📄 হযরত যায়দ ইব্ন হারিছা (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
ইবন ইসহাক বলেন, ইহার পর যায়দ ইব্ন হারিছা ইব্ন শুরাবীল ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর ক্রীতদাস ছিলেন, পরে তাঁহাকে মুক্ত করেন। হযরত যায়দ (রা)-এর মা ছিলেন সু'দা বিন্তে ছা'লাবা। যায়দ (রা)-এর বয়স যখন ৮ বৎসর, তখন তাঁহার মা তাহাকে নিয়া আত্মীয়-স্বজনের সাক্ষাতে বাহির হন। পথে তাঁহারা দুস্যদের কবলে পড়েন এবং যায়দ (রা)-এর মা তাঁহাকে হারান। দস্যুরা যায়দ (রা)-কে আরবের হুবাশা নামক বাজারে বিক্রয় করিয়া দেয়। হাকীম ইব্ন হিযাম ইব্ন খুওয়ায়লিদ একবার শাম দেশ হইতে কিছু গোলাম খরীদ করিয়া আনেন। ইহাদের মধ্যে অল্প বয়স্ক যায়দ ইব্ন হারিসা (রা)-ও ছিলেন। হযরত খাদীজা (রা) হাকীম ইব্ন হিযামের ফুফু ছিলেন। তিনি তাঁহার ভ্রাতুষ্পুত্রের সহিত সাক্ষাত করিতে গেলে হাকীম বলেন, ফুফুজান! এই গোলামদের মধ্যে যাহাকে আপনার পছন্দ হয়, তাহাকে নিয়া যান। হযরত খাদীজা (রা) যায়দ (রা)-কে পছন্দ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) হযরত খাদীজা (রা)-এর নিকট যায়দ (রা)-কে দেখিলেন এবং যায়দ (রা)-কে খাদীজা (রা)-এর নিকট চাহিলেন। তখন হযরত খাদীজা (রা) যায়দ (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট অর্পণ করেন। রাসূলুল্লাহ (স) যায়দ (রা)-কে আযাদ করিয়া তাহাকে পোষ্য পুত্ররূপে নির্ধারণ করেন। এই ঘটনা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি ওহী নাযিলের পূর্বেকার।
হযরত যায়দ (রা)-এর পিতা হারিছা তাহার সন্তান (যায়দ)-কে দুর্বৃত্তরা ছিনাইয়া নেওয়ার ফলে অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং অনেক অশ্রুপাত করিয়া নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেন,
بكيت على زيد ولم ادر ما فعل - احي فيرجى ام اتى دونه الاجل. فوالله ما ادرى واني لسائل - اغا لك بعدى السهل ام غالك الجبل. وياليت شعري هل لك الدحراً - وبة فحسبى من الدنيا رجوعك لي بجل.
تذكرنيه الشمس عند طلوعها وتعرض ذكراه اذا غربها أفل. وان هبت الارواح هيجن ذكره فياطول ما حزني عليه وما وجل. سأعمل نص العيس في الأرض جاهدا ولا اسام التطواف أو تسام الابل. حیاتي او تأتي على منيتي فكل امریء فان وان غره الأمل.
“যায়দের জন্য আমি কত যে কাঁদিয়াছি! কিন্তু জানি না তাহার কি হইয়াছে! সে কি জীবিত আছে যে, তাহার জন্য কোন প্রত্যাশা করা যাইবে, নাকি মৃত্যু তাহার পথের প্রতিবন্ধক হইয়াছে! আল্লাহর শপথ! আমি জানি না। আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি, আমার নিকট হইতে অন্তর্হিত হওয়ার পর তোমাকে কি বিজন প্রান্তর ছিনাইয়া নিয়াছে, না কোন পাহাড়? হায়! আমি যদি জানিতে পারিতাম যে, তুমি কখনও ফিরিয়া আসিবে, তবে তোমার প্রত্যাগমন আমার আনন্দময় জীবন উপভোগের জন্য যথেষ্ট হইত। সূর্য তাহার উদয়কালে আমাকে তাহার স্মরণে বিভোর করিয়া তোলে এবং তাহার অস্তকালেও তাহার স্মরণ আমাকে বিভোর করিয়া দেয়। আর যখন বাতাস প্রবাহিত হয় তখন তাহার স্মরণ উম্মাতাল করিয়া তোলে। কত দীর্ঘ হইবে তাহার জন্য সংকটময় ও ব্যথা-বেদনার কাল! তাহার অবিরাম সন্ধানে কত দ্রুত ভূপৃষ্ঠ চষিয়া বেড়াইতেছি এবং কালের বিপর্যয়ও আমাকে ক্লিষ্ট-ক্লান্ত করিতে পারিতেছে না। হয়ত উটই ক্লিষ্ট-ক্লান্ত হইয়া পড়িতেছে। আজীবন এইভাবেই ঘুরিয়া বেড়াইব। বেড়াইতে বেড়াইতে মৃত্যু আসিয়া পড়িবে। মৃত্যু তো প্রত্যেকেরই আসে, যদিও প্রত্যাশার চোরাবালি আমাকে ধোঁকায় ফেলিয়া রাখিয়াছে"।
অতঃপর যায়দ (রা)-এর পিতা ও চাচা তাঁহার খোঁজে মক্কায় আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে লোকজনকে জিজ্ঞাসা করিলে লোকজন উত্তর দিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে আছেন। তাহারা উভয়ে সেখানে উপস্থিত হইয়া বলেন, হে আবদুল মুত্তালিবের পৌত্র! হে হাশিমের পৌত্র! হে সরদার পুত্র! আপনারা মহান কা'বার অধিবাসী এবং তাহার প্রতিবেশী। আপনারা অসহায়কে সাহায্য করেন। বন্দীর ভরণপোষণ করেন। আমাদের সন্তানের ব্যাপারে আপনার নিকট আমরা আসিয়াছি। এই মুক্তিপণের বিনিময়ে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। আমাদের প্রতি সদয় হউন। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, কে সেই গোলাম? তাহারা বলিলেন, যায়দ ইব্ন্ন হারিছা। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা ছাড়া আর কিছু নয় তো? তাহারা বলিল, না, সে কোথায়? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করুন। সে যদি আপনাদের সঙ্গ অবলম্বন করিয়া লয় তাহা হইলে সে তো আপনাদের সঙ্গে যাইবে। আর সে যদি আমার সহিত থাকিতে চায়, তাহা হইলে সে আমার সঙ্গেই থাকিবে। আমি তাহার ব্যাপারে জবরদস্তি করিব না। অতঃপর যায়দ (রা)-কে তিনি ডাকিয়া পাঠাইলেন। হযরত যায়দ (রা) আসিলে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি ইহাদিগকে চিন? যায়দ (রা) বলিলেন, হাঁ, চিনি। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহারা কে? তিনি বলিলেন, ইনি আমার পিতা আর ইনি আমার চাচা। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন,
انا من قد علمت ورأيت صحبتی فاخترنی او اخترهما .
