📄 সর্বপ্রথম যিনি ইসলাম গ্রহণ করেন
এই ব্যাপারে সকলেই একমত যে, সর্বপ্রথম হযরত খাদীজা (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। কেহ কেহ বলিয়াছেন, ওয়ারাকা ইবন নাওফাল সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন। মুকাদ্দিমা আবূ নু'আয়মে আছে, ওয়ারাকা ইবন নাওফাল রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিয়াছিলেন,
ابشر فأنا اشهد انك الذي بشر به ابن مريم وانك على مثل ناموس موسى وانك نبي مرسل وانك ستؤمر بالجهاد وان ادرك ذالك لا جاهدن معك.
"আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনিই সেই সত্তা, যাঁহার ব্যাপারে মরিয়ম তনয় ঈসা (আ) সুসংবাদ দিয়াছেন। নিশ্চয় আপনার প্রতিই মূসা (আ)-এর নামূস (জিবরাঈল) নাযিল হইয়াছেন। আপনি প্রেরিত নবী। আপনি নিশ্চয় জিহাদের জন্য অচিরেই আদিষ্ট হইবেন। আমি যদি তখন আপনাকে পাই, তবে আপনার সহিত জিহাদে অংশ গ্রহণ করিব।"
ইহার দ্বারা বুঝা যাইতেছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর রিসালাতে ঈমান আনিয়াছিলেন। আল্লামা বালীকানী বলিয়াছেন, বরং পুরুষদের মধ্যে তিনি প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন।
ওয়ারাকা ইবন নাওফাল যখন ইন্তিকাল করেন তখন রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন,
لقد رأيت السق في الجنة عليه ثياب الحرير لأنه امن بي وصدقني.
"আমি ওয়ারাকাকে জান্নাতের প্রাসাদে লাল কাপড় পরিহিত অবস্থায় দেখিয়াছি। কারণ তিনি আমার প্রতি ঈমান আনিয়াছিলেন এবং আমাকে সত্য বলিয়া স্বীকার করিয়াছিলেন"।
হযরত আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। হযরত খাদীজা (রা) ওয়ারাকা ইবন নাওফাল সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন,
قد رأيته فرأيت عليه ثياب بياض فأحسبه لوكان من اهل النار لم يكن عليه ثياب بياض.
"আমি তাঁহাকে (ওয়ারাকাকে) দেখিয়াছি। আমি দেখিলাম তাঁহার গায়ে সাদা কাপড়। আমি বুঝিয়া নিয়াছি যে, তিনি যদি জাহান্নামী হইতেন, তাহা হইলে তাঁহার গায়ে সাদা কাপড় থাকিত না।”
ইবন ইসহাক বলেন, পুরুষদের মধ্যে প্রথম হযরত আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি ঈমান আনিয়াছেন, তাঁহার সঙ্গে নামায পড়িয়াছেন এবং তাঁহাকে সত্য বলিয়া মানিয়া নিয়াছেন। তখন তাঁহার বয়স ছিল দশ বৎসর। তিনি ইসলামের পূর্ব হইতেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হন।
অন্যরা বলিয়াছেন, এই উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম আবূ বাক্স (রা) ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন। ইমাম যুহরী বলিয়াছেন, ক্রীতদাসদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন যায়দ ইবন হারিছা (রা) এবং মহিলাদের মধ্যে খাদীজা (রা)।
হযরত ইবন মাসউদ (রা) বলিয়াছেন,
اول من اظهر الاسلام سبعة رسول الله صلى الله عليه وسلم وابوبكر وعمار وامه سميه وصهب وبلال والمقداد .
"সর্বপ্রথম সাতজন ইসলাম প্রকাশ করিয়াছেন: (১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম, (২) আবূ বাক্স (রা), (৩) আম্মার (রা), (৪) তাঁহার মা সুমাইয়া (রা), (৫) সুহায়ব (রা), (৬) বিলাল (রা) এবং (৭) মিন্দাদ (রা)।”
অন্য বর্ণনায় হযরত মিন্দাদের পরিবর্তে হযরত খাব্বাবের নাম পাওয়া যায়।
হযরত হারিস (র) বলেন, আমি হযরত আলী (রা)-এর নিকট শুনিয়াছি, তিনি বলিয়াছেন, اول من اسلم من الرجال أبو بكر الصديق واول من صلى مع النبي صلى الله عليه وسلم من الرجال على بن ابي طالب.
"পুরুষদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) এবং পুরুষদের মধ্যে প্রথম রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে নামায পড়িয়াছেন আলী ইব্ন আবূ তালিব”।
মুহাম্মাদ ইব্ন কা'ব বলিয়াছেন, 'এই উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম মুসলমান হইয়াছেন খাদীজা (রা) এবং দুইজন পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন-আবূ বাক্স (রা), আলী (রা)। আলী (রা) আবু বাক্স (রা)-এর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। আর আলী (রা) তাঁহার পিতার ভয়ে ইসলামের কথা গোপন রাখিতেন। পরে তাঁহার পিতার সহিত সাক্ষাত হইলে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছ? আলী (রা) বলেন, হাঁ। তাঁহার পিতা বলেন, 'তবে তোমার চাচার পুত্রকে শক্তিশালী ও সাহায্য করিও।' মুহাম্মাদ ইব্ন কা'ব বলেন, সর্বপ্রথম ইসলামের কথা প্রকাশ করেন হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা)।
ইবনুস্ সালাহ বলিয়াছেন, যথার্থ কথা হইল, স্বাধীন পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন আবূ বাক্স (রা), শিশু-কিশোরদের মধ্যে আলী (রা), মহিলাদের মধ্যে খাদীজা (রা), আযাদকৃত গোলামদের মধ্যে যায়দ ইব্ন হারিছা (রা) এবং গোলামদের মধ্যে বিলাল, (রা)।
ইমাম আবূ হানীফা (র)-ও এইভাবেই বলিয়াছেন, اول من اسلم من الرجال الاحرار ابو بكر ومن النساء خديجة ومن المولى زيد بن حارثة ومن الغلمان علی بن ابی طالب رضى الله عنهم اجمعين.
"সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন স্বাধীন পুরুষদের মধ্যে আবূ বাক্স (রা), মহিলাদের মধ্যে খাদীজা (রা), আযাদকৃত গোলামদের মধ্যে যায়দ ইবন হারিছা (রা) এবং বালকদের মধ্যে আলী (রা)”।
হযরত শা'বী (র) বলেন, আমি ইব্ন আব্বাস (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, সর্বপ্রথম কে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন? তিনি বলিলেন, 'তুমি কি হযরত হাসান ইব্ন ছাবিত (রা)-এর কবিতাটি শোন নাই? তাহা হইল,
اذا تذكرت سبوى من أخي ثقة - تأذكر اخاك ابا بكر بما فعلا . بعد النبي واوفاها بما حملا . - خير الصبرية اتقاها واعدلها واول الناس قدما صدق الرسلا. - والثاني التالي المحمود مشهده
"যদি আমার বিশ্বাসভাজন কোন ভাইয়ের দুঃখ-কষ্টের কথা আলোচনা করিতে চাও, তাহা হইলে তোমার ভাই আবূ বাক্স (রা)-এর অবদানের কথা আলোচনা কর। তিনি যাহা করিয়াছিলেন। সকল মানুষের মধ্যে (উম্মতের মধ্যে) তিনিই তো সর্বাধিক মুত্তাকী, নীতিবান। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পর তিনিই সর্বাধিক তাঁহার সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করিয়াছেন। তিনিই সর্বাধিক দুঃখ-কষ্ট বহন করিয়াছেন। দ্বিতীয়ত তিনিই প্রশংসিত উল্লেখযোগ্য এবং সকল মানুষের মধ্যে তিনিই রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে সর্বপ্রথম সত্য বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনিই সকলের অগ্রগণ্য"।
عن أبي سعيد الخدرى رضى الله عنه قال قال ابو بكر الست احق الناس بها الست اول من اسلم الست صاحب كذا .
