📄 ১. আবূ জাহ্ ইব্ন হিশাম
এই ব্যক্তি ছিল এই উম্মতের ফেরাউন। বিদ্বেষ ও বৈরিতার এমন কোন পন্থা নাই যাহা সে অবলম্বন করে নাই। এমনকি বদর যুদ্ধে দুই মুসলিম কিশোরের হাতে নিহত হওয়ার প্রাক্কালেও সে যে উক্তি করিয়াছিল, তাহাতেও তাহার চরম বিদ্বেষের অভিব্যক্তি ঘটিয়াছিল।
তাহার উপনাম ছিল আবুল হাকাম। রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহাকে আবূ জাহল বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছিলেন (পৃ. গ্র)। আবু জাহল বলিত, আমার নাম আযীয করীম অর্থাৎ সম্ভ্রমশীল সর্দার। তাহার এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে নাযিল হয়ঃ
"নিশ্চয় যাক্কুম বৃক্ষ হইবে পাপীর খাদ্য; গলিত তাম্রের মত, উহাদের উদরে ফুটিতে থাকিবে ফুটন্ত إِنَّ شَجَرَتَ الزَّقُومِ. طَعَامُ الْأَثِيمِ. كَالْمُهْلِ يَغْلِي فِي الْبُطُونِ. كَغَلْي الْحَمِيمِ. خُذُوهُ فَاعْتِلُوهُ إِلَى سَوَاءِ الْجَحِيمِ. ثُمَّ صُبُّوا فَوْقَ رَأْسِهِ مِنْ عَذَابِ الْحَمِيمِ ذُقْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْكَرِيمُ إِنَّ هَذَا مَا كُنْتُمْ بِهِ تَمْتَرُونَ পানির মত। উহাকে ধর এবং টানিয়া লইয়া যাও কাসম্যুহেলু ইয়াগলী ফিলবুতুন আলহিম খদহু ফাগতিলুহু ইলা সাওয়া আলজাহিম সুমমা সুব্বু ফাওকা রাসিহি মিন আজাবিলহিম জুক ইন্নাকা আনতাল আজিজ আলকারিম ইন্না হাজা মাকুনতুম বিহী তামতারুন. জাহান্নামের মধ্যস্থলে, অতঃপর উহার মস্তকের উপর ফুটন্ত পানি ঢালিয়া শাস্তি দাও এবং বলা হইবে আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত। ইহা তো উহাই যে বিষয়ে তোমরা সন্দেহ করিতে" (৪৪:৪৩-৫০)।
এই ব্যক্তি ছিল এই উম্মতের ফেরাউন। বিদ্বেষ ও বৈরিতার এমন কোন পন্থা নাই যাহা সে অবলম্বন করে নাই। এমনকি বদর যুদ্ধে দুই মুসলিম কিশোরের হাতে নিহত হওয়ার প্রাক্কালেও সে যে উক্তি করিয়াছিল, তাহাতেও তাহার চরম বিদ্বেষের অভিব্যক্তি ঘটিয়াছিল। তাহার উপনাম ছিল আবুল হাকাম। রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহাকে আবূ জাহল বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছিলেন (পৃ. গ্র)। আবু জাহল বলিত, আমার নাম আযীয করীম অর্থাৎ সম্ভ্রমশীল সর্দার। তাহার এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে নাযিল হয়ঃ "নিশ্চয় যাক্কুম বৃক্ষ হইবে পাপীর খাদ্য; গলিত তাম্রের মত, উহাদের উদরে ফুটিতে থাকিবে ফুটন্ত إِنَّ شَجَرَتَ الزَّقُومِ. طَعَامُ الْأَثِيمِ. كَالْمُهْلِ يَغْلِي فِي الْبُطُونِ. كَغَلْي الْحَمِيمِ. خُذُوهُ فَاعْتِلُوهُ إِلَى سَوَاءِ الْجَحِيمِ. ثُمَّ صُبُّوا فَوْقَ رَأْسِهِ مِنْ عَذَابِ الْحَمِيمِ ذُقْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْكَرِيمُ إِنَّ هَذَا مَا كُنْتُمْ بِهِ تَمْتَرُونَ পানির মত। উহাকে ধর এবং টানিয়া লইয়া যাও কাসম্যুহেলু ইয়াগলী ফিলবুতুন আলহিম খদহু ফাগতিলুহু ইলা সাওয়া আলজাহিম সুমমা সুব্বু ফাওকা রাসিহি মিন আজাবিলহিম জুক ইন্নাকা আনتال আজিজ আলকারيم ইন্না হাজا মাকুনতুম বিহী তামতারুন. জাহান্নামের মধ্যস্থলে, অতঃপর উহার মস্তকের উপর ফুটন্ত পানি ঢালিয়া শাস্তি দাও এবং বলা হইবে আস্বাদ গ্রহণ কর, তুমি তো ছিলে সম্মানিত, অভিজাত। ইহা তো উহাই যে বিষয়ে তোমরা সন্দেহ করিতে" (৪৪:৪৩-৫০)।
