📄 নুবওয়াত লাভের পূর্বে নবীগণের অবস্থা
নুবওয়াত লাভের পূর্বে নবীগণের অবস্থা
আল-কুরআন হইতে জানা যায় যে, ওহী আসিবার পূর্বে নবীগণের 'ইল্ম সাধারণ মানুষের ইল্ম হইতে ভিন্নতর হয় না। সাধারণের মত তাঁহাদের নিকট ইল্ম আসিবার অন্য কোন মাধ্যমও থাকে না। ইরশাদ হইয়াছেঃ
مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيْمَانُ (الشورى - ٥٢ ) .
"তুমি তো জানিতে না কিতাব কি এবং ঈমান কি" (৪২ঃ ৫২)?
وَوَجَدَكَ ضَالاً فَهَدَى (الضحى (۷).
"তিনি তোমাকে পাইলেন পথ সম্পর্কে অনবহিত, অতঃপর তিনি পথের নির্দেশ দিলেন” (৯৩ঃ ৭)।
এতদসঙ্গে আল-কুরআন হইতে আমরা ইহাও অবগত হই যে, নবুওয়াত লাভের পূর্বে নবীগণ সাধারণের 'ইল্ম ও মারিফাতের মত 'ইল্ম দ্বারা গায়বের উপর ঈমান আনার সোপান অতিক্রম করিয়া থাকেন। ওহী আসিয়া কেবল তাহা সুদৃঢ় করিয়া থাকে। তাঁহাদের অন্তরে ঈমানের যেই রহস্য বদ্ধমূল থাকে ওহী আসিয়া ইহার অনুকূলে সাক্ষী দান করে যে, ইহাই সঠিক ও যথার্থ ঈমান, যাহাতে তাঁহারা পূর্ণ আস্থার সহিত দুনিয়াবাসীর সামনে ইহার সাক্ষ্য প্রদান করিতে পারেন। এই বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে নিম্নোক্ত আয়াতে পরিস্ফুটিত হইয়া উঠিয়াছে :
أَفَمَنْ كَانَ عَلَى بَيِّنَةٍ مِنْ رَبِّهِ وَيَتْلُوهُ شَاهِدٌ مِنْهُ وَمِنْ قَبْلِهِ كِتَابٌ مُوسَى إِمَامًا وَرَحْمَةً (হুদ- ১৭).
"তাহারা কি উহাদের সমতুল্য যাহারা প্রতিষ্ঠিত উহাদের প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণের উপর, যাহার অনুসরণ করে তাঁহার প্রেরিত সাক্ষী এবং যাহার পূর্বে ছিল মূসার কিতাব আদর্শ ও অনুগ্রহস্বরূপ” (১১:১৭)?
নূহ ('আ)-এর উক্তি আল-কুরআনে এইভাবে ব্যক্ত হইয়াছে :
يُقَوْمِ أَرَأَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّنْ رَّبِّي وَأَتْنِي رَحْمَةً مِّنْ عِنْدِهِ فَعُمِيَتْ عَلَيْكُمْ أَنْتَزِمُكُمُوهَا وَأَنْتُمْ لَهَا كُرْهُونَ (هود-২৮).
"হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে বল, আমি যদি আমার প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট নিদর্শনে প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং তিনি যদি আমাকে তাঁহার নিজ অনুগ্রহ হইতে দান করিয়া থাকেন, আর ইহা তোমাদের নিকট গোপন রাখা হইয়াছে, আমি কি এই বিষয়ে তোমাদিগকে বাধ্য করিতে পারি, যখন তোমরা ইহা অপসন্দ কর" (১১: ২৮)?
ঠিক এই বিষয়টি উক্ত সূরার ৬৩ নং আয়াতে এবং ৮৮ নং আয়াতে যথাক্রমে সালিহ ('আ) ও শু'আয়ব ('আ)-এর যবানীতে ব্যক্ত হইয়াছে। ইহা হইতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ওহীর মাধ্যমে পথনির্দেশ লাভের পূর্বে নবীগণ পর্যবেক্ষণ ও ধ্যান-ধারণার সৃষ্টিগত যোগ্যতা দ্বারা তাওহীদের রহস্য পর্যন্ত পৌঁছিয়া থাকেন। ইহার পর আল্লাহ তা'আলা আবার তাঁহাদিগকে ইহার অনুকূলে ইলমে ওহী দান করিয়া থাকেন। এই দান অর্জিত নহে, বরং আল্লাহ প্রদত্ত হইয়া থাকে (সায়্যিদ আবুল আ'লা মওদূদী, সীরাতে সারওয়ারে 'আলম, ১খ, পৃ. ৭২)।
📄 যুক্তির কষ্টিপাথরে নবুওয়াত
শহর বন্দরে আমরা হাজার হাজার কল-কারখানা বিদ্যুতের সাহায্যে চলিতে দেখি। আরও দেখি রেল ও ট্রাম গাড়ী চলিতেছে। সন্ধ্যা হইলে হাজার হাজার আলোর ঝিকিমিকি প্রত্যক্ষ করি। গ্রীষ্মকালে ঘরে ঘরে অসংখ্য বৈদ্যুতিক পাখা চলে। ইহা অবলোকন করিয়া আমাদের মধ্যে কোন প্রকার প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় না। ইহার আলো দান ও সঞ্চালনের কারণ সম্পর্কে আমাদের মধ্যে কোন দ্বিমতও নাই। এই ঐক্যমতের ভিত্তি কি? তাহা হইল, এই আলো বাতির সম্পর্ক যেই তারের সঙ্গে রহিয়াছে তাহা আমরা চোখে দেখি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থানও আমরা প্রত্যক্ষ করি। এখানকার শ্রমিক ও প্রকৌশলী সম্পর্কে আমরা অবহিত। মেশিন ও যন্ত্রপাতি যাহার সাহায্যে ইহা উৎপন্ন হয় তাহার খবরও আমরা রাখি। বিদ্যুতের প্রভাব দেখিয়াও ইহার উৎস সম্পর্কে আমাদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি না হইবার কারণ হইল ইহার উৎস আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। আমরা ইহা প্রত্যক্ষ করি। যদি এই সকল যান্ত্রিক আয়োজন আমাদের দৃষ্টিশক্তির আড়ালে থাকিত, তাহা হইলে ইহার উৎস সম্পর্কে অবশ্যই আমাদের মধ্যেমত পার্থক্য সৃষ্টি হইত। কারণ উৎস সম্পর্কে অজ্ঞতা মতবিরোধের কারণ হইয়া থাকে। হাজার হাজার লাখ লাখ বৈদ্যুতিক বাতি, পাখা, গাড়ী ও কারখানা কোন শক্তির জোরে চলিতেছে ইহা যদি জানা না থাকিত তাহা হইলে সকল মানুষ ইহার উৎস সন্ধানে ব্যস্ত হইয়া পড়িত। কেহ বলিত, এই সকল জিনিস স্বভাবতই আলোকিত হয়, বাহিরের কোন উপাদান ইহাদেরকে আলো দান করে না। কেহ বলিত, এই উপাদানগুলির অবতার রহিয়াছে, ইহাদের কোনটি আলো দান করে, আবার কোনটি রেল ও ট্রাম গাড়ী চালনা করে, কোনটি পাখা ও কারখানা ইত্যাদি চালায়। কেহ কেহ এই ব্যাপারে গবেষণা করিতে গিয়া কোন সমাধান না পাইয়া বাধ্য হইয়া বলিত, ইহা আমাদের কল্পনাশক্তির বাহিরের কোন শক্তি দ্বারা চালিত। আমরা কেবল ইহাই জানি যাহা করি, ইহা ব্যতীত অন্য কিছু আমরা জানি না, বুঝি না। আর যাহা আমরা জানি না তাহাকে সত্যও বলি না, মিথ্যাও না। তাহারা এই ব্যাপারে পরস্পর বিতর্কে লিপ্ত কিন্তু স্ব-স্ব দাবির সমর্থনে অনুমান ব্যতীত অন্য কোন দলীল নাই।
এই প্রেক্ষিতে এক ব্যক্তির আবির্ভাব হইল। তিনি আহবান জানাইলেন, হে লোকসকল! আমার নিকট জ্ঞানের এমন একটি মাধ্যম রহিয়াছে যে, এই সকল বাতি, পাখা, গাড়ী ও কারখানার সংযোগ এমন একটি গোপন তারের সংগে রহিয়াছে যাহা তোমরা অনুধাবন করিতে সক্ষম নও। বিরাট একটি উৎপাদন কেন্দ্র হইতে এই তার বিদ্যুতায়িত হয়। এই কেন্দ্রে শক্তিশালী মেশিন রহিয়াছে। অনেক লোক ইহা চালনার কাজে নিয়োজিত। তাহারা একজন বড় প্রকৌশলীর অধীনে কর্মরত। এই প্রকৌশলীর জ্ঞান ও কর্মদক্ষতার ফলে এই সকল ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। তাহার নির্দেশনায় এই কাজ পরিচালিত হইতেছে। এই আহবানকারী লোকটি পূর্ণ উদ্যমে তাহার মিশন চালাইয়া যাইতেছেন। মানুষ তাঁহাকে মিথ্যাবাদী বলিয়া অভিহিত করিতেছে, তাঁহার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিতেছে, পাগল বলিতেছে, আঘাত করিতেছে, দুঃখ-ক্লেশ দিতেছে, দেশান্তরি করিয়া দিতেছে। কিন্তু এত কিছুর পরও তিনি তাঁহার দাবিতে অনড় রহিয়াছেন। কোন ভয়ভীতি ও প্রলোভন তাঁহাকে স্বীয় দাবি হইতে বিচ্যুত করিতে পারিতেছে না।
ইহার পর আরও একজন লোকের আগমন ঘটিল তিনিও অবিকল এই আহ্হ্বান জানাইলেন। ইহার পর তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম ব্যক্তি আসিয়া এই একই আহ্বান জানাইলেন। ক্রমান্বয়ে তাঁহাদের সংখ্যা হাজারের কোঠা অতিক্রম করিল। সকলের আহ্বান ও মতাদর্শ অভিন্ন। স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে তাঁহাদের সকলের একই দাবি: "আমাদের নিকট জ্ঞানের এমন একটি উৎস রহিয়াছে যাহা সাধারণের মধ্যে অনুপস্থিত"। ইহার ফলে সাধারণ মানুষ তাঁহাদেরকে দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত করে, কিন্তু দুনিয়ার কোন শক্তি তাঁহাদেরকে এই দাবি হইতে নিবৃত্ত করিতে পারে নাই।
এই অদম্য সংকল্প ও অবিচলতার সহিত তাঁহাদের বৈশিষ্ট্য হইল, তাঁহারা চরিত্রবান ও পূণ্যবান মানুষ, তাঁহারা পাগলও নহেন, বরং তাঁহারা সূক্ষ্ম ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বিধান দান করেন। একদিকে তাঁহাদিগকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী দল এবং অপর দিকে একই চিন্তাধারার দাবিদারগণ। সুস্থ ও স্থির বুদ্ধির আদালতে এই দুই দলের বিচার দায়ের করা হইলে বিচারক হিসাবে বিবেকের কাজ হইল উভয় দলের অবদান সম্পর্কে অবহিত হওয়া। ইহার আগে বিবেককেও নিজের অবস্থান সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে সচেতন থাকিতে হইবে। ইহার পর উভয় দিক পর্যালোচনা করিয়া সিদ্ধান্ত দিতে হইবে কোন দলের কথা প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য। বিচারকের অবস্থা হইল তাহার নিকট সঠিক বিষয় সম্পর্কে অবহিত হইবার কোন মাধ্যম নাই। প্রকৃত ঘটনা তিনি জানেনও না। বাদীও বিবাদীর যুক্তি-তর্ক ও বিবৃতির ভিত্তিতেই তাহাকে ফয়সালা দিতে হইবে।
মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের অবস্থান হইল: (১) মূল বিষয় সম্পর্কে তাহাদের চিন্তাধারা পরস্পর বিরোধী। কোন ছোটখাট বিষয়েও তাহারা একমত নহেন।
(২) তাহারা স্বয়ং এই কথা স্বীকার করেন যে, তাহাদের নিকট জানার কোন মাধ্যম নাই যেইভাবে অন্যদের কোন মাধ্যম নাই। পরস্পরের মধ্যে তাহাদের চিন্তাধারা অধিকতর শক্তিশালী, এই ব্যাপারেও কোন স্বীকৃত দাবী নাই। তাহারা স্ব-স্ব ধারণাকে ধারণা হিসাবেই স্বীকার করিয়া থাকেন।
(৩) নিজেদের চিন্তাধারার উপর তাহাদের বিশ্বাস অবিচল ও স্থির নহে, বারংবার তাহা পরিবর্তিত হয়। গতকাল অবধি তাহারা যেই চিন্তাধারা পোষণ করিয়াছেন আজ ইহার সম্পূর্ণ বিপরীত চিন্তাধারা গ্রহণ করিয়াছেন।
(৪) দাবিদারগণকে তাহারা শুধু এই বলিয়া প্রত্যাখ্যান করিতেছেন যে, তাহাদের নিকট গ্রহণযোগ্য উহাদের নিশ্চিত কোন প্রমাণ উপস্থাপন করিতে পারেন নাই। উহারা গোপন তারের যেই সংযোগের কথা বলিতেছেন তাহা দেখাইতে পারিতেছেন না।
দাবিদারগণের অবস্থান হইল : (১) তাঁহারা পরস্পর সামঞ্জস্যশীল কথা বলিতেছেন। দাবির বুনিয়াদী সূক্ষ্ম বিষয়াদিতে তাঁহাদের মধ্যে পূর্ণ ঐক্যমত রহিয়াছে।
(২) তাঁহাদের ঐকমত্যের দাবি হইল, আমাদের নিকট এমন একটি মাধ্যম রহিয়াছে যাহা সাধারণ লোকের মধ্যে অনুপস্থিত।
(৩) তাঁহাদের কেহই এই দাবি করিতেছেন না, আমরা যাহা বলিতেছি তাহা ধারণাপ্রসূত, বরং সকলেই একই সুরে বলিতেছেন, মূল প্রকৌশলীর সহিত আমাদের বিশেষ ধরনের যোগাযোগ রহিয়াছে।
(৪) তাঁহাদের মধ্যে এইরূপ একটি নজীরও পাওয়া যায় না যে, কেহ তাঁহার বর্ণনায় এক তিল পরিমাণ রদবদল করিয়াছেন। দাবির সূচনা হইতে জীবনের শেষ পর্যন্ত তাঁহারা একই ধরনের কথা বলিতেছেন।
(৫) তাঁহাদের আচার-আচরণ সীমাহীন পবিত্র। মিথ্যাচার, ধোঁকাবাজি ও প্রতারণার লেশ মাত্র তাঁহাদের জীবনে নাই।
(৬) এই দাবি উত্থাপনে তাঁহাদের নিজেদের কোন উপকার নিহিত রহিয়াছে বলিয়া কোন প্রমাণ নাই, বরং এই দাবির কারণে তাঁহারা অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট সহ্য করিয়াছেন। কেহ কেহ বন্দী হইয়াছেন, আবার কেহ নিহতও হইয়াছেন।
(৭) তাঁহাদের কেহ পাগল বা অপ্রকৃতিস্থ ছিলেন এমন কোন প্রমাণও নাই, বরং তাঁহারা জীবনের সকল কাজ অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সহিত আনজাম দিয়াছেন বলিয়া প্রমাণ রহিয়াছে। তাঁহাদের বিরুদ্ধবাদীরা এই কথা অকপটে স্বীকার করিয়াছেন।
(৮) তাঁহারা স্বয়ং ইহারও দাবি করেন নাই যে, তাঁহারাই ইহার উদ্ভাবক বা নির্মাতা। বিরুদ্ধবাদীদেরকে তাঁহারা যে এই শক্তির উৎসের সহিত মিলাইয়া দিবেন তাহাও বলেন নাই। তাঁহারা যেই দিকে আহবান করিতেছেন তাহা তাঁহারা স্বয়ং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে লাভ করিয়াছেন ইহাও বলেন নাই; বরং তাঁহাদের কথা হইল, এই সকল বিষয় তাঁহারা 'গায়ব' হইতে লাভ করিয়াছেন।
এখন যুক্তির কষ্টিপাথরে পর্যালোচনা করিয়া দেখিলে উভয় দলের মধ্যে দ্বিতীয় দল তাঁহাদের দাবিতে যে সঠিক তাহা স্পষ্টত প্রতিভাত হয়। কারণ স্থান-কাল-পাত্রভেদ সত্ত্বেও এত অধিক সংখ্যক লোকের কোন কলংকের কালিমা নাই, তাঁহারা স্বীয় দাবিতে মিথ্যাবাদী হইতে পারেন না। নিশ্চয় তাঁহাদের নিকট অস্বাভাবিক পন্থায় কোন ইলমের মাধ্যম রহিয়াছে। তাঁহারা যাহা বলিতেছেন তাহা অসম্ভব কিছুও নহে। কতক মানুষের মধ্যে অস্বাভাবিক কোন শক্তি থাকাকে যুক্তিও অস্বীকার করে না। বাস্তব অবস্থার প্রতি তাকাইলেও মনে হয় দ্বিতীয় দলের দাবি নির্ভুল। কারণ বাতি, পাখা, গাড়ী ও কারখানা ইত্যাদি আপনাআপনি আলোকিত ও সচল হইতে পারে না, ইহা তাহাদের ইচ্ছাধীনও নয়। কেবল পারস্পরিক সংযোগের ফলেও তাহা সচল ও আলোকিত হইতে পারে না। কারণ যখন তাহা সচল ও আলোকিত হয় না তখনও ইহার সংযোগ থাকে। সুতরাং প্রথম পক্ষ যত প্রকার অভিযোগ অনুযোগ উপস্থাপন করিয়া থাকুক না কেন সবগুলিই অযৌক্তিক বলিয়া বিবেচিত হয়। একদল সন্দেহ পোষণকারীর বক্তব্য হইল তাহারা এই বিষয় বুঝেন না। সুতরাং যাহা তাহারা বুঝেন না তাহাকে তাহারা সত্য বা মিথ্যা কোনটির স্বীকৃতি দিবেন না। বিবেক এই কথাকেও যথার্থ বলিয়া রায় দেয় না। কারণ শ্রোতার বোধগম্যতার উপর ঘটনার সত্যতা নির্ভর করে না। ইহার অনুকূলে কোন গ্রহণযোগ্য, বিবেকবান, সত্যবাদী, নিঃস্বার্থ সাক্ষী বর্তমান থাকিলেই ঘটনার সত্যতাকে স্বীকার করিয়া লওয়া হয়। প্রথম শ্রেণীর লোকদের উদাহরণ হইল নবুওয়াতের দাবিদার তথা আম্বিয়া (আ)-এর (সায়্যিদ আবুল আলা মওদূদী, সীরাতে সারওয়ারে আলম, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ৪৬)
