📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফরয সালাতের রাক'আত-সংখ্যা নির্দ্ধারণ

📄 ফরয সালাতের রাক'আত-সংখ্যা নির্দ্ধারণ


ফরয সালাতের রাক'আত সংখ্যা কখন কিভাবে নির্ধারিত হইয়াছিল এই প্রসঙ্গে হযরত 'আইশা (রা)-এর হাদীছটি প্রণিধানযোগ্য:
عَنْ عَائِشَةَ أَمِّ الْمُؤْمِنِينَ قَالَتْ فَرَضَ اللهُ الصَّلاةَ حِيْنَ فَرَضَهَا رَكَعَتَيْنِ رَكَعَتَيْنِ فِي الْحَضَرِ وَالسَّفَرِ فَأَقِرَتْ صَلَاةُ السَّفَرِ وَزِيدَ فِي صَلَاةِ الْحَضَرِ.
"উম্মুল মুমিনীন 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা যখন সালাত ফরয করিলেন তখন আবাস-প্রবাস উভয় অবস্থায় দুই রাক'আত করিয়া ফরয করিলেন। অতঃপর সফরকালীন সময়ে সালাত পূর্বের ন্যায় বলবৎ রাখা হয়। আর আপন বসতিতে অবস্থানকালীন সময়ের সালাতকে বৃদ্ধি করা হয়” (বুখারী, ১খ)।
হাফিয ইবন হাজার 'আসকালানী (র) রাক'আতের সংখ্যা সম্পর্কে বিভিন্ন হাদীছ উল্লেখ করার পর বলেন:
وَالَّذِي يَظْهَرُ لِي وَبِهَا تَجْتَمِعُ الأَدلَّةُ السَّابِقَةُ أَنَّ الصَّلَوَاتِ فُرِضَتْ لَيْلَةَ الْإِسْرَاءِ رَكَعَتَيْنِ إِلَّا الْمَغْرِبَ ثُمَّ زِيدَتْ بَعْدَ الهِجْرَةِ عَقِبَ الهِجْرَةِ إِلَّا الصُّبْحَ كَمَا رَوَى ابْنُ خُزَيْمَةَ وَابْنُ حِبَّانٍ وَالْبَيْهَقِيُّ مِنْ طَرِيقِ الشَّعْبِي عَنْ مَسْرُوقٍ عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ فُرِضَتْ صَلَاةُ الْحَضَرِ وَالسَّفَرِ رَكْعَتَيْنِ رَكَعَتَيْنِ فَلَمَّا قَدِمَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ وَاطْمَأَنَّ زِيدَ فِي صَلَاةِ الْحَضَرِ رَكْعَتَانِ رَكْعَتَانِ وَتُرِكَتْ صَلَاةُ الْفَجْرِ لِطُولِ الْقِرَاءَةِ وَصَلَاةُ الْمَغْرِبِ لِأَنَّهَا وَتْرُ النَّهَارِ.
"আমার নিকট যাহা প্রতিভাত হয় এবং এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে উপযুক্ত দলীলসমূহের মধ্যেও সমন্বয় সাধিত হইবে তাহা এই লায়লাতুল ইসরা-এ সালাতসমূহকে দুই দুই রাক'আত করিয়াই ফরয করা হয়। তবে মাগরিব ছিল ইহার ব্যতিক্রম। অতঃপর মদীনায় হিজরতের পর ফজর ছাড়া অন্যান্য সালাতের রাক'আত সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। ইবন খুযায়মা, ইবন হিব্বান ও বায়হাকী শা'বীর সনদে মাসরূক হইতে এবং তিনি হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবাসে ও প্রবাসে সালাত দুই দুই রাক'আত করিয়া ফরয করা হয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) যখন মদীনায় আগমন করেন এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিলেন ও স্থির হইলেন তখন আবাসের সালাত দুই দুই রাক'আত করিয়া বৃদ্ধি করা হয়। তবে ফজরের সালাতে দীর্ঘ কিরাআত পাঠের কারণে উহাকে এবং মাগরিবের সালাতকে দিবসের বেজোড় হওয়ার কারণে পূর্ববৎ রাখিয়া দেওয়া হয়" (ফাতহুল বারী, ১খ)।
অতঃপর ইবন হাজার (র) আরও বলেন:
ثُمَّ بَعْدَ أَنْ اسْتَقَرَّ فَرْضُ الرُّبَاعِيَّةِ خُفِّفَ مِنْهَا فِي السَّفَرِ عِنْدَ نُزُولِ قَوْلِهِ تَعَالَى فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلاةِ.
"চার রাক'আত বিশিষ্ট ফরয সালাতের বিষয়টি সুস্থির হওয়ার পর প্রবাসকালীন অবস্থায় উহাকে হালকা করা হয় এবং রাক'আত সংখ্যা হ্রাস করা হয়। আর ইহা তখনই করা হয়, যখন আল্লাহ তা'আলার বাণী, "যখন তোমরা কোন দেশ-বিদেশে সফর করিবে তখন নামাযে কিছুটা হ্রাস করিলে তোমাদের কোন দোষ নাই" (৪: ১০১) নাযিল হয়”।
ইবনুল আছীরে মতে, হিজরী চতুর্থ সালে কসরের হুকুম নাযিল হয়। 'আল্লামা দাওলাবী (র)-এর মতে এই হুকুম হিজরী দ্বিতীয় বর্ষের রবীউল আখির মাসে নাযিল হয়। 'আল্লামা সুহায়লী হিজরতের এক বৎসর বা তাহার কাছাকাছি সময় পর নাযিল হইয়াছে বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। কাহারও মতে এই হুকুম হিজরতের চল্লিশ দিবস পর নাযিল হয় (ফাতহুল বারী, ১খ)।
সালাতুল-জুমু'আও একটি ফরয সালাত। ইবনুল হুমাম বলেন:
إِنَّ الْجُمُعَةَ فَرِيضَةٌ مُحْكَمَةٌ بِالْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ وَالْإِجْمَاعِ.
"জুমু'আর নামায সুপ্রতিষ্ঠিত একটি ফরয; কিতাব, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত” (ইবনুল হুমাম, ফাতুহুল কাদীর, ২খ)।
নবী কারীম (স) মক্কায় ইহা আদায় করিতে সক্ষম হন নাই। মদীনায় আগমনের পর তিনি কুবা-এ চৌদ্দ দিন অবস্থান করেন। এই সময় তিনি জুমু'আ পড়েন নাই। সর্বপ্রথম তিনি মদীনার বানু সালিম মহল্লায় জুমু'আ সালাত আদায় করেন (ফায়দুল বারী, ২খ)।
ইবন সীরীন (র)-এর মতে, মহানবী (স)-এর মদীনায় আগমনের পূর্বে সাহাবীগণ জুমু'আ আদায় করেন। রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা শরীফে থাকিতেই জুমু'আর সালাতের অনুমতি পাইয়াছিলেন, কিন্তু সেখানে উহা আদায় করা সম্ভব হয় নাই। সাহাবীগণই এই দিবসকে জুমু'আ দিবস বলিয়া নামকরণ করেন।
ভিন্নমতে আনসারগণ বলিলেন, ইয়াহুদীরা সপ্তাহে একটি দিনে সমবেত হয়। নাসারাগণও সপ্তাহে একটি দিনে মিলিত হয়। আমরাও অনুরূপভাবে একটি দিনে মিলিত হইতে চাই। তাঁহারা হযরত আসআদ-এর নিকট গমন করেন। তিনি তাহাদিগকে লইয়া দুই রাক'আত সালাত আদায় করেন এবং ইহাকে জুমু'আ নামে অভিহিত করেন। তিনি ঐ দিবসে একটি ছাগল যবাহ করেন এবং সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁহারা ইহার গোশত খাইলেন (ই. বি., ১১খ)। কারণ ঐ সময় তাঁহারা সংখ্যায় কম ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা নাযিল করেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا البَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ.
"মু'মিনগণ! জুমু'আর দিন যখন সালাতের জন্য আহবান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহ্ স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। ইহাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি কর" (৬২: ৯) (আয়নী, ৫খ)।
শাহ ওয়ালিয়্যুল্লাহ (র) বলেন:
وَخَصَّ اللهُ تَعَالَى هَذِهِ الْأُمَّةَ بِعِلْمٍ عَظِيمٍ نَفَشَهُ أَوْلاً فِي صُدُورِ أَصْحَابِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى أَقَامُوا الْجُمُعَةَ فِي المَدِينَةِ قَبْلَ مَقْدَمِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
"আল্লাহ তা'আলা এই উম্মাকে একটি মহান জ্ঞান দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেন। এই জ্ঞান তিনি প্রথমে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবীগণের অন্তরে নিক্ষেপ করেন। ফলে তাঁহারা নবী কারীম (স)-এর আগমনের পূর্বেই মদীনাতে জুমু'আর নামায কায়েম করিলেন" (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, ২খ)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাওয়াতের প্রতিক্রিয়া ও কাফিরদের নির্যাতন

📄 দাওয়াতের প্রতিক্রিয়া ও কাফিরদের নির্যাতন


পৃথিবীতে যুগে যুগে নবী-রসূলগণ (আ) আগমন করিয়াছেন হেদায়াতের বাণী লইয়া। তাঁহাদের মিশন ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীর মানুষকে আলোর পথে আনয়ন করা, পুঞ্জীভূত কুসংস্কাররাশি বিদূরিত করিয়া তাহাদিগকে স্রষ্টার নির্দেশিত কল্যাণের পথ সিরাতুল মুস্তাকীমের উপর প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু এই পথটি মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। যেহেতু তাঁহাদিগকে নানা দেশাচার, প্রতিষ্ঠিত রীতিনীতি, কায়েমী স্বার্থ এবং প্রবৃত্তি পূজার বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করিতে হইত, এমনকি প্রয়োজনে জিহাদে অবতীর্ণ হইতে হইত, তাই চিরদিনই প্রবৃত্তিপূজারী, দেশাচার ও কুপ্রথার অনুসারী ও কায়েমী স্বার্থবাদীরা তাঁহাদের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইয়াছে, তাঁহাদের উপর নির্যাতনের স্টীমরোলার চালাইয়াছে, এমনকি তাঁহাদিগকে হত্যা করিতেও কুণ্ঠাবোধ করে নাই। এই কথারই অভিব্যক্তি ঘটিয়াছে আল-কুরআনের নিম্নের বাণীতে:
يَا حَسْرَةً عَلَى الْعِبَادِ مَا يَأْتِيهِمْ مِّنْ رَّسُولِ الأَ كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِؤُنَ. "পরিতাপ বান্দাদের জন্য! উহাদের নিকট যখনই কোন রাসূল আসিয়াছে তখনই উহারা তাহাকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিয়াছে" (৩৬: ৩০)।
كُلَّمَا جَاءَهُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَى أَنْفُسُهُمْ فَرِيقًا كَذَّبُوا وَفَرِيقًا يَقْتُلُونَ. "যখনই কোন রাসূল তাহাদের নিকট এমন কিছু লইয়া আসে যাহা তাহাদের মনঃপূত নয়, তখনই তাহারা কতককে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করে এবং কতককে হত্যা করে" (৫ঃ ৭০)।
হযরত নূহ্ আলায়হিস্ সালামের প্রতি তাঁহার সম্প্রদায়ের দুর্ব্যবহার এবং পরিণামে মহাপ্লাবনে তাহাদের ধ্বংস হওয়া, হযরত মূসা ও হারুন (আ) নবী ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রতি ফেরাউন ও তদীয় পারিষদদের দুর্ব্যবহার ও লোহিত সাগরে তাহাদের ডুবিয়া মরা, ইবরাহীম (আ)-কে নমরূদের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ এবং পরিণামে তাহার ধ্বংস হওয়া, হযরত লূত, হযরত হূদ ও হযরত সালিহ্ ও শু'আয়ব (আ)-এর কওমসমূহের তাহাদের নবীর প্রতি দুর্ব্যবহার ও শাস্তি ভোগ, হযরত যাকারিয়া (আ)-এর স্ব-সম্প্রদায়ের হাতে নির্দয়ভাবে নিহত হওয়ার বিশদ বিবরণ কুরআন শরীফের বিভিন্ন সূরায় বর্ণিত হইয়াছে।
সূরা বাকারার উপর্যুপরি কয়েকটি আয়াতে নবীগণকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করা ও তাহাদিগকে হত্যা করা সংক্রান্ত বর্ণনা দিয়া আল্লাহ তা'আলা ঐ মিথ্যা প্রতিপন্নকারী ও নির্যাতনকারীদের ভয়াবহ পরিণতির কথাও উল্লেখ করিয়াছেন এইভাবে:
وَلَقَدْ أَتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ وَأَتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنُهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ أَفَكَلَّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَى أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ. وَقَالُوا قَلُوبُنَا غُلْفٌ بَلْ لَّعَنَهُمُ اللهُ بِكُفْرِهِمْ فَقَلِيْلًا مَّا يُؤْمِنُونَ. وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِّنْ عِنْدِ اللهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُوْنَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ فَلَعْنَةُ اللهِ عَلَى الْكَافِرِينَ، بِئْسَمَا اشْتَرَوْا بِهِ أَنْفُسَهُمْ أَنْ يَكْفُرُوا بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ بَغْيًا أَنْ يُنَزِّلَ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ عَلَى مَنْ يَّشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ فَبَاءُوا بِغَضَبٍ عَلَى غَضَبٍ وَالْكَافِرِينَ عَذَابٌ مُّهِينٌ. وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا نُؤْمِنُ بِمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا وَيَكْفُرُونَ بِمَا وَرَاءَهُ وَهُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِمَا مَعَهُمْ قُلْ فَلِمَ تَقْتُلُونَ أَنْبِيَاءَ اللَّهُ مِنْ قَبْلُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ.
"এবং নিশ্চয় আমি মূসাকে কিতাব দিয়াছি এবং তাহার পরে পর্যায়ক্রমে রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছি, মারয়াম-তনয় 'ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ দিয়াছি এবং 'পবিত্র আত্মা' দ্বারা তাহাকে শক্তিশালী করিয়াছি। তবে কি যখনই কোন রাসূল তোমাদের নিকট এমন কিছু আনিয়াছে যাহা তোমাদের মনঃপূত নহে তখনই তোমরা অহংকার করিয়াছ আর কতককে অস্বীকার করিয়াছ এবং কতককে হত্যা করিয়াছ? তাহারা বলিয়াছিল, আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত, বরং কুফরীর জন্য আল্লাহ তাহাদিগকে লা'নত করিয়াছেন। সুতরাং তাহাদের অল্প সংখ্যকই ঈমান আনে। তাহাদের নিকট যাহা আছে আল্লাহ্র নিকট হইতে তাহার সমর্থক কিতাব আসিল, যদিও পূর্বে সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের বিরুদ্ধে তাহারা ইহার সাহায্যে বিজয় প্রার্থনা করিত, তবুও তাহারা যাহা জ্ঞাত ছিল উহা যখন তাহাদের নিকট আসিল তখন তাহারা উহা প্রত্যাখ্যান করিল। সুতরাং কাফিরদের প্রতি আল্লাহ্র লা'নত। উহা কত নিকৃষ্ট যাহার বিনিময়ে তাহারা তাহাদের আত্মাকে বিক্রয় করিয়াছে- উহা এই যে, আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন, জিদের বশবর্তী হইয়া তাহারা তাহাকে প্রত্যাখ্যান করিত শুধু এই কারণে যে, আল্লাহ তাঁহার বান্দাদের মধ্য হইতে যাহাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন। সুতরাং তাহারা ক্রোধের উপর ক্রোধের পাত্র হইল। কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি রহিয়াছে। এবং যখন তাহাদিগকে বলা হয়, আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন তাহাতে ঈমান আনয়ন কর, তাহারা বলে, আমাদের প্রতি যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে আমরা তাহাতে বিশ্বাস করি। অথচ তাহা ব্যতীত সব কিছুই তাহারা প্রত্যাখ্যান করে, যদিও উহা সত্য এবং যাহা তাহাদের নিকট আছে তাহার সমর্থক। বল, যদি তোমরা মু'মিন হইতে তবে কেন তোমরা অতীতে আল্লাহ্ নবীগণকে হত্যা করিয়াছিলে" (২:৮৭-৯১)?