“তুমি আমার ব্যাপারে অবগত আছ এবং আমার সংস্পর্শে আছ। এখন তোমার ইচ্ছা, যদি আমার কাছে থাকিতে চাও, তাহা হইলে আমার কাছে থাকিবে অথবা ইচ্ছা করিলে তাহাদের সঙ্গে যাইতে পারিবে”।
যায়দ (রা) বলেন,
ما انا بالذي اختار عليك احدا - انت منى بمكان الاب والعم.
“আমি আপনাকে ছাড়া আর কাহাকেও অবলম্বন করিতে পারিব না। আপনিই আমার জন্য পিতা এবং চাচা”।
ইহা শুনিয়া তাহারা বলিল, ধিক্ তোমাকে! তোমার পিতা, চাচা, পরিবার-পরিজন এবং আত্মীয়-স্বজনের উপর গোলামীকে প্রাধান্য দিতেছ? যায়দ (রা) বলিলেন, আমি এই মহান ব্যক্তির মাঝে এমন কিছু দেখিয়াছি যে, তাঁহাকে আমি কখনও ছাড়িয়া যাইতে পারিব না। রাসূলুল্লাহ (স) তখন তাহার হাত ধরিয়া তাহাকে কুরায়শদের এক সভায় নিয়া গিয়া বলিলেন,
اشهدكم أن زيدا ابنى يرثه ويرثني
“তোমরা সাক্ষী থাক, আজ হইতে যায়েদ আমার পুত্র। আমরা পরস্পরের উত্তরাধিকারী হইব”।
যায়দ (রা)-এর পিতা ও চাচা যখন ইহা দেখিলেন, তখন তাহারা অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন এবং আনন্দ চিত্তে ফিরিয়া গেলেন। তখন হইতে যায়দ (রা)-কে মুহাম্মাদ (স)-এর পুত্র বলিয়া ডাকা হইত। ইহার পর যখন রাসূলুল্লাহ (স) নবুওয়াত প্রাপ্ত হন তখন তিনি তাঁহাকে সত্য বলিয়া মানিয়া লন এবং ইসলাম গ্রহণ করিয়া তাঁহার সঙ্গে নামায পড়েন। অতঃপর যখন এই আয়াত নাযিল হয়, أَدْعُوهُمْ لا بَائِهِمْ )তোমরা তাহাদিগকে ডাক তাহাদের পিতৃ পরিচয়ে; ৩৩৪ ৫), তখন যায়দ (রা) বলেন, انا زيد بن حارثة
“আমি হারিছার পুত্র যায়দ"।
ইবন ইসহাক বলেন, ইহার পর যায়দ ইব্ন হারিছা ইব্ন শুরাবীল ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর ক্রীতদাস ছিলেন, পরে তাঁহাকে মুক্ত করেন। হযরত যায়দ (রা)-এর মা ছিলেন সু'দা বিন্তে ছা'লাবা। যায়দ (রা)-এর বয়স যখন ৮ বৎসর, তখন তাঁহার মা তাহাকে নিয়া আত্মীয়-স্বজনের সাক্ষাতে বাহির হন। পথে তাঁহারা দুস্যদের কবলে পড়েন এবং যায়দ (রা)-এর মা তাঁহাকে হারান। দস্যুরা যায়দ (রা)-কে আরবের হুবাশা নামক বাজারে বিক্রয় করিয়া দেয়। হাকীম ইব্ন হিযাম ইব্ন খুওয়ায়লিদ একবার শাম দেশ হইতে কিছু গোলাম খরীদ করিয়া আনেন। ইহাদের মধ্যে অল্প বয়স্ক যায়দ ইব্ন হারিসা (রা)-ও ছিলেন। হযরত খাদীজা (রা) হাকীম ইব্ন হিযামের ফুফু ছিলেন। তিনি তাঁহার ভ্রাতুষ্পুত্রের সহিত সাক্ষাত করিতে গেলে হাকীম বলেন, ফুফুজান! এই গোলামদের মধ্যে যাহাকে আপনার পছন্দ হয়, তাহাকে নিয়া যান। হযরত খাদীজা (রা) যায়দ (রা)-কে পছন্দ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) হযরত খাদীজা (রা)-এর নিকট যায়দ (রা)-কে দেখিলেন এবং যায়দ (রা)-কে খাদীজা (রা)-এর নিকট চাহিলেন। তখন হযরত খাদীজা (রা) যায়দ (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট অর্পণ করেন। রাসূলুল্লাহ (স) যায়দ (রা)-কে আযাদ করিয়া তাহাকে পোষ্য পুত্ররূপে নির্ধারণ করেন। এই ঘটনা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি ওহী নাযিলের পূর্বেকার।
হযরত যায়দ (রা)-এর পিতা হারিছা তাহার সন্তান (যায়দ)-কে দুর্বৃত্তরা ছিনাইয়া নেওয়ার ফলে অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং অনেক অশ্রুপাত করিয়া নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেন,
بكيت على زيد ولم ادر ما فعل - احي فيرجى ام اتى دونه الاجل. فوالله ما ادرى واني لسائل - اغا لك بعدى السهل ام غالك الجبل. وياليت شعري هل لك الدحراً - وبة فحسبى من الدنيا رجوعك لي بجل.
تذكرنيه الشمس عند طلوعها وتعرض ذكراه اذا غربها أفل. وان هبت الارواح هيجن ذكره فياطول ما حزني عليه وما وجل. سأعمل نص العيس في الأرض جاهدا ولا اسام التطواف أو تسام الابل. حیاتي او تأتي على منيتي فكل امریء فان وان غره الأمل.