📄 এক নজরে নবুওয়াতের ইতিহাস
সূচনায় আল্লাহ তা'আলা একজন মানুষ সৃষ্টি করিয়াছিলেন, অতঃপর তাহার সঙ্গীনি সৃষ্টি করিলেন। তিনি এই একজোড়া মানুষ হইতে বংশবৃদ্ধি করিয়াছেন। যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে তাঁহাদের বংশধরগণ বিশ্বের সর্বত্র ছড়াইয়া পড়ে। সকল মানুষই আদম সন্তান। সকল জাতির ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় এই ব্যাপারে কোন ব্যক্তিক্রম নাই। বৈজ্ঞানিক মতবাদে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পৃথক পৃথক মানুষ সৃষ্টি করা হইয়াছিল বলিয়া কোন প্রমাণ নাই। বিজ্ঞানীদের অধিকাংশ এই মত পোষণ করিয়া থাকেন যে, সর্বপ্রথম একজন মানব সৃষ্টি করা হইয়াছিল, বর্তমান মানব সন্তান এই একই মানুষ হইতে সৃষ্ট। তিনি হইলেন আদম (আ)। আল্লাহ তা'আলা সর্বপ্রথম নবী আদম (আ)-কেই সৃষ্টি করিয়াছিলেন। তাঁহাকে আদেশ দিয়াছিলেন যেন তিনি তাঁহার সন্তানদিগকে তাওহীদের শিক্ষা দান করেন। পরবর্তী কালে তাঁহাদের মধ্যে একদল পুণ্যবান ভাল লোক জন্মগ্রহণ করে। পক্ষান্তরে অন্য একদল অবাধ্য ও পাপী লোকের আবির্ভাব ঘটিল। ক্রমে সকল প্রকার অন্যায়-অনাচার ছড়াইয়া পড়িল। কেহ চন্দ্র, সূর্য, তারকা ইত্যাদির, আবার কেহ বৃক্ষ, পশু, পাখি ও আগুন-পানির পূজা করিতে লাগিল। এইভাবে শিরক ও মৃতিপূজার প্রচলন হইল। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে আদম সন্তান ছড়াইয়া পড়িলে তাহাদের মধ্যে নানা ধর্মের উদ্ভব হয়। আদম (আ) তাঁহার সন্তানদিগকে যাহা শিক্ষাদান করিয়া ছিলেন অনেকেই তাহা ভুলিয়া গিয়াছিল। মানবজাতি নিজেদের খেয়ালখুশিমত চলিতে লাগিল। ইহার ফলে অনেক মন্দ প্রথা ও ধারণার প্রসার ঘটিল। এই প্রসঙ্গে আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে ইরশাদ হইয়াছে:
كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ وَأَنْزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيْمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ إِلَّا الَّذِينَ أُوتُوهُ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَاتُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ (البقرة - ١٢٣).
"সমস্ত মানুষ ছিল একই উম্মত। অতঃপর আল্লাহ নবীগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেন। মানুষেরা যে বিষয়ে মতভেদ করিত তাহাদের মধ্যে সে বিষয়ে মীমাংসার জন্য তিনি তাহাদের সহিত সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেন এবং যাহাদিগকে তাহা দেওয়া হইয়াছিল স্পষ্ট নিদর্শন তাহাদের নিকট আসিবার পরে তাহারা শুধু পরস্পর বিদ্বেষবশত সেই বিষয়ে বিরোধিতা করিত" (২: ২১৩)।
আজ লোকেরা তাহাদের ধারণাপ্রসূত ধর্মের ইতিহাস লিখিতে গিয়া উল্লেখ করে যে, মানুষেরা তাহাদের জীবনের সূচনা করিয়াছিল শিরকের অমানিশায়। অতঃপর ক্রমান্বয়ে তাহারা আলোর দিকে ধাবিত হইয়া তাওহীদের স্তর পর্যন্ত পৌঁছিয়াছিল। কিন্তু আল-কুরআনে ইহার সম্পূর্ণ বিপরীত বর্ণনা রহিয়াছে। কুরআনের শিক্ষা হইল, সর্বপ্রথম মানব আদম (আ)-কে আল্লাহ সঠিক পথনির্দেশ দান করিয়াছিলেন। তাঁহার নির্দেশে পরিচালিত হইয়া লোকজন দীর্ঘ কাল সরল পথের অনুসারী ছিল। ইহার পর মানুষ নূতন নূতন পন্থা উদ্ভাবন করিল, যেইগুলির ভিত্তি ছিল জুলুম, অবিচার ও সীমালংঘনের উপর। তাহাদের মধ্যকার এই সকল অনাচার দূর করিবার জন্য আল্লাহ তা'আলা নবীগণকে প্রেরণ করিতে থাকেন। এই সকল নবীকে এই উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয় নাই যে, তাঁহাদের প্রত্যেকে স্ব-স্ব নামে একটি করিয়া ধর্ম প্রতিষ্ঠা করিবেন, বরং তাঁহাদিগকে প্রেরণ করিবার উদ্দেশ্য ছিল লোকদিগকে তাঁহারা সরল সঠিক পন্থা বলিয়া দিবেন এবং একই উম্মাহ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করিবেন (সায়্যিদ আবুল আলা মওদূদী, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ৬২)।