উক্ত আয়াতসমূহ এবং এই জাতীয় কুরআন-হাদীছের আরও বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ রিসালাতের মত মহান মর্যাদা কেন বানু ইসরাঈল বংশে না দিয়া ইসমাঈল বংশে দান করিলেন অথবা কেন তাঁহার নির্বাচিত বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে দান করিলেন, ইহা অবিশ্বাসীদের একটা ঈর্ষার কারণও ছিল। এইজন্য বুঝিয়া শুনিয়া তাহারা নষী-রসূলদের প্রতি, বিশেষত শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্ (স)-এর প্রতি অন্তরে বিদ্বেষ পোষণ করিত। এজন্য সাধারণভাবে সকল নবী-রাসূলকে, বিশেষত বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-কেই নির্যাতনের শিকার হইতে হয়। তাই নবী কারীম (স) বলেন:
"اَشَدُّ النَّاسِ ابْتِلاء الانبياء ثم امثلهم ثم امثلهم" “সবচেয়ে কঠোর পরীক্ষা গিয়াছে নবী-রাসূলগণের উপর, তারপর তাহাদের সহিত যাহাদের সামঞ্জস্য সর্বাধিক তাহাদের উপর, তারপর তাহাদের সহিত যাহাদের সর্বাধিক সামঞ্জস্য তাহাদের উপর” (মুসনাদে আহমাদ, ৬খ; ১খ; আরও দ্র. বুখারী, কিতাবুল মারদা; ইব্‌ন মাজা, ফিতান; সুনানুদ দারিমী, রিকাক)।
উপরিউক্ত আয়াতসমূহের বর্ণনা আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের উপর বিশেষভাবে প্রযোজ্য। কেননা তাহারা তাহাদের নবী-রাসূলগণের যুগে এবং তাঁহাদের উপর নাযিলকৃত কিতাবসমূহের মাধ্যমে শেষ নবীর আগমন সংবাদ নিশ্চিতভাবে অবগত ছিল। আল-কুরআন ভাষায়:
الَّذِينَ أَتَيْنَهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَانَهُمْ.
“আমি যাহাদিগকে কিতাব দিয়াছি তাহারা তাহাকে সেইরূপ জানে যেইরূপ তাহারা তাহাদের সন্তানগণকে চিনে” (২: ১৪৬)।
এতদসত্ত্বেও তাহারা জানিয়া শুনিয়া সত্য প্রত্যাখ্যান করিত এবং নবী করীম (স)-কে নানাভাবে কায়ক্লেশে জর্জরিত করিত। কিন্তু কিতাবীদের এই বিদ্বেষ ও নির্যাতনের শিকার নবী করীম (স) প্রথম যুগে হন নাই, এমনকি নবুওয়াত লাভের প্রথম তিন বৎসর পর্যন্ত তাঁহার নিজ সম্প্রদায়ও তাঁহার প্রতি রুষ্ট বা বিদ্বিষ্ট ছিল বলিয়া তেমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি সর্বপ্রথম নির্যাতন শুরু হয় তাঁহার নবুওয়াত লাভের তিন বৎসর পর যখন তাঁহার প্রতি আয়াত নাযিল হইল:
وَانْذِرْ عَشِيْرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ.
“(হে রাসূল) তোমার নিকটাত্মীয়দিগকে সতর্ক করিয়া দাও” (২৬: ২১৪) আরো নাযিল হইল:
فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ.
"অতএব তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হইয়াছ তাহা প্রকাশ্যে প্রচার কর" (১৫: ৯৪)।
হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, যখন وَأَنْذِرْ عَشِيْرَتَكَ الْأَقْرَبَيْنَ আয়াত অবতীর্ণ হইল তখন রাসূলুল্লাহ (স) সাফা পাহাড়ের উপর আরোহণ করিয়া লোকজনকে উচ্চ কণ্ঠে আহ্বান জানাইলেন: 'হে ফিহরের বংশধরগণ! হে কুরাইশ বংশীয় আদীর বংশধরগণ!' তাঁহার এইরূপ আকুল আহ্বান শুনিয়া লোকজন সমবেত হইল। তখন তিনি বলিলেন: 'আচ্ছা! আমি যদি তোমাদিগকে সংবাদ দেই যে, পাহাড়ের ঐদিকে একটি অশ্বারোহী বাহিনী তোমাদের উপর হামলার জন্য উদ্যত, তাহা হইলে তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করিবে?' তাহারা জবাব দিল, 'আলবৎ। কেননা আমরা তো তোমাকে কোন দিন সত্য ছাড়া মিথ্যা বলিতে উনি নাই।' তখন তিনি বলিলেন : আমি তোমাদিগকে অতি নিকটের এক কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করিতেছি। তখন আবু লাহাব বলিয়া উঠিল:
তব্‌ বান লাকা লি হাজা জামাতনা ?
‘তুমি ধ্বংস হও হে মুহাম্মাদ! এই কথাটি বলিবার জন্যই কি তুমি আমাদিগকে সমবেত করিয়াছ?’ তখনই নাযিল হয় : তাব্বাত ইয়াদা আবি লাহাবিওঁ ওয়া তাব্বা (ধ্বংস হউক আবু লাহাবের দুই হস্ত এবং ধ্বংস হউক সে নিজেও; ১১১ সূরা লাহাব), বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, তাফসীর অধ্যায়, (২খ; ১২খ; কিতাবুল মুস্তাফা, মুহাম্মাদ খালীদ আল-খাতিব সংকলিত, মিসর)।
এই ঘটনার অপর অংশে ইমাম মুসলিম (র) তদীয় ‘সহীহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এই সংক্রান্ত হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন, এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার স্বজনদিগকে আহবান করিলেন ও বলিলেন, “হে কুরায়শ দল! তোমরা নিজদিগকে (জাহান্নাম হইতে) রক্ষা কর। হে বানু ফিহর! নিজেদের জাহান্নাম হইতে রক্ষা কর। আমি তোমাদিগকে আল্লাহর শান্তি হইতে রক্ষা করিতে পারিব না। হে মুহাম্মাদ তনয়া ফাতিমা! নিজেকে জাহান্নাম হইতে বাঁচাও। আমি তোমাদিগকে আল্লাহর শাস্তি হইতে রক্ষা করিতে পারিব না” (দ্র. সহীহ মুসলিম, ১খ; সহীহ বুখারী, ১খ)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আত্মীয়-স্বজনকে প্রথম আনুষ্ঠানিক দাওয়াত

📄 আত্মীয়-স্বজনকে প্রথম আনুষ্ঠানিক দাওয়াত


দাওয়াত পেশ করা সম্পর্কে আল-কুরআনের নির্দেশ যেহেতু
উদউ ইলা সাবিলি রব্বিকা বিল হিকমাতি ওয়াল মুওয়াজাতিল হাছানাতি ওয়া জাদালহুম বিল্লাতি হিয়া আহসানু।
“তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং উহাদের সহিত তর্ক করিবে উত্তম পন্থায়” (১৬:১২৫), তাই নবী করীম (স) তাঁহার নিকটাত্মীয়গণকে দাওয়াত পেশ করিবার ব্যাপারে যে হিকমত অবলম্বন করিবেন, তাহাই ছিল স্বাভাবিক। তিনি তাহাদিগকে দাওয়াত পেশ করিবার উদ্দেশ্যে একটি ভোজসভার আয়োজন করিলেন এবং তাহাতে তাঁহার নবীসুলভ মুজিযারও অভিব্যক্তি ঘটিল। ইবন ইসহাক ও বায়হাকী হযরত আলী (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বর্ণনা করিয়াছেন: নবী করীম (স)-এর প্রতি আয়াত নাযিল হইলে নবী করীম (স) আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে আলী! ছাগলের একটি আস্ত রান এবং এক সা' (প্রায় সোয়া তিন কেজি পরিমাণ) শস্য দ্বারা তুমি খাবারের আয়োজন কর এবং দুধের একটি বড় পেয়ালা প্রস্তুত রাখ। তারপর মুত্তালিব বংশের লোকজনদের একত্র কর। আমি তাঁহার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করিলাম। প্রায় চল্লিশজন লোক সমবেত হইল। তাহাদের মধ্যে তদীয় পিতৃব্য আবু তালিব, হামযা, আব্বাস এবং আবু লাহাবও ছিলেন। আমি খাদ্য ভর্তি পাত্র তাহাদের সম্মুখে উপস্থিত করিলাম। মহানবী (স) পেয়ালা হইতে গোশতের একটি টুকরা উঠাইয়া নিজের পবিত্র দন্ত দ্বারা একটু চিবাইয়া পুনরায় উক্ত পেয়ালায় রাখিয়া দিলেন। তারপর উপস্থিত লোকজনকে আল্লাহ্ নামে খাদ্য গ্রহণ করিতে আহ্বান জানাইলেন। সকলেই তৃপ্তির সহিত তাহা খাইল। অথচ তাহাতে খাদ্যের পরিমাণ এতই স্বল্প ছিল যে, তাহাদের এক ব্যক্তিই তাহা খাইয়া শেষ করিত পারিত।
তারপর মহানবী (স) বলিলেন, আলী! ইহাদিগকে দুধ পান করিতে দাও। আমি তাহাদিগকে দুধ পান করিতে দিলাম। তাহারা সকলেই তৃপ্তির সহিত দুধ পান করিল, অথচ আল্লাহ্র কসম! তাহাদের মধ্যকার কোন এক ব্যক্তিই এই দুধটুকু সাবাড় করিয়া ফেলিতে পারিত। কেননা এক পেয়ালা দুধ যে কোন এক ব্যক্তিই পান করিতে পারে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তাহা সকলের জন্যই যথেষ্ট হইয়া গেল। তারপর মহানবী (স) যখন কিছু বলিতে যাইবেন তখনই আবু লাহাব বলিয়া উঠিল, উঠ! আমরা প্রস্থান করি। মুহাম্মাদ আজ তোমাদের খাদ্যের উপর যে জাদুর খেলা দেখাইল, এমনটি তো আর কোন দিন আমরা দেখি নাই। তাহার একথায় সত্যসত্যই সকলে প্রস্থান করিল। সেদিন আর মহানবী (স)-এর দাওয়াত পেশ করা সম্ভবপর হইল না।
পরদিন মহানবী (স) হযরত আলী (রা)-কে পুনরায় অনুরূপ খাদ্য প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। লোকজন পুনরায় সমবেত হইল। আহারপর্ব শেষ হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: "আমি আপনাদের সম্মুখে যাহা পেশ করিয়াছি, কোন ব্যক্তি তাহার সম্প্রদায়ের সম্মুখে ইহার চেয়ে উত্তম কিছু পেশ করিতে পারে নাই। আমি আপনাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সংবাদ নিয়া আসিয়াছি” (দ্র. আল-খাসাইসুল কুরা; সুয়ূতী, ১খ, পৃ. ১২৩; ইবন ইসহাক, বায়হাকী ও আবূ নুআয়মের বরাতে সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ, পৃ. ১৭৩)।
ঐতিহাসিক ইবনুল আছীর রাসূলুল্লাহ (স)-এর আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মীয়-স্বজনকে প্রথম দাওয়াত পেশের ঘটনাটি বর্ণনা করিয়াছেন। সাথে সাথে তিনি আবু লাহাবের প্রথম বৈরিতা প্রকাশ ও কঠোর বিরোধিতার কথাটিও তুলিয়া ধরিয়াছেন এইভাবে: আত্মীয়-পরিজনদিগকে সতর্ক করার নির্দেশ সম্বলিত আয়াত নাযিল হইলে সর্বপ্রথম নবী করীম (স) হাশিম বংশীয়দিগকে একত্র করিলেন। বানু মুত্তালিব ইব্‌ন আবদে মানাফের একটি দলও তাহাতে শামিল ছিল। সর্বসাকুল্যে পঁয়তাল্লিশ ব্যক্তি ঐ সমাবেশে হাযির ছিল। কিন্তু আবু লাহাবই অগ্রসর হইয়া বলিয়া উঠিল,
"দেখ, ইহারা তোমার চাচা ও চাচাতো ভাই! কথা বল এবং (মূর্তি পূজায় অবিশ্বাসী) সাবেয়ীদের পথ পরিহার কর! জানিয়া রাখ, তোমার গোত্রের গোটা আরব জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সামর্থ্য নাই। আমিই তোমাকে পাকড়াও করার সর্বাধিক হকদার। তোমাকে দমনের জন্য তোমার পিতৃকুলই যথেষ্ট। যদি তুমি তোমার বক্তব্যে অটল থাক, তাহা হইলে গোটা কুরায়শকুল তোমার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িবে। অন্যান্য আরব গোত্র এ ব্যাপারে তাহাদের সাহায্যার্থে আগাইয়া আসিবে। আপন পিতৃকুলের জন্য তোমার মত এমন অনর্থ আনয়নকারী লোক আমি দেখি নাই।"
রাসূলুল্লাহ্ (স) তখন চুপ হইয়া গেলেন এবং এই মজলিসে একটি কথাও উচ্চারণ করিলেন না। পরদিন পুনারয় তিনি তাহাদিগকে সমবেত করিলেন এবং বলিলেন:
الحمد لله احمده সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্। আমি তাঁহার স্তুতিগান ও মহিমা কীর্তন করি।
واستعينه এবং আমি তাঁহারই সাহায্য প্রার্থনা করি।
وأؤمن به এবং তাঁহারই প্রতি আমি ঈমান রাখি।
واتوكل عليه এবং তাঁহারই উপর আমি ভরসা করি।
واشهد ان لا اله الا الله وحده لا شريك له এবং আমি সাক্ষ্য দেই যে, এক আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই তাঁহার কোন শরীক নাই।
ان الرائد لا يكذب اهله অতঃপর তিনি বলিলেন: পথপ্রদর্শক তাহার আপনজনদিগকে মিথ্যা বলিতে পারে না।
والله الذي لا اله الا هو আর আল্লাহ্ সেই পবিত্র সত্তা যিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই,
انی رسول الله اليكم خاصة والى الناس عامة নিশ্চয় আমি আল্লাহ্র রসূল বিশেষত তোমাদের প্রতি এবং সাধারণভাবে গোটা মানবজাতির প্রতি।
والله لتموتن كما تنامون আল্লাহ্র কসম! নিশ্চয় তোমরা মৃত্যুবরণ করি যেমন তোমরা নিদ্রার কোলে ঢলিয়া পড়
ولتبعثن كما تستيقظون এবং নিশ্চয় তোমরা পুনরুত্থিত হইবে যেমন তোমরা নিদ্রা হইতে জাগ্রত হইয়া থাক।
ولتحاسين بما تعملون এবং অবশ্যই তোমাদের কৃতকর্মের হিসাব-নিকাশ নেওয়া হইবে।
وانما الجنة ابدا والنار ابدا . এবং সুনিশ্চিতভাবেই জান্নাত চিরস্থায়ী এবং জাহান্নামও চিরস্থায়ী।
তখন আবূ তালিব বলিয়া উঠিলেন, আমার নিকট তোমার সাহায্য-সহযোগিতা কতই না প্রিয়! আমি তোমার উপদেশাবলী সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করিলাম এবং তোমার কথায় পূর্ণ আস্থা স্থাপন করিলাম। আর এখানে তোমার পিতৃকূলের লোকজন উপস্থিত রহিয়াছে। আমি তো তাহাদেরই একজন। তবে আমি সর্বাগ্রে তোমার প্রিয় মিশনকে স্বাগত জানাই। তুমি যে ব্যাপারে আদিষ্ট হইয়াছ তাহা চালাইয়া যাও! আল্লাহ্র কসম! আমি সর্বদা তোমার সাহায্য-সহযোগিতা করিব ও তোমার হেফাযতের ব্যাপারে যত্নবান থাকিব। তবে আবদুল মুত্তালিবের দীন ছাড়িতে আমার মন সায় দেয় না। তখন আবু লাহাব বলিয়া উঠিল, আল্লাহ্র কসম! ইহা একটি মন্দ সিদ্ধান্ত। অন্যরা পাকড়াও করার পূর্বে তোমরা নিজেরাই বরং তাহাকে পাকড়াও কর ও নিবৃত্ত কর। তখন আবূ তালিব বলিলেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই আজীবন তাঁহাকে অনিষ্টকারীদের হাত হইতে রক্ষা করিয়া যাইব (আর-রাহীকুল মাখতুম, ১ম মুদ্রণ, মক্কা মুকাররামা ১৪০০/১৯৮০; ইবনুল আছীর, ফিক্হস সীরাঃ, পৃ. ৭৭-৭৮-এর বরাতে)।