“যায়দের জন্য আমি কত যে কাঁদিয়াছি! কিন্তু জানি না তাহার কি হইয়াছে! সে কি জীবিত আছে যে, তাহার জন্য কোন প্রত্যাশা করা যাইবে, নাকি মৃত্যু তাহার পথের প্রতিবন্ধক হইয়াছে! আল্লাহর শপথ! আমি জানি না। আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি, আমার নিকট হইতে অন্তর্হিত হওয়ার পর তোমাকে কি বিজন প্রান্তর ছিনাইয়া নিয়াছে, না কোন পাহাড়? হায়! আমি যদি জানিতে পারিতাম যে, তুমি কখনও ফিরিয়া আসিবে, তবে তোমার প্রত্যাগমন আমার আনন্দময় জীবন উপভোগের জন্য যথেষ্ট হইত। সূর্য তাহার উদয়কালে আমাকে তাহার স্মরণে বিভোর করিয়া তোলে এবং তাহার অস্তকালেও তাহার স্মরণ আমাকে বিভোর করিয়া দেয়। আর যখন বাতাস প্রবাহিত হয় তখন তাহার স্মরণ উম্মাতাল করিয়া তোলে। কত দীর্ঘ হইবে তাহার জন্য সংকটময় ও ব্যথা-বেদনার কাল! তাহার অবিরাম সন্ধানে কত দ্রুত ভূপৃষ্ঠ চষিয়া বেড়াইতেছি এবং কালের বিপর্যয়ও আমাকে ক্লিষ্ট-ক্লান্ত করিতে পারিতেছে না। হয়ত উটই ক্লিষ্ট-ক্লান্ত হইয়া পড়িতেছে। আজীবন এইভাবেই ঘুরিয়া বেড়াইব। বেড়াইতে বেড়াইতে মৃত্যু আসিয়া পড়িবে। মৃত্যু তো প্রত্যেকেরই আসে, যদিও প্রত্যাশার চোরাবালি আমাকে ধোঁকায় ফেলিয়া রাখিয়াছে"।
অতঃপর যায়দ (রা)-এর পিতা ও চাচা তাঁহার খোঁজে মক্কায় আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে লোকজনকে জিজ্ঞাসা করিলে লোকজন উত্তর দিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে আছেন। তাহারা উভয়ে সেখানে উপস্থিত হইয়া বলেন, হে আবদুল মুত্তালিবের পৌত্র! হে হাশিমের পৌত্র! হে সরদার পুত্র! আপনারা মহান কা'বার অধিবাসী এবং তাহার প্রতিবেশী। আপনারা অসহায়কে সাহায্য করেন। বন্দীর ভরণপোষণ করেন। আমাদের সন্তানের ব্যাপারে আপনার নিকট আমরা আসিয়াছি। এই মুক্তিপণের বিনিময়ে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। আমাদের প্রতি সদয় হউন। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, কে সেই গোলাম? তাহারা বলিলেন, যায়দ ইব্ন্ন হারিছা। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা ছাড়া আর কিছু নয় তো? তাহারা বলিল, না, সে কোথায়? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করুন। সে যদি আপনাদের সঙ্গ অবলম্বন করিয়া লয় তাহা হইলে সে তো আপনাদের সঙ্গে যাইবে। আর সে যদি আমার সহিত থাকিতে চায়, তাহা হইলে সে আমার সঙ্গেই থাকিবে। আমি তাহার ব্যাপারে জবরদস্তি করিব না। অতঃপর যায়দ (রা)-কে তিনি ডাকিয়া পাঠাইলেন। হযরত যায়দ (রা) আসিলে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি ইহাদিগকে চিন? যায়দ (রা) বলিলেন, হাঁ, চিনি। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহারা কে? তিনি বলিলেন, ইনি আমার পিতা আর ইনি আমার চাচা। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন,
انا من قد علمت ورأيت صحبتی فاخترنی او اخترهما .
“তুমি আমার ব্যাপারে অবগত আছ এবং আমার সংস্পর্শে আছ। এখন তোমার ইচ্ছা, যদি আমার কাছে থাকিতে চাও, তাহা হইলে আমার কাছে থাকিবে অথবা ইচ্ছা করিলে তাহাদের সঙ্গে যাইতে পারিবে”।
যায়দ (রা) বলেন,
ما انا بالذي اختار عليك احدا - انت منى بمكان الاب والعم.
“আমি আপনাকে ছাড়া আর কাহাকেও অবলম্বন করিতে পারিব না। আপনিই আমার জন্য পিতা এবং চাচা”।
ইহা শুনিয়া তাহারা বলিল, ধিক্ তোমাকে! তোমার পিতা, চাচা, পরিবার-পরিজন এবং আত্মীয়-স্বজনের উপর গোলামীকে প্রাধান্য দিতেছ? যায়দ (রা) বলিলেন, আমি এই মহান ব্যক্তির মাঝে এমন কিছু দেখিয়াছি যে, তাঁহাকে আমি কখনও ছাড়িয়া যাইতে পারিব না। রাসূলুল্লাহ (স) তখন তাহার হাত ধরিয়া তাহাকে কুরায়শদের এক সভায় নিয়া গিয়া বলিলেন,
اشهدكم أن زيدا ابنى يرثه ويرثني
“তোমরা সাক্ষী থাক, আজ হইতে যায়েদ আমার পুত্র। আমরা পরস্পরের উত্তরাধিকারী হইব”।
যায়দ (রা)-এর পিতা ও চাচা যখন ইহা দেখিলেন, তখন তাহারা অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন এবং আনন্দ চিত্তে ফিরিয়া গেলেন। তখন হইতে যায়দ (রা)-কে মুহাম্মাদ (স)-এর পুত্র বলিয়া ডাকা হইত। ইহার পর যখন রাসূলুল্লাহ (স) নবুওয়াত প্রাপ্ত হন তখন তিনি তাঁহাকে সত্য বলিয়া মানিয়া লন এবং ইসলাম গ্রহণ করিয়া তাঁহার সঙ্গে নামায পড়েন। অতঃপর যখন এই আয়াত নাযিল হয়, أَدْعُوهُمْ لا بَائِهِمْ )তোমরা তাহাদিগকে ডাক তাহাদের পিতৃ পরিচয়ে; ৩৩৪ ৫), তখন যায়দ (রা) বলেন, انا زيد بن حارثة
“আমি হারিছার পুত্র যায়দ"।
📄 হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, আমি তখন কিশোর ছিলাম এবং মক্কায় উকবা ইব্ন আবূ মু'ঈতের বকরী চরাইতাম। অতঃপর একদিন রাসূলুল্লাহ (স) ও আবূ বাক্স (রা) আমার নিকট আসিলেন। তাঁহারা তখন মুশরিকদের নিকট হইতে আত্মগোপন করিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিলেন, عندك ياغلام لبن تسقينا “হে বালক! তোমার নিকট কি আমাদের পান করার মত দুধ আছে?” আমি বলিলাম, 'আমি এইগুলির রক্ষক। আমি আপনাদেরকে দুধ পান করাইতে অক্ষম।' তিনি বলিলেন,
هل عندك من جزعة لم ينزل عليها الفحل بعد ?
"তোমার নিকট কি কোন ছোট বকরী আছে, যাহা দুধবিহীন"?
