📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ৩. উমাইয়া ইব্‌ন খালাফ আল-জুমাহী

📄 ৩. উমাইয়া ইব্‌ন খালাফ আল-জুমাহী


নবী করীম (স) ও মুসলমানগণকে নির্যাতন ও বিব্রতকরণে সদা সচেষ্ট এই দুরাচার সর্বদা প্রকাশ্যে আল্লাহ্ নবীর দুর্নাম করিয়া বেড়াইত। তাহার অত্যাচার-নির্যাতনের কাহিনী অনেক দীর্ঘ। নবী করীম (স)-কে দেখিতেই সে চক্ষু কটমট করিয়া অত্যন্ত রুদ্রমূর্তিতে তাঁহার দিকে তাকাইত। তাহার এইরূপ ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের প্রেক্ষিতেই নাযিল হয়:
وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةَ لُمَزَةَ. الَّذِي جَمَعَ مَالاً وَعَدَدَهُ. يَحْسَبُ أَنَّ مَالَهُ أَخْلَدَهُ. كَلَّا لَيُنْبَذَنَّ فِي الْحُطَمَةِ، وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْحُطَمَةُ نَارُ اللَّهِ الْمُوْقَدَةُ الَّتِي تَطَّلِعُ عَلَى الْأَفْئِدَةِ إِنَّهَا عَلَيْهِمْ مُوْصَدَةٌ فِي عَمَدٍ مُّمَدَّدَةٍ.
“দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে, যে অর্থ জমায় ও উহা বারবার গণনা করে। সে ধারণা করে যে, তাহার অর্থ তাহাকে অমর করিয়া রাখিবে; কখনও না, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হইবে হুতামায়। তুমি কি জান হুতামা কি? ইহা আল্লাহ্ প্রজ্জ্বলিত হুতাশন, যাহা হৃদয়কে গ্রাস করিবে। নিশ্চয় ইহা উহাদিগকে পরিবেষ্টন করিয়া রাখবে দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে (১০৪: ১-৯)।”

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ৪. উবাই ইব্‌ন খালাফ

📄 ৪. উবাই ইব্‌ন খালাফ


উবাই ইব্‌ন খালাফ ও তাহার সহোদর উমাইয়া ইব্‌ন খালাফের মত রসূলুল্লাহ (স) এর শত্রুতায় সর্বদা সক্রিয় থাকিত। একদা সে একটি জীর্ণশীর্ণ অস্থি হাতে লইয়া নবী করীম (স)-এর সম্মুখে উপস্থিত হয় এবং উহা হাতে মলিয়া গুড়া করিয়া বলিতে আরম্ভ করে, আল্লাহ কি ইহাকে পুনর্জীবিত করিবেন? জবাবে আল্লাহ্র রাসূল (স) বলিলেন: হাঁ, ঐ অস্থিকে এবং তোমার অস্থিকেও ঐরূপ জীর্ণ অস্থিতে পরিণত হওয়ার পর আল্লাহ পূনর্জীবিত করিবেন এবং তোমাকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করিবেন। ঐ প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়:
وَنَسِيَ خَلْقَهُ قَالَ مَنْ يُحْيِ الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ. قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقِ عَلَيْمُ الَّذِي جَعَلَ لَكُمْ مِّنَ الشَّجَرِ الْأَخْضَرِ نَارًا فَإِذَا أَنْتُمْ مِنْهُ تُوْقَدُونَ أَوَلَيْسَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ بقادر عَلَى أَنْ يَخْلُقَ مِثْلَهُمْ بَلَى وَهُوَ الْخَلَاقُ الْعَلِيْمُ، أَنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا। أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ، فَسُبْحَانَ الَّذِيْ بيدهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْيْ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
"এবং সে আমার সম্বন্ধে উপমা রচনা করে, অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলিয়া যায়। সে বলে, কে অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করিবে যখন উহা পচিয়া গলিয়া যাইবে? বল, উহার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করিবেন তিনিই যিনি ইহা প্রথমবার সৃষ্টি করিয়াছেন এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত। তিনি তোমাদের জন্য সবুজ বৃক্ষ হইতে অগ্নি উৎপাদন করেন এবং তোমরা উহা হইতে প্রজ্বলিত কর। যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন তিনি কি তাহাদের অনুরূপ সৃষ্টি করিতে সমর্থ নহেন? হাঁ, নিশ্চয়ই তিনি মহাস্রষ্টা, সর্বজ্ঞ। তাঁহার ব্যাপার শুধু এই, তিনি যখন কোন কিছুর ইচ্ছা করেন, তিনি উহাকে বলেন, 'হও', ফলে উহা হইয়া যায়। অতএব পবিত্র ও মহান তিনি, যাঁহার হস্তেই প্রত্যেক বিষয়ের সর্বময় কর্তৃত্ব; আর তাঁহারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হইবে” (৩৬: ৭৮-৮৩; দ্র. মুখতাসার ইব্‌ন কাছীর, সাবুনী সম্পা., ৩খ., পৃ. ১৭১)।
উহুদ যুদ্ধের সময় নবী করীম (স)-এর হাতে আল্লাহ্ এই শত্রুর জীবন সংহার ঘটে (দ্র. তারীখ ইবনে আছীর; ২খ., পৃ. ২৫; সীরাত-ই মুস্তফা, পৃ. ২১৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 উকবা ইব্‌ন আবূ মুআইত (মুঈত মি'য়াত)