উক্ত বর্ণনায় আবু লাহাবের সর্বপ্রথম বৈরিতার কথা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হইয়াছে। উক্ত ঘটনার উপর মন্তব্য করিতে গিয়া আল্লামা ইদরীস কান্দেহলভী (র) লিখেন, "আবূ লাহাব যদিও সম্পর্কে নবী করীম (স)-এর চাচা ছিল, তবুও আল্লাহ্ নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, তাঁহার প্রতি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও বিদ্বেষ-বৈরিতার ক্ষেত্রে সে ছিল সকলের অগ্রণী। এই বিদ্বেষ ও বৈরিতার জন্যই সে তাহার পুত্রদ্বয় উৎবা ও উতায়বাকে নবী-নন্দিনী রুকাইয়া ও উম্মে কুলছুম (রা)-কে তালাক দিতে বাধ্য করে, যাহাতে নবী করীম (স) মর্মযাতনায় দগ্ধ হন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উহাও কালক্রমে আল্লাহর মহান রহমতরূপে প্রতিপন্ন হয়। কেননা পরবর্তী কালে উক্ত দুইজন নবী দুহিতা পর্যায়ক্রমে হযরত উছমান (রা)-এর সহিত পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। ফলে হযরত উসমান 'যুন্-নূরায়ন' বা যুগল জ্যোতির অধিকারী হন। এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী-রসূলের অগণিত সাহাবীগণের মধ্যে একমাত্র হযরত উছমানই কোন নবীর দুইজন কন্যার স্বামী হওয়ার গৌরব লাভ করেন (দ্র. সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ, পৃ.১৭৪)।

দাওয়াত পেশ করা সম্পর্কে আল-কুরআনের নির্দেশ যেহেতু উদউ ইলা সাবিলি রব্বিকা বিল হিকমাতি ওয়াল মুওয়াজাতিল হাছানাতি ওয়া জাদালহুম বিল্লাতি হিয়া আহসানু। “তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং উহাদের সহিত তর্ক করিবে উত্তম পন্থায়” (১৬:১২৫), তাই নবী করীম (স) তাঁহার নিকটাত্মীয়গণকে দাওয়াত পেশ করিবার ব্যাপারে যে হিকমত অবলম্বন করিবেন, তাহাই ছিল স্বাভাবিক। তিনি তাহাদিগকে দাওয়াত পেশ করিবার উদ্দেশ্যে একটি ভোজসভার আয়োজন করিলেন এবং তাহাতে তাঁহার নবীসুলভ মুজিযারও অভিব্যক্তি ঘটিল। ইবন ইসহাক ও বায়হাকী হযরত আলী (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বর্ণনা করিয়াছেন: নবী করীম (স)-এর প্রতি আয়াত নাযিল হইলে নবী করীম (স) আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে আলী! ছাগলের একটি আস্ত রান এবং এক সা' (প্রায় সোয়া তিন কেজি পরিমাণ) শস্য দ্বারা তুমি খাবারের আয়োজন কর এবং দুধের একটি বড় পেয়ালা প্রস্তুত রাখ। তারপর মুত্তালিব বংশের লোকজনদের একত্র কর। আমি তাঁহার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করিলাম। প্রায় চল্লিশজন লোক সমবেত হইল। তাহাদের মধ্যে তদীয় পিতৃব্য আবু তালিব, হামযা, আব্বাস এবং আবু লাহাবও ছিলেন। আমি খাদ্য ভর্তি পাত্র তাহাদের সম্মুখে উপস্থিত করিলাম। মহানবী (স) পেয়ালা হইতে গোশতের একটি টুকরা উঠাইয়া নিজের পবিত্র দন্ত দ্বারা একটু চিবাইয়া পুনরায় উক্ত পেয়ালায় রাখিয়া দিলেন। তারপর উপস্থিত লোকজনকে আল্লাহ্ নামে খাদ্য গ্রহণ করিতে আহ্বান জানাইলেন। সকলেই তৃপ্তির সহিত তাহা খাইল। অথচ তাহাতে খাদ্যের পরিমাণ এতই স্বল্প ছিল যে, তাহাদের এক ব্যক্তিই তাহা খাইয়া শেষ করিত পারিত। তারপর মহানবী (স) বলিলেন, আলী! ইহাদিগকে দুধ পান করিতে দাও। আমি তাহাদিগকে দুধ পান করিতে দিলাম। তাহারা সকলেই তৃপ্তির সহিত দুধ পান করিল, অথচ আল্লাহ্র কসম! তাহাদের মধ্যকার কোন এক ব্যক্তিই এই দুধটুকু সাবাড় করিয়া ফেলিতে পারিত। কেননা এক পেয়ালা দুধ যে কোন এক ব্যক্তিই পান করিতে পারে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তাহা সকলের জন্যই যথেষ্ট হইয়া গেল। তারপর মহানবী (স) যখন কিছু বলিতে যাইবেন তখনই আবু লাহাব বলিয়া উঠিল, উঠ! আমরা প্রস্থান করি। মুহাম্মাদ আজ তোমাদের খাদ্যের উপর যে জাদুর খেলা দেখাইল, এমনটি তো আর কোন দিন আমরা দেখি নাই। তাহার একথায় সত্যসত্যই সকলে প্রস্থান করিল। সেদিন আর মহানবী (স)-এর দাওয়াত পেশ করা সম্ভবপর হইল না। পরদিন মহানবী (স) হযরত আলী (রা)-কে পুনরায় অনুরূপ খাদ্য প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। লোকজন পুনরায় সমবেত হইল। আহারপর্ব শেষ হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: "আমি আপনাদের সম্মুখে যাহা পেশ করিয়াছি, কোন ব্যক্তি তাহার সম্প্রদায়ের সম্মুখে ইহার চেয়ে উত্তম কিছু পেশ করিতে পারে নাই। আমি আপনাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সংবাদ নিয়া আসিয়াছি” (দ্র. আল-খাসাইসুল কুরা; সুয়ূতী, ১খ, পৃ. ১২৩; ইবন ইসহাক, বায়হাকী ও আবূ নুআয়মের বরাতে সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ, পৃ. ১৭৩)। ঐতিহাসিক ইবনুল আছীর রাসূলুল্লাহ (স)-এর আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মীয়-স্বজনকে প্রথম দাওয়াত পেশের ঘটনাটি বর্ণনা করিয়াছেন। সাথে সাথে তিনি আবু লাহাবের প্রথম বৈরিতা প্রকাশ ও কঠোর বিরোধিতার কথাটিও তুলিয়া ধরিয়াছেন এইভাবে: আত্মীয়-পরিজনদিগকে সতর্ক করার নির্দেশ সম্বলিত আয়াত নাযিল হইলে সর্বপ্রথম নবী করীম (স) হাশিম বংশীয়দিগকে একত্র করিলেন। বানু মুত্তালিব ইব্‌ন আবদে মানাফের একটি দলও তাহাতে শামিল ছিল। সর্বসাকুল্যে পঁয়তাল্লিশ ব্যক্তি ঐ সমাবেশে হাযির ছিল। কিন্তু আবু লাহাবই অগ্রসর হইয়া বলিয়া উঠিল, "দেখ, ইহারা তোমার চাচা ও চাচাতো ভাই! কথা বল এবং (মূর্তি পূজায় অবিশ্বাসী) সাবেয়ীদের পথ পরিহার কর! জানিয়া রাখ, তোমার গোত্রের গোটা আরব জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সামর্থ্য নাই। আমিই তোমাকে পাকড়াও করার সর্বাধিক হকদার। তোমাকে দমনের জন্য তোমার পিতৃকুলই যথেষ্ট। যদি তুমি তোমার বক্তব্যে অটল থাক, তাহা হইলে গোটা কুরায়শকুল তোমার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িবে। অন্যান্য আরব গোত্র এ ব্যাপারে তাহাদের সাহায্যার্থে আগাইয়া আসিবে। আপন পিতৃকুলের জন্য তোমার মত এমন অনর্থ আনয়নকারী লোক আমি দেখি নাই।" রাসূলুল্লাহ্ (স) তখন চুপ হইয়া গেলেন এবং এই মজলিসে একটি কথাও উচ্চারণ করিলেন না। পরদিন পুনারয় তিনি তাহাদিগকে সমবেত করিলেন এবং বলিলেন: الحمد لله احمده সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্। আমি তাঁহার স্তুতিগান ও মহিমা কীর্তন করি। واستعينه এবং আমি তাঁহারই সাহায্য প্রার্থনা করি। وأؤمن به এবং তাঁহারই প্রতি আমি ঈমান রাখি। وأتوكل عليه এবং তাঁহারই উপর আমি ভরসা করি। واشهد ان لا اله الا الله وحده لا شريك له এবং আমি সাক্ষ্য দেই যে, এক আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই তাঁহার কোন শরীক নাই। ان الرائد لا يكذب اهله অতঃপর তিনি বলিলেন: পথপ্রদর্শক তাহার আপনজনদিগকে মিথ্যা বলিতে পারে না। والله الذي لا اله الا هو আর আল্লাহ্ সেই পবিত্র সত্তা যিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই, انی رسول الله اليكم خاصة والى الناس عامة নিশ্চয় আমি আল্লাহ্র রসূল বিশেষত তোমাদের প্রতি এবং সাধারণভাবে গোটা মানবজাতির প্রতি। والله لتموتن كما تنامون আল্লাহ্র কসম! নিশ্চয় তোমরা মৃত্যুবরণ করি যেমন তোমরা নিদ্রার কোলে ঢলিয়া পড় ولتبعثن كما تستيقظون এবং নিশ্চয় তোমরা পুনরুত্থিত হইবে যেমন তোমরা নিদ্রা হইতে জাগ্রত হইয়া থাক। ولتحاسين بما تعملون এবং অবশ্যই তোমাদের কৃতকর্মের হিসাব-নিকাশ নেওয়া হইবে। وانما الجنة ابدا والنار ابدا . এবং সুনিশ্চিতভাবেই জান্নাত চিরস্থায়ী এবং জাহান্নামও চিরস্থায়ী। তখন আবূ তালিব বলিয়া উঠিলেন, আমার নিকট তোমার সাহায্য-সহযোগিতা কতই না প্রিয়! আমি তোমার উপদেশাবলী সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করিলাম এবং তোমার কথায় পূর্ণ আস্থা স্থাপন করিলাম। আর এখানে তোমার পিতৃকূলের লোকজন উপস্থিত রহিয়াছে। আমি তো তাহাদেরই একজন। তবে আমি সর্বাগ্রে তোমার প্রিয় মিশনকে স্বাগত জানাই। তুমি যে ব্যাপারে আদিষ্ট হইয়াছ তাহা চালাইয়া যাও! আল্লাহ্র কসম! আমি সর্বদা তোমার সাহায্য-সহযোগিতা করিব ও তোমার হেফাযতের ব্যাপারে যত্নবান থাকিব। তবে আবদুল মুত্তালিবের দীন ছাড়িতে আমার মন সায় দেয় না। তখন আবু লাহাব বলিয়া উঠিল, আল্লাহ্র কসম! ইহা একটি মন্দ সিদ্ধান্ত। অন্যরা পাকড়াও করার পূর্বে তোমরা নিজেরাই বরং তাহাকে পাকড়াও কর ও নিবৃত্ত কর। তখন আবূ তালিব বলিলেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই আজীবন তাঁহাকে অনিষ্টকারীদের হাত হইতে রক্ষা করিয়া যাইব (আর-রাহীকুল মাখতুম, ১ম মুদ্রণ, মক্কা মুকাররামা ১৪০০/১৯৮০; ইবনুল আছীর, ফিক্হস সীরাঃ, পৃ. ৭৭-৭৮-এর বরাতে)। উক্ত বর্ণনায় আবু লাহাবের সর্বপ্রথম বৈরিতার কথা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হইয়াছে। উক্ত ঘটনার উপর মন্তব্য করিতে গিয়া আল্লামা ইদরীস কান্দেহলভী (র) লিখেন, "আবূ লাহাব যদিও সম্পর্কে নবী করীম (স)-এর চাচা ছিল, তবুও আল্লাহ্ নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, তাঁহার প্রতি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও বিদ্বেষ-বৈরিতার ক্ষেত্রে সে ছিল সকলের অগ্রণী। এই বিদ্বেষ ও বৈরিতার জন্যই সে তাহার পুত্রদ্বয় উৎবা ও উতায়বাকে নবী-নন্দিনী রুকাইয়া ও উম্মে কুলছুম (রা)-কে তালাক দিতে বাধ্য করে, যাহাতে নবী করীম (স) মর্মযাতনায় দগ্ধ হন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উহাও কালক্রমে আল্লাহর মহান রহমতরূপে প্রতিপন্ন হয়। কেননা পরবর্তী কালে উক্ত দুইজন নবী দুহিতা পর্যায়ক্রমে হযরত উছমান (রা)-এর সহিত পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। ফলে হযরত উثمان 'যুন্-নূরায়ন' বা যুগল জ্যোতির অধিকারী হন। এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী-রসূলের অগণিত সাহাবীগণের মধ্যে একমাত্র হযরত উছমানই কোন নবীর দুইজন কন্যার স্বামী হওয়ার গৌরব লাভ করেন (দ্র. সীরাতুল মুস্তফা, ১খ, পৃ.১৭৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বৈরিতা ও উৎপীড়নের কারণসমূহ

📄 বৈরিতা ও উৎপীড়নের কারণসমূহ


ইব্‌ন ইসহাক বলেন, আল্লাহ্র নির্দেশ মুতাবিক যখন রাসূলুল্লাহ্ (স) আপন কওম-এর নিকট প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিলেন, তখন তাহার জানামতে, তিনি মুশরিকদের দেবদেবীর কথা উল্লেখ ও তাহাদের নিন্দা না করা পর্যন্ত তাহারা তাঁহার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় নাই এবং তাঁহার প্রতি বিরূপও হয় নাই। তিনি যখন এই কাজই করিলেন তখন তাহারা ইহাকে গুরুতর অন্যায় মনে করিল, বিক্ষুব্ধ হইল এবং ঐক্যবদ্ধ হইয়া তাঁহার বিরোধিতা ও শত্রুতায় বদ্ধপরিকর হইল (দ্র. ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ১খ, পৃ. ১৯৮; ই. ফা. প্রকাশিত)। হযরত খালিদ ইবনুল আস (রা) বলেন, আমি স্বপ্নে দেখিলাম, আমি একটি অগ্নি গহবরের নিকট দাঁড়াইয়া আছি। আমার পিতা আস আমাকে উহাতে নিক্ষেপ করিতে উদ্যত। ঠিক এমন সময় রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং আমাকে অগ্নিকুণ্ড হইতে রক্ষা করিলেন। ঘুম হইতে জাগ্রত হইয়াই আমি উপলব্ধি করিলাম যে, উহা একটি সত্য স্বপ্ন। আবু বাক্ (রা)-এর কাছে আসিয়া সেই স্বপ্ন বর্ণনা করিলে তিনি আমাকে মহানবী (স)-এর আনুগত্য অবলম্বন করিয়া ইসলাম গ্রহণের পরামর্শ দিলেন। তারপর আমি তাঁহার পরামর্শ অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইলাম। আমি আরয করিলাম, হে মুহাম্মাদ! আপনি আমাদিগকে কিসের দাওয়াত দেন? জবাবে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন :
ادعوك الى الله وحده لاشريك له وان محمدا عبده ورسوله تخلع ما كنت عليه من عبادة حجر لا يضر ولا ينفع ولا يدرى من عبده ممن لا يعبده.
