📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ওহী নাযিলের সূচনা ও পদ্ধতিসমূহ

📄 ওহী নাযিলের সূচনা ও পদ্ধতিসমূহ


আল-কুরআনুল কারীম, নির্ভরযোগ্য হাদীছের গ্রন্থাবলী ও ভাষ্য গ্রন্থাবলী এবং হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (স)-এর জীবনী গ্রন্থাবলীতে ওহী (ওয়াহহিয়)-এর সূচনা সম্পর্কীয় যাবতীয় বিবরণ আলোচনা-পর্যালোচনা ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে ওহীর শুভ সূচনার প্রেক্ষাপট ও পূর্বাভাষ, অনুরূপভাবে ইহার শুভ সূচনা কখন হইয়াছিল, কাহার কাছে, কত বৎসর বয়সে, কোন জায়গাতে, কোন ভাষাতে, কোন দিনে, কোন মাসে, জাগ্রত অবস্থায়, না ঘুমন্ত অবস্থাতে, কাহার মাধ্যমে, তিনি কি মানবীয় আকৃতিতে আসিয়াছিলেন, না ভিন্ন আকৃতিতে, অনুরূপভাবে ওহীর সূচনালগ্নে ফেরেস্তা ও রাসূলে কারীম (স)-এর মধ্যকার রোমাঞ্চকর অবস্থার বিবরণ, কোন আয়াতে কারীমার মাধ্যমে ওহীর শুভ সূচনা এবং সর্বোপরি রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনে ওহীর শুভ সূচনা, প্রভাবসমূহ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি নিম্নে আলোচনা করা হইল।
ওহী-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ
ওহী (وحی) শব্দের আভিধানিক অর্থ ইশারা, ইংগিত, ব্যক্ত করা, পৌঁছানো, নির্দেশ, প্রত্যাদিষ্ট বাণী, অনুক্ত বাণী (দ্র. লিসানুল আরাব, আল-মুফরাদাত ইত্যাদি)। কুরআন মজীদে উক্ত সব অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ:
وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا . "তোমার প্রতিপালক মৌমাছিকে ইঙ্গিত দিয়াছেন যে, পাহাড়ে গৃহ নির্মাণ কর" (১৬: ৬৮; আরও দ্র. ১৯: ১১)।
وَأَوْحَى فِي كُلِّ سَمَاءِ أَمْرَهَا . "এবং তিনি প্রত্যেক আকাশে উহার বিধান ব্যক্ত করিলেন" (৪১: ১২)।
إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّنَ مِنْ بَعْدِهِ. "নিশ্চয় আমি তোমার নিকট প্রত্যাদেশ পাঠাইয়াছি, যেমন নূহ ও তাহার পরবর্তী নবীগণের নিকট প্রত্যাদেশ পাঠাইয়াছি” (৪: ১৬৩)।
ثُمَّ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ أَنِ اتَّبِعْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا . "অতঃপর আমি তোমাকে নির্দেশ দিলাম যে, তুমি একনিষ্ঠ ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ কর" (১৬: ১২৩)।
أَوْ يُرْسِلَ رَسُولاً فَيُوْحِيَ بِاذْنِهِ مَا يَشَاءُ. "অথবা তিনি দূত প্রেরণ করেন যিনি তাঁহার অনুমতিক্রমে তিনি যাহা চাহেন তাহা ব্যক্ত করেন বা পৌঁছান" (৪২ঃ ৫১)।
বদরুদ্দীন 'আয়নী (র) বলেনঃ الوحى الاشارة والكتابة والرسالة والكلام الخفى وكل ما القيته الى غيرك. "ওহী অর্থ ইশারা করা, লিপিবদ্ধ করা, কোন কথাসহ প্রেরণ, গোপন কথা, অপরের অজ্ঞাতে কাহাকেও কিছু অবহিত করা" (উমদাতুল কারী শারহু সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ১৪)।
শায়খ আবদুল্লাহ্ আস-সারকাবী বলেন: وفي اصطلاح الشرع اعلام الله تعالى انبياءه الشيئ اما بكلام او برسالة ملك او منام أو الهام.
"শরীআতের পরিভাষায় ওহী বলা হয়, আল্লাহ কর্তৃক ফেরেশতা প্রেরণ করিয়া অথবা স্বপ্নযোগে অথবা ইলহামের সাহায্যে তাঁহার নবীগণকে কোন বিষয় বা কথা অবহিত করা” (ফাতহুল মুবতাদা শারহু মুখতাসার আয-যুবায়দী-এর বরাতে হাদীস সংকলনের ইতিহাস, পৃ. ৪৪)।
বস্তুত ওহীর গূঢ় রহস্য ও প্রকৃত তাৎপর্য আল্লাহ ব্যতীত কেহই জানেন না। ইসলামী পরিভাষায় ওহী শব্দটি মূলত নবী-রাসূলগণের নিকট আল্লাহ তাআলার বাণী এবং তাহা তাঁহাদের নিকট পৌঁছিবার পন্থাকে বুঝাইবার জন্য ব্যবহৃত হয়। আমরা ইন্দ্রিয় শক্তির সাহায্যে প্রথমে কোন জিনিস দেখিবার পর তৎসম্পর্কে জ্ঞাত হই। পক্ষান্তরে নবী-রাসূলগণ তাঁহাদের অন্তর্নিহিত শক্তির সাহায্যে দেখেন এবং তাঁহারা প্রথমে জ্ঞাত হন, অতঃপর দেখেন। নবীগণের নিকট প্রেরিত ওহীলব্ধ জ্ঞান প্রধানত দুই প্রকারঃ প্রথম প্রকার 'মৌল জ্ঞান' যাহা প্রত্যক্ষ ওহীর (وحى متلوء) মাধ্যমে প্রাপ্ত, যাহার নাম কিতাবুল্লাহ। যেমন আল্লাহ্ কিতাব আল-কুরআন। এই প্রকার ওহীর ভাব ও ভাষা উভয়ই আল্লাহ্। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা হুবহু আল্লাহ্ ভাষায় প্রকাশ করিয়াছেন। এইরূপ ওহী নাযিল হওয়ার সময় মহানবী (স)-এর নিকটে উপস্থিত লোকজন উপলব্ধি করিতে পারিত যে, তাঁহার উপর ওহী নাযিল হইতেছে।
দ্বিতীয় প্রকার জ্ঞান, যাহা প্রথমোক্ত জ্ঞানের ভাষ্য এবং যাহা পরোক্ষ ওহীর (وحى غير متلوء) মাধ্যমে প্রাপ্ত, ইহার নাম সুন্নাহ বা আল-হাদীছ। ইহার ভাব আল্লাহ্, কিন্তু মহানবী (স) তাহা নিজের ভাষায়, নিজের কথা, কর্ম ও সম্মতির মাধ্যমে প্রকাশ করিয়াছেন। এই প্রকারের ওহী মহানবী (স)-এর উপর প্রচ্ছন্নভাবে নাযিল হইত এবং অন্যরা তাহা টের পাইত না। এই প্রকারের ওহীর সমর্থন বা প্রমাণ কুরআন মজীদে বিদ্যমান। যেমন মহান আল্লাহ মহানবী (স) সম্পর্ক বলিয়াছেন:
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى أَنْ هُوَ إِلا وَحْيٌ يُوحَى.
"সে (মুহাম্মাদ) মনগড়া কোন কথা বলে না। ইহা তো ওহী যাহা তাহার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়" (৫৩: ৩-৪)।
وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيلِ. لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ، ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ.
"সে (নবী) যদি নিজে রচনা করিয়া কোন কথা আমার নামে চালাইয়া দিত তাহা হইলে আমি তাহার ডান হাত ধরিয়া ফেলিতাম এবং তাহার কণ্ঠনালী ছিন্ন করিয়া ফেলিতাম" (৪৪-৪৬)।
মহানবী (স) বলেন:
الَا إِنِّي أُوتِيتُ الْكِتَابَ وَمِثْلَهُ أَلَا إِنِّي أُوتِيتُ الْقُرْآنَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ.
"জানিয়া রাখ! আমাকে কিতাব দেওয়া হইয়াছে এবং উহার সহিত উহার অনুরূপ আরও একটি জিনিস দেওয়া হইয়াছে। জানিয়া রাখ! আমাকে কুরআন দেওয়া হইয়াছে এবং উহার সহিত দেওয়া হইয়াছে উহার অনুরূপ আরও একটি জিনিস” (মুসনাদ ইমাম আহমাদ, ৪খ., পৃ. ১৩০-১; সুনان আবূ দাউদ, রিয়াদ সং, কিতাবুস সুন্নাহ, বাব ফী লুযূমিস সুন্নাহ, নং ৪৬০৪)। উপরিউক্ত হাদীছ দ্বারা দ্বিতীয় প্রকারের ওহী (পরোক্ষ ওহী) প্রমাণিত হয়।
ঊর্ধ্ব জগত হইতে এবং আসমানী মূল উৎস (উম্মুল কিতাব) হইতে নবী-রাসূলগণের নিকট ওহীর বিষয়বস্তুর প্রেরণকার্যকে তানযীল (تَنْزِيلُ) ও ইনযাল (إِنْزَالُ) বলা হয়। যেমন কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে:
تَنْزِيلُ الْكِتٰبِ لَا رَيْبَ فِيهِ مِنْ رَّبِّ الْعَالَمِينَ.
"এই কিতাব জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হইতে অবতীর্ণ, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই” (৩২: ২)।
وَأَنْزَلَ التَّوْرَةَ وَالْإِنْجِيلَ مِنْ قَبْلُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَأَنْزَلَ الْفُرْقَانَ.
"এবং ইতিপূর্বে তিনি নাযিল করিয়াছিলেন তাওরাত ও ইনজীল মানবজাতিকে সৎপথ প্রদর্শনের জন্য। আর তিনি ফুরকান (কুরআন) নাযিল করিয়াছেন" (৩ঃ৪)।
অবশ্য ওহী শব্দটিও ক্রিয়াপদ হিসেবে ব্যবহৃত হইয়াছে এবং ইহার দ্বারাও ওহীর বিষয়বস্তুর প্রেরণকার্য বুঝানো হইয়াছে। যেমন,
وَأَوْحَيْنَا إِلى مُوسَى اذ اسْتَسْقُهُ قَوْمُهُ أَنِ اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْحَجَرَ.
"মূসার সম্প্রদায় যখন তাহার নিকট পানি প্রার্থনা করিল তখন আমি তাহার প্রতি প্রত্যাদেশ করিলাম, তোমার লাঠির দ্বারা পাথরে আঘাত কর" (৭: ১৬০)।
"ইহা তো ওহী, যাহা তাহার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়” (৫৩:৪)। وَانِ اهْتَدَيْتُ فَبِمَا يُوحَى إِلَى رَبِّي
"এবং আমি যদি সৎপথে থাকি তবে তাহা এইজন্য যে, আমার প্রতিপালক আমার নিকট ওহী প্রেরণ করেন" (৩৪:৫০)।
অবশ্য কুরআন মজীদে ওহীর প্রধান উদ্দিষ্ট ব্যক্তি হইতেছেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)।
হাদীছের আর এক প্রকার রহিয়াছে, যাহাকে 'হাদীছে কুদ্‌স্সী' বলা হয়। 'কুদ্‌স্সী' কুদুস হইতে গঠিত। ইহার অর্থ-পবিত্রতা, মহানত্ব। আল্লাহর আর এক নাম 'কুদ্দুস' মহান, পবিত্র। এই ধরনের হাদীছকে 'হাদীছে কুদ্‌স্সী' বলা হয় এজন্য যে, উহার মূল কথা সরাসরিভাবে আল্লাহ্র নিকট হইতে প্রাপ্ত। আল্লাহ তাআলা তাঁহার নবীকে 'ইলহাম' কিংবা স্বপ্নযোগে যাহা জানাইয়া দিয়াছেন, নবী (স) নিজ ভাষায় সেই কথাটি বর্ণনা করিয়াছেন। উহা কুরআন হইতে পৃথক জিনিস। কেননা কুরআনের কথা ও ভাষা উভয়ই আল্লাহ্র নিকট হইতে ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ।
প্রখ্যাত হাদীছ ব্যাখ্যাতা আল্লামা মুল্লা আলী আল-কারী (র) 'হাদীছে কুদ্‌সী'র সংজ্ঞা দান প্রসংগে বলিয়াছেন, "হাদীছে কুদ্‌স্সী সেসব হাদীছ, যাহা শ্রেষ্ঠ বর্ণনাকারী পূর্ণ চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল পরম নির্ভরযোগ্য হযরত মুহাম্মাদ (স) আল্লাহ্র নিকট হইতে বর্ণনা করেন, কখনও জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে জানিয়া, কখনও সরাসরি ওহী কিংবা ইলহাম বা স্বপ্নযোগে লাভ করিয়া। যে কোন প্রকারের ভাষার সাহায্যে ইহা প্রকাশ করার দায়িত্ব রাসূলের উপর অর্পিত হইয়া থাকে” (শায়খ মুহাম্মাদ আল-মাদানী, ইতহাফুস সুন্নিয়া ফিল আহাদীছিল কুদসিয়্যা, পৃ. ১৮৭)।
আল্লামা আবুল বাকা তাঁহার 'কুল্লিয়াত' গ্রন্থে লিখিয়াছেন, "কুরআনের শব্দ, ভাষা, অর্থ, ভাব ও কথা সবই আল্লাহ্র নিকট হইতে সুস্পষ্ট ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ। আর হাদীছে কুদ্‌স্সীর শব্দ ও ভাষা রসূলের কিন্তু উহার অর্থ, ভাব ও কথা আল্লাহ্র নিকট হইতে ইলহাম কিংবা স্বপ্নযোগে প্রাপ্ত” (আল-হাদীছ ওয়াল-মুহাদ্দিছুন, পৃ. ১৮)।
আল্লামা তায়্যিবীও এই কথা সমর্থন করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, "কুরআনের শব্দ ও ভাষা লইয়া জিবরাঈল (আ) রাসূলে করীম (স)-এর নিকট নাযিল হইয়াছেন। আর হাদীছে কুদ্‌স্সীর মূল কথা ইল্হাম বা স্বপ্নযোগে আল্লাহ্ তাআলা জানাইয়া দিয়াছেন এবং নবী করীম (স) তাঁহার নিজের ভাষায় উম্মতকে তাহা জানাইয়া দিয়াছেন (এইজন্য হাদীছে কুদ্‌স্সী আল্লাহ্র কথারূপে পরিচিত হইয়াছে), কিন্তু এতদ্ব্যতীত অন্যান্য হাদীছকে আল্লাহ্ কথা বলিয়া প্রচার করেন নাই এবং তাঁহার নামেও সে সবের বর্ণনা করেন নাই (আল-হাদীছ ওয়াল-মুহাদ্দিছুন, পৃ. ১৭; কুল্লিয়াত আবুল বাকা, পৃ. ২৮৮)।

আল-কুরআনুল কারীম, নির্ভরযোগ্য হাদীছের গ্রন্থাবলী ও ভাষ্য গ্রন্থাবলী এবং হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (স)-এর জীবনী গ্রন্থাবলীতে ওহী (ওয়াহহিয়)-এর সূচনা সম্পর্কীয় যাবতীয় বিবরণ আলোচনা-পর্যালোচনা ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে ওহীর শুভ সূচনার প্রেক্ষাপট ও পূর্বাভাষ, অনুরূপভাবে ইহার শুভ সূচনা কখন হইয়াছিল, কাহার কাছে, কত বৎসর বয়সে, কোন জায়গাতে, কোন ভাষাতে, কোন দিনে, কোন মাসে, জাগ্রত অবস্থায়, না ঘুমন্ত অবস্থাতে, কাহার মাধ্যমে, তিনি কি মানবীয় আকৃতিতে আসিয়াছিলেন, না ভিন্ন আকৃতিতে, অনুরূপভাবে ওহীর সূচনালগ্নে ফেরেস্তা ও রাসূলে কারীম (স)-এর মধ্যকার রোমাঞ্চকর অবস্থার বিবরণ, কোন আয়াতে কারীমার মাধ্যমে ওহীর শুভ সূচনা এবং সর্বোপরি রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনে ওহীর শুভ সূচনা, প্রভাবসমূহ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি নিম্নে আলোচনা করা হইল।
ওহী-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ ওহী (وحی) শব্দের আভিধানিক অর্থ ইশারা, ইংগিত, ব্যক্ত করা, পৌঁছানো, নির্দেশ, প্রত্যাদিষ্ট বাণী, অনুক্ত বাণী (দ্র. লিসানুল আরাব, আল-মুফরাদাত ইত্যাদি)। কুরআন মজীদে উক্ত সব অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ:
وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا . "তোমার প্রতিপালক মৌমাছিকে ইঙ্গিত দিয়াছেন যে, পাহাড়ে গৃহ নির্মাণ কর" (১৬: ৬৮; আরও দ্র. ১৯: ১১)।
وَأَوْحَى فِي كُلِّ سَمَاءِ أَمْرَهَا . "এবং তিনি প্রত্যেক আকাশে উহার বিধান ব্যক্ত করিলেন" (৪১: ১২)।
إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّنَ مِنْ بَعْدِهِ. "নিশ্চয় আমি তোমার নিকট প্রত্যাদেশ পাঠাইয়াছি, যেমন নূহ ও তাহার পরবর্তী নবীগণের নিকট প্রত্যাদেশ পাঠাইয়াছি” (৪: ১৬৩)।
ثُمَّ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ أَنِ اتَّبِعْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا . "অতঃপর আমি তোমাকে নির্দেশ দিলাম যে, তুমি একনিষ্ঠ ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ কর" (১৬: ১২৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরআন ও হাদীছে কুদসীর পার্থক্য

📄 কুরআন ও হাদীছে কুদসীর পার্থক্য


কুরআন ও হাদীছে কুদসীর পার্থক্য
(ক) কুরআন মজীদ জিবরাঈলের মাধ্যম ছাড়া নাযিল হয় নাই, উহার শব্দ ও ভাষা নিশ্চিতরূপে 'লাওহে মাহফুয' হইতে অবতীর্ণ। উহার বর্ণনা-পরম্পরা মুতাওয়াতির (অবিচ্ছিন্ন) নিশ্চিত ও নিঃসন্দেহ প্রত্যক পর্যায়ে ও প্রর্তেক যুগে। কিন্তু হাদীছে কুদসী তদ্রূপ নহে।
(খ) নামাযে কেবল কুরআন মজীদই পাঠ করা হয়, কুরআন ছাড়া নামায সহীহ হয় না, এই কুরআনের পরিবর্তে হাদীছে কুদ্‌স্সী পড়িলে নামায হয় না।
(গ) 'হাদীছে কুদ্‌স্সী' অপবিত্র ব্যক্তি, হায়েয-নিফাস সম্পন্ন নারীও স্পর্শ করিতে পারে, কিন্তু কুরআন স্পর্শ করা ইহাদের জন্য হারাম।
(ঘ) হাদীছে কুদ্‌স্সী কুরআনের ন্যায় 'মু'জিযা' নহে।
(ঙ) 'হাদীছে কুদ্‌সী' অমান্য করিলে লোক কাফির হইয়া যায় না, যেমন কাফির হইয়া যায় কুরআন অমান্য করিলে (ইতহাফুস সুন্নিয়্যা, পৃ. ১৮৭)।
শায়খ মুহাম্মাদ আলী আল-ফারূকী হাদীছকে দুই ভাগে ভাগ করিয়াছেন। এক: হাদীছে নববী-রসূলে করীমের হাদীছ; এবং দুই, হাদীছে ইলাহী-আল্লাহ্র হাদীছ। আর ইহাকেই বলা হয়, 'হাদীছে কুদ্‌স্সী'। তিনি লিখিয়াছেন, হাদীছে কুদ্‌সী তাহা, যাহা নবী করীম (স) তাঁহার মহামহিম প্রভুর তরফ হইতে বর্ণনা করেন, আর যাহা সেরূপ করেন না, তাহা হাদীছে নববী (আল-ইতহাফুস সুন্নিয়্যা, পৃ. ১৮৮)।
'হাদীছে কুদ্‌সী' কুরআন নয়; কিন্তু তাহা সত্ত্বেও উহাতে আল্লাহ্ কুদসী জগতের মনোমুগ্ধকর ঘ্রাণ মিশ্রিত রহিয়াছে। উহাও গায়বী জগত হইতে আগত এক নূর। মহান প্রতাপসম্পন্ন আল্লাহ্র দাপটপূর্ণ ভাবধারা উহাতেও পাওয়া যায়। ইহাই 'হাদীছে কুদ্‌স্সী'। ইহাকে 'ইলাহী' বা 'রব্বানী'ও বলা হয় (ডঃ সুবহী আস-সালেহ, উলূমুল হাদীছ ওয়া মুস্তালাহুহ্, পৃ. ১১)।
প্রচীন কালের হাদীছ গ্রন্থাবলীতে হাদীছে কুদ্‌س্সীর বর্ণনা দেয়া হয় এই ভাষায়: নবী করীম (স) আল্লাহ্র তরফ হইতে বর্ণনা করিতে গিয়া বলিয়াছেন, আর পরবর্তী কালের মুহাদ্দিছগণ ইহা উদ্ধৃত করিয়াছেন এই ভাষায়: 'আল্লাহ বলিয়াছেন-যাহা নবী করীম (স) তাঁহার নিকট হইতে বর্ণনা করিয়াছেন..। বলা বাহুল্য, এই উভয় ধরনের কথার মূল বর্ণনাকারী একই এবং তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স) (উলূমুল হাদীছ, পৃ. ১২)।

টিকাঃ
১. গ্রন্থপঞ্জী: বরাত নিবন্ধগর্ভে উক্ত হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ওহীর শুভ সূচনার প্রেক্ষাপট ও পূর্বাভাস

📄 ওহীর শুভ সূচনার প্রেক্ষাপট ও পূর্বাভাস


আস্-সুহায়লী আর-রাওদুল উনুফ, (১খ., পৃ. ২৬৬, ২৬৭)-এ উল্লেখ করিয়াছেন যে, ইব্‌ ইসহাক বলিয়াছেন, 'আবদুল মালিক ইবন 'উবায়দুল্লাহ কিছু বিজ্ঞজনের সনদে আমাদের জানাইয়াছেন যে, যখন আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-কে সম্মানিত করিবার ইচ্ছা করিয়াছিলেন নবুওয়াত প্রদানের মাধ্যমে, তখন তিনি নিজের কোন প্রয়োজনে ঘর হইতে বাহির হইলে দূর লোকালয়ে, মক্কার উপকণ্ঠে জনমানবহীন পাহাড়ী উপত্যকায় ও বিস্তীর্ণ সমভূমির দিকে চলিয়া যাইতেন। এই সময়ে তিনি যে গাছ ও পাথরকেই অতিক্রম করিতেন, সেটাই তাঁহাকে বলিত, السَّلَامُ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللهِ "হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হউক।” কোথা হইতে এই আওয়াজ আসিত ইহা দেখিবার জন্য রাসূলে কারীম (স) আশেপাশে, ডানে-বামে, সামনে-পিছনে তাকাইতেন, কিন্তু গাছ ও পাথর ছাড়া আর কিছুই দেখিতে পাইতেন না (আস্-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ২৬৬-২৬৭)।
সহীহ মুসলিম শরীফের "ফাদাইল" অধ্যায়ে নবুওয়াতের পূর্বে যে পাথরটি রাসূলুল্লাহ (স)-কে সালাম দিত উহার বিবরণ এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: আমি মক্কা শরীফের ঐ পাথরটিকে এখনও চিনি যাহা নবুওয়াতের পূর্ব হইতে আমাকে সালাম করিত (মুস্লিম, ফাদাইল অধ্যায়, বাব ফাদলু নাসাবিন্ নাবিয়্যি)। "রাসূলে রহমত" নামক সীরাত গ্রন্থে কাযী সুলায়মান মানসূরপুরীর উদ্ধৃতি উল্লেখপূর্বক বলা হইয়াছে যে, ওহী নাযিলের সাত বৎসর পূর্ব হইতে রাসূলে কারীম (স) একটি আলোকরশ্মি দেখিতেন। ইহা দর্শনমাত্রই তাঁহার চেহারা মুবারকে অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল ভাব পরিলক্ষিত হইত। অবশ্য এই বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মির ফলে কোন শব্দ বা আওয়াজ শোনা যাইত না (মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, রাসূলে রহমত, শিরো, যামানায়ে কুরবে বি'ছাত)। মাঝেমাঝে আওয়াজ শ্রবণ, আলোর জ্যোতি অবলোকন, গাছ-পাথরের পক্ষ হইতে সালাম প্রদান ইত্যাদি বিষয় ফায়দুল-বারীতেও উল্লেখ করা হইয়াছে (মুহাম্মদ আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী, ফায়দুল-বারী, ১খ., পৃ. ২৪)।
ওহী নাযিলের পূর্বে তিনি নির্ধারিত মাসব্যাপী হেরা গুহাতে গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকিতেন এবং আগন্তুক গরীবদেরকে খানা খাওয়াইতেন। এই প্রসঙ্গে ইব্‌ن হিশাম সীরাত-এ উল্লেখ করিয়াছেন যে, "প্রতি বৎসর নির্ধারিত মাসব্যাপী রাসূলে কারীম (স) নির্জনে গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকিতেন এবং আগন্তুক গরীবদিগকে খানা খাওয়াইতেন। কায়মনোবাক্যে গভীর ধ্যানশেষে বাড়ীতে যাইবার পূর্বে সাতবার বা আল্লাহ্ যতবার চাহিতেন পবিত্র কা'বা শরীফ তাওয়াফ করিয়া বাড়িতে যাইতেন” (ইব্‌ن হিশাম, সীরাত, ১খ, পৃ. ২৪৩, ২৪৪)। ওহী নাযিলের পূর্বে প্রতি বৎসর একমাস নির্জনবাস করিতেন। এই প্রসঙ্গে প্রায় অনুরূপ আয়নুল য়াকীন ফী সায়্যিদিল মুরসালীন” গ্রন্থে উল্লেখ করা হইয়াছে (মুহাম্মাদ সায়্যিদ কালীনী, 'আয়নুল ইয়াকীন ফী সায়্যিদিল-মুরসালীন, ১১, শিরো, مبعث النبي صلى الله عليه وسلم)। কেহ কেহ বলিয়াছেন, হেরা গুহাতে এই 'ইবাদতের সময়সীমা ছিল ছয় মাস। এই প্রসঙ্গে যাদুল মা'আদ এবং মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (স) নামক গ্রন্থদ্বয়ে উল্লেখ করা হইয়াছে (ইব্‌ন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আদ, ১খ, শিরো, في مبعثه صلى الله عليه وسلم .. মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (স), শিরো. بدء الوحى)।
হেরা গুহাতে 'ইবাদত ছিল দীনে ইব্রাহীম-এর অনুসরণে। এই প্রসঙ্গে শিবলী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী 'সীরাতুন্ নবী' গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন যে, “এই 'ইবাদাত ছিল তাঁহার পূর্বপুরুষ ইব্রাহীম (আ)-এর ইবাদতের মত, যাহা তিনি নবুওয়াত লাভের পূর্বে করিতেন। তারকার ঝলকানী, চাঁদের কিরণ, সূর্যের আলো দেখিয়া' তিনি বিস্ময়ে অভিভূত হইতেন। ক্রমশ অস্তমিত হওয়া এবং ইহাদের অসারতা বুঝিতে পারিয়া তিনি দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করিলেন, "আমি অস্তগামীদের ভালবাসিনা" (দ্র. ৬ঃ ৭৬)। পরক্ষণেই বলিলেন:
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ.
"আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁহার দিকে আমার মুখ ফিরাইতেছি যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নহি” (৬:৭৯) (শিল্পী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন্ নবী, ১খ, পৃ. ১২৫)।
মুহাম্মাদ রিদা তাঁহার সীরাত গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর তখনকার ইবাদত ছিল ইব্রাহীম (আ)-এর দীনের অনুসরণে ও অনুকরণে। কেহ কেহ বলিয়াছেন, যে সমস্ত বিষয়ে এবং যেইভাবে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে ইল্হাম হইত, তিনি সেইভাবে ইবাদত করিতেন (মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (স), পৃ. ৫৯, শিরো. بدء الوحى)। রাসূল আকরাম (স) হেরা গুহাতে তাহমীদ, তাব্দীস, যিক্র ইলাহী ও কুদরতে ইলাহী সম্পর্কে চিন্তা-ফিকির করিতেন (রাসূলে রহমত, মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, পৃ. ৭২, দ্র. بعثت والنبوة)। প্রায় এইরূপ বর্ণনা সায়্যিদ আবুল হাসান 'আলী নাদবী সংকলন করিয়াছেন (সায়্যিদ আবুল হাসান 'আলী নাদবী, নাবিয়্যি রাহমাত, ১খ, ১১৬)।
ইব্‌ন কাছীর এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করিয়াছেন যে, কেহ কেহ বলিয়াছেন, নূহ (আ)-এর শরীআত অনুসারে আবার কেহ বলিয়াছেন, মূসা (আ)-এর শরীআত অনুসারে। ইহা ছাড়াও ঈসা (আ)-এর আনীত শরীআত অনুসারে বর্ণিত হইয়াছে। তবে বলিষ্ঠ মত হইল, শরীআতে ইব্রাহীম (আ)-এর অনুসরণে অনুকরণে 'ইবাদত করিতেন (ইব্‌ن কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান্‌-নিহায়া, পৃ. ৬, শিরো. (عمره صلى الله عليه وسلم وقت بعثته هو تأريخها)।
নির্ভরযোগ্য হাদীছে ওহী-র শুভ সূচনার পূর্বাভাস সম্পর্কীয় বিবরণ
রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি কিসের মাধ্যমে ওহী আসিবার পূর্বাভাষ সূচিত হইয়াছিল, কিভাবে উহা বাস্তবে প্রতিফলিত হইত, কোন জিনিসের প্রতি তাঁহার অনাবিল আগ্রহ সৃষ্টি হইয়াছিল, সমাগত চিরসত্য প্রাপ্তির সূচনার বিবরণাদিসহ উহার বিরতিকাল এবং এই সময়ে তাঁহার আত্মিক অস্থিরতা, ব্যাকুলতা ইত্যাদি সম্পর্কীয় নির্ভরযোগ্য বিবরণ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা) হইতে একটি হাদীছ এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে:
عن عائشة أم المؤمنين رضى الله تعالى عنها انها قالت أول ما بدئ به رسول الله صلى الله عليه وسلم من الوحى الرؤيا الصالحة في النوم فكان لا يرى رؤيا الا جاءت مثل فلق الصبح ثم حبب اليه الخلاء وكان يخلو بغار حراء فيتحنث فيه وهو التعبد الليالي ذوات العدد قبل ان ينزع الى اهله ويتزود له ثم يرجع الى خديجة فيتزود لمثلها حتى جاءه الحق وهو في غار حراء فجاءه الملك فقال اقرأ فقلت ما انا بقارئ قال فاخذني فغطني حتى بلغ منى الجهد ثم أرسلنى فقال إقرأ فقلت ما انا بقارئ فاخذني فغطني الثانية حتى بلغ مني الجهد ثم أرسلنى فقال إِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الإِنْسَانَ مِنْ عَلَى اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ . فرجع بها رسول الله صلى الله عليه وسلم يرجف فؤاده فدخل على خديجة بنت خويلد فقال زملونی زملونی فزملوه حتى ذهب عنه الروع فقال لخديجة وأخبرها الخبر لقد خشيت على نفسى فقالت خديجة كلا والله ما يخزيك الله ابدا انك لتصل الرحم وتحمل الكل وتكسب المعدوم وتقرى الضيف وتعين على نوائب الحق. فانطلقت به خديجة حتى اتت به ورقة ابن نوفل بن اسد بن عبد العزى ابن عم خديجة وكان أمراً تنصر في الجاهلية وكان يكتب الكتاب العبراني فيكتب من الإنجيل بالعبرانية ما شاء الله ان يكتب وكان شيخا كبيرا قد عمى فقالت له خديجة يا ابن عم اسمع من ابن أخيك فقال له ورقة يا ابن اخي ماذا ترى فأخبره رسول الله صلى الله عليه وسلم خبر ما رأى فقال له ورقة هذا الناموس الذي نزل الله على موسى يا ليتني فيها جزعا يا ليتني أكون حيا اذ يخرجك قومك فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم أو مخرجى هم قال نعم لم يأت رجل قط بمثل ما جئت به الا عودى وان یدرکنی يومك أنصرك نصرا مؤزرا ثم لم ينشب ورقة ان يوفى وفتر الوحي .
"উম্মুল মুমিনীন 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি প্রথম ওহীর সূচনা হইয়াছিল সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দর্শন করিতেন উহা ভোরের আলোকরশ্মির ন্যায় সত্যরূপে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিত। অতঃপর নির্জন জীবন যাপনের প্রতি তাঁহার আগ্রহ সৃষ্টি হইল। তিনি নির্জনে হেরা গুহাতে 'ইবাদত করিতেন, দিবা-রাত্র 'ইবাদতে মগ্ন থাকিতেন, খাদ্য-সামগ্রী ফুরাইয়া গেলে খাদীজা (রা)-এর নিকট ফিরিয়া আসিয়া পুনখাদ্যসামগ্রী লইয়া আবার গুহাতে ফিরিয়া যাইতেন, অবশেষে একদিন সত্য সমাগত হইল।
রাসূলুল্লাহ (স) তখন 'হেরা' গুহাতে ছিলেন। ইতিমধ্যে জিব্রাঈল 'আলায়হি ওয়াসাল্লাম আগমন করিয়া বলিলেন, "পড়ুন"। আমি বলিলাম, "আমি পড়িতে পারি না।" রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, জিব্রাঈল (আ) আমাকে কাছে টানিয়া লইলেন এবং এত জোরে আলিঙ্গন করিলেন যে, আমি ক্লান্ত হইয়া পড়িলাম। তারপর আলিঙ্গনমুক্ত করিয়া বলিলেন, 'পড়ুন'। উত্তরে বলিলাম, 'আমি পড়িতে পারি না'। পুনরায় দ্বিতীয়বার তিনি আমাকে কাছে টানিয়া খুব জোরে চাপিয়া ধরিলেন। ফলে পুনঃ ক্লান্ত ও শ্রান্ত হইয়া পড়িলাম। অতঃপর আমাকে ছাড়িয়া দিয়া বলিলেন, পড়ুন। আমি বলিলাম, আমি পড়িতে পারি না। রাসূলে কারীম (স) বলিলেন, জিবরাঈল ফেরেস্তা আমাকে তৃতীয়বার কাছে টানিয়া দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিলেন। ফলে আমি পূর্ণমাত্রায় ক্লান্ত-শ্রান্ত হইয়া পড়িলাম। তারপর তিনি আমাকে আলিঙ্গনমুক্ত করিয়া বলিলেন,
إِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ، خَلَقَ الإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ . اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ .
"পড়ুন, আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন। তিনি সৃষ্টি করিয়াছেন মানবজাতিকে আঠাল রক্ত হইতে। পড়ুন, আপনার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত” (৯৬: ১-৩)।
রাসূলুল্লাহ (স) কম্পমান হৃদয়ে গৃহে ফিরিয়া আসিলেন। তিনি খাদীজা বিন্‌তে খুওয়ায়লিদ-এর গৃহে প্রবেশ করিয়া ডাকিয়া বলিলেন, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। তিনি তাঁহাকে বস্ত্রাবৃত করিলেন। অবশেষে যখন ভয়ভীতি দূর হইয়া গেল তখন তিনি খাদীজার নিকট সমস্ত ঘটনা জানাইয়া বলিলেন, আমি আমার জীবনের আশংকা করিতেছি। খাদীজা (রা) সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, "কখনও নয়, আল্লাহ্র কসম! তিনি আপনাকে কখনও অপমানিত করিবেন না। নিশ্চয় আপনি আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখেন, অপরের দুঃখ-দুর্দশাকে লাঘব করেন, অসহায়দের অভাব দূর করেন, অতিথিদের সেবা করেন, সত্য প্রতিষ্ঠাতে আপনি সাহায্য করেন। অতঃপর খাদীজা (রা) রাসূলে আকরাম (স)-কে সঙ্গে লইয়া তাঁহার চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবন নাওফাল ইব্‌ন আসাদ ইবন 'আবদুল 'উয্যা-এর কাছে গেলেন। ওয়ারাকা জাহিলী যুগে 'ঈসায়ী ধর্মের অনুসারী ছিলেন। তিনি হিব্রু ভাষাতে পুস্তকাদি লিখিতেন, এমনকি ইন্জীল-এর কিছু অংশ লিখিয়াছিলেন মহান আল্লাহ্র ইচ্ছা অনুযায়ী। বয়স ছিল অনেক বিধায় তিনি দৃষ্টিহীন হইয়া পড়িয়াছিলেন। খাদীজা (রা) তাহাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, ভাইয়া! আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রের নিকট হইতে ঘটনা শ্রবণ করুন।" ওয়ারাকা বলিলেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্র! তুমি কি দেখিয়াছ, বিবরণ দাও। আল্লাহ্র রাসূল (স) যাহা কিছু দেখিয়াছিলেন সবকিছুই তাঁহার কাছে বর্ণনা দিলেন। ওয়ারাকা সমস্ত ঘটনা শ্রবণ করিয়া বলিলেন, "উহা নামুস", ইনিই জিব্রাঈল ফেরেস্তা, যাঁহাকে আল্লাহ মূসা (আ)-এর নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। হায় আফসোস! আমি যদি বাঁচিয়া থাকিতাম, যখন নিজ বংশের লোকেরা তোমাকে বিতাড়িত করিবে। রাসূলে কারীম (স) বিস্ময়ের সহিত জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহাদের দ্বারা আমি কি বিতাড়িত হইব? উত্তরে বলিলেন, হাঁ, যাঁহারাই অনুরূপ জ্যোতি লইয়া আসিয়াছিলেন তাঁহাদের সকলকে দেশ হইতে বিতাড়িত হইতে হইয়াছিল। তোমার জীবনের ঐ দিনগুলিতে যদি আমি বাঁচিয়া থাকি, তবে আমি সর্বশক্তি দিয়া তোমাকে সাহায্য করিব।
ইহার পরে ওয়ারাকা বেশি দিন জীবিত ছিলেন না এবং কিছু দিনের জন্য ওহী প্রাপ্তির সাময়িক বিরতি ঘটে” (বুখারী, আওয়ালু মা বুদিআ বিহিল-ওয়াহহিয়, বাব, ৩; তু. মুসলিম, ঈমান, পৃ. ২৬৩, ২৫৪)।
কিসের মাধ্যমে ওহীর সূচনা হইয়াছিল এই প্রসঙ্গে উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা)-এর উল্লিখিত হাদীছ ছাড়াও অপরাপর হাদীছ, তাফসীর ও মুহাম্মাদ মুসতাফা (স)-এর জীবনী গ্রন্থসমূহে ওহীর সূচনার যেসব পুংখানুপুংখ বিশ্লেষণ লিপিবদ্ধ রহিয়াছে তন্মধ্যে নিম্নলিখিত বিবরণগুলি উল্লেখযোগ্য:
সত্য স্বপ্ন (الرؤيا الصادقة) (দর্শনের মাধ্যমে ওহীর সূচনা হইয়াছিল এবং ইহাই ছিল প্রকৃত ঘটনার পূর্বাভাষ। একইরূপ অপর হাদীছ ইবন জারীর (র) তাঁহার তাফসীরে ও ইন্ন সা'দ সংকলন করিয়াছেন (ইবন জারীর তাবারী, তাফসীর, ৩০: ১৩৮; ইবন সা'দ, তাবাকাত, ১/১খ, ১২৯; অনুরূপ নির্দেশের জন্য দ্র. ড. 'আবদুল-ফাত্তাহ্ ইব্রাহীম, হাওলাল্ ওহী, মাজাল্লাতুল জামি'আতি'ল ইস্লামিয়্যা, মদীনা মুনাওয়ারা, সংখ্যা ৪৫, ১৪০০ হি., ৪৪ পৃ., শিরো, الرؤيا الصادقة তু. উর্দু দাইরা মা'আরিফ ইসলামিয়্যা, ২২খ., পৃ. ৬২১, শিরো. ; ইন্ন হিশাম, সীরাত, ১খ., পৃ. ২৪০, ২৪১)। وحی محمدی کا آغاز و تسلسل
মুহাম্মাদ ইদ্রীস কান্ধলভী তাঁহার "সীরাতুল মুসতাফা"-তে সত্য স্বপ্ন প্রসঙ্গে এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, অদৃশ্য বিষয়াবলী উন্মোচনের ক্ষুদ্রতম মাধ্যম হইল সত্য স্বপ্ন, আর সর্বোচ্চ মাধ্যম হইল ওহী। রু'য়া সালিহা হইল নবুওয়াতের নমুনামাত্র। এই প্রসঙ্গে আবু নাঈম হাসান সনদে 'আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ-এর ছাত্র 'আলকামা ইব্‌ন কায়স হইতে একটি মুরসাল হাদীছ এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, প্রথমে নবীগণ স্বপ্ন দেখিতেন, ইহাতে তাঁহাদের অন্তর প্রশান্তিময় হইয়া যাইত এবং সার্বক্ষণিক উহার জন্য উৎকণ্ঠা বাড়িয়া গেলে ওহী নাযিল হইত। যেমন হযরত ইউসুফ ও ইব্রাহীম ('আ)-এর স্বপ্ন (মুহাম্মাদ ইদ্রীস কান্ধলভী, সীরাতুল-মুস্তাফা, ১২৮, শিরো. । (بدء الوحى تباشير نبوة
সত্য স্বপ্ন (الرؤيا الصادقة) 'নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের একভাগ' এই প্রসঙ্গে ইমাম বুখারী (র) একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করিয়াছেন: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم الرؤيا الصالحة جزأ من ستة واربعين جزأ من النبوة .
"রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, সত্য স্বপ্ন নবুওয়াতের ছেচল্লিশ অংশের একাংশ” (বুখারী, তা'বীর অধ্যায়, বাব আর-রু'য়া আস-সালিহা; অনুরূপ নির্দেশের জন্য দ্র. ইব্‌ن কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আদ, ১খ., ৩৩. শিরো. افی مبعثه صلى الله عليه وسلم
সমস্ত নবী-রাসূলদের কাছে ওহীর সূচনার পূর্বাভাস সূচিত হইয়াছিল স্বপ্নের মাধ্যমে। এই প্রসঙ্গে ইব্‌ন হাজার 'আস্কালানী (৭৭৩-৮৫২ হি.) ফাতহুল বারীতে আবূ না'ঈম-এর "আদ্-দালাইল” গ্রন্থের উদ্ধৃতি উল্লেখপূর্বক হাসান-এর সনদে 'আলকاما ইন্ন কায়স হইতে একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন:
إن أول ما يؤتى به الانبياء في المنام حتي تهدا قلوبهم ثم ينزل الوحى. ৪৫১
"ওহীর সূচনালগ্নে নবীদের কাছে যাহা কিছু আসিত উহা স্বপ্নের মাধ্যমে আসিত। ইহা এইজন্য ছিল যে, তাঁহাদের হৃদয়ভূমি ওহী গ্রহণের উপযোগী হইয়া যায়, হহার পরে জাগ্রত অবস্থায় ওহী নাযিল হইত" (ইবন হাজার 'আসকালানী, ফাতহুল বারী, ১খ., ৯পৃ., اول أحوال النبيين (। সত্য স্বপ্ন (الرؤيا الصادقة) শুধু রাসূলদের জন্য নির্দিষ্ট (খাস) নহে। এই প্রসঙ্গে মান্নাউল কাত্তান উল্লেখ করিয়াছেন, সত্য স্বপ্ন শুধু নবী-রাসূলদের সহিত সম্পৃক্ত নহে, বরং উহা মুমিনদের জন্যও প্রযোজ্য। তখন উহা ওহী হিসাবে গণ্য হইবে না। এই প্রসঙ্গে রাসূলের বাণী:
إنقطع الوحى وبقيت المبشرات رؤيا المؤمن .
