📄 পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের মধ্যে কোনটি সর্বপ্রথম ফরয হয়?
মি'রাজ রজনীতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয হওয়ার পর মহানবী (স) সর্বপ্রথম কোন সালাত আদায় করিয়াছিলেন এই সম্পর্কে 'আলিমগণের মতামত নিম্নরূপ:
১. একটি মত অনুসারে মহানবী (স) ফরজ সালাত হিসাবে সর্বপ্রথম ফজরের সালাত আদায় করিয়াছিলেন। ইমাম দারা কুতনী (মৃ. ৯৯৫ খৃ.) তাঁহার সুনান গ্রন্থে (১খ) হুযায়ফা ইবনুল য়ামান (রা)-এর মুক্ত দাস মাহবুব ইবনুল জাহম-এর সনদে ইবন 'উমার (রা) হইতে বর্ণনা করেন, أَتَانِي جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلامُ حِيْنَ طلع الفجر "যখন ফজর উদিত হইল তখন হযরত জিবরীল (আ) আমার নিকট আগমন করিলেন)"
এই হাদীছ হইতে বুঝা যায়, রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রথম আদায়কৃত ফরয সালাত ছিল ফজর। কিন্তু এই অভিমতটি দুর্বল। হাফিয যায়লা'ঈ (র) তাঁহার নাসাবুর রায়াহ গ্রন্থে (১খ) বলেন, “ইবন হিব্বান উক্ত হাদীছকে كِتابُ الضَّعَفَاء গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন এবং এই হাদীছের রাবী মাহবুব ইবনুল জাহমের কারণে তিনি হাদীছটিকে مُعَلَلٌ )ত্রুটিযুক্ত) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন।” ইহা ব্যতীত এই হাদীছ অন্যান্য সহীহ হাদীছেরেরও বিপরীত (মা'আরিফুস সুনান, ২খ)।
২. ফরয সালাত হিসাবে মহানবী (স) সর্বপ্রথম যুহরের সালাত আদায় করেন। এই প্রসঙ্গে তাবারানী বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীছ উল্লেখযোগ্য:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَأَبِي سَعِيدٍ قَالَا أَوَّلُ صَلَاةٍ فُرِضَتْ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صلاة الظهر. "হযরত আবু হুরায়রা (রা) এবং আবূ সা'ঈদ (রা) হইতে বর্ণিত। তাঁহারা বলেন, নবী কারীম (স)-এর উপর প্রথম ফরযকৃত সালাত হইতেছে যুহরের সালাত”।
ইবন ইসহাক এই প্রসঙ্গে বলেন:
قَالَ نَافِعُ بْنُ جُرَيْجٍ وَغَيْرُهُ لَمَّا أَصْبَحَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ اللَّيْلِ الَّتِي أَسْرِئَ بِهِ لَمْ يَرُعْهُ إِلَّا جِبْرِيلُ نَزَلَ حِينَ زَاغَتِ الشَّمْسُ وَلذلكَ سُمِّيَتِ الأُولَى أَنْ صَلَاةُ الظُّهْرِ فَأَمَرَ فَصِيْحَ بِأَصْحَابِهِ الصَّلَاةُ جَامِعَةٌ فَاجْتَمَعُوا فَصَلَّى بِهِ جِبْرِيلُ وَصَلَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالنَّاسِ.
"নাফি' ইবন জুরায়জ বলেন, ইসরার রজনী অবসানের পর নবী কারীম (স)-কে দিবাভাগে হযরত জিবরাঈল (আ)-এর আগমন ব্যতীত কোন বস্তুই শংকিত করে নাই। সূর্য পশ্চিম গগনে হেলিয়া পড়িবার পর জিবরাঈল (আ) তাঁহার নিকট আসিলেন। যুহর হইতে নামায আদায়ের রীতি প্রবর্তিত হওয়ার কারণে সালাতুয যুহরকে প্রথম সালাত নামে অভিহিত করা হয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সাহাবীগণকে সালাতের জন্য আহবান জানাইবার নির্দেশ প্রদান করেন। অতএব اَلصَّلَاةُ جامعة (সালাত অনুষ্ঠিত হইবে) বলিয়া সাহাবীগণকে ডাকা হয়। ইহা শুনিয়া তাঁহারা সমবেত হইলেন। অতঃপর জিবরাঈল (আ) (ইমাম হিসাবে) তাঁহাকে লইয়া সালাত পড়িলেন এবং তিনি লোকদেরকে লইয়া সালাত আদায় করিলেন" (ফাতহুল বারী, ২খ)।
ইবন 'আবিদল বার এই প্রসঙ্গে বলেন:
لَمْ يُخْتَلِفْ أَنَّ جِبْرِيلَ هَبَطَ صَبِيحَةَ الإِسْرَاءِ عِنْدَ الزَّوَالِ فَعَلَّمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الصَّلاةَ وَمَوَاقِيْتَهَا وَهَيْئَتَهَا
"এই বিষয়ে কোন মতভেদ নাই যে, জিবরীল (আ) ইসরার ঘটনার পরবর্তী দিবসে সূর্য হেলিয়া যাওয়ার সময় অবতরণ করেন। অতঃপর তিনি নবী কারীম (স)-কে সালাত, উহার সময়সীমা এবং উহার প্রণালী শিক্ষা দান করেন" (মা'আরিফুস সুনান, ২খ)।
ইমাম তিরমিযী (R) তাঁহার সনদে নাফি ইব্ন জুবায়র ইব্ন মু'ইম (রা) হইতে বর্ণনা করেন:
لَمْ يُخْتَلِفِ أَنَّ جِبْرِيلَ هَبَطَ صَبِيحَةَ الإِسْرَاءِ عِنْدَ الزَّوَالِ فَعَلَّمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الصَّلاةَ وَمَوَاقِيْتَهَا وَهَيْئَتَهَا . "নাফি' (র) বলেন, আমাকে ইবন 'আব্বাস (রা) হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। নবী কারীম (স) বলিয়াছেন, জিবরাঈল (আ) কা'বার (দরজার) নিকট দুইবার (দুই দিন) আমার সালাতের ইমামতি করিয়াছেন। তিনি এই দুই দিনের প্রথম দিন যুহরের সালাত পড়াইয়াছেন যখন প্রতিটি বস্তুর ছায়া জুতার ফিতার পরিমাণ হইল" (আল-জামি লিত-তিরমিযী, ১খ)।
ইবন ইসহাক তাঁহার আস্-সীরাতুন নাবabiyyah গ্রন্থে বলেন:
إِنَّهُ نَزَلَ عِنْدَ زَوَالِ الشَّمْسِ وَلِذَا سُمِّيَتْ بِالْأُولَى. "সূর্য হেলিয়া যাওয়ার পর জিবরাঈল (আ) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট অবতরণ করেন। আর এই কারণেই ইহা (যুহর) প্রথম সালাত নামে অভিহিত হয়”।
