📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দাওয়াতের সূচনা

📄 দাওয়াতের সূচনা


দাওয়াতের সূচনা
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, يأَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ. قُمْ فَانْذِرْ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ، وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ، وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ، وَلَا تَمْنُنْ تَسْتَكْثَرُ. وَلَرَبِّكَ فَاصْبِرْ . "হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠ ও সতর্কবাণী প্রচার কর এবং তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর। তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ, অপবিত্রতা হইতে দূরে থাক, অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করিও না এবং তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে ধৈর্য ধারণ কর" (৭৪:১-৭)।
আয়াতগুলিতে রাসূলুল্লাহ (স)-কে কয়েকটি নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। বাহ্যিকভাবে ইহার অর্থ সংক্ষিপ্ত মনে হইলেও মূলত ইহার অভীষ্ট লক্ষ্য অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত, যাহা এইখানে প্রণিধানযোগ্য। নিম্নে উহা উল্লেখ করা হইল।
(১) 'ইনযার' তথা সতর্ক করার চূড়ান্ত পর্যায় এই যে, এই বিশ্বচরাচরে মহান আল্লাহ্ সন্তুষ্টির পথ ছাড়িয়া যাহারাই অন্য পথে বেড়াইতেছে, তাহাদিগকে ইহার ভয়ংকর পরিণাম সম্পর্কে আপনি সতর্ক করুন। তাহা হইলে সেও পরাক্রমশালী আল্লাহ্ ভয়াবহ শাস্তির ভয়ে তাহার অন্তর ভয়ংকর প্রকম্পন অনুভব করিবে।
(২) মহান আল্লাহ্ শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার চূড়ান্ত পর্যায় হইল, এই ভূপৃষ্ঠে অন্য কাহারও কর্তৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব স্থায়ী হইতে দেওয়া হইবে না, বরং তাহার প্রতিপত্তির দন্ত চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হইবে। উহা সমূলে উপড়াইয়া ফেলা হইবে। কেবল মহান আল্লাহ্ শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্বই ভূপৃষ্ঠে স্থায়ী হইবে।
(৩) পরিচ্ছদ পবিত্র ও অনুচিতা হইতে দূরে রাখিবার উদ্দেশ্য হইল, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সকল কলুষতা ও অসুচিতা হইতে আত্মিক পরিশীলন ও পরিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে এমন পূর্ণত্বের স্তরে পৌঁছিতে হইবে যাহাতে মহান আল্লাহ্র রহমতের ছায়াঘন পরিবেশে, তাঁহার হেফাযতে তাঁহার প্রতিপালন সম্ভব হয়। যাহাতে এই প্রক্রিয়া মানব সমাজের জন্য এমন সর্বগ্রাহ্য ও সর্বগৃহীত দৃষ্টান্তে পরিণত হয় যে, তাঁহার প্রতি বুদ্ধিমান লোকেরাই আকৃষ্ট হইতে পারে এবং তাঁহার শ্রদ্ধাজনিত ভয় ও শ্রেষ্ঠত্বের উপলব্ধি বক্র হৃদয়ধারীরাও যেন অনুভব করিতে পারে। অনুকূল অথবা প্রতিকূল অবস্থায় তিনিই যেন সারা দুনিয়ার আলোচনা ও পর্যালোচনার কেন্দ্রবিন্দু হইতে পারেন।
(৪) নিজের কৃত পরিশ্রম ও কষ্ট-ক্লেশকে শ্রেষ্ঠ-ও অধিক তৃপ্তিদায়ক মনে না করিয়া ধারাবাহিকভাবে কর্মপ্রচেষ্টা চালাইয়া যাইতে হইবে এবং এই ক্ষেত্রে অতুলনীয় ত্যাগ-তিতীক্ষা ও চূড়ান্ত শ্রম ব্যয় করিয়া নিজের দায়িত্ব পালনকে স্বার্থক করিয়া তুলিতে হইবে। অর্থাৎ মহান আল্লাহর প্রতিনিয়ত স্মরণ ও তাঁহার সম্মুখে জবাবদিহিতার অনুভূতির উপর যেন নিজের কষ্ট-ক্লেশের উপলব্ধি প্রাধান্য না পায়।
(৫) সপ্তম আয়াতে এই দিকে ইংগিত করা হইয়াছে যে, আল্লাহ্র পথ পাওয়া ও তাবলীগের কাজ শুরু করার পর বিরোধিতাকারীদের বিরোধিতা, ঠাট্টা-বিদ্রুপ এবং এই পথে যাতনায় ক্লিষ্ট করা এবং রাসূলুল্লাহ (স)-সহ তাঁহার সঙ্গীদেরকে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হইবে এবং মুসলমানদেরকে ভূপৃষ্ঠ হইতে নিশ্চিহ্ন করিয়া দেওয়া সর্বাত্মক চেষ্টা চলিবে। রাসূলুল্লাহ (স)-কে এইসব প্রতিকূলতা অতিক্রম করিয়া যাইতে হইবে এবং অতি সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সহিত ধৈর্যধারণ করিয়া যাইতে হইবে। আর ইহাও এই জন্য নহে যে, এই ধৈর্যের বিনিময়ে একান্ত নিজের জন্য কোন প্রতিদান কাম্য হইবে বরং প্রভুর সন্তুষ্টির জন্যই এই ত্যাগ স্বীকার করিতে হইবে।