আমি বলিলাম, আছে। তখন আমি তাহা নিয়া আসিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) সেই বকরীর স্তনে হাত দিয়া দু'আ করিলেন। বকরীর স্তন দুধে ভরিয়া গেল। আবূ বাক্স (রা) পাথরের একটি পাত্র নিয়া আসিলেন। তিনি তাহাতে দুধ দোহন করিলেন, অতঃপর দুধ পান করিলেন, আবূ বাক্স (রা)-ও পান করিলেন, অতঃপর আমাকেও পান করাইলেন। ইহার পর রাসূলুল্লাহ্ (স) বকরীর স্তনকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, اقلص “দুধ পূর্বাবস্থায় ফিরিয়া যাও।” তখন দুধের ধারা বন্ধ হইয়া গেল। আমি ইহা দেখিয়া মুসলমান হইয়া গেলাম। পরে যখন আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলাম তখন বলিলাম, আমাকে এই উত্তম বাণী অর্থাৎ পবিত্র কুরআন শিখাইয়া দিন। তিনি বলিলেন,
بارك الله فيك فانك غلام وعلم الله
"মহান আল্লাহ তোমাকে কল্যাণ দান করুন। নিশ্চয় তুমি আল্লাহ্ দীক্ষাপ্রাপ্ত গোলাম।"
অতঃপর আমি ৭০টি সূরা তাঁহার নিকট হইতে শিখিয়াছি, যে ব্যাপারে কেহ আমার সঙ্গে বিতণ্ডা করিতে পারিবে না।
📄 হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
ইবন ইসহাক বলেন, ইহার পর ইসলাম গ্রহণ করেন হযরত আবূ বাকর ইব্ন আবূ কুহাফা (রা)। আবূ কুহাফা মক্কা বিজয়ের সময় মুসলমান হন। হযরত আবূ বাকর (রা)-এর নাম আবদুল্লাহ এবং তাঁহার উপাধি আতীক, ভিন্নমতে নাম আতীক। তাঁহার মাতার নাম উম্মুল খায়র বিন্ সখর ইব্ন আমর। বর্ণিত আছে, হযরত আবূ বাকর (রা)-এর মাতার কোন ছেলেই ভূমিষ্ঠ হইয়া জীবিত থাকিত না। তখন মাতা মান্নত করিলেন যে, যদি তাঁহার এই ছেলে জীবিত থাকে তাহা হইলে তাহার নাম রাখা হইবে আবদুল কা'বা। তাঁহার জন্মের পর উক্ত নামই রাখা হইল। অতঃপর তিনি যখন যুবা বয়সে পৌছিলেন তখন তাঁহার নাম রাখা হইল 'আতীক'। আরেক বর্ণনায় আছে, তিনি যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে বলেন,
انت عتيق من النار
"তুমি অগ্নি হইতে মুক্ত হইয়া প্রাচীন হইয়া গিয়াছ"।
হযরত আবূ বাকর (রা) পূর্ব হইতেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। তিনি তাঁহার নিকট আসা যাওয়া করিতেন। তাঁহার পবিত্রতা, নিষ্কলুষতা, সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে তিনি উত্তমরূপেই জানিতেন। অধিকন্তু তিনি শুরু হইতেই এক আল্লাহ্র ইবাদত করিতেন এবং মূর্তি পূজা বর্জন করিয়া চলিতেন।
হযরত আবূ বাকর (রা) তাঁহার স্বগোত্রীয়দের সহিত অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সকলের সহিত তাঁহার সম্প্রীতি ছিল। তিনি কোমল ও মার্জিত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তিনি কুরায়শ বংশের লোক ছিলেন। কুরায়শদের বংশতালিকা সম্পর্কে সকলের মধ্যে তিনিই সর্বাধিক জ্ঞাত ছিলেন। তাহাদের ভাল-মন্দ সম্বন্ধে তিনিই অধিক জানিতেন। তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী। সব সময় সদালাপী ছিলেন। সকলের সঙ্গে সুমার্জিত আচরণ করিতেন। জ্ঞান-বিদ্যা, ব্যবসায়ী অভিজ্ঞতা ও আচার-আচরণ সম্পর্কে জানিতে গোত্রের সকলেই তাঁহার নিকট আসিত।
রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাঁহাকে ইসলামের দাওয়াত দেন, তখন তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন। তিনি আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল (স)-এর প্রতি সকলকে দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তাঁহার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন,
ما دعوت احدا الى الاسلام الا كانت فيه عنده كبوة ونظر وتردد الا ماكان من ابي بكر بن ابی قحافة ما عكم عنه حين ذكرته له وما تردد فيه.
"আমি যাহাকেই ইসলামের দাওয়াত দিয়াছি সে তাহা গ্রহণ করবার ব্যাপারে বিলম্ব করিয়াছে, চিন্তা-ভাবনা করিয়াছে এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ভাব দেখাইয়াছে। কিন্তু আবূ বাকর ইন্ন আবু কুহাফা তাহা করেন নাই। যখন আমি তাঁহার নিকট ইহার উল্লেখ করিলাম, তখন আবূ বাক্স কোনরূপ বিলম্ব করেন নাই এবং দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েন নাই।"
বুখারী শরীফে বর্ণিত হযরত আবু দারদা (রা)-এর এক হাদীছে আছে, আবূ বাক্স (রা) ও উমার (রা) কোন ব্যাপারে বিতর্কে জড়াইয়া পড়িলে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, ان الله بعثني اليكم فقلتم كذبت وقال ابو بكر صدق وواساني بنفسه وماله فهل انتم تارکونی صاحبی.
"আল্লাহ তা'আলা আমাকে তোমাদের নিকট পাঠাইয়াছেন। কিন্তু তোমরা (প্রথমে) আমাকে বলিয়াছ যে, তুমি মিথ্যা বলিতেছ। আর আবূ বাক্স বলিয়াছে, সত্য বলিয়াছেন তিনি। সে আমাকে তাঁহার প্রাণ ও তাঁহার সম্পদ দিয়া সহযোগিতা করিয়াছে। তবে কি তোমরা আমার জন্য আমার সঙ্গীকে ছাড়িয়া দিতে পার না”।
হযরত আয়েশা (রা) বলেন, আবূ বাক্স (রা) একদিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর উদ্দেশে বাহির হন। তিনি জাহিলী যুগ হইতেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর বন্ধু ছিলেন। অতঃপর তাঁহার সঙ্গে সাক্ষাত হইলে আবূ বাক্স (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করেন, হে আবুল কাসেম! কুরায়শরা আপনার প্রতি অপবাদ আরোপ করিতেছে। আপনি নাকি তাহাদের পূর্বপুরুষদেরকে দোষারোপ করেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, اني رسول الله ادعوك الى الله.
"আমি আল্লাহ্ প্রেরিত রাসূল, আমি তোমাকে আল্লাহ্র পথে আহবান করিতেছি।”
রাসূলুল্লাহ (স) যখন কথা শেষ করিলেন, তখনই আবূ বাক্স (রা) ইসলাম গ্রহণ করিলেন। তাঁহার ইসলাম গ্রহণে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাইতে আর কেহ এত অধিক খুশী হন নাই। অন্য রিওয়ায়াতে আছে, আবূ বাক্স (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করেন, হে মুহাম্মাদ। কুরায়শরা যে বলিতেছে, আপনি আমাদের উপাস্যকে বর্জন করিয়াছেন, আমাদেরকে নির্বোধ বলিয়া সাব্যস্ত করিয়াছেন এবং আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে সত্যত্যাগী বলিয়াছেন তাহা কি সত্য? রাসূলুল্লাহ (স) বিললেন, بلی انی رسول الله ونبيه بعثنى لا بلغ رسالته وادعوك الى الله بالحق فوالله انه للحق ادعوك يا ابا بكر الى الله وحده لا شريك له ولا تعبد غيره والمولاة على طاعته.