📄 ২. আবু লাহাব ও তদীয় স্ত্রী উম্মে জামীল
আবু লাহাব ছিল তাহার উপনাম। আসল নাম ছিল আবদুল উয্যা ইব্ন আবদুল মুত্তালিব। সম্পর্কে সে ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর আপন পিতৃব্য। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনকে সতর্কীকরণ সংক্রান্ত আল্লাহর নির্দেশ আসার পর রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাহাদের ৪০/৪৫ জনকে একটি ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানাইয়া সর্বপ্রথম ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন, তখন এই আবু লাহাবই সর্বাগ্রে তাঁহাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং বলে: তبا لك سائر اليوم الهذا جمعتنا (ধ্বংস তোমাকে ধ্বংস করুন! এজন্যই কি তুমি আমাদিগকে সমবেত করিয়াছ)? এই কথা বলিয়া সে ইসলামের ঐ প্রথম দাওয়াতের মজলিসটিকে পণ্ড করিয়া দিয়া লোকজনকে লইয়া প্রস্থান করে। এই পরিস্থিতিতেই সূরা লাহাব নাযিল হইয়াছিল।
আবু লাহাব যেহেতু অত্যন্ত ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিল, এইজন্য যখন তাহাকে আল্লাহ্ শাস্তির ভয় প্রদর্শন করা হইত তখন সে বলিত, আমার ভ্রাতুষ্পুত্রের কথা যদি সত্য হয় তাহা হইলে কিয়ামতের দিন আমি মুক্তিপণস্বরূপ ধনসম্পদের বিনিময়ে নিষ্কৃতি লাভ করিব।
مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ
"তাহার ধন-সম্পদ ও তাহার উপার্জন তাহার কোন কাজে আসে নাই" (১১১: ২) আয়াতে এই দিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে। তাহার স্ত্রী উম্মে জামীল বিন্ত হারব ছিল আবূ সুফিয়ানের সহোদরা। সেও নবী করীম (স)-এর প্রতি অত্যন্ত বিদ্বেষ পোষণ করিত। রাত্রিবেলা তাঁহার চলার পথে সে কাঁটা বিছাইয়া রাখিত (দ্র. তাফসীর ইবন কাছীর ও রূহুল মা'আনী, সূরা লাহাবের ব্যাখ্যায়)। কোন কোন বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, সাফা পাহাড়ে মহানবীর প্রথম ভাষণের পর আবু লাহাব নবী করীম (স)-কে আঘাত করার উদ্দেশে হাতে পাথরও উঠাইয়াছিল (দ্র. আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৯৮, তিরমিযীর বরাতে)।
আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীল সম্পর্কে জানা যায় যে, সে অন্যন্ত কুভাষিণী ও কলহপ্রিয়া ছিল। নবী করীম (স)-এর প্রতি কুভাষা প্রয়োগ ও ষড়যন্ত্র পাকান এবং অপবাদ দেওয়া ছিল তাহার নিত্য দিনের কাজ। ফিৎনা-ফাসাদের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা এবং নবী করীম (স)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহ সৃষ্টিতে সে ছিল অত্যন্ত পারঙ্গম নারী। এইজন্য আল-কুরআনে তাহাকে حملة الحطب (ইন্ধন বহনকারিণী) বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে।
