📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সলামের প্রথম ফরয সালাত (নামায): সূচনা ও ক্রমবিকাশ

📄 সলামের প্রথম ফরয সালাত (নামায): সূচনা ও ক্রমবিকাশ


মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলায়হি ওয়াসাল্লামের মদীনায় হিজরত করিবার এক বৎসর পূর্বে মি'রাজের ঘটনা সংঘটিত হয়। এই মি'রাজেই তাঁহার উপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয হয়। হযরত আনাস (রা) বলেন:
قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَفَرَضَ اللهُ عَلَى أُمَّتِي خَمْسِينَ صَلَاةً فَرَجَعْتُ بِذَالِكَ حَتَّى مَرَرْتُ عَلَى مُوسَى فَقَالَ مَا فَرَضَ اللهُ لَكَ عَلَى أُمَّتِكَ قُلْتُ فَرَضَ خَمْسَيْنَ صَلَاةً قَالَ فَارْجِعْ إِلَى رَبِّكَ فَإِنَّ امْتَكَ لا تُطِيقُ ذَالِكَ فَرَاجَعْتُ فَوَضَعَ شَطْرَهَا فَرَجَعْتُ إِلَى مُوسَى قُلْتُ وَضَعَ شَطْرَهَا فَقَالَ رَاجِعُ رَبَّكَ فَإِنَّ أُمَّتَكَ لا تُطِيقُ فَرَاجَعْتُ فَوَضَعَ شَطْرَهَا فَرَجَعْتُ إِلَيْهِ فَقَالَ ارْجِعْ إِلَى رَبِّكَ فَإِنَّ أُمَّتَكَ لا تُطِيقُ ذَلِكَ فَرَاجَعْتُهُ فَقَالَ هِيَ خَمْسٌ وَهِيَ خَمْسُونَ لا يُبَدِّلُ الْقَوْلُ لَدَى.
"নবী কারীম (স) বলেন, আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের উপর (রাতে-দিনে) পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করিয়াছেন। আমি ইহা লইয়া প্রত্যাবর্তন করি এবং মূসা (আ)-এর নিকট পৌছি। তিনি বলেন, আপনার উম্মতের উপর আল্লাহ কি ফরয করিয়াছেন? আমি বলিলাম, তিনি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করিয়াছেন। তিনি বলিলেন, আপনার রবের নিকট ফিরিয়া যান। কেননা আপনার উম্মত ইহা আদায় করিতে সক্ষম হইবে না। আমি ফিরিয়া গেলাম। আল্লাহ কিছু অংশ কম করিলেন। তাহার পর মূসা (আ)-এর নিকট ফিরিয়া আসিয়া বলিলাম, আল্লাহ কিছু অংশ কমাইয়াছেন। তিনি বলিলেন, আপনার রবের নিকট ফিরিয়া যান। কেননা আপনার উম্মত তাহা আদায় করিতে সক্ষম হইবে না। আমি ফিরিয়া গেলাম। আল্লাহ কিছু অংশ কম করিলেন। আমি তাঁহার নিকট ফিরিয়া আসিলাম। তিনি পুনরায় বলিলেন, আবার আপনার রবের নিকট যান। কেননা আপনার উম্মত ইহাও আদায় করিতে সক্ষম হইবে না। আমি আবার ফিরিয়া গেলাম। তখন আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, (আমলের দিক হইতে) ইহা পাঁচ ওয়াক্ত, (ছওয়াব-এর দিক হইতে) ইহা পঞ্চাশ ওয়াক্ত। আমার কথার পরিবর্তন হয় না” (বুখারী, ১খ, কিতাবুস সালাত)।
এই হাদীছ হইতে প্রমাণিত হয় যে, পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সালাতের নির্দেশ মি'রাজ রজনীতে হইয়াছে। ইবন বাত্তাল (র) বলেন:
اَجْمَعُوا عَلَى أَنَّ فَرْضَ الصَّلوة كَانَ لَيْلَةَ الاسراء.
"আলিমগণ ঐকমত্য পোষণ করিয়াছেন যে, ইসরা রজনীতেই সালাত ফরয হইয়াছে" ('আয়নী, ৪খ)। ইবন ইসহাক (র) বলেন:
ثُمَّ إِنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ أَتَى فَهَمَزَ بِعَقِبِه فِي نَاحِيَةِ الْوَادِي فَانْفَجَرَتْ عَيْنُ مَاء مُزْنٍ فَتَوَضَّأَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَمُحَمَّدٌ عَلَيْهِ السَّلَامُ يَنْظُرُ فَرَجَعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخَذَ بِيَدِ خَدِيجَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا ثُمَّ أَتِي بِهَا الْعَيْنَ فَتَوَضَّا كَمَا تَوَضَّا جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلامُ ثُمَّ صَلَّى هُوَ وَخَدِيجَةُ رَكْعَتَيْنِ كَمَا صَلَّى جِبْرِيلُ عَلَيْهِ الصَّلوة والسلام.
"অতঃপর জিবরীল (আ) আগমন করিলেন এবং তিনি তাঁহার পায়ের গোড়ালী দ্বারা উপত্যকার পার্শ্বে আঘাত করিলেন। ইহাতে শীতল পানির ঝরণা প্রবাহিত হইল। জিবরীল (আ) উযু করিলেন। মুহাম্মাদ (স) তাহা প্রত্যক্ষ করিতেছিলেন। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) গৃহে ফিরিয়া গেলেন এবং হযরত খাদীজা (রা)-এর হাত ধরিয়া তাঁহাকেসহ ঝরণার নিকট আসিলেন। তাঁহারাও ঐভাবে উযু করিলেন যেইভাবে জিবরীল (আ) উযু করিয়াছেন। ইহার পর তিনি এবং খাদীজা (রা) দুই রাক'আত নামায পড়িলেন, যেইভাবে জিবরীল (আ) নামায পড়িয়াছিলেন" ('আয়নী, ৪খ)।
নাফি' ইবন জুবায়র (র) এই প্রসঙ্গে বলেন:
أَصْبَحَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْلَةَ الإِسْرَاءِ فَنَزَلَ جِبْرِيلُ حِينَ زَاغَتِ الشَّمْسُ فَصلی به.