জিবরাঈল (আ) ফজরের ওয়াক্তে না আসিয়া যুহরে ওয়াক্তে কেন আসিলেন ইহার ব্যাখ্যায় 'আলিমগণ বলেন:
১. ইসরা-এর প্রত্যুষে নবী কারীম (স) ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। এমতাবস্থায় জিবরাঈল (আ) তাঁহাকে জাগ্রত করা পছন্দ করেন নাই। কিন্তু এই ব্যাখ্যাটি যুক্তিসংগত নহে। এই ব্যাখ্যাকার লায়লাতুত-তা'রীসকে (لَيْلَةُ التَّعْريس) লায়তুল ইসরা (لَيْلَةُ الإسراء) -এর সঙ্গে গুলাইয় ফেলিয়াছেন। কেননা ফজরের সময় ঘুমাইয়া থাকার ঘটনাটি লায়লাতু'ত-তা'রীসে ঘটিয়াছিল, ইহা লায়লাতুল ইসরা-এ ঘটে নাই।
২. রাসূলুল্লাহ (স) ইসরা-এর ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পূর্ব হইতেই ফজর ও আসরের সালাত আদায় করিতেন (ফায়দুল বারী, ২খ)।
৩. মি'রাজ হইতে প্রত্যাবর্তনকালে নবী কারীম (স) মসজিদুল আকসায় আম্বিয়ায়ে কিরামগণের সহিত জামাআত সহকারে ফজরের সালাত আদায় করিয়াছিলেন (মা'আরিফুস সুনান, ২খ)।
📄 ফরয সালাতের রাক'আত-সংখ্যা নির্দ্ধারণ
ফরয সালাতের রাক'আত সংখ্যা কখন কিভাবে নির্ধারিত হইয়াছিল এই প্রসঙ্গে হযরত 'আইশা (রা)-এর হাদীছটি প্রণিধানযোগ্য:
عَنْ عَائِشَةَ أَمِّ الْمُؤْمِنِينَ قَالَتْ فَرَضَ اللهُ الصَّلاةَ حِيْنَ فَرَضَهَا رَكَعَتَيْنِ رَكَعَتَيْنِ فِي الْحَضَرِ وَالسَّفَرِ فَأَقِرَتْ صَلَاةُ السَّفَرِ وَزِيدَ فِي صَلَاةِ الْحَضَرِ.
"উম্মুল মুমিনীন 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা যখন সালাত ফরয করিলেন তখন আবাস-প্রবাস উভয় অবস্থায় দুই রাক'আত করিয়া ফরয করিলেন। অতঃপর সফরকালীন সময়ে সালাত পূর্বের ন্যায় বলবৎ রাখা হয়। আর আপন বসতিতে অবস্থানকালীন সময়ের সালাতকে বৃদ্ধি করা হয়” (বুখারী, ১খ)।
হাফিয ইবন হাজার 'আসকালানী (র) রাক'আতের সংখ্যা সম্পর্কে বিভিন্ন হাদীছ উল্লেখ করার পর বলেন:
وَالَّذِي يَظْهَرُ لِي وَبِهَا تَجْتَمِعُ الأَدلَّةُ السَّابِقَةُ أَنَّ الصَّلَوَاتِ فُرِضَتْ لَيْلَةَ الْإِسْرَاءِ رَكَعَتَيْنِ إِلَّا الْمَغْرِبَ ثُمَّ زِيدَتْ بَعْدَ الهِجْرَةِ عَقِبَ الهِجْرَةِ إِلَّا الصُّبْحَ كَمَا رَوَى ابْنُ خُزَيْمَةَ وَابْنُ حِبَّانٍ وَالْبَيْهَقِيُّ مِنْ طَرِيقِ الشَّعْبِي عَنْ مَسْرُوقٍ عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ فُرِضَتْ صَلَاةُ الْحَضَرِ وَالسَّفَرِ رَكْعَتَيْنِ رَكَعَتَيْنِ فَلَمَّا قَدِمَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ وَاطْمَأَنَّ زِيدَ فِي صَلَاةِ الْحَضَرِ رَكْعَتَانِ رَكْعَتَانِ وَتُرِكَتْ صَلَاةُ الْفَجْرِ لِطُولِ الْقِرَاءَةِ وَصَلَاةُ الْمَغْرِبِ لِأَنَّهَا وَتْرُ النَّهَارِ.
"আমার নিকট যাহা প্রতিভাত হয় এবং এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে উপযুক্ত দলীলসমূহের মধ্যেও সমন্বয় সাধিত হইবে তাহা এই লায়লাতুল ইসরা-এ সালাতসমূহকে দুই দুই রাক'আত করিয়াই ফরয করা হয়। তবে মাগরিব ছিল ইহার ব্যতিক্রম। অতঃপর মদীনায় হিজরতের পর ফজর ছাড়া অন্যান্য সালাতের রাক'আত সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। ইবন খুযায়মা, ইবন হিব্বান ও বায়হাকী শা'বীর সনদে মাসরূক হইতে এবং তিনি হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবাসে ও প্রবাসে সালাত দুই দুই রাক'আত করিয়া ফরয করা হয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) যখন মদীনায় আগমন করেন এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিলেন ও স্থির হইলেন তখন আবাসের সালাত দুই দুই রাক'আত করিয়া বৃদ্ধি করা হয়। তবে ফজরের সালাতে দীর্ঘ কিরাআত পাঠের কারণে উহাকে এবং মাগরিবের সালাতকে দিবসের বেজোড় হওয়ার কারণে পূর্ববৎ রাখিয়া দেওয়া হয়" (ফাতহুল বারী, ১খ)।
অতঃপর ইবন হাজার (র) আরও বলেন:
ثُمَّ بَعْدَ أَنْ اسْتَقَرَّ فَرْضُ الرُّبَاعِيَّةِ خُفِّفَ مِنْهَا فِي السَّفَرِ عِنْدَ نُزُولِ قَوْلِهِ تَعَالَى فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلاةِ.
"চার রাক'আত বিশিষ্ট ফরয সালাতের বিষয়টি সুস্থির হওয়ার পর প্রবাসকালীন অবস্থায় উহাকে হালকা করা হয় এবং রাক'আত সংখ্যা হ্রাস করা হয়। আর ইহা তখনই করা হয়, যখন আল্লাহ তা'আলার বাণী, "যখন তোমরা কোন দেশ-বিদেশে সফর করিবে তখন নামাযে কিছুটা হ্রাস করিলে তোমাদের কোন দোষ নাই" (৪: ১০১) নাযিল হয়”।
ইবনুল আছীরে মতে, হিজরী চতুর্থ সালে কসরের হুকুম নাযিল হয়। 'আল্লামা দাওলাবী (র)-এর মতে এই হুকুম হিজরী দ্বিতীয় বর্ষের রবীউল আখির মাসে নাযিল হয়। 'আল্লামা সুহায়লী হিজরতের এক বৎসর বা তাহার কাছাকাছি সময় পর নাযিল হইয়াছে বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। কাহারও মতে এই হুকুম হিজরতের চল্লিশ দিবস পর নাযিল হয় (ফাতহুল বারী, ১খ)।
সালাতুল-জুমু'আও একটি ফরয সালাত। ইবনুল হুমাম বলেন:
إِنَّ الْجُمُعَةَ فَرِيضَةٌ مُحْكَمَةٌ بِالْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ وَالْإِجْمَاعِ.