📄 উকবা ইব্‌ন আবূ মুআইত (মুঈত মি'য়াত)


এই ব্যক্তিটি উবাই ইব্‌ন খালাফের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল। একদা উকবা নবী করীম (স)-এর নিকট আসিয়া কিছুক্ষণ তাঁহার নিকট থাকিয়া তাঁহার বাণী শ্রবণ করে। এই সংবাদ জানিতে পারিয়া উবাই তৎক্ষণাৎ তাহার নিকট গিয়া উপস্থিত হয় এবং বলে, আমি জানিতে পারিয়াছি যে, তুমি মুহাম্মাদের নিকট গিয়াছ এবং তাহার কথাবার্তাও শ্রবণ করিয়াছ। আল্লাহ্র কসম! তুমি যতক্ষণ পর্যন্ত তাহার নিকট গিয়া তাহার মুখে থুথু নিক্ষেপ করিয়া না আসিবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার চেহারা দর্শন বা তোমার সাথে কথা বলা আমার জন্য হারাম। এই কথা শুনিয়া হতভাগ্য উকবা সত্যসত্যই মহানবী (স)-এর পবিত্র চেহারামণ্ডলে থুথু নিক্ষেপ করিয়া তাহার নরাধম বন্ধুটির মনস্তুষ্টি সাধন করে। ইহারই পরিপ্রেক্ষিতে নাযিল হয় :
يَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يُلَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلاً، يُوَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلانًا خَلِيْلاً. لَقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي وَكَانَ الشَّيْطَنُ لِلْإِنْسَانِ خَدُولاً . وَقَالَ الرَّسُولُ يُرَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هُذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا. وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِي عَدُوا مِّنَ الْمُجْرِمِينَ وكَفَى بِرَبِّكَ هَادِيًا وَنَصِيراً .
"জালিম ব্যক্তি সেই দিন নিজ হস্তদ্বয় দংশন করিতে করিতে বলিবে, হায়! আমি যদি রাসূলের সহিত সৎপথ অবলম্বন করিতাম! হায়, দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করিতাম! আমাকে তো সে বিভ্রান্ত করিয়াছিল আমার নিকট উপদেশ পৌছিবার পর। শয়তান তো মানুষের জন্য মহাপ্রতারক। রাসূল বলিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো এই কুরআনকে পরিত্যাজ্য মনে করে। (আল্লাহ্ বলেন) এইভাবেই আমি প্রত্যেক নবীর শত্রু করিয়াছিলাম অপরাধীদিগকে। তোমার জন্য তোমার প্রতিপালকই পথপ্রদর্শক ও সাহায্যকারীরূপে যথেষ্ট” (২৫: ২৭-৩১)।
বদর যুদ্ধে উকবা মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। সাফরা নামক স্থানে পৌঁছাইলে তাহার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরী করা হয় (দ্র. ইব্‌ন আছীর, ২খ., পৃ. ২৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ৬. ওলীদ ইন্ন মুগীরা