আমি একক আল্লাহর দিকে তোমাকে দাওয়াত দিতেছি। তাঁহার কোন শরীক নাই এবং মুহাম্মাদ তাঁহার বান্দা ও রাসূল। এবং তুমি যে প্রস্তর মূর্তির উপসনায় নিমগ্ন রহিয়াছ তাহা পরিত্যাগ কর। উহা তোমার কোন ক্ষতি বা উপকার করিতে পারে না আর না সে উপলব্ধি করিতে সক্ষম যে, কে তাহার উপাসনা করিল আর কে করিল না।
খালিদ বলেন, তখন আমি আল্লাহর একত্ব ও নবী করীম (স)-এর সত্য রাসূল হওয়ার সাক্ষ্যবাণী (কালিমায়ে শাহাদাত) উচ্চারণ করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিলাম। আমার পিতা তাহা অবগত হইয়া এতই ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিলেন যে, তাহার নির্দয় প্রহারে আমি রক্তাক্ত হইয়া গেলাম। একটি আস্ত লাঠি তিনি আমার মাথায় ভাঙ্গিলেন এবং বলিলেন, "রে হতভাগা! তুই ইহা কী করিলি! তুই আমার সম্মুখ হইতে দূর হইয়া যা'। তুই সেই মুহম্মাদের দলে যোগ দিলি যে আমাদের গোটা সম্প্রদায়ের বিরোধী। সে আমাদের দেব-দেবীদের নিন্দা করিয়াছে। আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে অজ্ঞ ও নির্বোধ প্রতিপন্ন করিয়াছে।"খালিদ (রা) বলেন, আমি জবাব দিলাম, "আল্লাহ্র কসম! মুহাম্মাদ (স) যাহা বলিয়াছেন তাহা যথার্থ। পিতা তাহাতে আরও ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করিলেন। তিনি আমাকে নানারূপ গালমন্দ করিলেন এবং মুখে বলিলেন, "নরাধম! তুই আমার সম্মুখ হইতে চলিয়া যা। আল্লাহ্র কসম! আমি তোর পানাহার বন্ধ করিয়া দিব।"
আমিও আর চুপ করিয়া থাকিলাম না। বলিলাম, "তুমি আমার পানাহার যদি বন্ধও করিয়া দাও, তাহা হইতে আল্লাহই আমাকে আমার রিযিক দান করিবেন"। সত্যসত্যই আমার পিতা আমাকে বাড়ী হইতে বাহির করিয়া দিলেন এবং আমার অন্যান্য ভাইদিগকে লক্ষ্য করিয়া শাসাইয়া চলিলেন, “কেহ তাহার সহিত কথা বলিতে পারিবে না। যদি কেহ এই আদেশ অমান্য করে তবে তাহাকেও ঐ একই পরিণাম বরণ করিতে হইবে” (দ্র. সীরতুল মুস্তাফা, ১খ, পৃ. ১৬৩-১৬৪)।
অসংখ্য দেবদেবীর বিপরীতে এক আল্লাহ্‌র উপাস্য হওয়ায় ধারণাটি আরবে খুব বিরল থাকিলেও একেবারে অনুপস্থিত ছিল না। এই জাতীয় ধ্যান-ধারণার প্রতি তাহাদের বিদ্বিষ্ট হওয়ার আরেকটি কারণ এই ছিল যে, হাতীসহ কা’বা শরীফ ধ্বংসের উদ্দেশে হামলাকারী ইয়েমেনের আবিসিনীয় বংশোদ্ভূত শাসক আবরাহা ও তদীয় বাহিনীর সকলেই ছিল খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী। তাহারাও মূর্তিপূজা বিরোধী ছিল বিধায় সাবিয়ীন তথা পৌত্তলিকতা বিরোধী সকলকেই তাহারা সাবিয়ী বলিয়া ঘৃণা করিত। বিজয়ী মুসলমানদের প্রতি ভারতীয় হিন্দুদের যে কট্টর ঘৃণা-বিদ্বেষ, খৃস্টান ইংরেজ শাসক শোষকের প্রতি আমাদের যেরূপ ঘৃণাবোধ, ঐ একই ঘৃণাবোধ সক্রিয় ছিল পৌত্তলিক আরবদের মনে সাবিয়ীনদের প্রতি। মহানবী (স) যখন তাওহীদের দাওয়াত লইয়া আবির্ভূত হইলেন তখন আরবের কুরায়শগণও তাঁহাকে সাবিয়ী ধারণা করিয়া রুখিয়া দাঁড়াইয়াছিল, যাহার অভিব্যক্তি ঘটিয়াছিল সর্বপ্রথম আত্মীয়-স্বজনকে ডাকিয়া তিনি যখন তাহাদের সম্মুখে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন তখন আবু লাহাবের বক্তব্যে। স্মর্তব্য, সে তখন মহানবী (স)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছিল : وهؤلاء هم عمومك وبنو عمك فتكلم ودع الصباة. "হে মুহাম্মাদ! ইহারা হইতেছেন তোমার পিতৃব্যগণ ও পিতৃব্য পুত্রগণ। সুতরাং তুমি কথা বল এবং সাবিয়ীগণকে পরিহার কর অর্থাৎ সাবিয়ীসুলভ কথাবার্তা হইতে বিরত হও” (দ্র. ফিকহুস্ সীরা, পৃ. ৭৭-৭৮; ইবনুল আছীরের বরাতে আর-রাহীকুল মাখতুম, আরবী, ১ম সং ১৪০০ হি., মক্কা মুকাররমা, পৃ. ৮৯)।
আল্লামা শিবলী নু'মানী কুরায়শদের বিরোধিতা ও মহানবী (স)-কে নির্যাতনের কারণসমূহ বর্ণনা করিতে গিয়া বৈরিতার অনেকগুলি কারণের প্রথমটি বর্ণনা করিয়াছেন এইভাবেঃ (১) অশিক্ষিত ও বর্বর জাতিসমূহের বৈশিষ্ট্য এই যে, তাহাদের পিতৃপুরুষের আকীদা-বিশ্বাস ও প্রথার বিরুদ্ধে যে কোন আন্দোলন তাহাদের মধ্যে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ইহা ছাড়া তাহাদের বিরোধিতা শুধু মৌখিক বিরোধিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, রক্তপাতের কমে তাহাদের প্রতিশোধ স্পৃহা নিবৃত্ত হয় না... (সীরাতুন্নবী, ২খ., পৃ. ১৩১)।
আরবজাতি সুদীর্ঘ কাল যাবৎ মূর্তি পূজায় লিপ্ত ছিল। মূর্তি সংহারক হযরত ইবরাহীম (আ)-এর স্মৃতিবাহী কা'বা শরীফে ৩৬০টি প্রতিমা শোভা পাইতেছিল। 'হুবল' মূর্তি ছিল তাহাদের শ্রেষ্ঠ উপাস্য। এই সমস্ত মূর্তিবিগ্রহ-ই ছিল তাহাদের সর্বপ্রকার কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক। তাহাদের ধারণামতে, এইগুলিই বৃষ্টি বর্ষণ করিত, সন্তান দান করিত এবং যুদ্ধবিগ্রহে তাহাদিগকে বিজয় দান করিত।
(২) ইসলামের আবির্ভাব ঘটিয়াছিল এই সমস্ত ধ্যান-ধারণার আমূল পরিবর্তন ও বৈপ্লবিক সংস্কার সাধনের জন্য। ইহার ফলে কুরায়শদের আধিপত্য ও বিশ্বব্যাপী প্রভাব-প্রতিপত্তির অবসান ছিল অবশ্যম্ভাবী। এইজন্য কুরায়শদের বিরোধিতা ছিল তীব্রতর। তাহাদের মধ্যে যাহাদের স্বার্থ যত বেশী হুমকির সম্মুখীন ছিল, তাহারাই বিরোধিতায় তত বেশী সক্রিয় ছিল (পৃ. গ্র., পৃ. ১৩২)।
আরবে নেতৃত্ব লাভের সর্বাধিক যোগ্য বিবেচিত হইতেন ঐসব ব্যক্তি, অর্থ ও সন্তান-সন্ততি ছিল যাহাদের সর্বাধিক। ভারতবর্ষের হিন্দুগণ ও বিভিন্ন বর্বর জাতির মধ্যেও উহাই ছিল নেতৃত্বের মাপকাঠি। ঐ নিরিখে ওলীদ ইব্‌ন্ন মুগীরা, উমাইয়া ইন্ন খালাফ, আস ইব্‌ন ওয়াইল সাহমী এবং আবূ মাসউদ ছাকাফীই ছিল নেতৃত্বের হকদার। তাই নবুওয়াতের মত উচ্চমর্যাদাও তাহাদের ধারণামতে এমন কোন ব্যক্তির পাওয়া উচিত ছিল যিনি মক্কায় বা তায়েফে এইরূপ বিভব, সন্তান-সন্ততি ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী। তাহাদের এই মনোভাবের কথা কুরআন পাকে বিবৃত হইয়াছে এইভাবেঃ
وَقَالُوا لَوْلَا نُزِّلَ هَذَا الْقُرْآنُ عَلَى رَجُلٍ مِّنَ الْقَرْيَتَيْنِ عَظِيمٍ
“এবং ইহারা বলে, এই কুরআন কেন নাযিল করা হইল না দুই শহরের কোন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির উপর" (৪৩: ৩১)?
অর্থাৎ মক্কার ওলীদ ইবুন মুগীরা অথবা তায়েফের আবূ মাসউদ ছাকাফীকেই কেন নবুওয়াতের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হইল না? ধনসম্পদের কলুষতামুক্ত এবং যাঁহার পুত্রসন্তানগণ বৎসর দুই বৎসরের অধিক কালের আয়ু লাভ করেন নাই, সেই মুহাম্মাদ (স) নবী হইবেন, ইহা ছিল তাহাদের কল্পনা ও সহ্যের অতীত (পৃ. গ্র., পৃ. ১৩২)।
(৩) অনেক ব্যাপারে ইসলাম ও খৃস্টবাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় একই ধরনের এবং মুসলমানগণ মক্কী জীবনে তো বটেই মাদানী জীবনেও কিছুকাল পর্যন্ত খৃস্টানদের মত বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলারূপে মান্য করিয়া সেদিকে মুখ ফিরাইয়া নামায পড়িতেন। তাই মক্কাবাসীদের মধ্যে এরূপ একটা ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হইয়াছিল যে, মুহাম্মাদ (স) বুঝি খৃস্টবাদেরই দাওয়াত দিতেছেন, তাই তাহারা তাঁহার বিরুদ্ধে বৈরিতা শুরু করে।
(৪) গোত্রীয় হানাহানি ও বৈরিতাও ছিল ইহার অন্যতম কারণ। কুরায়শদের মধ্যে দুইটি গোত্রে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রেষারেষি ছিল। গোত্র দুইটি হইতেছে বানু হাশিম ও বানু উমাইয়া। আব্দুল মুত্তালিব নিজের ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতাবলে বানু হাশিমের পাল্লা ভারী করিয়া ফেলেন। কিন্তু তাঁহার উত্তরসুরিদের মধ্যে আর কেহই তেমন প্রতিপত্তিশীল হইয়া উঠিতে পারেন নাই। আবূ তালিবের অর্থবিত্ত ছিল না। আব্বাস অর্থবিত্তে সমৃদ্ধ হইলেও বদান্যতা গুণ হইতে বঞ্চিত ছিলেন। আবু লাহাব ছিল দুশ্চরিত্র। ফলে প্রভাব-প্রতিপত্তিতে বানু উমাইয়ার পাল্লা ভারী হইয়া উঠে। নবী করীম (স)-এর নবুওয়াতকে বানু উমাইয়াগণ তাই তাহাদের প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্র বানূ হাশিমের বিজয় বলিয়া ধারণা করে। এই জন্য ঐ গোত্রটিই নবী করীম (স)-এর সর্বাধিক বিরোধিতা করে। একমাত্র বদর যুদ্ধ ছাড়া অপর সকল যুদ্ধই তাই আবু সুফিয়ানের অপতৎপরতায় সংঘটিত হয় এবং ঐ যুদ্ধসমূহের সেনাপতিও ছিলেন ঐ আবু সুফিয়ানই। নবী করীম (স)-এর প্রাণের বৈরী উব্বা ইব্‌ন আবূ মু'আইত ছিল ঐ উমাইয়া বংশেরই লোক।
বানূ উমাইয়ার পরপরই যে গোত্রটি বানু হাশিমের সমকক্ষতার দাবি করিত, তাহা হইল বানু মাখযূম গোত্র। ওলীদ ইব্‌ন মুগীরা ছিল ঐ গোত্রেরই সর্দার। এইজন্য ঐ গোত্রও মহানবী (স)-এর সহিত বৈরিতায় লিপ্ত হয়। আবূ জাহলের একটি বক্তব্য হইতে উহার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।
একদা আখনাস ইব্‌ন শুরায়ক ছাকাফী আবু জাহলের সহিত সাক্ষাত করিয়া মুহাম্মাদ (স) ও তাঁহার নবুওয়াত সম্পর্কে তাহার অভিমত জানিতে চাহিলে আবু জাহল স্পষ্ট জবাব দেয়, আমরা এবং বানু আবদে মানাফ অর্থাৎ বানু হাশিম ছিলাম চির প্রতিদ্বন্দ্বী। তাহারা আতিথ্য প্রদান করিলে আমরাও আতিথ্য প্রদান করিতাম। তাহারা রক্তপণ প্রদানের উদারতা প্রদর্শন করে, আমরাও সে ব্যাপারে পিছাইয়া থাকি নাই। তাহারা বদান্যতা প্রদর্শন করিলে আমরা আরও বর্ধিত হারে বদান্যতা প্রদর্শন করি। এইরূপে সর্ব ব্যাপারেই যখন আমরা তাহাদের সমকক্ষ হইয়া উঠিলাম, তখন তাহারা নবুওয়াতের দাবিদার সাজিয়াছে। আল্লাহ্র কসম! এই নবীর প্রতি আমরা কস্মিনকালেও ঈমান আনয়ন করিতে পারিব না (পৃ. গ্র., ১৩৩; ইব্‌ন হিশাম, পৃ. ১০৮, মিসরীয় মুদ্রণ)।
(৫) কুরায়শদের মধ্যে সীমাহীন চারিত্রিক অধঃপতন দেখা দিয়াছিল। তাহাদের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিগণ নানা চারিত্রিক ব্যাধিতে লিপ্ত ছিল। বানু হাশিম গোত্রের সেরা সম্মানিত নেতা আবৃ লাহাব হারাম শরীফের কোষাগারে রক্ষিত স্বর্ণের হরিণ মূর্তি চুরি করিয়া বিক্রয় করিয়া ফেলে (দ্র. মা'আরিফ ইব্‌ন কুতায়বা, মিসরীয় মুদ্রণ, পৃ. ৫৫)।
বানু যুহার চুক্তিবদ্ধ বন্ধু ও অন্যতম আরব সর্দার আখনাস ইবন শুরায়ক ছিল পরনিন্দা ও মিথ্যাচারে অভ্যস্ত। নবী করীম (স) যখন আল-কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করিয়া ঐ সমস্ত চারিত্রিক ব্যাধির প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করিতেন তখন ঐ আরব সর্দাররা অত্যন্ত বিব্রত বোধ করিত এবং বিচলিত হইয়া উঠিত। কেননা কুরআনের ঐ আয়াতসমূহ যে কাহাদের উপর প্রযোজ্য, তাহা শ্রোতা মাত্রই স্পষ্ট আঁচ করিতে পারিত। সুতরাং তাহাদের নেতৃত্ব- কর্তৃত্বের প্রাসাদ যে উহাতে ধুলিসাৎ হইয়া যাইবে, তাহা তাহারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিত। ঐ সমস্ত আয়াতের দ্বারা যেহেতু মহানবী (স)-এর নির্যাতনকারী শত্রুদের চারিত্রিক দোষত্রুটি ফুটিয়া উঠে তাই ঐ জাতীয় কয়েকটি আয়াতের উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। আল-কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلافٍ مَهِينٍ: هَمَّازٍ مَّشَاء بِنَمِيمٍ مَنَّاعٍ لِلْخَيْرِ مُعْتَدٍ أَثِيمٍ. عُتُلٍ بَعْدَ ذَلِكَ زَنِيمٍ. أَنْ كَانَ ذَا مَالٍ وَبَنِينَ. اذَا تُتْلَى عَلَيْهِ آيَاتُنَا قَالَ أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ.
"এবং অনুসরণ করিও না তাহার যে কথায় কথায় শপথ করে, যে লাঞ্ছিত, পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগাইয়া বেড়ায়, যে কল্যাণের কার্যে বাধা দান করে, যে সীমালংঘনকারী পাপিষ্ঠ, রূঢ় স্বভাব এবং তদুপরি কুখ্যাত; এইজন্য যে, সে ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধিশালী। উহার নিকট আমার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হইলে সে বলে, ইহা তো সেকালের উপকথা মাত্র" (৬৮: ১০-১৫)।
উক্ত আয়াতে যে দশটি চারিত্রিক দোষের কথা উল্লিখিত হইয়াছে এইগুলি কুরায়শ সর্দার ওলীদ ইব্‌ন মুগীরার মধ্যে ছিল বলিয়া 'আসবাবুন নুযূল'-এ বর্ণিত হইয়াছে (দ্র. আল-কুরআনুল কারীম, ইফাবা, পৃ. ৯৪২, অষ্টাদশ মুদ্রণ, ১৯৯৬ খৃ.)। তবে এইরূপ চরিত্র তাহাদের আরও অনেকেরই ছিল। সফিউর রহমান মুবারকপুরী এই স্বভাবগুলি আখনাস ইব্‌ন শুরায়ক ছাকাফীরও ছিল বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (দ্র. আর-রাহীকুল মাখতুম, ১ম আরবী সংস্করণ, ১৪০০ হি., পৃ. ১০১)।
ওলীদ ইব্‌ন মুগীরার ব্যাপারে আরও আয়াত নাযিল হয়ঃ
ذَرْنِي وَمَنْ خَلَقْتُ وَحَيْداً . وجَعَلْتُ لَهُ مَالاً مَّمْدُوداً . وَبَنِينَ شُهُوداً . وَمَهَدْتُ لَهُ تَمْهِيداً . ثُمَّ يَطْمَعُ أَنْ أَزِيدَ. كَلَّا إِنَّهُ كَانَ لَايُتِنَا عَنِيداً .