অতঃপর এই আয়াতগুলির তাৎপর্য মহান আল্লাহ্র এক আসমানী আওয়াজের ঐশী আহবানের মধ্যে নিহিত রহিয়াছে যাহাতে রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই সুমহান কর্মদায়িত্বের জন্য উদ্যোগী হইতে, নিদ্রার আচ্ছাদন ছাড়িয়া উঠিতে এবং কষ্টসহিষ্ণু ও সংগ্রামমুখর কর্মক্ষেত্রে পদার্পণ করিবার জন্য বলা হইয়াছে : يٰأَيُّهَا الْمُدَّثِرُ قُمْ فَأَنْذِرْ “হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠ এবং সতর্ক কর” (৭৪ : ১-২)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) উঠিলেন। বিশ বৎসরের অধিক সময় ধরিয়া তিনি সুখ-শান্তির পথ পরিত্যাগ করিলেন। আল্লাহ্ পথে, তাঁহার প্রতি দাওয়াতের পথে তিনি আত্মনিয়োগ করিলেন। ইহা ছিল এক দায়িত্বভার। এই ভূপৃষ্ঠের উপর আমানতে কুবরার দায়িত্বভার। সমগ্র মানবজাতির জন্য এক মহা দায়িত্বভার। যখন হইতেই তিনি সেই আসমানী ঘোষণা শুনিলেন এবং এই সুমহান দায়িত্বভার পাইলেন, তখন হইতেই তাঁহাকে কখনও কোন অবস্থাই অনবধান-অসচেতন করিতে পারে নাই।
গোপনে দাওয়াত
ইহা তো স্বীকৃত ব্যাপার যে, মক্কা নগরী সব সময়ই সমগ্র আরবের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এইখানে কা'বার ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য রহিয়াছে। এইখানে তখন সেই প্রতিমা পূজারীরাও ছিল, যাহাদেরকে সমগ্র আরবে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হইত। এইজন্যই অন্য যে কোন স্থান হইতে মক্কায় ধর্মীয় সংস্কারমূলক কাজ করা খুবই দুরূহ ছিল। তাই তখন এমন অটল দৃঢ়তার প্রয়োজন ছিল যেই অবিচলতায় বিপদের শত ঝাপটাও স্বীয় স্থান হইতে বিচ্যুত করিতে পারিবে না। আর এই লক্ষ্যকে সামনে রাখিয়া সুচিন্তিত যেই পথটি উন্মুক্ত ছিল, সেইটি হইল, প্রথম প্রথম দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ গোপনে লোকচক্ষুর অন্তরালে আঞ্জাম দেওয়া যাহাতে মক্কাবাসী হঠাৎ করিয়া এক উত্তেজক অবস্থার সম্মুখীন না হয়।

টিকাঃ
১. সফীউর রহমান মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৭৩।
২. আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৭৪, ৭৫; তাফসীর ফী যিলালিল কুরআন, ৬খ., পৃ. ৩৭৪৬।
৩. আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৭৭।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কতক মুসলমানের ইসলাম গ্রহণ প্রক্রিয়া

📄 কতক মুসলমানের ইসলাম গ্রহণ প্রক্রিয়া


কতক মুসলমানের ইসলাম গ্রহণ প্রক্রিয়া
হযরত জা'ফর ইবন আবু তালিব (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
একদিন হযরত আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত নামায পড়িতেছিলেন। হযরত আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানপার্শ্বে দাঁড়াইয়াছিলেন। ঘটনাক্রমে সেইখান দিয়া আবূ তালিব পথ অতিক্রম করেন। জা'ফর (রা)-ও তাহার সঙ্গে ছিলেন। আবূ তালিব যখন এইভাবে নামায পড়িতে দেখেন তখন জা'ফর (রা)-কে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন, হে বৎস! তুমিও আলীর মত তোমার চাচাত ভাইয়ের সঙ্গী হইয়া যাও এবং তাঁহার বামদিকে দাঁড়াইয়া নামাযে শরীক হইয়া যাও। তখন তিনি নামাযে দাঁড়াইয়া যান। বর্ণিত আছে, তিনি ৩১ জনের পর ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন।
হযরত আফীফ কিন্দী (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত আফীফ কিন্দী (রা) হযরত আব্বাস (রা)-এর বন্ধু ছিলেন। তাঁহারা ব্যবসায় করিতেন। ব্যবসায়িক সূত্রে তিনি ইয়ামানেও যাতায়াত করিতেন। আফীফ কিন্দী (রা) বলেন, একবার আমি হযরত আব্বাস (রা)-এর সঙ্গে মিনায় ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি আসিলেন। প্রথমে তিনি উত্তমরূপে উযু করিলেন, অতঃপর নামাযে দাঁড়াইয়া গেলেন। ইহার পর একজন মহিলা আসিয়া অনুরূপ উযু করিয়া নামাযের জন্য দাঁড়াইয়া গেলেন। অতঃপর এগার বৎসরের একজন বালক আসিয়া অনুরূপ উযু করিয়া সেই প্রথম ব্যক্তির বরাবর নামাযে দাঁড়াইয়া গেলেন। আমি আব্বাস (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, ইহা কোন ধর্ম? হযরত আব্বাস (রা) বলিলেন, ইহা আমার ভাতিজার ধর্ম, যিনি বলেন, 'আল্লাহ তাঁহাকে রাসূল বানাইয়া পাঠাইয়াছেন'। আর এই বালক আলী ইব্‌ন আবূ তালিবও আমার ভাতিজা। সে এই ধর্মের অনুসারী হইয়াছে। আর এই স্ত্রীলোক মুহাম্মদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর স্ত্রী। আফীফ (রা) পরে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তিনি বলিতেন, হায়! আমি যদি চতুর্থ নম্বরে মুসলমান হইতাম।