"জুমু'আর নামায সুপ্রতিষ্ঠিত একটি ফরয; কিতাব, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত” (ইবনুল হুমাম, ফাতুহুল কাদীর, ২খ)।
নবী কারীম (স) মক্কায় ইহা আদায় করিতে সক্ষম হন নাই। মদীনায় আগমনের পর তিনি কুবা-এ চৌদ্দ দিন অবস্থান করেন। এই সময় তিনি জুমু'আ পড়েন নাই। সর্বপ্রথম তিনি মদীনার বানু সালিম মহল্লায় জুমু'আ সালাত আদায় করেন (ফায়দুল বারী, ২খ)।
ইবন সীরীন (র)-এর মতে, মহানবী (স)-এর মদীনায় আগমনের পূর্বে সাহাবীগণ জুমু'আ আদায় করেন। রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা শরীফে থাকিতেই জুমু'আর সালাতের অনুমতি পাইয়াছিলেন, কিন্তু সেখানে উহা আদায় করা সম্ভব হয় নাই। সাহাবীগণই এই দিবসকে জুমু'আ দিবস বলিয়া নামকরণ করেন।
ভিন্নমতে আনসারগণ বলিলেন, ইয়াহুদীরা সপ্তাহে একটি দিনে সমবেত হয়। নাসারাগণও সপ্তাহে একটি দিনে মিলিত হয়। আমরাও অনুরূপভাবে একটি দিনে মিলিত হইতে চাই। তাঁহারা হযরত আসআদ-এর নিকট গমন করেন। তিনি তাহাদিগকে লইয়া দুই রাক'আত সালাত আদায় করেন এবং ইহাকে জুমু'আ নামে অভিহিত করেন। তিনি ঐ দিবসে একটি ছাগল যবাহ করেন এবং সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁহারা ইহার গোশত খাইলেন (ই. বি., ১১খ)। কারণ ঐ সময় তাঁহারা সংখ্যায় কম ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা নাযিল করেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا البَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ.
"মু'মিনগণ! জুমু'আর দিন যখন সালাতের জন্য আহবান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহ্ স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। ইহাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি কর" (৬২: ৯) (আয়নী, ৫খ)।
শাহ ওয়ালিয়্যুল্লাহ (র) বলেন:
وَخَصَّ اللهُ تَعَالَى هَذِهِ الْأُمَّةَ بِعِلْمٍ عَظِيمٍ نَفَشَهُ أَوْلاً فِي صُدُورِ أَصْحَابِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى أَقَامُوا الْجُمُعَةَ فِي المَدِينَةِ قَبْلَ مَقْدَمِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
"আল্লাহ তা'আলা এই উম্মাকে একটি মহান জ্ঞান দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেন। এই জ্ঞান তিনি প্রথমে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবীগণের অন্তরে নিক্ষেপ করেন। ফলে তাঁহারা নবী কারীম (স)-এর আগমনের পূর্বেই মদীনাতে জুমু'আর নামায কায়েম করিলেন" (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, ২খ)।
📄 দাওয়াতের প্রতিক্রিয়া ও কাফিরদের নির্যাতন
পৃথিবীতে যুগে যুগে নবী-রসূলগণ (আ) আগমন করিয়াছেন হেদায়াতের বাণী লইয়া। তাঁহাদের মিশন ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীর মানুষকে আলোর পথে আনয়ন করা, পুঞ্জীভূত কুসংস্কাররাশি বিদূরিত করিয়া তাহাদিগকে স্রষ্টার নির্দেশিত কল্যাণের পথ সিরাতুল মুস্তাকীমের উপর প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু এই পথটি মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। যেহেতু তাঁহাদিগকে নানা দেশাচার, প্রতিষ্ঠিত রীতিনীতি, কায়েমী স্বার্থ এবং প্রবৃত্তি পূজার বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করিতে হইত, এমনকি প্রয়োজনে জিহাদে অবতীর্ণ হইতে হইত, তাই চিরদিনই প্রবৃত্তিপূজারী, দেশাচার ও কুপ্রথার অনুসারী ও কায়েমী স্বার্থবাদীরা তাঁহাদের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইয়াছে, তাঁহাদের উপর নির্যাতনের স্টীমরোলার চালাইয়াছে, এমনকি তাঁহাদিগকে হত্যা করিতেও কুণ্ঠাবোধ করে নাই। এই কথারই অভিব্যক্তি ঘটিয়াছে আল-কুরআনের নিম্নের বাণীতে:
يَا حَسْرَةً عَلَى الْعِبَادِ مَا يَأْتِيهِمْ مِّنْ رَّسُولِ الأَ كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِؤُنَ. "পরিতাপ বান্দাদের জন্য! উহাদের নিকট যখনই কোন রাসূল আসিয়াছে তখনই উহারা তাহাকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিয়াছে" (৩৬: ৩০)।
كُلَّمَا جَاءَهُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَى أَنْفُسُهُمْ فَرِيقًا كَذَّبُوا وَفَرِيقًا يَقْتُلُونَ. "যখনই কোন রাসূল তাহাদের নিকট এমন কিছু লইয়া আসে যাহা তাহাদের মনঃপূত নয়, তখনই তাহারা কতককে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করে এবং কতককে হত্যা করে" (৫ঃ ৭০)।
হযরত নূহ্ আলায়হিস্ সালামের প্রতি তাঁহার সম্প্রদায়ের দুর্ব্যবহার এবং পরিণামে মহাপ্লাবনে তাহাদের ধ্বংস হওয়া, হযরত মূসা ও হারুন (আ) নবী ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রতি ফেরাউন ও তদীয় পারিষদদের দুর্ব্যবহার ও লোহিত সাগরে তাহাদের ডুবিয়া মরা, ইবরাহীম (আ)-কে নমরূদের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ এবং পরিণামে তাহার ধ্বংস হওয়া, হযরত লূত, হযরত হূদ ও হযরত সালিহ্ ও শু'আয়ব (আ)-এর কওমসমূহের তাহাদের নবীর প্রতি দুর্ব্যবহার ও শাস্তি ভোগ, হযরত যাকারিয়া (আ)-এর স্ব-সম্প্রদায়ের হাতে নির্দয়ভাবে নিহত হওয়ার বিশদ বিবরণ কুরআন শরীফের বিভিন্ন সূরায় বর্ণিত হইয়াছে।
সূরা বাকারার উপর্যুপরি কয়েকটি আয়াতে নবীগণকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করা ও তাহাদিগকে হত্যা করা সংক্রান্ত বর্ণনা দিয়া আল্লাহ তা'আলা ঐ মিথ্যা প্রতিপন্নকারী ও নির্যাতনকারীদের ভয়াবহ পরিণতির কথাও উল্লেখ করিয়াছেন এইভাবে:
وَلَقَدْ أَتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ وَأَتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنُهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ أَفَكَلَّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَى أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ. وَقَالُوا قَلُوبُنَا غُلْفٌ بَلْ لَّعَنَهُمُ اللهُ بِكُفْرِهِمْ فَقَلِيْلًا مَّا يُؤْمِنُونَ. وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِّنْ عِنْدِ اللهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُوْنَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ فَلَعْنَةُ اللهِ عَلَى الْكَافِرِينَ، بِئْسَمَا اشْتَرَوْا بِهِ أَنْفُسَهُمْ أَنْ يَكْفُرُوا بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ بَغْيًا أَنْ يُنَزِّلَ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ عَلَى مَنْ يَّشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ فَبَاءُوا بِغَضَبٍ عَلَى غَضَبٍ وَالْكَافِرِينَ عَذَابٌ مُّهِينٌ. وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا نُؤْمِنُ بِمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا وَيَكْفُرُونَ بِمَا وَرَاءَهُ وَهُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِمَا مَعَهُمْ قُلْ فَلِمَ تَقْتُلُونَ أَنْبِيَاءَ اللَّهُ مِنْ قَبْلُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ.