"হাঁ, আমি আল্লাহ্ প্রেরিত রাসূল ও তাঁহার নবী। আমাকে তিনি পাঠাইয়াছেন তাঁহার বাণী প্রচার করার জন্য এবং আমি তোমাকে সত্যসহ আল্লাহ্র প্রতি আহ্বান করিতেছি। আল্লাহ্ শপথ! ইহা নিঃসন্দেহে সত্য ভাষণ। হে আবূ বাক্স! আমি তোমাকে এক আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দিতেছি, যাঁহার কোন শরীক নাই এবং তুমি তাঁহাকে ছাড়া আর কাহারও ইবাদত করিও না, সর্বদা তাঁহারই আনুগত্য করিয়া যাও”।
হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর দাওয়াতে যাঁহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন, তাঁহারা হইলেনঃ
(১) হযরত উছমান ইব্ন আফ্ফান ইবনে আবুল আস (রা)। তিনি ছিলেন ইসলামের তৃতীয় খলীফা এবং আশারায়ে মুবাশশারার অন্যতম। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর দুই কন্যাকে পরপর বিবাহ করার ফলে 'যুননুরায়ন' উপাধি প্রাপ্ত হন।
(২) যুবায়র ইবনুল্ আওয়াম ইব্ন খুওয়ায়লিদ ইব্ন আসাদ। তিনি আশারায়ে মুবাশারার একজন।
(৩) আবদুর রহমান ইব্ন আওফ ইব্ন হারিস ইব্ন যুহরা। তাঁহার উপনাম আবু মুহাম্মাদ। তিনি আশারায়ে মুবাশশারার অন্যতম। রাসূলুল্লাহ (স) দারুল আরকামে প্রবেশের পূর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি আবিসিনিয়া ও মদীনা এই উভয় হিজরতেই অংশগ্রহণ করিয়াছেন।
(৪) সা'দ ইব্ন আবূ ওয়াক্কাস। তাঁম্বরপূর্বনাম ছিল মালিক ইব্ন ওয়াহ্ ইব্ন আবদে মানাফ। তিনি আশারায়ে মুবাশশারার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। পারস্য তাঁহার হাতেই বিজিত হইয়াছিল।
(৫) তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ ইব্ন উছমান ইবন আমর। তিনি আশারায়ে মুবাশশারার অন্যতম।
হযরত আবূ বাক্স (রা) তাহাদেরকে নিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলে তাঁহারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নামায পড়েন। ইহার পর যাঁহারা ইসলাম গ্রহণ করেন তাঁহারা হইলেন:
(৬) আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ্। তিনি আশারায়ে মুবাশশারার অন্তর্ভুক্ত। হাবশা ও মদীনা উভয় স্থানেই তিনি হিজরত করিয়াছিলেন।
(৭) আবূ সালামা, তাঁহার পূর্ণ নাম আবদুল্লাহ ইব্ন আবদুল আসাদ। তিনি হাবশায় দুইবার হিজরত করিয়াছিলেন। অতঃপর তিনিই সর্বপ্রথম মদীনায় হিজরত করিয়াছিলেন।
(৮) আরকাম ইব্ন আবুল আরকাম। তাঁহার পূর্ণ নাম আবদে মানাফ ইব্ন আসাদ। প্রথমদিকে তাঁহার বাড়ীতেই রাসূলুল্লাহ (স) সংগোপনে ইসলামের দাওয়াত দেন। ইবন হাজার উল্লেখ করেন যে, তিনি সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্তর্ভুক্ত। দশজনের পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
(৯) উছমান ইবন মাজউন ইব্ন হাবীব ইব্ন ওয়াহাব। ইবন ইসহাক উল্লেখ করেন যে, ১৩ ব্যক্তির পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি তাঁহার পুত্র সাইব ইব্ন উছমানের সঙ্গে হাবশায় হিজরত করেন।
(১০) উছমান ইবন মাজউনের ভাই কুদামা ইবন মাজউন ইবন হাবীব ও 'আবদুল্লাহ ইবন মাজউন ইবন হাবীব। তিনি প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। উভয় হিজরতই তিনি করিয়াছিলেন এবং বদর যুদ্ধে শরীক ছিলেন। হযরত উমার (রা) তাঁহাকে বাহরায়নের আমীর নিযুক্ত করেন।
(১১) উবায়দা ইবন হারিছ ইব্ন আবদুল মুত্তালিব। বানু আব্দ মানাফের মধ্যে তিনি সর্বাধিক সৎকর্মশীল ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) থেকে তিনি বয়সে ১০ বৎসরের বড় ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) দারুল আরকামে প্রবেশের পূর্বেই তিনি মুসলমান হইয়াছিলেন। তিনি তাঁহার দুই ভাই তুফায়ল-হুসায়নসহ মদীনায় হিজরত করিয়াছিলেন। বদর যুদ্ধে প্রথমে যে দুইজন দুইজন করিয়া সম্মুখ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন তিনি তাঁহাদের অন্যতম।
(১২) সাঈদ ইব্ন যায়দ ইব্ন আমর ইব্ নুফায়ল। তিনি আশaraয়ে মুবাশশারার অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (স) দারুল আরকামে প্রবেশের পূর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি প্রখ্যাত মুওয়াহিদ তথা একত্ববাদী হযরত যায়দ ইব্ন আমর ইবন নুফায়লের পুত্র এবং হযরত উমার (রা)-এর ভগ্নিপতি ছিলেন।
(১৩) সাঈদ ইব্ন যায়দ (রা)-এর স্ত্রী ফাতিমা বিন্ত খাত্তাব ইব্ নুফায়ল ইব্ন আবদিল উয্যা।
(১৪) আসমা বিন্ত আবূ বাক্স। তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন যুবায়র (রা)-এর মাতা ছিলেন। তাঁহার মাতার নাম ছিল কাতিলা বিনতে আবদুল উযযা। ইবন ইসহাক বলেন, ১৭ ব্যক্তির পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। হিজরতের সময় রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে 'যাতুন-নিতাকায়ন' উপধিতে ভূষিত করেন।
(১৫) হযরত আয়েশা বিন্ত আবূ বাকর (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর প্রিয়তমা স্ত্রী। তাঁহার মাতার নাম ছিল উম্মে রুমান বিন্তে আমের কিনানিয়্যা। বুখারী ও মুসলিমের রিওয়ায়াত অনুযায়ী তাঁহার ছয় বৎসর বয়সে তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন।
(১৬) খাব্বাব ইব্নুল আরাত (ইব্ত) ইব্ন জান্দালাহ। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে জুবায়র ইব্ন আতীকের সহিত ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ করিয়াছেন। কুরায়শরা তাঁহাকে অকথ্য নির্যাতন করিয়াছিল।
(১৭) আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ, ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে ষষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) প্রথম তাঁহার ও হযরত যুবায়র (রা)-এর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করিয়া দিয়াছিলেন এবং হিজরতের পর সা'দ ইবন মু'আযের সঙ্গে তাঁহার ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করিয়া দেন। তিনি সব সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে থাকিতেন এবং তাঁহাকে আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত বলিয়া মনে করা হইত।