“ইসরা রজনীর অতিক্রান্তে নবী করীম (স) ঘুম হইতে উঠিলেন। অতঃপর সূর্য পশ্চিম দিগন্তে হেলিয়া পড়িলে জিবরীল (আ) আসিলেন এবং তাঁহাকে লইয়া নামায পড়িলেন” (আয়নী, ৪খ)।
ইমাম তিরমিযী (র) এই প্রসঙ্গে ইবন ‘আব্বাস (রা) হইতে একটি দীর্ঘ হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। হাদীছটি এই:
قَالَ أَخْبَرَنِى ابْنُ عَبَّاسٍ أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ أَمَّنِي جِبْرِيْلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ عِنْدَ الْبَيْتِ مَرَّتَيْنِ فَصَلَّى الظُّهْرَ فِى الْأُولَى مِّنْهُمَا حِيْنَ كَانَ الْفَيْءُ مِثْلَ الشِّرَاكِ ثُمَّ صَلَّى الْعَصْرَ حِيْنَ كَانَ ظِلُّ كُلِّ شَيْءٍ مِثْلَهُ ثُمَّ صَلَّى الْمَغْرِبَ حِيْنَ وَجَبَتِ الشَّمْسُ وَأَفْطَرَ الصَّائِمُ ثُمَّ صَلَّى الْعِشَاءَ حِيْنَ غَابَ الشَّفَقُ ثُمَّ صَلَّى الْفَجْرَ حِيْنَ دَرَقَ الْفَجْرُ وَحَرُمَ الطَّعَامُ عَلَى الصَّائِمِ وَصَلَّى الْمَرَّةَ الثَّانِيَةَ الظَّهْرَ حِيْنَ كَانَ ظِلُّ كُلِّ شَيْءٍ مِثْلَهُ لِوَقْتِ الْعَصْرِ بِالْأَمْسِ ثُمَّ صَلَّى الْعَصْرَ حِيْنَ كَانَ ظِلُّ كُلِّ شَيْءٍ مِثْلَهُ ثُمَّ صَلَّى الْمَغْرِبَ لِوَقْتِهِ الْأَوَّلِ ثُمَّ صَلَّى الْعِشَاءَ الْآخِرَةَ حِيْنَ ذَهَبَ ثُلُثُ اللَّيْلِ ثُمَّ صَلَّى الصُّبْحَ حِيْنَ اَسْفَرَتِ الْأَرْضُ ثُمَّ الْتَفَتَ إِلَىَّ جِبْرِيْلُ فَقَالَ يَا مُحَمَّدُ هَذَا وَقْتُ الْأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِكَ وَالْوَقْتُ فِيْمَا بَيْنَ هَذَيْنِ الْوَقْتَيْنِ-
“বর্ণনাকারী (নাফি’ ইবন যুবায়র) বলেন, আমার নিকট ইবন আব্বাস (রা) বর্ণনা করিয়াছেনঃ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন, “জিবরীল (আ) ‘কাবা শরীফের (দরজার) নিকট দুইবার আমার সালাতের ইমামতি করিয়াছিলেন। তিনি প্রথম দিন যুহরের সালাত পড়াইলেন যখন প্রতিটি বস্তুর ছায়া জুতার ফিতার মত ছিল। অতঃপর তিনি ‘আসরের সালাত পড়াইলেন যখন বস্তুর ছায়া (মূল ছায়া ব্যতীত) তার সমান ছিল। অতঃপর মাগরিবের সালাত পড়াইলেন যখন সূর্য অস্তমিত হইল এবং রোযাদার ইফতার করিল। অতঃপর ‘ইশার সালাত পড়াইলেন যখন শাফাক (আকাশের রক্তিম আভা) অদৃশ্য হইয়া গেল। অতঃপর ফজরের সালাত পড়াইলেন যখন ফজর উদিত হইল এবং রোযাদারের উপর খাদ্য গ্রহণ হারাম হইল। তিনি (জিবরীল) দ্বিতীয় দিবসে যুহরের সালাত পড়াইলেন যখন বস্তুর ছায়া উহার পরিমাণ হইল এবং (পূর্ববর্তী দিন ঠিক যেই সময়ে) ‘আসরের সালাত পড়াইয়াছিলেন। অতঃপর ‘আসরের সালাত পড়াইলেন যখন বস্তুর ছায়া তাহার দ্বিগুণ হইল। অতঃপর মাগরিবের সালাত পড়াইলেন পূর্বের দিনের সময়ে। অতঃপর ‘ইশার সালাত পড়াইলেন যখন রাতের এক-তৃতীয়াংশ চলিয়া গেল। আর ফজরের সালাত পড়াইলেন যখন যমিন আলোকিত হইল। অতঃপর জিবরীল (আ) আমার প্রতি তাকাইয়া বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! ইহাই হইল আপনার পূর্ববর্তী নবীগণের সালাতের ওয়াক্ত। আর সালাতের ওয়াক্ত এই দুই সময়ের মাঝখানে।”
উপর্যুক্ত হাদীছ হইতে প্রমাণিত হয় যে, জিবরাঈল (আ) পরপর দুই দিন রাসূলুল্লাহ (স)-কে সালাতের তা'লীম দিয়াছেন। এই হাদীছ হইতে আরও জানা যায় যে, পূর্ববতী নবীগণও এই সব নামায পড়িতেন। ইবনুল 'আরাবী ইহার ব্যাখ্যায় বলেন, পূর্ববর্তী নবীগণের সালাতের সময়সীমাও এইরূপই নির্ধারিত ছিল। অর্থাৎ প্রত্যেক সালাতের সময় ছিল প্রশস্ত এবং আওয়াল ও আখির ওয়াক্তবিশিষ্ট (মা'আরিফুস সুনান, ২খ)।
ইবন হাজার (র) বলেন, 'ইশার সালাত ছাড়া অন্যান্য সালাতগুলি বিভিন্ন নবীগণের মাঝে বিভক্ত ছিল। একত্রে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত শুধু আমাদেরই বৈশিষ্ট্য। তবে 'আল্লামা তীবী (র)-এর মতে পূর্ববর্তী নবীগণ সালাতুল ইশা নফল হিসাবে পড়িতেন, ইহা তাঁহাদের উপর ফরয ছিল না (মাআরিফুস সুনান, ২খ)। মুল্লা আলী আল-কারী (র) অনুরূপ মত পোষণ করিয়া বলেন, নবীগণ 'ইশার সালাত নফলস্বরূপ পড়িতেন। যেমন সালাতুত-তাহাজ্জুদ আমাদের নবীর উপর ফরয ছিল, কিন্তু আমাদের উপর ফরয নয়। আমরা ইহা নফল হিসাবে পড়ি (মিরকাত, ২খ)।
ইমাম তাহাবী (র) পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সূচনা সম্পর্কে একটি হাদীছ আবু আবদুর রাহমান উবায়দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আইশা (র) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। হাদীছটি এই:
إِنَّ ادَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ لَمَّا تَيْبَ عَلَيْهِ عِنْدَ الْفَجْرِ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ فَصَارَتِ الصُّبْحُ وَفُدِيَ إِسْحَقُ عِنْدَ الظُّهْرِ فَصَلَّى إِبْرَاهِيمُ عَلَيْهِ السَّلَامُ أَرْبَعًا فَصَارَتِ الظُّهْرُ وَبُعِثَ عُزَيْرٌ فَقِيلَ لَهُ كَمْ لَبِثْتَ فَقَالَ يَوْمًا فَرَأَى الشَّمْسَ فَقَالَ أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ فَصَلَّى أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ فَصَارَت الْعَصْرُ وَقَدْ قَبْلَ غُفِرَ لِعُزَيْرِ عَلَيْهِ السَّلامُ وَغُفِرَ لِدَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلَامُ عِنْدَ الْمَغْرِبِ فَقَامَ فَصَلَّى أَرْبَعَ رَكْعَاتٍ فَجَهَدَ فَجَلَسَ فِي الثَّالِثَةِ فَصَارَتِ الْمَغْرِبُ ثَلَثًا وَأَوَّلُ مَنْ صَلَّى العشاء الآخِرَةَ نَبِيُّنَا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
"হযরত আদম (আ)-এর তওবা যখন ফজরের সময় কবুল হয় তখন তিনি দুই রাকআত সালাত পড়েন। আর ইহাই সকালের সালাত হিসাবে গণ্য হইল। হযরত ইসহাক (আ)-কে, অপর বর্ণনায় ইসমাঈল (আ)-যুহরের সময় কুরবানীর উদ্দেশে পেশ করা হয়। তখন হযরত ইবরাহীম (আ) চার রাকআত সালাত আদায় করেন এবং ইহাই হইল সালাতুয যুহর। হযরত 'উযায়র (আ)-কে পুনর্জীবিত করার পর তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনি কতদিন অবস্থান করিয়াছেন? তিনি বলিলেন, এক দিন। অতঃপর তিনি সূর্যের প্রতি তাকাইলেন, দেখিলেন তখনও সূর্যরশ্মি অবশিষ্ট রহিয়াছে এবং বলিলেন, অথবা দিবসের কিছু অংশ। অতঃপর তিনি চারি রাক'আত নামায পড়িলেন। আর ইহাই হইল আসরের সালাত। কাহারও কাহারও মতে হযরত 'উযায়র (আ)-কে ক্ষমা করা হইয়াছে। অপর নুসখায় غفر শব্দের স্থলে غيْرُ শব্দ রহিয়াছে। এমতাবস্থায় অর্থ হইবে, কাহারও কাহারও মতানুসারে 'উযায়র (আ) নহেন, বরং তিনি ছিলেন অন্য একজন নবী। আর তাঁহার নাম হযরত ইউনুস (আ)। হযরত দা'উদ (আ)-কে মাগরিবের ওয়াক্তে ক্ষমা করা হইয়াছিল। তখন তিনি দণ্ডায়মান হইলেন এবং চারি রাকাআত নামায শুরু করিলেন, অতঃপর ক্লান্ত হইয়া তৃতীয় রাক'আতে বসিয়া পড়িলেন। ইহাতে মাগরিবের সালাত তিন রাকআত হইল। আর যিনি 'ইশা'-এর সালাত সর্বপ্রথম আদায় করিয়াছিলেন তিনি হইলেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু 'আলায়হি ওয়াসাল্লাম (শারহু মা'আনিল আছার, ১খ)।
শায়খ রামলী তাঁহার "নিহায়াতুল মুহতাজ" গ্রন্থে (১খ) বলেন, "সকালের সালাত হইতেছে আদম (আ)-এর সালাত, যুহর দাউদ (আ)-এর, 'আসর সুলায়মান (আ)-এর, মাগরিব ইয়া'কূব (আ)-এর এবং 'ইশা' ইউনুস (আ)-এর সালাত। শায়খ রামলী এই বর্ণনার পক্ষে একটি হাদীছ উল্লেখ করিয়াছেন। শায়খ শাবরামুলসী উপর্যুক্ত বর্ণনার সমালোচনা করিয়া বলেন, বিশুদ্ধ মতানুসারে ইশার সালাত হইতেছে আমাদের বৈশিষ্ট্য, আর মুহর ইবরাহীম (আ) এবং মাগরিব 'ঈসা (আ)-এরঃ দুই রাকআত তাঁহার নিজের পক্ষ হইতে এবং এক রাকআত তাঁহার মাতার পক্ষ হইতে। "ইনায়া গ্রন্থকারের মতে, 'আসরের সালাত প্রথম আদায় করিয়াছিলেন ইউনুস (আ) (মা'আরিফুস সুনান, ২খ)।
মি'রাজ রজনীতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয হওয়ার পূর্বে আমাদের নবী (স)-এর উপর কোন সালাত ফরয ছিল কিনা এই সম্পর্কে 'আলিমগণের মধ্যে মতপার্থক্য রহিয়াছে। কাহারও মতে ইহার পূর্বে কোন সালাত ফরয ছিল না। তবে রাত্রি বেলায় অনির্ধারিত সময়ে তাঁহার উপর সালাত আদায়ের হুকুম ছিল। আল্লামা হারবী এই প্রসঙ্গে বলেন:
إِنَّ الصَّلوةَ كَانَتْ مَفْرُوضَةً رَكْعَتَيْنِ بِالْغَدَاةِ وَرَكْعَتَيْنِ بِالْعَشِيِّ.