টিকাঃ
১. আল-কুরআনুল কারীম, স্থা; ২. হাদীছ গ্রন্থাবলী, মিফতাহু কুনুষিস সুন্নাহ, মূল লেখক A. J. Wensinck, আরবী ভাষান্তরঃ মুহাম্মাদ ফুয়াদ আবদুল বাকী, দিল্লী, তা. বি; ৩. শাহ ওলীয্যুল্লাহ্ মুহাদ্দিছে দিহলাবী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, বৈরূত, তা. বি, ১খ, পৃ. ৮৪; ৪. শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন্নবী, প্রথম সংস্করণ, করাচী ১৯৮৫ খৃ., ৪খ, পৃ. ১৪; ৫. আবদুল কারীম আল-খাতীব, আন-নাবিয়্যু মুহাম্মাদ, বৈরূত, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৭৫ খৃ., পৃ. ৪৫; ৬. আবদুল ওয়াহ্হাব আশ-শা'রানী, আল-ইয়াওয়াকীত ওয়াল-জাওয়াহির ফী বায়ানি 'আকাইদি'ল আকাবির, বৈরূত, দ্বিতীয় সংস্করণ, তা. বি, ১খ, ও ২খ, পৃ. ২; ৭. আবদুর রাহমান ইবন মুহাম্মাদ আল-খাদরামী, তারীখু ইবন খালদুন, বৈরূত ১৩৯৯ হি./ ১৯৯৭ খৃ.,.১খ, পৃ. ৮০; ৮. রাগিব আল-ইসফাহানী, আল-মুফরাদাতু ফী গারীবিল কুরআন, করাচী, তা, বি, পৃ. ৪৮২; ৯. ইবন হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল বারী, বৈরুত, তা. বি, ৬খ, পৃ. ৩৬১; ১০. বাদরুদ্দীন আল-আয়নী, উমদাতুল কারী, বৈরূত, তা. বি, ১৫ খ, পৃ. ২০৪; ১১. বদরে আলম মিরাঠী, তরজমানুস সুন্নাহ, লাহোর, তা. বি, ১খ, পৃ. ৪১; ১২. মানযূর নুমানী, মাআরিফুল হাদীছ, লাহোর, তা. বি., ১খ, পৃ. ৪১; ১৩. হিফজুর রাহমান সিউহারবী, কাসাসুল কুরআন, দিল্লী, ১৩৯৯ হি., ৪খ, পৃ. ২৮৯; ১৪. ইদরীস কান্দালাবী, মাআরিফুল কুরআন, দ্বিতীয় সংস্করণ, লাহোর ১৯৮২ খৃ., ১খ, পৃ. ৯৯; ১৫. ঐ লেখক, সীরাতুল মুস্তাফা, দেওবন্দ ১৯৮০ খৃ., ১খ, পৃ. ১২০; ১৬. আবূ মুহাম্মাদ আলী ইব্ন আহমাদ ইব্ন হায্য আত-তাহিরী, আল-ফাসলু ফিল-মিলাল ওয়াল-আহওয়া ওয়ান-নিহাল, তৃতীয় সংস্করণ, বৈরূত ১৯৭৫ খৃ., ৪খ, পৃ. ২; ১৭. ফখরুদ্দীন আর-রাযী, আত-তাফসীরুল কাবীর, ৩২খ., মাকতাবাতুল ই'লাম আল-ইসলামী, ১৪১১ হি; ১৮. কাযী ইয়াদ আল-ইয়াহসাবী, আশ-শিফা বিতা'রীফি হুকূকিল মুস্তাফা, বৈরূত, তা. বি, ১২ খ, পৃ. ১১৭; ১৯. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, খাসাইসুল কুবরা, বৈরূত, তা, বি, ১খ, পৃ. ৩; ২০. মুহাম্মাদ আলী আস-সাবৃনী, আন-নুবুওয়াত ওয়াল-আম্বিয়া, মক্কা মুকাররামা; ২১. রাগিব আল-ইসফাহানী, তাফসীলুন নাশআতায়ন ওয়া তাহসীলুস সা'আদায়ন, বৈরূত ১৯৮৩ খৃ., পৃ. ৫৯; ২২. ইদরীস হুশিয়ারপুরী, খুতাবাতে হাকীমুল ইসলাম, দেওবন্দ, তা.বি, পৃ. ১২; ২৩. ডঃ ফাদিল আহমাদ আস-সামারাই, নুবুওয়াতু মুহাম্মাদিন মিনাশ-শাক ইলাল-ইয়াকীন, বাগদাদ ১৯৯৮ হি, পৃ. ৩৯; ২৪. কাযী মুহাম্মাদ যাহিদ আল-হুসায়নী, রাহমাতে কায়েনাত, দিল্লী ১৩৭৭ হি, পৃ. ২৭১; ২৫. জামীল আহমাদ, আম্বিয়ায়ে কুরআন, লাহোর, তা. বি, পৃ. ২৮-৫০; ২৬. মুহাম্মাদ মিয়া সাহেব, সীরাতে মুবারাকাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স), দিল্লী ১৯৭৩ খৃ., পৃ. ৫; ২৭. শায়খ মুহাম্মাদ আল-গাযালী, আকীদায়ে ইসলাম, আলীগড় ১০৮১ খৃ., পৃ. ২৭৪; বাংলা অনু. মুহাম্মদ মূসা, ইসলামী আকীদা; ২৮. মাওলানা আবদুর রহীম, আল-কুরআনে নবৃওয়াত ও রিসালাত, খায়রুন প্রকাশনী; ২৯. কাযী সুলায়মান মানসুরপুরী, রাহমাতুল্লিল আলামীন, দিল্লী ১৯৮০ খৃ., ৩খ, পৃ. ১১৫; ৩০. ইবরাহীম আল-মূসাবী আয-যানজীবী, আকাইদু'ল ইমামিয়্যা আল-ইসনা আশারিয়্যা, বৈরূত ১৩৯৩ হি./১৯৭৩ খৃ., ১খ, পৃ. ৩৭; ৩১. আস-সায়্যিদ মাহদী আস-সাদর, উসূলু'ল আকীদা ফিন নুবুওয়াত, বৈরূত, তা,বি, পৃ. ৭৩; ৩২. সম্পাদনা পরিষদ, ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৯৩ খৃ., ১৪খ, পৃ. ১৬৬; ৩৩. মুফতী মুহাম্মাদ শফী, খতমে নবুওয়াত, অনুবাদ মুহাম্মদ সিরাজুল