হযরত তালহা (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
মুহাম্মদ ইব্‌ন আবূ তালহা (রা) থেকে বর্ণিত, হযরত তালহা (রা) বলেনঃ আমি ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে বসরার এক বাজারে গিয়াছিলাম। হঠাৎ দেখিলাম, এক পাদ্রী তাহার গির্জার ভিতর হইতে বলিতেছেন, বাজারের লোকদিগকে জিজ্ঞাসা কর, তাহাদের মধ্যে মক্কার কোন অধিবাসী আছে কিনা? তালহা (রা) বলেন, আমি বলিলাম, হাঁ, আমি আছি। পাদ্রী বলিলেন, আহমাদ (স)-এর কি আবির্ভাব হইয়াছে? আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আহমাদ (স) কে? পাদ্রী বলিলেন, ইব্‌ন আব্দুল্লাহ ইবন আবদুল মুত্তালিব। এই মাসেই তাঁহার আবির্ভাব হওয়ার কথা। মক্কা হইতেই তিনি প্রকাশ হইবেন। তিনি পাথর ও খেজুর ঘেরা যমীনের দিকে হিজরত করিবেন। তুমি যেন আবার তাঁহার অনুসরণে পেছনে থাকিয়া না যাও।
তাল্‌হা (রা) বলেন, তাহার এই কথা আমার অন্তরে প্রভাব বিস্তার করিল। তখন আমি দ্রুত প্রত্যাবর্তন করিয়া মক্কায় চলিয়া আসিলাম। লোকজনকে জিজ্ঞাসা করিলাম, নূতন কিছু কি ঘটিয়াছে? তাহারা বলিল, হাঁ। মুহাম্মাদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ (স) নবুওয়াতের দাবি করিয়াছেন। আর আবূ বাক্স ইব্‌ন আবী কুহাফা তাঁহার অনুসারী হইয়াছেন। তাল্‌হা (রা) বলেন, আমি তখন হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর নিকট পৌঁছিয়া বলিলাম, আপনি কি এই ব্যক্তির অনুসারী হইয়াছেন? আবূ বাক্স (রা) বলেন, হাঁ। কারণ তিনি সত্যের পথে আহবান করেন। তাল্‌হা (রা) তখন সেই পাদ্রীর কথা খুলিয়া বলিলেন। অতঃপর আবূ বাক্স (রা) তালহা (রা)-কে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইলেন এবং তালহা (রা) ইসলাম গ্রহণ করিলেন। পরে তিনি সেই পাদ্রীর কথা রাসূলুল্লাহ (স)-কে জানাইলে তিনি বেশ আনন্দিত হইলেন।
হযরত সা'দ ইব্‌ন আবু ওয়াক্কাস (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত সা'দ ইব্‌ন আবূ ওয়াক্কাস (রা) বলেন, ইসলাম গ্রহণের তিন রাত পূর্বে আমি স্বপ্নে দেখিলাম যে, আমি যেন ঘোর অন্ধকারের মধ্যে রহিয়াছি। অন্ধকারের কারণে কিছুই আমার দৃষ্টিগোচর হইতেছিল না। হঠাৎ এক আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিল। আমি তাহা অনুসরণ করিয়া চলিলাম। দেখিলাম, হযরত যায়দ ইবন হারিছা (রা), হযরত আলী (রা) এবং হযরত আবূ বাক্স (রা) আমার অনেক আগে চলিয়া গিয়াছেন। আর আমি এই সংবাদ পাইয়াছিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (স) গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিতেছেন। অতঃপর আমি তাঁহার সঙ্গে সাক্ষাত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, 'আপনি কিসের দাওয়াত দেন? তিনি বলিলেন: اشهد ان لا اله الا الله واني رسول الله. "আমি সাক্ষ্য প্রদান করি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ্ নাই এবং আমি আল্লাহ্র রাসূল।" আমি তখন এই মর্মে সাক্ষ্য প্রদান করিলাম।
হযরত খালিদ ইব্‌ন সাঈদ ইবনুল আস (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত খালিদ ইব্‌ন সাঈদ (রা) ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে চতুর্থ বা পঞ্চম ব্যক্তি। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন যে, আগুনের গভীর এক গর্তের প্রান্তে তিনি দাঁড়াইয়া আছেন। আর তাঁহার পিতা তাঁহাকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করিতে উদ্যত। হঠাৎ তিনি দেখিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে আসিয়া তাঁহার কোমর ধরিয়া তাঁহাকে টানিয়া নিয়া আসিলেন। তিনি ঘুম হইতে ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া জাগিয়া উঠলেন। আর বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! এই স্বপ্ন সত্য। অতঃপর তিনি হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর নিকট আসিয়া এই স্বপ্নের আদ্যোপান্ত জানাইলেন। আবূ বাক্স (রা) বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে কল্যাণ করিতে ইচ্ছা করিয়াছেন। তিনি (মুহাম্মাদ স) আল্লাহ্র রাসূল। আর তুমি অচিরেই তাঁহার অনুগামী হইবে এবং তাঁহার সহিত ইসলামে দীক্ষিত হইবে। ইসলামই তোমাকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হইতে বাঁচাইয়া রাখিবে। কিন্তু তোমার পিতা প্রায় আগুনে পড়িয়াই গিয়াছে। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাত করিয়া আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইয়া মুহাম্মাদ! আপনি কিসের দাওয়াত দিয়া থাকেন? তিনি বলিলেন: ادعوك الى الله وحده لا شريك له وأن محمدا عبده ورسوله وتخلع ما أنت عليه من عبادة حجر لا يسمع ولا يضر ولا يبصر ولا ينفع ولا يدرى من عبده ممن لا يعبده. "আমি তোমাকে আল্লাহ্র প্রতি আহবান করিতেছি, যিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁহার কোন শরীক নাই। আর মুহাম্মاد (স) আল্লাহ্র রাসূল ও তাঁহার বান্দা। তুমি যে পাথরের তৈরী প্রতিমার পূজা কর তাহা ছাড়িয়া দাও। তাহা কোন কিছু শুনিতে অক্ষম, কোন কিছু দেখিতে অক্ষম, কাহারো কোন ক্ষতি বা উপকার করিতে অক্ষম। আর সে জানে না কে তাহার পূজা করিতেছে, আর কে তাহার পূজা করিতেছে না।" হযরত খালিদ ইব্‌ن সাঈদ (রা) বলেন, তখন আমি বলিলাম, اشهد أن لا اله الا الله واشهد انك رسول الله. "আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ্ নাই। আমি আরো সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি আল্লাহ্র রাসূল”। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার ইসলাম গ্রহণে খুশী হইলেন। ইহার পর খালিদ ইব্‌ن সাঈদ (রা) আত্মগোপন করিয়া থাকিলেন। যখন তাঁহার পিতা তাঁহার ইসলাম গ্রহণের কথা জানিতে পারিল, তখন তাঁহাকে ডাকাইয়া আনিয়া প্রহার করিল এবং প্রহারের আঘাতে তাঁহার মাথা ফাটাইয়া দিল, আর বলিল, আল্লাহ্র কসম! 'আমি তোমার আহারাদি বন্ধ করিয়া দিব।' খালিদ (রা) বলিলেন, 'তুমি আমার পানাহার বন্ধ করিয়া দিলেও আল্লাহ তা'আলা আমাকে রিযিক দান করিবেন, যাহার দ্বারা আমার জীবন নির্বাহ করিব।' অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট চলিয়া গেলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে সম্মান করিতেন এবং তিনি তাঁহার সঙ্গে থাকিতেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, আমি তখন কিশোর ছিলাম এবং মক্কায় উকবা ইব্‌ن ابূ মু'ঈতের বকরী চরাইতাম। অতঃপর একদিন রাসূলুল্লাহ (স) ও ابূ বাক্স (রা) আমার নিকট আসিলেন। তাঁহারা তখন মুশরিকদের নিকট হইতে আত্মগোপন করিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিলেন, عندك ياغلام لبن تسقينا "হে বালক! তোমার নিকট কি আমাদের পান করার মত দুধ আছে?” আমি বলিলাম, 'আমি এইগুলির রক্ষক। আমি আপনাদেরকে দুধ পান করাইতে অক্ষম।' তিনি বলিলেন, هل عندك من جزعة لم ينزل عليها الفحل بعد ؟ "তোমার নিকট কি কোন ছোট বকরী আছে, যাহা দুধবিহীন"? আমি বলিলাম, আছে। তখন আমি তাহা নিয়া আসিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) সেই বকরীর স্তনে হাত দিয়া দু'আ করিলেন। বকরীর স্তন দুধে ভরিয়া গেল। ابূ বাক্স (রা) পাথরের একটি পাত্র নিয়া আসিলেন। তিনি তাহাতে দুধ দোহন করিলেন, অতঃপর দুধ পান করিলেন, ابূ বাক্স (রা)-ও পান করিলেন, অতঃপর আমাকেও পান করাইলেন। ইহার পর রাসূলুল্লাহ্ (স) বকরীর স্তনকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, اقلص "দুধ পূর্বাবস্থায় ফিরিয়া যাও।” তখন দুধের ধারা বন্ধ হইয়া গেল। আমি ইহা দেখিয়া মুসলমান হইয়া গেলাম। পরে যখন আমি রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট আসিলাম তখন বলিলাম, আমাকে এই উত্তম বাণী অর্থাৎ পবিত্র কুরআন শিখাইয়া দিন। তিনি বলিলেন, بارك الله فيك فانك غلام وعلم الله "মহান আল্লাহ তোমাকে কল্যাণ দান করুন। নিশ্চয় তুমি আল্লাহ্ দীক্ষাপ্রাপ্ত গোলাম।" অতঃপর আমি ৭০টি সূরা তাঁহার নিকট হইতে শিখিয়াছি, যে ব্যাপারে কেহ আমার সঙ্গে বিতণ্ডা করিতে পারিবে না।