"হযরত আবু সাঈদ খুদ্রী (রা) বলেন, আবূ বাক্স (রা) বলিয়াছেন, "মানুষের মধ্যে অমুক বিষয়ে আমিই কি সর্বাধিক উপযুক্ত নহি? আমিই কি সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে? আমিই কি অমুক বিষয়ের অধিকারী নহি”।
অধিকন্তু সকলের মধ্যে হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর ইসলাম গ্রহণই তখন সবচাইতে বেশি ফলদায়ক ছিল। কারণ তিনিই কুরায়শদের মধ্যে একজন উল্লেখযোগ্য নেতা ছিলেন, সর্বমান্য ছিলেন, ইসলামের প্রতি প্রথম আহবানকারী ছিলেন, অধিক ভালবাসা ও আনুগত্য প্রদর্শনপূর্বক আল্লাহর পথে একনিষ্ঠ সম্পদ ব্যয়কারী ছিলেন।
উপরন্তু হযরত খাদীজা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র স্ত্রী ছিলেন এবং হযরত আলী (রা) বালক ছিলেন ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সুতরাং একজন গৃহিণী এবং একজন বালকের এই ক্ষমতা থাকে না যে, তাহারা বড়দের মতামতকে অগ্রাহ্য করিতে পারিবে। ইহার বিপরীতে হযরত আবূ বাক্স (রা) ছিলেন পূর্ণ স্বাধীন। তিনি কাহারও অধীনস্থ ছিলেন না। কাহারও বাধা, কাহারও অনুযোগ, কাহারও চাপ প্রয়োগ এবং কাহারও অধীনস্থ থাকিয়া তাঁহাকে ইসলাম কবুল করিতে হয় নাই। স্বতঃপ্রণোদিত হইয়া তাঁহার ইসলাম গ্রহণ নিশ্চয় শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। ইহা ছাড়া হযরত খাদীজা (রা) ও আলী (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের প্রতিক্রিয়া তখন তাঁহাদের নিজস্ব গণ্ডি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। আর আবূ বাক্স (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ বিস্তৃত ছিল। কারণ, তিনি ইসলামে দাখিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইসলামের দাওয়াত ও প্রচার-প্রসারে নিবিষ্ট হইয়া যান। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে সহযোগিতা করেন এবং তাঁহার জন্য একটি শক্তিতে পরিণত হন। অন্যদিকে হযরত আলী (রা) বালক ছিলেন। তিনি তখন আর কতটুকু ইসলামের জন্য সহযোগিতা করিতে পারিতেন? তিনি তো তাঁহার ইসলাম গ্রহণ নিজের পিতার নিকটই গোপন রাখিয়াছিলেন।
📄 হযরত আম্মার (রা) ও সুহায়ব (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত আম্মার ইবন ইয়াসার (রা) বলেন, দারুল আরকামের দরজায় হযরত সুহায়ব ইব্ন সিনান (রা)-এর সহিত আমার সাক্ষাত হইল এবং তিনি তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে প্রবেশ করিতেছিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমার অভিপ্রায় কি? সুহায়ব (রা)-ও আমাকে একই কথা জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি অভিপ্রায় নিয়া আসিয়াছ? আমি বলিলাম, আমার অভিপ্রায় হইল, তাঁহার নিকট হাজির হইয়া আমি তাঁহার কথা শুনিব। অতঃপর আমরা উভয়ে দারুল আরকামে প্রবেশ করিলে রাসূলুল্লাহ (স) আমাদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাইলেন। আমরা তখন ইসলাম গ্রহণ করিলাম। অতঃপর আমরা সেইখানে একদিন অবস্থান করিয়া পরদিন গোপনে সেইখান হইতে বাহির হইলাম। হযরত আম্মার ও সুহায়ব (রা) ৩০ জনের পর ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন।
📄 হযরত আমর ইব্ন আবাসা (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত আমর ইবন আবাসা (রা) বলেন, আমি প্রথম হইতেই প্রতিমা পূজা হইতে বিরত ছিলাম। এইগুলিকে ভ্রান্ত বলিয়া জ্ঞান করিতাম আর এইসব প্রতিমাকে সামান্য পাথর ছাড়া কিছুই মনে করিতাম না। অতঃপর মক্কা সম্পর্কে খবরাখবর রাখে এমন এক লোকের নিকট রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে জানিতে পারিয়া মক্কার উদ্দেশে সওয়ারীতে আরোহণ করিলাম। মক্কায় পৌঁছিয়া অতি গোপনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাত করিলাম। তাঁহার সম্প্রদায় তখন তাঁহার বিরোধিতা করিতেছিল। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনি কে? তিনি বলিলেন, আমি আল্লাহ্ নবী। জিজ্ঞাসা করিলাম, নবী কি? তিনি বলিলেন, আল্লাহ্র রাসূল। জিজ্ঞাস করিলাম, আপনাকে কি আল্লাহ পাঠাইয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ, পাঠাইয়াছেন। জিজ্ঞাসা করিলাম, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে কি পয়গাম দিয়া পাঠাইয়াছেন? তিনি বলিলেন, তাহা এই যে, আল্লাহকে এক জানিতে হইবে, তাঁহার সহিত কোন কিছু শরীক করা যাইবে না। প্রতিমা ভাঙ্গিতে হইবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখিতে হইবে।
রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন যে,
بأن تعبد الله وحده لاشريك له وتكسير الاصنام وتصل الأرحام.