হক, ইফাবা; ৩৪. আবুল হাসান আলী নাদবী, মানসাবে নুবুওয়াত আওর উসকী আলী মাকামে হামেলীন, বাংলা অনু. নবুওয়াত ও আম্বিয়া-ই কিরাম (আ), অনুবাদকঃ রুহুল আমীন উজানবী, ইফাবা. ১৯৯১; ৩৫. এস. এম. মতিউর রহমান নূরী, মু'জিযাতুন নবী, ইফাবা ১৯৯৪, খৃ.; ৩৬. ইব্ন আমীরিল হাজ্জ, আত-তাকবীর ওয়াত-তাবহীর শরহে তাহরীরে ইব্ন হুমام, মাতবা 'আমীরিয়্যা, মিসর ১৩১৭ হি., ৩খ, পৃ. ২৯৪-২৯৯; ৩৭. আত-তালবীহ্ ফী কাশফি হাকাইকি'ত তানকীহ্ ওয়াত-তাওদীহ্ ফী হাল্লি গাওয়ামিসিত তানকীহ্, কুসতানতানিয়্যা ১৩১০ হি, ২খ., পৃ. ৪৫২; ৩৮. সায়ি্যদ আবুল আলা মওদূদী, সীরাতে সারওয়ারে আলাম, ১খ, স্থা.; ৩৯. ইমাম গাযালী, তুহফাতুল ফালাসিফা, পৃ. ৩২; ৪. ঐ লেখক, মা'আরিজুন নুবুওয়াত; ৪০. মুফতী মুহাম্মাদ শফী, মা'আরিফুল কুরআন, করাচী ১৯৭৮ খৃ.,৮খ, পৃ. ৮৪৭; ৪১. ইমাম গাযালী, মা'আরিজুল কুদস; ৪২. আশ-শারীফুল মুরতাদা, তানযীহুল আম্বিয়া, নাজাফ ১৯৬০ খৃ.; ৪৩. আর-রাযী, মাতালিবুল আলিয়া; ৪৪. ইব্ন তায়মিয়্যা, কিতাবুন নুবুওয়াত; ৪৫. ঐ লেখক, আল-জাওয়াবুস সাহীহ লিমান বাদ্দালা দীনাল-মাসীহ।
📄 ওহী নাযিলের সূচনা ও পদ্ধতিসমূহ
আল-কুরআনুল কারীম, নির্ভরযোগ্য হাদীছের গ্রন্থাবলী ও ভাষ্য গ্রন্থাবলী এবং হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (স)-এর জীবনী গ্রন্থাবলীতে ওহী (ওয়াহহিয়)-এর সূচনা সম্পর্কীয় যাবতীয় বিবরণ আলোচনা-পর্যালোচনা ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে ওহীর শুভ সূচনার প্রেক্ষাপট ও পূর্বাভাষ, অনুরূপভাবে ইহার শুভ সূচনা কখন হইয়াছিল, কাহার কাছে, কত বৎসর বয়সে, কোন জায়গাতে, কোন ভাষাতে, কোন দিনে, কোন মাসে, জাগ্রত অবস্থায়, না ঘুমন্ত অবস্থাতে, কাহার মাধ্যমে, তিনি কি মানবীয় আকৃতিতে আসিয়াছিলেন, না ভিন্ন আকৃতিতে, অনুরূপভাবে ওহীর সূচনালগ্নে ফেরেস্তা ও রাসূলে কারীম (স)-এর মধ্যকার রোমাঞ্চকর অবস্থার বিবরণ, কোন আয়াতে কারীমার মাধ্যমে ওহীর শুভ সূচনা এবং সর্বোপরি রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনে ওহীর শুভ সূচনা, প্রভাবসমূহ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি নিম্নে আলোচনা করা হইল।
ওহী-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ
ওহী (وحی) শব্দের আভিধানিক অর্থ ইশারা, ইংগিত, ব্যক্ত করা, পৌঁছানো, নির্দেশ, প্রত্যাদিষ্ট বাণী, অনুক্ত বাণী (দ্র. লিসানুল আরাব, আল-মুফরাদাত ইত্যাদি)। কুরআন মজীদে উক্ত সব অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ:
وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا . "তোমার প্রতিপালক মৌমাছিকে ইঙ্গিত দিয়াছেন যে, পাহাড়ে গৃহ নির্মাণ কর" (১৬: ৬৮; আরও দ্র. ১৯: ১১)।
وَأَوْحَى فِي كُلِّ سَمَاءِ أَمْرَهَا . "এবং তিনি প্রত্যেক আকাশে উহার বিধান ব্যক্ত করিলেন" (৪১: ১২)।
إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّنَ مِنْ بَعْدِهِ. "নিশ্চয় আমি তোমার নিকট প্রত্যাদেশ পাঠাইয়াছি, যেমন নূহ ও তাহার পরবর্তী নবীগণের নিকট প্রত্যাদেশ পাঠাইয়াছি” (৪: ১৬৩)।
ثُمَّ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ أَنِ اتَّبِعْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا . "অতঃপর আমি তোমাকে নির্দেশ দিলাম যে, তুমি একনিষ্ঠ ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ কর" (১৬: ১২৩)।
أَوْ يُرْسِلَ رَسُولاً فَيُوْحِيَ بِاذْنِهِ مَا يَشَاءُ. "অথবা তিনি দূত প্রেরণ করেন যিনি তাঁহার অনুমতিক্রমে তিনি যাহা চাহেন তাহা ব্যক্ত করেন বা পৌঁছান" (৪২ঃ ৫১)।
বদরুদ্দীন 'আয়নী (র) বলেনঃ الوحى الاشارة والكتابة والرسالة والكلام الخفى وكل ما القيته الى غيرك. "ওহী অর্থ ইশারা করা, লিপিবদ্ধ করা, কোন কথাসহ প্রেরণ, গোপন কথা, অপরের অজ্ঞাতে কাহাকেও কিছু অবহিত করা" (উমদাতুল কারী শারহু সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ১৪)।
শায়খ আবদুল্লাহ্ আস-সারকাবী বলেন: وفي اصطلاح الشرع اعلام الله تعالى انبياءه الشيئ اما بكلام او برسالة ملك او منام أو الهام.