“ওহী (আগমন) বন্ধ হইয়া গিয়াছে, সুসংবাদসমূহের (আগমন) এখনো অবশিষ্ট রহিয়াছে, উহা হইল মুমিনের সত্য স্বপ্ন” (মাবাহিছ ফী 'উলূমিল কুরআন, ৩৮, শিরো. الرؤيا الصالحة في المنام) (। আম্বিয়াদের সকল সত্য স্বপ্ন )الرؤيا الصالحة في المنام ওহীর হুকুম রাখে এবং ইহার অনুসরণ ওয়াজিব আল-কুরআনে ইহার বিবরণ উল্লেখ হইয়াছে, ইবরাহীম (আ) কর্তৃক স্বীয় পুত্র ইসমা'ঈল (আ)-কে যবেহ প্রসঙ্গে (মান্‌ناউল কাতান, মাবাহিছ ফী 'উলূميل কুরআন, পৃ. ৩৭, শিরো. ا الرؤيا الصالحة في المنام
ওহীর সূচনার পূর্বাভাষ হিসাবে যেমন রাসূলে কারীম (স) স্বপ্ন দেখিতেন তেমনি পরবর্তী কালেও তিনি অনুরূপ স্বপ্ন দেখিতেন। এই প্রসঙ্গে বুখারী শরীফে বর্ণিত হইয়াছে যে, উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা)-এর প্রতি যখন সন্দেহ পোষণ করা হইয়াছিল, তখন তিনি এই আশাই পোষণ করিয়াছিলেন, আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন তাঁহার নিষ্কলঙ্কতার কথা রাসূলুল্লাহ (স)-কে স্বপ্নে জানাইয়া দিবেন (বুখারী, তাফসীর অধ্যায়, সূরা আন্-নূর; বাব ৬)।
স্বপ্নের মাধ্যমে ওহী আসার নিগূঢ় রহস্য প্রসঙ্গে আল্লামা আয়নী (র) বলিয়াছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর কাছে ওহী আসিত ঘুমন্ত অবস্থায় এবং ধীরে ধীরে যেন ইহা তাঁহার কাছে সহজতর মনে হয় এবং ওহী আনয়নকারী ফেরেশতার সাথে ক্রমশ সখ্যতা বৃদ্ধি পায় ('উম্দাতুল কারী, ১খ., পৃ. ৪০)।
সত্য স্বপ্ন )الرؤيا الصادقة(-এর মাধ্যমে ওহীর সূচনা মূলত রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক আসন্ন ওহী গ্রহণের একটি পূর্ব-প্রশিক্ষণ মাত্র (অনুরূপ নির্দেশের জন্য দ্র. উর্দু দাইরা মা'আরিফ ইসলামিয়্যা, ২২খ, পৃ. ৬২১, শিরো تسلسل(। وحی محمدی کا اغاز و রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিদ্রা ও তন্দ্রা এবং স্বপ্নকে একান্তভাবে বিশ্লেষণ করিতে হইলে দুইটি বিষয়ের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি প্রদান আবশ্যক। (এক) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিজ নিদ্রা সম্পর্কীয় বর্ণনার প্রতি। এই প্রসঙ্গে তিনি বলিয়াছেন, আমার চক্ষুদ্বয় ঘুমাইয়া থাকে কিন্তু আমার অন্তর সর্বদাই জাগ্রত থাকে। অর্থাৎ চক্ষুদ্বয় বন্ধ হওয়া সত্ত্বেও তাঁহার অন্তর সর্বদা জাগ্রত থাকে। (দুই) রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্বপ্ন দর্শন তাঁহার গভীর নিদ্রাতে সংঘটিত হইত না, বরং ইহা এমন একটি অবস্থাতে সংঘটিত হইত যাহাকে পুরা নিদ্রাও বলা চলে না বা পূর্ণ সজাগ এমনটিও নহে, এই দুইয়ের মাঝামাঝি এক অবস্থা (উর্দু দাইরা মা'আরিফ ইসলামিয়্যা, ২২খ, পৃ. ৬২১, শিরো. وحی محمدی کا آغاز وتسلسل(। ওহীর সূচনার পূর্বাভাষ সম্পর্কীয় আলোচনায় সুস্পষ্ট যে, "সত্য স্বপ্ন দর্শন" (الرؤيا لصالحة في المنام)-এর মাধ্যমে ওহীর সূচনার পূর্বাভাষ হইয়াছিল।
যে সমস্ত স্বপ্ন দর্শনের মাধ্যমে ওহীর নাযিলের পূর্বাভাষ সূচিত হইয়াছিল, কিভাবে উহার সত্যতার প্রতিফলন ঘটিত? কোন জিনিসের প্রতি এবং কেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনাবিল আগ্রহ হইয়াছিল ইত্যাদি প্রসঙ্গে যেসব বিবরণ হাদীছ, তাফসীর এবং সীরাত গ্রন্থগুলিতে বর্ণিত হইয়াছে তন্মধ্যে নিম্নলিখিত বর্ণনা প্রণিধানযোগ্য :
উম্মুল মু'মিনীন হযরত আইশা (রা)-এর হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে যে, ওহী নাযিলের পূর্বাভাষ সূচিত হইয়াছিল সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে এবং ঊষার আলোর মতই সত্য হইয়া উহার প্রতিফলন ঘটিত। অর্থাৎ এই সময়ে রাসূলে কারীম (স) যে স্বপ্নই দেখিতেন, তাহা ভোরের উদীয়মান সূর্যের ন্যায় বাস্তবে সংঘটিত হইত (বুখারী, বাদউল্ ওহী, বাব ৩; তু. মুসলিম, ঈমান, পৃ. ২৫৩, ২৫৪)। উদীয়মান সূর্যের সহিত সত্য স্বপ্নের যে সূক্ষ্ম উপমা প্রদান করা হইয়াছে, এই প্রসঙ্গে মুহাম্মাদ ইদ্রীস কান্ধলাভী তাঁহার "সীরাতুল মুস্তাফা” ১৩০ পৃ.-তে ইব্‌ন আবূ জামরাহ্ হইতে একটি রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন যে, "প্রত্যূষের ক্রমবর্ধিষ্ণু ফর্সা ও উজ্জ্বলতা যেমন উদীয়মান প্রখর সূর্যের ভূমিকাস্বরূপ, তেমনি "সত্য স্বপ্ন” নবুওয়াত ও রিসালাত-এর উদীয়মান সূর্যশিখার ভূমিকাস্বরূপ (পৃ. ১৩০, শিরো.। بدء الوحي تباشير نبوة।
* স্বপ্ন দর্শনকালীন নির্জন অবস্থানের প্রতি রাসূলের অনাবিল আগ্রহ সৃষ্টি এবং ক্রমশ নির্জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণ প্রসঙ্গে ইব্‌ন কাছীর তাঁহার তা'রীখে এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, "যখন রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার জাতিকে গাছপালা-পাথর ইত্যাদির পূজা ও সিজদা করার মত নিকৃষ্টতম ও স্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত দেখিলেন তখন উহা হইতে জাতিকে মুক্ত করিয়া সঠিক পথে পরিচালিত করিবার চিন্তায় মগ্ন হইয়া পড়েন। ফলে ক্রমশ নির্জনতা ও নিসঙ্গতা প্রিয় হইয়া উঠে। ওহীর সূচনার শুভ দিন যতই নিকটে আসিতে লাগিল ততই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্জনে অবস্থান ক্রমবর্ধিষ্ণু হারে প্রিয় হইয়া উঠিল (বিদায়া, পৃ. ৫)। তারীখে আক্কার ওয়া উলূম ইসলামী (تأريخ أفكار وعلوم اسلامی)-তে আরও স্পষ্টভাবে রাসূলের নির্জনপ্রিয়তার কারণ প্রসঙ্গে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, "নির্জনতার প্রতি রাসূলুল্লাহ (س)-এর আকর্ষিত হইবার কারণ ইহাও হইতে পারে যে, "তাহাখ্খুলে ওয়াহয়ি” অর্থাৎ ওহী গ্রহণ করিবার জন্য দরকার ছিল বিশেষ যোগ্যতা। আর এই যোগ্যতা সৃষ্টির মাধ্যম ছিল নির্জন ও নিভৃত স্থানে একাগ্রতার সহিত গভীরভাবে ইবাদতও ক্রমাগত অনুশীলন যেন ইহার গুরুভার বহনের যোগ্যতা সৃষ্টি হয়। যেমন আল্লাহ হযরত মূসা ('আ)-কে রোযা রাখার আদেশ দিয়াছিলেন (ইস্তেখার আহমাদ বাল্‌খী, তা'রীখে আক্কার ওয়া উলূম ইস্লামী, পৃ. ৯১, শিরো.। (نزول قرآن)। "ফায়দুল বারী" গ্রন্থকার এক চমৎকার ব্যাখ্যা উল্লেখ করিয়াছেন যে, হেরা গুহাতে অবস্থানকারী সকলেই তিন ধরনের 'ইবাদতের সমন্বয় করিতে পারেন। খালওয়াত (الخلوة) বা নির্জনতায় অবস্থান, তাআব্বুদ (تعبد) বা কায়মনোবাক্যে 'ইবাদাত করা এবং রু'য়াতু বায়তিল্লাহ্ (رؤية بيت الله) বা কা'বা শরীফ বারবার দর্শনের সুযোগ লাভ। রাসূলুল্লাহ্ (س) ইহার প্রত্যেকটি 'ইবাদতের অপূর্ব সুযোগ লাভ করিয়াছিলেন (মুহাম্মাদ আওয়ার শাহ কাশমিরী, ফায়দুল বারী, পৃ. ২৩,২৪, শিরা الرؤيا الصالحة في المنام)। আল-কাস্তাল্লানী নির্জনতার প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর অবর্ণনীয় আকর্ষণের কারণ উল্লেখপূর্বক বলিয়াছেন যে, 'যেন রাসূলের অন্তর মুবারকে হিকমাত-এর ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হয়' (আল-কাস্তাল্পানী, ইরশাদুস্ সারী লি-শারহি সাহীহিল-বুখারী, পৃ. ৬২)।
ওহীর সূচনা কখন হইয়াছিল এবং কোন সময়ে, কোন দিনে, কোন মাসে, কাহার কাছে, কত বৎসর বয়সে, কোন জায়গাতে, কোন ভাষাতে, কাহার মাধ্যমে হইয়াছিল ইত্যাদি প্রসঙ্গে আল-কুরআন, আল-হাদীছ, ইহাদের ভাষ্যসমূহে এবং সীরাত গ্রন্থাবলীতে যেসব বিবরণ পাওয়া যায় উহার কিছু আলোচনা পেশ করা হইল:
যখন রাসূলুল্লাহ (স) পরিণত বয়সে পদার্পণ করিলেন তখন আল্লাহ রব্বুল 'আলামীন ওহীর সূচনার মাধ্যমে তাঁহাকে বিশ্বজগতের জন্য সুসংবাদ দানকারী এবং ভীতি প্রদর্শনকারী হিসাবে প্রেরণ করিয়াছিলেন যেন তাহাদিগকে অজ্ঞানতার আঁধার হইতে মুক্ত করিয়া হিদায়াতের পথ দেখাইতে পারেন। ওহীর এই শুভ সূচনা হইয়াছিল ৬১০ খৃ. মোতাবেক ১৭ রামাদান (মুহাম্মাদ আল-খিদরী, নূরুল য়াকীন ফী সীরাতি সায়্যিদিল মুরসালীন, পৃ. ৩৫, শিরা بدء الوحى)। তিনি চল্লিশ বৎসর বয়সে এবং সোমবারে নবুওয়াত পাইয়াছিলেন, এই প্রসঙ্গে ইব্‌ন হিশাম সীরাত-এ ইবন ইসহাক-এর বরাত দিয়া উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) চল্লিশ বৎসর বয়সেই নবুওয়াত লাভ করিয়াছিলেন। ইবন 'আব্বাস, জুবায়র ইবন মুত'ঈম, কুবাছ ইব্‌ন আশয়াম, সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব এবং মালিক ইব্‌ন আনাস (রা) প্রমুখ বর্ণনা করিয়াছেন যে, জ্ঞানী ও সীরাত লেখকদের কাছে ইহাই বিশুদ্ধ মত। আল-বাকাই (البکائی) বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) বিলাল (রা)-কে বলিয়াছেন, "সোমবারের রোযা খুবই পুণ্যময়, কেননা এই দিনই আমি জন্মগ্রহণ করিয়াছি, এই দিনই নবুওয়াত লাভ করিয়াছি এবং এই দিনই আমার মৃত্যু হইবে" (ইব্‌ن হিশাম, সীরাত, ১খ, পৃ. ২৪০, ১নং টীকা)। সোমবারে ওহীর সূচনা প্রসঙ্গে কাতাদা (র) হইতে একইরূপ একটি হাদীছ ইমাম মুসলিম (র) সংকলন করিয়াছেন (ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া, পৃ. ৭ শিরা عمره صلى الله عليه وسلم وقت بعثته وتأريخها অনুরূপ নির্দেশের জন্য দ্র. আল-কাস্তাল্লানী, ইরশাদুস্ সারী লি'শারহি সাহীহিল বুখারী, পৃ. ৬৩)। মুহাম্মাদ রিদা এই প্রসঙ্গে বলিয়াছেন, “৪১তম বৎসরে পদার্পণ করিলে হযরত জিবরাঈل (আ) নবুওয়াত-এর সুসংবাদ সম্বলিত প্রথম ওহী নিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। চান্দ্রমাসের হিসাবানুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনে প্রথম ওহীর সূচনা হইয়াছিল ৪০ বৎসর ৬ মাস ৮ দিনে অর্থাৎ ৬১০ খৃ.-এর ৬ আগস্ট (মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ্, পৃ. ৫৯, শিরো. بدء الوحى; অনুরূপ নির্দেশের জন্য দ্র. হাসানুদ্দীন আহমাদ, আহসানুল বায়ান ফী উলূমিল কুরআন, পৃ. ১৮; একইরূপ বর্ণনার জন্য দ্র. সায়্যিদ আবুল হাসান 'আলী নাদবী, নাবিয়্যে রহমত, পৃ. ১১৬)।
ভিন্নমত পোষণ করিয়া ইমাম আহমাদ (র) ওয়াসিলা ইব্‌নু’ল আসকা’-এর সনদে উল্লেখ করিয়াছেন, “ইব্রাহীম (‘আ)-এর সহীফাসমূহ রামাদান-এর প্রথম রজনীতে, তাওরাত ষষ্ঠ রামাদান অতিবাহিত হইবার পর, ইন্জীল তেরই রামাদানে এবং আল-কুরআন নাযিল হইয়াছে চব্বিশ রামাদান-এ”। এইজন্য সাহাবা ও তাবিঈনের অনেকেই চব্বিশ রামাদান-এ লায়লাতু’ল-কদ্‌র বা মহা-মহিমান্বিত রাত্র হইয়া থাকে, এইমত পোষণ করিয়া থাকেন (ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া, ২খ, পৃ. ৭, শিরো। (عمره صلى الله عليه وسلم وقت بعثته وتأريخها) সংযোজন সর্বাধিক প্রসিদ্ধ, নির্ভরযোগ্য ও যথার্থ মত অনুসারে রমযান মাসের “লায়লাতুল কদ্‌র”-এর অতীব বরকতময় মহিমান্বিত রজনীতে কুরআন মজীদ নাযিল হইয়াছে। এই সম্পর্কে কুরআন মজীদের তিন জায়গায় স্পষ্ট বক্তব্য বিদ্যমান। মহান আল্লাহ বলেন: شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَتِ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ. “রমযান মাস, ইহাতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে আল-কুরআন নাযিল হইয়াছে” (২: ১৮৫)।
উপরন্তু প্রতি রমযান মাসে প্রতি রাত্রে মহানবী (স) জিবরাঈল (আ)-কে কুরআন (যতখানি নাযিল হইয়াছে) পড়িয়া শুনাইতেন (দ্র. বুখারী, বাদউল ওয়াহ্‌য়ি, নং ৬; মুসলিম, কিতাবুল ফাদ্বাইল, বাব জাওয়াদিহী (স), নং ৬০০৯/৫০)।
কুরআন মজীদ এক বরকতময় রাত্রে নাযিল হইয়াছে। এই সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন: إِنَّا أَنْزَلْتُهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَرَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ أَمْرًا مِّنْ عِنْدِنَا . “নিশ্চয় আমি ইহা (আল-কুরআন) নাযিল করিয়াছি এক বরকতময় রাত্রে। নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। এই রাত্রে প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয় আমার আদেশক্রমে” (৪৪: ৩-৫)।
উপরিউক্ত আয়াত হইতে বুঝা যায়, যে রাত্রে এই কুরআন মজীদ নাযিলের সূচনা হয় সেই রাত্র বড়ই কল্যাণময়, প্রাচুর্যময় ও বরকতপূর্ণ এবং সেই রাত্রে আল্লাহর নির্দেশে প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থিরীকৃত হয়। এখানে সেই বরকতময় রজনী কোনটি তাহা নির্দিষ্টভাবে না বলা হইলেও অপর এক সূরায় তাহা স্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে। إِنَّا أَنْزَلْتُهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ. وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ. لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ. تَنَزُّلُ الْمَلْئِكَةُ وَالرُّوحُ فِيْهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ سَلْمٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ. “নিশ্চয় আমি ইহা (আল-কুরআন) মহিমান্বিত রজনীতে নাযিল করিয়াছি। আর মহিমান্বিত রজনী সম্পর্কে তুমি কি জান? মহিমান্বিত রজনী সহস্র মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সেই রজনীতে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিবরাঈল) অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাহাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সেই রজনী ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত” (৯৭: ১-৫)।
কুরআন মজীদে লায়লাতুল কদর (কদরের রাত্রি) ব্যতীত অন্য কোনও রাত্রির এত অধিক ফযীলাত বর্ণিত হয় নাই (কদর শব্দের অর্থ ভাগ্য ও মর্যাদা উভয়ই)। সুতরাং সূরা ৪৪: ৩-৫ আয়াতে যে "বরকতময় রজনীর" কথা বলা হইয়াছে উহাকে ৯৭: ১-৫ আয়াতে নির্দিষ্ট করিয়া বলিয়া দেওয়া হইয়াছে যে, তাহা "লায়লাতুল কদর"। কেননা এই রাত্রের (ইবাদত-বন্দেগীসহ সমস্ত সৎকর্মের) কল্যাণ ও বরকত হাজার মাসের কল্যাণ ও বরকতের চাইতেও অধিক।
কোন রাতটি লায়লাতুল কদর এই সম্পর্কে মহানবী (স) বলেন:
تَحَرُّوا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ.
"তোমরা রমযান মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিসমূহে লায়লাতুল কদর অনুসন্ধান কর” (বুখারী, সাওম, বাব তাহাররী লায়লাতিল কাদ্র, নং ২০১৭; মুসলিম, সিয়াম, বাব ফাদলি লায়লাতিল কাদ্র, নং ২৭৭৬/২১৯; মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, সাওম, বাব লায়লাতিল কাদ্র; মুসনাদে আহমাদ, ৬খ, পৃ. ৫৬, রিয়াদ সং পৃ. ১৮১৯, নং ২৪৭৯৬, আরও দ্র. ২৪৭৩৭)।
অপর হাদীছে রমযানের শেষ সাত দিনের বেজোড় রাত্রিতে 'লায়লাতুল কদর' অনুসন্ধানের কথা বলা হইয়াছে (দ্র. মুওয়াত্তা, পূর্বোক্ত বরাত; মুসলিম, সিয়াম, বাব ফাদলি লায়লাতিল কাদ্র, নং ২৭৬২/২০৬; আবূ দাউদ, সালাত, বাব সালাতিত তাতাবু, নং ১৩৮৫; মুসনাদে আহমাদ, ২খ, পৃ. ১১৩, রিয়াদ সং পৃ. ৪৫৭, নং ৫৯৩২, আরও দ্র. নং ৪৮০৮, ৫৪৩০ ও ৬৪৭৪)।
অপর মত অনুযায়ী লায়লাতুল কদর রমযান মাসের ২৭ তারিখ (অর্থাৎ ২৬ তারিখ দিবাগত রাত্র)। যেমন:
عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ أَبِي سُفْيَانَ عَنِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ قَالَ لَيْلَةُ الْقَدْرِ لَيْلَةُ سَبْعِ وَعِشْرِينَ.
"মুআবিয়া ইব্‌ন আবূ সুফ্যান (রা) হইতে বর্ণিত। মহানবী (স) লায়লাতুল কদর সম্পর্কে বলেন: লায়লাতুল কদর হইল (রমযান মাসের) ২৭ তারিখের রাত্র” (আবূ দাউদ, সালাত, নং ১৩৮৬; আরও দ্র. মুসনাদে আহমাদ, ৫খ, পৃ. ১৩০, রিয়াদ সং পৃ. ১৫৫৭, নং ২১৫০৯, আরও দ্র. নং ২১৫২৮-৩০, উবায়্যি ইব্‌ন কাব (রা) কর্তৃক বর্ণিত, আরও দ্র. মুসলিম, সিয়াম, নং ২৭৬৩/২০৭, ইবন উমার (রা) কর্তৃক বর্ণিত)।
কুরআন মজীদ নাযিলের দিনটি সোমবার। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিল:
يَا رَسُولَ اللهِ أَرَأَيْتَ صَوْمَ يَوْمِ الْاثْنَيْنِ وَيَوْمِ الخَمِيسِ قَالَ فِيْهِ وَلِدْتُ وَفِيْهِ أُنْزِلَ عَلَى القرآن.
"ইয়া রাসূলাল্লাহ! সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোযা সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? তিনি বলেন: ঐ দিন আমি জন্মগ্রহণ করিয়াছি এবং ঐ দিনে আমার উপর আল-কুরআন নাযিল হইয়াছে'
(আবূ দাউদ, সিয়াম, বাব সাওমিদ দাহরি তাতাব্বুআন, নং ২৪২৬)। উক্ত হাদীছে 'ঐ দিন' বলিতে সোমবার বুঝান হইয়াছে। কেননা সহীহ মুসলিমে স্পষ্টভাবে সোমবারের কথা উল্লেখ আছে (দ্র. সহীহ মুসলিম, সিয়াম, প্রতি মাসে তিন দিন রোযা পালন অনুচ্ছেদ, নং ২৭৪৭/১৯৭ ও ২৭৫০/১৯৮)। উপরন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর সোমবার জন্মগ্রহণের অভিমতটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।
অতএব নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, কুরআন মজীদ সর্বপ্রথম রমযান মাসের লায়লাতুল কদরে সোমবার রাত্রে নাযিল হয়। এই রাত্রিটি ২৭ রমযানও হইতে পারে অথবা রমযানের শেষ দশকের যে কোন বেজোড় রাত্রিও হইতে পারে। কতক বিশেষজ্ঞ আলেম "লায়লাতু আল-কাদ্র" বাক্যাংশ প্রসঙ্গে বলিয়াছেন, উহা সংশ্লিষ্ট সূরায় তিনবার উক্ত হইয়াছে। তিনবারে উহার হরফসংখ্যা দাঁড়ায় ২৭ (সাতাশ = ৯০৩) (তাফসীরে কবীর, ৩২ খ., পৃ. ৩০)। অতএব লায়লাতুল কদর হইল ২৭ রমযান।

টিকাঃ
১. গ্রন্থপঞ্জী: শুধু সংযোজন অংশের বরাতের জন্য (১) আল-কুরআনুল করীম, সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহের তরজমার জন্য; (২) মাওসূআতুল হাদীছিস শরীফ, আল-কুতুবুস সিত্তা (এক ভলিউমে), ৩য় সং, দারুস সালাম, রিয়াদ ১৪২১/২০০০; (৩) ইমাম আহমাদ ইব্‌ন হাম্বল, আল-মুসনাদ (৬ খণ্ড এক ভলিউমে), ১ম সং, বায়তুল আফকার আদ-দুওয়ালিয়া, রিয়াদ ১৪১৯/১৯৯৮; (৪) ইমাম মালিক (র), আল-মুওয়াত্তা (উর্দু-আরবী), দেওবন্দ; (৫) ইমাম রাযী, তাফসীরে কবীর, দারু ইয়া আত-তুরাছ আল-আরাবী, ৩য় সং, বৈরূত, ৩২ খ., পৃ. ৩০।
২. মুহাম্মাদ মূসা, কোন ভাষাতে ওহীর সূচনা হইয়াছিল, এই প্রসঙ্গে "আস্-সুয়ূতী" ইব্‌ন আবী হাতিম-এর সনদে সুফ্যান আছ-ছাওরী হইতে একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন, "আল্লাহ্ পাক রব্বুল 'আলামীন-এর পক্ষ হইতে সমস্ত ওহী 'আরবী ভাষাতেই নাযিল হইয়াছে। অতঃপর সমস্ত নবীই জাতির কাছে ইহার ভাষান্তরিত করিয়া দিয়াছেন (আস্-সুয়ূতী, আল-ইত্কান ফী 'উলূমি'ل-কুরআন, ১খ, পৃ. ১২৯)। ওহীর ভাষা ছিল 'আরবী' (দ্র. ৪৩ঃ ৩; ৪৪ঃ ৫৮)।
৩. ওহীর সূচনার স্থান প্রসঙ্গে "রাসূলে রহমত"-এ উল্লেখ করা হইয়াছে যে, হেরা গুহাতে ওহীর সূচনা হইয়াছিল, যাহার উচ্চতা ৪ গজ এবং প্রশস্ততা পৌণে দুই গজ। ইহা মক্কার তিন মাইল দূরে অবস্থিত একটি পর্বত যাহার চূড়াতে চক্রাকারে ঘুরিয়া উঠিতে হয়। বর্তমানে ইহাকে "জাবালে নূর” বলা হইয়া থাকে (তু. মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, রাসূলে রহমত, পৃ. ৭১, শিরো। بعثت ونبوة ৩ নং টীকা; হেরা পর্বত ও মক্কার দূরত্ব প্রসঙ্গে একইরূপ বর্ণনার জন্য দ্র. শিবলী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন্ নবী, ১খ, পৃ. ১২৫)। "হারাম শরীফ হইতে হেরা পর্বতের দূরত্ব আড়াই থেকে তিন মাইল। ইহার উচ্চতা প্রায় দুই হাজার ফুটের মত হইবে (আলী আসগার চৌধূরী, হযরত মুহাম্মাদ (স) গার হিরা' সে গারি ছাওর তক্, লাহোর, পৃ. ৯, ১ নং টীকা)।
৪. ওহীর সূচনা জাগ্রত অবস্থায় হইয়াছিল না ঘুমন্ত অবস্থায় এই প্রসঙ্গে দুই ধরনের রিওয়ায়াত লক্ষ্য করা যায়। ইব্‌ন হিশাম-এর "সীরাত”-এ ওহীর সূচনা ঘুমন্ত অবস্থায় হইয়াছিল, এই মর্মে একটি রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, যখন জিব্রাঈল 'আলায়হিস সালাম আমার কাছে ওহী লইয়া আসিলেন, তখন আমি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম। তিনি এক খণ্ড রেশমী বস্ত্রসহ আগমন করিলেন যাহাতে কিছু বাণী লিখিত ছিল। তারপর তিনি বলিলেন, পড়ুন। উত্তরে বলিলাম, আমি পড়িতে পারি না (তু. ইব্‌ন হিশাম, সীরাত, ১খ, পৃ. ২৪৪)।