(১৮) মাসউদ ইব্ন রাবী‘আ আল্-কারীঃ রাসূলুল্লাহ (স)-এর দারুল আরকামে যাওয়ার পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং মদীনায় হিজরত করিয়াছিলেন। ইব্ন ইসহাক তাঁহাকে বদরে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে গণ্য করিয়াছেন।
(১৯) সালীত ইব্ন ‘আম্রঃ রাসূলুল্লাহ (স) দারুল আরকামে প্রবেশের পূর্বে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। দ্বিতীয়বারে হাবশায় হিজরত করিয়াছেন। তখন তাঁহার সঙ্গে তাঁহার স্ত্রী ফাতিমা বিন্ত আলকামাও ছিলেন।
(২০) ‘আইয়াশ ইব্ন আবূ রাবী‘আ ইবনুল মুগীরাঃ তিনি হযরত খালিদ ইব্দুল ওয়ালীদ ইব্ন মুগীরার চাচাত ভাই ছিলেন। তিনি দ্বিতীয়বারে হাবশায় হিজরত করেন। তাঁহার সঙ্গে তাঁহার স্ত্রী আসমা বিন্ত সুলামা ইব্ন মাখরামা তামীমিয়্যা ছিলেন। হাবশায় তাঁহার সন্তান আবদুল্লাহ ইব্ন ‘আইয়াশ ভূমিষ্ঠ হন। অতঃপর মক্কায় ফিরিয়া আসেন এবং মদীনায় হিজরত করেন।
(২১) ‘আইয়াশ (রা)-এর স্ত্রী আসমা বিন্ত সুলামা ইব্ন মাখরামা।
(২২) খুনায়স ইব্ন হুযাফাহ, হাবশায় হিজরত করেন, অতঃপর মক্কায় ফিরিয়া আসেন এবং মদীনায় হিজরত করেন। বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন এবং উহুদ যুদ্ধে আঘাতপ্রাপ্ত হইয়া তাহাতেই ইন্তিকাল করেন। তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত হাফসা বিন্ত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর প্রথম স্বামী ছিলেন। তাঁহার ইন্তিকালের পর রাসূলুল্লাহ (স) হাফসা (রা)-কে বিবাহ করেন।
(২৩) ‘আমের ইব্ন রাবী‘আ, শুরুতেই মুসলমান হন। স্বীয় স্ত্রী লায়লা বিন্ত আবু খায়ছামাহকে নিয়া হাবশায় হিজরত করেন, অতঃপর মদীনায় হিজরত করেন। বদরসহ অন্যান্য যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। হযরত উমার (রা)-এর পিতা খাত্তাব তাঁহাকে পালিত পুত্র হিসাবে গ্রহণ করেন। এইজন্য প্রথমে তাঁহাকে আমের ইব্ন খাত্তাব বলা হইত। কিন্তু ادعوهم لابائهم এই আয়াত নাযিল হইলে তাঁহাকে আমের ইব্ন রাবী‘আ বলিয়া ডাকা শুরু হয়।
(২৪) ‘আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ আল্-আসাদী। তিনি প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারী। উভয় হিজরতই তিনি করিয়াছিলেন। বদর যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে তিনি শরীক হন এবং উহুদ যুদ্ধে শহীদ হন।
(২৫) আবূ আহমাদ ইব্ন জাহ্শ আল্-আসাদী। তাঁহার ব্যাপারে সকলেই একমত যে, তিনি প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন। তবে তিনি হাবশায় হিজরত করেন নাই। তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত যায়নাব বিন্ত জাহ্শ (রা)-এর ভাই। আবূ সালামা (রা)-র পর সর্বপ্রথম তাঁহার ভাই আবদুল্লাহ ইব্ন জাহ্শ (রা) তাঁহার পরিবারের সকলকে নিয়া হিজরত করেন। কিন্তু তিনি একা মক্কায় থাকিয়া যান, পরে হিজরত করেন। বদর, উহুদ ইত্যাদি যুদ্ধে শরীক হন।
(২৬) জা'ফর ইব্ন আবূ তালিব (রা)। মৃতার যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।
(২৭) তাঁহার স্ত্রী আসমা বিন্ত উমায়স।
(২৮) হাতিব ইবন হারিস ইব্ন মা'মার। তিনি তাঁহার ভাই খাত্তাবের সঙ্গে হাবশায় হিজরত করেন এবং হাবশাতেই ইন্তিকাল করেন। তাঁহার স্ত্রী ফাতিমা বিন্ত মিজাল্লালও তাঁহার সঙ্গে ছিলেন। সেইখানে তাঁহার মুহাম্মাদ ও হারিছ নামে দুই সন্তান জন্মগ্রহণ করেন।
(২৯) তাঁহার স্ত্রী ফাতিমা বিন্ত মিজাল্লাল।
(৩০) মা'মার ইবন হারিছ (হাতিব, খাত্তাব এবং মা'মার তিন ভাই ছিলেন)। ইবন ইসহাক উদ্ধৃত করিয়াছেন, দারুল আরকামে রাসূলুল্লাহ (স)-এর যাওয়ার পূর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
(৩১) সাইব ইব্ন উছমান ইবন মাজউন প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁহার পিতা উছমান ইব্ন মাজঊনের সহিত হাবশায় হিজরত করিয়াছিলেন। অতঃপর মক্কায় ফিরিয়া আসেন এবং মদীনায় হিজরত করেন। বদরে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন।
(৩২) মুত্তালিব ইব্ন আযহার ইব্ন আবদে 'আওফ ছিলেন আবদুর রহমান ইব্ন আওফের চাচাত ভাই। তিনি প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হাবশায় হিজরত করেন। হাবশায় আবদুল্লাহ নামে তাঁহার এক সন্তান হয় এবং হাবশাতেই তাঁহার ইন্তিকাল হয়।
(৩৩) মুত্তালিব ইব্ন আযহার (রা)-এর স্ত্রী রামলা বিন্ত আবূ আওফ।
(৩৪) নু'আয়ম ইব্ন আবদুল্লাহ্ আন্-নাহ্'হাস আল্-আদাবী হযরত উমার (রা)-এর বোনকে পবিত্র কুরআন শিক্ষা দিতেন। তিনি মক্কাতেই থাকিতেন। মক্কা বিজয়ের কিছু দিন পূর্বে তিনি হিজরত করিয়াছিলেন। ইহার কারণ হইল, প্রথমদিকে তিনি ইসলাম গ্রহণের কথা গোপনই রাখিয়াছিলেন। কিন্তু পরে তাহা প্রকাশ পাওয়ার পরও তাঁহার স্বগোত্রীয়রা তাঁহাকে কোন অত্যাচার করে নাই। তিনি বিধবা ও ইয়াতীম অসহায়দের ভরণ-পোষণ করিতেন।
(৩৫) আমের ইব্ন ফুহায়রা আত-তামীমী: রাসূলুল্লাহ (স) দারুল আরকামে প্রবেশের পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। আবূ বাক্স (রা) তাঁহাকে ক্রয় করিয়া আযাদ করিয়া দেন। ইসলাম গ্রহণের কারণে তাঁহাকে অবর্ণনীয় অত্যাচার সহ্য করিতে হইয়াছিল।
(৩৬) খালিদ ইবন সা'ঈদ ইবনুল আস ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে চতুর্থ বা পঞ্চম ব্যক্তি। তিনি স্বীয় স্ত্রীসহ হযরত উছমান (রা) ও জা'ফর (রা)-এর সঙ্গে হাবশার হিজরত করেন। তাঁহার কন্যা উম্মু খালিদ সেইখানেই ভূমিষ্ঠ হন। হযরত জা'ফর (রা)-এর পূর্বেই তিনি মদীনায় ফিরিয়া আসেন। মাসলামা ইবন মুহারিবের বর্ণনায় আছে যে, তিনি হযরত আলী (রা)-এর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন, কিন্তু তাঁহার পিতার কারণে তাহা গোপন রাখেন।