"এবং নিশ্চয় আমি মূসাকে কিতাব দিয়াছি এবং তাহার পরে পর্যায়ক্রমে রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছি, মারয়াম-তনয় 'ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ দিয়াছি এবং 'পবিত্র আত্মা' দ্বারা তাহাকে শক্তিশালী করিয়াছি। তবে কি যখনই কোন রাসূল তোমাদের নিকট এমন কিছু আনিয়াছে যাহা তোমাদের মনঃপূত নহে তখনই তোমরা অহংকার করিয়াছ আর কতককে অস্বীকার করিয়াছ এবং কতককে হত্যা করিয়াছ? তাহারা বলিয়াছিল, আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত, বরং কুফরীর জন্য আল্লাহ তাহাদিগকে লা'নত করিয়াছেন। সুতরাং তাহাদের অল্প সংখ্যকই ঈমান আনে। তাহাদের নিকট যাহা আছে আল্লাহ্র নিকট হইতে তাহার সমর্থক কিতাব আসিল, যদিও পূর্বে সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের বিরুদ্ধে তাহারা ইহার সাহায্যে বিজয় প্রার্থনা করিত, তবুও তাহারা যাহা জ্ঞাত ছিল উহা যখন তাহাদের নিকট আসিল তখন তাহারা উহা প্রত্যাখ্যান করিল। সুতরাং কাফিরদের প্রতি আল্লাহ্র লা'নত। উহা কত নিকৃষ্ট যাহার বিনিময়ে তাহারা তাহাদের আত্মাকে বিক্রয় করিয়াছে- উহা এই যে, আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন, জিদের বশবর্তী হইয়া তাহারা তাহাকে প্রত্যাখ্যান করিত শুধু এই কারণে যে, আল্লাহ তাঁহার বান্দাদের মধ্য হইতে যাহাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন। সুতরাং তাহারা ক্রোধের উপর ক্রোধের পাত্র হইল। কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি রহিয়াছে। এবং যখন তাহাদিগকে বলা হয়, আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন তাহাতে ঈমান আনয়ন কর, তাহারা বলে, আমাদের প্রতি যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে আমরা তাহাতে বিশ্বাস করি। অথচ তাহা ব্যতীত সব কিছুই তাহারা প্রত্যাখ্যান করে, যদিও উহা সত্য এবং যাহা তাহাদের নিকট আছে তাহার সমর্থক। বল, যদি তোমরা মু'মিন হইতে তবে কেন তোমরা অতীতে আল্লাহ্ নবীগণকে হত্যা করিয়াছিলে" (২:৮৭-৯১)?
উক্ত আয়াতসমূহ এবং এই জাতীয় কুরআন-হাদীছের আরও বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ রিসালাতের মত মহান মর্যাদা কেন বানু ইসরাঈল বংশে না দিয়া ইসমাঈল বংশে দান করিলেন অথবা কেন তাঁহার নির্বাচিত বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে দান করিলেন, ইহা অবিশ্বাসীদের একটা ঈর্ষার কারণও ছিল। এইজন্য বুঝিয়া শুনিয়া তাহারা নষী-রসূলদের প্রতি, বিশেষত শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্ (স)-এর প্রতি অন্তরে বিদ্বেষ পোষণ করিত। এজন্য সাধারণভাবে সকল নবী-রাসূলকে, বিশেষত বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-কেই নির্যাতনের শিকার হইতে হয়। তাই নবী কারীম (স) বলেন:
"اَشَدُّ النَّاسِ ابْتِلاء الانبياء ثم امثلهم ثم امثلهم" “সবচেয়ে কঠোর পরীক্ষা গিয়াছে নবী-রাসূলগণের উপর, তারপর তাহাদের সহিত যাহাদের সামঞ্জস্য সর্বাধিক তাহাদের উপর, তারপর তাহাদের সহিত যাহাদের সর্বাধিক সামঞ্জস্য তাহাদের উপর” (মুসনাদে আহমাদ, ৬খ; ১খ; আরও দ্র. বুখারী, কিতাবুল মারদা; ইব্ন মাজা, ফিতান; সুনানুদ দারিমী, রিকাক)।
উপরিউক্ত আয়াতসমূহের বর্ণনা আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের উপর বিশেষভাবে প্রযোজ্য। কেননা তাহারা তাহাদের নবী-রাসূলগণের যুগে এবং তাঁহাদের উপর নাযিলকৃত কিতাবসমূহের মাধ্যমে শেষ নবীর আগমন সংবাদ নিশ্চিতভাবে অবগত ছিল। আল-কুরআন ভাষায়:
الَّذِينَ أَتَيْنَهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَانَهُمْ.
“আমি যাহাদিগকে কিতাব দিয়াছি তাহারা তাহাকে সেইরূপ জানে যেইরূপ তাহারা তাহাদের সন্তানগণকে চিনে” (২: ১৪৬)।
এতদসত্ত্বেও তাহারা জানিয়া শুনিয়া সত্য প্রত্যাখ্যান করিত এবং নবী করীম (স)-কে নানাভাবে কায়ক্লেশে জর্জরিত করিত। কিন্তু কিতাবীদের এই বিদ্বেষ ও নির্যাতনের শিকার নবী করীম (স) প্রথম যুগে হন নাই, এমনকি নবুওয়াত লাভের প্রথম তিন বৎসর পর্যন্ত তাঁহার নিজ সম্প্রদায়ও তাঁহার প্রতি রুষ্ট বা বিদ্বিষ্ট ছিল বলিয়া তেমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি সর্বপ্রথম নির্যাতন শুরু হয় তাঁহার নবুওয়াত লাভের তিন বৎসর পর যখন তাঁহার প্রতি আয়াত নাযিল হইল:
وَانْذِرْ عَشِيْرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ.