৫. সহীহ বুখারী, মুসলিম ও অপরাপর হাদীছ গ্রন্থাবলীতে যেসমস্ত রিওয়ায়াত আসিয়াছে উহাতে সুস্পষ্ট যে, ওহীর সূচনা জাগ্রত অবস্থায় হইয়াছিল। কেননা উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা) বর্ণিত হাদীছে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে যখন হযরত জibরাঈل ('আ) সূরা ইকরা' লইয়া আসিলেন তখন তিনি জাগ্রত অবস্থায় ছিলেন। কেননা হাদীছের শুরুতে বলা হইয়াছে, "সত্য স্বপ্নের দ্বারা ওহীর নাযিলের পূর্বাভাষ সূচিত হইয়াছিল। এই সময়ে তিনি যে স্বপ্নই দেখিতেন উহা ঊষার আলোর মতই সত্য হইয়া দেখা দিত। ইহার পরে আল্লাহ তাঁহাকে নির্জনতার প্রতি আকৃষ্ট করিয়াছিলেন। অবশেষে তাঁহার কাছে যখন সত্যবাণী আসিয়া উপস্থিত হইল তখন তিনি হেরা গুহাতে জাগ্রত অবস্থায় ছিলেন (ইবন হিশাম, সীরাত, ১খ, পৃ. ২৪৪, ১ নং টীকা)। আস্-সুহায়লী 'রাওদুল উনুফ'-এ সূদীর্ঘ আলোচনা পর্যালোচনার পর যে সারমর্ম উদঘাটন করিয়াছেন, তাহা হইল, "সর্বপ্রথম নবুওয়াতের সুখবর রাত্রিবেলায় স্বপ্নযোগে আসে। অতঃপর জাগ্রত অবস্থায় কুরআন নাযিলের শুভ সূচনা হয়" (শারহুর রাওদিল-উনুফ, ১খ, ১৫২)।
৬. ওহীর সূচনার প্রাথমিক পর্যায়ের দায়িত্ব কাহার উপর ন্যস্ত হইয়াছিল, এই প্রসঙ্গীয় বিবরণ বিভিন্ন হাদীছের ভাষ্যে এবং মুহাম্মাদ মুস্তাফা (স)-এর জীবনী গ্রন্থসমূহে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে: বুখারী শরীফের প্রসিদ্ধ ভাষ্যকার আল্লামা 'আয়নী (র) মুস্লাদ আহমাদ-এর বিশুদ্ধ সনদে আশ্-শা'বী হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, "রাসূলুল্লাহ (س) চল্লিশ বৎসর বয়সে নবুওয়াত প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। নবুওয়াতের সূচনার প্রাথমিক পর্যায়ের তিন বৎসর যাবৎ হযরত ইস্রাফীল ('আ)-এর উপর দায়িত্ব প্রদান করা হইয়াছিল। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে আল-কুরআন ব্যতীত বিভিন্ন মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় বাণী শিক্ষা দিতেন। দীর্ঘ তিন বৎসর অতিবাহিত হইবার পর হযরত জিব্রাঈل (আ) নবুওয়াত পৌঁছানোর দায়িত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন ('আয়নী, 'উমদাতুল কারী, ১খ, পৃ. ৪০; অনুরূপ নির্দেশের জন্য দ্র. আস্-সুয়ূতী, ইত্কান, ১খ, পৃ. ১২৯)। প্রায় একইরূপ বর্ণনা "সীরাত মুহাম্মদিয়্যা"- সংকলন করা হইয়াছে (মুহাম্মাদ 'আবদুল জাব্বার খান, সীরাত মুহাম্মাদিয়্যা, ১খ, পৃ. ২১৪)।
৭. হযরত ইস্রাফীল ('আ)-কে প্রাথমিক পর্যায়ের দায়িত্ব প্রদানের রহস্য প্রসঙ্গে ইবন 'আসাকির বলিয়াছেন, "হযরত ইস্রাফীল (আ)-কে শিঙ্গা ফুঁকিবার দায়িত্ব প্রদান করা হইয়াছে, যাহার ফলে সমগ্র সৃষ্টিজগৎ একদিন ধ্বংস হইয়া যাইবে এবং কিয়ামত সংঘটিত হইবে। আর রাসূলুল্লাহ (س)-এর উপর নবুওয়াতের সূচনা এবং ওহী নাযিলের চিরসমাপ্তি (انقطاع الوحى) সমগ্র সৃষ্টিজগৎ নিশ্চিহ্ন হওয়া এবং কিয়ামত সংঘটিত হইবার পূর্বের এক মহাঘোষণার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে (আস্-সুয়ূতী, আল-ইত্কান, ১খ., পৃ. ১২৯)। হযরত জিবরাঈل হযরত মুহাম্মাদ (س)-এর নিকাট ওহী পৌছাইয়া দিতেন। তিনি অন্যদের নিকটও দৃষ্টিগোচর হইতেন (বুখারী, ফাদাইলুল কুরআন, বাব ১; প্রায় একইরূপ বর্ণনার জন্য দ্র. আবূ নু'আয়ম, দালাইলুন-نبووة, পৃ. ৬৯)।
৮. ওহী নাযিল হওয়ার পূর্বেই আল্লাহ্ রব্বুল 'আলামীন রাসূলুল্লাহ্ (س)-কে যথাযোগ্য যোগ্যতা দান করিয়াছিলেন। এই প্রসঙ্গে "সীরাত তায়্যিবা"-তে বর্ণিত হইয়াছে যে, "মহামহিমান্বিত প্রতিপালক কর্তৃক নির্বাচিত বিশেষ ব্যক্তিদের মধ্য হইতে যাহাদেরকে নবুওয়াত দিয়া সম্মানিত করা হয়, তাহাদিগকে অসংখ্য বৈশিষ্ট্যসহ ওহী গ্রহণের বিশেষ যোগ্যতা দান করা হইয়া থাকে। জিব্রাঈل ('আ)-কে প্রেরণের দ্বারা আল্লাহ মুহাম্মাদ (س)-এর অন্তর মুবারকে ওহী গ্রহণের নৈসর্গিক শক্তি সৃষ্টি ও তাহা স্থায়ী করিয়াছিলেন, অনুরূপভাবে তাঁহার জিহ্বাতেও এই স্বর্গীয় শক্তির সঞ্চার করিয়া দিয়াছিলেন। ফলে জিব্রাঈل ('আ)-এর সাথে ওহীর উচ্চারণ সহজ হইয়াছিল, যাহার প্রমাণ আমরা উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা)-এর হাদীছে এইভাবে পাই, ما انا بقارئي )"আমি পড়িতে পারি না") (কাযী যায়নুল 'আবিদীন, সীরাতি তায়্যিবা, পৃ. ৭৮. শিরো. كبرى ضياء كى نبوة اافتاب
৯. ওহীর সূচনাতে জিব্রাঈل ('আ) রাসূলুল্লাহ্ (س)-কে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিয়া বাহুবেষ্টনে চাপ এইজন্য দিয়াছিলেন যেন নাযিলকৃত ওহী তাঁহার অন্তরের গভীরে উৎক্ষেপিত হইয়া যায় এবং ফেরেস্তার বিশেষ নৈকট্য লাভ করিতে পারেন। ইহা দ্বারা পারস্পরিক সম্পর্ক গাঢ় ও স্থায়ী হয়। তাহা ছাড়া শিক্ষকের অধিকার রহিয়াছে শিক্ষার্থীর উপর (মুহাম্মাদ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী, ফায়দুল বারী, ১খ, পৃ. ২৪)। তিন তিনবার আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিয়া বাহুবেষ্টনে সজোরে চাপ প্রদানের এক চমৎকার ব্যাখ্যা আস্-সুহায়লী এইভাবে প্রদান করিয়াছেন যে, "তিন-তিনবার চাপ প্রয়োগে জড়াইয়া ধরা, ইহা এইদিকে ইশারা প্রদান করা হইয়াছে যে, মুহাম্মাদ (স)-এর জীবনে তিন-তিনবার কঠিন থেকে কঠিনতম পরীক্ষা আসিবে এবং ইহার পরে মুক্ত জীবনের শুভ সূচনা হইবে। প্রথমটি ছিল কুরায়শ কর্তৃক প্রায় তিন বৎসরের নির্বাসিত জীবনযাপন, দ্বিতীয়টি ছিল তাঁহাকে চিরতরে দুনিয়া হইতে বিদায় দেওয়ার জন্য তাহাদের ষড়যন্ত্র এবং তৃতীয়টি ছিল তাঁহাকে প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগে বাধ্য করা। ইহার পরে মুক্ত জীবনের শুভ অধ্যায়ের সূচনা হয় (মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মاد রাসূলুল্লাহ, পৃ. ৬০, ১০ নং টীকা)।
১০. ওহীর সূচনা আল-কুরআনের কোন আয়াত দ্বারা হইয়াছিল, এই প্রসঙ্গে মুহাম্মاد রিদা উল্লেখ করিয়াছেন যে, “রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উপর ওহীর সূচনা হইয়াছিল إقرأ باسم ربك الذي خلق )"আপনি পড়ুন মহান প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন") আয়াতের দ্বারা, যাহা উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা)-এর বিশুদ্ধ বর্ণনায় আসিয়াছে। ইমাম নববী (র) বলিয়াছেন, ইহাই বিশুদ্ধতর মত যাহাতে অধিকাংশ বিজ্ঞ 'আলেম ঐক্যমতে পৌঁছিয়াছেন (মুহাম্মاد রিদা, মুহাম্মاد রাসূলুল্লাহ, পৃ. ৬১, শিরো. بدء الوحى ; অনুরূপ নির্দেশের জন্য দ্র. ইস্তেখার আহমাদ বালখী, তা'রীখে আক্কার ওয়া 'উলূم ইসলামী, পৃ. ৯৪, শিরো. نزول قرآن (। কোন কোন রিওয়ায়াতে আসিয়াছে, জিবরাঈل ('আ) অলংকার খচিত একটি রেশমী সহীফা রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে দিয়াছিলেন যাহাতে সূরা 'আলাকের উক্ত আয়াতগুলি লিপিবদ্ধ ছিল ('আলী আসগার চৌধুরী, হাদরাত মুহাম্মাদ (س) গারে হিরা' সে গারি ছাওর তক, ২খ., পৃ. ৯)।
১১. আল-বালাযুরীর )البلاذری( বর্ণনামতে, উযু এবং সালাত-এর পদ্ধতিও জিবরাঈل (আ) মহানবী (স)-কে সেই সময়ই শিক্ষা দিয়াছিলেন (আল-বালাযুরী, আন্সাবুল আশরাফ, ১খ., পৃ. ১১১)।
১২. নাযিলকৃত সর্বপ্রথম ওহী ছিল সূরা আল-মুদ্দাছছির-এর কিছু অংশ, এই প্রসঙ্গে আল-বুরহান ফী 'উলূميل কুরআন-এর গ্রন্থকার জাবির (রা) হইতে সহীহ মুসলিম-এর একটি রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন, "আল-কুরআন-এর অংশবিশেষ সর্বপ্রথম যাহা নাযিল হইয়াছিল উহা হইল সূরাতু'ল মুদ্দাছছির (আয-যারকাশী, আল-বুরহান ফী 'উলূميل কুরআন, ১খ, পৃ. ২০৬, শিরো. نزل ما نزل .area . প্রায় একরূপ বর্ণনা হাফিজ ইবন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা "যাদুল মা'আদ"-এ সংকলন করিয়া উহাকে খণ্ডনও করিয়াছেন এবং উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) ও অধিকাংশ আলিমের অভিমত সঠিক হইবার পিছনে কয়েকটি শক্তিশালী যুক্তির অবতারণা করিয়াছেন। (১) হযরত 'আইশা (রা)-এর বর্ণিত হাদীছে রাসূলের বাণী ما أنا بقارئي )"আমি পড়িতে পারি না") ইহা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, তিনি ইহার পূর্বে কখনও পড়িতে পারিতেন না।
(২) কোন বিষয়ে ভীতি প্রদর্শন করিবার আদেশ প্রদানের পূর্বেই ঐ বিষয়ে ভালভাবে পাঠ করা অবশ্যক। যখন কোন কিছু ভালভাবে পাঠ করা হয়, তখন ঐ বিষয়ে ভীতি প্রদর্শন করা সহজ হয়। সুতরাং পাঠ করিবার আদেশ প্রথমেই করা হইয়াছে এবং ইহার পরে পঠিত বিষয়ের ভীতি প্রদর্শন (lil) করিবার আদেশ প্রদান করা হইয়াছে দ্বিতীয়বারে। (৩) হযরত জাবির (রা)-এর রিওয়ায়াত অপেক্ষা উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা)-এর রিওয়ায়াত অধিক শক্তিশালী (ইবন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৩, । في مبعثه صلى الله عليه وسلم وأول ما نزل عليه . fares
১৩. ওহীর পদ্ধতিসমূহ: ওহীর পদ্ধতি সম্পর্কে হাদীছের নির্ভরযোগ্য বিবরণ এই:
عن ام المؤمنين عائشة رضى الله عنها أن الحارث بن هشام سئل رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال يا رسول الله كيف يأتيك الوحي فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم أحيانا يأتيني مثل صلصلة الجرس وهو اشده على فيفصم عنى وقد وعيت عنه ما قال وأحينا يتمثل لى الملك رجلا فيكلمني فأعى ما يقول قالت عائشة ولقد رأيته ينزل عليه الوحي في اليوم الشديد البرد فيفصم عنه وأن جبينه ليتفصد عرقا .
"উম্মুল মুমিনীন 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। হারিছ ইবন হিশাম রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনার নিকট কিভাবে ওহী আসে?" রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "কখনও আমার নিকট ঘন্টার আওয়াজের মত ওহী আসে। এই ধরনের ওহীর অবতরণ অত্যন্ত কষ্টদায়ক" (দ্র. বুখারী, বাদউল ওয়াহয়ি, বাব ২; বাদউল খালক, বাব ৬; তু. মুসলিম, ফাদাইল পরিচ্ছেদ, হাদীছ নং ৮৭; তু. তিরমিযী, মানাকিব, পরিচ্ছেদ ৭; তু. নাসাঈ, ইফতিতাহ, পরিচ্ছেদ, হাদীছ নং ৩৭; তু. মালিক, মুওয়াত্তা, আল-উদ্‌ লিমান মাস্সাল-কুরআন পরিচ্ছেদ, হাদীছ নং ৭)।
১৪. ওহীর পদ্ধতি সম্পর্কে বুখারী, মুসলিম ও ইহাদের ভাষ্যসমূহ, অন্যান্য হাদীছ ও জীবনী গ্রন্থসমূহে যে সমস্ত বিবরণ পাওয়া যায় উহা প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট একাধিক পদ্ধতিতে ওহী নাযিল হইত। ইহার সংখ্যা প্রসঙ্গে যে সমস্ত বিবরণ পাওয়া যায় তন্মধ্যে নিম্নলিখিত বিবরণগুলি উল্লেখযোগ্য:
বারুদ্দীন আল-'আয়নী (র) আস-সুহায়লী-এর উদ্ধৃতিতে বলিয়াছেন, ওহী নাযিলের পদ্ধতি সাতটি ('উমদাতু'ل কারী, ১খ., পৃ. ৪০)। উর্দু দাইরা মা'আরিফ ইসলামিয়্যা-তে সর্বমোট আটটি পদ্ধতির উল্লেখ আছে, ২২ খ., পৃ. ৬১৫-৬১৬, শিরো। ইব্‌ন হিশাম সীরাত-এ এবং ইমাম রাগিব (র) আল-মুফ্রাদাত-এ ওহী নাযিলের ছয়টি পদ্ধতির আলোচনা করিয়াছেন (ইব্‌ن হিশাম, সীরাত, পৃ. ৫১৫, ৫১৬)।
১৫. ওহীর পদ্ধতির সংখ্যা প্রসঙ্গে আল্লাহ রব্বুল 'আলামীন আল-কুরআনুল কারীমে ৪২: ৫১ আয়াতে উল্লেখ করিয়াছেন: وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِّمَهُ اللهُ إِلَّا وَحْيَا أَوْ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوْحِيَ باذْنِهِ مَا يَشَاءُ . "মানুষের এমন মর্যাদা নাই যে, আল্লাহ তাহার সহিত কথা বলিবেন ওহীর মাধ্যম ব্যতিরেকে অথবা পর্দার অন্তরাল ব্যতিরেকে অথবা এমন দূত প্রেরণ ব্যতিরেকে, যেই দূত তাঁহার অনুমতিক্রমে তিনি যাহা চাহেন তাহাই ব্যক্ত করেন" (৪২ঃ ৫১)।
১৬. আলোচ্য আয়াতে কারীমাতে আল্লাহ্ তা'আলা নবীদের কাছে ওহী প্রেরণের তিনটি মৌলিক পদ্ধতির আলোচনা করিয়াছেন। (১) সরাসরি ওহী নাযিলের পদ্ধতি )وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِّمَهُ اللهُ إِلَّا وَحْيًا) (২) পর্দার অন্তরাল হইতে ওয়াহয়ি নাযিলের পদ্ধতি )أَو من وراء حجاب) (৩) ফেরেশতার মাধ্যমে ওহী নাযিলের পদ্ধতি )أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًاً فَيُوْحِيَ باذنه مَا يَشَاءُ)
১৭. হাওলা'ل-ওয়াহহিয় )حول الوحی( প্রবন্ধে ড. আবদুল-ফাত্তাহ ইব্রাহীম আল-কুরআনে বর্ণিত ওহী নাযিলের উপরিউক্ত তিনটি মৌলিক পদ্ধতির চমৎকার বিশ্লেষণ এইভাবে করিয়াছেন যে, উল্লিখিত তিনটি মৌলিক পদ্ধতিতে সাতটি পদ্ধতিই অন্তর্ভুক্ত রহিয়াছে। তিনি বলিয়াছেন, ওহী নাযিলের প্রথম পদ্ধতি (সরাসরি ওহী নাযিল) মূলত দুইটির সমন্বয়ে একটি পদ্ধতিঃ (ক) সত্য স্বপ্ন )الرؤيا الصادقة(, )খ) অন্তরে নিক্ষেপণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওয়াহয়ি প্রেরণ )النفث في الروع(। অনুরূপভাবে আল-কুরআনে বর্ণিত ওহী নাযিলের দ্বিতীয় পদ্ধতি (পর্দার অন্তরাল হইতে ওহী নাযিল) মূলত দুইটির সমন্বয়ে একটি পদ্ধতি: (ক) পর্দাবিহীন অবস্থাতে সরাসরি মহান আল্লাহ্র সহিত কথোপকথন )الكلام جهرة من غير حجاب(। সর্বজনস্বীকৃত মত হইল, ইহা পৃথিবীতে আদৌ সম্ভব নহে। তবে মুহাম্মাদ (س) মি'রাজের রাত্রিতে সরাসরি আল্লাহ্ সহিত এই পদ্ধতিতে কথোপকথন করিয়াছেন। (খ) পর্দার অন্তরাল হইতে কথোপকথন )الکلام من وراء حجاب(। যেমন মূসা ('আ)-এর প্রতি এই পদ্ধতিতে ওহী নাযিল হইত। ওহী নাযিলের শেষোক্ত পদ্ধতি (ফেরেপ্তার মাধ্যমে ওহী নাযিল / أو يرسل رسولا فیوحی باذنه ما يشاء(, ইহাও মূলত তিনটি পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত রহিয়াছে: (ক) মানুষের আকৃতিতে ফেরেস্তার আগমন পূর্বক ওহী নাযিল )مجئ الملك في صورة البشرية(। )খ) ফেরেস্তা তাঁহার খাঁটি অবয়ব প্রদর্শনের মাধ্যমে ওহীর অবতরণ )مجئ الملك على صورته الملائكة الحقيقة(। (গ) অদৃশ্য অবস্থায় হযরত জিবরাঈل ('আ)-এর ওহীসহ আগমন যাহা নির্ধারিত সংকেত ধ্বনির মাধ্যমে বুঝা যাইত। আল-কুরআনুল কারীমে বর্ণিত উপরোল্লিখিত মৌলিক তিনটি পদ্ধতির ব্যাখ্যামূলক আলোচনা "হাওলাল ওয়াহহিয়" প্রবন্ধে করা হইয়াছে, যাহার সংক্ষিপ্তসার উল্লেখ করা হইল (তু. ড. 'আবদুল ফাত্তাহ ইবরাহীম সাল্লামা, হাওলাল ওয়াহহিয়, মাজাল্লাতুল জামি'আতিল ইস্লামিয়্যা, মদীنا মুনাওওয়ারা, আল-'আদাদ: ৪৫, ১৪০০ হি., পৃ. ৪৩-৪৭, শিরা। )تفصيل انواع الوحى(
১৮. ওয়াহয়ি-র পদ্ধতি প্রসঙ্গে আল-কুরআনুল কারীম, নির্ভরযোগ্য হাদীছের গ্রন্থাবলী ও ইহাদের ভাষ্যসমূহ এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনী গ্রন্থকারদের পক্ষ হইতে প্রাপ্ত একাধিক নির্ভরযোগ্য যে সমস্ত পদ্ধতির বিবরণ পাওয়া যায় তন্মধ্যে নিম্নলিখিত বর্ণনা উল্লেখযোগ্য:
প্রথম পদ্ধতি: স্বপ্নযোগে, যাহার বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য বিবরণ বিশ্বস্ততম দুই হাদীছ গ্রন্থ বুখারী ও মুসলিম শরীফসহ অপরাপর হাদীছ গ্রন্থাবলীতে উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা) হইতে বর্ণনা করা হইয়াছে বিস্তারিত বিবরণের জন্য উপরের "ওহীর সূচনার পূর্বাভাষ সূচিত হইয়াছিল সত্য স্বপ্নের )الوؤيا لصادقة( মাধ্যমে দ্র.।
১৯. দ্বিতীয় পদ্ধতি "সালসালাতুল জারس" অর্থাৎ ঘণ্টার ধ্বনির ন্যায়। উম্মুল মু'মিনীন হযরত আইশা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে যে, একদা হারিছ ইবন হিশام রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা কিরয়াছিলেন, “হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনার নিকট ওহী কিভাবে আসে?" রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, "কখনও আমার কাছে ওহী ঘন্টার আওয়াজের মত আসে। এই ধরনের ওহীর অবতরণ অত্যন্ত কষ্টদায়ক" (দ্র. বুখারী, বাদউল ওয়াহয়ি, বাব ২; বাদউল খালক, বাব ৬; তু. মুসলিম, ফادাইল পরিচ্ছেদ, হাদীছ নং ৮৭; তু. তিরমিযী, মানাকিব, পরিচ্ছেদ ৭; তু. নাসাঈ, ইফতিতাহ, পরিচ্ছেদ, হাদীছ নং ৩৭; তু. মালিক, মুওয়াত্তা, আল-উদ্‌ লিমান মাস্সাল-কুরআন পরিচ্ছেদ, হাদীছ নং ৭)।
২০. এই পদ্ধতিতে ওহীর বাহক হয়রত জিবরাঈل ('আ)-এর আগমন হইত অদৃশ্য অবস্থায়, যাহা সংকেত ধ্বনির মাধ্যমে বুঝা যাইত। এই প্রসঙ্গে "হাওলা'ল-ওয়াহহিয়" প্রবন্ধে বর্ণিত হইয়াছে, "আর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জিবরাঈل ('আ) অধিকাংশ সময় এই অদৃশ্য অবস্থায় আসা-যাওয়া করিতেন। কেহ তাহাকে দেখিতে পাইত না। তিনি চোখের আড়ালেই অবস্থান করিতেন, অথচ তাহার আগমন সংকেত ধ্বনির মাধ্যমে বুঝা যাইত (ড. 'আবদুল ফাত্তাহ্ ইবরাহীম সাল্লামা, হাওলাল ওয়াহহিয়)।
২১. "ওহীর আওয়াজ ছিল ঘণ্টার আওয়াজের মত", উক্ত বিষয়টির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে মুফতী শফী (র) "তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন"-এ শায়খ মুহীউদ্‌ दीन ইবনুল 'আরাবীর উদ্ধৃতি এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন, "রাসূলুল্লাহ (স)-এর কানে এক ধরনের নৈসর্গিক আওয়াজ অনুভূত হইবার মাধ্যমে আল্লাহ্র কালাম প্রাপ্তিও ছিল ওহী নাযিলের একটি বিশেষ পদ্ধতি। বিরতিহীনভাবে যদি ঘণ্টা একটানা বাজিতে থাকে, তখন এই আওয়াজ কোন্ দিক হইতে আসিতেছে, তাহা নির্ণয় করা সাধারণ শ্রোতাদের পক্ষে সম্ভব হইয়া উঠে না। মনে হয় চারিদিক হইতে এই আওয়াজ ভাসিয়া আসিতেছে। একমাত্র যাহার উপর ওহী নাযিল হইত তিনি ব্যতীত অন্য কাহারও পক্ষে তাহা পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব নহে। তাই সাধারণ মানুষের বোধগম্য করিবার উদ্দেশ্যেই মুহাম্মাদ মুসতাফা (س) সেই পবিত্র আওয়াজকে ঘণ্টাধ্বনির সাথে তুলনা করিয়াছেন (১খ, পৃ. ৪)।
২২. "ইহা কিসের আওয়াজ ছিল?" এই প্রসঙ্গে যে সমস্ত নির্ভরযোগ্য বিবরণ পাওয়া যায়, তন্মধ্যে নিম্নলিখিত বিবরণগুলি উল্লেখযোগ্য: আল-কাসতাল্লানী "ইরশাদুস্ সারী"-তে উল্লেখ করিয়াছেন যে, কাহারও মতে, ইহা ওহী বহনকারী ফেরেস্তার পাখার আওয়াজ অথবা ইহা হইল ওহীর দায়িত্বে নিয়োজিত ফিরিপ্তার যবান নিঃসৃত ওহীর আওয়াজ (আল-কাستال্লানী, ইরশাদুস্ সারী, ১খ., পৃ. ৫৮)। উর্দু দাইরা মা'আরিف ইস্লামিয়্যাতে উল্লেখ রহিয়াছে, "ইহা স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল 'আলামীনের কুদরতী আওয়াজ। যাহারা এই মতের প্রবক্তা তাহারা আল্লাহ্ আওয়াজকে স্বীকার করেন (২২খ., পৃ. ৬১৬, শিরো, وحی کی مختلف طریقے(। "ফায়দুল বারী"-তে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, "ঘণ্টার আওয়াজ যেমন ক্রমশই বাজিতে থাকে তেমনি ওহীর আওয়াজ শুরু বা শেষ ব্যতিরেকেই চলিতে থাকিত, যাহা ছিল মানবজাতির উৎসারিত আওয়াজ হইতে সম্পূর্ণ আলাদা। এই প্রসঙ্গে শায়খুল আকবার (র)-এর গ্রহণযোগ্য মতটি এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে, মহান আল্লাহ যেমন প্রত্যেকটি আওয়াজ চতুর্দিক হইতে শুনিতে পাইয়া থাকেন তেমনি ওহীর আওয়াজ সকল দিক হইতে সমভাবে শোনা যাইত (ফায়দুল বারী, ১খ, পৃ. ১৯, শিরো. (حديث صلصلة الجرس)। সীরাত মুহাম্মাদিয়্যা"-তে সালসালাতু'ل-জারাস-এর ব্যাখ্যা এইভাবে প্রদান করা হইয়াছে, "ক্রমশ ধীর গতিতে চলমান কোন জানোয়ারের গলায় অথবা মাথায় ঘণ্টা বাঁধা থাকিলে যেমন মৃদু আওয়াজ শোনা যায়, ওহী নাযিলের সময় অনুরূপ আওয়াজ শোনা যাইত (মুহাম্মاد 'আবদুল জাব্বার খান, সীরাতি মুহাম্মাদিয়্যা, ১খ, পৃ. ২১০, শিরো। (وحي كى مراتب كا بيان।
২৩. মৌমাছির গুঞ্জনের ন্যায় চারিদিকে এক হালকা আওয়াজ শোনা যাইত। এই প্রসঙ্গে ইমাম তিরমিযী (র) একটি রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন, "যখন ওহী নাযিল হইত তখন রাসূলুল্লাহ (س)-এর পবিত্র চেহারার চতুর্দিকে মৌমাছির গুঞ্জনের গুন গুন শব্দ শোনা যাইত এবং এইরূপ অবস্থায় সূরাতুল মু'মিনূন-এর প্রথম কয়েকটি আয়াত নাযিল হইয়াছিল (তু. তিরমিযী, তাফসীর সূরাতুল মু'মিনূন, হাদীছ নং ১)। প্রায় একইরূপ বর্ণনা আহমاد ইবন হাম্বল সংকলন করিয়াছেন (আহমاد ইবন হাম্বাল, ১খ., ৩৪; অনুরূপ নির্দেশের জন্য দ্র. ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, পৃ. ২১, শিরো. (في كيفية إيتان الوحى الى رسول الله)। আহমاد ইবন হাম্বাল 'মুসনাদ'-এ এই প্রসঙ্গে একটি রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (س)-এর প্রতি যখন ওহী নাযিল হইত, তখন কাছাকাছি অবস্থানকারীরা মৌমাছির গুঞ্জনের ন্যায় আওয়াজ শুনিতে পাইতেন। একদিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে অনুরূপ আওয়াজ শুনিয়া আমরা থামিয়া গেলাম এবং ওহী নাযিল সমাপ্ত হইলে রাসূলুল্লাহ (س) কিবলামুখী হইয়া বসিয়া দোআ করিতে লাগিলেন:
اللهم زدنا ولا تنقصنا واكرمنا ولا تهنا واعطنا ولا تحرمنا واثرنا ولا تؤثر علينا وأرض عنا وأرضنا .