"শরীআতের পরিভাষায় ওহী বলা হয়, আল্লাহ কর্তৃক ফেরেশতা প্রেরণ করিয়া অথবা স্বপ্নযোগে অথবা ইলহামের সাহায্যে তাঁহার নবীগণকে কোন বিষয় বা কথা অবহিত করা” (ফাতহুল মুবতাদা শারহু মুখতাসার আয-যুবায়দী-এর বরাতে হাদীস সংকলনের ইতিহাস, পৃ. ৪৪)।
বস্তুত ওহীর গূঢ় রহস্য ও প্রকৃত তাৎপর্য আল্লাহ ব্যতীত কেহই জানেন না। ইসলামী পরিভাষায় ওহী শব্দটি মূলত নবী-রাসূলগণের নিকট আল্লাহ তাআলার বাণী এবং তাহা তাঁহাদের নিকট পৌঁছিবার পন্থাকে বুঝাইবার জন্য ব্যবহৃত হয়। আমরা ইন্দ্রিয় শক্তির সাহায্যে প্রথমে কোন জিনিস দেখিবার পর তৎসম্পর্কে জ্ঞাত হই। পক্ষান্তরে নবী-রাসূলগণ তাঁহাদের অন্তর্নিহিত শক্তির সাহায্যে দেখেন এবং তাঁহারা প্রথমে জ্ঞাত হন, অতঃপর দেখেন। নবীগণের নিকট প্রেরিত ওহীলব্ধ জ্ঞান প্রধানত দুই প্রকারঃ প্রথম প্রকার 'মৌল জ্ঞান' যাহা প্রত্যক্ষ ওহীর (وحى متلوء) মাধ্যমে প্রাপ্ত, যাহার নাম কিতাবুল্লাহ। যেমন আল্লাহ্ কিতাব আল-কুরআন। এই প্রকার ওহীর ভাব ও ভাষা উভয়ই আল্লাহ্। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা হুবহু আল্লাহ্ ভাষায় প্রকাশ করিয়াছেন। এইরূপ ওহী নাযিল হওয়ার সময় মহানবী (স)-এর নিকটে উপস্থিত লোকজন উপলব্ধি করিতে পারিত যে, তাঁহার উপর ওহী নাযিল হইতেছে।
দ্বিতীয় প্রকার জ্ঞান, যাহা প্রথমোক্ত জ্ঞানের ভাষ্য এবং যাহা পরোক্ষ ওহীর (وحى غير متلوء) মাধ্যমে প্রাপ্ত, ইহার নাম সুন্নাহ বা আল-হাদীছ। ইহার ভাব আল্লাহ্, কিন্তু মহানবী (স) তাহা নিজের ভাষায়, নিজের কথা, কর্ম ও সম্মতির মাধ্যমে প্রকাশ করিয়াছেন। এই প্রকারের ওহী মহানবী (স)-এর উপর প্রচ্ছন্নভাবে নাযিল হইত এবং অন্যরা তাহা টের পাইত না। এই প্রকারের ওহীর সমর্থন বা প্রমাণ কুরআন মজীদে বিদ্যমান। যেমন মহান আল্লাহ মহানবী (স) সম্পর্ক বলিয়াছেন:
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى أَنْ هُوَ إِلا وَحْيٌ يُوحَى.
"সে (মুহাম্মাদ) মনগড়া কোন কথা বলে না। ইহা তো ওহী যাহা তাহার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়" (৫৩: ৩-৪)।
وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيلِ. لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ، ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ.
"সে (নবী) যদি নিজে রচনা করিয়া কোন কথা আমার নামে চালাইয়া দিত তাহা হইলে আমি তাহার ডান হাত ধরিয়া ফেলিতাম এবং তাহার কণ্ঠনালী ছিন্ন করিয়া ফেলিতাম" (৪৪-৪৬)।
মহানবী (স) বলেন:
الَا إِنِّي أُوتِيتُ الْكِتَابَ وَمِثْلَهُ أَلَا إِنِّي أُوتِيتُ الْقُرْآنَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ.
"জানিয়া রাখ! আমাকে কিতাব দেওয়া হইয়াছে এবং উহার সহিত উহার অনুরূপ আরও একটি জিনিস দেওয়া হইয়াছে। জানিয়া রাখ! আমাকে কুরআন দেওয়া হইয়াছে এবং উহার সহিত দেওয়া হইয়াছে উহার অনুরূপ আরও একটি জিনিস” (মুসনাদ ইমাম আহমাদ, ৪খ., পৃ. ১৩০-১; সুনان আবূ দাউদ, রিয়াদ সং, কিতাবুস সুন্নাহ, বাব ফী লুযূমিস সুন্নাহ, নং ৪৬০৪)। উপরিউক্ত হাদীছ দ্বারা দ্বিতীয় প্রকারের ওহী (পরোক্ষ ওহী) প্রমাণিত হয়।
ঊর্ধ্ব জগত হইতে এবং আসমানী মূল উৎস (উম্মুল কিতাব) হইতে নবী-রাসূলগণের নিকট ওহীর বিষয়বস্তুর প্রেরণকার্যকে তানযীল (تَنْزِيلُ) ও ইনযাল (إِنْزَالُ) বলা হয়। যেমন কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে:
تَنْزِيلُ الْكِتٰبِ لَا رَيْبَ فِيهِ مِنْ رَّبِّ الْعَالَمِينَ.
"এই কিতাব জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হইতে অবতীর্ণ, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই” (৩২: ২)।
وَأَنْزَلَ التَّوْرَةَ وَالْإِنْجِيلَ مِنْ قَبْلُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَأَنْزَلَ الْفُرْقَانَ.
"এবং ইতিপূর্বে তিনি নাযিল করিয়াছিলেন তাওরাত ও ইনজীল মানবজাতিকে সৎপথ প্রদর্শনের জন্য। আর তিনি ফুরকান (কুরআন) নাযিল করিয়াছেন" (৩ঃ৪)।
অবশ্য ওহী শব্দটিও ক্রিয়াপদ হিসেবে ব্যবহৃত হইয়াছে এবং ইহার দ্বারাও ওহীর বিষয়বস্তুর প্রেরণকার্য বুঝানো হইয়াছে। যেমন,
وَأَوْحَيْنَا إِلى مُوسَى اذ اسْتَسْقُهُ قَوْمُهُ أَنِ اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْحَجَرَ.