"(মি'রাজের পূর্বেও) সকালে দুই রাক'আত এবং বিকালে দুই রাক'আত সালাত আদায় করা তাঁহার উপর ফরয ছিল" (ফাতহুল বারী, ১খ)।
কিন্তু মুহাম্মাদ ইবন নাসর আল-মারওয়াযীর মতে উল্লিখিত মত সঠিক নহে। তিনি তাঁহার বক্তব্যের পক্ষে দলীল উপস্থাপন করিয়া বলেন, এই সূরার পরবর্তী আয়াত وَآخَرُونَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ )"আর কেহ কেহ আল্লাহর পথে লড়াইয়ে লিপ্ত থাকে”) হইতে বুঝা যায় যে, فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنْهُ আয়াতটি মদীনায় নাযিল হইয়াছে, মক্কায় নহে। কেননা জিহাদের হুকুম মদীনায় অবতীর্ণ হইয়াছে, মক্কায় নহে। অথচ ইসরার ঘটনা ইহার পূর্বেই মক্কায় সংঘটিত হইয়াছে। ইবন হাজার 'আসকালানী (র)-এর মতে মারওয়াযীর এই দলীল স্পষ্ট নহে। কারণ আল্লাহ তা'আলার বাণী-
عَلِمَ أَنْ سَيَكُونُ مِنْكُمْ مَّرْضَى وَآخَرُونَ يَضْرِبُونَ فِي الْأَرْضِ يَبْتَغُونَ مِنْ فَضْلِ اللَّهِ وَآخَرُونَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ.
"আল্লাহ জানেন যে, তোমাদের মধ্যে কেহ অসুস্থ হইয়া পড়িবে, কেহ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে দেশভ্রমণ করিবে এবং কেহ আল্লাহ্ পথে সংগ্রামে লিপ্ত হইবে" (৭৩: ২০) স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এই বিষয়গুলি ভবিষ্যতে ঘটিবে। আর তিনি ইহাও জানেন যে, বান্দাগণ ভবিষ্যতে এইসব কষ্টে পতিত হইবে। এই কারণে মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করিয়া পূর্ব হইতেই 'ইবাদতকে সহজ করিয়া দেন (ফাতহুল বারী, ১খ)।
ইমাম কুরতবী (র)-এর মতে মি'রাজের পূর্বে রাত্রি বেলায় সালাত ফরয ছিল। তবে কাহাদের উপর ফরয ছিল এই সম্পর্কে তিনি 'আলিমগণের তিনটি অভিমত উল্লেখ করিয়াছেন:
১. সা'ঈদ ইবন জুবায়রের মতে রাত্রিকালীন সালাত শুধু নবী কারীম (স)-এর উপরই ফরয ছিল। কেননা আল্লাহ তা'আলা يَاأَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ قُمِ اللَّيْلَ ا "হে বস্ত্রাবৃত! রাত্রে জাগরণ কর” (৭৩৪১-২) দ্বারা শুধু রাসূলুল্লাহ (স)-কে সম্বোধন করিয়াছেন।
২. ইবন 'আব্বাস (রা)-এর মতে নবী কারীম (স) এবং তাঁহার পূর্ববর্তী নবীগণের উপর সালাতুল লায়ল (রাতের নামায) ফরয ছিল।
৩. হযরত 'আইশা (রা) এবং ইবন 'আব্বাস (রা)-এর অপর মত অনুসারে রাসূলুল্লাহ (স) এবং সাহাবীগণের উপর সালাতুল লায়ল ফরয ছিল। আর এই মতটি বিশুদ্ধ। সহীহ মুসলিম-এ বর্ণিত আছে: فَقُلْتُ لِعَائِشَةَ أَنْبِثْنِي عَنْ قِيَامِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ السْتَ تَقْرَأُ يَاأَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ قُلْتُ بَلَى قَالَتْ فَإِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ إِفْتَرَضَ قِيَامَ اللَّيْلِ فِي أَوَّلِ هَذِهِ السُّورَةِ فَقَامَ وَأَصْحَابُهُ حَوْلاً ..
"বর্ণনাকারী বলেন, আমি 'আইশা (রা)-কে বলিলাম, আমাকে রাসুলুল্লাহ (স)-এর রাত্রের 'ইবাদত সম্পর্কে অবহিত করুন। তিনি বলিলেন, আপনি কি পাঠ করেন না, يَأَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ আমি বলিলাম, হাঁ! তিনি বলিলেন, মহান ও পরাক্রমশালী আল্লাহ এই সূরার প্রারম্ভেই কিয়ামুল লায়ল-কে ফরয করিয়াছেন। অতএব তিনি এবং তাঁহার সাহাবীগণ এক বৎসর যাবত রাত্রিবেলায় সালাত আদায় করিতেন”।
সিমাক আল-হানাফী এই প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন: سَمِعْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ يَقُولُ لَمَّا أُنْزِلَ أَوَّلُ يَأَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ كَانُوا يَقُومُونَ نَحْوا مِنْ قِيَامِهِمْ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ حَتَّى نَزَلَ أَخِرُهَا وَكَانَ بَيْنَ أَوَّلِهَا وَآخِرِهَا نَحْو مِنْ سِنَةٍ.