“(হে রাসূল) তোমার নিকটাত্মীয়দিগকে সতর্ক করিয়া দাও” (২৬: ২১৪) আরো নাযিল হইল:
فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ.
"অতএব তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হইয়াছ তাহা প্রকাশ্যে প্রচার কর" (১৫: ৯৪)।
হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, যখন وَأَنْذِرْ عَشِيْرَتَكَ الْأَقْرَبَيْنَ আয়াত অবতীর্ণ হইল তখন রাসূলুল্লাহ (স) সাফা পাহাড়ের উপর আরোহণ করিয়া লোকজনকে উচ্চ কণ্ঠে আহ্বান জানাইলেন: 'হে ফিহরের বংশধরগণ! হে কুরাইশ বংশীয় আদীর বংশধরগণ!' তাঁহার এইরূপ আকুল আহ্বান শুনিয়া লোকজন সমবেত হইল। তখন তিনি বলিলেন: 'আচ্ছা! আমি যদি তোমাদিগকে সংবাদ দেই যে, পাহাড়ের ঐদিকে একটি অশ্বারোহী বাহিনী তোমাদের উপর হামলার জন্য উদ্যত, তাহা হইলে তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করিবে?' তাহারা জবাব দিল, 'আলবৎ। কেননা আমরা তো তোমাকে কোন দিন সত্য ছাড়া মিথ্যা বলিতে উনি নাই।' তখন তিনি বলিলেন : আমি তোমাদিগকে অতি নিকটের এক কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করিতেছি। তখন আবু লাহাব বলিয়া উঠিল:
তব্ বান লাকা লি হাজা জামাতনা ?
‘তুমি ধ্বংস হও হে মুহাম্মাদ! এই কথাটি বলিবার জন্যই কি তুমি আমাদিগকে সমবেত করিয়াছ?’ তখনই নাযিল হয় : তাব্বাত ইয়াদা আবি লাহাবিওঁ ওয়া তাব্বা (ধ্বংস হউক আবু লাহাবের দুই হস্ত এবং ধ্বংস হউক সে নিজেও; ১১১ সূরা লাহাব), বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, তাফসীর অধ্যায়, (২খ; ১২খ; কিতাবুল মুস্তাফা, মুহাম্মাদ খালীদ আল-খাতিব সংকলিত, মিসর)।
এই ঘটনার অপর অংশে ইমাম মুসলিম (র) তদীয় ‘সহীহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এই সংক্রান্ত হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন, এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার স্বজনদিগকে আহবান করিলেন ও বলিলেন, “হে কুরায়শ দল! তোমরা নিজদিগকে (জাহান্নাম হইতে) রক্ষা কর। হে বানু ফিহর! নিজেদের জাহান্নাম হইতে রক্ষা কর। আমি তোমাদিগকে আল্লাহর শান্তি হইতে রক্ষা করিতে পারিব না। হে মুহাম্মাদ তনয়া ফাতিমা! নিজেকে জাহান্নাম হইতে বাঁচাও। আমি তোমাদিগকে আল্লাহর শাস্তি হইতে রক্ষা করিতে পারিব না” (দ্র. সহীহ মুসলিম, ১খ; সহীহ বুখারী, ১খ)।
📄 আত্মীয়-স্বজনকে প্রথম আনুষ্ঠানিক দাওয়াত
দাওয়াত পেশ করা সম্পর্কে আল-কুরআনের নির্দেশ যেহেতু
উদউ ইলা সাবিলি রব্বিকা বিল হিকমাতি ওয়াল মুওয়াজাতিল হাছানাতি ওয়া জাদালহুম বিল্লাতি হিয়া আহসানু।
“তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং উহাদের সহিত তর্ক করিবে উত্তম পন্থায়” (১৬:১২৫), তাই নবী করীম (স) তাঁহার নিকটাত্মীয়গণকে দাওয়াত পেশ করিবার ব্যাপারে যে হিকমত অবলম্বন করিবেন, তাহাই ছিল স্বাভাবিক। তিনি তাহাদিগকে দাওয়াত পেশ করিবার উদ্দেশ্যে একটি ভোজসভার আয়োজন করিলেন এবং তাহাতে তাঁহার নবীসুলভ মুজিযারও অভিব্যক্তি ঘটিল। ইবন ইসহাক ও বায়হাকী হযরত আলী (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বর্ণনা করিয়াছেন: নবী করীম (স)-এর প্রতি আয়াত নাযিল হইলে নবী করীম (স) আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে আলী! ছাগলের একটি আস্ত রান এবং এক সা' (প্রায় সোয়া তিন কেজি পরিমাণ) শস্য দ্বারা তুমি খাবারের আয়োজন কর এবং দুধের একটি বড় পেয়ালা প্রস্তুত রাখ। তারপর মুত্তালিব বংশের লোকজনদের একত্র কর। আমি তাঁহার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করিলাম। প্রায় চল্লিশজন লোক সমবেত হইল। তাহাদের মধ্যে তদীয় পিতৃব্য আবু তালিব, হামযা, আব্বাস এবং আবু লাহাবও ছিলেন। আমি খাদ্য ভর্তি পাত্র তাহাদের সম্মুখে উপস্থিত করিলাম। মহানবী (স) পেয়ালা হইতে গোশতের একটি টুকরা উঠাইয়া নিজের পবিত্র দন্ত দ্বারা একটু চিবাইয়া পুনরায় উক্ত পেয়ালায় রাখিয়া দিলেন। তারপর উপস্থিত লোকজনকে আল্লাহ্ নামে খাদ্য গ্রহণ করিতে আহ্বান জানাইলেন। সকলেই তৃপ্তির সহিত তাহা খাইল। অথচ তাহাতে খাদ্যের পরিমাণ এতই স্বল্প ছিল যে, তাহাদের এক ব্যক্তিই তাহা খাইয়া শেষ করিত পারিত।
তারপর মহানবী (স) বলিলেন, আলী! ইহাদিগকে দুধ পান করিতে দাও। আমি তাহাদিগকে দুধ পান করিতে দিলাম। তাহারা সকলেই তৃপ্তির সহিত দুধ পান করিল, অথচ আল্লাহ্র কসম! তাহাদের মধ্যকার কোন এক ব্যক্তিই এই দুধটুকু সাবাড় করিয়া ফেলিতে পারিত। কেননা এক পেয়ালা দুধ যে কোন এক ব্যক্তিই পান করিতে পারে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তাহা সকলের জন্যই যথেষ্ট হইয়া গেল। তারপর মহানবী (স) যখন কিছু বলিতে যাইবেন তখনই আবু লাহাব বলিয়া উঠিল, উঠ! আমরা প্রস্থান করি। মুহাম্মাদ আজ তোমাদের খাদ্যের উপর যে জাদুর খেলা দেখাইল, এমনটি তো আর কোন দিন আমরা দেখি নাই। তাহার একথায় সত্যসত্যই সকলে প্রস্থান করিল। সেদিন আর মহানবী (স)-এর দাওয়াত পেশ করা সম্ভবপর হইল না।
