📄 ৬. ওলীদ ইন্ন মুগীরা
ওলীদ ইব্ন মুগীরা বলাবলি করিত, আশ্চর্যের বিষয়, মুহাম্মাদের প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয় অথচ আমার মত সেরা ব্যক্তিত্ব ও আবূ মাসউদ ছাকাফীর মত ছাকীফ গোত্রের নেতার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয় না। তাহার এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে নাযিল হয় : وَقَالُوا لَوْلَا نُزِّلَ هَذَا الْقُرْآنُ عَلَى رجلٍ مِّنَ الْقَرْيَتَيْنِ عَظِيمٍ أَهُمْ يقسمونَ رَحْمَةً رَبِّكَ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُمْ مَعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَةٍ ليَتَّخِذَ بَعْضُهُمْ بَعْضًا سُخْرِيَّا وَرَحْمَةٌ
তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ উৎকৃষ্ট” (৪৩: ৩১-৩২)। সারকথা হইতেছে নবুওয়াত বা রিসালাত লাভ পার্থিব সম্মান বা সম্পদের উপর নির্ভরশীল নহে। এক দিনের ঘটনা, ওলীদ ইব্ন মুগীরা, উমাইয়া ইব্ন খালাফ, আবু জাহল, উৎবা ও শায়বা (শেষোক্ত দুইজন ছিলেন রবী'আর দুই পুত্র) এবং অন্যান্য কুরায়শ সর্দারগণ সম্মিলিত হইয়া ইসলাম সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করার জন্য নবী করীম (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়। তিনি তাহাদেরকে বুঝানোর জন্য কথাবার্তা বলিতেছিলেন। এমন সময় তাঁহার মসজিদের মুআযযিন অন্ধ সাহাবী আবদুল্লাহ্ ইব্ন উম্মে মাকতুম কিছু একটা জিজ্ঞাসা করিবার উদ্দেশে সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। কিন্তু নবী করীম (স) ভাবিলেন যে, ইব্ন উম্মে মাকতুম তো মুসলমান এবং অনেকটা নিজের লোক। যে কোন সুবিধামত সময় আসিয়া তাহার প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়া লইতে পারিবে। কিন্তু তাহার সম্মুখে উপস্থিত কুরায়শ সর্দারগণ প্রভাব-প্রতিপত্তিশীল লোক, তাহারা যদি ইসলাম গ্রহণ করে তবে তাহাদের দেখাদেখি অনেক লোক ইসলাম গ্রহণ করিবে। তিনি ঐ সময় ইব্ন উম্মে মাকতূমের প্রতি তেমন ভ্রূক্ষেপ করিলেন না, বরং তাহার ঐ সময় আগমনে নবী করীম (স)-এর চেহারায় কিছুটা অসন্তুষ্টির ভাব পরিলক্ষিত হইল। কেননা তাহার তো উচিত ছিল উক্ত কুরায়শ সর্দারদের সহিত নবী করীম (স)-এর কথাবার্তা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা। এই প্রসঙ্গে নাযিল হইল:
عَبَسَ وَتَوَلَّى أَنْ جَاءَهُ الْأَعْمَى. وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّى، أَوْ يَذَّكَّرُ فَتَنْفَعَهُ الذِكْرَى، أَمَّا مَنِ اسْتَغْنَى فَأَنْتَ لَهُ تَصَدَّى وَمَا عَلَيْكَ الا زَكَّى، وَأَمَّا مِنْ جَاءَكَ يَسْعَى، وَهُوَ يَخْشَى، فَأَنْتَ عَنْهُ تَلَهُى. كَلاَّ إِنَّهَا تذكرة. فَمَن شَاء ذكرَهُ