"আমি ইবন 'আব্বাস (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছি, যখন يَأَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট সূরার প্রথম অংশ নাযিল হয় তখন তাঁহারা (নবী কারীম (স) এবং সাহাবীগণ).রমযান মাসের সালাতের ন্যায় অন্যান্য সকল রাত্রেও সালাতে নিয়োজিত থাকিতেন। শেষে এই সূরার শেষাংশ নাযিল হয়। আর এই সূরার প্রথম অংশ ও শেষ অংশ নাযিলের ব্যবধানকাল হইতেছে এক বৎসরের মত (অর্থাৎ তাঁহারা এক বৎসর ধরিয়া রাত্রিবেলা সালাত আদায় করিয়াছেন)" (কুরতুবী, আল-জামি' লি-আহকামিল কুরআন, ১৯খ)।
উল্লিখিত আলোচনার প্রেক্ষিতে প্রমাণিত হয় যে, প্রথম ফরয সালাত ছিল সালাতুল লায়ল। আর এই সালাত ইসলামের প্রথম যুগেই ফরয হইয়াছিল। কেননা সূরা মুয্যাম্মিল ফাতরাতুল ওয়াহয়ি-এর যুগ সমাপ্ত হওয়ার পরই নাযিল হইয়াছিল।
মি'রাজে একসাথে পাঁচ ওয়াক্ত সাল্লাত ফরয হওয়ার পূর্বে সালাতুল লায়ল ব্যতীত আর কোন প্রকার সালাত ফরয ছিল কিনা এই সম্পর্কে 'আলিমগণের মতামত নিম্নরূপঃ মুহাম্মাদ আনওয়ার শাহ কাশমীরী (র) এবং একদল 'আলিমের মতে মি'রাজের পূর্বেই নবী কারীম (স) দুই ওয়াক্ত সালাত আদায় করিতেন। এই দুই ওয়াক্ত সালাত হইতেছে ফজর এবং 'ইশা অথবা ফজর এবং 'আসর। 'আল্লামা কাশমীরী (র) তাঁহার মতের পক্ষে দলীলস্বরূপ বুখারী ও মুসলিমে উল্লিখিত হযরত ইবন 'আব্বাস (রা)-এর নিম্নের হাদীছ উল্লেখ করেন: عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ انْطَلَقَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي طَائِفَةٍ مِّنْ أَصْحَابِهِ عامدين إلى سوق عُكاظ ....... وَهُوَ يُصَلِّى بِأَصْحَابِهِ صَلَوَةَ الْفَجْرِ فَلَمَّا سَمِعُوا الْقُرْآنَ اسْتَمَعُوا لَهُ.
"নবী কারীম (স) তাঁহার একদল সাহাবীসহ 'উকায বাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। ('উকায যাওয়ার পথে) তিনি (নাখলা নামক স্থানে) তাঁহার সাহাবীগণ সমভিব্যাহারে ফজরের সালাত আদায় করিতেছিলেন। এমতাবস্থায় জিনেরা যখন তাঁহার কুরআন পাঠ শ্রবণ করিল তখন তাহারা উহা মনোযোগ সহকারে শুনিতে থাকে” (বুখারী, ১খ)।
এই হাদীছ হইতে জানা যায় যে, নবী (স) এই সালাত আদায়ের সময় শব্দ করিয়া কিরাআত পাঠ করেন এবং জামা'আত সহকারেনামায পড়েন। ইসরা তথা মি'রাজের ঘটনার পরও তিনি অনুরূপভাবেই ফজরের সালাত আদায় করিতেন। অতএব ইহা কোন নফল সালাত ছিল না, বরং ফরযই ছিল (ফায়দুল বারী, ২খ)।
'আল্লামা কাসতাল্লানী (র) বলেন: وَالَّذِي تَظَاهَرَتْ أَنَّ ذلِكَ أَوَّلَ الْمَبْعَثِ .... وَأَنَّ مُجِينَ الْجِنَّ لِإِسْتِمَاعِ الْقُرْآنِ قَبْلَ خُرُوجِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى الطَّائِفِ بِسَنَتَيْنِ.
"স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইহা ছিল নবুওয়াতের প্রথম দিকের একটি ঘটনা। আর কুরআন শ্রবণের উদ্দেশে তাঁহার নিকট কিছু সংখ্যক জিন-এর আগমনের সময়কাল ছিল তাঁহার তাইফ যাত্রার দুই বৎসর পূর্বে।"
ইমাম নববী (র) মহানবী (স)-এর নাখলাতে আদায়কৃত সালাতের ধরন সম্পর্কে বলেন, وَإِنَّهَا كَانَتْ مَشْرُوْعَةً مِنْ أُوَّلِ النُّبُوَّةَ “উহা (ফজরের সালাত) নবুওয়াতের প্রথমকাল হইতেই বিধিবন্ধ ছিল" (সহীহ মুসলিমের পাদটীকা, ১খ)।
আল্লাম শাব্বীর আহমাদ 'উছমানী (র) বলেনঃ فَحَدِيْثُ ابْنِ عَبَّاسٍ فِي أَوَّلِ الْأَمْرِ وَأَوَّلِ النُّبُوَّةِ حِيْنَ أَتَوا فَسَمِعُوا .
"ইবন 'আব্বাস (রা)-এর হাদীছ প্রথমকালের এবং নবুওয়াতের প্রাথমিক যুগের ঘটনা। ঐ সময় কিছু সংখ্যক জিন তাঁহার নিকট (নাখলা নামক স্থানে) আগমন করে এবং তাঁহার কুরআন পাঠ শ্রবণ করে" (ফাতহুল মুলহিম, ২খ)।
উল্লিখিত বর্ণনাসমূহের প্রেক্ষিতে প্রমাণিত হয় যে, ফজরের সালাত মি'রাজের পূর্ব হইতেই ফরয ছিল। হাফিজ ইবন কাছীর মি'রাজ সম্পর্কিত বিভিন্ন হাদীছ উল্লেখ করিবার পর বায়তুল মাদ্দিসে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদায়কৃত দুই রাক'আত নামায সম্পর্কে বলেন: "নবী কারীম (স) প্রথমে বুরাক-এ সওয়ার হইয়া বায়তুল মাকদিসের দরজায় অবতরণ করেন। অতঃপর তিনি মসজিদে প্রবেশ করিয়া দুই রাক'আত তাহিয়্যাতুল মাসজিদ সালাত আদায় করেন। ইহার পর তিনি ঊর্ধ্বজগত ভ্রমণশেষে ফিরিয়া আসিবার সময় পুনরায় বায়তুল মাকদিসে অবতরণ করেন এবং নবীগণ তাঁহার সাথে তথায় অবতরণ করেন।" অতঃপর ইবন কাছীর বলেন: فَصَلَّى بِهِمْ فِيْهِ لَمَّا حَانَتِ الصَّلَاةُ وَيَحْتَمِلُ أَنَّهَا الصُّبْحُ يَوْمَئِذٍ.
“রাসূলুল্লাহ (স) নবীগণ সহকারে বায়তুল মাকদিসে এ সালাত আদায় করেন যখন সালাতের ওয়াক্ত হইল। সম্ভবত ইহা ছিল ঐ দিনের ফজরের সালাত” (তাফসীরুল কুরআনিল আজীম, ৩খ)।
কোনও কোনও 'আলিমের মতে 'ইশার সালাতও মি'রাজের পূর্বেই ফরয ছিল। তাঁহারা দলীলস্বরূপ কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াত পেশ করিয়া থাকেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ بِالْعَشِيِّ وَالْإِبْكَارِ.
"সকাল-সন্ধ্যায় তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর” (৪০: ৫৫)।
এই আয়াতের তাফসীরে কাযী বায়দাবী (র) বলেন: وَقِيلَ صَلِّ لِهَدَيْنِ الْوَقْتَيْنِ إِذْ كَانَ الْوَاجِبُ بِمَكَّةَ رَكَعَتَيْنِ بُكْرَةً وَرَكَعَتَيْنِ عَشِيَّةً.
"কাহারও মতে আয়াতের অর্থ হইল হে নবী! আপনি এই দুই ওয়াক্ত সালাত আদায় করুন। কেননা মক্কায় অবস্থানকালে সকালে দুই রাক'আত সালাত এবং সন্ধ্যায় দুই রাক'আত সালাত ওয়াজিব ছিল” (আনওয়াবুত তানযীল, ২খ)।
ইমাম কুরতুবী (র) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন: وَقِيلَ هِيَ صَلَاةٌ كَانَتْ بِمَكَّةَ قَبْلَ أَنْ تُفْرَضَ الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ رَكْعَتَانِ عُدْوَةً وَرَكَعَتَانِ عَشِيَّةً عَنِ الْحَسَنِ أَيْضًا ذَكَرَهُ الْمَاوَرْدِي فَيَكُونُ هُذَا مِمَّا نُسِخَ وَاللَّهُ أَعْلَمُ.