পরদিন মহানবী (স) হযরত আলী (রা)-কে পুনরায় অনুরূপ খাদ্য প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। লোকজন পুনরায় সমবেত হইল। আহারপর্ব শেষ হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: "আমি আপনাদের সম্মুখে যাহা পেশ করিয়াছি, কোন ব্যক্তি তাহার সম্প্রদায়ের সম্মুখে ইহার চেয়ে উত্তম কিছু পেশ করিতে পারে নাই। আমি আপনাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সংবাদ নিয়া আসিয়াছি” (দ্র. আল-খাসাইসুল কুরা; সুয়ূতী, ১খ, পৃ. ১২৩; ইবন ইসহাক, বায়হাকী ও আবূ নুআয়মের বরাতে সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ, পৃ. ১৭৩)।
ঐতিহাসিক ইবনুল আছীর রাসূলুল্লাহ (স)-এর আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মীয়-স্বজনকে প্রথম দাওয়াত পেশের ঘটনাটি বর্ণনা করিয়াছেন। সাথে সাথে তিনি আবু লাহাবের প্রথম বৈরিতা প্রকাশ ও কঠোর বিরোধিতার কথাটিও তুলিয়া ধরিয়াছেন এইভাবে: আত্মীয়-পরিজনদিগকে সতর্ক করার নির্দেশ সম্বলিত আয়াত নাযিল হইলে সর্বপ্রথম নবী করীম (স) হাশিম বংশীয়দিগকে একত্র করিলেন। বানু মুত্তালিব ইব্ন আবদে মানাফের একটি দলও তাহাতে শামিল ছিল। সর্বসাকুল্যে পঁয়তাল্লিশ ব্যক্তি ঐ সমাবেশে হাযির ছিল। কিন্তু আবু লাহাবই অগ্রসর হইয়া বলিয়া উঠিল,
"দেখ, ইহারা তোমার চাচা ও চাচাতো ভাই! কথা বল এবং (মূর্তি পূজায় অবিশ্বাসী) সাবেয়ীদের পথ পরিহার কর! জানিয়া রাখ, তোমার গোত্রের গোটা আরব জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সামর্থ্য নাই। আমিই তোমাকে পাকড়াও করার সর্বাধিক হকদার। তোমাকে দমনের জন্য তোমার পিতৃকুলই যথেষ্ট। যদি তুমি তোমার বক্তব্যে অটল থাক, তাহা হইলে গোটা কুরায়শকুল তোমার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িবে। অন্যান্য আরব গোত্র এ ব্যাপারে তাহাদের সাহায্যার্থে আগাইয়া আসিবে। আপন পিতৃকুলের জন্য তোমার মত এমন অনর্থ আনয়নকারী লোক আমি দেখি নাই।"
রাসূলুল্লাহ্ (স) তখন চুপ হইয়া গেলেন এবং এই মজলিসে একটি কথাও উচ্চারণ করিলেন না। পরদিন পুনারয় তিনি তাহাদিগকে সমবেত করিলেন এবং বলিলেন:
الحمد لله احمده সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্। আমি তাঁহার স্তুতিগান ও মহিমা কীর্তন করি।
واستعينه এবং আমি তাঁহারই সাহায্য প্রার্থনা করি।
وأؤمن به এবং তাঁহারই প্রতি আমি ঈমান রাখি।
واتوكل عليه এবং তাঁহারই উপর আমি ভরসা করি।
واشهد ان لا اله الا الله وحده لا شريك له এবং আমি সাক্ষ্য দেই যে, এক আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই তাঁহার কোন শরীক নাই।
ان الرائد لا يكذب اهله অতঃপর তিনি বলিলেন: পথপ্রদর্শক তাহার আপনজনদিগকে মিথ্যা বলিতে পারে না।
والله الذي لا اله الا هو আর আল্লাহ্ সেই পবিত্র সত্তা যিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই,
انی رسول الله اليكم خاصة والى الناس عامة নিশ্চয় আমি আল্লাহ্র রসূল বিশেষত তোমাদের প্রতি এবং সাধারণভাবে গোটা মানবজাতির প্রতি।
والله لتموتن كما تنامون আল্লাহ্র কসম! নিশ্চয় তোমরা মৃত্যুবরণ করি যেমন তোমরা নিদ্রার কোলে ঢলিয়া পড়
ولتبعثن كما تستيقظون এবং নিশ্চয় তোমরা পুনরুত্থিত হইবে যেমন তোমরা নিদ্রা হইতে জাগ্রত হইয়া থাক।
ولتحاسين بما تعملون এবং অবশ্যই তোমাদের কৃতকর্মের হিসাব-নিকাশ নেওয়া হইবে।
وانما الجنة ابدا والنار ابدا . এবং সুনিশ্চিতভাবেই জান্নাত চিরস্থায়ী এবং জাহান্নামও চিরস্থায়ী।
তখন আবূ তালিব বলিয়া উঠিলেন, আমার নিকট তোমার সাহায্য-সহযোগিতা কতই না প্রিয়! আমি তোমার উপদেশাবলী সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করিলাম এবং তোমার কথায় পূর্ণ আস্থা স্থাপন করিলাম। আর এখানে তোমার পিতৃকূলের লোকজন উপস্থিত রহিয়াছে। আমি তো তাহাদেরই একজন। তবে আমি সর্বাগ্রে তোমার প্রিয় মিশনকে স্বাগত জানাই। তুমি যে ব্যাপারে আদিষ্ট হইয়াছ তাহা চালাইয়া যাও! আল্লাহ্র কসম! আমি সর্বদা তোমার সাহায্য-সহযোগিতা করিব ও তোমার হেফাযতের ব্যাপারে যত্নবান থাকিব। তবে আবদুল মুত্তালিবের দীন ছাড়িতে আমার মন সায় দেয় না। তখন আবু লাহাব বলিয়া উঠিল, আল্লাহ্র কসম! ইহা একটি মন্দ সিদ্ধান্ত। অন্যরা পাকড়াও করার পূর্বে তোমরা নিজেরাই বরং তাহাকে পাকড়াও কর ও নিবৃত্ত কর। তখন আবূ তালিব বলিলেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই আজীবন তাঁহাকে অনিষ্টকারীদের হাত হইতে রক্ষা করিয়া যাইব (আর-রাহীকুল মাখতুম, ১ম মুদ্রণ, মক্কা মুকাররামা ১৪০০/১৯৮০; ইবনুল আছীর, ফিক্হস সীরাঃ, পৃ. ৭৭-৭৮-এর বরাতে)।