সে যখন জানিতে পারিল যে, তাহার ও তাহার স্বামীর নিন্দায় কুরআন শরীফের আয়াত নাযিল হইয়াছে, তখন সে দৌড়াইয়া রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর খোঁজে বাহির হইয়া পড়ে। তিনি তখন মসজিদুল হারামে অবস্থান করিতেছিলেন। সে তাহার হাতের মুষ্ঠির মধ্যে পাথর লইয়া সেখানে গিয়া উপস্থিত হইল। আল্লাহর কুদরতে নবী করীম (স) তাহার দৃষ্টি হইতে অদৃশ্য হইয়া গেলেন। সে শুধু হযরত আবূ বাকর (রা)-কেই দেখিতে পাইল। রাগে গরগর করিয়া সে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, হে আবূ বাক্স! তোমার সঙ্গীটি কোথায়? আমি জানিতে পারিয়াছি যে, সে আমার কুৎসামূলক কবিতা রচনা করে। আল্লাহ্র শপথ! আমি যদি তাঁহাকে পাইতাম তবে তাঁহার মুখে ইহা ছুঁড়িয়া মারিতাম। আল্লাহ্র শপথ! আমিও কবিতা রচনা করিতে পারঙ্গম। এই কথা বলিয়াই সে আবৃত্তি করিলঃ مُدَمًمًا عَصَيْنَا "নিন্দিতের করেছি অবাধ্যতা" وَأَمْرَةَ أَبَيْنَا “হুকুম তাহার করিয়াছি প্রত্যাখ্যান" وَدَيْنَهُ قَلَيْنَا "তাহার দীনের সহিত আমার শত্রুতা।"
উল্লেখ্য, তাহার তথাকথিত নিন্দাসূচক কবিতায় সে নবী করীম (স)-এর মুহাম্মাদ (প্রসংশিত) নামের স্থলে 'মুযাম্মাম' (নিন্দিত) শব্দটি ব্যবহার করিয়া তাহার বৈরিতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছে। তাহার পর সে সেখানে হইতে প্রস্থান করে (সীরাত-ই মুস্তাফা, পৃ. ২১৩)।
কুরায়শগণ যখন মুহাম্মাদ (স)-কে মুযাম্মাম বলিয়া নিন্দা করিত তখন তিনি বলিতেন, হে কুরায়শকুল! তোমরা তো মুযাম্মামেরই নিন্দাবাদ করিয়া থাক, মুহাম্মাদের নহে। আর আমি তো হইতেছি মুহাম্মাদ (প্রশংসিত)। সুতরাং মুযাম্মাম নামের নিন্দাবাদ আমাকে স্পর্শ করে না (পৃ. গ্র., পৃ. ২১৩)।
অন্য এক বর্ণনা হইতে জানা যায়, আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) উম্মে জামীলকে আগাইয়া আসিতে দেখিয়াই বলিয়াছিলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! উম্মে জামীল এইদিকে আসিতেছে। আমি আপনার নিরাপত্তার ব্যাপারে শঙ্কিত। তিনি বলিয়াছিলেন : إِنَّمَا لَنْ تَرَانِي "সে আমাকে মোটেই দেখিবে না"। এই সময় তিনি কুরআন শরীফের কতিপয় আয়াত তিলাওয়াত করিলেন (দ্র. তাফসীর ইবন কাছীর, সূরা লাহাবের তাফসীর)।
উল্লেখ্য, আল্লাহ তা'আলা কুরআনুল কারীমে রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই মর্মে একটি আশ্বাসও দান করিয়াছেন যে, কুরআন তিলাওয়াতকালে আল্লাহ তাআলা তাঁহার ও কাফিরদের মধ্যে একটি অদৃশ্য আবরণ সৃষ্টি করিয়া দিবেন।
وَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ جَعَلْنَا بَيْنَكَ وَبَيْنَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بالآخرة حجابًا مستوراً. "তুমি যখন কুরআন পাঠ কর তখন তোমার ও আখিরাতে যাহারা বিশ্বাস করে না তাহাদের মধ্যে এক প্রচ্ছন্ন পর্দা রাখিয়া দেই” (১৭:৪৫)।