"কাহারও মতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয হওয়ার পূর্বে এই সালাত আদায় করার বিধান ছিল। সকালে ছিল দুই রাক'আত এবং সন্ধ্যায় দুই রাক'আত। হাসান (র) হইতেও অনুরূপ বর্ণনা আছে। আল্লামা মাওয়ারদী (র) ইহা উল্লেখ করিয়াছেন। এই দুই ওয়াক্ত সালাতের বিধান পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের হুকুম নাযিল হওয়ার পর মানসূখ (রহিত) হইয়া যায়। আল্লাহ তা'আলাই সম্যক অবগত” (আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১৫ খ)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের মধ্যে কোনটি সর্বপ্রথম ফরয হয়?

📄 পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের মধ্যে কোনটি সর্বপ্রথম ফরয হয়?


মি'রাজ রজনীতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয হওয়ার পর মহানবী (স) সর্বপ্রথম কোন সালাত আদায় করিয়াছিলেন এই সম্পর্কে 'আলিমগণের মতামত নিম্নরূপ:
১. একটি মত অনুসারে মহানবী (স) ফরজ সালাত হিসাবে সর্বপ্রথম ফজরের সালাত আদায় করিয়াছিলেন। ইমাম দারা কুতনী (মৃ. ৯৯৫ খৃ.) তাঁহার সুনান গ্রন্থে (১খ) হুযায়ফা ইবনুল য়ামান (রা)-এর মুক্ত দাস মাহবুব ইবনুল জাহম-এর সনদে ইবন 'উমার (রা) হইতে বর্ণনা করেন, أَتَانِي جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلامُ حِيْنَ طلع الفجر "যখন ফজর উদিত হইল তখন হযরত জিবরীল (আ) আমার নিকট আগমন করিলেন)"
এই হাদীছ হইতে বুঝা যায়, রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রথম আদায়কৃত ফরয সালাত ছিল ফজর। কিন্তু এই অভিমতটি দুর্বল। হাফিয যায়লা'ঈ (র) তাঁহার নাসাবুর রায়াহ গ্রন্থে (১খ) বলেন, “ইবন হিব্বান উক্ত হাদীছকে كِتابُ الضَّعَفَاء গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন এবং এই হাদীছের রাবী মাহবুব ইবনুল জাহমের কারণে তিনি হাদীছটিকে مُعَلَلٌ )ত্রুটিযুক্ত) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন।” ইহা ব্যতীত এই হাদীছ অন্যান্য সহীহ হাদীছেরেরও বিপরীত (মা'আরিফুস সুনান, ২খ)।
২. ফরয সালাত হিসাবে মহানবী (স) সর্বপ্রথম যুহরের সালাত আদায় করেন। এই প্রসঙ্গে তাবারানী বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীছ উল্লেখযোগ্য:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَأَبِي سَعِيدٍ قَالَا أَوَّلُ صَلَاةٍ فُرِضَتْ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صلاة الظهر. "হযরত আবু হুরায়রা (রা) এবং আবূ সা'ঈদ (রা) হইতে বর্ণিত। তাঁহারা বলেন, নবী কারীম (স)-এর উপর প্রথম ফরযকৃত সালাত হইতেছে যুহরের সালাত”।
ইবন ইসহাক এই প্রসঙ্গে বলেন:
قَالَ نَافِعُ بْنُ جُرَيْجٍ وَغَيْرُهُ لَمَّا أَصْبَحَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ اللَّيْلِ الَّتِي أَسْرِئَ بِهِ لَمْ يَرُعْهُ إِلَّا جِبْرِيلُ نَزَلَ حِينَ زَاغَتِ الشَّمْسُ وَلذلكَ سُمِّيَتِ الأُولَى أَنْ صَلَاةُ الظُّهْرِ فَأَمَرَ فَصِيْحَ بِأَصْحَابِهِ الصَّلَاةُ جَامِعَةٌ فَاجْتَمَعُوا فَصَلَّى بِهِ جِبْرِيلُ وَصَلَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالنَّاسِ.
"নাফি' ইবন জুরায়জ বলেন, ইসরার রজনী অবসানের পর নবী কারীম (স)-কে দিবাভাগে হযরত জিবরাঈল (আ)-এর আগমন ব্যতীত কোন বস্তুই শংকিত করে নাই। সূর্য পশ্চিম গগনে হেলিয়া পড়িবার পর জিবরাঈল (আ) তাঁহার নিকট আসিলেন। যুহর হইতে নামায আদায়ের রীতি প্রবর্তিত হওয়ার কারণে সালাতুয যুহরকে প্রথম সালাত নামে অভিহিত করা হয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সাহাবীগণকে সালাতের জন্য আহবান জানাইবার নির্দেশ প্রদান করেন। অতএব اَلصَّلَاةُ جامعة (সালাত অনুষ্ঠিত হইবে) বলিয়া সাহাবীগণকে ডাকা হয়। ইহা শুনিয়া তাঁহারা সমবেত হইলেন। অতঃপর জিবরাঈল (আ) (ইমাম হিসাবে) তাঁহাকে লইয়া সালাত পড়িলেন এবং তিনি লোকদেরকে লইয়া সালাত আদায় করিলেন" (ফাতহুল বারী, ২খ)।
ইবন 'আবিদল বার এই প্রসঙ্গে বলেন:
لَمْ يُخْتَلِفْ أَنَّ جِبْرِيلَ هَبَطَ صَبِيحَةَ الإِسْرَاءِ عِنْدَ الزَّوَالِ فَعَلَّمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الصَّلاةَ وَمَوَاقِيْتَهَا وَهَيْئَتَهَا
"এই বিষয়ে কোন মতভেদ নাই যে, জিবরীল (আ) ইসরার ঘটনার পরবর্তী দিবসে সূর্য হেলিয়া যাওয়ার সময় অবতরণ করেন। অতঃপর তিনি নবী কারীম (স)-কে সালাত, উহার সময়সীমা এবং উহার প্রণালী শিক্ষা দান করেন" (মা'আরিফুস সুনান, ২খ)।
ইমাম তিরমিযী (R) তাঁহার সনদে নাফি ইব্‌ন জুবায়র ইব্‌ন মু'ইম (রা) হইতে বর্ণনা করেন:
لَمْ يُخْتَلِفِ أَنَّ جِبْرِيلَ هَبَطَ صَبِيحَةَ الإِسْرَاءِ عِنْدَ الزَّوَالِ فَعَلَّمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الصَّلاةَ وَمَوَاقِيْتَهَا وَهَيْئَتَهَا . "নাফি' (র) বলেন, আমাকে ইবন 'আব্বাস (রা) হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। নবী কারীম (স) বলিয়াছেন, জিবরাঈল (আ) কা'বার (দরজার) নিকট দুইবার (দুই দিন) আমার সালাতের ইমামতি করিয়াছেন। তিনি এই দুই দিনের প্রথম দিন যুহরের সালাত পড়াইয়াছেন যখন প্রতিটি বস্তুর ছায়া জুতার ফিতার পরিমাণ হইল" (আল-জামি লিত-তিরমিযী, ১খ)।
ইবন ইসহাক তাঁহার আস্-সীরাতুন নাবabiyyah গ্রন্থে বলেন:
إِنَّهُ نَزَلَ عِنْدَ زَوَالِ الشَّمْسِ وَلِذَا سُمِّيَتْ بِالْأُولَى. "সূর্য হেলিয়া যাওয়ার পর জিবরাঈল (আ) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট অবতরণ করেন। আর এই কারণেই ইহা (যুহর) প্রথম সালাত নামে অভিহিত হয়”।
জিবরাঈল (আ) ফজরের ওয়াক্তে না আসিয়া যুহরে ওয়াক্তে কেন আসিলেন ইহার ব্যাখ্যায় 'আলিমগণ বলেন:
১. ইসরা-এর প্রত্যুষে নবী কারীম (স) ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। এমতাবস্থায় জিবরাঈল (আ) তাঁহাকে জাগ্রত করা পছন্দ করেন নাই। কিন্তু এই ব্যাখ্যাটি যুক্তিসংগত নহে। এই ব্যাখ্যাকার লায়লাতুত-তা'রীসকে (لَيْلَةُ التَّعْريس) লায়তুল ইসরা (لَيْلَةُ الإسراء) -এর সঙ্গে গুলাইয় ফেলিয়াছেন। কেননা ফজরের সময় ঘুমাইয়া থাকার ঘটনাটি লায়লাতু'ত-তা'রীসে ঘটিয়াছিল, ইহা লায়লাতুল ইসরা-এ ঘটে নাই।
২. রাসূলুল্লাহ (স) ইসরা-এর ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পূর্ব হইতেই ফজর ও আসরের সালাত আদায় করিতেন (ফায়দুল বারী, ২খ)।
৩. মি'রাজ হইতে প্রত্যাবর্তনকালে নবী কারীম (স) মসজিদুল আকসায় আম্বিয়ায়ে কিরামগণের সহিত জামাআত সহকারে ফজরের সালাত আদায় করিয়াছিলেন (মা'আরিফুস সুনান, ২খ)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ফরয সালাতের রাক'আত-সংখ্যা নির্দ্ধারণ

📄 ফরয সালাতের রাক'আত-সংখ্যা নির্দ্ধারণ


ফরয সালাতের রাক'আত সংখ্যা কখন কিভাবে নির্ধারিত হইয়াছিল এই প্রসঙ্গে হযরত 'আইশা (রা)-এর হাদীছটি প্রণিধানযোগ্য:
عَنْ عَائِشَةَ أَمِّ الْمُؤْمِنِينَ قَالَتْ فَرَضَ اللهُ الصَّلاةَ حِيْنَ فَرَضَهَا رَكَعَتَيْنِ رَكَعَتَيْنِ فِي الْحَضَرِ وَالسَّفَرِ فَأَقِرَتْ صَلَاةُ السَّفَرِ وَزِيدَ فِي صَلَاةِ الْحَضَرِ.