"তুমি এক আল্লাহ্ ইবাদত করিবে, যাঁহার কোন শরীক নাই এবং প্রতিমা ভাঙ্গিয়া ফেলিবে। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখিবে"।
আমর ইব্ন আবাসা (রা) বলেন: আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, এই ব্যাপারে আপনার অনুগামী কে? তিনি বলিলেন, "একজন স্বাধীন ব্যক্তি এবং একজন গোলাম।" অর্থাৎ হযরত আবূ বাক্র ইব্ন আবূ কুহাফা (রা) এবং তাঁহার আযাদকৃত গোলাম বিলাল (রা)।
আমি বলিলাম, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যেই পয়গামসহ পাঠাইয়াছেন তাহা কতইনা উত্তম! আমি আপনার প্রতি ঈমান আনিয়াছি এবং আপনাকে সত্য বলিয়া স্বীকার করিতেছি। এখন কি আমি আপনার সহিত অবস্থান করিব? এই ব্যাপারে আপনার অভিমত কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন,
قد تترى كراهة الناس لما جئت به فامكن في أهلك فاذا سمعتم بي قد خرجت مخرجی فائتینی
"তুমি তো এখন লক্ষ্য করিতেছ, আমি যাহা নিয়া আসিয়াছি তাহা লোকেরা কেমন অপছন্দ করিতেছে। সুতরাং তুমি তোমার পরিবারের সঙ্গে গিয়া থাক। যখন তোমরা আমার সম্পর্কে শুনিবে যে, আমি প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়া শুরু করিয়াছি, তখন তুমি আমার নিকট আসিও”।
হযরত আমর ইব্ন আবাসা (রা) বলেন, ইসলাম গ্রহণ করিয়া আমি আমার পরিবারের নিকট ফিরিয়া গেলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) যখন মদীনায় হিজরত করিলেন তখন একদিন মক্কার কিছু লোক আমাদের নিকট আসিলে আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, মক্কার সেই ব্যক্তির কি খবর, যিনি তোমাদের নিকট আসিয়াছেন? তাহারা বলিল, তাঁহার সম্প্রদায় তাঁহাকে হত্যা করিতে চেষ্টা করিয়াছিল। কিন্তু তাহারা ইহাতে সফলকাম হয় নাই। ইহাতে তাঁহার ও তাঁহার সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হইল এবং আমরা তখন দ্রুত তথা হইতে চলিয়া আসিলাম। হযরত আমর ইব্ন আবাসা (রা) বলেন, অতঃপর আমি মদীনায় গিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হাজির হইয়া আরয করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আমাকে চিনিতে পারিয়াছেন? রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন,
نعم الست انت الذي اتيتني بمكة
"হাঁ, তুমি কি সেই ব্যক্তি নহ, যে মক্কায় আমার নিকট আসিয়াছিল”।
📄 হযরত আবূ যার (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, হযরত আবূ যার গিফারী (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াত সম্পর্কে জানিতে পারিলেন তখন তাঁহার ভাই উনাইসকে তিনি বলিলেন, "তুমি মক্কায় গিয়া সেই ব্যক্তি সম্পর্কে জানিয়া আস যিনি দাবি করিয়াছেন যে, তিনি নবী এবং তাঁহার নিকট আকাশ হইতে ওহী নাযিল হয়। তাঁহার কথা শুনিয়া আমার নিকট আসিয়া ইহার বিবরণ জানাও”। উনাইস মক্কায় পৌঁছিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর কথা শুনিয়া আবূ যার (রা)-এর নিকট ফিরিয়া আসেন। অতঃপর বলেন, 'আমি তাঁহাকে দেখিয়াছি যে, তিনি