হযরত উছমান ইব্‌ন আফফান (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত উছমান (রা) বলেন, আমি একবার আমার ঘরে গিয়া দেখি, আমার খালা সু'আদা ঘরের লোকজনের সঙ্গে বসিয়া আছেন। তিনি গণকের কাজও জানিতেন। আমাকে দেখিয়া তিনি বলিয়া উঠিলেন, ابشروحييت ثلاثا وترا - ثم ثلاثا وثلاثا أخرى. ثم باخرى للى تتم عشرا - لقيت خيرا ووقيت شرا. وانت بكر ولقيت بكر - نكحت والله حصانا زهرا "হে উছمان! তোমার জন্য সুসংবাদ এবং শান্তির বার্তা। তিনবার, তিনবার, অতঃপর তিনবার। আরো একবার, যাহাতে দশ পূর্ণ হইয়া যায়। তুমি কল্যাণের সাক্ষাত পাইয়াছ এবং অকল্যাণ হইতে রক্ষা পাইয়াছ। আল্লাহ্র কসম! তুমি অতি সতী-সাধ্বী এক মহিলাকে বিবাহ করিয়াছ। তুমি নিজেও অবিবাহিত, সেও অবিবাহিতা।" ইহা শুনিয়া আমি বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, খালা! তুমি এইসব কি বলিতেছ? তখন সু'আদা নিম্নোক্ত কবিতাগুচ্ছ আবৃত্তি করিলেন, عثمان يا عثمان یا عثمان - لك الجمال ولك الشأن. ارسله بحقه الديان - هذا نبي معه البرهان وجاءه التنزيل والفرقان - فاتبعه لا تغيا بك الأوثان "হে উছমান! হে উছমান! হে উছমান! তোমার জন্য সৌন্দর্য ও মর্যাদা রহিয়াছে। তিনি সেই নবী, যাঁহার সহিত নবুওয়াত ও রিসালাতের অকাট্য প্রমাণ রহিয়াছে। মহান প্রতিপালক প্রতিদান প্রদানকারী তাঁহাকে সত্যসহ পাঠাইয়াছেন। আল্লাহর কালাম ও সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী তাঁহার নিকট আসিয়াছে। তাই তুমি তাঁহার অনুসরণ কর। প্রতিমা পূজা যেন তোমাকে বিভ্রান্ত না করে।" আমি বলিলাম, হে খালা! তুমি এমন বিষয়ের উল্লেখ করিয়াছ, যাহার নাম আমি শহরের কোথাও শুনি নাই। আমি তো কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। তখন সু'আদা বলিলেন, محمد بن عبد الله رسول من عند الله جاء لتنزيل الله يدعو الى الله قوله صلاح ودينه فلاح وامره نجاح ما ينفع الصياح لو وقع الرماح وسلت الصفاح ومدت الرماح. "মুহাম্মাদ ইব্‌ن আবদুল্লাহ (স) আল্লাহর পক্ষ হইতে প্রেরিত রাসূল। আল্লাহ্র কালাম তাঁহার নিকট আসিয়াছে। তিনি আল্লাহর পথে আহবান করেন। তাঁহার বাণী সুউত্তম-সুললিত। তাঁহার ধর্ম সফলকাম। তাঁহার বিরুদ্ধে কাহারো চীৎকার কোন কাজে আসিবে না। তাঁহার বিরুদ্ধে অসংখ্য তরবারি ও বর্শা ধারণ করিলেও কোন কাজে আসিবে না।" ইহা বলিয়া তিনি চলিয়া গেলেন। কিন্তু আমার মনে তাহার কথাগুলি বেশ রেখাপাত করিল। তখন হইতেই আমি ভাবিতে লাগিলাম। হযরত ابূ বাক্স (রা)-এর সহিত আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। আমি তাঁহার নিকট গেলে তিনি আমাকে চিন্তিত দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কিসের চিন্তা করিতেছ? আমি তখন সকল বৃত্তান্ত তাঁহাকে জানাইলাম। তিনি বলিলেন, হে উছমান! আল্লাহ্ চাহে তো তুমি একজন সচেতন ও বুদ্ধিমান লোক। সত্য-মিথ্যার মধ্যকার বিভেদ ভালই চিনিতে পার। তোমার মত লোকদের হক ও বাতিলের ব্যাপারে কোন সংশয় থাকিতে পারে না। এইসব প্রতিমাগুলি কি বস্তু যাহার পূজায় আমাদের স্বগোত্রীয়রা লিপ্ত? এই প্রতিমারা কি অন্ধ ও বধির নহে, যাহারা কিছুই শোনে না, কিছুই দেখে না, কাহারও কোন ক্ষতি করিতে পারে না এবং উপকারও করিতে পারে না? হযরত উছমান (রা) বলেন, আমি বলিলাম, আল্লাহ্র কসম! আপনার বক্তব্যই আমার বক্তব্য। ابূ বাক্স (রা) বলিলেন, 'আল্লাহ্র কসম! তোমার খালা সত্যই বলিয়াছেন যে, তিনি মুহাম্মাদ ইب্‌ن আবদুল্লাহ, আল্লাহর রাসূল। মহান আল্লাহ তাঁহাকে নবীরূপে মনোনীত করিয়া সমগ্র মানবজাতির নিকট প্রেরণ করিয়াছেন। তুমি ভাল মনে করিলে তাঁহার নিকট হাজির হইয়া তাঁহার কথা শোন।' এইসব কথা যখন চলিতেছিল তখন হঠাৎ দেখিলাম, রাসূলুল্লাহ (স) সেই স্থান দিয়া যাইতেছেন এবং তাঁহার সঙ্গে হযরত আলী (রা)-ও রহিয়াছেন। হযরত ابূ বাক্স তাঁহাকে দেখিয়া উঠিয়া গেলেন এবং নীচু স্বরে কিছু আরয করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তখন সেই স্থানে বসিয়া গেলেন এবং আমার দিকে ফিরিয়া বলিলেন, يا عثمان اجب الله الى جنته - فاني رسول الله أليك والى خلقه. "হে উছمان! মহান আল্লাহ্ জান্নাতের দিকে ডাকিতেছেন। তুমি সেই ডাকে সাড়া দাও। আর আমি আল্লাহ্র রাসূল। তোমার প্রতি এবং সমগ্র সৃষ্টির প্রতি আমাকে প্রেরণ করা হইয়াছে"। হযতর উছমান (রা) বলেন, فوالله ما تمالكت حين سمعت قوله ان اسلمت واشهدت ان لا اله الا الله وحده لا شريك له وان محمدا عبده ورسوله. "আল্লাহ্ শপথ! তাঁহার কথা শোনার পর আমার নিজের উপর আমার যেন আর কোন কর্তৃত্ব রহিল না। আমি সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করিলাম এবং এই মর্মে সাক্ষ্য প্রদান করিলাম যে, "আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ (স) আল্লাহর বান্দা এবং তাঁহার রাসূল"। উছমান (রা) বলেন, ইহার কিছু দিন পরই হযরত (স)-এর প্রিয়তম কন্যা হযরত রুকাইয়া (রা) আমার বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হইলেন। আর