"উম্মুল মুমিনীন 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা যখন সালাত ফরয করিলেন তখন আবাস-প্রবাস উভয় অবস্থায় দুই রাক'আত করিয়া ফরয করিলেন। অতঃপর সফরকালীন সময়ে সালাত পূর্বের ন্যায় বলবৎ রাখা হয়। আর আপন বসতিতে অবস্থানকালীন সময়ের সালাতকে বৃদ্ধি করা হয়” (বুখারী, ১খ)।
হাফিয ইবন হাজার 'আসকালানী (র) রাক'আতের সংখ্যা সম্পর্কে বিভিন্ন হাদীছ উল্লেখ করার পর বলেন:
وَالَّذِي يَظْهَرُ لِي وَبِهَا تَجْتَمِعُ الأَدلَّةُ السَّابِقَةُ أَنَّ الصَّلَوَاتِ فُرِضَتْ لَيْلَةَ الْإِسْرَاءِ رَكَعَتَيْنِ إِلَّا الْمَغْرِبَ ثُمَّ زِيدَتْ بَعْدَ الهِجْرَةِ عَقِبَ الهِجْرَةِ إِلَّا الصُّبْحَ كَمَا رَوَى ابْنُ خُزَيْمَةَ وَابْنُ حِبَّانٍ وَالْبَيْهَقِيُّ مِنْ طَرِيقِ الشَّعْبِي عَنْ مَسْرُوقٍ عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ فُرِضَتْ صَلَاةُ الْحَضَرِ وَالسَّفَرِ رَكْعَتَيْنِ رَكَعَتَيْنِ فَلَمَّا قَدِمَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ وَاطْمَأَنَّ زِيدَ فِي صَلَاةِ الْحَضَرِ رَكْعَتَانِ رَكْعَتَانِ وَتُرِكَتْ صَلَاةُ الْفَجْرِ لِطُولِ الْقِرَاءَةِ وَصَلَاةُ الْمَغْرِبِ لِأَنَّهَا وَتْرُ النَّهَارِ.
"আমার নিকট যাহা প্রতিভাত হয় এবং এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে উপযুক্ত দলীলসমূহের মধ্যেও সমন্বয় সাধিত হইবে তাহা এই লায়লাতুল ইসরা-এ সালাতসমূহকে দুই দুই রাক'আত করিয়াই ফরয করা হয়। তবে মাগরিব ছিল ইহার ব্যতিক্রম। অতঃপর মদীনায় হিজরতের পর ফজর ছাড়া অন্যান্য সালাতের রাক'আত সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। ইবন খুযায়মা, ইবন হিব্বান ও বায়হাকী শা'বীর সনদে মাসরূক হইতে এবং তিনি হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবাসে ও প্রবাসে সালাত দুই দুই রাক'আত করিয়া ফরয করা হয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) যখন মদীনায় আগমন করেন এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিলেন ও স্থির হইলেন তখন আবাসের সালাত দুই দুই রাক'আত করিয়া বৃদ্ধি করা হয়। তবে ফজরের সালাতে দীর্ঘ কিরাআত পাঠের কারণে উহাকে এবং মাগরিবের সালাতকে দিবসের বেজোড় হওয়ার কারণে পূর্ববৎ রাখিয়া দেওয়া হয়" (ফাতহুল বারী, ১খ)।
অতঃপর ইবন হাজার (র) আরও বলেন:
ثُمَّ بَعْدَ أَنْ اسْتَقَرَّ فَرْضُ الرُّبَاعِيَّةِ خُفِّفَ مِنْهَا فِي السَّفَرِ عِنْدَ نُزُولِ قَوْلِهِ تَعَالَى فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلاةِ.
"চার রাক'আত বিশিষ্ট ফরয সালাতের বিষয়টি সুস্থির হওয়ার পর প্রবাসকালীন অবস্থায় উহাকে হালকা করা হয় এবং রাক'আত সংখ্যা হ্রাস করা হয়। আর ইহা তখনই করা হয়, যখন আল্লাহ তা'আলার বাণী, "যখন তোমরা কোন দেশ-বিদেশে সফর করিবে তখন নামাযে কিছুটা হ্রাস করিলে তোমাদের কোন দোষ নাই" (৪: ১০১) নাযিল হয়”।
ইবনুল আছীরে মতে, হিজরী চতুর্থ সালে কসরের হুকুম নাযিল হয়। 'আল্লামা দাওলাবী (র)-এর মতে এই হুকুম হিজরী দ্বিতীয় বর্ষের রবীউল আখির মাসে নাযিল হয়। 'আল্লামা সুহায়লী হিজরতের এক বৎসর বা তাহার কাছাকাছি সময় পর নাযিল হইয়াছে বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। কাহারও মতে এই হুকুম হিজরতের চল্লিশ দিবস পর নাযিল হয় (ফাতহুল বারী, ১খ)।
সালাতুল-জুমু'আও একটি ফরয সালাত। ইবনুল হুমাম বলেন:
إِنَّ الْجُمُعَةَ فَرِيضَةٌ مُحْكَمَةٌ بِالْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ وَالْإِجْمَاعِ.