উক্ত বর্ণনায় আবু লাহাবের সর্বপ্রথম বৈরিতার কথা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হইয়াছে। উক্ত ঘটনার উপর মন্তব্য করিতে গিয়া আল্লামা ইদরীস কান্দেহলভী (র) লিখেন, "আবূ লাহাব যদিও সম্পর্কে নবী করীম (স)-এর চাচা ছিল, তবুও আল্লাহ্ নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, তাঁহার প্রতি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও বিদ্বেষ-বৈরিতার ক্ষেত্রে সে ছিল সকলের অগ্রণী। এই বিদ্বেষ ও বৈরিতার জন্যই সে তাহার পুত্রদ্বয় উৎবা ও উতায়বাকে নবী-নন্দিনী রুকাইয়া ও উম্মে কুলছুম (রা)-কে তালাক দিতে বাধ্য করে, যাহাতে নবী করীম (স) মর্মযাতনায় দগ্ধ হন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উহাও কালক্রমে আল্লাহর মহান রহমতরূপে প্রতিপন্ন হয়। কেননা পরবর্তী কালে উক্ত দুইজন নবী দুহিতা পর্যায়ক্রমে হযরত উছমান (রা)-এর সহিত পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। ফলে হযরত উসমান 'যুন্-নূরায়ন' বা যুগল জ্যোতির অধিকারী হন। এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী-রসূলের অগণিত সাহাবীগণের মধ্যে একমাত্র হযরত উছমানই কোন নবীর দুইজন কন্যার স্বামী হওয়ার গৌরব লাভ করেন (দ্র. সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ, পৃ.১৭৪)।
দাওয়াত পেশ করা সম্পর্কে আল-কুরআনের নির্দেশ যেহেতু উদউ ইলা সাবিলি রব্বিকা বিল হিকমাতি ওয়াল মুওয়াজাতিল হাছানাতি ওয়া জাদালহুম বিল্লাতি হিয়া আহসানু। “তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং উহাদের সহিত তর্ক করিবে উত্তম পন্থায়” (১৬:১২৫), তাই নবী করীম (স) তাঁহার নিকটাত্মীয়গণকে দাওয়াত পেশ করিবার ব্যাপারে যে হিকমত অবলম্বন করিবেন, তাহাই ছিল স্বাভাবিক। তিনি তাহাদিগকে দাওয়াত পেশ করিবার উদ্দেশ্যে একটি ভোজসভার আয়োজন করিলেন এবং তাহাতে তাঁহার নবীসুলভ মুজিযারও অভিব্যক্তি ঘটিল। ইবন ইসহাক ও বায়হাকী হযরত আলী (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বর্ণনা করিয়াছেন: নবী করীম (স)-এর প্রতি আয়াত নাযিল হইলে নবী করীম (স) আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে আলী! ছাগলের একটি আস্ত রান এবং এক সা' (প্রায় সোয়া তিন কেজি পরিমাণ) শস্য দ্বারা তুমি খাবারের আয়োজন কর এবং দুধের একটি বড় পেয়ালা প্রস্তুত রাখ। তারপর মুত্তালিব বংশের লোকজনদের একত্র কর। আমি তাঁহার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করিলাম। প্রায় চল্লিশজন লোক সমবেত হইল। তাহাদের মধ্যে তদীয় পিতৃব্য আবু তালিব, হামযা, আব্বাস এবং আবু লাহাবও ছিলেন। আমি খাদ্য ভর্তি পাত্র তাহাদের সম্মুখে উপস্থিত করিলাম। মহানবী (স) পেয়ালা হইতে গোশতের একটি টুকরা উঠাইয়া নিজের পবিত্র দন্ত দ্বারা একটু চিবাইয়া পুনরায় উক্ত পেয়ালায় রাখিয়া দিলেন। তারপর উপস্থিত লোকজনকে আল্লাহ্ নামে খাদ্য গ্রহণ করিতে আহ্বান জানাইলেন। সকলেই তৃপ্তির সহিত তাহা খাইল। অথচ তাহাতে খাদ্যের পরিমাণ এতই স্বল্প ছিল যে, তাহাদের এক ব্যক্তিই তাহা খাইয়া শেষ করিত পারিত। তারপর মহানবী (স) বলিলেন, আলী! ইহাদিগকে দুধ পান করিতে দাও। আমি তাহাদিগকে দুধ পান করিতে দিলাম। তাহারা সকলেই তৃপ্তির সহিত দুধ পান করিল, অথচ আল্লাহ্র কসম! তাহাদের মধ্যকার কোন এক ব্যক্তিই এই দুধটুকু সাবাড় করিয়া ফেলিতে পারিত। কেননা এক পেয়ালা দুধ যে কোন এক ব্যক্তিই পান করিতে পারে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তাহা সকলের জন্যই যথেষ্ট হইয়া গেল। তারপর মহানবী (স) যখন কিছু বলিতে যাইবেন তখনই আবু লাহাব বলিয়া উঠিল, উঠ! আমরা প্রস্থান করি। মুহাম্মাদ আজ তোমাদের খাদ্যের উপর যে জাদুর খেলা দেখাইল, এমনটি তো আর কোন দিন আমরা দেখি নাই। তাহার একথায় সত্যসত্যই সকলে প্রস্থান করিল। সেদিন আর মহানবী (স)-এর দাওয়াত পেশ করা সম্ভবপর হইল না। পরদিন মহানবী (স) হযরত আলী (রা)-কে পুনরায় অনুরূপ খাদ্য প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। লোকজন পুনরায় সমবেত হইল। আহারপর্ব শেষ হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: "আমি আপনাদের সম্মুখে যাহা পেশ করিয়াছি, কোন ব্যক্তি তাহার সম্প্রদায়ের সম্মুখে ইহার চেয়ে উত্তম কিছু পেশ করিতে পারে নাই। আমি আপনাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সংবাদ নিয়া আসিয়াছি” (দ্র. আল-খাসাইসুল কুরা; সুয়ূতী, ১খ, পৃ. ১২৩; ইবন ইসহাক, বায়হাকী ও আবূ নুআয়মের বরাতে সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ, পৃ. ১৭৩)। ঐতিহাসিক ইবনুল আছীর রাসূলুল্লাহ (স)-এর আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মীয়-স্বজনকে প্রথম দাওয়াত পেশের ঘটনাটি বর্ণনা করিয়াছেন। সাথে সাথে তিনি আবু লাহাবের প্রথম বৈরিতা প্রকাশ ও কঠোর বিরোধিতার কথাটিও তুলিয়া ধরিয়াছেন এইভাবে: আত্মীয়-পরিজনদিগকে সতর্ক করার নির্দেশ সম্বলিত আয়াত নাযিল