সকলেই এই বন্ধনকে শুভ দৃষ্টিতে দেখিল এবং আমার খালা সু'আদা এই সম্পর্কে কবিতা আবৃত্তি করিলেন, هدى الله عثمان الصفى بقوله - فارشده والله يهدى الى الحق. فتابع بالرأى السبرير محمدا - وكان ابن اروى لا يصد عن الحق وانكحه المبعوث احدى بناته - فكان كبد رمازج الشمس في الافق. فدى لك يا ابن الهاشمين مهجتي - فانت امين الله ارسلت للخلق . "মহান আল্লাহ তাঁহার বান্দা উছমানকে হেদায়াত দিয়াছেন এবং আল্লাহ তা'আলাই সত্যের পথে হেদায়াত দান করেন। সুতরাং উছমান তাঁহার সঠিক সিদ্ধান্তেই মুহাম্মاد (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর অনুগামী হইয়াছে। উপরন্তু সে 'আরওয়ার' পুত্র। তিনি সত্য পথে বাধা দেন নাই এবং সেই মহানবী (স) তাঁহার এক কন্যাকে তাঁহার সঙ্গে বিবাহ দিয়াছেন। এক পূর্ণচন্দ্র ও সূর্য দিগন্তে তাঁহার সহিত মিলিত হইয়াছে। হে হাশেমের পুত্র মুহাম্মاد (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম)! আমার প্রাণ আপনার প্রতি উৎসর্গিত হউক। আপনি তো আল্লাহ্ আমীন একান্ত বিশ্বাসভাজন। সমগ্র সৃষ্টির প্রতি আপনাকে প্রেরণ করা হইয়াছে” (সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ., পৃ. ১৬৭-৬৮; আর-রিয়াদুন নাদারা, ২খ., পৃ. ৮)।
হযরত আম্মার (রা) ও সুহায়ব (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত আম্মার ইবন ইয়াসার (রা) বলেন, দারুল আরকামের দরজায় হযরত সুহায়ব ইব্ন সিনান (রা)-এর সহিত আমার সাক্ষাত হইল এবং তিনি তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে প্রবেশ করিতেছিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমার অভিপ্রায় কি? সুহায়ব (রা)-ও আমাকে একই কথা জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি অভিপ্রায় নিয়া আসিয়াছ? আমি বলিলাম, আমার অভিপ্রায় হইল, তাঁহার নিকট হাজির হইয়া আমি তাঁহার কথা শুনিব। অতঃপর আমরা উভয়ে দারুল আরকামে প্রবেশ করিলে রাসূলুল্লাহ (স) আমাদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাইলেন। আমরা তখন ইসলাম গ্রহণ করিলাম। অতঃপর আমরা সেইখানে একদিন অবস্থান করিয়া পরদিন গোপনে সেইখান হইতে বাহির হইলাম। হযরত আম্মার ও সুহায়ব (রা) ৩০ জনের পর ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন।
হযরত আমর ইবন আবাসা (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত আমর ইবন আবাসা (রা) বলেন, আমি প্রথম হইতেই প্রতিমা পূজা হইতে বিরত ছিলাম। এইগুলিকে ভ্রান্ত বলিয়া জ্ঞান করিতাম আর এইসব প্রতিমাকে সামান্য পাথর ছাড়া কিছুই মনে করিতাম না। অতঃপর মক্কা সম্পর্কে খবরাখবর রাখে এমন এক লোকের নিকট রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে জানিতে পারিয়া মক্কার উদ্দেশে সওয়ারীতে আরোহণ করিলাম। মক্কায় পৌঁছিয়া অতি গোপনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাত করিলাম। তাঁহার সম্প্রদায় তখন তাঁহার বিরোধিতা করিতেছিল। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনি কে? তিনি বলিলেন, আমি আল্লাহ্ নবী। জিজ্ঞাসা করিলাম, নবী কি? তিনি বলিলেন, আল্লাহ্র রাসূল। জিজ্ঞাস করিলাম, আপনাকে কি আল্লাহ পাঠাইয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ, পাঠাইয়াছেন। জিজ্ঞাসা করিলাম, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে কি পয়গাম দিয়া পাঠাইয়াছেন? তিনি বলিলেন, তাহা এই যে, আল্লাহকে এক জানিতে হইবে, তাঁহার সহিত কোন কিছু শরীক করা যাইবে না। প্রতিমা ভাঙ্গিতে হইবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখিতে হইবে।
রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন যে, بأن تعبد الله وحده لاشريك له وتكسير الاصنام وتصل الأرحام. "তুমি এক আল্লাহ্ ইবাদত করিবে, যাঁহার কোন শরীক নাই এবং প্রতিমা ভাঙ্গিয়া ফেলিবে। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখিবে"।