"জুমু'আর নামায সুপ্রতিষ্ঠিত একটি ফরয; কিতাব, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত” (ইবনুল হুমাম, ফাতুহুল কাদীর, ২খ)।
নবী কারীম (স) মক্কায় ইহা আদায় করিতে সক্ষম হন নাই। মদীনায় আগমনের পর তিনি কুবা-এ চৌদ্দ দিন অবস্থান করেন। এই সময় তিনি জুমু'আ পড়েন নাই। সর্বপ্রথম তিনি মদীনার বানু সালিম মহল্লায় জুমু'আ সালাত আদায় করেন (ফায়দুল বারী, ২খ)।
ইবন সীরীন (র)-এর মতে, মহানবী (স)-এর মদীনায় আগমনের পূর্বে সাহাবীগণ জুমু'আ আদায় করেন। রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা শরীফে থাকিতেই জুমু'আর সালাতের অনুমতি পাইয়াছিলেন, কিন্তু সেখানে উহা আদায় করা সম্ভব হয় নাই। সাহাবীগণই এই দিবসকে জুমু'আ দিবস বলিয়া নামকরণ করেন।
ভিন্নমতে আনসারগণ বলিলেন, ইয়াহুদীরা সপ্তাহে একটি দিনে সমবেত হয়। নাসারাগণও সপ্তাহে একটি দিনে মিলিত হয়। আমরাও অনুরূপভাবে একটি দিনে মিলিত হইতে চাই। তাঁহারা হযরত আসআদ-এর নিকট গমন করেন। তিনি তাহাদিগকে লইয়া দুই রাক'আত সালাত আদায় করেন এবং ইহাকে জুমু'আ নামে অভিহিত করেন। তিনি ঐ দিবসে একটি ছাগল যবাহ করেন এবং সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁহারা ইহার গোশত খাইলেন (ই. বি., ১১খ)। কারণ ঐ সময় তাঁহারা সংখ্যায় কম ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা নাযিল করেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا البَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ.
"মু'মিনগণ! জুমু'আর দিন যখন সালাতের জন্য আহবান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহ্ স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। ইহাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি কর" (৬২: ৯) (আয়নী, ৫খ)।
শাহ ওয়ালিয়্যুল্লাহ (র) বলেন:
وَخَصَّ اللهُ تَعَالَى هَذِهِ الْأُمَّةَ بِعِلْمٍ عَظِيمٍ نَفَشَهُ أَوْلاً فِي صُدُورِ أَصْحَابِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى أَقَامُوا الْجُمُعَةَ فِي المَدِينَةِ قَبْلَ مَقْدَمِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
"আল্লাহ তা'আলা এই উম্মাকে একটি মহান জ্ঞান দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেন। এই জ্ঞান তিনি প্রথমে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবীগণের অন্তরে নিক্ষেপ করেন। ফলে তাঁহারা নবী কারীম (স)-এর আগমনের পূর্বেই মদীনাতে জুমু'আর নামায কায়েম করিলেন" (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, ২খ)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাওয়াতের প্রতিক্রিয়া ও কাফিরদের নির্যাতন

📄 দাওয়াতের প্রতিক্রিয়া ও কাফিরদের নির্যাতন


পৃথিবীতে যুগে যুগে নবী-রসূলগণ (আ) আগমন করিয়াছেন হেদায়াতের বাণী লইয়া। তাঁহাদের মিশন ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীর মানুষকে আলোর পথে আনয়ন করা, পুঞ্জীভূত কুসংস্কাররাশি বিদূরিত করিয়া তাহাদিগকে স্রষ্টার নির্দেশিত কল্যাণের পথ সিরাতুল মুস্তাকীমের উপর প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু এই পথটি মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। যেহেতু তাঁহাদিগকে নানা দেশাচার, প্রতিষ্ঠিত রীতিনীতি, কায়েমী স্বার্থ এবং প্রবৃত্তি পূজার বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করিতে হইত, এমনকি প্রয়োজনে জিহাদে অবতীর্ণ হইতে হইত, তাই চিরদিনই প্রবৃত্তিপূজারী, দেশাচার ও কুপ্রথার অনুসারী ও কায়েমী স্বার্থবাদীরা তাঁহাদের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইয়াছে, তাঁহাদের উপর নির্যাতনের স্টীমরোলার চালাইয়াছে, এমনকি তাঁহাদিগকে হত্যা করিতেও কুণ্ঠাবোধ করে নাই। এই কথারই অভিব্যক্তি ঘটিয়াছে আল-কুরআনের নিম্নের বাণীতে:
يَا حَسْرَةً عَلَى الْعِبَادِ مَا يَأْتِيهِمْ مِّنْ رَّسُولِ الأَ كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِؤُنَ. "পরিতাপ বান্দাদের জন্য! উহাদের নিকট যখনই কোন রাসূল আসিয়াছে তখনই উহারা তাহাকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিয়াছে" (৩৬: ৩০)।
كُلَّمَا جَاءَهُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَى أَنْفُسُهُمْ فَرِيقًا كَذَّبُوا وَفَرِيقًا يَقْتُلُونَ. "যখনই কোন রাসূল তাহাদের নিকট এমন কিছু লইয়া আসে যাহা তাহাদের মনঃপূত নয়, তখনই তাহারা কতককে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করে এবং কতককে হত্যা করে" (৫ঃ ৭০)।
হযরত নূহ্ আলায়হিস্ সালামের প্রতি তাঁহার সম্প্রদায়ের দুর্ব্যবহার এবং পরিণামে মহাপ্লাবনে তাহাদের ধ্বংস হওয়া, হযরত মূসা ও হারুন (আ) নবী ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রতি ফেরাউন ও তদীয় পারিষদদের দুর্ব্যবহার ও লোহিত সাগরে তাহাদের ডুবিয়া মরা, ইবরাহীম (আ)-কে নমরূদের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ এবং পরিণামে তাহার ধ্বংস হওয়া, হযরত লূত, হযরত হূদ ও হযরত সালিহ্ ও শু'আয়ব (আ)-এর কওমসমূহের তাহাদের নবীর প্রতি দুর্ব্যবহার ও শাস্তি ভোগ, হযরত যাকারিয়া (আ)-এর স্ব-সম্প্রদায়ের হাতে নির্দয়ভাবে নিহত হওয়ার বিশদ বিবরণ কুরআন শরীফের বিভিন্ন সূরায় বর্ণিত হইয়াছে।
সূরা বাকারার উপর্যুপরি কয়েকটি আয়াতে নবীগণকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করা ও তাহাদিগকে হত্যা করা সংক্রান্ত বর্ণনা দিয়া আল্লাহ তা'আলা ঐ মিথ্যা প্রতিপন্নকারী ও নির্যাতনকারীদের ভয়াবহ পরিণতির কথাও উল্লেখ করিয়াছেন এইভাবে:
وَلَقَدْ أَتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ وَأَتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنُهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ أَفَكَلَّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَى أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ. وَقَالُوا قَلُوبُنَا غُلْفٌ بَلْ لَّعَنَهُمُ اللهُ بِكُفْرِهِمْ فَقَلِيْلًا مَّا يُؤْمِنُونَ. وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِّنْ عِنْدِ اللهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُوْنَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ فَلَعْنَةُ اللهِ عَلَى الْكَافِرِينَ، بِئْسَمَا اشْتَرَوْا بِهِ أَنْفُسَهُمْ أَنْ يَكْفُرُوا بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ بَغْيًا أَنْ يُنَزِّلَ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ عَلَى مَنْ يَّشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ فَبَاءُوا بِغَضَبٍ عَلَى غَضَبٍ وَالْكَافِرِينَ عَذَابٌ مُّهِينٌ. وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا نُؤْمِنُ بِمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا وَيَكْفُرُونَ بِمَا وَرَاءَهُ وَهُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِمَا مَعَهُمْ قُلْ فَلِمَ تَقْتُلُونَ أَنْبِيَاءَ اللَّهُ مِنْ قَبْلُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ.