হইলে সর্বপ্রথম নবী করীম (স) হাশিম বংশীয়দিগকে একত্র করিলেন। বানু মুত্তালিব ইব্ন আবদে মানাফের একটি দলও তাহাতে শামিল ছিল। সর্বসাকুল্যে পঁয়তাল্লিশ ব্যক্তি ঐ সমাবেশে হাযির ছিল। কিন্তু আবু লাহাবই অগ্রসর হইয়া বলিয়া উঠিল, "দেখ, ইহারা তোমার চাচা ও চাচাতো ভাই! কথা বল এবং (মূর্তি পূজায় অবিশ্বাসী) সাবেয়ীদের পথ পরিহার কর! জানিয়া রাখ, তোমার গোত্রের গোটা আরব জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সামর্থ্য নাই। আমিই তোমাকে পাকড়াও করার সর্বাধিক হকদার। তোমাকে দমনের জন্য তোমার পিতৃকুলই যথেষ্ট। যদি তুমি তোমার বক্তব্যে অটল থাক, তাহা হইলে গোটা কুরায়শকুল তোমার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িবে। অন্যান্য আরব গোত্র এ ব্যাপারে তাহাদের সাহায্যার্থে আগাইয়া আসিবে। আপন পিতৃকুলের জন্য তোমার মত এমন অনর্থ আনয়নকারী লোক আমি দেখি নাই।" রাসূলুল্লাহ্ (স) তখন চুপ হইয়া গেলেন এবং এই মজলিসে একটি কথাও উচ্চারণ করিলেন না। পরদিন পুনারয় তিনি তাহাদিগকে সমবেত করিলেন এবং বলিলেন: الحمد لله احمده সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্। আমি তাঁহার স্তুতিগান ও মহিমা কীর্তন করি। واستعينه এবং আমি তাঁহারই সাহায্য প্রার্থনা করি। وأؤمن به এবং তাঁহারই প্রতি আমি ঈমান রাখি। وأتوكل عليه এবং তাঁহারই উপর আমি ভরসা করি। واشهد ان لا اله الا الله وحده لا شريك له এবং আমি সাক্ষ্য দেই যে, এক আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই তাঁহার কোন শরীক নাই। ان الرائد لا يكذب اهله অতঃপর তিনি বলিলেন: পথপ্রদর্শক তাহার আপনজনদিগকে মিথ্যা বলিতে পারে না। والله الذي لا اله الا هو আর আল্লাহ্ সেই পবিত্র সত্তা যিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই, انی رسول الله اليكم خاصة والى الناس عامة নিশ্চয় আমি আল্লাহ্র রসূল বিশেষত তোমাদের প্রতি এবং সাধারণভাবে গোটা মানবজাতির প্রতি। والله لتموتن كما تنامون আল্লাহ্র কসম! নিশ্চয় তোমরা মৃত্যুবরণ করি যেমন তোমরা নিদ্রার কোলে ঢলিয়া পড় ولتبعثن كما تستيقظون এবং নিশ্চয় তোমরা পুনরুত্থিত হইবে যেমন তোমরা নিদ্রা হইতে জাগ্রত হইয়া থাক। ولتحاسين بما تعملون এবং অবশ্যই তোমাদের কৃতকর্মের হিসাব-নিকাশ নেওয়া হইবে। وانما الجنة ابدا والنار ابدا . এবং সুনিশ্চিতভাবেই জান্নাত চিরস্থায়ী এবং জাহান্নামও চিরস্থায়ী। তখন আবূ তালিব বলিয়া উঠিলেন, আমার নিকট তোমার সাহায্য-সহযোগিতা কতই না প্রিয়! আমি তোমার উপদেশাবলী সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করিলাম এবং তোমার কথায় পূর্ণ আস্থা স্থাপন করিলাম। আর এখানে তোমার পিতৃকূলের লোকজন উপস্থিত রহিয়াছে। আমি তো তাহাদেরই একজন। তবে আমি সর্বাগ্রে তোমার প্রিয় মিশনকে স্বাগত জানাই। তুমি যে ব্যাপারে আদিষ্ট হইয়াছ তাহা চালাইয়া যাও! আল্লাহ্র কসম! আমি সর্বদা তোমার সাহায্য-সহযোগিতা করিব ও তোমার হেফাযতের ব্যাপারে যত্নবান থাকিব। তবে আবদুল মুত্তালিবের দীন ছাড়িতে আমার মন সায় দেয় না। তখন আবু লাহাব বলিয়া উঠিল, আল্লাহ্র কসম! ইহা একটি মন্দ সিদ্ধান্ত। অন্যরা পাকড়াও করার পূর্বে তোমরা নিজেরাই বরং তাহাকে পাকড়াও কর ও নিবৃত্ত কর। তখন আবূ তালিব বলিলেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই আজীবন তাঁহাকে অনিষ্টকারীদের হাত হইতে রক্ষা করিয়া যাইব (আর-রাহীকুল মাখতুম, ১ম মুদ্রণ, মক্কা মুকাররামা ১৪০০/১৯৮০; ইবনুল আছীর, ফিক্হস সীরাঃ, পৃ. ৭৭-৭৮-এর বরাতে)। উক্ত বর্ণনায় আবু লাহাবের সর্বপ্রথম বৈরিতার কথা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হইয়াছে। উক্ত ঘটনার উপর মন্তব্য করিতে গিয়া আল্লামা ইদরীস কান্দেহলভী (র) লিখেন, "আবূ লাহাব যদিও সম্পর্কে নবী করীম (স)-এর চাচা ছিল, তবুও আল্লাহ্ নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, তাঁহার প্রতি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও বিদ্বেষ-বৈরিতার ক্ষেত্রে সে ছিল সকলের অগ্রণী। এই বিদ্বেষ ও বৈরিতার জন্যই সে তাহার পুত্রদ্বয় উৎবা ও উতায়বাকে নবী-নন্দিনী রুকাইয়া ও উম্মে কুলছুম (রা)-কে তালাক দিতে বাধ্য করে, যাহাতে নবী করীম (স) মর্মযাতনায় দগ্ধ হন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উহাও কালক্রমে আল্লাহর মহান রহমতরূপে প্রতিপন্ন হয়। কেননা পরবর্তী কালে উক্ত দুইজন নবী দুহিতা পর্যায়ক্রমে হযরত উছমান (রা)-এর সহিত পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। ফলে হযরত উثمان 'যুন্-নূরায়ন' বা যুগল জ্যোতির অধিকারী হন। এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী-রসূলের অগণিত সাহাবীগণের মধ্যে একমাত্র হযরত উছমানই কোন নবীর দুইজন কন্যার স্বামী হওয়ার গৌরব লাভ করেন (দ্র. সীরাতুল মুস্তফা, ১খ, পৃ.১৭৪)।