📄 হযরত আমর ইব্ন আবাসা (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত আমর ইবন আবাসা (রা) বলেন, আমি প্রথম হইতেই প্রতিমা পূজা হইতে বিরত ছিলাম। এইগুলিকে ভ্রান্ত বলিয়া জ্ঞান করিতাম আর এইসব প্রতিমাকে সামান্য পাথর ছাড়া কিছুই মনে করিতাম না। অতঃপর মক্কা সম্পর্কে খবরাখবর রাখে এমন এক লোকের নিকট রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে জানিতে পারিয়া মক্কার উদ্দেশে সওয়ারীতে আরোহণ করিলাম। মক্কায় পৌঁছিয়া অতি গোপনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাত করিলাম। তাঁহার সম্প্রদায় তখন তাঁহার বিরোধিতা করিতেছিল। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনি কে? তিনি বলিলেন, আমি আল্লাহ্ নবী। জিজ্ঞাসা করিলাম, নবী কি? তিনি বলিলেন, আল্লাহ্র রাসূল। জিজ্ঞাস করিলাম, আপনাকে কি আল্লাহ পাঠাইয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ, পাঠাইয়াছেন। জিজ্ঞাসা করিলাম, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে কি পয়গাম দিয়া পাঠাইয়াছেন? তিনি বলিলেন, তাহা এই যে, আল্লাহকে এক জানিতে হইবে, তাঁহার সহিত কোন কিছু শরীক করা যাইবে না। প্রতিমা ভাঙ্গিতে হইবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখিতে হইবে।
রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন যে,
بأن تعبد الله وحده لاشريك له وتكسير الاصنام وتصل الأرحام.
"তুমি এক আল্লাহ্ ইবাদত করিবে, যাঁহার কোন শরীক নাই এবং প্রতিমা ভাঙ্গিয়া ফেলিবে। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখিবে"।
আমর ইব্ন আবাসা (রা) বলেন: আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, এই ব্যাপারে আপনার অনুগামী কে? তিনি বলিলেন, "একজন স্বাধীন ব্যক্তি এবং একজন গোলাম।" অর্থাৎ হযরত আবূ বাক্র ইব্ন আবূ কুহাফা (রা) এবং তাঁহার আযাদকৃত গোলাম বিলাল (রা)।
আমি বলিলাম, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যেই পয়গামসহ পাঠাইয়াছেন তাহা কতইনা উত্তম! আমি আপনার প্রতি ঈমান আনিয়াছি এবং আপনাকে সত্য বলিয়া স্বীকার করিতেছি। এখন কি আমি আপনার সহিত অবস্থান করিব? এই ব্যাপারে আপনার অভিমত কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন,
قد تترى كراهة الناس لما جئت به فامكن في أهلك فاذا سمعتم بي قد خرجت مخرجی فائتینی
"তুমি তো এখন লক্ষ্য করিতেছ, আমি যাহা নিয়া আসিয়াছি তাহা লোকেরা কেমন অপছন্দ করিতেছে। সুতরাং তুমি তোমার পরিবারের সঙ্গে গিয়া থাক। যখন তোমরা আমার সম্পর্কে শুনিবে যে, আমি প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়া শুরু করিয়াছি, তখন তুমি আমার নিকট আসিও”।
হযরত আমর ইব্ন আবাসা (রা) বলেন, ইসলাম গ্রহণ করিয়া আমি আমার পরিবারের নিকট ফিরিয়া গেলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) যখন মদীনায় হিজরত করিলেন তখন একদিন মক্কার কিছু লোক আমাদের নিকট আসিলে আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, মক্কার সেই ব্যক্তির কি খবর, যিনি তোমাদের নিকট আসিয়াছেন? তাহারা বলিল, তাঁহার সম্প্রদায় তাঁহাকে হত্যা করিতে চেষ্টা করিয়াছিল। কিন্তু তাহারা ইহাতে সফলকাম হয় নাই। ইহাতে তাঁহার ও তাঁহার সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হইল এবং আমরা তখন দ্রুত তথা হইতে চলিয়া আসিলাম। হযরত আমর ইব্ন আবাসা (রা) বলেন, অতঃপর আমি মদীনায় গিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হাজির হইয়া আরয করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আমাকে চিনিতে পারিয়াছেন? রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন,
نعم الست انت الذي اتيتني بمكة
