📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নির্ভরযোগ্য হাদীছে ওহীর শুভ সূচনার পূর্বাভাস সম্পর্কীয় বিবরণ

📄 নির্ভরযোগ্য হাদীছে ওহীর শুভ সূচনার পূর্বাভাস সম্পর্কীয় বিবরণ


নির্ভরযোগ্য হাদীছে ওহী-র শুভ সূচনার পূর্বাভাস সম্পর্কীয় বিবরণ
রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি কিসের মাধ্যমে ওহী আসিবার পূর্বাভাষ সূচিত হইয়াছিল, কিভাবে উহা বাস্তবে প্রতিফলিত হইত, কোন জিনিসের প্রতি তাঁহার অনাবিল আগ্রহ সৃষ্টি হইয়াছিল, সমাগত চিরসত্য প্রাপ্তির সূচনার বিবরণাদিসহ উহার বিরতিকাল এবং এই সময়ে তাঁহার আত্মিক অস্থিরতা, ব্যাকুলতা ইত্যাদি সম্পর্কীয় নির্ভরযোগ্য বিবরণ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা) হইতে একটি হাদীছ এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে: عن عائشة أم المؤمنين رضى الله تعالى عنها انها قالت أول ما بدئ به رسول الله صلى الله عليه وسلم من الوحى الرؤيا الصالحة في النوم فكان لا يرى رؤيا الا جاءت مثل فلق الصبح ثم حبب اليه الخلاء وكان يخلو بغار حراء فيتحنث فيه وهو التعبد الليالي ذوات العدد قبل ان ينزع الى اهله ويتزود له ثم يرجع الى خديجة فيتزود لمثلها حتى جاءه الحق وهو في غار حراء فجاءه الملك فقال اقرأ فقلت ما انا بقارئ قال فاخذني فغطني حتى بلغ منى الجهد ثم أرسلنى فقال إقرأ فقلت ما انا بقارئ فاخذني فغطني الثانية حتى بلغ مني الجهد ثم أرسلنى فقال إِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الإِنْسَانَ مِنْ عَلَى اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ . فرجع بها رسول الله صلى الله عليه وسلم يرجف فؤاده فدخل على خديجة بنت خويلد فقال زملونی زملونی فزملوه حتى ذهب عنه الروع فقال لخديجة وأخبرها الخبر لقد خشيت على نفسى فقالت خديجة كلا والله ما يخزيك الله ابدا انك لتصل الرحم وتحمل الكل وتكسب المعدوم وتقرى الضيف وتعين على نوائب الحق. فانطلقت به خديجة حتى اتت به ورقة ابن نوفل بن اسد بن عبد العزى ابن عم خديجة وكان أمراً تنصر في الجاهلية وكان يكتب الكتاب العبراني فيكتب من الإنجيل بالعبرانية ما شاء الله ان يكتب وكان شيخا كبيرا قد عمى فقالت له خديجة يا ابن عم اسمع من ابن أخيك فقال له ورقة يا ابن اخي ماذا ترى فأخبره رسول الله صلى الله عليه وسلم خبر ما رأى فقال له ورقة هذا الناموس الذي نزل الله على موسى يا ليتني فيها جزعا يا ليتني أكون حيا اذ يخرجك قومك فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم أو مخرجى هم قال نعم لم يأت رجل قط بمثل ما جئت به الا عودى وان یدرکنی يومك أنصرك نصرا مؤزرا ثم لم ينشب ورقة ان يوفى وفتر الوحي . "উম্মুল মুমিনীন 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি প্রথম ওহীর সূচনা হইয়াছিল সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দর্শন করিতেন উহা ভোরের আলোকরশ্মির ন্যায় সত্যরূপে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিত। অতঃপর নির্জন জীবন যাপনের প্রতি তাঁহার আগ্রহ সৃষ্টি হইল। তিনি নির্জনে হেরা গুহাতে 'ইবাদত করিতেন, দিবা-রাত্র 'ইবাদতে মগ্ন থাকিতেন, খাদ্য-সামগ্রী ফুরাইয়া গেলে খাদীজা (রা)-এর নিকট ফিরিয়া আসিয়া পুনখাদ্যসামগ্রী লইয়া আবার গুহাতে ফিরিয়া যাইতেন, অবশেষে একদিন সত্য সমাগত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) তখন 'হেরা' গুহাতে ছিলেন। ইতিমধ্যে জিব্রাঈল 'আলায়হি ওয়াসাল্লাম আগমন করিয়া বলিলেন, "পড়ুন"। আমি বলিলাম, "আমি পড়িতে পারি না।" রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, জিব্রাঈল (আ) আমাকে কাছে টানিয়া লইলেন এবং এত জোরে আলিঙ্গন করিলেন যে, আমি ক্লান্ত হইয়া পড়িলাম। তারপর আলিঙ্গনমুক্ত করিয়া বলিলেন, 'পড়ুন'। উত্তরে বলিলাম, 'আমি পড়িতে পারি না'। পুনরায় দ্বিতীয়বার তিনি আমাকে কাছে টানিয়া খুব জোরে চাপিয়া ধরিলেন। ফলে পুনঃ ক্লান্ত ও শ্রান্ত হইয়া পড়িলাম। অতঃপর আমাকে ছাড়িয়া দিয়া বলিলেন, পড়ুন। আমি বলিলাম, আমি পড়িতে পারি না। রাসূলে কারীম (স) বলিলেন, জিবরাঈল ফেরেস্তা আমাকে তৃতীয়বার কাছে টানিয়া দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিলেন। ফলে আমি পূর্ণমাত্রায় ক্লান্ত-শ্রান্ত হইয়া পড়িলাম। তারপর তিনি আমাকে আলিঙ্গনমুক্ত করিয়া বলিলেন, إِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ، خَلَقَ الإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ . اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ . "পড়ুন, আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন। তিনি সৃষ্টি করিয়াছেন মানবজাতিকে আঠাল রক্ত হইতে। পড়ুন, আপনার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত” (৯৬: ১-৩)। রাসূলুল্লাহ (স) কম্পমান হৃদয়ে গৃহে ফিরিয়া আসিলেন। তিনি খাদীজা বিন্‌তে খুওয়ায়লিদ-এর গৃহে প্রবেশ করিয়া ডাকিয়া বলিলেন, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। তিনি তাঁহাকে বস্ত্রাবৃত করিলেন। অবশেষে যখন ভয়ভীতি দূর হইয়া গেল তখন তিনি খাদীজার নিকট সমস্ত ঘটনা জানাইয়া বলিলেন, আমি আমার জীবনের আশংকা করিতেছি। খাদীজা (রা) সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, "কখনও নয়, আল্লাহ্র কসম! তিনি আপনাকে কখনও অপমানিত করিবেন না। নিশ্চয় আপনি আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখেন, অপরের দুঃখ-দুর্দশাকে লাঘব করেন, অসহায়দের অভাব দূর করেন, অতিথিদের সেবা করেন, সত্য প্রতিষ্ঠাতে আপনি সাহায্য করেন। অতঃপর খাদীজা (রা) রাসূলে আকরাম (স)-কে সঙ্গে লইয়া তাঁহার চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবন নাওফাল ইব্‌ন আসাদ ইবন 'আবদুল 'উয্যা-এর কাছে গেলেন। ওয়ারাকা জাহিলী যুগে 'ঈসায়ী ধর্মের অনুসারী ছিলেন। তিনি হিব্রু ভাষাতে পুস্তকাদি লিখিতেন, এমনকি ইন্জীল-এর কিছু অংশ লিখিয়াছিলেন মহান আল্লাহ্র ইচ্ছা অনুযায়ী। বয়স ছিল অনেক বিধায় তিনি দৃষ্টিহীন হইয়া পড়িয়াছিলেন। খাদীজা (রা) তাহাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, ভাইয়া! আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রের নিকট হইতে ঘটনা শ্রবণ করুন।" ওয়ারাকা বলিলেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্র! তুমি কি দেখিয়াছ, বিবরণ দাও। আল্লাহ্র রাসূল (স) যাহা কিছু দেখিয়াছিলেন সবকিছুই তাঁহার কাছে বর্ণনা দিলেন। ওয়ারাকা সমস্ত ঘটনা শ্রবণ করিয়া বলিলেন, "উহা নামুস", ইনিই জিব্রাঈল ফেরেস্তা, যাঁহাকে আল্লাহ মূসা (আ)-এর নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। হায় আফসোস! আমি যদি বাঁচিয়া থাকিতাম, যখন নিজ বংশের লোকেরা তোমাকে বিতাড়িত করিবে। রাসূলে কারীম (স) বিস্ময়ের সহিত জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহাদের দ্বারা আমি কি বিতাড়িত হইব? উত্তরে বলিলেন, হাঁ, যাঁহারাই অনুরূপ জ্যোতি লইয়া আসিয়াছিলেন তাঁহাদের সকলকে দেশ হইতে বিতাড়িত হইতে হইয়াছিল। তোমার জীবনের ঐ দিনগুলিতে যদি আমি বাঁচিয়া থাকি, তবে আমি সর্বশক্তি দিয়া তোমাকে সাহায্য করিব। ইহার পরে ওয়ারাকা বেশি দিন জীবিত ছিলেন না এবং কিছু দিনের জন্য ওহী প্রাপ্তির সাময়িক বিরতি ঘটে” (বুখারী, আওয়ালু মা বুদিআ বিহিল-ওয়াহহিয়, বাব, ৩; তু. মুসলিম, ঈমান, পৃ. ২৬৩, ২৫৪)।
কিসের মাধ্যমে ওহীর সূচনা হইয়াছিল এই প্রসঙ্গে উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা)-এর উল্লিখিত হাদীছ ছাড়াও অপরাপর হাদীছ, তাফসীর ও মুহাম্মাদ মুসতাফা (স)-এর জীবনী গ্রন্থসমূহে ওহীর সূচনার যেসব পুংখানুপুংখ বিশ্লেষণ লিপিবদ্ধ রহিয়াছে তন্মধ্যে নিম্নলিখিত বিবরণগুলি উল্লেখযোগ্য: সত্য স্বপ্ন (الرؤيا الصادقة) (দর্শনের মাধ্যমে ওহীর সূচনা হইয়াছিল এবং ইহাই ছিল প্রকৃত ঘটনার পূর্বাভাষ। একইরূপ অপর হাদীছ ইবন জারীর (র) তাঁহার তাফসীরে ও ইন্ন সা'দ সংকলন করিয়াছেন।
মুহাম্মাদ ইদ্রীস কান্ধলভী তাঁহার "সীরাতুল মুসতাফা"-তে সত্য স্বপ্ন প্রসঙ্গে এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, অদৃশ্য বিষয়াবলী উন্মোচনের ক্ষুদ্রতম মাধ্যম হইল সত্য স্বপ্ন, আর সর্বোচ্চ মাধ্যম হইল ওহী। রু'য়া সালিহা হইল নবুওয়াতের নমুনামাত্র। এই প্রসঙ্গে আবু নাঈম হাসান সনদে 'আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ-এর ছাত্র 'আলকামা ইব্‌ন কায়س হইতে একটি মুরসাল হাদীছ এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, প্রথমে নবীগণ স্বপ্ন দেখিতেন, ইহাতে তাঁহাদের অন্তর প্রশান্তিময় হইয়া যাইত এবং সার্বক্ষণিক উহার জন্য উৎকণ্ঠা বাড়িয়া গেলে ওহী নাযিল হইত। যেমন হযরত ইউসুফ ও ইব্রাহীম ('আ)-এর স্বপ্ন।
সত্য স্বপ্ন (الرؤيا الصادقة) 'নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের একভাগ' এই প্রসঙ্গে ইমাম বুখারী (র) একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করিয়াছেন: রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, সত্য স্বপ্ন নবুওয়াতের ছেচল্লিশ অংশের একাংশ। সমস্ত নবী-রাসূলদের কাছে ওহীর সূচনার পূর্বাভাস সূচিত হইয়াছিল স্বপ্নের মাধ্যমে। এই প্রসঙ্গে ইব্‌ن হাজার 'আস্কালানী (৭৭৩-৮৫২ হি.) ফাতহুল বারীতে আবূ না'ঈم-এর "আদ্-দালাইল” গ্রন্থের উদ্ধৃতি উল্লেখপূর্বক হাসান-এর সনদে 'আলকামা ইন্ন কায়س হইতে একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন: إن أول ما يؤتى به الانبياء في المنام حتي تهدا قلوبهم ثم ينزل الوحى. "ওহীর সূচনালগ্নে নবীদের কাছে যাহা কিছু আসিত উহা স্বপ্নের মাধ্যমে আসিত। ইহা এইজন্য ছিল যে, তাঁহাদের হৃদয়ভূমি ওহী গ্রহণের উপযোগী হইয়া যায়, হহার পরে জাগ্রত অবস্থায় ওহী নাযিল হইত"। সত্য স্বপ্ন (الرؤيا الصادقة) শুধু রাসূলদের জন্য নির্দিষ্ট (খাস) নহে। এই প্রসঙ্গে মান্নাউল কাত্তান উল্লেখ করিয়াছেন, সত্য স্বপ্ন শুধু নবী-রাসূলদের সহিত সম্পৃক্ত নহে, বরং উহা মুমিনদের জন্যও প্রযোজ্য। তখন উহা ওহী হিসাবে গণ্য হইবে না। এই প্রসঙ্গে রাসূলের বাণী: إنقطع الوحى وبقيت المبشرات رؤيا المؤمن . “ওহী (আগমন) বন্ধ হইয়া গিয়াছে, সুসংবাদসমূহের (আগমন) এখনো অবশিষ্ট রহিয়াছে, উহা হইল মুমিনের সত্য স্বপ্ন”। আম্বিয়াদের সকল সত্য স্বপ্ন )الرؤيا الصالحة في المنام ওহীর হুকুম রাখে এবং ইহার অনুসরণ ওয়াজিব আল-কুরআনে ইহার বিবরণ উল্লেখ হইয়াছে, ইবরাহীম (আ) কর্তৃক স্বীয় পুত্র ইসমা'ঈل (আ)-কে যবেহ প্রসঙ্গে।
ওহীর সূচনার পূর্বাভাষ হিসাবে যেমন রাসূলে কারীম (স) স্বপ্ন দেখিতেন তেমনি পরবর্তী কালেও তিনি অনুরূপ স্বপ্ন দেখিতেন। এই প্রসঙ্গে বুখারী শরীফে বর্ণিত হইয়াছে যে, উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা)-এর প্রতি যখন সন্দেহ পোষণ করা হইয়াছিল, তখন তিনি এই আশাই পোষণ করিয়াছিলেন, আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন তাঁহার নিষ্কলঙ্কতার কথা রাসূলুল্লাহ (স)-কে স্বপ্নে জানাইয়া দিবেন।
স্বপ্নের মাধ্যমে ওহী আসার নিগূঢ় রহস্য প্রসঙ্গে আল্লামা আয়নী (র) বলিয়াছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর কাছে ওহী আসিত ঘুমন্ত অবস্থায় এবং ধীরে ধীরে যেন ইহা তাঁহার কাছে সহজতর মনে হয় এবং ওহী আনয়নকারী ফেরেশতার সাথে ক্রমশ সখ্যতা বৃদ্ধি পায়। সত্য স্বপ্ন )الرؤيا الصادقة(-এর মাধ্যমে ওহীর সূচনা মূলত রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক আসন্ন ওহী গ্রহণের একটি পূর্ব-প্রশিক্ষণ মাত্র। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিদ্রা ও তন্দ্রা এবং স্বপ্নকে একান্তভাবে বিশ্লেষণ করিতে হইলে দুইটি বিষয়ের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি প্রদান আবশ্যক। (এক) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিজ নিদ্রা সম্পর্কীয় বর্ণনার প্রতি। এই প্রসঙ্গে তিনি বলিয়াছেন, আমার চক্ষুদ্বয় ঘুমাইয়া থাকে কিন্তু আমার অন্তর সর্বদাই জাগ্রত থাকে। অর্থাৎ চক্ষুদ্বয় বন্ধ হওয়া সত্ত্বেও তাঁহার অন্তর সর্বদা জাগ্রত থাকে। (দুই) রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্বপ্ন দর্শন তাঁহার গভীর নিদ্রাতে সংঘটিত হইত না, বরং ইহা এমন একটি অবস্থাতে সংঘটিত হইত যাহাকে পুরা নিদ্রাও বলা চলে না বা পূর্ণ সজাগ এমনটিও নহে, এই দুইয়ের মাঝামাঝি এক অবস্থা। ওহীর সূচনার পূর্বাভাষ সম্পর্কীয় আলোচনায় সুস্পষ্ট যে, "সত্য স্বপ্ন দর্শন" (الرؤيا لصالحة في المنام)-এর মাধ্যমে ওহীর সূচনার পূর্বাভাষ হইয়াছিল।
যে সমস্ত স্বপ্ন দর্শনের মাধ্যমে ওহীর নাযিলের পূর্বাভাষ সূচিত হইয়াছিল, কিভাবে উহার সত্যতার প্রতিফলন ঘটিত? কোন জিনিসের প্রতি এবং কেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনাবিল আগ্রহ হইয়াছিল ইত্যাদি প্রসঙ্গে যেসব বিবরণ হাদীছ, তাফসীর এবং সীরাত গ্রন্থগুলিতে বর্ণিত হইয়াছে তন্মধ্যে নিম্নলিখিত বর্ণনা প্রণিধানযোগ্য : উম্মুল মু'মিনীন হযরত আইশা (রা)-এর হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে যে, ওহী নাযিলের পূর্বাভাষ সূচিত হইয়াছিল সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে এবং ঊষার আলোর মতই সত্য হইয়া উহার প্রতিফলন ঘটিত। অর্থাৎ এই সময়ে রাসূলে কারীম (স) যে স্বপ্নই দেখিতেন, তাহা ভোরের উদীয়মান সূর্যের ন্যায় বাস্তবে সংঘটিত হইত। উদীয়মান সূর্যের সহিত সত্য স্বপ্নের যে সূক্ষ্ম উপমা প্রদান করা হইয়াছে, এই প্রসঙ্গে মুহাম্মاد ইদ্রীس কান্ধলাভী তাঁহার "সীরাতুল মুস্তাফা” ১৩০ পৃ.-তে ইব্‌ن ابূ জামরাহ্ হইতে একটি রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন যে, "প্রত্যূষের ক্রমবর্ধিষ্ণু ফর্সা ও উজ্জ্বলতা যেমন উদীয়মান প্রখর সূর্যের ভূমিকাস্বরূপ, তেমনি "সত্য স্বপ্ন” নবুওয়াত ও রিসালাত-এর উদীয়মান সূর্যশিখার ভূমিকাস্বরূপ।
স্বপ্ন দর্শনকালীন নির্জন অবস্থানের প্রতি রাসূলের অনাবিল আগ্রহ সৃষ্টি এবং ক্রমশ নির্জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণ প্রসঙ্গে ইب্‌ن কাছীর তাঁহার তা'রীখে এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, "যখন রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহার জাতিকে গাছপালা-পাথর ইত্যাদির পূজা ও সিজদা করার মত নিকৃষ্টতম ও স্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত দেখিলেন তখন উহা হইতে জাতিকে মুক্ত করিয়া সঠিক পথে পরিচালিত করিবার চিন্তায় মগ্ন হইয়া পড়েন। ফলে ক্রমশ নির্জনতা ও নিসঙ্গতা প্রিয় হইয়া উঠে। ওহীর সূচনার শুভ দিন যতই নিকটে আসিতে লাগিল ততই রাসূলুল্লাহ (س)-এর নির্জনে অবস্থান ক্রমবর্ধিষ্ণু হারে প্রিয় হইয়া উঠিল।" তারীখে আক্কার ওয়া উলূم ইসলামী-তে আরও স্পষ্টভাবে রাসূলের নির্জনপ্রিয়তার কারণ প্রসঙ্গে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, "নির্জনতার প্রতি রাসূলুল্লাহ (س)-এর আকর্ষিত হইবার কারণ ইহাও হইতে পারে যে, "তাহাখ্খুলে ওয়াহয়ি” অর্থাৎ ওহী গ্রহণ করিবার জন্য দরকার ছিল বিশেষ যোগ্যতা। আর এই যোগ্যতা সৃষ্টির মাধ্যম ছিল নির্জন ও নিভৃত স্থানে একাগ্রতার সহিত গভীরভাবে ইবাদতও ক্রমাগত অনুশীলন যেন ইহার গুরুভার বহনের যোগ্যতা সৃষ্টি হয়। যেমন আল্লাহ হযরত মূসা ('আ)-কে রোযা রাখার আদেশ দিয়াছিলেন।" "ফায়দুল বারী" গ্রন্থকার এক চমৎকার ব্যাখ্যা উল্লেখ করিয়াছেন যে, হেরা গুহাতে অবস্থানকারী সকলেই তিন ধরনের 'ইবাদতের সমন্বয় করিতে পারেন। খালওয়াত বা নির্জনতায় অবস্থান, তাআব্বুদ বা কায়মনোবাক্যে 'ইবাদাত করা এবং রু'য়াতু বায়তিল্লাহ্ বা কা'বা শরীফ বারবার দর্শনের সুযোগ লাভ। রাসূলুল্লাহ্ (س) ইহার প্রত্যেকটি 'ইবাদতের অপূর্ব সুযোগ লাভ করিয়াছিলেন। আল-কাستال্লانی নির্জনতার প্রতি রাসূলুল্লাহ (س)-এর অবর্ণনীয় আকর্ষণের কারণ উল্লেখপূর্বক বলিয়াছেন যে, 'যেন রাসূলের অন্তর মুবারকে হিকমাত-এর ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হয়'।
ওহীর সূচনা কখন হইয়াছিল এবং কোন সময়ে, কোন দিনে, কোন মাসে, কাহার কাছে, কত বৎসর বয়সে, কোন জায়গাতে, কোন ভাষাতে, কাহার মাধ্যমে হইয়াছিল ইত্যাদি প্রসঙ্গে আল-কুরআন, আল-হাদীছ, ইহাদের ভাষ্যসমূহে এবং সীরাত গ্রন্থাবলীতে যেসব বিবরণ পাওয়া যায় উহার কিছু আলোচনা পেশ করা হইল:
যখন রাসূলুল্লাহ (س) পরিণত বয়সে পদার্পণ করিলেন তখন আল্লাহ রব্বুল 'আলামীন ওহীর সূচনার মাধ্যমে তাঁহাকে বিশ্বজগতের জন্য সুসংবাদ দানকারী এবং ভীতি প্রদর্শনকারী হিসাবে প্রেরণ করিয়াছিলেন যেন তাহাদিগকে অজ্ঞানতার আঁধার হইতে মুক্ত করিয়া হিদায়াতের পথ দেখাইতে পারেন। ওহীর এই শুভ সূচনা হইয়াছিল ৬১০ খৃ. মোতাবেক ১৭ রামাদান। তিনি চল্লিশ বৎসর বয়সে এবং সোমবারে নবুওয়াত পাইয়াছিলেন, এই প্রসঙ্গে ইব্‌ن হিশام সীরাত-এ ইবন ইসহাক-এর বরাত দিয়া উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (س) চল্লিশ বৎসর বয়সেই নবুওয়াত লাভ করিয়াছিলেন। ইবন 'আব্বাস, জুবায়র ইবন মুত'ঈم, কুবাছ ইব্‌ن আশয়াম, সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব এবং মালিক ইব্‌ن আনাস (রা) প্রমুখ বর্ণনা করিয়াছেন যে, জ্ঞানী ও সীরাত লেখকদের কাছে ইহাই বিশুদ্ধ মত। আল-বাকাই বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (س) বিলাল (রা)-কে বলিয়াছেন, "সোমবারের রোযা খুবই পুণ্যময়, কেননা এই দিনই আমি জন্মগ্রহণ করিয়াছি, এই দিনই নবুওয়াত লাভ করিয়াছি এবং এই দিনই আমার মৃত্যু হইবে"। সোমবারে ওহীর সূচনা প্রসঙ্গে কাতাদা (র) হইতে একইরূপ একটি হাদীছ ইমাম মুসলিম (র) সংকলন করিয়াছেন। মুহাম্মاد ریদা এই প্রসঙ্গে বলিয়াছেন, “৪১তম বৎসরে পদার্পণ করিলে হযরত জিবراঈل (আ) নবুওয়াত-এর সুসংবাদ সম্বলিত প্রথম ওহী নিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। চান্দ্রমাসের হিসাবানুযায়ী রাসূলুল্লাহ (س)-এর জীবনে প্রথম ওহীর সূচনা হইয়াছিল ৪০ বৎসর ৬ মাস ৮ দিনে অর্থাৎ ৬১০ খৃ.-এর ৬ আগস্ট।
ভিন্নমত পোষণ করিয়া ইমাম আহমاد (র) ওয়াসিলা ইব্‌নু’ل اسکا’-এর সনদে উল্লেখ করিয়াছেন, “ইব্রাহীم (‘আ)-এর সহীফাসমূহ রামাদান-এর প্রথম রজনীতে, তাওরাত ষষ্ঠ রামাদান অতিবাহিত হইবার পর, ইন্জীল তেরই রামাদানে এবং আল-কুরআন নাযিল হইয়াছে চব্বিশ রামাদান-এ”। এইজন্য সাহাবা ও তাবিঈনের অনেকেই চব্বিশ রামাদান-এ লায়লাতু’ল-কদ্‌ر বা মহা-মহিমান্বিত রাত্র হইয়া থাকে, এইমত পোষণ করিয়া থাকেন। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ, নির্ভরযোগ্য ও যথার্থ মত অনুসারে রমযান মাসের “লায়লাতুল কদ্‌ر”-এর অতীব বরকতময় মহিমান্বিত রজনীতে কুরআন মজীদ নাযিল হইয়াছে। এই সম্পর্কে কুরআন মজীদের তিন জায়গায় স্পষ্ট বক্তব্য বিদ্যমান। মহান আল্লাহ বলেন: شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَتِ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ. “রমযান মাস, ইহাতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে আল-কুরআন নাযিল হইয়াছে” (২: ১৮৫)।
উপরন্তু প্রতি রমযান মাসে প্রতি রাত্রে মহানবী (স) জিবরাঈল (আ)-কে কুরআন (যতখানি নাযিল হইয়াছে) পড়িয়া শুনাইতেন।
কুরআন মজীদ এক বরকতময় রাত্রে নাযিল হইয়াছে। এই সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন: إِنَّا أَنْزَلْتُهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَرَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ أَمْرًا مِّنْ عِنْدِنَا . “নিশ্চয় আমি ইহা (আল-কুরআন) নাযিল করিয়াছি এক বরকতময় রাত্রে। নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। এই রাত্রে প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয় আমার আদেশক্রমে” (৪৪: ৩-৫)।
উপরিউক্ত আয়াত হইতে বুঝা যায়, যে রাত্রে এই কুরআন মজীদ নাযিলের সূচনা হয় সেই রাত্র বড়ই কল্যাণময়, প্রাচুর্যময় ও বরকতপূর্ণ এবং সেই রাত্রে আল্লাহর নির্দেশে প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থিরীকৃত হয়। এখানে সেই বরকতময় রজনী কোনটি তাহা নির্দিষ্টভাবে না বলা হইলেও অপর এক সূরায় তাহা স্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে। إِنَّا أَنْزَلْتُهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ. وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ. لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ. تَنَزُّلُ الْمَلْئِكَةُ وَالرُّوحُ فِيْهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ سَلْمٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ. “নিশ্চয় আমি ইহা (আল-কুরআন) মহিমান্বিত রজনীতে নাযিল করিয়াছি। আর মহিমান্বিত রজনী সম্পর্কে তুমি কি জান? মহিমান্বিত রজনী সহস্র মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সেই রজনীতে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিবরাঈল) অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাহাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সেই রজনী ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত” (৯৭: ১-৫)।
কুরআন মজীদে লায়লাতুল কদর (কদরের রাত্রি) ব্যতীত অন্য কোনও রাত্রির এত অধিক ফযীলাত বর্ণিত হয় নাই (কদর শব্দের অর্থ ভাগ্য ও মর্যাদা উভয়ই)। সুতরাং সূরা ৪৪: ৩-৫ আয়াতে যে "বরকতময় রজনীর" কথা বলা হইয়াছে উহাকে ৯৭: ১-৫ আয়াতে নির্দিষ্ট করিয়া বলিয়া দেওয়া হইয়াছে যে, তাহা "লায়লাতুল কদর"। কেননা এই রাত্রের (ইবাদত-বন্দেগীসহ সমস্ত সৎকর্মের) কল্যাণ ও বরকত হাজার মাসের কল্যাণ ও বরকতের চাইতেও অধিক।