আমর ইব্‌ن আবাসা (রা) বলেন: আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, এই ব্যাপারে আপনার অনুগামী কে? তিনি বলিলেন, "একজন স্বাধীন ব্যক্তি এবং একজন গোলাম।" অর্থাৎ হযরত ابূ বাক্স ইব্‌ন ابূ কুহাফা (রা) এবং তাঁহার আযাদকৃত গোলাম বিলাল (রা)। আমি বলিলাম, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যেই পয়গামসহ পাঠাইয়াছেন তাহা কতইনা উত্তম! আমি আপনার প্রতি ঈমান আনিয়াছি এবং আপনাকে সত্য বলিয়া স্বীকার করিতেছি। এখন কি আমি আপনার সহিত অবস্থান করিব? এই ব্যাপারে আপনার অভিমত কি? রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, قد تترى كراهة الناس لما جئت به فامكن في أهلك فاذا سمعتم بي قد خرجت مخرجی فائتینی "তুমি তো এখন লক্ষ্য করিতেছ, আমি যাহা নিয়া আসিয়াছি তাহা লোকেরা কেমন অপছন্দ করিতেছে। সুতরাং তুমি তোমার পরিবারের সঙ্গে গিয়া থাক। যখন তোমরা আমার সম্পর্কে শুনিবে যে, আমি প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়া শুরু করিয়াছি, তখন তুমি আমার নিকট আসিও।"
হযরত আমর ইব্‌ن আবাসা (রা) বলেন, ইসলাম গ্রহণ করিয়া আমি আমার পরিবারের নিকট ফিরিয়া গেলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (س) যখন মদীনায় হিজরত করিলেন তখন একদিন মক্কার কিছু লোক আমাদের নিকট আসিলে আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, মক্কার সেই ব্যক্তির কি খবর, যিনি তোমাদের নিকট আসিয়াছেন? তাহারা বলিল, তাঁহার সম্প্রদায় তাঁহাকে হত্যা করিতে চেষ্টা করিয়াছিল। কিন্তু তাহারা ইহাতে সফলকাম হয় নাই। ইহাতে তাঁহার ও তাঁহার সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হইল এবং আমরা তখন দ্রুত তথা হইতে চলিয়া আসিলাম। হযরত আমর ইব্‌ن আবাসা (রা) বলেন, অতঃপর আমি মদীনায় গিয়া রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট হাজির হইয়া আরয করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আমাকে চিনিতে পারিয়াছেন? রাসূলুল্লাহ্ (س) বলিলেন, نعم الست انت الذي اتيتني بمكة "হাঁ, তুমি কি সেই ব্যক্তি নহ, যে মক্কায় আমার নিকট আসিয়াছিল"।
হযরত ابূ যার (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, হযরত ابূ যার গিফারী (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (س)-এর নবুওয়াত সম্পর্কে জানিতে পারিলেন তখন তাঁহার ভাই উنایسকে তিনি বলিলেন, "তুমি মক্কায় গিয়া সেই ব্যক্তি সম্পর্কে জানিয়া আস যিনি দাবি করিয়াছেন যে, তিনি নবী এবং তাঁহার নিকট আকাশ হইতে ওহী নাযিল হয়। তাঁহার কথা শুনিয়া আমার নিকট আসিয়া ইহার বিবরণ জানাও”। উنایس মক্কায় পৌঁছিয়া রাসূলুল্লাহ (س)-এর কথা শুনিয়া ابূ যার (রা)-এর নিকট ফিরিয়া আসেন। অতঃপর বলেন, 'আমি তাঁহাকে দেখিয়াছি যে, তিনি লোকজনকে উত্তম চরিত্র-মাধুর্যের কথা বলেন। তাঁহার কথায় মোটেও কবিতার ছোঁয়া নাই।' ابূ যার (রা) বলিলেন, 'তোমার কথায় আমি তৃপ্ত হইতে পারিলাম না।' অতঃপর তিনি সফরের পাথেয় ও পানির মশক নিয়া বাহির হইয়া পড়িলেন এবং মক্কায় আসিয়া মসজিদে উপস্থিত হইলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (س)-কে তালাশ করিলেন। কিন্তু তিনি যেহেতু তাঁহাকে চিনিতেন না, তাই তাঁহার সম্পর্কে কাহাকেও কিছু জিজ্ঞাসা করা সমীচীন মনে করিলেন না। অবশেষে রাত্র হইলে তিনি মসজিদে শুইয়া পড়িলেন। হযরত আলী (রা) মসজিদে আসিয়া তাঁহাকে দেখিয়া বুঝিতে পারিলেন যে, ইনি কোন মুসাফির। তাঁহাকে তিনি নিজ গৃহে নিয়া গেলেন। কিন্তু কেহই কাহাকেও কোন কিছু জিজ্ঞাসা করিলেন না। এইভাবেই সকাল হইয়া গেল। পরদিনও তিনি মসজিদে আসিয়া রাসূলুল্লাহ (س)-কে তালাশ করিয়া পাইলেন না। রাত্র হইলে শুইয়া পড়িলেন। হযরত আলী (রা) তাঁহার পাশ দিয়া যাওয়ার সময় তাঁহাকে উঠাইয়া সঙ্গে নিয়া গেলেন। কিন্তু কেহই কাহাকেও কিছু জিজ্ঞাসা করিলেন না। তৃতীয় দিনও এইরূপ ঘটিল। তখন হযরত আলী (را) তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, 'তুমি কেন এখানে আসিয়াছ তাহা কি আমাকে বলিতে পার?' তিনি বলিলেন, 'তুমি যদি আমার সহিত এই অঙ্গীকার কর যে, তুমি আমাকে সঠিক সংবাদ দিবে, তাহা হইলে আমি তোমাকে বলিতে পারি।' তিনি রাজী হইলেন। ابূ যার (রা) সব বলিলেন। আলী (রা) বলিলেন, 'নিশ্চয় তিনি হক এবং তিনি আল্লাহ্র রাসূল। সকাল বেলা তুমি আমার অনুসরণ করিয়া চলিও। কিন্তু বিরুদ্ধবাদীদের কারণে আমার খুব আশংকা হয়। তাই আমি পথ চলার সময় যদি তোমার জন্য আশংকাজনক কিছু দেখি, তখন আমি পেশাব করিবার বাহানায় বসিয়া যাইব। তুমি হাঁটিতে থাকিবে। এইভাবে আমি তোমাকে তাঁহার নিকট পৌঁছাইয়া দিব।' পরদিন তিনি হযরত আলী (را)-এর সহিত রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট হাজির হইলেন