“হে আল্লাহ! আমাদেরকে বাড়াইয়া দাও, কম দিও না। আমাদিগকে সম্মানিত কর, অপমানিত করিও না। আমাদিগকে দান কর, বঞ্চিত-হতভাগ্য করিও না। আমাদেরকে অন্যদের উপর অগ্রাধিকার দান কর, অন্যদেরকে আমাদের উপর বিজয় দিও না এবং আমাদের সকল কাজ-কর্মে তুমি সন্তুষ্ট হইয়া যাও"।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, "এইমাত্র আমার উপর দশটি আয়াত (সূরা মু'মিনূন-এর প্রথম দশ আয়াত) নাযিল হইয়াছে। কেহ যদি এই আয়াতগুলির উপর আমল করে সে জান্নাতে প্রবেশ করিবে" (তাফসীর মা'আরিফুল কুরআন, বাংলা সংক্ষিপ্ত সং, পৃ. ৯১১, শিরো, সূরা মুমিনূন-এর বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব)। নাসাঈ শারীফে 'আবদুল্লাহ্ ইবন উমার (রা)-এর একটি রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ আছে, "আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, ওহী নাযিলের সময় আপনি কেমন আওয়াজ শুনিতে পান? তিনি বলিলেন, হাঁ, আমি ধাতব দিয়ে তৈরী বাদ্যযন্ত্রের বাজনার ন্যায় অনুরূপ হাল্কা আওয়াজ শুনিতে পাই" (নাসাঈ, ইফাতিহ বাব, হাদীছ নং ১১৩)।
২৪. রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট "সালসালাতুল-জারাস" পদ্ধতিতে ওহী আসাটা ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক এবং প্রচণ্ড শীতের মাঝেও তাঁহার ললাট ঘর্মাক্ত ও স্বেদাদ্র হইয়া উঠিত (বুখারী, বাদউল ওয়াহহিয়, বাব ২; তাফসীর, সূরা ২৪, বাব ৬; মুসলিম ফাদাইল, হাদীছ নং ৮৬; তিরমিযী, মানাকিব, বাব ৭; নাসাঈ, ইস্তিহাজাহ., বাব ৩৭; মালিক, মুওয়াত্তা, পরিচ্ছেদ আল-উদ্‌ লিমান মাস্সাল কুরআন, হাদীছ নং ৭)। তাঁহার শ্বাস-প্রশ্বাস ফুলিয়া উঠিত, দন্ত আড়ষ্ট হইয়া যাইত। এই প্রসঙ্গে "আল-ইত্কান ফী 'উলূميل কুরআন"-এ ইবন সা'দ-এর সনদে উম্মুল মু'মিনীন 'আইশা সিদ্দীকা (রা) হইতে একটি রিওয়ায়াত এইভাবে উদ্ধৃত হইয়াছে, “ওহী নাযিলের সময় রাসূলে কারীম (س) স্বীয় মস্তক ঢাকিয়া লইতেন, তাঁহার চেহারা বিবর্ণ হইয়া যাইত, কখনও চেহারা শুকنا খেজুর শাখার ন্যায় ধূসর মনে হইত, শ্বাস-প্রশ্বাস ফুলিয়া-ফাঁপিয়া উঠিত, এমনকি প্রচণ্ড ঠাণ্ডাতেও দন্ত মুবারক আড়ষ্ট হইয়া যাইত এবং রাসূলুল্লাহ (س)-এর শরীর ঘর্মাক্ত হইয়া পড়িত। ফলে বিক্ষিপ্ত মুক্তার ন্যায় ঘাম ঝরিতে থাকিত” (আস-সুয়ূতী, আল-ইতকান, ১খ, পৃ. ১৩০, শিরো. تغير لون النبي صلى الله عليه وسلم عند نزول الوحى
২৫. "সালসালাতুল জারাস" পদ্ধতিতে ওহী নাযিলের প্রভাবে রাসূলুল্লাহ (স) কখনও কখনও ঘুমন্ত ব্যক্তির নাক ডাকার ন্যায় ক্রমবর্ধমান আওয়াজে নাক ডাকিতেন। এই সময় তাঁহার মুখমণ্ডল লালবর্ণ হইয়া যাইত। এই প্রসঙ্গে বুখারী ও মুসলিম শরীফে একটি রিওয়ায়াত এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে: "ওহী নাযিলের সময় রাসূলে কারীম (س) মাথা ঢাকিয়া লইতেন। এই সময় তাঁহার মুখমণ্ডল লালবর্ণ ধারণ করিত, এমনকি ঘুমন্ত ব্যক্তির নাক ডাকার ন্যায় ক্রমশ আওয়াজ বাহির হইতে থাকিত অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবে কষ্ট-ক্লেশযুক্ত বাচ্চা উটের আওয়াজের ন্যায় এক ধরনের আওয়াজ বাহির হইত" (তু. বুখারী, হজ্জ, হাদীছ নং ১৭; 'উমরা, বাব ২, হাদীছ নং ১০; ফাদাইলুল কুরআন, হাদীছ নং ২; মুসলিম, হজ্জ, হাদীছ নং ৬)। তাঁহার চেহারা বিবর্ণ হইয়া যাইত। এই প্রসঙ্গে মুসলিম শরীফে এইভাবে 'মূল পাঠ উক্ত হইয়াছে, "তারাবাদা লাহু ওয়াজহুহু” (তু. মুসলিম, হুদূদ, হাদীছ নং ১৩-১৪; ফadাইল, হাদীছ নং ৮৮)।
২৬. ওহীর বিশেষ ওজন ও অস্বাভাবিক ভার রাসূলুল্লাহ (স)-এর পক্ষে সহ্য করা খুবই কষ্টকর ছিল। এই প্রসঙ্গে আবূ দাউদ ও আহমاد ইবন হাম্বল (র) যায়দ ইব্‌ন ছাবিত (রা)-এর একটি রিওয়ায়াত এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন, "রাসূলে করীম (স)-এর উপর যখন সাকীনা অবতীর্ণ হইতেছিল তখন আমি নিকটেই ছিলাম। তাঁহার মাথা আমার রানের উপর থাকাতে এমন ভীষণ ভারী বোধ হইতেছিল যেন উরুর হাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া যাইতেছে। ওহী নাযিল শেষ হইলে তিনি আমাকে উহা লিখিতে আদেশ দিলেন। আমি সূরা নিসা-এর ৯৫ নং আয়াত লিপিবদ্ধ করিলাম (তু. আবূ দাউদ, জিহاد, হাদীছ নং ১৯; আহমاد, ৫ খ., পৃ. ১৮৪ ও ১৯০)।
২৭. "সালসালাতুল-জারাস" পদ্ধতিতে ওহী নাযিলের সময় অসাধারণ ওজন ও বোঝার চাপে "আযবাহ" (عزية) নামীয় উষ্ট্রী অক্ষম হইয়া পড়িলে রাসূলে কারীম (স) নিচে নামিয়া আসেন। এই প্রসঙ্গে আহমاد ইবন হাম্বাল (র) মুসনাদ-এ 'আবদুল্লাহ্ ইব্‌ن 'উমার (র) ও আসমা' বিন্ত য়াযীদ (রা) হইতে একটি রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন, "আযাহ নামীয় উষ্ট্রীতে আরোহণরত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (س)-এর উপর সূরা মাইদা অবতীর্ণ হইতেছিল। ওহীর অসাধারণ চাপে উষ্ট্রীটি অক্ষম হইয়া পড়িলে তিনি উহা হইতে নিচে নামিয়া আসেন" (২ খ., ১৭৬; ৬ খ., ৪৫৫ ও ৪৫৮)। আবূ দাউদ আত্-তায়ালিসী (র) ইবন 'আব্বাস (রা)-এর সনদে একটি রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি যখন ওহী অবতীর্ণ হইত তখন তাঁহার সমস্ত শরীর ঘামিয়া যাইত, কম্পন দেখা দিত, সাহাবীগণ হইতে বিমুখ হইয়া যাইতেন, এমনকি কাহারও সহিত কথাবার্তা বলিতেন না (ইব্‌ن কাছীর, আল-বিদায়া, ২খ, পৃ. ২১, শিরো, في كيفية اتيان الوحى الى رسول الله )।
২৮. "সালসালাতুল-জারাস" পদ্ধতিতে এই বিশেষ ও কঠিন অবস্থা কেন হইত, এই প্রসঙ্গে হাবীবুর রহমান ফযل "ওহী ও ইলহাম” প্রবন্ধে শাহ ওয়ালিয়্যل্লাহ (র)-এর উদ্ধৃতি এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন, "প্রত্যেক মানুষের ভিতরে মানবসুলভ ও ফেরেস্তাসুলভ দুইটি স্বভাবই বিদ্যমান রহিয়াছে। দুইটিরই পৃথক পৃথক বিশেষত্ব ও উপকরণ রহিয়াছে। নবী ও রাসূলগণও মানুষ। পূত-পবিত্র ও ফেরেস্তাসুলভ স্বভাবের আধিক্য থাকা সত্ত্বেও একেবারে মানবসুলভ স্বভাব শূন্য তাঁহারা হইতে পারেন না। কাজেই রাসূলুল্লাহ (স) মানবসুলভ স্বভাবমুক্ত ছিলেন না। এই কারণে ওহী নাযিলের সময় তাঁহার সম্পর্ক 'আলমে-কুদس"-এর নিকটতর হইত এবং আল্লাহ রব্বুল আলামীন-এর পক্ষ হইতে নাযিলকৃত ওহীর প্রতিক্রিয়া গ্রহণ বা উহাকে সংরক্ষণ করিবার জন্য তাঁহার "রূহানী" অবস্থা ফেরেস্তাসুলভ প্রতিভার দ্বারা ঊর্ধ্বজগতের দিকে ধাবিত হইত। তখন মানবসুলভ প্রতিভা ও রূহানী প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হইত। ইহার প্রতিক্রিয়াতে মানবসুলভ স্বভাবের তাগিদে তাঁহার শরীর ও শারীরিক গঠন-প্রণালীর উপর প্রভাবিত হইয়া প্রথমদিকে অস্থির করিয়া তুলিতে শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হইয়া উঠিত, বুকের মধ্যে ফুটন্ত হাঁড়ির আওয়াজের মত আওয়াজ উত্থিত হইত, কপালে ঘর্মবিন্দু দেখা দিত। ঐ অবস্থায় ফেরেস্তাসুলভ নূরানী প্রতিক্রিয়া মানবতাসুলভ স্বভাবের উপর ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করিয়া রাসূলুল্লাহ (س)-কে সম্পূর্ণরূপে প্রভাবিত করিয়া ফেলিত। যখন রাসূলে কারীম (স) 'আনওয়ারাত' ও 'তাজل্লিয়াত'-এর মধ্যে ডুবিয়া ওহীর স্বাদ গ্রহণ করিতেন, তখন শারীরিক ও মানসিক কষ্ট-ক্লেশ, ক্লান্তি-শ্রান্তি দূর হইয়া যাইত এবং অনন্ত সুখ অনুভূত হইত। এই সমস্ত পর্যায়ে মাত্র কয়েক মুহূর্ত অতিক্রান্ত হইত। তখন রাসূলুল্লাহ (س) ঐ সমস্ত বাণী শুনিতেন যাহা অন্য কেহ শুনিতে পাইত না। তাঁহার সামনে ঐ সমস্ত ঘটনাবলী উদ্ভাসিত হইত যেখান পর্যন্ত বস্তুবাদী বা বুদ্ধিযুক্ত অনুভূতির অনুভব পৌঁছিতে পারে না। সেই অবস্থা মূলত সামান্য উপমা ভিন্ন আর কিভাবে বুঝানো যাইতে পারে? এইজন্যই ওহী নাযিল হওয়ার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে তিনি ঘণ্টার আওয়াজ ও মৌমাছির ভনভন আওয়াজের উপমা প্রদান করিয়াছেন। তাহা না হইলে একজন চক্ষুষ্মান আর একজন জন্মান্ধকে আলোয় পরিচয় দেবে কিভাবে (মুহিউদ্দীন খান, কুরআন পরিচিতি, পৃ. ৮৩)!"
২৯. তৃতীয় পদ্ধতি (النفث في الروع) : হৃদয়ে কোন বাণী উৎকীর্ণ করা বা ঢুকাইয়া দেওয়া। الروع-এর “রা” পেশযোগে পঠিত হইলে তখন অর্থ হইবে অন্তর। সুতরাং “আন্-নাফাছু ফির-রূ’-এর অর্থ হইল إلقاء المعنى المراد في القلب (উদ্দিষ্ট অর্থ অন্তরে নিক্ষেপ করা)। এই প্রসঙ্গে রাসূল আকরাম (স)-এর বাণী এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে :
إن روح القدس نفث في روعى انه لن تموت نفس حتى تستوفي رزقها واجلها فاتقوا الله واجملوا في الطلب خذوا ما حَلَّ ودعوا ما حَرَّم.
"নিঃসন্দেহে পবিত্র আত্মা (জিবরাঈل) আমার অন্তরে এই কথা নিক্ষেপ করিয়াছেন যে, প্রত্যেকটি আত্মার নির্ধারিত রিযিক ও সময় যতক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ না হইবে ততক্ষণ পর্যন্ত কোন আত্মাই মৃত্যুবরণ করিবে না। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করিতে থাক, রিযিক অন্বেষণে উত্তম পন্থা অবলম্বন কর, হালাল গ্রহণ ও হারামকে পরিহার কর" (সাহীহ ইব্‌ন হিব্বান)।
৩০. আর অন্তরে নিক্ষেপণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওহী প্রেরণের এই পদ্ধতি নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহর পক্ষ হইতে সরাসরি অথবা জিবরাঈل ('আ)-এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি অবতীর্ণ হইয়া থাকে (হাওলাল ওয়াহয়ি, মাজাল্লাতুল জামি'আতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৪৪, শিরা النفث في الروع(। "ফেরেস্তা অদৃশ্যভাবে আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্মরণশক্তিতে এবং অন্তরে কোন বাণী উৎকীর্ণ করিয়া দিতেন" (উর্দু দাইরাঃ মা'আরিف ইসলামিয়্যা, ৬১৫, وحى كى مختلف طريقے )।
৩১. “মান্নাউল কাত্তান” মাবাহিছ ফী 'উলূমিল কুরআন-এ “অন্তরে উৎক্ষেপণের মাধ্যমে ওহী নাযিলের এই পদ্ধতি (النفث في الروع)-কে অস্বীকার করিয়া বলিয়াছেন যে, "আন্-نافاছু ফী'র-রু" প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদীছের রিওয়ায়াত প্রমাণ করে না যে, ইহা ওহী নাযিলের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি, বরং অন্তরে উৎকীর্ণ করিবার এই পদ্ধতি উম্মুল মু'মিনীন 'আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর হাদীছে বর্ণিত পদ্ধতিদ্বয়েরই অন্তর্ভুক্ত। কেননা এই পদ্ধতিতে কখনও কখনও আল-কুরআনের আয়াত ছাড়াও অন্য কিছুও নাযিল হইত (পৃ. ৪০, كيفية وحى الملك رجلا )।
৩২. চতুর্থ পদ্ধতি (أحيانا يتمثل لى الملك رجلا) : কোন কোন সময় ফেরেস্তা মানুষের আকৃতি ধারণ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ওহী নিয়া আগমন করিতেন। উম্মুল মু'মিনীন 'আইশা সিদ্দীকা (রা)-এর বর্ণিত হাদীছে হারিছ ইব্‌ন হিশাম-এর প্রশ্নের উত্তরে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (س) হইতে এই প্রসঙ্গে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, "কোন কোন সময় ফেরেশতা মানবীয় আকৃতি ধারণ করিয়া আমার নিকট ওহী নিয়া আসিতেন। তিনি যাহা বলিতেন আমি উহা মুখস্থ করিতাম” (তু. বুখারী, বাদউল ওয়াহয়ি, বাব ২; বাদউল খালক, বাব ৬; মুসলিম, ফাদাইল পরিচ্ছদ, হাদীছ নং ৮৭; তিরমিযী, মানাকিব, পরিচ্ছেদ ৭; নাসাঈ, ইস্তিতাহ পরিচ্ছেদ, হাদীছ নং ৩৭; ইমাম মালিক, মুওয়াত্তা, আল-উদ্ লিমান্ মাস্সال কুরআন পরিচ্ছেদ, হাদীছ নং ৭)। মানুষের আকৃতিতে ফেরেস্তার আগমনকে সাহাবায়ে কিরাম মাঝে মাঝে চর্মচোখে দেখিতে পাইতেন (দ্র. 'আয়নী, 'উমদাতুল কারী, ১খ., ৪০পৃ.; উর্দু দাইরা মা'আরিف ইসলামিয়্যা, ২২খ, পৃ. ৬১৬, শিরো. وحی کی مختلف طریقے।
৩৩. আরবে বসবাসকারী দায়াতুল কাল্লী (دحية الكلبي) নামক জনৈক ব্যক্তির আকৃতিতে জিব্রাঈل ('আ) রাসূলে কারীম (স)-এর নিকট আসিতেন (তু. মাওলানা হাবীব আহমاد হাশিমী, তারীখে ফিকহে ইসলামী, পৃ. ২২-২৫, शिरो تزول وحی کی کیفیت (। রাসূলে কারীম (س) তাহাকে ভালভাবে চিনিতেন। মজলিসে উপস্থিত সাহাবা (রা) জিব্রাঈل ('আ)-কে মৃদু হাসির সহিত কথাবার্তা বলিতে দেখিতেন অথচ ইহার গুঢ় রহস্য রাসূলে কারীম (س) ব্যতিরেকে কেহই জানিতেন না। বুখারী শরীফের কিতাবুল ঈমান-এ ঈমান, ইসলাম, ইহসান ও কিয়ামত বিষয়ক সূদীর্ঘ হাদীছটিতে ইহার বর্ণনা লক্ষ্য করা যায় (হাওলাল ওয়াহয়ি, পৃ. ৪৬, শিরো. مجئ الملك في صورة بشرية(। আমাদের নবীজী (স) ছাড়াও অন্যান্য নবীদের কাছেও মানবীয় আকৃতিতে ফেরেস্তার আগমন ঘটিয়াছিল। "হাওলাল ওয়াহয়ি” প্রবন্ধে বিষয়টি এইভাবে আলোকপাত করা হইয়াছে, "আল-কুরআনুল কারীমে সায়্যিদিনা ইব্রাহীম ('আ)-এর কাছে কিছু সম্মানিত মেহমান (ফেরেশতা) আগমন প্রসঙ্গে সূরা আয-যারিয়াত (৫১ : ২৪-২৮)-এ উল্লেখ করা হইয়াছে। অনুরূপ লূত ('আ)-এর কওমকে ধ্বংসকারী ফেরেস্তাদের জামাআত মানুষের আকৃতিতে আসিয়াছিলেন। এই প্রসঙ্গে সূরা হুদ, ১১ : ৭৭-৮৮ আয়াতে এবং হযরত মারয়াম ('আ)-এর কাছে হযরত জিব্রাঈل ('আ)-এর আগমন প্রসঙ্গে সূরা মারয়াম, ১৯ : ১১৭ আয়াতে উল্লেখ করা হইয়াছে (উপরে দ্র.)।
৩৪. مجئ الملك على صورته الملائكية الحقيقية ('আ) তাঁহার নিজস্ব অবয়ব প্রদর্শনের মাধ্যমে রাসূলে কারীম (স)-এর নিকট আগমন করিয়া ওহী প্রেরণ করিতেন। তাঁহার আসল অবয়ব প্রসঙ্গে 'আয়নী (র) এইভাবে বর্ণনা দিয়াছেন, "জিবরাঈল ('আ) রাসূলুল্লাহ (س)-এর কাছে মহান আল্লাহ যে তাঁহাকে ছয় শত ডানাবিনিষ্ট বিশাল আকৃতিতে সৃষ্টি করিয়াছেন ঐ আকৃতিতেই হাজির হইতেন। তাঁহার প্রত্যেকটি ডানা ছিল মণিমুক্তা ও ইয়াকুত খচিত ('উমদাতুল কারী, ১খ., পৃ. ৪০; তু. ইব্‌ن হিশাম, সীরাত, ১৭, পৃ. ২৪৪ ও ২৪৫)।
৩৫. আসল আকৃতিতে রাসূলুল্লাহ (স) জিব্রাঈل ('আ)-কে কতবার প্রতক্ষ্য করিয়াছিলেন এই প্রসঙ্গে ফাতহুল বারী-তে তিনবারের কথা উল্লেখ আছে। একবার রাসূলুল্লাহ (স) জিব্রাঈل ('আ)-কে আসল আকৃতিতে দেখিবার আগ্রহ প্রকাশ করিলে তিনি আত্মপ্রকাশ করিয়াছিলেন। দ্বিতীয়বার মি'রাজের রাত্রিতে এবং তৃতীয়বার মক্কা শারীফের আজয়াদ (أجيد) নামক স্থানে। প্রথম দুইবারের কথা সহীহ হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে এবং তৃতীয়বারের দেখা সম্পর্কিত বর্ণনা সনদের দিক দিয়া দুর্বল ও সন্দেহযুক্ত (ইব্‌ন হাজার 'আস্কালানী, ফাত্حُل বারী, ১খ, ১৮, পৃ. ১৯)। উর্দু দাইরা মা'আরিف اسلامিয়্যা-তে এইভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে, প্রথমবার হেরা পর্বতে, দ্বিতীয়বার ওহী বিরতির শেষদিকে আসমানের এক জায়গায় কুরসীতে বসা অবস্থায় এবং তৃতীয়বার মি'রাজের রাত্রিতে সিদ্রাতুল মুস্তাহাতে, যাহা সূরা নাজম (৫৩:৪-২৪)-এ উল্লেখ করা হইয়াছে (২২খ, পৃ. ৬১৬, শিরো)। وحی کی مختلف طریقے ।
৩৬. ষষ্ঠ পদ্ধতি (الكلام من وراء حجاب) : আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং পর্দার আড়াল হইতে তাঁহার সহিত কথাবার্তা বলিতেন। কথোপকথনের এই প্রক্রিয়া কখনও জাগ্রত অবস্থায় হইত, যেমন মি'রাজের রাত্রিতে হইয়াছিল এবং কখনও নিদ্রিত অবস্থায়ও হইতে পারে, যেমন মু'আয (রা)-এর বর্ণিত হাদীছে রাসূলুল্লাহ এইভাবে বলিয়াছেন : اتاني ربي في أحسن صورة فقال فيم يختصم الملا الاعلى (আমার প্রতিপালক আমাকে সর্বোত্তম আকৃতিতে দর্শন দিয়াছেন। আমার প্রতি ইরশাদ হইল যে, (হে রসূল) ঊর্দ্ধজগতে ফেরেস্তারা কোন বিষয় নিয়া পরস্পর ঝগড়া করিয়া থাকে) (আস-সুয়ূতী, ইত্কان, ১খ., পৃ. ১২৮; 'আয়নী, 'উمادাতুল কারী, ১খ., পৃ. ৪০)।
৩৭. মি'রাজের রাত্রিতে কোন ফেরেস্তা বা মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি আল্লাহ নবীকারীমের উপর ওহী নাযিলসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামায ও আহকাম ফরয করিয়াছিলেন (উর্দু দাইরা মা'আরিف ইসলামিয়্যা, ২২খ, পৃ. ৬১৬)। আহলুস সুন্না ওয়াল জামা'আত-এর সর্বজনস্বীকৃত মত হইল, "পর্দাবিহীন অবস্থায় সরাসরি আল্লাহ্র সহিত কথোপকথন পৃথিবীতে আদৌ সম্ভব নহে। তবে একমাত্র আমাদের নবী (স) মি'রাজের রাত্রিতে সরাসরি আল্লাহ্ সহিত কথোপকথন করিয়াছিলেন।" আর পর্দার অন্তরালে মূসা ('আ) আল্লাহ্র সহিত কথোপকথন করিতেন। এই প্রসঙ্গে আল-কুরআনুল কারীমে সূরা আ'রাফ (৭: ১৪৪), আন্-নিসা' (৪: ১৬৪) এবং আল-বাকারা (২: ২৫৩) আয়াতে বর্ণিত হইয়াছে (হাওলাল ওয়াহহিয়, পৃ. ৪৪ ও ৪৫, শিরো کلم کفا حا 499 ا الكلام من وراء حجاب ।
৩৮. সপ্তম পদ্ধতি (وحی اسرافیل) : বুখারী শরীফ-এর প্রসিদ্ধ ভাষ্যকার 'আয়নী (র) উمادাতু'ل কারী-তে আস-সুহায়লীর উদ্ধৃতি উল্লেখ পূর্বক ইহার আলোচনা করিয়াছেন। মুসناد আহমاد-এ আশ-শা'বী হইতে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হইয়াছে যে, চল্লিশ বৎসর বয়সে রাসূলুল্লাহ (س) নবুওয়াত প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। প্রাথমিক পর্যায়ের তিন বৎসর নবুওয়াতের ওইয়দায়িত্ব প্রদান করা হইয়াছিল ইস্রাফীল ('আ)-এর প্রতি। এই সময়ে তিনি রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে বিভিন্ন বাণী ও প্রয়োজনীয় বিষয়াদি শিক্ষা দিতেন, তবে আল-কুরআনের কোন অংশই নাযিল করেন নাই।