কোন রাতটি লায়লাতুল কদর এই সম্পর্কে মহানবী (স) বলেন: تَحَرُّوا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ. "তোমরা রমযান মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিসমূহে লায়লাতুল কদর অনুসন্ধান কর” (বুখারী, সাওম, বাব তাহাররী লায়লাতিল কাদ্র, নং ২০১৭; মুসলিম, সিয়াম, বাব ফাদলি লায়লাতিল কাদ্র, নং ২৭৭৬/২১৯; মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, সাওম, বাব লায়লাতিল কাদ্র; মুসনাদে আহমاد, ৬খ, পৃ. ৫৬, রিয়اد সং পৃ. ১৮১৯, নং ২৪৭৯৬, আরও দ্র. ২৪৭৩৭)।
অপর হাদীছে রমযানের শেষ সাত দিনের বেজোড় রাত্রিতে 'লায়লাতুল কদর' অনুসন্ধানের কথা বলা হইয়াছে।
অপর মত অনুযায়ী লায়লাতুল কদর রমযান মাসের ২৭ তারিখ (অর্থাৎ ২৬ তারিখ দিবাগত রাত্র)। যেমন: عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ أَبِي سُفْيَانَ عَنِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ قَالَ لَيْلَةُ الْقَدْرِ لَيْلَةُ سَبْعِ وَعِشْرِينَ. "মুআবিয়া ইব্‌ন ابূ সুফ্যান (রা) হইতে বর্ণিত। মহানবী (স) লায়লাতুল কদর সম্পর্কে বলেন: লায়লাতুল কদর হইল (রমযান মাসের) ২৭ তারিখের রাত্র” (ابূ دাউد, সালাত, নং ১৩۸৬; আরও দ্র. মুসনাদে আহমاد, ۵خ, পৃ. ۱۳۰, رিয়اد সং পৃ. ۱۵۵۷, নং ۲۱۵۰۹, আরও দ্র. নং ۲۱۵۲۸-۳۰, عبায়্যি ইব্‌ن کaব (রা) কর্তৃক বর্ণিত, আরও দ্র. মুসলিম, সিয়াম, নং ۲۷۶۳/۲۰۷, ইب্‌ن عمر (রা) কর্তৃক বর্ণিত)।
কুরআন মজীদ নাযিলের দিনটি সোমবার। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিল: يَا رَسُولَ اللهِ أَرَأَيْتَ صَوْمَ يَوْمِ الْاثْنَيْنِ وَيَوْمِ الخَمِيسِ قَالَ فِيْهِ وَلِدْتُ وَفِيْهِ أُنْزِلَ عَلَى القرآن. "ইয়া রাসূলাল্লাহ! সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোযা সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? তিনি বলেন: ঐ দিন আমি জন্মগ্রহণ করিয়াছি এবং ঐ দিনে আমার উপর আল-কুরআন নাযিল হইয়াছে'। উক্ত হাদীছে 'ঐ দিন' বলিতে সোমবার বুঝান হইয়াছে। কেননা সহীহ মুসলিমে স্পষ্টভাবে সোমবারের কথা উল্লেখ আছে। উপরন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর সোমবার জন্মগ্রহণের অভিমতটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। অতএব নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, কুরআন মজীদ সর্বপ্রথম রমযান মাসের লায়লাতুল কদরে সোমবার রাত্রে নাযিল হয়। এই রাত্রিটি ২৭ রমযানও হইতে পারে অথবা রমযানের শেষ দশকের যে কোন বেজোড় রাত্রিও হইতে পারে। কতক বিশেষজ্ঞ আলেম "লায়লাতু আল-কাদر" বাক্যাংশ প্রসঙ্গে বলিয়াছেন, উহা সংশ্লিষ্ট সূরায় তিনবার উক্ত হইয়াছে। তিনবারে উহার হরফসংখ্যা দাঁড়ায় ২৭ (সাতাশ = ৯০৩)। অতএব লায়লাতুল কদর হইল ২৭ রমযান।
কোন ভাষাতে ওহীর সূচনা হইয়াছিল, এই প্রসঙ্গে "আস্-সুয়ূতী" ইব্‌ন ابی হাতিم-এর সনদে সুফ্যান আছ-ছাওরী হইতে একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন, "আল্লাহ্ পাক রব্বুল 'আলামীন-এর পক্ষ হইতে সমস্ত ওহী 'আরবী ভাষাতেই নাযিল হইয়াছে। অতঃপর সমস্ত নবীই জাতির কাছে ইহার ভাষান্তরিত করিয়া দিয়াছেন।" ওহীর ভাষা ছিল 'আরবী'।
ওহীর সূচনার স্থান প্রসঙ্গে "রাসূলে রহমত"-এ উল্লেখ করা হইয়াছে যে, হেরা গুহাতে ওহীর সূচনা হইয়াছিল, যাহার উচ্চতা ৪ গজ এবং প্রশস্ততা পৌণে দুই গজ। ইহা মক্কার তিন মাইল দূরে অবস্থিত একটি পর্বত যাহার চূড়াতে চক্রাকারে ঘুরিয়া উঠিতে হয়। বর্তমানে ইহাকে "জাবালে নূর” বলা হইয়া থাকে। "হারাম শরীফ হইতে হেরা পর্বতের দূরত্ব আড়াই থেকে তিন মাইল। ইহার উচ্চতা প্রায় দুই হাজার ফুটের মত হইবে।
ওহীর সূচনা জাগ্রত অবস্থায় হইয়াছিল না ঘুমন্ত অবস্থায় এই প্রসঙ্গে দুই ধরনের রিওয়ায়াত লক্ষ্য করা যায়। ইব্‌ন হিশাম-এর "সীরাত”-এ ওহীর সূচনা ঘুমন্ত অবস্থায় হইয়াছিল, এই মর্মে একটি রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, যখন জিব্রাঈل 'আলায়হিস সালাম আমার কাছে ওহী লইয়া আসিলেন, তখন আমি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম। তিনি এক খণ্ড রেশমী বস্ত্রসহ আগমন করিলেন যাহাতে কিছু বাণী লিখিত ছিল। তারপর তিনি বলিলেন, পড়ুন। উত্তরে বলিলাম, আমি পড়িতে পারি না।
সহীহ বুখারী, মুসলিম ও অপরাপর হাদীছ গ্রন্থাবলীতে যেসমস্ত রিওয়ায়াত আসিয়াছে উহাতে সুস্পষ্ট যে, ওহীর সূচনা জাগ্রত অবস্থায় হইয়াছিল। কেননা উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা) বর্ণিত হাদীছে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে যখন হযরত জিব্রাঈল ('আ) সূরা ইকরা' লইয়া আসিলেন তখন তিনি জাগ্রত অবস্থায় ছিলেন। কেননা হাদীছের শুরুতে বলা হইয়াছে, "সত্য স্বপ্নের দ্বারা ওহীর নাযিলের পূর্বাভাষ সূচিত হইয়াছিল। এই সময়ে তিনি যে স্বপ্নই দেখিতেন উহা ঊষার আলোর মতই সত্য হইয়া দেখা দিত। ইহার পরে আল্লাহ তাঁহাকে নির্জনতার প্রতি আকৃষ্ট করিয়াছিলেন। অবশেষে তাঁহার কাছে যখন সত্যবাণী আসিয়া উপস্থিত হইল তখন তিনি হেরা গুহাতে জাগ্রত অবস্থায় ছিলেন।" আস্-সুহায়লী 'রাওদুল উনুফ'-এ সূদীর্ঘ আলোচনা পর্যালোচনার পর যে সারমর্ম উদঘাটন করিয়াছেন, তাহা হইল, "সর্বপ্রথম নবুওয়াতের সুখবর রাত্রিবেলায় স্বপ্নযোগে আসে। অতঃপর জাগ্রত অবস্থায় কুরআন নাযিলের শুভ সূচনা হয়"।