"ছাড়িয়া দাও আমাকে এবং যাহাকে আমি সৃষ্টি করিয়াছি একাকী। আমি তাহাকে দিয়াছি বিপুল ধন-সম্পদ। এবং নিত্যসঙ্গী পুত্রগণ এবং তাহাকে দিয়াছি স্বচ্ছন্দ জীবনের প্রচুর উপকরণ; ইহার পরও সে কামনা করে যে, আমি তাহাকে আরও অধিক দেই। না, তাহা হইবে না, সে তো আমার নিদর্শনসমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী" (৭৪ : ১১-১৬)।
উক্ত আয়াতসমূহের বক্তব্য উক্ত সূরার ৩০ তম আয়াত পর্যন্ত বিস্তৃত, যাহাতে তাহার শাস্তির জন্য যে ভয়াবহ জাহান্নাম রহিয়াছে এবং বিরাটকায় ও প্রবল শক্তিধর উনিশজন ফেরেশতা রহিয়াছেন তাহারও বর্ণনা রহিয়াছে।
উমাইয়া ইব্‌ন খালাফ যখনই রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে দেখিত তখনই তাঁহাকে নানারূপ কটাক্ষ করিত। তাহার সম্পর্কে নাযিল হইল: وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةَ أُمَزَةَ "দুর্ভোগ ঐ সমস্ত নিন্দাকারীর যাহারা সম্মুখে ও পশ্চাতে লোকের নিন্দা করে (১০৪:১)।"
ইবন হিশামের ভাষ্যমতে, 'হুমাযা' ঐ ব্যক্তি, যে প্রকাশ্যে মুখের উপর লোকের নিন্দাবাদ করে, গালিগালাজ করে এবং বক্রচক্ষে তাকায়। লুমাযা হইতেছে ঐ ব্যক্তি, যে লোকের অসাক্ষাতে তাহার দুর্ণাম করে এবং পীড়া দেয় (দ্র. ইব্‌ন হিশাম, ১খ, পৃ. ৩৫৬-৩৫৭)।
আবূ জাহল কখনও কখনও রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া কুরআন শ্রবণ করিত। কিন্তু ঐ শোনা পর্যন্তই, ঈমান, ইয়াকীন, আল্লাহ্ ভয় কিছুই তাহার মনে সৃষ্টি হইত না। সে তাহার কথাবার্তা ও কাজকর্ম দ্বারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে পীড়া দিত এবং তাঁহার ইবাদত-বন্দেগী ও প্রচারের পথে নানারূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিত। অধিকন্তু সে তাহার এই অপতৎপরতার জন্য রীতিমত গর্ববোধ করিত যেন কী বিরাট পুণ্যকর্মই না সে করিয়া ফেলিয়াছে। এই প্রেক্ষিতে নাযিল হইল:
فَلَا صَدَّقَ وَلَا صَلَّى. وَلَكُنْ كَذَّبَ وَتَوَلَّى. ثُمَّ ذَهَبَ إِلَى أَهْلِهِ يَتَمَطَّى. أولى لَكَ فَأَوْلى. ثُمَّ أَوْلَى لَكَ فَأَوْلى.
"সে বিশ্বাস করে নাই এবং সালাতও আদায় করে নাই, বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করিয়াছিল এবং মুখ ফিরাইয়া লইয়াছিল। অতঃপর সে তাহার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরিয়া গিয়াছিল দম্ভভরে। দুর্ভোগ তোমার জন্য, দুর্ভোগ আবার দুর্ভোগ তোমার জন্য, দুর্ভোগ (৭৫: ৩১-৩৫; দ্র. ফী যিলালিল কুরআন, ২৯ খ, ২১২)!"
কুরআন শরীফ যেইভাবে কাফির নেতাদের স্বরূপ উদঘাটন করিয়া চলিয়াছিল উহা ছিল তাহাদের জন্য একান্তই অসহনীয় ও চরম বিব্রতকর। সর্বোপরি যখন আল-কুরআন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করিল:
إِنَّكُمْ وَمَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ حَصَبُ جَهَنَّمَ أَنْتُمْ لَهَا وَارِدُونَ.
"তোমরা এবং আল্লাহ্র পরিবর্তে তোমরা যাহাদের ইবাদত কর, সেগুলি তো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সকলে উহাতে প্রবেশ করিবে” (২১ঃ ৯৮)।
তখন তাহাদের সকল ধৈর্যের বাঁধ টুটিয়া গেল। আল-কুরআনের এই বাচনভঙ্গী তাহাদের দাম্ভিক আচরণ ও উদ্ধত স্বভাবের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত সঙ্গত হইলেও ইহাতে তাহারা টগবগ করিয়া ফুসিয়া উঠিল এবং নবী করীম (স) ও তাঁহার সাহাবীগণের উপর কঠোর নির্যাতন চালাইতে লাগিল (সীরতুন্নবী, ১খ., পৃ. ২১২-২১৯; আল্লামা শিবলী নু'মানীকৃত, ৫ম সং.)। রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি কুরায়শদের নির্যাতনের নমুনা
(১) মু'জাম তাবারানীতে উদ্ধৃত, হযরত মুনীব গামিদী (রা)-এর বর্ণনা আছে, আমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছি, রাসূলুল্লাহ (স) লোকজনকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিয়া যাইতেছিলেন : قُولُوا لَا اله الا اللهُ تُفْلِحُوا . "তোমরা বল, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, তোমরা সাফল্য লাভ করিবে।"
তখন কোন কোন হতভাগ্য লোক তাঁহাকে গালমন্দ করিতেছিল। তাহারা তাঁহার প্রতি থুথু নিক্ষেপ করিতেছিল। তাহাদের কেহ কেহ তাঁহার প্রতি ধুলি নিক্ষেপ করিতেছিল। এইভাবে দ্বিপ্রহর গড়াইয়া গেল। এমন সময় একটি বালিকা পানি লইয়া আসিল এবং তাঁহার পবিত্র মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় ধৌত করিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, বালিকাটি কে? লোকজন আমাকে জানাইল যে, বালিকাটি নবী করীম (স)-এর কন্যা যয়নব (রা)।
বুখারীর বর্ণনায় আরও আছে, তখন রাসূলুল্লাহ (স) যয়নবকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: প্রিয় কন্যা। তোমার পিতা অসহায়ভাবে লাঞ্ছিত হইবেন এরূপ আশঙ্কা করিও না। বুখারী (র) তদীয় 'তারীখ' গ্রন্থে তাহা বর্ণনা করিয়াছেন। এতদ্ব্যতীত আবু নু'আয়মও তাহা বর্ণনা করিয়াছেন। আবূ যুর'আ দামিল্কী বলেন, এই হাদীছখানা সহীহ্ (দ্র. কানযুল উম্মাল, ৬খ., পৃ. ৩০৬)।
(২) সাহাবী তারেক ইব্‌ন আবদুল্লাহ আল-মাহারিবী (রা) বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে যি'ল-মাজাযের বাজারে দেখিয়াছি। তিনি বলিয়া যাইতেছিলেন, হে লোকসকল! তোমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বল, তাহা হইলে তোমার সফলকাম হইবে। তখন এক হতভাগা তাঁহার পশ্চাতে পশ্চাতে পাথর নিক্ষেপ করিয়া চলিয়াছিল আর মুখে বলিতেছিল, হে লোকসকল! এই লোকটির কথার কর্ণপাত করিও না, কেননা লোকটা মিথ্যুক। ইবন আবী শায়বা এ হাদীছখানা বর্ণনা করিয়াছেন (প্রাগুক্ত, ৬খ., পৃ. ৩০২)।
(৩) বানু কিনানার জনৈক শায়খ বর্ণনা করেন, আমি নবী করীম (স)-কে ফি'ল-মাজাযের বাজারে দেখিয়াছি। তিনি লোকজনকে লক্ষ্য করিয়া বলিতেছিলেন, লোকসকল! তোমরা 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বল, তাহা হইলে সফলকাম হইবে। তখন আবু জাহল তাঁহার প্রতি মাটি নিক্ষেপ করিতে করিতে বলিতেছিল, লোকসকল! ইহার প্রতারণা জালে তোমরা ধরা দিও না। এই ব্যক্তি তোমাদিগকে লাত ও উযযা হইতে বিচ্ছিন্ন করিতে চাহিতেছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার প্রতি ভ্রুক্ষেপমাত্র করিতেছিলেন না (দ্র. মুসনাদে আহমাদ, ৪খ, পৃ. ৬৩, রিয়াদ সং. পৃ. ১১৮৭, নং ১৬৭২০ ও ২২৫৭৯)।
(৪) উরওয়া ইব্‌নুষ যুবায়র (রা) বলেন, আমি একদা হযরত আমর ইবনুল 'আস (রা)-কে অনুরোধ করিলাম, নবী করীম (স)-কে মুশরিকরা যে নির্যাতন করিত আমাকে তাহার বর্ণনা শুনান। জবাবে তিনি বলিলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (স) সালাত আদায়ে রত ছিলেন। এমতাবস্থায় উব্বা ইব্‌ন আবূ মু'ঈত তাঁহার কণ্ঠদেশে কাপড় পেঁচাইয়া এমনভাবে হেঁচকা টান দিল যে, তাঁহার দম বন্দ হইয়া আসার উপক্রম হইল। এমন সময় আবূ বকর (রা) আসিয়া সেখান উপস্থিত হইলেন এবং সজোরে ধাক্কা দিয়া তাহাকে সরাইয়া দিলেন এবং এই আয়াতটি পাঠ করিলেন:
اتَقْتُلُونَ رَجُلاً أَنْ يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ وَقَدْ جَاءَكُمْ بِالْبَيِّنَتِ.
"তোমরা কি এক ব্যক্তিকে এজন্যে হত্যা করিবে যে, সে বলে, আমার প্রভু আল্লাহ, এবং (অথচ সে তোমাদের নিকট তোমাদের প্রভুর পক্ষ হইতে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি লইয়া আসিয়াছেন" (৪০ঃ ২৮)?
উল্লেখ্য, ফেরাউন ও হামান চক্র যখন মূসা (আ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র আঁটিতেছিল, তখন ফেরাউন পরিবারের গোপনে ঈমান আনয়নকারী এক ব্যক্তি হুবহু ঐ বাক্যটিই উচ্চারণ করিয়াছিলেন।
মুসনাদে বায্যার এবং দালাইলে নবুওয়াতে আবূ নুআয়মের বর্ণিত এক বিবরণে আছে, হযরত আলী (রা)-এর পুত্র মুহাম্মাদ বর্ণনা করেন, একদা হযরত আলী (রা) খুতবা প্রদানকালে সমবেত লোকজনকে প্রশ্ন করিলেন, আচ্ছা বল তো দেখি, সর্বাধিক বীরপুরুষ কে? উপস্থিত লোকজন জবাব দিল, আপনি। হযরত আলী (রা) বলিলেন, আমার অবস্থা এই যে, যে-ই আমার বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হইয়াছে, আমি তাহার প্রতিশোধ না লইয়া ছাড়ি নাই। সর্বাধিক বীর পুরুষ তো হইতেছেন হযরত আবূ বকর (রা)। আমি একবার লক্ষ্য করি যে, কুরায়শরা রসূলুল্লাহ (স)-কে প্রহার করিতে করিতে বলিতেছিল :
انت جعلت الألهة الها واحدا.
"তুমিই সেই ব্যক্তি যে আমাদের বহু উপাস্যকে এক উপাস্যে নামাইয়া আনিয়াছ।"
আমাদের মধ্যকার কাহারও সাহস হইল না যে, তাহাদের পাশে ঘেঁষি এবং দুশমনদের কবল হইতে আল্লাহর নবীকে মুক্ত করি। এমন সময় ঘটনাক্রমে সেখানে আবূ বকর আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তিনি কালবিলম্ব না করিয়া শত্রুদের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িলেন এবং এক ঘুষিতে প্রহারকারী হতভাগ্যটিকে কাবু করিয়া ফেলিলেন এবং ফেরাউন পরিবারের সেই মুমিন ব্যক্তিটির ন্যায় বলিলেন, আফসোস যে, তোমরা এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করিতে যাইতেছ যে বলে, আমার প্রভু আল্লাহ। তারপর রোরুদ্যমান কণ্ঠে তিনি সমবেত জনতাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আল্লাহর কসম, আচ্ছা বল দেখি, ফেরাউন পরিবারের ঐ মুমিন ব্যক্তিটি উত্তম ছিল নাকি হযরত আবু বাক্স? তাঁহার এই প্রশ্নে লোকজন নিরুত্তর রহিল। এবার তিনি নিজেই উত্তর দিলেন: শোন, আবৃ বাক্ (রা)-এর সামান্য একটু সময় ফেরাউন পরিবারের ঐ পুণ্যবান মুমিনের সারা জীবনের চাইতেও উত্তম। সেই ব্যক্তি তাহার ঈমান গোপন রাখিয়া তৃতীয় পক্ষ সাজিয়া কথাটি উচ্চারণ করিয়াছিল। পক্ষান্তরে হযরত আবূ বাক্স বীরদর্পে তাঁহার ঈমানী পরিচয় ব্যক্ত করিয়াছেন (দ্র. ফাতহুল বারী, 'মক্কায় মুশরিকদের পক্ষ হইতে নবী করীম (স) ও তদীয় সহাবীগণের নির্যাতন ভোগ অধ্যায়)। এতদ্ব্যতীত ঐ ব্যক্তি কেবল মৌখিক প্রতিবাদ করিয়াই দায়িত্ব সম্পূর্ণ করিয়াছিল। পক্ষান্তরে আবূ বাক্স (রা) মৌখিক প্রতিবাদের সাথে সাথে বাহুবল প্রয়োগে নবী করীম (স)-এর সাহায্য করিয়াছেন।
(৫) আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস (রা)-এর একটি বর্ণনায় আছে, যখন শত্রুরা তাঁহাকে ছাড়িয়া ছত্রভঙ্গ হইয়া গেল তখন তিনি বলিয়াছিলেন:
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا أُرْسِلْتُ إِلَيْكُمْ إِلَّا بِالذَّبْحِ.