৩৯. অবশ্য আল-ওয়াকিদী জিব্রাঈل ('আ) ব্যতীত অন্য কাহাকেও ওহী নাযিলের দায়িত্ব প্রদান করা হইয়াছিল এই মতকে অস্বীকার করিয়াছেন ('উمادাতুল কারী, ১খ., পৃ. ৪০)। ব্যতিক্রমধর্মী পদ্ধতি অর্থাৎ চর্মচক্ষুতে আল্লাহ্ দর্শন ও অন্তরঙ্গ মুহূর্তে কথোপকথনের মাধ্যমে ওহী নাযিল। একমাত্র উর্দু দাইরা মা'আরিف ইসলামিয়্যা-তে এই ব্যতিক্রমধর্মী পদ্ধতির আলোচনা এইভাবে আসিয়াছে, "কিছু কিছু আলিম ওহী নাযিলের আরো একটি পদ্ধতি সম্পর্কে বলিয়াছেন। মহান আল্লাহ যাবতীয় মাধ্যম ও সকল ধরনের পর্দা উন্মোচন পূর্বক নূরের সাগরে উদ্ভাসিত হইয়া উঠেন এবং নবীর সহিত একান্ত অন্তরঙ্গ মুহূর্তে কথোপকথন করিয়া থাকেন। ওহী নাযিলের এই পদ্ধতিতে রাসূলে কারীম (স) মি'রাজে চাক্ষুষভাবে সরাসরি আল্লাহ্ দীদার লাভ করিয়াছিলেন। চর্মচক্ষুতে আল্লাহকে দর্শন (رؤیت بصری) মতের সমর্থক আলিমদের ইহাই অভিমত।
৪০. কিন্তু যাহারা এই মতের বিপরীত মত পোষণ করেন তাহারা নিজেদের সমর্থনে কুরআন মাজীদ হইতে দলীল পেশ করিয়াছেন, لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ "দৃষ্টিসমূহ তাহাকে অবধারণ করিতে পারে না, কিন্তু তিনি অবধারণ করেন সকল দৃষ্টি; তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক পরিজ্ঞাত" (৬ঃ ১০৩)।
৪১. চর্মচক্ষুতে আল্লাহকে দর্শন (رؤیت بصری) মতের প্রবক্তাগণ ইহার উত্তর এইভাবে প্রদান করিয়াছেন যে, এই আয়াতে "চর্মচক্ষুতে আল্লাহকে দর্শন অসম্ভব" যে বর্ণনা আসিয়াছে উহা বস্তুজগতের চর্মচক্ষুর সহিত সম্পর্কযুক্ত অর্থাৎ আল্লাহর দীদার শুধু এই দুনিয়াতেই অসম্ভব। মি'রাজের রাত্রিতে আসमाने রাসূলুল্লাহ (س)-এর সহিত মহান আল্লাহর যে দীদার হইয়াছিল উহা ইহজগতে ছিল না এবং 'আলমে আখিরাত"-এ হইয়াছিল (উর্দু দাইরা মা'আরিف اسلامিয়্যা, পৃ. ২২২খ, ৬১৬)।
উপসংহারঃ "ওহীর সূচনা ও নাযিল হওয়ার পদ্ধতি" প্রসঙ্গে সূদীর্ঘ আলোচনায় সুস্পষ্ট যে, ওহী একটি জীবন্ত মু'জিযা। ইহার শুভ সূচনা ও পরিসমাপ্তি জিব্রাঈل امীনর মাধ্যমে মুহাম্মاد মুসতাফা (س)-এর নিকট হইয়াছে। স্থান-কাল-পাত্রভেদে বিভিন্ন পদ্ধতিতে ওহীর অবতরণ নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, ইহা মহামহিমান্বিত সুবিজ্ঞ প্রতিপালকের পক্ষ হইতে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে অবতারিত। মহান আল্লাহ্ এই কথা বুঝাইতে চাহিতেছেন যে, মুহাম্মاد (س)-ই পৃথিবীর প্রথম মানুষ ছিলেন না যে, একমাত্র তাঁহার উপরই ওহী নাযিল হইয়াছে, বরং তাঁহার পূর্বে নূহ ('আ), ইব্রাহীم ('আ), মূসা ('আ) ও 'ঈসা ('আ) প্রমুখ নবীদের উপরও এই উদ্দেশ্যে ওহী প্রেরণ করা হইয়াছিল যে, তাঁহারা যেন দীন ইসলামকে মজবুতভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। অনুরূপ নির্দেশ রাসূলুল্লাহ (س) প্রদান করা হইয়াছিল যে, আল্লাহ্র পক্ষ হইতে যাবতীয় আহকাম তিনি যেন মানবজাতির কাছে পৌঁছাইয়া দেন এবং উহা হাতে-কলমে বুঝাইয়া দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর মাধ্যমে ওহী নাযিলের উদ্দেশ্যকে সফলভাবে বাস্তবায়িত করেন এবং উহার মধ্যে কোন প্রকার পার্থক্য সূচিত হইতে না দেন।

টিকাঃ
১. গ্রন্থপঞ্জী: (১) আল-কুরআনুল কারীম, বিভিন্ন সূরার সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহ; (২) আস- সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুف্, দারুল মা'রিফা, বৈরূত-লেবানন ১৩৯৮/১৯৭৮, ১খ, পৃ. ২৬৬, ১৬৭; (৩) মুসলিম ইব্‌ن হাজ্জাজ (২০৪-২৬১ হি.), আস-সাহীহ, ফادাইল অধ্যায়, فাদলু নাসাবি'ن-নাবিয়্যي, ঈমান, পৃ. ২৫৩, ৫২৪; হজ্জ, হাদীছ নং ৬; হুদূদ, হাদীছ নং ১৩,১৪; (৪) মাওলানা আবুল কালাম আযاد, রাসূলে রাহমাত, ১ম সং, দিল্লী ১৯৮২, পৃ. ৭১, শিরো। (৫) মুহাম্মাদ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী, ফায়দুল বারী, দারু'ل মা'রিফাঃ, বৈরূত-লেবানন, তা. বি, ১খ, পৃ. ২৪, শিরো। (৬) ইব্‌ن হিশাম, সীরাত, আল-মাক্তাবাতুত তাওফীকিয়্যা, মিসر, তা. বি, ১খ., পৃ. ২৪۰, ২৪৪; (৭) মুহাম্মاد সায়্যিদ কীলানী, 'আয়নুল ইয়াকীন ফী سায়্যিদিল মুরসালীন, দারুল মা'রিফা, বৈরূত-লেবানন, ২য় সং, ১৩৯৮/১৯۷۸, পৃ. ১১, শিরো। (৮) ইব্‌ن কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আد, মাত্মاআতু মুসতাফা আল-আলবানী, আল-হালাب ১৩۹۰/۱۹۷۰, ১খ, পৃ. ৩৩, শি.। (৯) মুহাম্মاد ریদা, মুহাম্মاد রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলায়হি ওয়াসাল্লাম, دارু'ل-কুতুবি'ل-'ইলমিয়্যাঃ, বৈরূত-লেবানন ১৩۹۵/۱۹۷۵, পৃ. ৫৯, শিরো। (۱۰) শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, سীরাতুন নবী, দারুল ইশা'আত, করাচী ۱۹۸৬ খৃ., ১ম সং, ১খ, পৃ. ১২۵; (১১) ইب্‌ن কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, দারুর-রায়‍্যান, ১ম সং, ১৪۰۸/۱۹۸۸, ২খ, পৃ. ৬, শিরো। (১২) মুহাম্মাদ ইব্‌ن ইসমা'ঈل (১৯৪-২৫৬ হি.), বুখারী, আওওয়ালু মা বুদিআ বিহিল্-ওয়াহহিয়, বাব ৩; تا'বীর অধ্যায়, আর-রু'য়া আস-সালিহা বাব; তাফসীর অধ্যায়, সূরা আন-নূর, বাব ৬; ফادাইলুল কুরআন, বাব ১; বাদ'উল-খালকি বাব ৬; হজ্জ, হাদীছ নং ১৭; 'উমরা, হাদীছ নং ১০; (۱۳) ইব্‌ن জারীর তাবারী, তাফসীর (৩০ : ১৩۸); (১৪) ড. 'আবদুল ফাত্তاح ইবরাহীম সাল্লামা, হাওলাল ওয়াহয়ি, মাজাল্লাতুল জামিআতিল ইস্লামিয়্যা, মদীنا মুনাওয়ারা, ৪৫ সংখ্যা, ১৪۰۰ হি., পৃ. ৪৪, শিরো। (۱۵) উর্দু দাইরা মা'আরিফা ইস্লামিয়্যা, লাহোর, ১৪۰۹/۱۹۸۹, ২২খ, পৃ. ৬২১ শিরো। (১৬) মুহাম্মاد ইদ্রীس কান্দলাভী, سীরাতুল মুসতাফা, লাহোর ۱۴۰۶/۱۹۸۵, পৃ. ১২۸, শিরো। (۱۷) ইب্‌ن হাজার 'আস্কالانی (۷۷۳-۸۵۲ হি.), فাত্حُل বারী, দারুল মা'রিফা, বৈরূত-লেবানن, তা, বি, ১খ, পৃ. ৯, শিরো। (۱۸) মান্না'উল কাত্তান, মাবাহিছ ফী 'উলূميل কুরআন, লাহোর ১৪۰۸/۱۹۸۷, পৃ. ৩৮, শিরো। (۱۹) بارود दीन আল- 'آયنی, 'উمادাতুল কারী, দারু ইহয়াইত্ তুরাছিল 'আরাবী, বৈরূত-লেبانن, তা,বি, ১খ, পৃ. ৪০; (۲۰) استخار احمد بالبى, তা'রীখে আঙ্কার ওয়া উলূم ইসলামী, দিল্লী ۱۹۸৩ খৃ., পৃ. ৯۱, শিরো. ; نزول قرآن )۲۱) আল-কاسতাল্লانی, ইরشাদুস্ সারী লি-শারহি সাহীহিল বুখারী, দারু ইহয়াইত তুরাছিল 'আরাবী, বৈরূত, তা, বি, পৃ. ৬۲, ۶۳; (۲۲) মুহাম্মاد আল-খಿದরী, নূরুল ইয়াকীন ফী سায়্যিদিল মুরসালীন, মুওয়াস্সাসাতু 'উলূميل কুরআন, دিমাক্- বৈরূত, ১ম সং, ۱۳۹۸/۱۹۷۸, পৃ. ۳۵, শিরো. ;بدء الوحى )۲۳) سায়্যিদ আবুল হাসান 'আলী نادবী, নাবিয়্যে রাহমাত, ২য় সং. ۱۴۰۱/ ۱۹۸۱, লক্ষ্ণৌ, ১খ., পৃ. ۱۱۶; (۲۴) আস্-سوয়ূতী, আল-ইتْکان فী 'উলূميل কুরআন, দারু ইহয়াইল 'উলূم, বৈরূত, ১ম সং, ۱۴۰۷/۱۹۸۷, ۱خ, পৃ. ۱۲۹-۱۳۰, শিরো. تغير لون النبي ;عند نزول الوحى )۲۵) 'আলী আসগার চৌধুরী, হাদরাত মুহাম্মاد (س) গারে হিরা' সে গারি ছাওর তক্, লাহোর ۱۹۸۲ খৃ., ۲خ, পৃ. ۹, ۱নং টীকা; (۲۶) মুহাম্মاد 'আবদুল জাব্বার খান, سীরাতি মুহাম্মادিয়্যা, লাহোর, তা,বি, ۱خ, পৃ. ۲۱۴, ۲۱۰, শিরো. وحی کی مراتب کا بیان (۲۷) আবূ নু'আয়ম, داলাইলুন نبووة, হায়দরাবাদ ۱۳۲۰ হি., পৃ. ۶۹; (۲۸) قادی যায়নুল 'আবিদীন, سীরাতি তায়্যিবা, مাক্কাবা-ই 'ইলমিয়্যা, মীরাঠ ۱۴۰۳/۱۹۸۳, শিরো. افتاب نبوت کی ضیاء کبری )۲۹) আল-بالاذوری (مृ. ۲۷۹/۸۹۲), আনসাবুল আশ্রাফ, বায়তুল مাকদিস সং, ۱۹۳۶ খৃ., ۱خ, পৃ. ۱۱۱; (۳۰) আয-যারকাশী, আল-বুরহান ফী 'উলূmil কুরআন, দারুল ما'রিফা, বৈরূত-লেবানن ۱۳۹۱/۱۹۷۲, ২য় সং, ۱خ, পৃ. ۲۰۶, শিরা معرفة أول ما نزل وآخر ما نزل ; )۳۱) আবূ 'ঈسا মুহাম্মاد ইب্‌ن 'ঈسا (۲۰۹-۲۷۹ হি.), তিরমিযী, মানাকিব, পরিচ্ছেদ ۷; তাফসীর সূরাতুল মু'মিনূন, হাদীছ ۱; (۳۲) 'আব্দুর রহমান ইب্‌ن শু'আয়ب (۲۶۵-۳۰۹ হি.), نساঈ, ইস্তিতাহ পরিচ্ছেদ, হাদীছ নং ۳۷; (۳۳) ইমাম মালিক, মুওয়াত্তা, আল-উদ্‌ লিমানْ মাস্সال কুরআন পরিচ্ছেদ, হাদীছ নং ۷; (۳۴) আর-রাগিব, আল-মুফ্রাদাত ফী গারীবিল কুরআন, করাচী তা. বি., পৃ. ۵۱۵, ۵۱۶; (۳۵) মুফতী শফী, মা'আরিফুল কুরআন, অনু. মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর, বাদশাহ ফাহاد কুরআন মুদ্রণ প্রকল্প, মদীنا মুনাওয়ারা, পৃ. ۹۱۱, শিরো. সূরা মু'মিনূন-এর বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব; (۳۶) আবু دাউد (۲۰۲-۲۷۵ হি.), سُنن ابو دا'উদ, জিহাদ, হাদীছ নং ۱۹; (۳۷) احمد ইب্‌ن হাম্বল, মুস্লাد, ۵خ., ۱۸۴, ۱۹۰; ۲خ., ۱۷۶; ۶خ., ۴۵۵, ۴۵۸; (۳۸) মুহিউদ্দীন খান, কুরআন পরিচিতি, মদীنا পাবলিকেশन्स, বাংলাবাজার, ঢাকা, ২য় সং, ১৪۱۲/۱۹۹۲, শিরো, وহী ও ইলহাম, মূল প্রাবন্ধিক: হাবীবুর রহমান فضل, অনু. মুহীউদ্দীন শামী, পৃ. ۸۳; (۳۹) মাওলানা হাবীব আহমاد হাশিমী, تا'রীখে فিকহে ইসলামী, ২য় সং, করাচী ۱۳۹۸/۱۹۷۸, পৃ. ۲۲-۲۵, শিরো. नुज़ूले ওয়াহহিয় কী কায়ফিয়াত।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নির্ভরযোগ্য হাদীছে ওহীর শুভ সূচনার পূর্বাভাস সম্পর্কীয় বিবরণ

📄 নির্ভরযোগ্য হাদীছে ওহীর শুভ সূচনার পূর্বাভাস সম্পর্কীয় বিবরণ


নির্ভরযোগ্য হাদীছে ওহী-র শুভ সূচনার পূর্বাভাস সম্পর্কীয় বিবরণ
রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি কিসের মাধ্যমে ওহী আসিবার পূর্বাভাষ সূচিত হইয়াছিল, কিভাবে উহা বাস্তবে প্রতিফলিত হইত, কোন জিনিসের প্রতি তাঁহার অনাবিল আগ্রহ সৃষ্টি হইয়াছিল, সমাগত চিরসত্য প্রাপ্তির সূচনার বিবরণাদিসহ উহার বিরতিকাল এবং এই সময়ে তাঁহার আত্মিক অস্থিরতা, ব্যাকুলতা ইত্যাদি সম্পর্কীয় নির্ভরযোগ্য বিবরণ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা) হইতে একটি হাদীছ এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে: عن عائشة أم المؤمنين رضى الله تعالى عنها انها قالت أول ما بدئ به رسول الله صلى الله عليه وسلم من الوحى الرؤيا الصالحة في النوم فكان لا يرى رؤيا الا جاءت مثل فلق الصبح ثم حبب اليه الخلاء وكان يخلو بغار حراء فيتحنث فيه وهو التعبد الليالي ذوات العدد قبل ان ينزع الى اهله ويتزود له ثم يرجع الى خديجة فيتزود لمثلها حتى جاءه الحق وهو في غار حراء فجاءه الملك فقال اقرأ فقلت ما انا بقارئ قال فاخذني فغطني حتى بلغ منى الجهد ثم أرسلنى فقال إقرأ فقلت ما انا بقارئ فاخذني فغطني الثانية حتى بلغ مني الجهد ثم أرسلنى فقال إِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الإِنْسَانَ مِنْ عَلَى اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ . فرجع بها رسول الله صلى الله عليه وسلم يرجف فؤاده فدخل على خديجة بنت خويلد فقال زملونی زملونی فزملوه حتى ذهب عنه الروع فقال لخديجة وأخبرها الخبر لقد خشيت على نفسى فقالت خديجة كلا والله ما يخزيك الله ابدا انك لتصل الرحم وتحمل الكل وتكسب المعدوم وتقرى الضيف وتعين على نوائب الحق. فانطلقت به خديجة حتى اتت به ورقة ابن نوفل بن اسد بن عبد العزى ابن عم خديجة وكان أمراً تنصر في الجاهلية وكان يكتب الكتاب العبراني فيكتب من الإنجيل بالعبرانية ما شاء الله ان يكتب وكان شيخا كبيرا قد عمى فقالت له خديجة يا ابن عم اسمع من ابن أخيك فقال له ورقة يا ابن اخي ماذا ترى فأخبره رسول الله صلى الله عليه وسلم خبر ما رأى فقال له ورقة هذا الناموس الذي نزل الله على موسى يا ليتني فيها جزعا يا ليتني أكون حيا اذ يخرجك قومك فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم أو مخرجى هم قال نعم لم يأت رجل قط بمثل ما جئت به الا عودى وان یدرکنی يومك أنصرك نصرا مؤزرا ثم لم ينشب ورقة ان يوفى وفتر الوحي . "উম্মুল মুমিনীন 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি প্রথম ওহীর সূচনা হইয়াছিল সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দর্শন করিতেন উহা ভোরের আলোকরশ্মির ন্যায় সত্যরূপে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিত। অতঃপর নির্জন জীবন যাপনের প্রতি তাঁহার আগ্রহ সৃষ্টি হইল। তিনি নির্জনে হেরা গুহাতে 'ইবাদত করিতেন, দিবা-রাত্র 'ইবাদতে মগ্ন থাকিতেন, খাদ্য-সামগ্রী ফুরাইয়া গেলে খাদীজা (রা)-এর নিকট ফিরিয়া আসিয়া পুনখাদ্যসামগ্রী লইয়া আবার গুহাতে ফিরিয়া যাইতেন, অবশেষে একদিন সত্য সমাগত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) তখন 'হেরা' গুহাতে ছিলেন। ইতিমধ্যে জিব্রাঈল 'আলায়হি ওয়াসাল্লাম আগমন করিয়া বলিলেন, "পড়ুন"। আমি বলিলাম, "আমি পড়িতে পারি না।" রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, জিব্রাঈল (আ) আমাকে কাছে টানিয়া লইলেন এবং এত জোরে আলিঙ্গন করিলেন যে, আমি ক্লান্ত হইয়া পড়িলাম। তারপর আলিঙ্গনমুক্ত করিয়া বলিলেন, 'পড়ুন'। উত্তরে বলিলাম, 'আমি পড়িতে পারি না'। পুনরায় দ্বিতীয়বার তিনি আমাকে কাছে টানিয়া খুব জোরে চাপিয়া ধরিলেন। ফলে পুনঃ ক্লান্ত ও শ্রান্ত হইয়া পড়িলাম। অতঃপর আমাকে ছাড়িয়া দিয়া বলিলেন, পড়ুন। আমি বলিলাম, আমি পড়িতে পারি না। রাসূলে কারীম (স) বলিলেন, জিবরাঈল ফেরেস্তা আমাকে তৃতীয়বার কাছে টানিয়া দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিলেন। ফলে আমি পূর্ণমাত্রায় ক্লান্ত-শ্রান্ত হইয়া পড়িলাম। তারপর তিনি আমাকে আলিঙ্গনমুক্ত করিয়া বলিলেন, إِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ، خَلَقَ الإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ . اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ . "পড়ুন, আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন। তিনি সৃষ্টি করিয়াছেন মানবজাতিকে আঠাল রক্ত হইতে। পড়ুন, আপনার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত” (৯৬: ১-৩)। রাসূলুল্লাহ (স) কম্পমান হৃদয়ে গৃহে ফিরিয়া আসিলেন। তিনি খাদীজা বিন্‌তে খুওয়ায়লিদ-এর গৃহে প্রবেশ করিয়া ডাকিয়া বলিলেন, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। তিনি তাঁহাকে বস্ত্রাবৃত করিলেন। অবশেষে যখন ভয়ভীতি দূর হইয়া গেল তখন তিনি খাদীজার নিকট সমস্ত ঘটনা জানাইয়া বলিলেন, আমি আমার জীবনের আশংকা করিতেছি। খাদীজা (রা) সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, "কখনও নয়, আল্লাহ্র কসম! তিনি আপনাকে কখনও অপমানিত করিবেন না। নিশ্চয় আপনি আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখেন, অপরের দুঃখ-দুর্দশাকে লাঘব করেন, অসহায়দের অভাব দূর করেন, অতিথিদের সেবা করেন, সত্য প্রতিষ্ঠাতে আপনি সাহায্য করেন। অতঃপর খাদীজা (রা) রাসূলে আকরাম (স)-কে সঙ্গে লইয়া তাঁহার চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবন নাওফাল ইব্‌ন আসাদ ইবন 'আবদুল 'উয্যা-এর কাছে গেলেন। ওয়ারাকা জাহিলী যুগে 'ঈসায়ী ধর্মের অনুসারী ছিলেন। তিনি হিব্রু ভাষাতে পুস্তকাদি লিখিতেন, এমনকি ইন্জীল-এর কিছু অংশ লিখিয়াছিলেন মহান আল্লাহ্র ইচ্ছা অনুযায়ী। বয়স ছিল অনেক বিধায় তিনি দৃষ্টিহীন হইয়া পড়িয়াছিলেন। খাদীজা (রা) তাহাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, ভাইয়া! আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রের নিকট হইতে ঘটনা শ্রবণ করুন।" ওয়ারাকা বলিলেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্র! তুমি কি দেখিয়াছ, বিবরণ দাও। আল্লাহ্র রাসূল (স) যাহা কিছু দেখিয়াছিলেন সবকিছুই তাঁহার কাছে বর্ণনা দিলেন। ওয়ারাকা সমস্ত ঘটনা শ্রবণ করিয়া বলিলেন, "উহা নামুস", ইনিই জিব্রাঈল ফেরেস্তা, যাঁহাকে আল্লাহ মূসা (আ)-এর নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। হায় আফসোস! আমি যদি বাঁচিয়া থাকিতাম, যখন নিজ বংশের লোকেরা তোমাকে বিতাড়িত করিবে। রাসূলে কারীম (স) বিস্ময়ের সহিত জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহাদের দ্বারা আমি কি বিতাড়িত হইব? উত্তরে বলিলেন, হাঁ, যাঁহারাই অনুরূপ জ্যোতি লইয়া আসিয়াছিলেন তাঁহাদের সকলকে দেশ হইতে বিতাড়িত হইতে হইয়াছিল। তোমার জীবনের ঐ দিনগুলিতে যদি আমি বাঁচিয়া থাকি, তবে আমি সর্বশক্তি দিয়া তোমাকে সাহায্য করিব। ইহার পরে ওয়ারাকা বেশি দিন জীবিত ছিলেন না এবং কিছু দিনের জন্য ওহী প্রাপ্তির সাময়িক বিরতি ঘটে” (বুখারী, আওয়ালু মা বুদিআ বিহিল-ওয়াহহিয়, বাব, ৩; তু. মুসলিম, ঈমান, পৃ. ২৬৩, ২৫৪)।
কিসের মাধ্যমে ওহীর সূচনা হইয়াছিল এই প্রসঙ্গে উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা)-এর উল্লিখিত হাদীছ ছাড়াও অপরাপর হাদীছ, তাফসীর ও মুহাম্মাদ মুসতাফা (স)-এর জীবনী গ্রন্থসমূহে ওহীর সূচনার যেসব পুংখানুপুংখ বিশ্লেষণ লিপিবদ্ধ রহিয়াছে তন্মধ্যে নিম্নলিখিত বিবরণগুলি উল্লেখযোগ্য: সত্য স্বপ্ন (الرؤيا الصادقة) (দর্শনের মাধ্যমে ওহীর সূচনা হইয়াছিল এবং ইহাই ছিল প্রকৃত ঘটনার পূর্বাভাষ। একইরূপ অপর হাদীছ ইবন জারীর (র) তাঁহার তাফসীরে ও ইন্ন সা'দ সংকলন করিয়াছেন।
মুহাম্মাদ ইদ্রীস কান্ধলভী তাঁহার "সীরাতুল মুসতাফা"-তে সত্য স্বপ্ন প্রসঙ্গে এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, অদৃশ্য বিষয়াবলী উন্মোচনের ক্ষুদ্রতম মাধ্যম হইল সত্য স্বপ্ন, আর সর্বোচ্চ মাধ্যম হইল ওহী। রু'য়া সালিহা হইল নবুওয়াতের নমুনামাত্র। এই প্রসঙ্গে আবু নাঈম হাসান সনদে 'আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ-এর ছাত্র 'আলকামা ইব্‌ন কায়س হইতে একটি মুরসাল হাদীছ এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, প্রথমে নবীগণ স্বপ্ন দেখিতেন, ইহাতে তাঁহাদের অন্তর প্রশান্তিময় হইয়া যাইত এবং সার্বক্ষণিক উহার জন্য উৎকণ্ঠা বাড়িয়া গেলে ওহী নাযিল হইত। যেমন হযরত ইউসুফ ও ইব্রাহীম ('আ)-এর স্বপ্ন।