(৩৭) তাঁহার স্ত্রী উমায়মা (মতান্তরে আমীনা) বিন্ত খালাফ ইব্ন আস'আদ আল্-খুযাইয়া।
(৩৮) হাতিব ইব্ন আমর ইব্ন আবদে শামস আল্-আমেরী: তিনি আমের, সুহায়ল এবং সালীত ইব্ন আমরের ভ্রাতা। তিনি একেবারে শুরুতেই ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন। ইব্ন হাজার উল্লেখ করেন যে, ইমাম যুহরী এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে, হাবশায় হিজরতকারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম ব্যক্তি।
(৩৯) আবু হুযায়ফা মাহশাম ইব্ন উতবা ইবন রাবী'আ হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর মামা। দুইবার হাবশায় হিজরত করিয়াছেন এবং উভয় কিবলার দিকে নামায পড়িয়াছেন। পরে মদীনায় হিজরত করিয়াছেন এবং বদর যুদ্ধে শরীক ছিলেন।
(৪০) ওয়াকিদ ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন আবদে মানাফ আত-তামীমী আল্-হান্জালী। ইব্ ইসহাক তাঁহাকে প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে গণ্য করিয়াছেন। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন।
(৪১) খালিদ ইব্ন বুকায়র বদর যুদ্ধে শরীক হইয়াছিলেন। ইয়াওমুর রাজী'তে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
(৪২) 'আকিল ইবন বুকায়র বদr যুদ্ধে শরীক হইয়াছিলেন এবং বদরেই শহীদ হন। ইবন হাজার বলেন, দারুল আরকামে তিনিই সর্বপ্রথম বায়'আত হন।
(৪৩) আমের ইব্ন বুকায়র ইয়ামামার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন।
(৪৪) ইয়াস ইবন বুকায়র (বাক্): ইবন ইসহাক বলেন, ইয়াস (রা) ব্যতীত আর কাহারো ব্যাপারে ইহা জানা নাই যে, তাঁহার চার ভাইয়ের সকলেই বদর যুদ্ধে শরীক হইয়াছিলেন। সকলেই হিজরত করিয়া রিফা'আ ইবন আবদুল মুনযিরের নিকট অবস্থান করেন। তাঁহারা হইলেন ইয়াস, আকিল, খালিদ ও আমের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)। আকিল (রা) বদর যুদ্ধেই শহীদ হন। ইয়াস (রা) মিসর অভিযানে শরীক হন এবং ২৪ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। খালিদ (রা) ইয়াওমুর রজীতে শহীদ হন। আমের (রা) ইয়ামামায় শহীদ হন।
(৪৫) আম্মার ইবন ইয়াসির ইবন আমের ইবন মালিক। তিনি প্রথম পর্যায়েই পিতা ইয়াসির (রা)-সহ ইসলাম গ্রহণ করেন। এইজন্য অনেক নির্যাতন সহ্য করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদের পাশ দিয়া যাওয়ার সময় বলেন,
صبرا ال ياسر موعدكم الجنة
"ইয়াসির পরিবারের লোকেরা! তোমরা ধৈর্যধারণ কর। তোমাদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি রহিল।"
(৪৬) সুহায়ব ইবন সিনান ইবন মালিক (রা): তিনি এবং হযরত আম্মার (রা) একসঙ্গে দারুল আরকামে গিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট মুসলমান হন। তিনি অত্যধিক নির্যাতন সহিয়াছেন। হযরত উমার (রা) ওসিয়াত করিয়া গিয়াছিলেন যে, সুহায়ব (রা) যেন তাঁহার জানাযার নামায পড়ান"।
(৪৭) উমায়র ইব্ন আবূ ওয়াক্কাস ছিলেন সা'দ ইব্ন আবু ওয়াক্কাসের ভ্রাতা। তিনি দশজনের পর ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি হাবশায় হিজরত করেন এবং হযরত জা'ফর (রা)-এর সঙ্গে প্রত্যাবর্তন করেন।
(৪৮) আবূ উমার উল্লেখ করিয়াছেন যে, হযরত আবূ যার (রা)-ও প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং তিনি আবূ নাজাহ্, সালামা, উমার ইব্ন আবাসা (রা) ও আবদুল্লাহ্ ইবন মাস্টদের ভাই উতবা ইবন মাসউদ (রা)-কেও 'সাবিকীনে আওয়ালীন' তথা প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারী বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।
(৪৯) খাদীজা (রা)-এর পর মহিলাদের মধ্যে যিনি সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন তিনি হইলেন হযরত আব্বাস (রা)-এর স্ত্রী 'উম্মুল ফাদল'।
📄 হযরত উছমান ইব্ন আফফান (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত উছমান (রা) বলেন, আমি একবার আমার ঘরে গিয়া দেখি, আমার খালা সু'আদা ঘরের লোকজনের সঙ্গে বসিয়া আছেন। তিনি গণকের কাজও জানিতেন। আমাকে দেখিয়া তিনি বলিয়া উঠিলেন,
ابشروحييت ثلاثا وترا - ثم ثلاثا وثلاثا أخرى. ثم باخرى للى تتم عشرا - لقيت خيرا ووقيت شرا. وانت بكر ولقيت بكر - نكحت والله حصانا زهرا
"হে উছমান! তোমার জন্য সুসংবাদ এবং শান্তির বার্তা। তিনবার, তিনবার, অতঃপর তিনবার। আরো একবার, যাহাতে দশ পূর্ণ হইয়া যায়। তুমি কল্যাণের সাক্ষাত পাইয়াছ এবং অকল্যাণ হইতে রক্ষা পাইয়াছ। আল্লাহ্র কসম! তুমি অতি সতী-সাধ্বী এক মহিলাকে বিবাহ করিয়াছ। তুমি নিজেও অবিবাহিত, সেও অবিবাহিতা।"
ইহা শুনিয়া আমি বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, খালা! তুমি এইসব কি বলিতেছ? তখন সু'আদা নিম্নোক্ত কবিতাগুচ্ছ আবৃত্তি করিলেন,
عثمان يا عثمان یا عثمان - لك الجمال ولك الشأن. ارسله بحقه الديان - هذا نبي معه البرهان وجاءه التنزيل والفرقان - فاتبعه لا تغيا بك الأوثان
"হে উছমান! হে উছমান! হে উছমান! তোমার জন্য সৌন্দর্য ও মর্যাদা রহিয়াছে। তিনি সেই নবী, যাঁহার সহিত নবুওয়াত ও রিসালাতের অকাট্য প্রমাণ রহিয়াছে। মহান প্রতিপালক প্রতিদান প্রদানকারী তাঁহাকে সত্যসহ পাঠাইয়াছেন। আল্লাহর কালাম ও সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী তাঁহার নিকট আসিয়াছে। তাই তুমি তাঁহার অনুসরণ কর। প্রতিমা পূজা যেন তোমাকে বিভ্রান্ত না করে।"
আমি বলিলাম, হে খালা! তুমি এমন বিষয়ের উল্লেখ করিয়াছ, যাহার নাম আমি শহরের কোথাও শুনি নাই। আমি তো কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। তখন সু'আদা বলিলেন,
محمد بن عبد الله رسول من عند الله جاء لتنزيل الله يدعو الى الله قوله صلاح ودينه فلاح وامره نجاح ما ينفع الصياح لو وقع الرماح وسلت الصفاح ومدت الرماح.
"মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল্লাহ (স) আল্লাহর পক্ষ হইতে প্রেরিত রাসূল। আল্লাহ্র কালাম তাঁহার নিকট আসিয়াছে। তিনি আল্লাহর পথে আহবান করেন। তাঁহার বাণী সুউত্তম-সুললিত। তাঁহার ধর্ম সফলকাম। তাঁহার বিরুদ্ধে কাহারো চীৎকার কোন কাজে আসিবে না। তাঁহার বিরুদ্ধে অসংখ্য তরবারি ও বর্শা ধারণ করিলেও কোন কাজে আসিবে না।"
ইহা বলিয়া তিনি চলিয়া গেলেন। কিন্তু আমার মনে তাহার কথাগুলি বেশ রেখাপাত করিল। তখন হইতেই আমি ভাবিতে লাগিলাম। হযরত আবূ বাক্র (রা)-এর সহিত আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। আমি তাঁহার নিকট গেলে তিনি আমাকে চিন্তিত দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কিসের চিন্তা করিতেছ? আমি তখন সকল বৃত্তান্ত তাঁহাকে জানাইলাম। তিনি বলিলেন, হে উছমান! আল্লাহ্ চাহে তো তুমি একজন সচেতন ও বুদ্ধিমান লোক। সত্য-মিথ্যার মধ্যকার বিভেদ ভালই চিনিতে পার। তোমার মত লোকদের হক ও বাতিলের ব্যাপারে কোন সংশয় থাকিতে পারে না। এইসব প্রতিমাগুলি কি বস্তু যাহার পূজায় আমাদের স্বগোত্রীয়রা লিপ্ত? এই প্রতিমারা কি অন্ধ ও বধির নহে, যাহারা কিছুই শোনে না, কিছুই দেখে না, কাহারও কোন ক্ষতি করিতে পারে না এবং উপকারও করিতে পারে না?
হযরত উছমান (রা) বলেন, আমি বলিলাম, আল্লাহ্র কসম! আপনার বক্তব্যই আমার বক্তব্য। আবূ বাকর (রা) বলিলেন, 'আল্লাহ্র কসম! তোমার খালা সত্যই বলিয়াছেন যে, তিনি মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল্লাহ, আল্লাহর রাসূল। মহান আল্লাহ তাঁহাকে নবীরূপে মনোনীত করিয়া সমগ্র মানবজাতির নিকট প্রেরণ করিয়াছেন। তুমি ভাল মনে করিলে তাঁহার নিকট হাজির হইয়া তাঁহার কথা শোন।' এইসব কথা যখন চলিতেছিল তখন হঠাৎ দেখিলাম, রাসূলুল্লাহ (স) সেই স্থান দিয়া যাইতেছেন এবং তাঁহার সঙ্গে হযরত আলী (রা)-ও রহিয়াছেন। হযরত আবূ বাকর তাঁহাকে দেখিয়া উঠিয়া গেলেন এবং নীচু স্বরে কিছু আরয করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তখন সেই স্থানে বসিয়া গেলেন এবং আমার দিকে ফিরিয়া বলিলেন,
يا عثمان اجب الله الى جنته - فاني رسول الله أليك والى خلقه.
"হে উছমান! মহান আল্লাহ্ জান্নাতের দিকে ডাকিতেছেন। তুমি সেই ডাকে সাড়া দাও। আর আমি আল্লাহ্র রাসূল। তোমার প্রতি এবং সমগ্র সৃষ্টির প্রতি আমাকে প্রেরণ করা হইয়াছে"।
হযতর উছমান (রা) বলেন,
فوالله ما تمالكت حين سمعت قوله ان اسلمت واشهدت ان لا اله الا الله وحده لا شريك له وان محمدا عبده ورسوله.
"আল্লাহ্ শপথ! তাঁহার কথা শোনার পর আমার নিজের উপর আমার যেন আর কোন কর্তৃত্ব রহিল না। আমি সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করিলাম এবং এই মর্মে সাক্ষ্য প্রদান করিলাম যে, "আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মদ (স) আল্লাহর বান্দা এবং তাঁহার রাসূল"।
উছমান (রা) বলেন, ইহার কিছু দিন পরই হযরত (স)-এর প্রিয়তম কন্যা হযরত রুকাইয়া (রা) আমার বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হইলেন। আর সকলেই এই বন্ধনকে শুভ দৃষ্টিতে দেখিল এবং আমার খালা সু'আদা এই সম্পর্কে কবিতা আবৃত্তি করিলেন,
هدى الله عثمان الصفى بقوله - فارشده والله يهدى الى الحق. فتابع بالرأى السبرير محمدا - وكان ابن اروى لا يصد عن الحق وانكحه المبعوث احدى بناته - فكان كبد رمازج الشمس في الافق. فدى لك يا ابن الهاشمين مهجتي - فانت امين الله ارسلت للخلق .
“মহান আল্লাহ তাঁহার বান্দা উছমানকে হেদায়াত দিয়াছেন এবং আল্লাহ তা'আলাই সত্যের পথে হেদায়াত দান করেন। সুতরাং উছমান তাঁহার সঠিক সিদ্ধান্তেই মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর অনুগামী হইয়াছে। উপরন্তু সে 'আরওয়ার' পুত্র। তিনি সত্য পথে বাধা দেন নাই এবং সেই মহানবী (স) তাঁহার এক কন্যাকে তাঁহার সঙ্গে বিবাহ দিয়াছেন। এক পূর্ণচন্দ্র ও সূর্য দিগন্তে তাঁহার সহিত মিলিত হইয়াছে। হে হাশেমের পুত্র মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম)! আমার প্রাণ আপনার প্রতি উৎসর্গিত হউক। আপনি তো আল্লাহ্ আমীন একান্ত বিশ্বাসভাজন। সমগ্র সৃষ্টির প্রতি আপনাকে প্রেরণ করা হইয়াছে”।