"সেই পবিত্র সত্তার কসম যাঁহার হাতে আমার প্রাণ! আমি কেবল তোমাদের মর্ত লোকদেরকে যবাহ্ করিবার জন্যই প্রেরিত হইয়াছি"। (দ্র. বুখারী, খাল্ক আফ্ আলিল ইবাদ অধ্যায় এবং আবূ ইয়ালা ও ইবন হিব্বান, ফাতহুল বারী, প্রাগুক্ত অধ্যায়)।
আবূ নুআয়মের দালাইলুন নবুওয়া, বায়হাকীর দালাইলুন নূবুওয়া এবং সীরতে ইব্‌ ইসহাক- এর রিওয়ায়াতে আছে, তাঁহার ঐ কথা উচ্চারণের সাথে সাথে সকলেই নির্বাক হইয়া গেল এবং নিজ নিজ স্থানে মাথা নত করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। কেননা ইহা তাহারা সম্যক জ্ঞাত ছিল যে, তিনি যাহা বলেন তাহা অবশ্যম্ভাবী (দ্র. আল-খাসাইসুল কুবরা, পৃ. ১৪৪; সীরাত ইন্ন হিশাম, ১খ, পৃ. ৯৮)।
(৬) মুসনাদে আবূ ইয়া'লা ও মুসনাদে বায্যার গ্রন্থে হযরত আনাস (রা)-এর প্রমুখাৎ সহীহ সনদে বর্ণিত আছে যে, একদা কুরায়শরা মহানবী (স)-কে এত অমানুষিক প্রহার করে যে, তাঁহার পবিত্র মস্তক রক্তাক্ত হইয়া গেল। এমন সময় তাঁহার সাহায্যার্থে হযরত আবূ বাক্স আগাইয়া আসিলে তাহারা মহানবী (স)-কে ছাড়িয়া তাঁহার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল। মুসনাদে আবূ ইয়া'লা 'হাসান' সনদে হযরত আবূ বাক্স দুহিতা হযরত আসমা (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, তাহারা তখন হযরত আবূ বাক্স (রা)-কে এত নির্দয়ভাবে প্রহার করে যে, তাহার সমস্ত মস্তক রক্তাক্ত হইয়া যায়। মাথায় আঘাত এত গুরুতর ছিল যে, হযরত আবূ বাক্স (রা) মাথায় হাত লাগাইতে পারিতেছিলেন না (দ্র. ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ১২৯)।
(৭) উছমান ইবন আফফান (রা) বলেন, একদা আমি নবী করীম (স)-কে তাওয়াফরত দেখিতে পাই। উব্বা ইব্‌ন আবূ মু'আইত (মুঈত, মি'য়াত) আবূ জাহল ও উমাইয়া ইবন খালাফ তখন কা'বা শরীফের 'হাতীম' অংশে উপবিষ্ট ছিল। তিনি তাওয়াফ করিতে করিতে তাহাদের সম্মুখ দিয়া অতিক্রম করাকালে তাহারা তাঁহার প্রতি কটূক্তি করে। দ্বিতীয়বার তাওয়াফকালে তিনি তাহাদের পাশ দিয়া অতিক্রম করিতেছিলেন, তখনও তাহারা তাহাদের কটূক্তির পুনরাবৃত্তি করিল। তৃতীয়বারও যখন এরূপ করিল তখন তাঁহার চেহারায় ক্রোধের চিহ্ন পরিলক্ষিত হইল। তিনি দাঁড়াইয়া গেলেন এবং বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ্র গযব না আসা পর্যন্ত তোমরা বিরত হইবে না। হযরত উছমান (রা) বলেন, তখন তাহাদের প্রত্যেকেই রীতিমত কাঁপিতেছিল। ঐ কথা বলিয়াই তিনি নিজ বাটীতে ফিরিতেছিলেন, আর আমি তাঁহার পিছনে পিছনে যাইতেছিলাম। তখন তিনি আমাদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন:
ابشروا فان الله مظهر دينه ومتم كلمته وناصر دينه. "সুসংবাদ গ্রহণ কর কেননা আল্লাহ তাআলা তাঁহার দীনকে বিজয়ী করিবেন। তিনি তাঁহার কলেমাকে পূর্ণ করিবেন এবং তাঁহার দীনকে সাহায্য করিবেন।" সাথে সাথে জালিম কাফিরদের পরিণাম সম্পর্কে বলিলেন :
ان هؤلاء الذين ترون ممن يذبح بايديكم عاجلا فوالله لقد رأيتهم ذبحهم الله بايدينا . "ঐ যেসব লোককে তোমরা দেখিতে পাইতেছ, তাহাদিগকে তোমাদের হাতেই যবাহ্ করানো হইবে। আল্লাহ্র কসম! আমি প্রত্যক্ষ করিয়াছি যে, আল্লাহ তা'আলা আমাদের হাতে তাহাদিগকে যবাহ্ করাইয়াছেন" (দারা কুতনী উহা বর্ণনা করিয়াছেন, দ্র. উয়ূনুল আছার, ১খ)।
(৮) আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) হইতে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ (স) হারাম শরীফে সালাত আদায়রত ছিলেন। আবু জাহল ও তাহার সঙ্গী-সাথীগণ সেখানে উপস্থিত ছিল। আবূ জাহল বলিল, আমাদের মধ্যে এমন কেহ কি নাই, যে অমুক উটের নাড়িভুঁড়ি উঠাইয়া আনিয়া মুহাম্মাদ সিজদারত থাকা অবস্থায় তাঁহার পিঠের উপর ফেলিয়া দিবে? তখন সম্প্রদায়ের সর্বাধিক হতভাগ্যটি অর্থাৎ উক্রা ইন্ন আবূ মুঈত তাহা উঠাইয়া আনিয়া সত্যসত্যই তাঁহার পিঠের উপর চাপাইয়া দিল।
আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, আমি সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি প্রত্যক্ষ করিতেছিলাম, অথচ আমার কিছু করার সাধ্য ছিল না। পৌত্তলিকরা উহা প্রত্যক্ষ করিয়া হাসাহাসি করিতেছিল এবং একে অপরের গায়ের উপর ঢলিয়া পড়িতেছিল। এমন সময় নবী করীম (স)-এর চার-পাঁচ বৎসর বয়স্কা কন্যা ফাতিমা (রা) দৌঁড়াইয়া আসিয়া আপন পিতার পিঠ হইতে ঐ আবর্জনা সরাইলেন। তখন তিনি সিজদা হইতে উঠিয়া তিনবার বদদো'আ করিলেন (সহীহ্ বুখারী, ১ খ)। তারপর তিনি বিশেষভাবে আবূ জাহল, উব্বা ইন্ন রবীআ, ওয়ালীদ ইব্‌ন উৎবা, উমাইয়া ইবন খালাফ, উত্কা ইব্‌ন আবূ মুঈত ও উমায়া ইবনুল ওয়ালীদের নাম ধরিয়া ধরিয়া বদদু'আ করিলেন। উহাদের অধিকাংশই বদর যুদ্ধে নিহত হয়। আমি বদরের কূপে নিক্ষিপ্ত তাহাদের মৃতদেহগুলি প্রত্যক্ষ করিয়াছি (দ্র. সহীহ বুখারী, কিতাবুল উযু, ১ খ)।
বুখারী শরীফের কিতাবুত তাহারাত (পবিত্রতা অর্জন অধ্যায়) এবং কিতাবুস সালাত (নামায অধ্যায়)-এ বর্ণিত হাদীছ হইতে জানা যায় যে, পবিত্রতা হাসিলের নির্দেশ অর্থাৎ وَثَيَابَكَ فَطَهِرْ আয়াতখানা এই ঘটনার পরেই নাযিল হইয়াছিল (দ্র. ফাতহুল বারী, ৮খ; সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ)।
হযরত আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি দুইজন মন্দতম প্রতিবেশীর মধ্যবর্তী স্থানে বসবাস করিতাম। তাহারা হইতেছে আবু লাহাব এবং উব্বা ইন্ন আবূ মু'আইত। উক্ত দুইজন আমার দ্বারপ্রান্তে বিষ্ঠা নিক্ষেপ করিত (দ্র. যুরকানী, ১খ)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহিত শত্রুতায় যাহারা অগ্রণী ছিল তাহাদের অনেকের সংক্ষিপ্ত বিবরণ ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। তাহাদের কঠোর নির্যাতনের মুকাবিলা যেভাবে নবী করীম (স) ও তদীয় সাহাবীগণ করিয়াছেন তাহা উম্মতের জন্য একটি বিরাট শিক্ষণীয় ব্যাপার। কুরআন-হাদীছের উদ্ধৃতিসহ আল্লামা ইদরীস কান্দেহলভী (র) তাহার একটি বিশদ বর্ণনা দিয়াছেন তাঁহার 'সীরাতুল মুস্তাফা' গ্রন্থে (১খ)।

ইব্‌ন ইসহাক বলেন, আল্লাহ্র নির্দেশ মুতাবিক যখন রাসূলুল্লাহ্ (স) আপন কওম-এর নিকট প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিলেন, তখন তাহার জানামতে, তিনি মুশরিকদের দেবদেবীর কথা উল্লেখ ও তাহাদের নিন্দা না করা পর্যন্ত তাহারা তাঁহার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় নাই এবং তাঁহার প্রতি বিরূপও হয় নাই। তিনি যখন এই কাজই করিলেন তখন তাহারা ইহাকে গুরুতর অন্যায় মনে করিল, বিক্ষুব্ধ হইল এবং ঐক্যবদ্ধ হইয়া তাঁহার বিরোধিতা ও শত্রুতায় বদ্ধপরিকর হইল (দ্র. ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ১খ, পৃ. ১৯৮; ই. ফা. প্রকাশিত)। হযরত খালিদ ইবনুল আস (রা) বলেন, আমি স্বপ্নে দেখিলাম, আমি একটি অগ্নি গহবরের নিকট দাঁড়াইয়া আছি। আমার পিতা আস আমাকে উহাতে নিক্ষেপ করিতে উদ্যত। ঠিক এমন সময় রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং আমাকে অগ্নিকুণ্ড হইতে রক্ষা করিলেন। ঘুম হইতে জাগ্রত হইয়াই আমি উপলব্ধি করিলাম যে, উহা একটি সত্য স্বপ্ন। আবু বাক্ (রা)-এর কাছে আসিয়া সেই স্বপ্ন বর্ণনা করিলে তিনি আমাকে মহানবী (স)-এর আনুগত্য অবলম্বন করিয়া ইসলাম গ্রহণের পরামর্শ দিলেন। তারপর আমি তাঁহার পরামর্শ অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইলাম। আমি আরয করিলাম, হে মুহাম্মাদ! আপনি আমাদিগকে কিসের দাওয়াত দেন? জবাবে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : ادعوك الى الله وحده لاشريك له وان محمدا عبده ورسوله تخلع ما كنت عليه من عبادة حجر لا يضر ولا ينفع ولا يدرى من عبده ممن لا يعبده. আমি একক আল্লাহর দিকে তোমাকে দাওয়াত দিতেছি। তাঁহার কোন শরীক নাই এবং মুহাম্মাদ তাঁহার বান্দা ও রাসূল। এবং তুমি যে প্রস্তর মূর্তির উপসনায় নিমগ্ন রহিয়াছ তাহা পরিত্যাগ কর। উহা তোমার কোন ক্ষতি বা উপকার করিতে পারে না আর না সে উপলব্ধি করিতে সক্ষম যে, কে তাহার উপাসনা করিল আর কে করিল না। খালিদ বলেন, তখন আমি আল্লাহর একত্ব ও নবী করীম (স)-এর সত্য রাসূল হওয়ার সাক্ষ্যবাণী (কালিমায়ে শাহাদাত) উচ্চারণ করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিলাম। আমার পিতা তাহা অবগত হইয়া এতই ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিলেন যে, তাহার নির্দয় প্রহারে আমি রক্তাক্ত হইয়া গেলাম। একটি আস্ত লাঠি তিনি আমার মাথায় ভাঙ্গিলেন এবং বলিলেন, "রে হতভাগা! তুই ইহা কী করিলি! তুই আমার সম্মুখ হইতে দূর হইয়া যা'। তুই সেই মুহম্মাদের দলে যোগ দিলি যে আমাদের গোটা সম্প্রদায়ের বিরোধী। সে আমাদের দেব-দেবীদের নিন্দা করিয়াছে। আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে অজ্ঞ ও নির্বোধ প্রতিপন্ন করিয়াছে।"খালিদ (রা) বলেন, আমি জবাব দিলাম, "আল্লাহ্র কসম! মুহাম্মাদ (স) যাহা বলিয়াছেন তাহা যথার্থ। পিতা তাহাতে আরও ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করিলেন। তিনি আমাকে নানারূপ গালমন্দ করিলেন এবং মুখে বলিলেন, "নরাধম! তুই আমার সম্মুখ হইতে চলিয়া যা। আল্লাহ্র কসম! আমি তোর পানাহার বন্ধ করিয়া দিব।" আমিও আর চুপ করিয়া থাকিলাম না। বলিলাম, "তুমি আমার পানাহার যদি বন্ধও করিয়া দাও, তাহা হইতে আল্লাহই আমাকে আমার রিযিক দান করিবেন"। সত্যসত্যই আমার পিতা আমাকে বাড়ী হইতে বাহির করিয়া দিলেন এবং আমার অন্যান্য ভাইদিগকে লক্ষ্য করিয়া শাসাইয়া চলিলেন, “কেহ তাহার সহিত কথা বলিতে পারিবে না। যদি কেহ এই আদেশ অমান্য করে তবে তাহাকেও ঐ একই পরিণাম বরণ করিতে হইবে” (দ্র. সীরতুল মুস্তাফা, ১খ, পৃ. ১৬৩-১৬৪)। অসংখ্য দেবদেবীর বিপরীতে এক আল্লাহ্‌র উপাস্য হওয়ায় ধারণাটি আরবে খুব বিরল থাকিলেও একেবারে অনুপস্থিত ছিল না। এই জাতীয় ধ্যান-ধারণার প্রতি তাহাদের বিদ্বিষ্ট হওয়ার আরেকটি কারণ এই ছিল যে, হাতীসহ কা’বা শরীফ ধ্বংসের উদ্দেশে হামলাকারী ইয়েমেনের আবিসিনীয় বংশোদ্ভূত শাসক আবরাহা ও তদীয় বাহিনীর সকলেই ছিল খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী। তাহারাও মূর্তিপূজা বিরোধী ছিল বিধায় সাবিয়ীন তথা পৌত্তলিকতা বিরোধী সকলকেই তাহারা সাবিয়ী বলিয়া ঘৃণা করিত। বিজয়ী মুসলমানদের প্রতি ভারতীয় হিন্দুদের যে কট্টর ঘৃণা-বিদ্বেষ, খৃস্টান ইংরেজ শাসক শোষকের প্রতি আমাদের যেরূপ ঘৃণাবোধ, ঐ একই ঘৃণাবোধ সক্রিয় ছিল পৌত্তলিক আরবদের মনে সাবিয়ীনদের প্রতি। মহানবী (স) যখন তাওহীদের দাওয়াত লইয়া আবির্ভূত হইলেন তখন আরবের কুরায়শগণও তাঁহাকে সাবিয়ী ধারণা করিয়া রুখিয়া দাঁড়াইয়াছিল, যাহার অভিব্যক্তি ঘটিয়াছিল সর্বপ্রথম আত্মীয়-স্বজনকে ডাকিয়া তিনি যখন তাহাদের সম্মুখে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন তখন আবু লাহাবের বক্তব্যে। স্মর্তব্য, সে তখন মহানবী (স)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছিল : وهؤلاء هم عمومك وبنو عمك فتكلم ودع الصباة. "হে মুহাম্মাদ! ইহারা হইতেছেন তোমার পিতৃব্যগণ ও পিতৃব্য পুত্রগণ। সুতরাং তুমি কথা বল এবং সাবিয়ীগণকে পরিহার কর অর্থাৎ সাবিয়ীসুলভ কথাবার্তা হইতে বিরত হও” (দ্র. ফিকহুস্ সীরা, পৃ. ৭৭-৭৮; ইবনুল আছীরের বরাতে আর-রাহীকুল মাখতুম, আরবী, ১ম সং ১৪০০ হি., মক্কা মুকাররমা, পৃ. ৮৯)। আল্লামা শিবলী নু'মানী কুরায়শদের বিরোধিতা ও মহানবী (স)-কে নির্যাতনের কারণসমূহ বর্ণনা করিতে গিয়া বৈরিতার অনেকগুলি কারণের প্রথমটি বর্ণনা করিয়াছেন এইভাবেঃ (১) অশিক্ষিত ও বর্বর জাতিসমূহের বৈশিষ্ট্য এই যে, তাহাদের পিতৃপুরুষের আকীদা-বিশ্বাস ও প্রথার বিরুদ্ধে যে কোন আন্দোলন তাহাদের মধ্যে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ইহা ছাড়া তাহাদের বিরোধিতা শুধু মৌখিক বিরোধিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, রক্তপাতের কমে তাহাদের প্রতিশোধ স্পৃহা নিবৃত্ত হয় না... (সীরাতুন্নবী, ২খ., পৃ. ১৩১)। আরবজাতি সুদীর্ঘ কাল যাবৎ মূর্তি পূজায় লিপ্ত ছিল। মূর্তি সংহারক হযরত ইবরাহীম (আ)-এর স্মৃতিবাহী কা'বা শরীফে ৩৬০টি প্রতিমা শোভা পাইতেছিল। 