"সে ভ্রূকুঞ্চিত করিল এবং মুখ ফিরাইয়া লইল। কারণ তাহার নিকট অন্ধ লোকটি আসিল। তুমি কেমন করিয়া জানিবে সে হয়ত পরিশুদ্ধ হইত, অথবা উপদেশ গ্রহণ করিত, ফলে উপদেশে তাহার উপকারে আসিত। পক্ষান্তরে যে পরোয়া করে না, তুমি তাহার প্রতি মনোযোগ দিয়াছ। অথচ সে নিজে পরিশুদ্ধ না হইলে তোমার কোন দায়িত্ব নাই। অন্যপক্ষে যে তোমার নিকট ছুটিয়া আসিল, আর সে সশংকচিত্ত, তুমি তাহাকে উপেক্ষা করিলে। না, ইহা ঠিক নহে ইহা তো উপদেশবাণী! যে ইচ্ছা করিবে সে ইহা স্মরণ রাখিবে" (৮০ঃ ১-১২)।
এই ঘটনার পর হইতে মহানবী (স)-এর অবস্থা এই দাঁড়ায় যে, যখনই আবদুল্লাহ ইব্ন উম্মে মাক্কুম (রা) তাঁহার খিদমতে আসিতেন তখনই তিনি নিজ চাদর তাহার জন্য বিছাইয়া দিয়া তাহাকে স্বাগত জানাইতেন এই বলিয়া:
مرحبا بمن فيه عاتبني ربي
"স্বাগতম জানাই তাহাকে যাহার জন্য আমার প্রতিপালক আমাকে তমবীহ করিয়াছেন।"
তাহারা মদীনায় হিজরত করার পর রাসূলুল্লাহ (স) দুই দুইবার তাহাকে তাহার অনুপস্থিতিতে মদীনার গভর্ণর হিসাবে নিযুক্ত করিয়াছেন (দ্র. সায়্যিদ কুতুব শহীদ, ফী যিলালিল কুরআন, আমপারা, পৃ. ৮৭৭, আল-কুরআন একাডেমী, লণ্ডন প্রকাশিত)।
📄 ৭. আবূ কায়স ইনুল ফাকিহ
এই হতভাগাও সর্বদা মহানবী (স)-কে কষ্ট দিত। সে ছিল আবূ জাহলের বিশিষ্ট সহযোগী। বদর যুদ্ধকালে হযরত হামযা (রা)-এর হস্তে সে নিহত হয়।
📄 ৮. নযর ইন্ন হারিছ
নযর ইবন হারিছ ছিল কুরায়শদের অন্যতম সর্দার। ব্যবসা ব্যাপদেশে সে পারস্যে গমন করিত এবং পারস্যের বাদশাহগণের ইতিহাস ও কিস্সা-কাহিনী সংগ্রহ করিয়া লইয়া আসিত। সে তাহা কুরায়শদিগকে শুনাইত এবং বলিত, মুহাম্মাদ তোমাদিগকে আদ ও ছামূদ জাতির ইতিহাস শোনান, আর আমি তোমাদিগকে রুস্তম, ইসফেন্দিয়ার ও পারস্য সম্রাটদের কাহিনী শোনাই। লোকজন ঐসব কিস্সা-কাহিনী আগ্রহের সহিত শুনিত এবং উপভোগ করিত। এইগুলি তাহাদিগকে কুরআন শ্রবণ করিতে বিরত রাখিত।
ঐ হতভাগা একটি নর্তকী গায়িকাও ক্রয় করিয়া রাখিয়াছিল। সে তাহার মাধ্যমে লোকজনকে গান শোনাইত ও নাচ দেখাইত। সে যখনই কোন ব্যক্তি সম্পর্কে জানিতে পারিত যে, সে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িয়াছে, তাহার কাছেই উপস্থিত হইয়া বলিত, ইহাকে আহার্য ও পানীয় দাও এবং তাহার নাচগান উপভোগ কর। তারপর নর্তকীর নাচগানের পর সে বলিত, বল দেখি, আমার এই নর্তকীর নাচগান উত্তম, নাকি মুহাম্মাদের ঐসব কথা উত্তম যাহাতে তিনি বলেন, নামায পড়, রোযা রাখ, আল্লাহ্র দুশমনদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর। তাহার এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে নাযিল হয়: وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِى لَهْوَ الْحَدِيْثَ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيْلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِيْنٌ. وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِ أَيَاتُنَا وَلَّى