"মূসার সম্প্রদায় যখন তাহার নিকট পানি প্রার্থনা করিল তখন আমি তাহার প্রতি প্রত্যাদেশ করিলাম, তোমার লাঠির দ্বারা পাথরে আঘাত কর" (৭: ১৬০)।
"ইহা তো ওহী, যাহা তাহার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়” (৫৩:৪)। وَانِ اهْتَدَيْتُ فَبِمَا يُوحَى إِلَى رَبِّي
"এবং আমি যদি সৎপথে থাকি তবে তাহা এইজন্য যে, আমার প্রতিপালক আমার নিকট ওহী প্রেরণ করেন" (৩৪:৫০)।
অবশ্য কুরআন মজীদে ওহীর প্রধান উদ্দিষ্ট ব্যক্তি হইতেছেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)।
হাদীছের আর এক প্রকার রহিয়াছে, যাহাকে 'হাদীছে কুদ্স্সী' বলা হয়। 'কুদ্স্সী' কুদুস হইতে গঠিত। ইহার অর্থ-পবিত্রতা, মহানত্ব। আল্লাহর আর এক নাম 'কুদ্দুস' মহান, পবিত্র। এই ধরনের হাদীছকে 'হাদীছে কুদ্স্সী' বলা হয় এজন্য যে, উহার মূল কথা সরাসরিভাবে আল্লাহ্র নিকট হইতে প্রাপ্ত। আল্লাহ তাআলা তাঁহার নবীকে 'ইলহাম' কিংবা স্বপ্নযোগে যাহা জানাইয়া দিয়াছেন, নবী (স) নিজ ভাষায় সেই কথাটি বর্ণনা করিয়াছেন। উহা কুরআন হইতে পৃথক জিনিস। কেননা কুরআনের কথা ও ভাষা উভয়ই আল্লাহ্র নিকট হইতে ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ।
প্রখ্যাত হাদীছ ব্যাখ্যাতা আল্লামা মুল্লা আলী আল-কারী (র) 'হাদীছে কুদ্সী'র সংজ্ঞা দান প্রসংগে বলিয়াছেন, "হাদীছে কুদ্স্সী সেসব হাদীছ, যাহা শ্রেষ্ঠ বর্ণনাকারী পূর্ণ চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল পরম নির্ভরযোগ্য হযরত মুহাম্মাদ (স) আল্লাহ্র নিকট হইতে বর্ণনা করেন, কখনও জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে জানিয়া, কখনও সরাসরি ওহী কিংবা ইলহাম বা স্বপ্নযোগে লাভ করিয়া। যে কোন প্রকারের ভাষার সাহায্যে ইহা প্রকাশ করার দায়িত্ব রাসূলের উপর অর্পিত হইয়া থাকে” (শায়খ মুহাম্মাদ আল-মাদানী, ইতহাফুস সুন্নিয়া ফিল আহাদীছিল কুদসিয়্যা, পৃ. ১৮৭)।
আল্লামা আবুল বাকা তাঁহার 'কুল্লিয়াত' গ্রন্থে লিখিয়াছেন, "কুরআনের শব্দ, ভাষা, অর্থ, ভাব ও কথা সবই আল্লাহ্র নিকট হইতে সুস্পষ্ট ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ। আর হাদীছে কুদ্স্সীর শব্দ ও ভাষা রসূলের কিন্তু উহার অর্থ, ভাব ও কথা আল্লাহ্র নিকট হইতে ইলহাম কিংবা স্বপ্নযোগে প্রাপ্ত” (আল-হাদীছ ওয়াল-মুহাদ্দিছুন, পৃ. ১৮)।
আল্লামা তায়্যিবীও এই কথা সমর্থন করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, "কুরআনের শব্দ ও ভাষা লইয়া জিবরাঈল (আ) রাসূলে করীম (স)-এর নিকট নাযিল হইয়াছেন। আর হাদীছে কুদ্স্সীর মূল কথা ইল্হাম বা স্বপ্নযোগে আল্লাহ্ তাআলা জানাইয়া দিয়াছেন এবং নবী করীম (স) তাঁহার নিজের ভাষায় উম্মতকে তাহা জানাইয়া দিয়াছেন (এইজন্য হাদীছে কুদ্স্সী আল্লাহ্র কথারূপে পরিচিত হইয়াছে), কিন্তু এতদ্ব্যতীত অন্যান্য হাদীছকে আল্লাহ্ কথা বলিয়া প্রচার করেন নাই এবং তাঁহার নামেও সে সবের বর্ণনা করেন নাই (আল-হাদীছ ওয়াল-মুহাদ্দিছুন, পৃ. ১৭; কুল্লিয়াত আবুল বাকা, পৃ. ২৮৮)।
আল-কুরআনুল কারীম, নির্ভরযোগ্য হাদীছের গ্রন্থাবলী ও ভাষ্য গ্রন্থাবলী এবং হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (স)-এর জীবনী গ্রন্থাবলীতে ওহী (ওয়াহহিয়)-এর সূচনা সম্পর্কীয় যাবতীয় বিবরণ আলোচনা-পর্যালোচনা ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে ওহীর শুভ সূচনার প্রেক্ষাপট ও পূর্বাভাষ, অনুরূপভাবে ইহার শুভ সূচনা কখন হইয়াছিল, কাহার কাছে, কত বৎসর বয়সে, কোন জায়গাতে, কোন ভাষাতে, কোন দিনে, কোন মাসে, জাগ্রত অবস্থায়, না ঘুমন্ত অবস্থাতে, কাহার মাধ্যমে, তিনি কি মানবীয় আকৃতিতে আসিয়াছিলেন, না ভিন্ন আকৃতিতে, অনুরূপভাবে ওহীর সূচনালগ্নে ফেরেস্তা ও রাসূলে কারীম (স)-এর মধ্যকার রোমাঞ্চকর অবস্থার বিবরণ, কোন আয়াতে কারীমার মাধ্যমে ওহীর শুভ সূচনা এবং সর্বোপরি রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনে ওহীর শুভ সূচনা, প্রভাবসমূহ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি নিম্নে আলোচনা করা হইল।
ওহী-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ ওহী (وحی) শব্দের আভিধানিক অর্থ ইশারা, ইংগিত, ব্যক্ত করা, পৌঁছানো, নির্দেশ, প্রত্যাদিষ্ট বাণী, অনুক্ত বাণী (দ্র. লিসানুল আরাব, আল-মুফরাদাত ইত্যাদি)। কুরআন মজীদে উক্ত সব অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ:
وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا . "তোমার প্রতিপালক মৌমাছিকে ইঙ্গিত দিয়াছেন যে, পাহাড়ে গৃহ নির্মাণ কর" (১৬: ৬৮; আরও দ্র. ১৯: ১১)।
وَأَوْحَى فِي كُلِّ سَمَاءِ أَمْرَهَا . "এবং তিনি প্রত্যেক আকাশে উহার বিধান ব্যক্ত করিলেন" (৪১: ১২)।
إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّنَ مِنْ بَعْدِهِ. "নিশ্চয় আমি তোমার নিকট প্রত্যাদেশ পাঠাইয়াছি, যেমন নূহ ও তাহার পরবর্তী নবীগণের নিকট প্রত্যাদেশ পাঠাইয়াছি” (৪: ১৬৩)।
ثُمَّ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ أَنِ اتَّبِعْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا . "অতঃপর আমি তোমাকে নির্দেশ দিলাম যে, তুমি একনিষ্ঠ ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ কর" (১৬: ১২৩)।