উম্মে জামীলের প্রস্থানের পর হযরত আবূ বাক্স (রা) আরয করিলেন, সম্ভবত উম্মে জামীল আপনাকে দেখিতে পায় নাই। জবাবে তিনি বলিলেন: তাহার প্রস্থান পর্যন্ত জনৈক ফেরেশতা আমাকে আড়াল করিয়া রাখিয়াছিলেন।
বদর যুদ্ধের সাতদিন পর আবু লাহাবের দেহে একটি বিষাক্ত ফোঁড়া দেখা দেয় এবং উহাতেই তাহার মৃত্যু ঘটে'। তাহার পরিবারের লোকজন রোগ সংক্রমণের আশঙ্কায় তাহার ধারে-কাছে আসিত না। ফলে তাহার মৃতদেহে পচন ধরিয়া যায়। দুর্ণামের আশঙ্কায় বিষয়টি গোপন রাখিয়া কয়েকজন কাফ্রী মজুর নিয়োগ করিয়া তাহার দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। ঐ মজুররা ঐ মৃতদেহটি উঠাইয়া নিয়া যায় এবং একটা গর্ত খনন করিয়া কাষ্ঠখণ্ড দ্বারা ঠেলিয়া ঐ মৃতদেহটি উহাতে নিক্ষেপ করিয়া মাটিচাপা দেয়। এইভাবে চরম অপমান ও লাঞ্ছনার সহিত তাহার পার্থিব জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
আবু লাহাবের তিনটি পুত্র সন্তান ছিলঃ (১) উৎবা, (২) মুআত্তিব ও (৩) উতায়বা। প্রথমোক্ত দুইজন মক্কা বিজয়কালে ইসলাম গ্রহণ করেন। অপর পুত্র উতায়বা, যে তাহার পিতার প্ররোচনায় নবী দুহিতাকে তালাক দিয়াছিল, উপরন্তু ঔদ্ধত্য প্রকাশ করিয়াছিল, সে রসূলুল্লাহ (স)-এর অভিশাপে ধ্বংস হয়।
মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আব্বাস (রা)-কে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র উৎবা ও মুআত্তিব কোথায়? তাহাদিগকে দেখা যাইতেছে না কেন? জবাবে আব্বাস (রা) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সম্ভবত তাহারা কোথাও আত্মগোপন করিয়া রহিয়াছে। তখন রসূলুল্লাহ (স) আদেশ দিলেন, উহাদিগকে খুঁজিয়া আমার কাছে উপস্থিত করুন। অনেক খোঁজাখুজির পর তাহাদিগকে আরাফাত ময়দানে পাওয়া যায় এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশানুযায়ী তাহাদের দুইজনকেই তাহার দরবারে উপস্থিত করা হয়। নবী করীম (স) তাহাদিগকে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানাইলে তাঁহারা তাঁহার আহবানে সাড়া দিয়া তাৎক্ষণিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেনঃ আমি আমার প্রতিপালকের নিকট ফরিয়াদ করিয়া এই দুইটি পিতৃব্য পুত্রকে চাহিয়া লইয়াছি (দ্র. সীরাতুল মুস্তফা, ১খ, পৃ. ২১৪)।
আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীলেরও অপমৃত্যুই হইয়াছিল। খেজুরের আঁশ দ্বারা পাকানো রজ্জুতে বাঁধিয়া সে কাঠ বহন করিত। একদিন কাঠের বোঝার সেই রজ্জু দুর্ঘটনাক্রমে তাহার গলার ফাঁস হইয়া তাহার মৃত্যু ঘটায়।