ওহীর সূচনার প্রাথমিক পর্যায়ের দায়িত্ব কাহার উপর ন্যস্ত হইয়াছিল, এই প্রসঙ্গীয় বিবরণ বিভিন্ন হাদীছের ভাষ্যে এবং মুহাম্মাদ মুস্তাফা (স)-এর জীবনী গ্রন্থসমূহে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে: বুখারী শরীফের প্রসিদ্ধ ভাষ্যকার আল্লামা 'আয়নী (র) মুস্লাদ আহমাদ-এর বিশুদ্ধ সনদে আশ্-শা'বী হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, "রাসূলুল্লাহ (স) চল্লিশ বৎসর বয়সে নবুওয়াত প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। নবুওয়াতের সূচনার প্রাথমিক পর্যায়ের তিন বৎসর যাবৎ হযরত ইস্রাফীল ('আ)-এর উপর দায়িত্ব প্রদান করা হইয়াছিল। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে আল-কুরআন ব্যতীত বিভিন্ন মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় বাণী শিক্ষা দিতেন। দীর্ঘ তিন বৎসর অতিবাহিত হইবার পর হযরত জিব্রাঈল (আ) নবুওয়াত পৌঁছানোর দায়িত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।" প্রায় একইরূপ বর্ণনা "সীরাত মুহাম্মদিয়্যা"- সংকলন করা হইয়াছে।
হযরত ইস্রাফীল ('আ)-কে প্রাথমিক পর্যায়ের দায়িত্ব প্রদানের রহস্য প্রসঙ্গে ইব্‌ن 'আসাকির বলিয়াছেন, "হযরত ইস্রাফীল (আ)-কে শিঙ্গা ফুঁকিবার দায়িত্ব প্রদান করা হইয়াছে, যাহার ফলে সমগ্র সৃষ্টিজগৎ একদিন ধ্বংস হইয়া যাইবে এবং কিয়ামত সংঘটিত হইবে। আর রাসূলুল্লাহ (س)-এর উপর নবুওয়াতের সূচনা এবং ওহী নাযিলের চিরসমাপ্তি সমগ্র সৃষ্টিজগৎ নিশ্চিহ্ন হওয়া এবং কিয়ামত সংঘটিত হইবার পূর্বের এক মহাঘোষণার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে।" হযরত জিবরাঈল হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর নিকাট ওহী পৌছাইয়া দিতেন। তিনি অন্যদের নিকটও দৃষ্টিগোচর হইতেন।
ওহী নাযিল হওয়ার পূর্বেই আল্লাহ্ রব্বুল 'আলামীন রাসূলুল্লাহ্ (س)-কে যথাযোগ্য যোগ্যতা দান করিয়াছিলেন। এই প্রসঙ্গে "সীরাত তায়্যিবা"-তে বর্ণিত হইয়াছে যে, "মহামহিমান্বিত প্রতিপালক কর্তৃক নির্বাচিত বিশেষ ব্যক্তিদের মধ্য হইতে যাহাদেরকে নবুওয়াত দিয়া সম্মানিত করা হয়, তাহাদিগকে অসংখ্য বৈশিষ্ট্যসহ ওহী গ্রহণের বিশেষ যোগ্যতা দান করা হইয়া থাকে। জিব্রাঈل ('আ)-কে প্রেরণের দ্বারা আল্লাহ মুহাম্মاد (س)-এর অন্তর মুবারকে ওহী গ্রহণের নৈসর্গিক শক্তি সৃষ্টি ও তাহা স্থায়ী করিয়াছিলেন, অনুরূপভাবে তাঁহার জিহ্বাতেও এই স্বর্গীয় শক্তির সঞ্চার করিয়া দিয়াছিলেন। ফলে জিব্রাঈل ('আ)-এর সাথে ওহীর উচ্চারণ সহজ হইয়াছিল, যাহার প্রমাণ আমরা উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা)-এর হাদীছে এইভাবে পাই, ما انا بقارئي )"আমি পড়িতে পারি না")।
ওহীর সূচনাতে জিব্রাঈل ('আ) রাসূলুল্লাহ্ (س)-কে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিয়া বাহুবেষ্টনে চাপ এইজন্য দিয়াছিলেন যেন নাযিলকৃত ওহী তাঁহার অন্তরের গভীরে উৎক্ষেপিত হইয়া যায় এবং ফেরেস্তার বিশেষ নৈকট্য লাভ করিতে পারেন। ইহা দ্বারা পারস্পরিক সম্পর্ক গাঢ় ও স্থায়ী হয়। তাহা ছাড়া শিক্ষকের অধিকার রহিয়াছে শিক্ষার্থীর উপর। তিন তিনবার আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিয়া বাহুবেষ্টনে সজোরে চাপ প্রদানের এক চমৎকার ব্যাখ্যা আস্-সুহায়লী এইভাবে প্রদান করিয়াছেন যে, "তিন-তিনবার চাপ প্রয়োগে জড়াইয়া ধরা, ইহা এইদিকে ইশারা প্রদান করা হইয়াছে যে, মুহাম্মاد (س)-এর জীবনে তিন-তিনবার কঠিন থেকে কঠিনতম পরীক্ষা আসিবে এবং ইহার পরে মুক্ত জীবনের শুভ সূচনা হইবে। প্রথমটি ছিল কুরায়শ কর্তৃক প্রায় তিন বৎসরের নির্বাসিত জীবনযাপন, দ্বিতীয়টি ছিল তাঁহাকে চিরতরে দুনিয়া হইতে বিদায় দেওয়ার জন্য তাহাদের ষড়যন্ত্র এবং তৃতীয়টি ছিল তাঁহাকে প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগে বাধ্য করা। ইহার পরে মুক্ত জীবনের শুভ অধ্যায়ের সূচনা হয়।"
ওহীর সূচনা আল-কুরআনের কোন আয়াত দ্বারা হইয়াছিল, এই প্রসঙ্গে মুহাম্মাদ রিদা উল্লেখ করিয়াছেন যে, “রাসূলুল্লাহ্ (س)-এর উপর ওহীর সূচনা হইয়াছিল إقرأ باسم ربك الذي خلق )"আপনি পড়ুন মহান প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন") আয়াতের দ্বারা, যাহা উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা)-এর বিশুদ্ধ বর্ণনায় আসিয়াছে। ইমাম নববী (র) বলিয়াছেন, ইহাই বিশুদ্ধতর মত যাহাতে অধিকাংশ বিজ্ঞ 'আলেম ঐক্যমতে পৌঁছিয়াছেন। কোন কোন রিওয়ায়াতে আসিয়াছে, জিবরাঈل ('আ) অলংকার খচিত একটি রেশমী সহীফা রাসূলুল্লাহ (س)-এর হাতে দিয়াছিলেন যাহাতে সূরা 'আলাকের উক্ত আয়াতগুলি লিপিবদ্ধ ছিল। আল-বালাযুরীর বর্ণনামতে, উযু এবং সালাত-এর পদ্ধতিও জিবরাঈল (আ) মহানবী (س)-কে সেই সময়ই শিক্ষা দিয়াছিলেন।

টিকাঃ
১. মুস্লিম, ফাদাইল অধ্যায়, বাব ফাদলু নাসাবিন্ নাবিয়্যি।
২. মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, রাসূলে রহমত, শিরো, যামানায়ে কুরবে বি'ছাত।
৩. মুহাম্মদ আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী, ফায়দুল-বারী, ১খ., পৃ. ২৪।
৪. ইব্‌ন হিশাম, সীরাত, ১খ, পৃ. ২৪৩, ২৪৪।
৫. মুহাম্মাদ সায়্যিদ কালীনী, 'আয়নুল ইয়াকীন ফী সায়্যিদিল-মুরসালীন, ১১, শিরো, مبعث النبي صلى الله عليه وسلم।
৬. শিবলী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন্ নবী, ১খ, পৃ. ১২৫।
৭. মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (স), পৃ. ৫৯, শিরো. بدء الوحى।
৮. সায়্যিদ আবুল হাসান 'আলী নাদবী, নাবিয়্যে রাহমাত, ১খ, ১১৬।