مُسْتَكْرًا كَأَنْ لَمْ يَسْمَعْهَا كَأَنَّ فِيْ أُذْنَيْهِ وَقْرَأَ فَبَشِّرْهُ بِعَذَابٍ “মানুষের মধ্যে কেহ কেহ অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ হইতে বিচ্যুত করিবার জন্য অসার বাক্য ক্রয় করিয়া লয় এবং আল্লাহ্-প্রদর্শিত পথ লইয়া ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। উহাদেরই জন্য রহিয়াছে অবমাননাকর শাস্তি। যখন উহার নিকট আমার আয়াত আবৃত্তি করা হয় তখন সে দম্ভভরে মুখ ফিরাইয়া লয় যেন সে ইহা শুনিতে পায় নাই, যেন উহার কর্ণ দুইটি বধির। অতএব ইহাদিগকে মর্মন্তুদ শান্তির সংবাদ দাও” (৩১ঃ ৬-৭)।
বলা বাহুল্য, আহার্য ও পানীয় দান এবং নর্তকীদের নাচগানের দ্বারা প্রলুব্ধ করিয়া নিজেদের ধর্মের দিকে আহ্বান করা বাতিলপন্থীদের পুরাতন রীতি। বিশেষত খৃস্টানরা এই ব্যাপারে অত্যন্ত সক্রিয়। তাহাদের দেখাদেখি ভারতের আর্যসমাজীদের মধ্যেও এই রীতি প্রচলিত রহিয়াছে। কিন্তু আল্লাহ যাহাদিগকে বিবেক-বুদ্ধি দান করিয়াছেন, তাহারা উপলব্ধি করিতে পারেন যে, ইহা আল্লাহ্ওয়ালাদের নহে, উহা হইতেছে প্রবৃত্তি পূজারীদের অনুসৃত রীতি। সাহায্যের প্রলোভন দিয়া যাহারা ঈমান ক্রয়ের এরূপ অপচেষ্টা চালায়, তাহাদের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টিই উক্ত আয়াতসমূহ নাযিলের উদ্দেশ্য।
নযর ইবন হারিছ বদর যুদ্ধে বন্দী হয় এবং রসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে হযরত আলী (রা) তাহাকে নিধন করেন।
📄 ৯. আস ইব্ন ওয়াইল আস-সাহমী
লোকটি ছিল সাহাবী হযরত আমর ইবনুল আসের পিতা। নবী করীম (স)-কে এই ব্যক্তি সর্বদা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করিত। মহানবী (স)-এর পুত্র সন্তানগণ তাঁহার জীবদ্দশায় ইনতিকাল করায় সে মন্তব্য করে, ان محمدا ابتر لا يعيش له ولد "মুহাম্মাদ 'আবতার' অর্থাৎ আটকুড়া। তাঁহার কোন পুত্রই বাঁচে না।” তাহার এরূপ কটাক্ষপাতের জবাবেই সূরা কাওছার নাযিল হয়, যাহাতে এই আয়াতটিও রহিয়াছে: إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْأَبْتَرُ. "তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীই আটকুড়া বা নির্বংশ" (১০৮:৩)।
কাফিররা ভাবিয়াছিল, মুহাম্মাদ (স)-এর যেহেতু কোন পুত্রসন্তানই নাই, তাই তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহার আদর্শেরও স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটিবে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেল, তাঁহার অগণিত ভক্ত অনুরক্ত তাঁহার দীনের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেয়।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর মদীনায় হিজরতের এক মাস পর কোন বিষাক্ত কীটের দংশনে আস ইন্ন ওয়াইলের পা ফুলিয়া উটের ঘাড়ের মত হইয়া উঠে এবং ইহার ফলেই তাহার জীবনাবসান ঘটে।