আবু লাহাব ছিল তাহার উপনাম। আসল নাম ছিল আবদুল উয্যা ইব্ن আবদুল মুত্তালিব। সম্পর্কে সে ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর আপন পিতৃব্য। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনকে সতর্কীকরণ সংক্রান্ত আল্লাহর নির্দেশ আসার পর রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাহাদের ৪০/৪৫ জনকে একটি ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানাইয়া সর্বপ্রথম ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন, তখন এই আবু লাহাবই সর্বাগ্রে তাঁহাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং বলে: تبا لك سائر اليوم الهذا جمعتنا (ধ্বংস তোমাকে ধ্বংস করুন! এজন্যই কি তুমি আমাদিগকে সমবেত করিয়াছ)? এই কথা বলিয়া সে ইসলামের ঐ প্রথম দাওয়াতের মজলিসটিকে পণ্ড করিয়া দিয়া লোকজনকে লইয়া প্রস্থান করে। এই পরিস্থিতিতেই সূরা লাহাব নাযিল হইয়াছিল। আবু লাহাব যেহেতু অত্যন্ত ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিল, এইজন্য যখন তাহাকে আল্লাহ্ শাস্তির ভয় প্রদর্শন করা হইত তখন সে বলিত, আমার ভ্রাতুষ্পুত্রের কথা যদি সত্য হয় তাহা হইলে কিয়ামতের দিন আমি মুক্তিপণস্বরূপ ধনসম্পদের বিনিময়ে নিষ্কৃতি লাভ করিব। مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ "তাহার ধন-সম্পদ ও তাহার উপার্জন তাহার কোন কাজে আসে নাই" (১১১: ২) আয়াতে এই দিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে। তাহার স্ত্রী উম্মে জামীল বিন্ত হারব ছিল আবূ সুফিয়ানের সহোদরা। সেও নবী করীম (স)-এর প্রতি অত্যন্ত বিদ্বেষ পোষণ করিত। রাত্রিবেলা তাঁহার চলার পথে সে কাঁটা বিছাইয়া রাখিত (দ্র. তাফসীর ইবন কাছীর ও রূহুল মা'আনী, সূরা লাহাবের ব্যাখ্যায়)। কোন কোন বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, সাফা পাহাড়ে মহানবীর প্রথম ভাষণের পর আবু লাহাব নবী করীম (স)-কে আঘাত করার উদ্দেশে হাতে পাথরও উঠাইয়াছিল (দ্র. আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৯৮, তিরমিযীর বরাতে)। আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীল সম্পর্কে জানা যায় যে, সে অন্যন্ত কুভাষিণী ও কলহপ্রিয়া ছিল। নবী করীম (স)-এর প্রতি কুভাষা প্রয়োগ ও ষড়যন্ত্র পাকান এবং অপবাদ দেওয়া ছিল তাহার নিত্য দিনের কাজ। ফিৎনা-ফাসাদের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা এবং নবী করীম (স)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহ সৃষ্টিতে সে ছিল অত্যন্ত পারঙ্গম নারী। এইজন্য আল-কুরআনে তাহাকে حملة الحطب (ইন্ধন বহনকারিণী) বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। সে যখন জানিতে পারিল যে, তাহার ও তাহার স্বামীর নিন্দায় কুরআন শরীফের আয়াত নাযিল হইয়াছে, তখন সে দৌড়াইয়া রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর খোঁজে বাহির হইয়া পড়ে। তিনি তখন মসজিদুল হারামে অবস্থান করিতেছিলেন। সে তাহার হাতের মুষ্ঠির মধ্যে পাথর লইয়া সেখানে গিয়া উপস্থিত হইল। আল্লাহর কুদরতে নবী করীম (স) তাহার দৃষ্টি হইতে অদৃশ্য হইয়া গেলেন। সে শুধু হযরত আবূ বাকর (রা)-কেই দেখিতে পাইল। রাগে গরগর করিয়া সে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, হে আবূ বাক্স! তোমার সঙ্গীটি কোথায়? আমি জানিতে পারিয়াছি যে, সে আমার কুৎসামূলক কবিতা রচনা করে। আল্লাহ্র শপথ! আমি যদি তাঁহাকে পাইতাম তবে তাঁহার মুখে ইহা ছুঁড়িয়া মারিতাম। আল্লাহ্র শপথ! আমিও কবিতা রচনা করিতে পারঙ্গম। এই কথা বলিয়াই সে আবৃত্তি করিলঃ مُدَمًمًا عَصَيْنَا "নিন্দিতের করেছি অবাধ্যতা" وَأَمْرَةَ أَبَيْنَا “হুকুম তাহার করিয়াছি প্রত্যাখ্যান" وَدَيْنَهُ قَلَيْنَا "তাহার দীনের সহিত আমার শত্রুতা।" উল্লেখ্য, তাহার তথাকথিত নিন্দাসূচক কবিতায় সে নবী করীম (স)-এর মুহাম্মাদ (প্রসংশিত) নামের স্থলে 'মুযাম্মাম' (নিন্দিত) শব্দটি ব্যবহার করিয়া তাহার বৈরিতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছে। তাহার পর সে সেখানে হইতে প্রস্থান করে (সীরাত-ই মুস্তফা, পৃ. ২১৩)। কুরায়শগণ যখন মুহাম্মাদ (স)-কে মুযাম্মাম বলিয়া নিন্দা করিত তখন তিনি বলিতেন, হে কুরায়শকুল! তোমরা তো মুযাম্মামেরই নিন্দাবাদ করিয়া থাক, মুহাম্মাদের নহে। আর আমি তো হইতেছি মুহাম্মাদ (প্রশংসিত)। সুতরাং মুযাম্মাম নামের নিন্দাবাদ আমাকে স্পর্শ করে না (পৃ. গ্র., পৃ. ২১৩)। অন্য এক বর্ণনা হইতে জানা যায়, আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) উম্মে জামীলকে আগাইয়া আসিতে দেখিয়াই বলিয়াছিলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! উম্মে জামীল এইদিকে আসিতেছে। আমি আপনার নিরাপত্তার ব্যাপারে শঙ্কিত। তিনি বলিয়াছিলেন : إِنَّمَا لَنْ تَرَانِي "সে আমাকে মোটেই দেখিবে না"। এই সময় তিনি কুরআন শরীফের কতিপয় আয়াত তিলাওয়াত করিলেন (দ্র. তাফসীর ইবন কাছীর, সূরা লাহাবের তাফসীর)। উল্লেখ্য, আল্লাহ তা'আলা কুরআনুল কারীমে রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই মর্মে একটি আশ্বাসও দান করিয়াছেন যে, কুরআন তিলাওয়াতকালে আল্লাহ তাআলা তাঁহার ও কাফিরদের মধ্যে একটি অদৃশ্য আবরণ সৃষ্টি করিয়া দিবেন। وَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ جَعَلْنَا بَيْنَكَ وَبَيْنَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بالآخرة حجابًا مستوراً. "তুমি যখন কুরআন পাঠ কর তখন তোমার ও আখিরাতে যাহারা বিশ্বাস করে না তাহাদের মধ্যে এক প্রচ্ছন্ন পর্দা রাখিয়া দেই” (১৭:৪৫)। উম্মে জামীলের প্রস্থানের পর হযرت আবূ বাক্স (রা) আরয করিলেন, সম্ভবত উম্মে জামীل আপনাকে দেখিতে পায় নাই। জবাবে তিনি বলিলেন: তাহার প্রস্থান পর্যন্ত জনৈক ফেরেশতা আমাকে আড়াল করিয়া রাখিয়াছিলেন। বদর যুদ্ধের সাতদিন পর আবু লাহাবের দেহে একটি বিষাক্ত ফোঁড়া দেখা দেয় এবং উহাতেই তাহার মৃত্যু ঘটে'। তাহার পরিবারের লোকজন রোগ সংক্রমণের আশঙ্কায় তাহার ধারে-কাছে আসিত না। ফলে তাহার মৃতদেহে পচন ধরিয়া যায়। দুর্ণামের আশঙ্কায় বিষয়টি গোপন রাখিয়া