এবং তাঁহার কথা শুনিলেন এবং সেই স্থানেই মুসলমান হইয়া গেলেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহাকে বলিলেন, ارجع الى قومك فأخبرهم حتى يأتيك امرى "তুমি তোমার গোত্রের নিকট ফিরিয়া যাও এবং তাহাদেরকে ইহার সংবাদ দাও। তোমার নিকট আমার নির্দেশ পৌঁছিয়া যাইবে।” কিন্তু তিনি আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে প্রেরণ করিয়াছেন। আমি চিৎকার করিয়া শত্রুদের মধ্যে ইহা ঘোষণা করিব। ইহা বলিয়া তিনি মসজিদে আসিয়া উচ্চৈস্বরে ঘোষণা করিলেন اشهد ان لا اله الا الله وأن محمدا رسول الله. ইহা শুনিয়া কুরায়شরা তাঁহাকে প্রহার করিতে লাগিল। তখন হযরত আব্বাস (রা) তাঁহাকে আড়াল করিয়া তাহাদেরকে ভর্ৎসনা করিলেন এবং বলিলেন, তোমরা কি জান না, ইনি গিফার গোত্রের লোক? তোমাদের ব্যবসায়ের উদ্দেশে সিরিয়া যাওয়ার পথেই ইহাদের গিফার গোত্র। তখন তাহারা তাঁহাকে ছাড়িয়া দেয়। দ্বিতীয় দিন সকালেও তিনি অনুরূপ ঘোষণা করিলে প্রহৃত হন এবং আব্বাস (রা) আসিয়া তাঁহাকে রক্ষা করেন।

টিকাঃ
১. উসুদুল গাবা, ১খ., পৃ. ২৮৭।
২. যাহাবী, আস্-সীরাতুন নাবابিয়‍্যা, পৃ. ৭৯; তাবাকাত ইবন সা'দ, ৩খ., পৃ. ২১৪-১৫; আল-বিদায়া ওয়ানৃ-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩১-৩২।
৩. খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ১২২।
৪. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩৫; খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ১২২; আল্-ইসবা, ২খ., পৃ. ৯১।
৫. উয়ূনুল আছার, ১খ., পৃ. ৯৮; তাবাকাত ইবন সা'দ, ৩খ., পৃ. ১৫০-১৫১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩৫।
৬. سীরাতুল মুস্তাফা (স), ১খ., পৃ. ১৬৫-৬৭; আর-রিয়াদুন নাদদ্রাহ, ২খ., পৃ. ৭-৮।
৭. সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ., পৃ. ১৬৭; আর-রিয়াদুন নাদারা, ২খ., পৃ. ৮।
৮. তাবাকাত ইবন সা'দ, ৩খ., পৃ. ২২৭।
৯. মুسناদে আহমاد, ৪খ., পৃ. ১১১, হাদীছ নং ১৭১৪১।
১০. মুسناদে আহমاد, হাদীছ নং ১৭১৪৪।
১১. মুসনাদে আহমاد, ৪খ., পৃ. ১১১, হাদীছ নং ১৭১৪১।
১২. মুسناদে আহমاد, ৪খ., পৃ. ১৩৯, হাদীছ নং ১৭১৪৪; আল্-ইস্ত্রী'আব, ৩খ., পৃ. ১১৯২-৯৩; হায়াতুস্ সাহাবা, ১খ., পৃ. ৪১-৪২।
১৩. উয়ূনুল আছার, ১খ., পৃ. ৯৮; আল-বিদায়া ওয়ান্‌-নিহায়া, খ. ৩, পৃ. ৩৭।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গোপনে দাওয়াত

📄 গোপনে দাওয়াত


ইহা তো স্বীকৃত ব্যাপার যে, মক্কা নগরী সব সময়ই সমগ্র আরবের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এইখানে কা'বার ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য রহিয়াছে। এইখানে তখন সেই প্রতিমা পূজারীরাও ছিল, যাহাদেরকে সমগ্র আরবে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হইত। এইজন্যই অন্য যে কোন স্থান হইতে মক্কায় ধর্মীয় সংস্কারমূলক কাজ করা খুবই দুরূহ ছিল। তাই তখন এমন অটল দৃঢ়তার প্রয়োজন ছিল যেই অবিচলতায় বিপদের শত ঝাপটাও স্বীয় স্থান হইতে বিচ্যুত করিতে পারিবে না। আর এই লক্ষ্যকে সামনে রাখিয়া সুচিন্তিত যেই পথটি উন্মুক্ত ছিল, সেইটি হইল, প্রথম প্রথম দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ গোপনে লোকচক্ষুর অন্তরালে আঞ্জাম দেওয়া যাহাতে মক্কাবাসী হঠাৎ করিয়া এক উত্তেজক অবস্থার সম্মুখীন না হয়।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত জা'ফর ইবন আবূ তালিব (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ

📄 হযরত জা'ফর ইবন আবূ তালিব (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ


একদিন হযরত আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত নামায পড়িতেছিলেন। হযরত আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডানপার্শ্বে দাঁড়াইয়াছিলেন। ঘটনাক্রমে সেইখান দিয়া আবূ তালিব পথ অতিক্রম করেন। জা'ফর (রা)-ও তাহার সঙ্গে ছিলেন। আবূ তালিব যখন এইভাবে নামায পড়িতে দেখেন তখন জা'ফর (রা)-কে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন, হে বৎস! তুমিও আলীর মত তোমার চাচাত ভাইয়ের সঙ্গী হইয়া যাও এবং তাঁহার বামদিকে দাঁড়াইয়া নামাযে শরীক হইয়া যাও। তখন তিনি নামাযে দাঁড়াইয়া যান। বর্ণিত আছে, তিনি ৩১ জনের পর ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00