"এবং নিশ্চয় আমি মূসাকে কিতাব দিয়াছি এবং তাহার পরে পর্যায়ক্রমে রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছি, মারয়াম-তনয় 'ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ দিয়াছি এবং 'পবিত্র আত্মা' দ্বারা তাহাকে শক্তিশালী করিয়াছি। তবে কি যখনই কোন রাসূল তোমাদের নিকট এমন কিছু আনিয়াছে যাহা তোমাদের মনঃপূত নহে তখনই তোমরা অহংকার করিয়াছ আর কতককে অস্বীকার করিয়াছ এবং কতককে হত্যা করিয়াছ? তাহারা বলিয়াছিল, আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত, বরং কুফরীর জন্য আল্লাহ তাহাদিগকে লা'নত করিয়াছেন। সুতরাং তাহাদের অল্প সংখ্যকই ঈমান আনে। তাহাদের নিকট যাহা আছে আল্লাহ্র নিকট হইতে তাহার সমর্থক কিতাব আসিল, যদিও পূর্বে সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের বিরুদ্ধে তাহারা ইহার সাহায্যে বিজয় প্রার্থনা করিত, তবুও তাহারা যাহা জ্ঞাত ছিল উহা যখন তাহাদের নিকট আসিল তখন তাহারা উহা প্রত্যাখ্যান করিল। সুতরাং কাফিরদের প্রতি আল্লাহ্র লা'নত। উহা কত নিকৃষ্ট যাহার বিনিময়ে তাহারা তাহাদের আত্মাকে বিক্রয় করিয়াছে- উহা এই যে, আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন, জিদের বশবর্তী হইয়া তাহারা তাহাকে প্রত্যাখ্যান করিত শুধু এই কারণে যে, আল্লাহ তাঁহার বান্দাদের মধ্য হইতে যাহাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন। সুতরাং তাহারা ক্রোধের উপর ক্রোধের পাত্র হইল। কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি রহিয়াছে। এবং যখন তাহাদিগকে বলা হয়, আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন তাহাতে ঈমান আনয়ন কর, তাহারা বলে, আমাদের প্রতি যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে আমরা তাহাতে বিশ্বাস করি। অথচ তাহা ব্যতীত সব কিছুই তাহারা প্রত্যাখ্যান করে, যদিও উহা সত্য এবং যাহা তাহাদের নিকট আছে তাহার সমর্থক। বল, যদি তোমরা মু'মিন হইতে তবে কেন তোমরা অতীতে আল্লাহ্ নবীগণকে হত্যা করিয়াছিলে" (২:৮৭-৯১)?
উক্ত আয়াতসমূহ এবং এই জাতীয় কুরআন-হাদীছের আরও বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ রিসালাতের মত মহান মর্যাদা কেন বানু ইসরাঈল বংশে না দিয়া ইসমাঈল বংশে দান করিলেন অথবা কেন তাঁহার নির্বাচিত বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে দান করিলেন, ইহা অবিশ্বাসীদের একটা ঈর্ষার কারণও ছিল। এইজন্য বুঝিয়া শুনিয়া তাহারা নষী-রসূলদের প্রতি, বিশেষত শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্ (স)-এর প্রতি অন্তরে বিদ্বেষ পোষণ করিত। এজন্য সাধারণভাবে সকল নবী-রাসূলকে, বিশেষত বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-কেই নির্যাতনের শিকার হইতে হয়। তাই নবী কারীম (স) বলেন:
"اَشَدُّ النَّاسِ ابْتِلاء الانبياء ثم امثلهم ثم امثلهم" “সবচেয়ে কঠোর পরীক্ষা গিয়াছে নবী-রাসূলগণের উপর, তারপর তাহাদের সহিত যাহাদের সামঞ্জস্য সর্বাধিক তাহাদের উপর, তারপর তাহাদের সহিত যাহাদের সর্বাধিক সামঞ্জস্য তাহাদের উপর” (মুসনাদে আহমাদ, ৬খ; ১খ; আরও দ্র. বুখারী, কিতাবুল মারদা; ইব্‌ন মাজা, ফিতান; সুনানুদ দারিমী, রিকাক)।
উপরিউক্ত আয়াতসমূহের বর্ণনা আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের উপর বিশেষভাবে প্রযোজ্য। কেননা তাহারা তাহাদের নবী-রাসূলগণের যুগে এবং তাঁহাদের উপর নাযিলকৃত কিতাবসমূহের মাধ্যমে শেষ নবীর আগমন সংবাদ নিশ্চিতভাবে অবগত ছিল। আল-কুরআন ভাষায়:
الَّذِينَ أَتَيْنَهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَانَهُمْ.
“আমি যাহাদিগকে কিতাব দিয়াছি তাহারা তাহাকে সেইরূপ জানে যেইরূপ তাহারা তাহাদের সন্তানগণকে চিনে” (২: ১৪৬)।
এতদসত্ত্বেও তাহারা জানিয়া শুনিয়া সত্য প্রত্যাখ্যান করিত এবং নবী করীম (স)-কে নানাভাবে কায়ক্লেশে জর্জরিত করিত। কিন্তু কিতাবীদের এই বিদ্বেষ ও নির্যাতনের শিকার নবী করীম (স) প্রথম যুগে হন নাই, এমনকি নবুওয়াত লাভের প্রথম তিন বৎসর পর্যন্ত তাঁহার নিজ সম্প্রদায়ও তাঁহার প্রতি রুষ্ট বা বিদ্বিষ্ট ছিল বলিয়া তেমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি সর্বপ্রথম নির্যাতন শুরু হয় তাঁহার নবুওয়াত লাভের তিন বৎসর পর যখন তাঁহার প্রতি আয়াত নাযিল হইল:
وَانْذِرْ عَشِيْرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ.
“(হে রাসূল) তোমার নিকটাত্মীয়দিগকে সতর্ক করিয়া দাও” (২৬: ২১৪) আরো নাযিল হইল:
فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ.
"অতএব তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হইয়াছ তাহা প্রকাশ্যে প্রচার কর" (১৫: ৯৪)।
হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, যখন وَأَنْذِرْ عَشِيْرَتَكَ الْأَقْرَبَيْنَ আয়াত অবতীর্ণ হইল তখন রাসূলুল্লাহ (স) সাফা পাহাড়ের উপর আরোহণ করিয়া লোকজনকে উচ্চ কণ্ঠে আহ্বান জানাইলেন: 'হে ফিহরের বংশধরগণ! হে কুরাইশ বংশীয় আদীর বংশধরগণ!' তাঁহার এইরূপ আকুল আহ্বান শুনিয়া লোকজন সমবেত হইল। তখন তিনি বলিলেন: 'আচ্ছা! আমি যদি তোমাদিগকে সংবাদ দেই যে, পাহাড়ের ঐদিকে একটি অশ্বারোহী বাহিনী তোমাদের উপর হামলার জন্য উদ্যত, তাহা হইলে তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করিবে?' তাহারা জবাব দিল, 'আলবৎ। কেননা আমরা তো তোমাকে কোন দিন সত্য ছাড়া মিথ্যা বলিতে উনি নাই।' তখন তিনি বলিলেন : আমি তোমাদিগকে অতি নিকটের এক কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করিতেছি। তখন আবু লাহাব বলিয়া উঠিল:
তব্‌ বান লাকা লি হাজা জামাতনা ?
‘তুমি ধ্বংস হও হে মুহাম্মাদ! এই কথাটি বলিবার জন্যই কি তুমি আমাদিগকে সমবেত করিয়াছ?’ তখনই নাযিল হয় : তাব্বাত ইয়াদা আবি লাহাবিওঁ ওয়া তাব্বা (ধ্বংস হউক আবু লাহাবের দুই হস্ত এবং ধ্বংস হউক সে নিজেও; ১১১ সূরা লাহাব), বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, তাফসীর অধ্যায়, (২খ; ১২খ; কিতাবুল মুস্তাফা, মুহাম্মাদ খালীদ আল-খাতিব সংকলিত, মিসর)।
এই ঘটনার অপর অংশে ইমাম মুসলিম (র) তদীয় ‘সহীহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এই সংক্রান্ত হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন, এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার স্বজনদিগকে আহবান করিলেন ও বলিলেন, “হে কুরায়শ দল! তোমরা নিজদিগকে (জাহান্নাম হইতে) রক্ষা কর। হে বানু ফিহর! নিজেদের জাহান্নাম হইতে রক্ষা কর। আমি তোমাদিগকে আল্লাহর শান্তি হইতে রক্ষা করিতে পারিব না। হে মুহাম্মাদ তনয়া ফাতিমা! নিজেকে জাহান্নাম হইতে বাঁচাও। আমি তোমাদিগকে আল্লাহর শাস্তি হইতে রক্ষা করিতে পারিব না” (দ্র. সহীহ মুসলিম, ১খ; সহীহ বুখারী, ১খ)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00