সত্য স্বপ্ন (الرؤيا الصادقة) 'নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের একভাগ' এই প্রসঙ্গে ইমাম বুখারী (র) একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করিয়াছেন: রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, সত্য স্বপ্ন নবুওয়াতের ছেচল্লিশ অংশের একাংশ। সমস্ত নবী-রাসূলদের কাছে ওহীর সূচনার পূর্বাভাস সূচিত হইয়াছিল স্বপ্নের মাধ্যমে। এই প্রসঙ্গে ইব্‌ن হাজার 'আস্কালানী (৭৭৩-৮৫২ হি.) ফাতহুল বারীতে আবূ না'ঈم-এর "আদ্-দালাইল” গ্রন্থের উদ্ধৃতি উল্লেখপূর্বক হাসান-এর সনদে 'আলকামা ইন্ন কায়س হইতে একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন: إن أول ما يؤتى به الانبياء في المنام حتي تهدا قلوبهم ثم ينزل الوحى. "ওহীর সূচনালগ্নে নবীদের কাছে যাহা কিছু আসিত উহা স্বপ্নের মাধ্যমে আসিত। ইহা এইজন্য ছিল যে, তাঁহাদের হৃদয়ভূমি ওহী গ্রহণের উপযোগী হইয়া যায়, হহার পরে জাগ্রত অবস্থায় ওহী নাযিল হইত"। সত্য স্বপ্ন (الرؤيا الصادقة) শুধু রাসূলদের জন্য নির্দিষ্ট (খাস) নহে। এই প্রসঙ্গে মান্নাউল কাত্তান উল্লেখ করিয়াছেন, সত্য স্বপ্ন শুধু নবী-রাসূলদের সহিত সম্পৃক্ত নহে, বরং উহা মুমিনদের জন্যও প্রযোজ্য। তখন উহা ওহী হিসাবে গণ্য হইবে না। এই প্রসঙ্গে রাসূলের বাণী: إنقطع الوحى وبقيت المبشرات رؤيا المؤمن . “ওহী (আগমন) বন্ধ হইয়া গিয়াছে, সুসংবাদসমূহের (আগমন) এখনো অবশিষ্ট রহিয়াছে, উহা হইল মুমিনের সত্য স্বপ্ন”। আম্বিয়াদের সকল সত্য স্বপ্ন )الرؤيا الصالحة في المنام ওহীর হুকুম রাখে এবং ইহার অনুসরণ ওয়াজিব আল-কুরআনে ইহার বিবরণ উল্লেখ হইয়াছে, ইবরাহীম (আ) কর্তৃক স্বীয় পুত্র ইসমা'ঈل (আ)-কে যবেহ প্রসঙ্গে।
ওহীর সূচনার পূর্বাভাষ হিসাবে যেমন রাসূলে কারীম (স) স্বপ্ন দেখিতেন তেমনি পরবর্তী কালেও তিনি অনুরূপ স্বপ্ন দেখিতেন। এই প্রসঙ্গে বুখারী শরীফে বর্ণিত হইয়াছে যে, উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা)-এর প্রতি যখন সন্দেহ পোষণ করা হইয়াছিল, তখন তিনি এই আশাই পোষণ করিয়াছিলেন, আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন তাঁহার নিষ্কলঙ্কতার কথা রাসূলুল্লাহ (স)-কে স্বপ্নে জানাইয়া দিবেন।
স্বপ্নের মাধ্যমে ওহী আসার নিগূঢ় রহস্য প্রসঙ্গে আল্লামা আয়নী (র) বলিয়াছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর কাছে ওহী আসিত ঘুমন্ত অবস্থায় এবং ধীরে ধীরে যেন ইহা তাঁহার কাছে সহজতর মনে হয় এবং ওহী আনয়নকারী ফেরেশতার সাথে ক্রমশ সখ্যতা বৃদ্ধি পায়। সত্য স্বপ্ন )الرؤيا الصادقة(-এর মাধ্যমে ওহীর সূচনা মূলত রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক আসন্ন ওহী গ্রহণের একটি পূর্ব-প্রশিক্ষণ মাত্র। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিদ্রা ও তন্দ্রা এবং স্বপ্নকে একান্তভাবে বিশ্লেষণ করিতে হইলে দুইটি বিষয়ের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি প্রদান আবশ্যক। (এক) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিজ নিদ্রা সম্পর্কীয় বর্ণনার প্রতি। এই প্রসঙ্গে তিনি বলিয়াছেন, আমার চক্ষুদ্বয় ঘুমাইয়া থাকে কিন্তু আমার অন্তর সর্বদাই জাগ্রত থাকে। অর্থাৎ চক্ষুদ্বয় বন্ধ হওয়া সত্ত্বেও তাঁহার অন্তর সর্বদা জাগ্রত থাকে। (দুই) রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্বপ্ন দর্শন তাঁহার গভীর নিদ্রাতে সংঘটিত হইত না, বরং ইহা এমন একটি অবস্থাতে সংঘটিত হইত যাহাকে পুরা নিদ্রাও বলা চলে না বা পূর্ণ সজাগ এমনটিও নহে, এই দুইয়ের মাঝামাঝি এক অবস্থা। ওহীর সূচনার পূর্বাভাষ সম্পর্কীয় আলোচনায় সুস্পষ্ট যে, "সত্য স্বপ্ন দর্শন" (الرؤيا لصالحة في المنام)-এর মাধ্যমে ওহীর সূচনার পূর্বাভাষ হইয়াছিল।
যে সমস্ত স্বপ্ন দর্শনের মাধ্যমে ওহীর নাযিলের পূর্বাভাষ সূচিত হইয়াছিল, কিভাবে উহার সত্যতার প্রতিফলন ঘটিত? কোন জিনিসের প্রতি এবং কেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনাবিল আগ্রহ হইয়াছিল ইত্যাদি প্রসঙ্গে যেসব বিবরণ হাদীছ, তাফসীর এবং সীরাত গ্রন্থগুলিতে বর্ণিত হইয়াছে তন্মধ্যে নিম্নলিখিত বর্ণনা প্রণিধানযোগ্য : উম্মুল মু'মিনীন হযরত আইশা (রা)-এর হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে যে, ওহী নাযিলের পূর্বাভাষ সূচিত হইয়াছিল সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে এবং ঊষার আলোর মতই সত্য হইয়া উহার প্রতিফলন ঘটিত। অর্থাৎ এই সময়ে রাসূলে কারীম (স) যে স্বপ্নই দেখিতেন, তাহা ভোরের উদীয়মান সূর্যের ন্যায় বাস্তবে সংঘটিত হইত। উদীয়মান সূর্যের সহিত সত্য স্বপ্নের যে সূক্ষ্ম উপমা প্রদান করা হইয়াছে, এই প্রসঙ্গে মুহাম্মاد ইদ্রীس কান্ধলাভী তাঁহার "সীরাতুল মুস্তাফা” ১৩০ পৃ.-তে ইব্‌ن ابূ জামরাহ্ হইতে একটি রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন যে, "প্রত্যূষের ক্রমবর্ধিষ্ণু ফর্সা ও উজ্জ্বলতা যেমন উদীয়মান প্রখর সূর্যের ভূমিকাস্বরূপ, তেমনি "সত্য স্বপ্ন” নবুওয়াত ও রিসালাত-এর উদীয়মান সূর্যশিখার ভূমিকাস্বরূপ।
স্বপ্ন দর্শনকালীন নির্জন অবস্থানের প্রতি রাসূলের অনাবিল আগ্রহ সৃষ্টি এবং ক্রমশ নির্জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণ প্রসঙ্গে ইب্‌ن কাছীর তাঁহার তা'রীখে এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, "যখন রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহার জাতিকে গাছপালা-পাথর ইত্যাদির পূজা ও সিজদা করার মত নিকৃষ্টতম ও স্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত দেখিলেন তখন উহা হইতে জাতিকে মুক্ত করিয়া সঠিক পথে পরিচালিত করিবার চিন্তায় মগ্ন হইয়া পড়েন। ফলে ক্রমশ নির্জনতা ও নিসঙ্গতা প্রিয় হইয়া উঠে। ওহীর সূচনার শুভ দিন যতই নিকটে আসিতে লাগিল ততই রাসূলুল্লাহ (س)-এর নির্জনে অবস্থান ক্রমবর্ধিষ্ণু হারে প্রিয় হইয়া উঠিল।" তারীখে আক্কার ওয়া উলূم ইসলামী-তে আরও স্পষ্টভাবে রাসূলের নির্জনপ্রিয়তার কারণ প্রসঙ্গে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, "নির্জনতার প্রতি রাসূলুল্লাহ (س)-এর আকর্ষিত হইবার কারণ ইহাও হইতে পারে যে, "তাহাখ্খুলে ওয়াহয়ি” অর্থাৎ ওহী গ্রহণ করিবার জন্য দরকার ছিল বিশেষ যোগ্যতা। আর এই যোগ্যতা সৃষ্টির মাধ্যম ছিল নির্জন ও নিভৃত স্থানে একাগ্রতার সহিত গভীরভাবে ইবাদতও ক্রমাগত অনুশীলন যেন ইহার গুরুভার বহনের যোগ্যতা সৃষ্টি হয়। যেমন আল্লাহ হযরত মূসা ('আ)-কে রোযা রাখার আদেশ দিয়াছিলেন।" "ফায়দুল বারী" গ্রন্থকার এক চমৎকার ব্যাখ্যা উল্লেখ করিয়াছেন যে, হেরা গুহাতে অবস্থানকারী সকলেই তিন ধরনের 'ইবাদতের সমন্বয় করিতে পারেন। খালওয়াত বা নির্জনতায় অবস্থান, তাআব্বুদ বা কায়মনোবাক্যে 'ইবাদাত করা এবং রু'য়াতু বায়তিল্লাহ্ বা কা'বা শরীফ বারবার দর্শনের সুযোগ লাভ। রাসূলুল্লাহ্ (س) ইহার প্রত্যেকটি 'ইবাদতের অপূর্ব সুযোগ লাভ করিয়াছিলেন। আল-কাستال্লانی নির্জনতার প্রতি রাসূলুল্লাহ (س)-এর অবর্ণনীয় আকর্ষণের কারণ উল্লেখপূর্বক বলিয়াছেন যে, 'যেন রাসূলের অন্তর মুবারকে হিকমাত-এর ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হয়'।
ওহীর সূচনা কখন হইয়াছিল এবং কোন সময়ে, কোন দিনে, কোন মাসে, কাহার কাছে, কত বৎসর বয়সে, কোন জায়গাতে, কোন ভাষাতে, কাহার মাধ্যমে হইয়াছিল ইত্যাদি প্রসঙ্গে আল-কুরআন, আল-হাদীছ, ইহাদের ভাষ্যসমূহে এবং সীরাত গ্রন্থাবলীতে যেসব বিবরণ পাওয়া যায় উহার কিছু আলোচনা পেশ করা হইল:
যখন রাসূলুল্লাহ (س) পরিণত বয়সে পদার্পণ করিলেন তখন আল্লাহ রব্বুল 'আলামীন ওহীর সূচনার মাধ্যমে তাঁহাকে বিশ্বজগতের জন্য সুসংবাদ দানকারী এবং ভীতি প্রদর্শনকারী হিসাবে প্রেরণ করিয়াছিলেন যেন তাহাদিগকে অজ্ঞানতার আঁধার হইতে মুক্ত করিয়া হিদায়াতের পথ দেখাইতে পারেন। ওহীর এই শুভ সূচনা হইয়াছিল ৬১০ খৃ. মোতাবেক ১৭ রামাদান। তিনি চল্লিশ বৎসর বয়সে এবং সোমবারে নবুওয়াত পাইয়াছিলেন, এই প্রসঙ্গে ইব্‌ن হিশام সীরাত-এ ইবন ইসহাক-এর বরাত দিয়া উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (س) চল্লিশ বৎসর বয়সেই নবুওয়াত লাভ করিয়াছিলেন। ইবন 'আব্বাস, জুবায়র ইবন মুত'ঈم, কুবাছ ইব্‌ن আশয়াম, সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব এবং মালিক ইব্‌ن আনাস (রা) প্রমুখ বর্ণনা করিয়াছেন যে, জ্ঞানী ও সীরাত লেখকদের কাছে ইহাই বিশুদ্ধ মত। আল-বাকাই বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (س) বিলাল (রা)-কে বলিয়াছেন, "সোমবারের রোযা খুবই পুণ্যময়, কেননা এই দিনই আমি জন্মগ্রহণ করিয়াছি, এই দিনই নবুওয়াত লাভ করিয়াছি এবং এই দিনই আমার মৃত্যু হইবে"। সোমবারে ওহীর সূচনা প্রসঙ্গে কাতাদা (র) হইতে একইরূপ একটি হাদীছ ইমাম মুসলিম (র) সংকলন করিয়াছেন। মুহাম্মاد ریদা এই প্রসঙ্গে বলিয়াছেন, “৪১তম বৎসরে পদার্পণ করিলে হযরত জিবراঈل (আ) নবুওয়াত-এর সুসংবাদ সম্বলিত প্রথম ওহী নিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। চান্দ্রমাসের হিসাবানুযায়ী রাসূলুল্লাহ (س)-এর জীবনে প্রথম ওহীর সূচনা হইয়াছিল ৪০ বৎসর ৬ মাস ৮ দিনে অর্থাৎ ৬১০ খৃ.-এর ৬ আগস্ট।
ভিন্নমত পোষণ করিয়া ইমাম আহমاد (র) ওয়াসিলা ইব্‌নু’ل اسکا’-এর সনদে উল্লেখ করিয়াছেন, “ইব্রাহীم (‘আ)-এর সহীফাসমূহ রামাদান-এর প্রথম রজনীতে, তাওরাত ষষ্ঠ রামাদান অতিবাহিত হইবার পর, ইন্জীল তেরই রামাদানে এবং আল-কুরআন নাযিল হইয়াছে চব্বিশ রামাদান-এ”। এইজন্য সাহাবা ও তাবিঈনের অনেকেই চব্বিশ রামাদান-এ লায়লাতু’ল-কদ্‌ر বা মহা-মহিমান্বিত রাত্র হইয়া থাকে, এইমত পোষণ করিয়া থাকেন। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ, নির্ভরযোগ্য ও যথার্থ মত অনুসারে রমযান মাসের “লায়লাতুল কদ্‌ر”-এর অতীব বরকতময় মহিমান্বিত রজনীতে কুরআন মজীদ নাযিল হইয়াছে। এই সম্পর্কে কুরআন মজীদের তিন জায়গায় স্পষ্ট বক্তব্য বিদ্যমান। মহান আল্লাহ বলেন: شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَتِ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ. “রমযান মাস, ইহাতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে আল-কুরআন নাযিল হইয়াছে” (২: ১৮৫)।
উপরন্তু প্রতি রমযান মাসে প্রতি রাত্রে মহানবী (স) জিবরাঈল (আ)-কে কুরআন (যতখানি নাযিল হইয়াছে) পড়িয়া শুনাইতেন।
কুরআন মজীদ এক বরকতময় রাত্রে নাযিল হইয়াছে। এই সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন: إِنَّا أَنْزَلْتُهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَرَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ أَمْرًا مِّنْ عِنْدِنَا . “নিশ্চয় আমি ইহা (আল-কুরআন) নাযিল করিয়াছি এক বরকতময় রাত্রে। নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। এই রাত্রে প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয় আমার আদেশক্রমে” (৪৪: ৩-৫)।
উপরিউক্ত আয়াত হইতে বুঝা যায়, যে রাত্রে এই কুরআন মজীদ নাযিলের সূচনা হয় সেই রাত্র বড়ই কল্যাণময়, প্রাচুর্যময় ও বরকতপূর্ণ এবং সেই রাত্রে আল্লাহর নির্দেশে প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থিরীকৃত হয়। এখানে সেই বরকতময় রজনী কোনটি তাহা নির্দিষ্টভাবে না বলা হইলেও অপর এক সূরায় তাহা স্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে। إِنَّا أَنْزَلْتُهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ. وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ. لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ. تَنَزُّلُ الْمَلْئِكَةُ وَالرُّوحُ فِيْهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ سَلْمٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ. “নিশ্চয় আমি ইহা (আল-কুরআন) মহিমান্বিত রজনীতে নাযিল করিয়াছি। আর মহিমান্বিত রজনী সম্পর্কে তুমি কি জান? মহিমান্বিত রজনী সহস্র মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সেই রজনীতে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিবরাঈল) অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাহাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সেই রজনী ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত” (৯৭: ১-৫)।
কুরআন মজীদে লায়লাতুল কদর (কদরের রাত্রি) ব্যতীত অন্য কোনও রাত্রির এত অধিক ফযীলাত বর্ণিত হয় নাই (কদর শব্দের অর্থ ভাগ্য ও মর্যাদা উভয়ই)। সুতরাং সূরা ৪৪: ৩-৫ আয়াতে যে "বরকতময় রজনীর" কথা বলা হইয়াছে উহাকে ৯৭: ১-৫ আয়াতে নির্দিষ্ট করিয়া বলিয়া দেওয়া হইয়াছে যে, তাহা "লায়লাতুল কদর"। কেননা এই রাত্রের (ইবাদত-বন্দেগীসহ সমস্ত সৎকর্মের) কল্যাণ ও বরকত হাজার মাসের কল্যাণ ও বরকতের চাইতেও অধিক।
কোন রাতটি লায়লাতুল কদর এই সম্পর্কে মহানবী (স) বলেন: تَحَرُّوا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ. "তোমরা রমযান মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিসমূহে লায়লাতুল কদর অনুসন্ধান কর” (বুখারী, সাওম, বাব তাহাররী লায়লাতিল কাদ্র, নং ২০১৭; মুসলিম, সিয়াম, বাব ফাদলি লায়লাতিল কাদ্র, নং ২৭৭৬/২১৯; মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, সাওম, বাব লায়লাতিল কাদ্র; মুসনাদে আহমاد, ৬খ, পৃ. ৫৬, রিয়اد সং পৃ. ১৮১৯, নং ২৪৭৯৬, আরও দ্র. ২৪৭৩৭)।
অপর হাদীছে রমযানের শেষ সাত দিনের বেজোড় রাত্রিতে 'লায়লাতুল কদর' অনুসন্ধানের কথা বলা হইয়াছে।
অপর মত অনুযায়ী লায়লাতুল কদর রমযান মাসের ২৭ তারিখ (অর্থাৎ ২৬ তারিখ দিবাগত রাত্র)। যেমন: عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ أَبِي سُفْيَانَ عَنِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ قَالَ لَيْلَةُ الْقَدْرِ لَيْلَةُ سَبْعِ وَعِشْرِينَ. "মুআবিয়া ইব্‌ন ابূ সুফ্যান (রা) হইতে বর্ণিত। মহানবী (স) লায়লাতুল কদর সম্পর্কে বলেন: লায়লাতুল কদর হইল (রমযান মাসের) ২৭ তারিখের রাত্র” (ابূ دাউد, সালাত, নং ১৩۸৬; আরও দ্র. মুসনাদে আহমاد, ۵خ, পৃ. ۱۳۰, رিয়اد সং পৃ. ۱۵۵۷, নং ۲۱۵۰۹, আরও দ্র. নং ۲۱۵۲۸-۳۰, عبায়্যি ইব্‌ن کaব (রা) কর্তৃক বর্ণিত, আরও দ্র. মুসলিম, সিয়াম, নং ۲۷۶۳/۲۰۷, ইب্‌ن عمر (রা) কর্তৃক বর্ণিত)।
কুরআন মজীদ নাযিলের দিনটি সোমবার। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিল: يَا رَسُولَ اللهِ أَرَأَيْتَ صَوْمَ يَوْمِ الْاثْنَيْنِ وَيَوْمِ الخَمِيسِ قَالَ فِيْهِ وَلِدْتُ وَفِيْهِ أُنْزِلَ عَلَى القرآن. "ইয়া রাসূলাল্লাহ! সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোযা সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? তিনি বলেন: ঐ দিন আমি জন্মগ্রহণ করিয়াছি এবং ঐ দিনে আমার উপর আল-কুরআন নাযিল হইয়াছে'। উক্ত হাদীছে 'ঐ দিন' বলিতে সোমবার বুঝান হইয়াছে। কেননা সহীহ মুসলিমে স্পষ্টভাবে সোমবারের কথা উল্লেখ আছে। উপরন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর সোমবার জন্মগ্রহণের অভিমতটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। অতএব নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, কুরআন মজীদ সর্বপ্রথম রমযান মাসের লায়লাতুল কদরে সোমবার রাত্রে নাযিল হয়। এই রাত্রিটি ২৭ রমযানও হইতে পারে অথবা রমযানের শেষ দশকের যে কোন বেজোড় রাত্রিও হইতে পারে। কতক বিশেষজ্ঞ আলেম "লায়লাতু আল-কাদر" বাক্যাংশ প্রসঙ্গে বলিয়াছেন, উহা সংশ্লিষ্ট সূরায় তিনবার উক্ত হইয়াছে। তিনবারে উহার হরফসংখ্যা দাঁড়ায় ২৭ (সাতাশ = ৯০৩)। অতএব লায়লাতুল কদর হইল ২৭ রমযান।
কোন ভাষাতে ওহীর সূচনা হইয়াছিল, এই প্রসঙ্গে "আস্-সুয়ূতী" ইব্‌ন ابی হাতিم-এর সনদে সুফ্যান আছ-ছাওরী হইতে একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন, "আল্লাহ্ পাক রব্বুল 'আলামীন-এর পক্ষ হইতে সমস্ত ওহী 'আরবী ভাষাতেই নাযিল হইয়াছে। অতঃপর সমস্ত নবীই জাতির কাছে ইহার ভাষান্তরিত করিয়া দিয়াছেন।" ওহীর ভাষা ছিল 'আরবী'।
ওহীর সূচনার স্থান প্রসঙ্গে "রাসূলে রহমত"-এ উল্লেখ করা হইয়াছে যে, হেরা গুহাতে ওহীর সূচনা হইয়াছিল, যাহার উচ্চতা ৪ গজ এবং প্রশস্ততা পৌণে দুই গজ। ইহা মক্কার তিন মাইল দূরে অবস্থিত একটি পর্বত যাহার চূড়াতে চক্রাকারে ঘুরিয়া উঠিতে হয়। বর্তমানে ইহাকে "জাবালে নূর” বলা হইয়া থাকে। "হারাম শরীফ হইতে হেরা পর্বতের দূরত্ব আড়াই থেকে তিন মাইল। ইহার উচ্চতা প্রায় দুই হাজার ফুটের মত হইবে।
ওহীর সূচনা জাগ্রত অবস্থায় হইয়াছিল না ঘুমন্ত অবস্থায় এই প্রসঙ্গে দুই ধরনের রিওয়ায়াত লক্ষ্য করা যায়। ইব্‌ন হিশাম-এর "সীরাত”-এ ওহীর সূচনা ঘুমন্ত অবস্থায় হইয়াছিল, এই মর্মে একটি রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, যখন জিব্রাঈل 'আলায়হিস সালাম আমার কাছে ওহী লইয়া আসিলেন, তখন আমি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম। তিনি এক খণ্ড রেশমী বস্ত্রসহ আগমন করিলেন যাহাতে কিছু বাণী লিখিত ছিল। তারপর তিনি বলিলেন, পড়ুন। উত্তরে বলিলাম, আমি পড়িতে পারি না।