৯. ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান্‌-নিহায়া, পৃ. ৬, শিরো. عمره صلى الله عليه وسلم وقت بعثته هو تأريخها।
১০. বুখারী, আওয়ালু মা বুদিআ বিহিল-ওয়াহহিয়, বাব, ৩; তু. মুসলিম, ঈমান, পৃ. ২৬৩, ২৫৪।
১১. ইবন জারীর তাবারী, তাফসীর, ৩০: ১৩৮; ইবন সা'দ, তাবাকাত, ১/১খ, ১২৯; অনুরূপ নির্দেশের জন্য দ্র. ড. 'আবদুল-ফাত্তাহ্ ইব্রাহীম, হাওলাল্ ওহী, মাজাল্লাতুল জামি'আতি'ل ইস্লামিয়্যা, মদীনা মুনাওয়ারা, সংখ্যা ৪৫, ১৪০০ হি., ৪৪ পৃ., শিরো, الرؤيا الصادقة তু. উর্দু দাইরা মা'আরিف ইসলামিয়্যা, ২২খ., পৃ. ৬২১, শিরো. وحی محمدی کا آغاز و تسلسل ; ইব্‌ن হিশাম, সীরাত, ১খ., পৃ. ২৪۰, ২৪۱।
১২. মুহাম্মাদ ইদ্রীস কান্ধলভী, সীরাতুল-মুস্তাফা, ১২۸, শিরো. بدء الوحى تباشير نبوة।
১৩. বুখারী, তা'বীর অধ্যায়, বাব আর-রু'য়া আস-সালিহা; অনুরূপ নির্দেশের জন্য দ্র. ইب্‌ন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আদ, ১খ., ৩৩. শিরো. افی مبعثه صلى الله عليه وسلم।
১৪. ইবন হাজার 'আস্কালানী, ফাতহুল বারী, ১খ., ৯পৃ., اول أحوال النبيين।
১৫. মান্নাউল কাত্তান, মাবাহিছ ফী 'উলূমিল কুরআন, ৩৮, শিরো. الرؤيا الصالحة في المنام।
১৬. আল-কاسতাল্লانی, ইরশাদুস্ সারী লি-শারহি সাহীহিল-বুখারী, পৃ. ৬২।
১৭. মুহাম্মাদ আল-খিদরী, নূরুল য়াকীন ফী সীরাতি سায়্যিদিল মুরসালীন, পৃ. ৩৫, শিরো بدء الوحى।
১৮. ইব্‌ن হিশام, সীরাত, ১খ., পৃ. ২৪۰, ১নং টীকা।
১৯. ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া, পৃ. ৭ শিরা عمره صلى الله عليه وسلم وقت بعثته وتأريخها।
২০. আল-কاسতাল্লانی, ইরশাদুস্ সারী লি'শারহি সাহীহিল বুখারী, পৃ. ৬৩।
২১. মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ্, পৃ. ৫৯, শিরো. بدء الوحى।
২২. হাসানুদ্দীন আহমاد, আহসানুল বায়ান ফী উলূميل কুরআন, পৃ. ১৮।
২৩. কাযী সুলায়মান মানসূরপুরী, রাহমাতুল্লিল আলামীন, ১খ., পৃ. ৪২-৪৩।
২৪. আয-যাহাবী, আস্-সীরাতুন্-নাবাবিয়্যা, পৃ.৭।
২৫. হিফজুর রহমান সীওয়াহারবী, কাসাসুল্ কুরআন, ৪খ., ২৫৪।
২৬. ইব্‌ن কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ২৪২-২৪৩।
২৭. ইবনুল্-জাওযী, আল্-ওয়াফা বি-আহ্ওয়ালিল্-মুস্তাফা, ১খ., পৃ. ৯১।
২৮. মুহাম্মাদ ইদ্রীس কান্ধালবী, ১৯৮১ খৃ., ১খ., পৃ. ২৫৪, পাদটীকা ১।
২৯. ইব্‌ন সা'দ তাবাকাত, ১খ., ১০০; আম্-যাহাবী, আস্-সীরাতুন্-নাবাবিয়্যা, পৃ. ৭।
৩০. ইب্‌ن কাছীর, আল্-বিদায়া, ১/২খ., পৃ. ২৪২।
৩১. ড. আকরাম যিয়াউল্-উمরী, আস্-سীরাতুন্-নাবাবিয়্যা আস্-সাহীহা, ১খ., পৃ. ৯۸।
৩২. ইب্‌ن কাছীর, আল-বিদায়া, ১/২খ., পৃ. ২৪۲।
৩৩. ইب্‌ن আব্বাস (র) ও জাবির (রা)-এর রিওয়ায়াত ইب্‌ن ابূ শায়বা তাঁহার 'আল-মুসান্নাফ' গ্রন্থে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ (س) ১৮ রাবী'উল-আওয়াল সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। তবে কোন কোন ঐতিহাসিক ১৭ এবং ২২ রাবী 'উল-আওয়াল উল্লেখ করিয়াছেন (অনুরূপ বর্ণনার জন্য দ্র. ইب্‌ن কাছীর, আল-বিদায়া, পৃ. ১/২খ., ২৪۲-২৪۳)।
৩৪. মুহাম্মاد ইب্‌ن یূসুف আস্-সালিহী আশ-শামী, সুবুলুল্-হুদা ওয়ার্-রাশাদ ফী سীরাতি খায়রिल্-ইবাদ, ১খ., ৩৩৩।
৩৫. মুহাম্মاد ইদ্রীস কান্ধালাবী, সীরাতুল্-মুস্তাফা, পৃ. ৫১, পাদটীকা ৩; দা. মা. ই., ১৯ খ., পৃ. ১২।
৩৬. মুহাম্মাদ ইদ্রীس কান্ধালবী (র) উল্লেখ করিয়াছেন, "যদিও এই রিওয়ায়াতটি সনদের দিক দিয়া দুর্বল, তবুও ইহা দ্বারা অন্যান্য সকল বর্ণনার মধ্যে অসামঞ্জস্যতা দূর করা সম্ভব। কেননা কোন কোন রিওয়ায়াত দ্বারা বুঝা যায়, রাসূলুল্লাহ (س)-এর শুভ-জন্ম দিনের বেলায় হইয়াছিল। অপরাপর বর্ণনা হইতে জানা যায়, তিনি (স) রাত্রি বেলায় ভূমিষ্ঠ হন। যদি কেহ এই দাবি করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) সুবহে সাদিক-এর সময় জন্মগ্রহণ করেন তবে ইহা অত্যুক্তি হইবে না। সুতরাং যে সমস্ত রিওয়ায়াত-এ সোমবার দিন অথবা সোমবার রাত-এ ভূমিষ্ঠ হওয়ার বর্ণনা উল্লিখিত হইয়াছে, উভয় রিওয়ায়াত-ই সহীহ। আর যে সমস্ত বর্ণনায় সুব্‌হ সাদিক-এর উল্লেখ রহিয়াছে উহার মর্মার্থ ইহাও হইতে পারে যে, রাত্রেই জন্মগ্রহণের সকল লক্ষণ ও চিহ্ন প্রকাশ পাইয়াছিল (মুহাম্মاد ইদ্রীس কান্ধালবী, সীরাতুল্-মুস্তাফা, পৃ. ৫১-৫২)। ইب্‌ন হিব্বান মা'রূফ ইন হায্যাবুয সম্পর্কে বলিয়াছেন, "তিনি একজন নির্ভরযোগ্য রাবী।" এই প্রসঙ্গে ابূ হাতেম বলিয়াছেন, "ইب্‌ن হায্যাবুষ-এর হাদীছ গ্রহণ করা যায়" (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৫২)।
৩৭. ইب্‌ن کایم আল-জাওযিয়্যা, যাদুল-মা'আد, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ১৭।
৩৮. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৫৫; অনুরূপ বর্ণনার জন্য দ্র. ইবনুল জাওযী, আল-ওয়াফা বিআর্গুয়ালিল্ মুস্তাফা, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৯০।
৩৯. মুহাম্মাদ আল-খিদরী, নূরুল-য়াকীন ফী سীরাতি سায়্যিদিল মুরসালীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬।
৪০. ইব্‌ن হিশام, আস্-সীরাতুন্ নাবابিয়্যা, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ১৬۵, টীকা নং-২।
৪১. আবদুর রউف দানাপূরীর আসাহ্হুস-সিয়ার গ্রন্থে বর্ণিত (পৃ. ৬) আছে যে, তিনি বায়তুল্লাহ্র অভ্যন্তরে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু ইহা প্রমাণিত নহে।