লোকজনকে উত্তম চরিত্র-মাধুর্যের কথা বলেন। তাঁহার কথায় মোটেও কবিতার ছোঁয়া নাই।' আবূ যার (রা) বলিলেন, 'তোমার কথায় আমি তৃপ্ত হইতে পারিলাম না।' অতঃপর তিনি সফরের পাথেয় ও পানির মশক নিয়া বাহির হইয়া পড়িলেন এবং মক্কায় আসিয়া মসজিদে উপস্থিত হইলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স)-কে তালাশ করিলেন। কিন্তু তিনি যেহেতু তাঁহাকে চিনিতেন না, তাই তাঁহার সম্পর্কে কাহাকেও কিছু জিজ্ঞাসা করা সমীচীন মনে করিলেন না। অবশেষে রাত্র হইলে তিনি মসজিদে শুইয়া পড়িলেন। হযরত আলী (রা) মসজিদে আসিয়া তাঁহাকে দেখিয়া বুঝিতে পারিলেন যে, ইনি কোন মুসাফির। তাঁহাকে তিনি নিজ গৃহে নিয়া গেলেন। কিন্তু কেহই কাহাকেও কোন কিছু জিজ্ঞাসা করিলেন না। এইভাবেই সকাল হইয়া গেল। পরদিনও তিনি মসজিদে আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে তালাশ করিয়া পাইলেন না। রাত্র হইলে শুইয়া পড়িলেন। হযরত আলী (রা) তাঁহার পাশ দিয়া যাওয়ার সময় তাঁহাকে উঠাইয়া সঙ্গে নিয়া গেলেন। কিন্তু কেহই কাহাকেও কিছু জিজ্ঞাসা করিলেন না। তৃতীয় দিনও এইরূপ ঘটিল। তখন হযরত আলী (রা) তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, 'তুমি কেন এখানে আসিয়াছ তাহা কি আমাকে বলিতে পার?' তিনি বলিলেন, 'তুমি যদি আমার সহিত এই অঙ্গীকার কর যে, তুমি আমাকে সঠিক সংবাদ দিবে, তাহা হইলে আমি তোমাকে বলিতে পারি।' তিনি রাজী হইলেন। আবূ যার (রা) সব বলিলেন। আলী (রা) বলিলেন, 'নিশ্চয় তিনি হক এবং তিনি আল্লাহ্র রাসূল। সকাল বেলা তুমি আমার অনুসরণ করিয়া চলিও। কিন্তু বিরুদ্ধবাদীদের কারণে আমার খুব আশংকা হয়। তাই আমি পথ চলার সময় যদি তোমার জন্য আশংকাজনক কিছু দেখি, তখন আমি পেশাব করিবার বাহানায় বসিয়া যাইব। তুমি হাঁটিতে থাকিবে। এইভাবে আমি তোমাকে তাঁহার নিকট পৌঁছাইয়া দিব।' পরদিন তিনি হযরত আলী (রা)-এর সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হাজির হইলেন এবং তাঁহার কথা শুনিলেন এবং সেই স্থানেই মুসলমান হইয়া গেলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে বলিলেন, ارجع الى قومك فأخبرهم حتى يأتيك امرى "তুমি তোমার গোত্রের নিকট ফিরিয়া যাও এবং তাহাদেরকে ইহার সংবাদ দাও। তোমার নিকট আমার নির্দেশ পৌঁছিয়া যাইবে।” কিন্তু তিনি আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে প্রেরণ করিয়াছেন। আমি চিৎকার করিয়া শত্রুদের মধ্যে ইহা ঘোষণা করিব। ইহা বলিয়া তিনি মসজিদে আসিয়া উচ্চৈস্বরে ঘোষণা করিলেন اشهد ان لا اله الا الله وأن محمدا رسول الله
ইহা শুনিয়া কুরায়শরা তাঁহাকে প্রহার করিতে লাগিল। তখন হযরত আব্বাস (রা) তাঁহাকে আড়াল করিয়া তাহাদেরকে ভর্ৎসনা করিলেন এবং বলিলেন, তোমরা কি জান না, ইনি গিফার গোত্রের লোক? তোমাদের ব্যবসায়ের উদ্দেশে সিরিয়া যাওয়ার পথেই ইহাদের গিফার গোত্র। তখন তাহারা তাঁহাকে ছাড়িয়া দেয়। দ্বিতীয় দিন সকালেও তিনি অনুরূপ ঘোষণা করিলে প্রহৃত হন এবং আব্বাস (রা) আসিয়া তাঁহাকে রক্ষা করেন।