কয়েকজন কাফ্রী মজুর নিয়োগ করিয়া তাহার দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। ঐ মজুররা ঐ মৃতদেহটি উঠাইয়া নিয়া যায় এবং একটা গর্ত খনন করিয়া কাষ্ঠখণ্ড দ্বারা ঠেলিয়া ঐ মৃতদেহটি উহাতে নিক্ষেপ করিয়া মাটিচাপা দেয়। এইভাবে চরম অপমান ও লাঞ্ছনার সহিত তাহার পার্থিব জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। আবু লাহাবের তিনটি পুত্র সন্তান ছিলঃ (১) উৎবা, (২) মুআত্তিব ও (৩) উতায়বা। প্রথমোক্ত দুইজন মক্কা বিজয়কালে ইসলাম গ্রহণ করেন। অপর পুত্র উতায়বা, যে তাহার পিতার প্ররোচনায় নবী দুহিতাকে তালাক দিয়াছিল, উপরন্তু ঔদ্ধত্য প্রকাশ করিয়াছিল, সে রসূলুল্লাহ (স)-এর অভিশাপে ধ্বংস হয়। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (স) হযرت আব্বাস (রা)-কে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র উৎবা ও মুআত্তিব কোথায়? তাহাদিগকে দেখা যাইতেছে না কেন? জবাবে আব্বাস (রা) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সম্ভবত তাহারা কোথাও আত্মগোপন করিয়া রহিয়াছে। তখন রসূলুল্লাহ (স) আদেশ দিলেন, উহাদিগকে খুঁজিয়া আমার কাছে উপস্থিত করুন। অনেক খোঁজাখুজির পর তাহাদিগকে আরাফাত ময়দানে পাওয়া যায় এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশানুযায়ী তাহাদের দুইজনকেই তাহার দরবারে উপস্থিত করা হয়। নবী করীম (স) তাহাদিগকে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানাইলে তাঁহারা তাঁহার আহবানে সাড়া দিয়া তাৎক্ষণিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেনঃ আমি আমার প্রতিপালকের নিকট ফরিয়াদ করিয়া এই দুইটি পিতৃব্য পুত্রকে চাহিয়া লইয়াছি (দ্র. সীরাতুল মুস্তফা, ১খ, পৃ. ২১৪)। আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীলেরও অপমৃত্যুই হইয়াছিল। খেজুরের আঁশ দ্বারা পাকানো রজ্জুতে বাঁধিয়া সে কাঠ বহন করিত। একদিন কাঠের বোঝার সেই রজ্জু দুর্ঘটনাক্রমে তাহার গলার ফাঁস হইয়া তাহার মৃত্যু ঘটায়।
📄 ৩. উমাইয়া ইব্ন খালাফ আল-জুমাহী
নবী করীম (স) ও মুসলমানগণকে নির্যাতন ও বিব্রতকরণে সদা সচেষ্ট এই দুরাচার সর্বদা প্রকাশ্যে আল্লাহ্ নবীর দুর্নাম করিয়া বেড়াইত। তাহার অত্যাচার-নির্যাতনের কাহিনী অনেক দীর্ঘ। নবী করীম (স)-কে দেখিতেই সে চক্ষু কটমট করিয়া অত্যন্ত রুদ্রমূর্তিতে তাঁহার দিকে তাকাইত। তাহার এইরূপ ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের প্রেক্ষিতেই নাযিল হয়:
وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةَ لُمَزَةَ. الَّذِي جَمَعَ مَالاً وَعَدَدَهُ. يَحْسَبُ أَنَّ مَالَهُ أَخْلَدَهُ. كَلَّا لَيُنْبَذَنَّ فِي الْحُطَمَةِ، وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْحُطَمَةُ نَارُ اللَّهِ الْمُوْقَدَةُ الَّتِي تَطَّلِعُ عَلَى الْأَفْئِدَةِ إِنَّهَا عَلَيْهِمْ مُوْصَدَةٌ فِي عَمَدٍ مُّمَدَّدَةٍ.
“দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে, যে অর্থ জমায় ও উহা বারবার গণনা করে। সে ধারণা করে যে, তাহার অর্থ তাহাকে অমর করিয়া রাখিবে; কখনও না, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হইবে হুতামায়। তুমি কি জান হুতামা কি? ইহা আল্লাহ্ প্রজ্জ্বলিত হুতাশন, যাহা হৃদয়কে গ্রাস করিবে। নিশ্চয় ইহা উহাদিগকে পরিবেষ্টন করিয়া রাখবে দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে (১০৪: ১-৯)।”
📄 ৪. উবাই ইব্ন খালাফ
উবাই ইব্ন খালাফ ও তাহার সহোদর উমাইয়া ইব্ন খালাফের মত রসূলুল্লাহ (স) এর শত্রুতায় সর্বদা সক্রিয় থাকিত। একদা সে একটি জীর্ণশীর্ণ অস্থি হাতে লইয়া নবী করীম (স)-এর সম্মুখে উপস্থিত হয় এবং উহা হাতে মলিয়া গুড়া করিয়া বলিতে আরম্ভ করে, আল্লাহ কি ইহাকে পুনর্জীবিত করিবেন? জবাবে আল্লাহ্র রাসূল (স) বলিলেন: হাঁ, ঐ অস্থিকে এবং তোমার অস্থিকেও ঐরূপ জীর্ণ অস্থিতে পরিণত হওয়ার পর আল্লাহ পূনর্জীবিত করিবেন এবং তোমাকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করিবেন। ঐ প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়:
وَنَسِيَ خَلْقَهُ قَالَ مَنْ يُحْيِ الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ. قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقِ عَلَيْمُ الَّذِي جَعَلَ لَكُمْ مِّنَ الشَّجَرِ الْأَخْضَرِ نَارًا فَإِذَا أَنْتُمْ مِنْهُ تُوْقَدُونَ أَوَلَيْسَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ بقادر عَلَى أَنْ يَخْلُقَ مِثْلَهُمْ بَلَى وَهُوَ الْخَلَاقُ الْعَلِيْمُ، أَنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا। أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ، فَسُبْحَانَ الَّذِيْ بيدهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْيْ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
"এবং সে আমার সম্বন্ধে উপমা রচনা করে, অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলিয়া যায়। সে বলে, কে অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করিবে যখন উহা পচিয়া গলিয়া যাইবে? বল, উহার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করিবেন তিনিই যিনি ইহা প্রথমবার সৃষ্টি করিয়াছেন এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত। তিনি তোমাদের জন্য সবুজ বৃক্ষ হইতে অগ্নি উৎপাদন করেন এবং তোমরা উহা হইতে প্রজ্বলিত কর। যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন তিনি কি তাহাদের অনুরূপ সৃষ্টি করিতে সমর্থ নহেন? হাঁ, নিশ্চয়ই তিনি মহাস্রষ্টা, সর্বজ্ঞ। তাঁহার ব্যাপার শুধু এই, তিনি যখন কোন কিছুর ইচ্ছা করেন, তিনি উহাকে বলেন, 'হও', ফলে উহা হইয়া যায়। অতএব পবিত্র ও মহান তিনি, যাঁহার হস্তেই প্রত্যেক বিষয়ের সর্বময় কর্তৃত্ব; আর তাঁহারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হইবে” (৩৬: ৭৮-৮৩; দ্র. মুখতাসার ইব্ন কাছীর, সাবুনী সম্পা., ৩খ., পৃ. ১৭১)।
উহুদ যুদ্ধের সময় নবী করীম (স)-এর হাতে আল্লাহ্ এই শত্রুর জীবন সংহার ঘটে (দ্র. তারীখ ইবনে আছীর; ২খ., পৃ. ২৫; সীরাত-ই মুস্তফা, পৃ. ২১৬)।