৪২. ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ২৬۵।
৪৩. ইবনুল জাওযী, আল-ওয়াফা বিআহ্ওয়ালিল মুস্তাফা, ১খ., ৯۱।
৪৪. ইب্‌ن কাছীর, আস্-সীরাতুন্- নাবابિય্যা, ১খ., পৃ. ২০۸-۲۰۹।
৪৫. ইب্‌ن کایم আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আদ, ১খ., ۱۸, ۱۹।
৪৬. ইب্‌ن কাছীর, আস্-সীরাতুন্- নাবابિય্যা, ১খ. পৃ. ۲۱۲।
৪৭. ইب্‌ن কাছীর, আল-বিদায়া, ২খ, পৃ. ۲۴۸।
৪৮. ইব্‌ন কাছীর, আস্-সীরাতুন্-نাবابিয়্যা, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ۲۱۲-২১৩ অনুরূপ বর্ণনার জন্য দ্র. ইবন হাজার 'আস্কালানী, فাতুহুল-বারী, দারুল-ما'রিফা, বৈরূত, তা. বি., ۶خ, পৃ. ۵۸۳।
৪৯. ইবন হাজার 'আসকালানীর فাতهুল বারীতে এই প্রসঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (س)-এর জন্মগ্রহণকালীন সময়ে পারস্যের রাজপ্রাসাদে ফাটل দেখা দেয় ও উহার গম্বুজ ভূমিতে ধ্বসিয়া পড়ে, পারসিকদের মন্দিরের অগ্নি নির্বাপিত হইয়া যায় যাহা ইহার পূর্বে হাজার বৎসরে নির্বাপিত হয় নাই এবং ساওয়া নদী শুকাইয়া যায় (ইবন হাজার 'আসকালানী, فাতহুল-বারী, دارال-ما'রিফা, বৈরূত, তা.বি., ۶خ., পৃ. ۵۸۴ অনুরূপ বর্ণনার জন্য দ্র. ইবন কাছীর, আস-سীরাতুন-نাবابিয়্যা, প্রাগুক্ত, ১خ., ২১۵; ইবনুল জাওযী, আল-ওয়াফা বিআহ্ওয়ালিল্- موستাফا, ১خ, পৃ. ۹۷-۹۸)।
৫০. মুহাম্মاد ইদ্রীس কান্ধলাবী, سীরাতুল-موستافا, রব্বানী বুক ডিপো দিল্লী, ۱۹۸۱ خৃ., ۱خ, পৃ. ۵۵-۵۷; আরো বিস্তারিত বর্ণনার জন্য দ্র. ইب্‌ن سায়্যিদিন নাস, উয়ূনুল আছার, ১خ., পৃ. ۲۹; ইবন কাছীর, আস-سীরাতুন নাবابিয়্যা, প্রাগুক্ত, ১خ., পৃ. ۲۱۵-۲۱۸)।
৫১. ইবন হাজার 'আসকালানী فاتحুল বারীতে তাবারানীর উদ্ধৃতি উল্লেখপূর্বক উছমান ইবন ابیل-আস (রা)-এর রিওয়ায়াত এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন, আমার মা আমার কাছে উল্লেখ করিয়াছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (س)-এর জন্মগ্রহণকালীন মুহূর্তে سায়্যিদা আমিনা-এর কাছে উপস্থিত ছিলেন এবং ঘরের প্রতিটি জিনিসে নূর আর নূর দেখিতে পাইয়াছিলেন। আকাশের নক্ষত্রগুলির প্রতি দৃষ্টিপাত করিতেই মনে হইতেছিল, ঐগুলি যেন আমার কোলেই ঝুঁকিয়া পড়িতেছে। سায়্যিদা আমিনা তাঁহাকে প্রসব করিতেই তাঁহার উদর হইতে এমন এক নূর বা জ্যোতি বিচ্ছুরিত হইয়াছিল, যাহাতে সম্পূর্ণ ঘর আলোকিত হইয়াছিল। ফলে চতুর্দিকে আমি নূর আর নূর দেখিতে পাইলাম (ইবন হাজার আস্কালানী, فাল্গুল বারী, দারুল ما'রিফা, বৈরূত, তা. বি., ۶خ., পৃ. ۵۸۳; আস্-سوয়ূতী, খাসাইসুল-قوبرا, دارال کتبিল ইলমিয়্যা, বৈরূত, তা, বি, ۱خ, পৃ. ۴۵)।
৫২. ইব্‌ن কাছীর سীরাত গ্রন্থে আবদুর রহমান ইবন 'আওف (রা)-এর মাতা شیفا বিনت 'আমর ইবন 'আওف (রা) হইতে উল্লিখিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট এমন নূর বা জ্যোতি প্রকাশিত হয় যাহা দ্বারা রোম সাম্রাজ্যের প্রাসাদসমূহ আলোকিত হইয়াছিল (ইب্‌ন কাছীর, আস্-سীরাতুন নাবাবিয়্যা, প্রাগুক্ত, ১خ., পৃ. ۲۰۶-۷)।
৫৩. ইব্‌ن কাছীর ও ইব্‌ن হিশাম উভয়ে তাঁহাদের سীরাت গ্রন্থে মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের উদ্ধৃতিতে হাসান ইবন ছাবিত-এর রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, তিনি বলিয়াছেন, আমি সাত অথবা আট বৎসরের বালক ছিলাম, যাহা কিছুই শুনিতাম এবং দেখিতাম ভালভাবেই বুঝিতাম। একদিন সকালে একজন ইয়াহূদী পণ্ডিত খুব জোরে চিৎকার দিয়া বলিলেন, হে কুরায়ش সম্প্রদায়। ফলে সকলেই তাহার কাছে সমবেত হইয়া বলিলেন, তোমার কি হইয়াছে আর তুমি কেনই با আমাদেরকে ডাকিয়াছ? রাবী বলিয়াছেন, এই কথা আমি তাহাকে বলিতে শুনিয়াছি যে, "এইমাত্র 'আহমاد' নামীয় তারকা উদিত হইয়াছে যিনি আজ রাত্রেই জন্মগ্রহণ করিয়াছেন" (ইب্‌ن কাছীর, আস্-سীরাতুন-نাবابিয়্যা, ১خ., পৃ. ۲۱۳)। ابূ নুআয়م "داলাইلুন-نبوওওয়া”-এর উদ্ধৃতি উল্লেখপূর্বক এবং ইب্‌ن কাছীর তাঁহার سীরাت-এ 'আবদুর রহমান ইب্‌ن ابی সা'ঈদ-এর পিতা হইতে একটি রিওয়ায়াত এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলিয়াছেন, আমি ابূ মালিক ইب্‌ن সিনان-কে বলিতে শুনিয়াছি, একদিন আমি বনূ 'আবদুল আশহال-এর কাছে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য আগমন করিলাম। কেননা আমাদের মাঝে ঐ দিনগুলিতে যুদ্ধ না হওয়ার সন্ধি ছিল। সেখানে ইয়াহূদী পণ্ডিত یূশা'-কে বলিতে শুনিয়াছি যে, "ال-هارাম" (মক্কা) হইতে একজন নবীর প্রকাশ হইয়াছে।” অতঃপর আশহال গোত্রের খলীফা ইب্‌ن ছা'লাبا তাহাকে ঠাট্টার ছলে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, তাঁহার "سیفات" বা বৈশিষ্ট্যগুলি কি কি? তিনি উত্তর করিলেন, তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি খুবই খাট বা লম্বা নহেন, উভয় নয়ন কিছুটা লালবর্ণ, তিনি পাগড়ী পরিধান করিবেন, গাধায় চড়িবেন, তাঁহার তরবারি থাকিবে উন্মুক্ত এবং এই শহর (ইয়াছریb) হইবে তাঁহার হিজরতের স্থান। রাবী ابূ মালিক ইب্‌ن সিনান বলিয়াছেন, আমি ইয়াহূদী পণ্ডিতের কথায় খুবই আশ্চর্যন্বিত হইয়া আমার کaoম بনী খুদ্রا-এর নিকট হাজির হইয়া তাহাদের একজনকে বলিতে শুনিলাম, শুধু ইয়াহূদী পণ্ডিত یূশা'-ই অনুরূপ কথা বলিয়াছেন? বরং ইয়াছریbের সকল ইয়াহূদী পণ্ডিতই এই প্রসঙ্গে বলিয়াছেন (ইب্‌ن কাছীর, আস-سীরাতুন-নাবابিয়্যা, ১خ., পৃ. ۲۱۳-۱۴)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00