সহীহ বুখারী, মুসলিম ও অপরাপর হাদীছ গ্রন্থাবলীতে যেসমস্ত রিওয়ায়াত আসিয়াছে উহাতে সুস্পষ্ট যে, ওহীর সূচনা জাগ্রত অবস্থায় হইয়াছিল। কেননা উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা) বর্ণিত হাদীছে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে যখন হযরত জিব্রাঈল ('আ) সূরা ইকরা' লইয়া আসিলেন তখন তিনি জাগ্রত অবস্থায় ছিলেন। কেননা হাদীছের শুরুতে বলা হইয়াছে, "সত্য স্বপ্নের দ্বারা ওহীর নাযিলের পূর্বাভাষ সূচিত হইয়াছিল। এই সময়ে তিনি যে স্বপ্নই দেখিতেন উহা ঊষার আলোর মতই সত্য হইয়া দেখা দিত। ইহার পরে আল্লাহ তাঁহাকে নির্জনতার প্রতি আকৃষ্ট করিয়াছিলেন। অবশেষে তাঁহার কাছে যখন সত্যবাণী আসিয়া উপস্থিত হইল তখন তিনি হেরা গুহাতে জাগ্রত অবস্থায় ছিলেন।" আস্-সুহায়লী 'রাওদুল উনুফ'-এ সূদীর্ঘ আলোচনা পর্যালোচনার পর যে সারমর্ম উদঘাটন করিয়াছেন, তাহা হইল, "সর্বপ্রথম নবুওয়াতের সুখবর রাত্রিবেলায় স্বপ্নযোগে আসে। অতঃপর জাগ্রত অবস্থায় কুরআন নাযিলের শুভ সূচনা হয়"।
ওহীর সূচনার প্রাথমিক পর্যায়ের দায়িত্ব কাহার উপর ন্যস্ত হইয়াছিল, এই প্রসঙ্গীয় বিবরণ বিভিন্ন হাদীছের ভাষ্যে এবং মুহাম্মাদ মুস্তাফা (স)-এর জীবনী গ্রন্থসমূহে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে: বুখারী শরীফের প্রসিদ্ধ ভাষ্যকার আল্লামা 'আয়নী (র) মুস্লাদ আহমাদ-এর বিশুদ্ধ সনদে আশ্-শা'বী হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, "রাসূলুল্লাহ (স) চল্লিশ বৎসর বয়সে নবুওয়াত প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। নবুওয়াতের সূচনার প্রাথমিক পর্যায়ের তিন বৎসর যাবৎ হযরত ইস্রাফীল ('আ)-এর উপর দায়িত্ব প্রদান করা হইয়াছিল। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে আল-কুরআন ব্যতীত বিভিন্ন মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় বাণী শিক্ষা দিতেন। দীর্ঘ তিন বৎসর অতিবাহিত হইবার পর হযরত জিব্রাঈল (আ) নবুওয়াত পৌঁছানোর দায়িত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।" প্রায় একইরূপ বর্ণনা "সীরাত মুহাম্মদিয়্যা"- সংকলন করা হইয়াছে।
হযরত ইস্রাফীল ('আ)-কে প্রাথমিক পর্যায়ের দায়িত্ব প্রদানের রহস্য প্রসঙ্গে ইব্‌ن 'আসাকির বলিয়াছেন, "হযরত ইস্রাফীল (আ)-কে শিঙ্গা ফুঁকিবার দায়িত্ব প্রদান করা হইয়াছে, যাহার ফলে সমগ্র সৃষ্টিজগৎ একদিন ধ্বংস হইয়া যাইবে এবং কিয়ামত সংঘটিত হইবে। আর রাসূলুল্লাহ (س)-এর উপর নবুওয়াতের সূচনা এবং ওহী নাযিলের চিরসমাপ্তি সমগ্র সৃষ্টিজগৎ নিশ্চিহ্ন হওয়া এবং কিয়ামত সংঘটিত হইবার পূর্বের এক মহাঘোষণার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে।" হযরত জিবরাঈল হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর নিকাট ওহী পৌছাইয়া দিতেন। তিনি অন্যদের নিকটও দৃষ্টিগোচর হইতেন।
ওহী নাযিল হওয়ার পূর্বেই আল্লাহ্ রব্বুল 'আলামীন রাসূলুল্লাহ্ (س)-কে যথাযোগ্য যোগ্যতা দান করিয়াছিলেন। এই প্রসঙ্গে "সীরাত তায়্যিবা"-তে বর্ণিত হইয়াছে যে, "মহামহিমান্বিত প্রতিপালক কর্তৃক নির্বাচিত বিশেষ ব্যক্তিদের মধ্য হইতে যাহাদেরকে নবুওয়াত দিয়া সম্মানিত করা হয়, তাহাদিগকে অসংখ্য বৈশিষ্ট্যসহ ওহী গ্রহণের বিশেষ যোগ্যতা দান করা হইয়া থাকে। জিব্রাঈل ('আ)-কে প্রেরণের দ্বারা আল্লাহ মুহাম্মاد (س)-এর অন্তর মুবারকে ওহী গ্রহণের নৈসর্গিক শক্তি সৃষ্টি ও তাহা স্থায়ী করিয়াছিলেন, অনুরূপভাবে তাঁহার জিহ্বাতেও এই স্বর্গীয় শক্তির সঞ্চার করিয়া দিয়াছিলেন। ফলে জিব্রাঈل ('আ)-এর সাথে ওহীর উচ্চারণ সহজ হইয়াছিল, যাহার প্রমাণ আমরা উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা)-এর হাদীছে এইভাবে পাই, ما انا بقارئي )"আমি পড়িতে পারি না")।
ওহীর সূচনাতে জিব্রাঈل ('আ) রাসূলুল্লাহ্ (س)-কে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিয়া বাহুবেষ্টনে চাপ এইজন্য দিয়াছিলেন যেন নাযিলকৃত ওহী তাঁহার অন্তরের গভীরে উৎক্ষেপিত হইয়া যায় এবং ফেরেস্তার বিশেষ নৈকট্য লাভ করিতে পারেন। ইহা দ্বারা পারস্পরিক সম্পর্ক গাঢ় ও স্থায়ী হয়। তাহা ছাড়া শিক্ষকের অধিকার রহিয়াছে শিক্ষার্থীর উপর। তিন তিনবার আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিয়া বাহুবেষ্টনে সজোরে চাপ প্রদানের এক চমৎকার ব্যাখ্যা আস্-সুহায়লী এইভাবে প্রদান করিয়াছেন যে, "তিন-তিনবার চাপ প্রয়োগে জড়াইয়া ধরা, ইহা এইদিকে ইশারা প্রদান করা হইয়াছে যে, মুহাম্মاد (س)-এর জীবনে তিন-তিনবার কঠিন থেকে কঠিনতম পরীক্ষা আসিবে এবং ইহার পরে মুক্ত জীবনের শুভ সূচনা হইবে। প্রথমটি ছিল কুরায়শ কর্তৃক প্রায় তিন বৎসরের নির্বাসিত জীবনযাপন, দ্বিতীয়টি ছিল তাঁহাকে চিরতরে দুনিয়া হইতে বিদায় দেওয়ার জন্য তাহাদের ষড়যন্ত্র এবং তৃতীয়টি ছিল তাঁহাকে প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগে বাধ্য করা। ইহার পরে মুক্ত জীবনের শুভ অধ্যায়ের সূচনা হয়।"
ওহীর সূচনা আল-কুরআনের কোন আয়াত দ্বারা হইয়াছিল, এই প্রসঙ্গে মুহাম্মাদ রিদা উল্লেখ করিয়াছেন যে, “রাসূলুল্লাহ্ (س)-এর উপর ওহীর সূচনা হইয়াছিল إقرأ باسم ربك الذي خلق )"আপনি পড়ুন মহান প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন") আয়াতের দ্বারা, যাহা উম্মুল মুমিনীন হযরত 'আইশা (রা)-এর বিশুদ্ধ বর্ণনায় আসিয়াছে। ইমাম নববী (র) বলিয়াছেন, ইহাই বিশুদ্ধতর মত যাহাতে অধিকাংশ বিজ্ঞ 'আলেম ঐক্যমতে পৌঁছিয়াছেন। কোন কোন রিওয়ায়াতে আসিয়াছে, জিবরাঈل ('আ) অলংকার খচিত একটি রেশমী সহীফা রাসূলুল্লাহ (س)-এর হাতে দিয়াছিলেন যাহাতে সূরা 'আলাকের উক্ত আয়াতগুলি লিপিবদ্ধ ছিল। আল-বালাযুরীর বর্ণনামতে, উযু এবং সালাত-এর পদ্ধতিও জিবরাঈল (আ) মহানবী (س)-কে সেই সময়ই শিক্ষা দিয়াছিলেন।

টিকাঃ
১. মুস্লিম, ফাদাইল অধ্যায়, বাব ফাদলু নাসাবিন্ নাবিয়্যি।
২. মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, রাসূলে রহমত, শিরো, যামানায়ে কুরবে বি'ছাত।
৩. মুহাম্মদ আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী, ফায়দুল-বারী, ১খ., পৃ. ২৪।
৪. ইব্‌ন হিশাম, সীরাত, ১খ, পৃ. ২৪৩, ২৪৪।
৫. মুহাম্মাদ সায়্যিদ কালীনী, 'আয়নুল ইয়াকীন ফী সায়্যিদিল-মুরসালীন, ১১, শিরো, مبعث النبي صلى الله عليه وسلم।
৬. শিবলী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন্ নবী, ১খ, পৃ. ১২৫।
৭. মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (স), পৃ. ৫৯, শিরো. بدء الوحى।
৮. সায়্যিদ আবুল হাসান 'আলী নাদবী, নাবিয়্যে রাহমাত, ১খ, ১১৬।
৯. ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান্‌-নিহায়া, পৃ. ৬, শিরো. عمره صلى الله عليه وسلم وقت بعثته هو تأريخها।
১০. বুখারী, আওয়ালু মা বুদিআ বিহিল-ওয়াহহিয়, বাব, ৩; তু. মুসলিম, ঈমান, পৃ. ২৬৩, ২৫৪।
১১. ইবন জারীর তাবারী, তাফসীর, ৩০: ১৩৮; ইবন সা'দ, তাবাকাত, ১/১খ, ১২৯; অনুরূপ নির্দেশের জন্য দ্র. ড. 'আবদুল-ফাত্তাহ্ ইব্রাহীম, হাওলাল্ ওহী, মাজাল্লাতুল জামি'আতি'ل ইস্লামিয়্যা, মদীনা মুনাওয়ারা, সংখ্যা ৪৫, ১৪০০ হি., ৪৪ পৃ., শিরো, الرؤيا الصادقة তু. উর্দু দাইরা মা'আরিف ইসলামিয়্যা, ২২খ., পৃ. ৬২১, শিরো. وحی محمدی کا آغاز و تسلسل ; ইব্‌ن হিশাম, সীরাত, ১খ., পৃ. ২৪۰, ২৪۱।
১২. মুহাম্মাদ ইদ্রীস কান্ধলভী, সীরাতুল-মুস্তাফা, ১২۸, শিরো. بدء الوحى تباشير نبوة।
১৩. বুখারী, তা'বীর অধ্যায়, বাব আর-রু'য়া আস-সালিহা; অনুরূপ নির্দেশের জন্য দ্র. ইب্‌ন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আদ, ১খ., ৩৩. শিরো. افی مبعثه صلى الله عليه وسلم।
১৪. ইবন হাজার 'আস্কালানী, ফাতহুল বারী, ১খ., ৯পৃ., اول أحوال النبيين।
১৫. মান্নাউল কাত্তান, মাবাহিছ ফী 'উলূমিল কুরআন, ৩৮, শিরো. الرؤيا الصالحة في المنام।
১৬. আল-কاسতাল্লانی, ইরশাদুস্ সারী লি-শারহি সাহীহিল-বুখারী, পৃ. ৬২।
১৭. মুহাম্মাদ আল-খিদরী, নূরুল য়াকীন ফী সীরাতি سায়্যিদিল মুরসালীন, পৃ. ৩৫, শিরো بدء الوحى।
১৮. ইব্‌ن হিশام, সীরাত, ১খ., পৃ. ২৪۰, ১নং টীকা।
১৯. ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া, পৃ. ৭ শিরা عمره صلى الله عليه وسلم وقت بعثته وتأريخها।
২০. আল-কاسতাল্লانی, ইরশাদুস্ সারী লি'শারহি সাহীহিল বুখারী, পৃ. ৬৩।
২১. মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ্, পৃ. ৫৯, শিরো. بدء الوحى।
২২. হাসানুদ্দীন আহমاد, আহসানুল বায়ান ফী উলূميل কুরআন, পৃ. ১৮।
২৩. কাযী সুলায়মান মানসূরপুরী, রাহমাতুল্লিল আলামীন, ১খ., পৃ. ৪২-৪৩।
২৪. আয-যাহাবী, আস্-সীরাতুন্-নাবাবিয়্যা, পৃ.৭।
২৫. হিফজুর রহমান সীওয়াহারবী, কাসাসুল্ কুরআন, ৪খ., ২৫৪।
২৬. ইব্‌ن কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ২৪২-২৪৩।
২৭. ইবনুল্-জাওযী, আল্-ওয়াফা বি-আহ্ওয়ালিল্-মুস্তাফা, ১খ., পৃ. ৯১।
২৮. মুহাম্মাদ ইদ্রীس কান্ধালবী, ১৯৮১ খৃ., ১খ., পৃ. ২৫৪, পাদটীকা ১।
২৯. ইব্‌ন সা'দ তাবাকাত, ১খ., ১০০; আম্-যাহাবী, আস্-সীরাতুন্-নাবাবিয়্যা, পৃ. ৭।
৩০. ইب্‌ن কাছীর, আল্-বিদায়া, ১/২খ., পৃ. ২৪২।
৩১. ড. আকরাম যিয়াউল্-উمরী, আস্-سীরাতুন্-নাবাবিয়্যা আস্-সাহীহা, ১খ., পৃ. ৯۸।
৩২. ইب্‌ن কাছীর, আল-বিদায়া, ১/২খ., পৃ. ২৪۲।
৩৩. ইب্‌ن আব্বাস (র) ও জাবির (রা)-এর রিওয়ায়াত ইب্‌ن ابূ শায়বা তাঁহার 'আল-মুসান্নাফ' গ্রন্থে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ (س) ১৮ রাবী'উল-আওয়াল সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। তবে কোন কোন ঐতিহাসিক ১৭ এবং ২২ রাবী 'উল-আওয়াল উল্লেখ করিয়াছেন (অনুরূপ বর্ণনার জন্য দ্র. ইب্‌ن কাছীর, আল-বিদায়া, পৃ. ১/২খ., ২৪۲-২৪۳)।
৩৪. মুহাম্মاد ইب্‌ن یূসুف আস্-সালিহী আশ-শামী, সুবুলুল্-হুদা ওয়ার্-রাশাদ ফী سীরাতি খায়রिल্-ইবাদ, ১খ., ৩৩৩।
৩৫. মুহাম্মاد ইদ্রীস কান্ধালাবী, সীরাতুল্-মুস্তাফা, পৃ. ৫১, পাদটীকা ৩; দা. মা. ই., ১৯ খ., পৃ. ১২।
৩৬. মুহাম্মাদ ইদ্রীس কান্ধালবী (র) উল্লেখ করিয়াছেন, "যদিও এই রিওয়ায়াতটি সনদের দিক দিয়া দুর্বল, তবুও ইহা দ্বারা অন্যান্য সকল বর্ণনার মধ্যে অসামঞ্জস্যতা দূর করা সম্ভব। কেননা কোন কোন রিওয়ায়াত দ্বারা বুঝা যায়, রাসূলুল্লাহ (س)-এর শুভ-জন্ম দিনের বেলায় হইয়াছিল। অপরাপর বর্ণনা হইতে জানা যায়, তিনি (স) রাত্রি বেলায় ভূমিষ্ঠ হন। যদি কেহ এই দাবি করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) সুবহে সাদিক-এর সময় জন্মগ্রহণ করেন তবে ইহা অত্যুক্তি হইবে না। সুতরাং যে সমস্ত রিওয়ায়াত-এ সোমবার দিন অথবা সোমবার রাত-এ ভূমিষ্ঠ হওয়ার বর্ণনা উল্লিখিত হইয়াছে, উভয় রিওয়ায়াত-ই সহীহ। আর যে সমস্ত বর্ণনায় সুব্‌হ সাদিক-এর উল্লেখ রহিয়াছে উহার মর্মার্থ ইহাও হইতে পারে যে, রাত্রেই জন্মগ্রহণের সকল লক্ষণ ও চিহ্ন প্রকাশ পাইয়াছিল (মুহাম্মاد ইদ্রীس কান্ধালবী, সীরাতুল্-মুস্তাফা, পৃ. ৫১-৫২)। ইب্‌ন হিব্বান মা'রূফ ইন হায্যাবুয সম্পর্কে বলিয়াছেন, "তিনি একজন নির্ভরযোগ্য রাবী।" এই প্রসঙ্গে ابূ হাতেম বলিয়াছেন, "ইب্‌ن হায্যাবুষ-এর হাদীছ গ্রহণ করা যায়" (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৫২)।
৩৭. ইب্‌ن کایم আল-জাওযিয়্যা, যাদুল-মা'আد, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ১৭।
৩৮. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৫৫; অনুরূপ বর্ণনার জন্য দ্র. ইবনুল জাওযী, আল-ওয়াফা বিআর্গুয়ালিল্ মুস্তাফা, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৯০।
৩৯. মুহাম্মাদ আল-খিদরী, নূরুল-য়াকীন ফী سীরাতি سায়্যিদিল মুরসালীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬।
৪০. ইব্‌ن হিশام, আস্-সীরাতুন্ নাবابিয়্যা, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ১৬۵, টীকা নং-২।
৪১. আবদুর রউف দানাপূরীর আসাহ্হুস-সিয়ার গ্রন্থে বর্ণিত (পৃ. ৬) আছে যে, তিনি বায়তুল্লাহ্র অভ্যন্তরে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু ইহা প্রমাণিত নহে।
৪২. ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ২৬۵।
৪৩. ইবনুল জাওযী, আল-ওয়াফা বিআহ্ওয়ালিল মুস্তাফা, ১খ., ৯۱।
৪৪. ইب্‌ن কাছীর, আস্-সীরাতুন্- নাবابિય্যা, ১খ., পৃ. ২০۸-۲۰۹।
৪৫. ইب্‌ن کایم আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আদ, ১খ., ۱۸, ۱۹।
৪৬. ইب্‌ن কাছীর, আস্-সীরাতুন্- নাবابિય্যা, ১খ. পৃ. ۲۱۲।
৪৭. ইب্‌ن কাছীর, আল-বিদায়া, ২খ, পৃ. ۲۴۸।
৪৮. ইব্‌ন কাছীর, আস্-সীরাতুন্-نাবابিয়্যা, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ۲۱۲-২১৩ অনুরূপ বর্ণনার জন্য দ্র. ইবন হাজার 'আস্কালানী, فাতুহুল-বারী, দারুল-ما'রিফা, বৈরূত, তা. বি., ۶خ, পৃ. ۵۸۳।
৪৯. ইবন হাজার 'আসকালানীর فাতهুল বারীতে এই প্রসঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (س)-এর জন্মগ্রহণকালীন সময়ে পারস্যের রাজপ্রাসাদে ফাটل দেখা দেয় ও উহার গম্বুজ ভূমিতে ধ্বসিয়া পড়ে, পারসিকদের মন্দিরের অগ্নি নির্বাপিত হইয়া যায় যাহা ইহার পূর্বে হাজার বৎসরে নির্বাপিত হয় নাই এবং ساওয়া নদী শুকাইয়া যায় (ইবন হাজার 'আসকালানী, فাতহুল-বারী, دارال-ما'রিফা, বৈরূত, তা.বি., ۶خ., পৃ. ۵۸۴ অনুরূপ বর্ণনার জন্য দ্র. ইবন কাছীর, আস-سীরাতুন-نাবابিয়্যা, প্রাগুক্ত, ১خ., ২১۵; ইবনুল জাওযী, আল-ওয়াফা বিআহ্ওয়ালিল্- موستাফا, ১خ, পৃ. ۹۷-۹۸)।
৫০. মুহাম্মاد ইদ্রীس কান্ধলাবী, سীরাতুল-موستافا, রব্বানী বুক ডিপো দিল্লী, ۱۹۸۱ خৃ., ۱خ, পৃ. ۵۵-۵۷; আরো বিস্তারিত বর্ণনার জন্য দ্র. ইب্‌ن سায়্যিদিন নাস, উয়ূনুল আছার, ১خ., পৃ. ۲۹; ইবন কাছীর, আস-سীরাতুন নাবابিয়্যা, প্রাগুক্ত, ১خ., পৃ. ۲۱۵-۲۱۸)।
৫১. ইবন হাজার 'আসকালানী فاتحুল বারীতে তাবারানীর উদ্ধৃতি উল্লেখপূর্বক উছমান ইবন ابیل-আস (রা)-এর রিওয়ায়াত এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন, আমার মা আমার কাছে উল্লেখ করিয়াছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (س)-এর জন্মগ্রহণকালীন মুহূর্তে سায়্যিদা আমিনা-এর কাছে উপস্থিত ছিলেন এবং ঘরের প্রতিটি জিনিসে নূর আর নূর দেখিতে পাইয়াছিলেন। আকাশের নক্ষত্রগুলির প্রতি দৃষ্টিপাত করিতেই মনে হইতেছিল, ঐগুলি যেন আমার কোলেই ঝুঁকিয়া পড়িতেছে। سায়্যিদা আমিনা তাঁহাকে প্রসব করিতেই তাঁহার উদর হইতে এমন এক নূর বা জ্যোতি বিচ্ছুরিত হইয়াছিল, যাহাতে সম্পূর্ণ ঘর আলোকিত হইয়াছিল। ফলে চতুর্দিকে আমি নূর আর নূর দেখিতে পাইলাম (ইবন হাজার আস্কালানী, فাল্গুল বারী, দারুল ما'রিফা, বৈরূত, তা. বি., ۶خ., পৃ. ۵۸۳; আস্-سوয়ূতী, খাসাইসুল-قوبرا, دارال کتبিল ইলমিয়্যা, বৈরূত, তা, বি, ۱خ, পৃ. ۴۵)।
৫২. ইব্‌ن কাছীর سীরাত গ্রন্থে আবদুর রহমান ইবন 'আওف (রা)-এর মাতা شیفا বিনت 'আমর ইবন 'আওف (রা) হইতে উল্লিখিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট এমন নূর বা জ্যোতি প্রকাশিত হয় যাহা দ্বারা রোম সাম্রাজ্যের প্রাসাদসমূহ আলোকিত হইয়াছিল (ইب্‌ন কাছীর, আস্-سীরাতুন নাবাবিয়্যা, প্রাগুক্ত, ১خ., পৃ. ۲۰۶-۷)।
৫৩. ইব্‌ن কাছীর ও ইব্‌ن হিশাম উভয়ে তাঁহাদের سীরাت গ্রন্থে মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের উদ্ধৃতিতে হাসান ইবন ছাবিত-এর রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, তিনি বলিয়াছেন, আমি সাত অথবা আট বৎসরের বালক ছিলাম, যাহা কিছুই শুনিতাম এবং দেখিতাম ভালভাবেই বুঝিতাম। একদিন সকালে একজন ইয়াহূদী পণ্ডিত খুব জোরে চিৎকার দিয়া বলিলেন, হে কুরায়ش সম্প্রদায়। ফলে সকলেই তাহার কাছে সমবেত হইয়া বলিলেন, তোমার কি হইয়াছে আর তুমি কেনই با আমাদেরকে ডাকিয়াছ? রাবী বলিয়াছেন, এই কথা আমি তাহাকে বলিতে শুনিয়াছি যে, "এইমাত্র 'আহমاد' নামীয় তারকা উদিত হইয়াছে যিনি আজ রাত্রেই জন্মগ্রহণ করিয়াছেন" (ইب্‌ن কাছীর, আস্-سীরাতুন-نাবابিয়্যা, ১خ., পৃ. ۲۱۳)। ابূ নুআয়م "داলাইلুন-نبوওওয়া”-এর উদ্ধৃতি উল্লেখপূর্বক এবং ইب্‌ن কাছীর তাঁহার سীরাت-এ 'আবদুর রহমান ইب্‌ن ابی সা'ঈদ-এর পিতা হইতে একটি রিওয়ায়াত এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলিয়াছেন, আমি ابূ মালিক ইب্‌ن সিনان-কে বলিতে শুনিয়াছি, একদিন আমি বনূ 'আবদুল আশহال-এর কাছে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য আগমন করিলাম। কেননা আমাদের মাঝে ঐ দিনগুলিতে যুদ্ধ না হওয়ার সন্ধি ছিল। সেখানে ইয়াহূদী পণ্ডিত یূশা'-কে বলিতে শুনিয়াছি যে, "ال-هارাম" (মক্কা) হইতে একজন নবীর প্রকাশ হইয়াছে।” অতঃপর আশহال গোত্রের খলীফা ইب্‌ن ছা'লাبا তাহাকে ঠাট্টার ছলে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, তাঁহার "سیفات" বা বৈশিষ্ট্যগুলি কি কি? তিনি উত্তর করিলেন, তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি খুবই খাট বা লম্বা নহেন, উভয় নয়ন কিছুটা লালবর্ণ, তিনি পাগড়ী পরিধান করিবেন, গাধায় চড়িবেন, তাঁহার তরবারি থাকিবে উন্মুক্ত এবং এই শহর (ইয়াছریb) হইবে তাঁহার হিজরতের স্থান। রাবী ابূ মালিক ইب্‌ن সিনান বলিয়াছেন, আমি ইয়াহূদী পণ্ডিতের কথায় খুবই আশ্চর্যন্বিত হইয়া আমার کaoম بনী খুদ্রا-এর নিকট হাজির হইয়া তাহাদের একজনকে বলিতে শুনিলাম, শুধু ইয়াহূদী পণ্ডিত یূশা'-ই অনুরূপ কথা বলিয়াছেন? বরং ইয়াছریbের সকল ইয়াহূদী পণ্ডিতই এই প্রসঙ্গে বলিয়াছেন (ইب্‌ن কাছীর, আস-سীরাতুন-নাবابিয়্যা, ১خ., পৃ. ۲۱۳-۱۴)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00