"হাঁ, তুমি কি সেই ব্যক্তি নহ, যে মক্কায় আমার নিকট আসিয়াছিল”।
📄 হযরত আবূ যার (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, হযরত আবূ যার গিফারী (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াত সম্পর্কে জানিতে পারিলেন তখন তাঁহার ভাই উনাইসকে তিনি বলিলেন, "তুমি মক্কায় গিয়া সেই ব্যক্তি সম্পর্কে জানিয়া আস যিনি দাবি করিয়াছেন যে, তিনি নবী এবং তাঁহার নিকট আকাশ হইতে ওহী নাযিল হয়। তাঁহার কথা শুনিয়া আমার নিকট আসিয়া ইহার বিবরণ জানাও”। উনাইস মক্কায় পৌঁছিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর কথা শুনিয়া আবূ যার (রা)-এর নিকট ফিরিয়া আসেন। অতঃপর বলেন, 'আমি তাঁহাকে দেখিয়াছি যে, তিনি লোকজনকে উত্তম চরিত্র-মাধুর্যের কথা বলেন। তাঁহার কথায় মোটেও কবিতার ছোঁয়া নাই।' আবূ যার (রা) বলিলেন, 'তোমার কথায় আমি তৃপ্ত হইতে পারিলাম না।' অতঃপর তিনি সফরের পাথেয় ও পানির মশক নিয়া বাহির হইয়া পড়িলেন এবং মক্কায় আসিয়া মসজিদে উপস্থিত হইলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স)-কে তালাশ করিলেন। কিন্তু তিনি যেহেতু তাঁহাকে চিনিতেন না, তাই তাঁহার সম্পর্কে কাহাকেও কিছু জিজ্ঞাসা করা সমীচীন মনে করিলেন না। অবশেষে রাত্র হইলে তিনি মসজিদে শুইয়া পড়িলেন। হযরত আলী (রা) মসজিদে আসিয়া তাঁহাকে দেখিয়া বুঝিতে পারিলেন যে, ইনি কোন মুসাফির। তাঁহাকে তিনি নিজ গৃহে নিয়া গেলেন। কিন্তু কেহই কাহাকেও কোন কিছু জিজ্ঞাসা করিলেন না। এইভাবেই সকাল হইয়া গেল। পরদিনও তিনি মসজিদে আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে তালাশ করিয়া পাইলেন না। রাত্র হইলে শুইয়া পড়িলেন। হযরত আলী (রা) তাঁহার পাশ দিয়া যাওয়ার সময় তাঁহাকে উঠাইয়া সঙ্গে নিয়া গেলেন। কিন্তু কেহই কাহাকেও কিছু জিজ্ঞাসা করিলেন না। তৃতীয় দিনও এইরূপ ঘটিল। তখন হযরত আলী (রা) তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, 'তুমি কেন এখানে আসিয়াছ তাহা কি আমাকে বলিতে পার?' তিনি বলিলেন, 'তুমি যদি আমার সহিত এই অঙ্গীকার কর যে, তুমি আমাকে সঠিক সংবাদ দিবে, তাহা হইলে আমি তোমাকে বলিতে পারি।' তিনি রাজী হইলেন। আবূ যার (রা) সব বলিলেন। আলী (রা) বলিলেন, 'নিশ্চয় তিনি হক এবং তিনি আল্লাহ্র রাসূল। সকাল বেলা তুমি আমার অনুসরণ করিয়া চলিও। কিন্তু বিরুদ্ধবাদীদের কারণে আমার খুব আশংকা হয়। তাই আমি পথ চলার সময় যদি তোমার জন্য আশংকাজনক কিছু দেখি, তখন আমি পেশাব করিবার বাহানায় বসিয়া যাইব। তুমি হাঁটিতে থাকিবে। এইভাবে আমি তোমাকে তাঁহার নিকট পৌঁছাইয়া দিব।' পরদিন তিনি হযরত আলী (রা)-এর সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হাজির হইলেন এবং তাঁহার কথা শুনিলেন এবং সেই স্থানেই মুসলমান হইয়া গেলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে বলিলেন, ارجع الى قومك فأخبرهم حتى يأتيك امرى "তুমি তোমার গোত্রের নিকট ফিরিয়া যাও এবং তাহাদেরকে ইহার সংবাদ দাও। তোমার নিকট আমার নির্দেশ পৌঁছিয়া যাইবে।” কিন্তু তিনি আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে প্রেরণ করিয়াছেন। আমি চিৎকার করিয়া শত্রুদের মধ্যে ইহা ঘোষণা করিব। ইহা বলিয়া তিনি মসজিদে আসিয়া উচ্চৈস্বরে ঘোষণা করিলেন اشهد ان لا اله الا الله وأن محمدا رسول الله
ইহা শুনিয়া কুরায়শরা তাঁহাকে প্রহার করিতে লাগিল। তখন হযরত আব্বাস (রা) তাঁহাকে আড়াল করিয়া তাহাদেরকে ভর্ৎসনা করিলেন এবং বলিলেন, তোমরা কি জান না, ইনি গিফার গোত্রের লোক? তোমাদের ব্যবসায়ের উদ্দেশে সিরিয়া যাওয়ার পথেই ইহাদের গিফার গোত্র। তখন তাহারা তাঁহাকে ছাড়িয়া দেয়। দ্বিতীয় দিন সকালেও তিনি অনুরূপ ঘোষণা করিলে প্রহৃত হন এবং আব্বাস (রা) আসিয়া তাঁহাকে রক্ষা করেন।