'হুবল' মূর্তি ছিল তাহাদের শ্রেষ্ঠ উপাস্য। এই সমস্ত মূর্তিবিগ্রহ-ই ছিল তাহাদের সর্বপ্রকার কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক। তাহাদের ধারণামতে, এইগুলিই বৃষ্টি বর্ষণ করিত, সন্তান দান করিত এবং যুদ্ধবিগ্রহে তাহাদিগকে বিজয় দান করিত। (২) ইসলামের আবির্ভাব ঘটিয়াছিল এই সমস্ত ধ্যান-ধারণার আমূল পরিবর্তন ও বৈপ্লবিক সংস্কার সাধনের জন্য। ইহার ফলে কুরায়শদের আধিপত্য ও বিশ্বব্যাপী প্রভাব-প্রতিপত্তির অবসান ছিল অবশ্যম্ভাবী। এইজন্য কুরায়শদের বিরোধিতা ছিল তীব্রতর। তাহাদের মধ্যে যাহাদের স্বার্থ যত বেশী হুমকির সম্মুখীন ছিল, তাহারাই বিরোধিতায় তত বেশী সক্রিয় ছিল (পৃ. গ্র., পৃ. ১৩২)। আরবে নেতৃত্ব লাভের সর্বাধিক যোগ্য বিবেচিত হইতেন ঐসব ব্যক্তি, অর্থ ও সন্তান-সন্ততি ছিল যাহাদের সর্বাধিক। ভারতবর্ষের হিন্দুগণ ও বিভিন্ন বর্বর জাতির মধ্যেও উহাই ছিল নেতৃত্বের মাপকাঠি। ঐ নিরিখে ওলীদ ইব্‌ন্ন মুগীরা, উমাইয়া ইন্ন খালাফ, আস ইব্‌ন ওয়াইল সাহমী এবং আবূ মাসউদ ছাকাফীই ছিল নেতৃত্বের হকদার। তাই নবুওয়াতের মত উচ্চমর্যাদাও তাহাদের ধারণামতে এমন কোন ব্যক্তির পাওয়া উচিত ছিল যিনি মক্কায় বা তায়েফে এইরূপ বিভব, সন্তান-সন্ততি ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী। তাহাদের এই মনোভাবের কথা কুরআন পাকে বিবৃত হইয়াছে এইভাবেঃ وَقَالُوا لَوْلَا نُزِّلَ هَذَا الْقُرْآنُ عَلَى رَجُلٍ مِّنَ الْقَرْيَتَيْنِ عَظِيمٍ “এবং ইহারা বলে, এই কুরআন কেন নাযিল করা হইল না দুই শহরের কোন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির উপর" (৪৩: ৩১)? অর্থাৎ মক্কায় ওলীদ ইবুন মুগীরা অথবা তায়েফের আবূ মাসউদ ছাকাফীকেই কেন নবুওয়াতের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হইল না? ধনসম্পদের কলুষতামুক্ত এবং যাঁহার পুত্রসন্তানগণ বৎসর দুই বৎসরের অধিক কালের আয়ু লাভ করেন নাই, সেই মুহাম্মাদ (স) নবী হইবেন, ইহা ছিল তাহাদের কল্পনা ও সহ্যের অতীত (পৃ. গ্র., পৃ. ১৩২)। (৩) অনেক ব্যাপারে ইসলাম ও খৃস্টবাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় একই ধরনের এবং মুসলমানগণ মক্কী জীবনে তো বটেই মাদানী জীবনেও কিছুকাল পর্যন্ত খৃস্টানদের মত বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলারূপে মান্য করিয়া সেদিকে মুখ ফিরাইয়া নামায পড়িতেন। তাই মক্কাবাসীদের মধ্যে এরূপ একটা ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হইয়াছিল যে, মুহাম্মাদ (স) বুঝি খৃস্টবাদেরই দাওয়াত দিতেছেন, তাই তাহারা তাঁহার বিরুদ্ধে বৈরিতা শুরু করে। (৪) গোত্রীয় হানাহানি ও বৈরিতাও ছিল ইহার অন্যতম কারণ। কুরায়শদের মধ্যে দুইটি গোত্রে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রেষারেষি ছিল। গোত্র দুইটি হইতেছে বানু হাশিম ও বানু উমাইয়া। আব্দুল মুত্তালিব নিজের ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতাবলে বানু হাশিমের পাল্লা ভারী করিয়া ফেলেন। কিন্তু তাঁহার উত্তরসুরিদের মধ্যে আর কেহই তেমন প্রতিপত্তিশীল হইয়া উঠিতে পারেন নাই। আবূ তালিবের অর্থবিত্ত ছিল না। আব্বাস অর্থবিত্তে সমৃদ্ধ হইলেও বদান্যতা গুণ হইতে বঞ্চিত ছিলেন। আবু লাহাব ছিল দুশ্চরিত্র। ফলে প্রভাব-প্রতিপত্তিতে বানু উমাইয়ার পাল্লা ভারী হইয়া উঠে। নবী করীম (স)-এর নবুওয়াতকে বানু উমাইয়াগণ তাই তাহাদের প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্র বানূ হাশিমের বিজয় বলিয়া ধারণা করে। এই জন্য ঐ গোত্রটিই নবী করীম (স)-এর সর্বাধিক বিরোধিতা করে। একমাত্র বদর যুদ্ধ ছাড়া অপর সকল যুদ্ধই তাই আবু সুফিয়ানের অপতৎপরতায় সংঘটিত হয় এবং ঐ যুদ্ধসমূহের সেনাপতিও ছিলেন ঐ আবু সুফিয়ানই। নবী করীম (স)-এর প্রাণের বৈরী উব্বা ইব্‌ন আবূ মু'আইত ছিল ঐ উমাইয়া বংশেরই লোক। বানূ উমাইয়ার পরপরই যে গোত্রটি বানু হাশিমের সমকক্ষতার দাবি করিত, তাহা হইল বানু মাখযূম গোত্র। ওলীদ ইব্‌ন মুগীরা ছিল ঐ গোত্রেরই সর্দার। এইজন্য ঐ গোত্রও মহানবী (স)-এর সহিত বৈরিতায় লিপ্ত হয়। আবূ জাহলের একটি বক্তব্য হইতে উহার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। একদা আখনাস ইব্‌ন শুরায়ক ছাকাফী আবু জাহলের সহিত সাক্ষাত করিয়া মুহাম্মাদ (স) ও তাঁহার নবুওয়াত সম্পর্কে তাহার অভিমত জানিতে চাহিলে আবু জাহল স্পষ্ট জবাব দেয়, আমরা এবং বানু আবদে মানাফ অর্থাৎ বানু হাশিম ছিলাম চির প্রতিদ্বন্দ্বী। তাহারা আতিথ্য প্রদান করিলে আমরাও আতিথ্য প্রদান করিতাম। তাহারা রক্তপণ প্রদানের উদারতা প্রদর্শন করে, আমরাও সে ব্যাপারে পিছাইয়া থাকি নাই। তাহারা বদান্যতা প্রদর্শন করিলে আমরা আরও বর্ধিত হারে বদান্যতা প্রদর্শন করি। এইরূপে সর্ব ব্যাপারেই যখন আমরা তাহাদের সমকক্ষ হইয়া উঠিলাম, তখন তাহারা নবুওয়াতের দাবিদার সাজিয়াছে। আল্লাহ্র কসম! এই নবীর প্রতি আমরা কস্মিনকালেও ঈমান আনয়ন করিতে পারিব না (পৃ. গ্র., ১৩৩; ইব্‌ন হিশাম, পৃ. ১০৮, মিসরীয় মুদ্রণ)। (৫) কুরায়শদের মধ্যে সীমাহীন চারিত্রিক অধঃপতন দেখা দিয়াছিল। তাহাদের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিগণ নানা চারিত্রিক ব্যাধিতে লিপ্ত ছিল। বানু হাশিম গোত্রের সেরা সম্মানিত নেতা আবৃ লাহাব হারাম শরীফের কোষাগারে রক্ষিত স্বর্ণের হরিণ মূর্তি চুরি করিয়া বিক্রয় করিয়া ফেলে (দ্র. মা'আরিফ ইব্‌ন কুতায়বা, মিসরীয় মুদ্রণ, পৃ. ৫৫)। বানু যুহার চুক্তিবদ্ধ বন্ধু ও অন্যতম আরব সর্দার আখনাস ইবন শুরায়ক ছিল পরনিন্দা ও মিথ্যাচারে অভ্যস্ত। নবী করীম (স) যখন আল-কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করিয়া ঐ সমস্ত চারিত্রিক ব্যাধির প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করিতেন তখন ঐ আরব সর্দাররা অত্যন্ত বিব্রত বোধ করিত এবং বিচলিত হইয়া উঠিত। কেননা কুরআনের ঐ আয়াতসমূহ যে কাহাদের উপর প্রযোজ্য, তাহা শ্রোতা মাত্রই স্পষ্ট আঁচ করিতে পারিত। সুতরাং তাহাদের নেতৃত্ব- কর্তৃত্বের প্রাসাদ যে উহাতে ধুলিসাৎ হইয়া যাইবে, তাহা তাহারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিত। ঐ সমস্ত আয়াতের দ্বারা যেহেতু মহানবী (স)-এর নির্যাতনকারী শত্রুদের চারিত্রিক দোষত্রুটি ফুটিয়া উঠে তাই ঐ জাতীয় কয়েকটি আয়াতের উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। আল-কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা'আলা বলেন- وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلافٍ مَهِينٍ: هَمَّازٍ مَّشَاء بِنَمِيمٍ مَنَّاعٍ لِلْخَيْرِ مُعْتَدٍ أَثِيمٍ. عُتُلٍ بَعْدَ ذَلِكَ زَنِيمٍ. أَنْ كَانَ ذَا مَالٍ وَبَنِينَ. اذَا تُتْلَى عَلَيْهِ آيَاتُنَا قَالَ أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ. "এবং অনুসরণ করিও না তাহার যে কথায় কথায় শপথ করে, যে লাঞ্ছিত, পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগাইয়া বেড়ায়, যে কল্যাণের কার্যে বাধা দান করে, যে সীমালংঘনকারী পাপিষ্ঠ, রূঢ় স্বভাব এবং তদুপরি কুখ্যাত; এইজন্য যে, সে ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধিশালী। উহার নিকট আমার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হইলে সে বলে, ইহা তো সেকালের উপকথা মাত্র" (৬৮: ১০-১৫)। উক্ত আয়াতে যে দশটি চারিত্রিক দোষের কথা উল্লিখিত হইয়াছে এইগুলি কুরায়ش সর্দার ওলীদ ইব্‌ন মুগীরার মধ্যে ছিল বলিয়া 'আসবাবুন নুযূল'-এ বর্ণিত হইয়াছে (দ্র. আল-কুরআনুল কারীম, ইফাবা, পৃ. ৯৪২, অষ্টাদশ মুদ্রণ, ১৯৯৬ খৃ.)। তবে এইরূপ চরিত্র তাহাদের আরও অনেকেরই ছিল। সফিউর রহমান মুবারকপুরী এই স্বভাবগুলি আখনাস ইব্‌ন শুরায়ক ছাকাফীরও ছিল বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (দ্র. আর-রাহীকুল মাখতুম, ১ম আরবী সংস্করণ, ১৪০০ হি., পৃ. ১০১)। ওলীদ ইব্‌ন মুগীরার ব্যাপারে আরও আয়াত নাযিল হয়ঃ ذَرْنِي وَمَنْ خَلَقْتُ وَحَيْداً . وجَعَلْتُ لَهُ مَالاً مَّمْدُوداً . وَبَنِينَ شُهُوداً . وَمَهَدْتُ لَهُ تَمْهِيداً . ثُمَّ يَطْمَعُ أَنْ أَزِيدَ. كَلَّا إِنَّهُ كَانَ لَايُتِنَا عَنِيداً . "ছাড়িয়া দাও আমাকে এবং যাহাকে আমি সৃষ্টি করিয়াছি একাকী। আমি তাহাকে দিয়াছি বিপুল ধন-সম্পদ। এবং নিত্যসঙ্গী পুত্রগণ এবং তাহাকে দিয়াছি স্বচ্ছন্দ জীবনের প্রচুর উপকরণ; ইহার পরও সে কামনা করে যে, আমি তাহাকে আরও অধিক দেই। না, তাহা হইবে না, সে তো আমার নিদর্শনসমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী" (৭৪ : ১১-১৬)। উক্ত আয়াতসমূহের বক্তব্য উক্ত সূরার ৩০ তম আয়াত পর্যন্ত বিস্তৃত, যাহাতে তাহার শাস্তির জন্য যে ভয়াবহ জাহান্নাম রহিয়াছে এবং বিরাটকায় ও প্রবল শক্তিধর উনিশজন ফেরেশতা রহিয়াছেন তাহারও বর্ণনা রহিয়াছে। উমাইয়া ইব্‌ন খালাফ যখনই রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে দেখিত তখনই তাঁহাকে নানারূপ কটাক্ষ করিত। তাহার সম্পর্কে নাযিল হইল: وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةَ أُمَزَةَ "দুর্ভোগ ঐ সমস্ত নিন্দাকারীর যাহারা সম্মুখে ও পশ্চাতে লোকের নিন্দা করে (১০৪:১)।" ইবন হিশামের ভাষ্যমতে, 'হুমাযা' ঐ ব্যক্তি, যে প্রকাশ্যে মুখের উপর লোকের নিন্দাবাদ করে, গালিগালাজ করে এবং বক্রচক্ষে তাকায়। লুমাযা হইতেছে ঐ ব্যক্তি, যে লোকের অসাক্ষাতে তাহার দুর্ণাম করে এবং পীড়া দেয় (দ্র. ইব্‌ন হিশাম, ১খ, পৃ. ৩৫৬-৩৫৭)। আবূ জাহল কখনও কখনও রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া কুরআন শ্রবণ করিত। কিন্তু ঐ শোনা পর্যন্তই, ঈমান, ইয়াকীন, আল্লাহ্ ভয় কিছুই তাহার মনে সৃষ্টি হইত না। সে তাহার কথাবার্তা ও কাজকর্ম দ্বারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে পীড়া দিত এবং তাঁহার ইবাদত-বন্দেগী ও প্রচারের পথে নানারূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিত। অধিকন্তু সে তাহার এই অপtতত্পরতার জন্য রীতিমত গর্ববোধ করিত যেন কী বিরাট পুণ্যকর্মই না সে করিয়া ফেলিয়াছে। এই প্রেক্ষিতে নাযিল হইল: فَلَا صَدَّقَ وَلَا صَلَّى. وَلَكُنْ كَذَّبَ وَتَوَلَّى. ثُمَّ ذَهَبَ إِلَى أَهْلِهِ يَتَمَطَّى. أولى لَكَ فَأَوْلى. ثُمَّ أَوْلَى لَكَ فَأَوْلى. "সে বিশ্বাস করে নাই এবং সালাতও আদায় করে নাই, বরং সে সত্য প্রত্যাখ্যান করিয়াছিল এবং মুখ ফিরাইয়া লইয়াছিল। অতঃপর সে তাহার পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরিয়া গিয়াছিল দম্ভভরে। দুর্ভোগ তোমার জন্য, দুর্ভোগ আবার দুর্ভোগ তোমার জন্য, দুর্ভোগ (৭৫: ৩১-৩৫; দ্র. ফী যিলালিল কুরআন, ২৯ খ, ২১২)!" কুরআন শরীফ যেইভাবে কাফির নেতাদের স্বরূপ উদঘাটন করিয়া চলিয়াছিল উহা ছিল তাহাদের জন্য একান্তই অসহনীয় ও চরম বিব্রতকর। সর্বোপরি যখন আল-কুরআন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করিল: إِنَّكُمْ وَمَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ حَصَبُ جَهَنَّمَ أَنْتُمْ لَهَا وَارِدُونَ. "তোমরা এবং আল্লাহ্র পরিবর্তে তোমরা যাহাদের ইবাদত কর, সেগুলি তো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সকলে উহাতে প্রবেশ করিবে” (২১ঃ ৯৮)। তখন তাহাদের সকল ধৈর্যের বাঁধ টুটিয়া গেল। আল-কুরআনের এই বাচনভঙ্গী তাহাদের দাম্ভিক আচরণ ও উদ্ধত স্বভাবের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত সঙ্গত হইলেও ইহাতে তাহারা টগবগ করিয়া ফুসিয়া উঠিল এবং নবী করীম (স) ও তাঁহার সাহাবীগণের উপর কঠোর নির্যাতন চালাইতে লাগিল (সীরতুন্নবী, ১খ., পৃ. ২১২-২১৯; আল্লামা শিবলী নু'মানীকৃত, ৫ম সং.)। রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি কুরায়শদের নির্যাতনের নমুনা (১) মু'জাম তাবারানীতে উদ্ধৃত, হযরত মুনীব গামিদী (রা)-এর বর্ণনা আছে, আমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছি, রাসূলুল্লাহ (স) লোকজনকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিয়া যাইতেছিলেন : قُولُوا لَا اله الا اللهُ تُفْلِحُوا . "তোমরা বল, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, তোমরা সাফল্য লাভ করিবে।" তখন কোন কোন হতভাগ্য লোক তাঁহাকে গালমন্দ করিতেছিল। তাহারা তাঁহার প্রতি থুথু নিক্ষেপ করিতেছিল। তাহাদের কেহ কেহ তাঁহার প্রতি ধুলি নিক্ষেপ করিতেছিল। এইভাবে দ্বিপ্রহর গড়াইয়া গেল। এমন সময় একটি বালিকা পানি লইয়া আসিল এবং তাঁহার পবিত্র মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় ধৌত করিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, বালিকাটি কে? লোকজন আমাকে জানাইল যে, বালিকাটি নবী করীম (স)-এর কন্যা যয়নব (রা)। বুখারীর বর্ণনায় আরও আছে, তখন রাসূলুল্লাহ (স) যয়নবকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: প্রিয় কন্যা। তোমার পিতা অসহায়ভাবে লাঞ্ছিত হইবেন এরূপ আশঙ্কা করিও না। বুখারী (র) তদীয় 'তারীখ' গ্রন্থে তাহা বর্ণনা করিয়াছেন। এতদ্ব্যতীত আবু নু'আয়মও তাহা বর্ণনা করিয়াছেন। আবূ যুর'আ দামিল্কী বলেন, এই হাদীছখানা সহীহ্ (দ্র. কানযুল উম্মাল, ৬খ., পৃ. ৩০৬)। (২) সাহাবী তারেক ইব্‌ন আবদুল্লাহ আল-মাহারিবী (রা) বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে যি'ল-মাজাযের বাজারে দেখিয়াছি। তিনি বলিয়া যাইতেছিলেন, হে লোকসকল! তোমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বল, তাহা হইলে তোমার সফলকাম হইবে। তখন এক হতভাগা তাঁহার পশ্চাতে পশ্চাতে পাথর নিক্ষেপ করিয়া চলিয়াছিল আর মুখে বলিতেছিল, হে লোকসকল! এই লোকটির কথার কর্ণপাত করিও না, কেননা লোকটা মিথ্যুক। ইবন আবী শায়বা এ হাদীছখানা বর্ণনা করিয়াছেন (প্রাগুক্ত, ৬খ., পৃ. ৩০২)। (৩) বানু কিনানার জনৈক শায়খ বর্ণনা করেন, আমি নবী করীম (স)-কে ফি'ল-মাজাযের বাজারে দেখিয়াছি। তিনি লোকজনকে লক্ষ্য করিয়া বলিতেছিলেন, লোকসকল! তোমরা 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বল, তাহা হইলে সফলকাম হইবে। তখন আবু জাহল তাঁহার প্রতি মাটি নিক্ষেপ করিতে করিতে বলিতেছিল, লোকসকল! ইহার প্রতারণা জালে তোমরা ধরা দিও না। এই ব্যক্তি তোমাদিগকে লাত ও উযযা হইতে বিচ্ছিন্ন করিতে চাহিতেছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার প্রতি ভ্রুক্ষেপমাত্র করিতেছিলেন না (দ্র. মুসনাদে আহমাদ, ৪খ, পৃ. ৬৩, রিয়াদ সং. পৃ. ১১৮৭, নং ১৬৭২০ ও ২২৫৭৯)। (৪) উরওয়া ইব্‌নুষ যুবায়র (রা) বলেন, আমি একদা হযরত আমর ইবনুল 'আস (রা)-কে অনুরোধ করিলাম, নবী করীম (স)-কে মুশরিকরা যে নির্যাতন করিত আমাকে তাহার বর্ণনা শুনান। জবাবে তিনি বলিলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (স) সালাত আদায়ে রত ছিলেন। এমতাবস্থায় উব্বা ইব্‌ন আবূ মু'ঈত তাঁহার কণ্ঠদেশে কাপড় পেঁচাইয়া এমনভাবে হেঁচকা টান দিল যে, তাঁহার দম বন্দ হইয়া আসার উপক্রম হইল। এমন সময় আবূ বকর (রা) আসিয়া সেখান উপস্থিত হইলেন এবং সজোরে ধাক্কা দিয়া তাহাকে সরাইয়া দিলেন এবং এই আয়াতটি পাঠ করিলেন: اتَقْتُلُونَ رَجُلاً أَنْ يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ وَقَدْ جَاءَكُمْ بِالْبَيِّنَتِ. "তোমরা কি এক ব্যক্তিকে এজন্যে হত্যা করিবে যে, সে বলে, আমার প্রভু আল্লাহ, এবং (অথচ সে তোমাদের নিকট তোমাদের প্রভুর পক্ষ হইতে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি লইয়া আসিয়াছেন" (৪০ঃ ২৮)? উল্লেখ্য, ফেরাউন ও হামান চক্র যখন মূসা (আ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র আঁটিতেছিল, তখন ফেরাউন পরিবারের গোপনে ঈমান আনয়নকারী এক ব্যক্তি হুবহু ঐ বাক্যটিই উচ্চারণ করিয়াছিলেন। মুসনাদে বায্যার এবং দালাইলে নবুওয়াতে আবূ নুআয়মের বর্ণিত এক বিবরণে আছে, হযরত আলী (রা)-এর পুত্র মুহাম্মাদ বর্ণনা করেন, একদা হযরত আলী (রা) খুতবা প্রদানকালে সমবেত লোকজনকে প্রশ্ন করিলেন, আচ্ছা বল তো দেখি, সর্বাধিক বীরপুরুষ কে? উপস্থিত লোকজন জবাব দিল, আপনি। হযরত আলী (রা) বলিলেন, আমার অবস্থা এই যে, যে-ই আমার বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হইয়াছে, আমি তাহার প্রতিশোধ না লইয়া ছাড়ি নাই। সর্বাধিক বীর পুরুষ তো হইতেছেন হযরত আবূ বকর (রা)। আমি একবার লক্ষ্য করি যে, কুরায়শরা রসূলুল্লাহ (স)-কে প্রহার করিতে করিতে বলিতেছিল : انت جعلت الألهة الها واحدا. "তুমিই সেই ব্যক্তি যে আমাদের বহু উপাস্যকে এক উপাস্যে নামাইয়া আনিয়াছ।" আমাদের মধ্যকার কাহারও সাহস হইল না যে, তাহাদের পাশে ঘেঁষি এবং দুশমনদের কবল হইতে আল্লাহর নবীকে মুক্ত করি। এমন সময় ঘটনাক্রমে সেখানে আবূ বকর আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তিনি কালবিলম্ব না করিয়া শত্রুদের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িলেন এবং এক ঘুষিতে প্রহারকারী হতভাগ্যটিকে কাবু করিয়া ফেলিলেন এবং ফেরাউন পরিবারের সেই মুমিন ব্যক্তিটির ন্যায় বলিলেন, আফসোস যে, তোমরা এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করিতে যাইতেছ যে বলে, আমার প্রভু আল্লাহ। তারপর রোরুদ্যমান কণ্ঠে তিনি সমবেত জনতাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আল্লাহর কসম, আচ্ছা বল দেখি, ফেরাউন পরিবারের ঐ মুমিন ব্যক্তিটি উত্তম ছিল নাকি হযরত আবু বাক্স? তাঁহার এই প্রশ্নে লোকজন নিরুত্তর রহিল। এবার তিনি নিজেই উত্তর দিলেন: শোন, আবৃ বাক্ (রা)-এর সামান্য একটু সময় ফেরাউন পরিবারের ঐ পুণ্যবান মুমিনের সারা জীবনের চাইতেও উত্তম। সেই ব্যক্তি তাহার ঈমান গোপন রাখিয়া তৃতীয় পক্ষ সাজিয়া কথাটি উচ্চারণ করিয়াছিল। পক্ষান্তরে হযরত আবূ বাক্স বীরদর্পে তাঁহার ঈমানী পরিচয় ব্যক্ত করিয়াছেন (দ্র. ফাতহুল বারী, 'মক্কায় মুশরিকদের পক্ষ হইতে নবী করীম (স) ও তদীয় সহাবীগণের নির্যাতন ভোগ অধ্যায়)। এতদ্ব্যতীত ঐ ব্যক্তি কেবল মৌখিক প্রতিবাদ করিয়াই দায়িত্ব সম্পূর্ণ করিয়াছিল। পক্ষান্তরে আবূ বাক্স (রা) মৌখিক প্রতিবাদের সাথে সাথে বাহুবল প্রয়োগে নবী করীম (স)-এর সাহায্য করিয়াছেন। (৫) আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস (রা)-এর একটি বর্ণনায় আছে, যখন শত্রুরা তাঁহাকে ছাড়িয়া ছত্রভঙ্গ হইয়া গেল তখন তিনি বলিয়াছিলেন: وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا أُرْسِلْتُ إِلَيْكُمْ إِلَّا بِالذَّبْحِ. "সেই পবিত্র সত্তার কসম যাঁহার হাতে আমার প্রাণ! আমি কেবল তোমাদের মর্ত লোকদেরকে যবাহ্ করিবার জন্যই প্রেরিত হইয়াছি"। (দ্র. বুখারী, খাল্ক আফ্ আলিল ইবাদ অধ্যায় এবং আবূ ইয়ালা ও ইবন হিব্বান, ফাতহুল বারী, প্রাগুক্ত অধ্যায়)। আবূ নুআয়মের দালাইলুন নবুওয়া, বায়হাকীর দালাইলুন নূবুওয়া এবং সীরতে ইব্‌ ইসহাক- এর রিওয়ায়াতে আছে, তাঁহার ঐ কথা উচ্চারণের সাথে সাথে সকলেই নির্বাক হইয়া গেল এবং নিজ নিজ স্থানে মাথা নত করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। কেননা ইহা তাহারা সম্যক জ্ঞাত ছিল যে, তিনি যাহা বলেন তাহা অবশ্যম্ভাবী (দ্র. আল-খাসাইসুল কুবরা, পৃ. ১৪৪; সীরাত ইন্ন হিশাম, ১খ, পৃ. ৯৮)। (৬) মুসনাদে আবূ ইয়া'লা ও মুسনাদে বায্যার গ্রন্থে হযরত আনাস (রা)-এর প্রমুখাৎ সহীহ সনদে বর্ণিত আছে যে, একদা কুরায়শরা মহানবী (স)-কে এত অমানুষিক প্রহার করে যে, তাঁহার পবিত্র মস্তক রক্তাক্ত হইয়া গেল। এমন সময় তাঁহার সাহায্যার্থে হযরত আবূ বাক্স আগাইয়া আসিলে তাহারা মহানবী (স)-কে ছাড়িয়া তাঁহার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল। মুসনাদে আবূ ইয়া'লা 'হাসান' সনদে হযরত আবূ বাক্স দুহিতা হযরত আসমা (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, তাহারা তখন হযরত আবূ বাক্স (রা)-কে এত নির্দয়ভাবে প্রহার করে যে, তাহার সমস্ত মস্তক রক্তাক্ত হইয়া যায়। মাথায় আঘাত এত গুরুতর ছিল যে, হযরত আবূ বাক্স (রা) মাথায় হাত লাগাইতে পারিতেছিলেন না (দ্র. ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ১২৯)। (৭) উছমান ইবন আফফান (রা) বলেন, একদা আমি নবী করীম (স)-কে তাওয়াফরত দেখিতে পাই। উব্বা ইব্‌ন আবূ মু'আইت (মুঈত, মি'য়াত) আবূ জাহল ও উমাইয়া ইবন খালাফ তখন কা'বা শরীফের 'হাতীম' অংশে উপবিষ্ট ছিল। তিনি তাওয়াফ করিতে করিতে তাহাদের সম্মুখ দিয়া অতিক্রম করাকালে তাহারা তাঁহার প্রতি কটূক্তি করে। দ্বিতীয়বার তাওয়াফকালে তিনি তাহাদের পাশ দিয়া অতিক্রম করিতেছিলেন, তখনও তাহারা তাহাদের কটূক্তির পুনরাবৃত্তি করিল। তৃতীয়বারও যখন এরূপ করিল তখন তাঁহার চেহারায় ক্রোধের চিহ্ন পরিলক্ষিত হইল। তিনি দাঁড়াইয়া গেলেন এবং বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ্র গযব না আসা পর্যন্ত তোমরা বিরত হইবে না। হযরত উছমান (রা) বলেন, তখন তাহাদের প্রত্যেকেই রীতিমত কাঁপিতেছিল। ঐ কথা বলিয়াই তিনি নিজ বাটীতে ফিরিতেছিলেন, আর আমি তাঁহার পিছনে পিছনে যাইতেছিলাম। তখন তিনি আমাদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: ابشروا فان الله مظهر دينه ومتم كلمته وناصر دينه. "সুসংবাদ গ্রহণ কর কেননা আল্লাহ তাআলা তাঁহার দীনকে বিজয়ী করিবেন। তিনি তাঁহার কলেমাকে পূর্ণ করিবেন এবং তাঁহার দীনকে সাহায্য করিবেন।" সাথে সাথে জালিম কাফিরদের পরিণাম সম্পর্কে বলিলেন : ان هؤلاء الذين ترون ممن يذبح بايديكم عاجلا فوالله لقد رأيتهم ذبحهم الله بايدينا . "ঐ যেসব লোককে তোমরা দেখিতে পাইতেছ, তাহাদিগকে তোমাদের হাতেই যবাহ্ করানো হইবে। আল্লাহ্র কসম! আমি প্রত্যক্ষ করিয়াছি যে, আল্লাহ তা'আলা আমাদের হাতে তাহাদিগকে যবাহ্ করাইয়াছেন" (দারা কুতনী উহা বর্ণনা করিয়াছেন, দ্র. উয়ূনুল আছার, ১খ)। (৮) আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) হইতে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ (স) হারাম শরীফে সালাত আদায়রত ছিলেন। আবু জাহল ও তাহার সঙ্গী-সাথীগণ সেখানে উপস্থিত ছিল। আবূ জাহল বলিল, আমাদের মধ্যে এমন কেহ কি নাই, যে অমুক উটের নাড়িভুঁড়ি উঠাইয়া আনিয়া মুহাম্মাদ সিজদারত থাকা অবস্থায় তাঁহার পিঠের উপর ফেলিয়া দিবে? তখন সম্প্রদায়ের সর্বাধিক হতভাগ্যটি অর্থাৎ উক্রা ইন্ন আবূ মুঈত তাহা উঠাইয়া আনিয়া সত্যসত্যই তাঁহার পিঠের উপর চাপাইয়া দিল। আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, আমি সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি প্রত্যক্ষ করিতেছিলাম, অথচ আমার কিছু করার সাধ্য ছিল না। পৌত্তলিকরা উহা প্রত্যক্ষ করিয়া হাসাহাসি করিতেছিল এবং একে অপরের গায়ের উপর ঢলিয়া পড়িতেছিল। এমন সময় নবী করীম (স)-এর চার-পাঁচ বৎসর বয়স্কা কন্যা ফাতিমা (রা) দৌঁড়াইয়া আসিয়া আপন পিতার পিঠ হইতে ঐ আবর্জনা সরাইলেন। তখন তিনি সিজদা হইতে উঠিয়া তিনবার বদদো'আ করিলেন (সহীহ্ বুখারী, ১ খ)। তারপর তিনি বিশেষভাবে আবূ জাহল, উব্বা ইন্ন রবীআ, ওয়ালীদ ইব্‌ন উৎবা, উমাইয়া ইবন খালাফ, উত্কা ইব্‌ন আবূ মুঈত ও উমায়া ইবনুল ওয়ালীদের নাম ধরিয়া ধরিয়া বদdu'a করিলেন। উহাদের অধিকাংশই বদর যুদ্ধে নিহত হয়। আমি বদরের কূপে নিক্ষিপ্ত তাহাদের মৃতদেহগুলি প্রত্যক্ষ করিয়াছি (দ্র. সহীহ বুখারী, কিতাবুল উযু, ১ খ)। বুখারী শরীফের কিতাবুত তাহারাত (পবিত্রতা অর্জন অধ্যায়) এবং কিতাবুস সালাত (নামায অধ্যায়)-এ বর্ণিত হাদীছ হইতে জানা যায় যে, পবিত্রতা হাসিলের নির্দেশ অর্থাৎ وَثَيَابَكَ فَطَهِرْ আয়াতখানা এই ঘটনার পরেই নাযিল হইয়াছিল (দ্র. ফাতহুল বারী, ৮খ; সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ)। হযরত আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি দুইজন মন্দতম প্রতিবেশীর মধ্যবর্তী স্থানে বসবাস করিতাম। তাহারা হইতেছে আবু লাহাব এবং উব্বা ইন্ন আবূ মু'আইত। উক্ত দুইজন আমার দ্বারপ্রান্তে বিষ্ঠা নিক্ষেপ করিত (দ্র. যুরকানী, ১খ)। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহিত শত্রুতায় যাহারা অগ্রণী ছিল তাহাদের অনেকের সংক্ষিপ্ত বিবরণ ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। তাহাদের কঠোর নির্যাতনের মুকাবিলা যেভাবে নবী করীম (স) ও তদীয় সাহাবীগণ করিয়াছেন তাহা উম্মতের জন্য একটি বিরাট শিক্ষণীয় ব্যাপার। কুরআন-হাদীছের উদ্ধৃতিসহ আল্লামা ইদরীস কান্দেহলভী (র) তাহার একটি বিশদ বর্ণনা দিয়াছেন তাঁহার 'সীরাতুল মুস্তাফা' গ্রন্থে (১খ)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00