📄 ৬. ওলীদ ইন্ন মুগীরা


ওলীদ ইব্‌ন মুগীরা বলাবলি করিত, আশ্চর্যের বিষয়, মুহাম্মাদের প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয় অথচ আমার মত সেরা ব্যক্তিত্ব ও আবূ মাসউদ ছাকাফীর মত ছাকীফ গোত্রের নেতার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয় না। তাহার এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে নাযিল হয় : وَقَالُوا لَوْلَا نُزِّلَ هَذَا الْقُرْآنُ عَلَى رجلٍ مِّنَ الْقَرْيَتَيْنِ عَظِيمٍ أَهُمْ يقسمونَ رَحْمَةً رَبِّكَ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُمْ مَعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَةٍ ليَتَّخِذَ بَعْضُهُمْ بَعْضًا سُخْرِيَّا وَرَحْمَةٌ
তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ উৎকৃষ্ট” (৪৩: ৩১-৩২)। সারকথা হইতেছে নবুওয়াত বা রিসালাত লাভ পার্থিব সম্মান বা সম্পদের উপর নির্ভরশীল নহে। এক দিনের ঘটনা, ওলীদ ইব্‌ন মুগীরা, উমাইয়া ইব্‌ন খালাফ, আবু জাহল, উৎবা ও শায়বা (শেষোক্ত দুইজন ছিলেন রবী'আর দুই পুত্র) এবং অন্যান্য কুরায়শ সর্দারগণ সম্মিলিত হইয়া ইসলাম সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করার জন্য নবী করীম (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়। তিনি তাহাদেরকে বুঝানোর জন্য কথাবার্তা বলিতেছিলেন। এমন সময় তাঁহার মসজিদের মুআযযিন অন্ধ সাহাবী আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন উম্মে মাকতুম কিছু একটা জিজ্ঞাসা করিবার উদ্দেশে সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। কিন্তু নবী করীম (স) ভাবিলেন যে, ইব্‌ন উম্মে মাকতুম তো মুসলমান এবং অনেকটা নিজের লোক। যে কোন সুবিধামত সময় আসিয়া তাহার প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়া লইতে পারিবে। কিন্তু তাহার সম্মুখে উপস্থিত কুরায়শ সর্দারগণ প্রভাব-প্রতিপত্তিশীল লোক, তাহারা যদি ইসলাম গ্রহণ করে তবে তাহাদের দেখাদেখি অনেক লোক ইসলাম গ্রহণ করিবে। তিনি ঐ সময় ইব্‌ন উম্মে মাকতূমের প্রতি তেমন ভ্রূক্ষেপ করিলেন না, বরং তাহার ঐ সময় আগমনে নবী করীম (স)-এর চেহারায় কিছুটা অসন্তুষ্টির ভাব পরিলক্ষিত হইল। কেননা তাহার তো উচিত ছিল উক্ত কুরায়শ সর্দারদের সহিত নবী করীম (স)-এর কথাবার্তা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা। এই প্রসঙ্গে নাযিল হইল:
عَبَسَ وَتَوَلَّى أَنْ جَاءَهُ الْأَعْمَى. وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّى، أَوْ يَذَّكَّرُ فَتَنْفَعَهُ الذِكْرَى، أَمَّا مَنِ اسْتَغْنَى فَأَنْتَ لَهُ تَصَدَّى وَمَا عَلَيْكَ الا زَكَّى، وَأَمَّا مِنْ جَاءَكَ يَسْعَى، وَهُوَ يَخْشَى، فَأَنْتَ عَنْهُ تَلَهُى. كَلاَّ إِنَّهَا تذكرة. فَمَن شَاء ذكرَهُ
"সে ভ্রূকুঞ্চিত করিল এবং মুখ ফিরাইয়া লইল। কারণ তাহার নিকট অন্ধ লোকটি আসিল। তুমি কেমন করিয়া জানিবে সে হয়ত পরিশুদ্ধ হইত, অথবা উপদেশ গ্রহণ করিত, ফলে উপদেশে তাহার উপকারে আসিত। পক্ষান্তরে যে পরোয়া করে না, তুমি তাহার প্রতি মনোযোগ দিয়াছ। অথচ সে নিজে পরিশুদ্ধ না হইলে তোমার কোন দায়িত্ব নাই। অন্যপক্ষে যে তোমার নিকট ছুটিয়া আসিল, আর সে সশংকচিত্ত, তুমি তাহাকে উপেক্ষা করিলে। না, ইহা ঠিক নহে ইহা তো উপদেশবাণী! যে ইচ্ছা করিবে সে ইহা স্মরণ রাখিবে" (৮০ঃ ১-১২)।
এই ঘটনার পর হইতে মহানবী (স)-এর অবস্থা এই দাঁড়ায় যে, যখনই আবদুল্লাহ ইব্‌ন উম্মে মাক্কুম (রা) তাঁহার খিদমতে আসিতেন তখনই তিনি নিজ চাদর তাহার জন্য বিছাইয়া দিয়া তাহাকে স্বাগত জানাইতেন এই বলিয়া:
مرحبا بمن فيه عاتبني ربي
"স্বাগতম জানাই তাহাকে যাহার জন্য আমার প্রতিপালক আমাকে তমবীহ করিয়াছেন।"
তাহারা মদীনায় হিজরত করার পর রাসূলুল্লাহ (স) দুই দুইবার তাহাকে তাহার অনুপস্থিতিতে মদীনার গভর্ণর হিসাবে নিযুক্ত করিয়াছেন (দ্র. সায়্যিদ কুতুব শহীদ, ফী যিলালিল কুরআন, আমপারা, পৃ. ৮৭৭, আল-কুরআন একাডেমী, লণ্ডন প্রকাশিত)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00