📄 নবীগণকে হিকমত (প্রজ্ঞা) দান
নবীগণকে হিকমত (প্রজ্ঞা) দান
নবীগণকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে যেই সকল নি'মাত দান করা হইয়াছে তাহার মধ্যে বিশেষ একটি নি'মাতের কথা আল-কুরআনে বারংবার উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহা হইল হিকমত। ইবরাহীম ('আ)-এর বংশধরের উপর আল্লাহ তা'আলা যেই সকল অনুগ্রহ করিয়াছিলেন এইগুলির উল্লেখ করিয়া ইরশাদ হইয়াছে:
فَقَدْ أَتَيْنَا آلَ إِبْرَاهِيمَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَأَتَيْنَاهُمْ مُلْكًا عَظِيمًا (النساء - ٥٤ ) .
"আমি ইবরাহীমের বংশধরকেও তো কিতাব ও হিকমত দান করিয়াছিলাম এবং তাহাদিগকে বিশাল রাজ্য দান করিয়াছিলাম" (৪ঃ ৫৪)।
লুকমান ('আ) সম্পর্কে ইড়শাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ أَتَيْنَا لُقْمَانَ الحِكْمَةَ أَنِ اشْكُرْ لله . لقمان - (۱۲) .
"আমি লুকমানকে হিকমত দান করিয়াছিলাম এবং বলিয়াছিলাম, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর" (৩১: ১২)।
দাউদ ('আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَشَدَدْنَا مُلْكَهُ وَأَتَيْنُهُ الحِكْمَةَ وَفَصْلَ الخطاب (ص - ٢٠) .
"আমি তাহার রাজ্যকে সুদৃঢ় করিয়াছিলাম এবং তাহাকে দিয়াছিলাম প্রজ্ঞা ও ফায়সালাকারী বাগ্মিতা" (৩৮ঃ ২০)।
وَقَتَلَ دَاوُدُ جَالُوْتَ وَأَنْهُ اللهُ الْمُلْكَ وَالحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ (البقرة - ٢٥١).
"দাউদ জালুতকে সংহার করিল, আল্লাহ তাহাকে রাজত্ব ও হিকমত দান করিলেন এবং যাহা তিনি ইচ্ছা করিলেন তাহা তাহাকে শিক্ষা দিলেন" (২: ২৫১)।
আল-কুরআনে 'ঈসা ('আ)-এর উক্তি এইরূপ হইয়াছে:
قَدْ جِئْتُكُمْ بِالْحِكْمَةِ وَلَأُبَيِّنَ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي تَخْتَلِفُونَ فِيهِ (الزخرف ٦٣).
"আমি তো তোমাদের নিকট আসিয়াছি প্রজ্ঞাসহ এবং তোমরা যে কতক বিষয়ে মতভেদ করিতেছ তাহা স্পষ্ট করিয়া দিবার জন্য" (৪৩ঃ ৬৩)।
আল্লাহ তা'আলা ঈসা ('আ)-এর উপর তাঁহার অনুগ্রহের ব্যাপারে ইরশাদ করিয়াছেন:
وَاذْ عَلَّمْتُكَ الكتاب والحكمة والتَّوراة والانجيل (المائدة - ١١٠).
"আমি তোমাকে কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল শিক্ষা দিয়াছিলাম” (৫: ১১০)। সকল নবীর ব্যাপারে ইরশাদ হইয়াছে:
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّنَ لَمَا أَتَيْتُكُمْ مِّنْ كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ (আল ইমরান - ৮১).
"স্মরণ কর, যখন আল্লাহ নবীদের অংগীকার লইয়াছিলেন যে, তোমাদিগকে কিতাব ও হিকমত যাহা কিছু দিয়াছি” (৩:৮১)।
ইবরাহীম (আ) রাসূলুল্লাহ (স)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে দু'আ করিতে গিয়া বলিয়াছিলেন:
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولاً مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ ايتك وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (আল-বাকারা - ১২৯).
"হে আমার প্রতিপালক! তুমি তাহাদের মধ্য হইতে তাহাদের নিকট এক রাসূল প্রেরণ করিও যে তোমার আয়াতসমূহ তাহাদের নিকট তিলাওয়াত করিবে, তাহাদিগকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবে এবং তাহাদিগকে পবিত্র করিবে। তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়" (২:১২৯)।
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার দু'আ কবুল করা প্রসঙ্গে ইরশাদ করিলেন:
كَمَا أَرْسَلْنَا فِيكُمْ رَسُولاً مِنْكُمْ يَتْلُوا عَلَيْكُمْ أَيْتِنَا وَيُزَكِّيكُمْ وَيُعَلِّمُكُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُمْ مَا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ (আল-বাকারা - ১৫১).
"যেমন আমি তোমাদের মধ্য হইতে তোমাদের নিকট একজন রাসূল প্রেরণ করিয়াছি, যে আমার আয়াতসমূহ তোমাদের নিকট তিলাওয়াত করে, তোমাদিগকে পবিত্র করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়, আর তোমরা যাহা জানিতে না তাহা শিক্ষা দেয়” (২:১৫১)।
ইবরাহীম (আ)-এর দু'আর ফসল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর আবির্ভাবের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা মুমিনগণের প্রতি যেই করুণা প্রদর্শন করিয়াছেন সেই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيُّتُه وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَّلٍ مُّبِينٍ (আল ইমরান - ১৬৪).
"আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি অবশ্যই অনুগ্রহ করিয়াছেন যে, তিনি তাহাদের নিজেদের মধ্য হইতে তাহাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন, যে তাঁহার আয়াতসমূহ তাহাদের নিকট তিলাওয়াত করে, তাহাদিগকে পরিশোধন করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়, যদিও তাহারা পূর্বে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে ছিল" (৩:১৬৪)।
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولاً مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُّبِينٍ.
"তিনিই উম্মীদের মধ্যে একজন রাসূল পাঠাইয়াছেন তাহাদের মধ্য হইতে, যে তাহাদের নিকট আবৃত্তি করে তাঁহার আয়াতসমূহ, তাহাদিগকে পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমত। ইতোপূর্বে তো ইহারা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে” (৬২: ২)।
স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)-কে লক্ষ্য করিয়া ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَوْلا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ وَرَحْمَتُهُ لَهَمَّتْ طَائِفَةٌ مِّنْهُمْ أَنْ يُضِلُّوكَ وَمَا يُضِلُّونَ إِلَّا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَضُرُّونَكَ مِنْ شَيْءٍ وَأَنْزَلَ اللهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا (النساء -١١٣).
"তোমার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকিলে তাহাদের একদল তোমাকে পথভ্রষ্ট করিতে চাহিতই। কিন্তু তাহারা নিজদিগকে ব্যতীত আর কাহাকেও পথভ্রষ্ট করে না এবং তোমার কোনই ক্ষতি করিতে পারে না। আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হikমত অবতীর্ণ করিয়াছেন এবং তুমি যাহা জানিতে না তাহা তোমাকে শিক্ষা দিয়াছেন, তোমার প্রতি আল্লাহ্ মহাঅনুগ্রহ রহিয়াছে” (৪: ১১৩)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে উদ্দেশ্য করিয়া আরও ইরশাদ হইয়াছে:
ذلِكَ مِمَّا أَوْحَى إِلَيْكَ رَبُّكَ مِنَ الْحِكْمَةِ (اسرائيل -٣٩).
"তোমার প্রতিপালক ওহীর দ্বারা তোমাকে যে হিকমত দান করিয়াছেন এইগুলি তাহার অন্তর্ভুক্ত” (১৭:৩৯)।
সাধারণ মুসলমানদের উদ্দেশ্যে ইরশাদ হইয়াছে:
وَاذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَمَا أَنْزَلَ عَلَيْكُمْ مِنَ الْكِتَابِ وَالْحِكَمَةِ يَعِظُكُمْ بِهِ (البقرة - ٢٣١).
"তোমাদের প্রতি আল্লাহর নি'মাত ও কিতাব এবং হিকমত যাহা তিনি তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করিয়াছেন, যদ্ধারা তিনি তোমাদিগকে উপদেশ দেন, তাহা স্মরণ কর" (২: ২৩১)।
বিশেষভাবে উম্মত জননীগণের উদ্দেশ্যে ইরশাদ হইয়াছে:
وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيت الله والحكمة (الاحزاب - ٣٤).
"আল্লাহ্ আয়াত ও জ্ঞানের কথা যাহা তোমাদের গৃহে পঠিত হয়, তাহা তোমরা স্মরণ রাখিবে" (৩৩ : ৩৪)।
যোগ্যতানুযায়ী সাধারণ মুসলমানগণও হিকমতের মত আল্লাহর উপহার লাভ করিয়া থাকে। ইরশাদ হইয়াছে:
يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَنْ يَّشَاءُ وَمَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا (البقرة - ٢٦٩).
"তিনি যাহাকে ইচ্ছা হিকমত দান করেন এবং যাহাকে হিকমত দান করা হয় তাহাকে প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়" (২ : ২৬৯)।
হিকমতের মাধ্যমে দীনের তাবলীগ ও দাওয়াত দানেরও হুকুম দেওয়া হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
أدْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ (النَّحْلُ - ١٢٥ ).
"তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং উহাদের সহিত তর্ক করিবে উত্তম পন্থায়" (১৬ : ১২৫)।
একটি স্থানে কিয়ামত ও উপদেশমূলক বাণী সম্পর্কে হিকমত শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مِنَ الْأَنْبَاءِ مَا فِيْهِ مُزْدَجَرٌ حِكْمَةٌ بَالِغَةٌ فَمَا تُغْنِ النُّذُرُ (القمر ٤ - ٥ ) .
"উহাদের নিকট আসিয়াছে সুসংবাদ, যাহাতে আছে সাবধান বাণী, ইহা পরিপূর্ণ জ্ঞান, তবে এই সতর্কবাণী উহাদের কোন উপকারে আসে নাই” (৫৪ : ৪-৫)।
উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহে হikমত শব্দ প্রয়োগ করা হইয়াছে। ইহাতে হিকমত শব্দটি কখনও একা এবং কখনও কিতাব শব্দের পরে আসিয়াছে। হিকমত শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা ও কাজ। কিন্তু আয়াতগুলিতে ইহা কোন অর্থে প্রয়োগ হইয়াছে, ইহা অনুধাবন করিবার জন্য আভিধানবেত্তা ও তাফসীর বিশেষজ্ঞগণের অভিমত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সর্বাধিক প্রাচীন আভিধানিক ইব্ন দুরায়দ হিকমত শব্দের অর্থ লিখিয়াছেন:
فَكُلُّ كَلِمَةٍ وَعَظَتْكَ أَوْ زَجَرَتْكَ أَوْ دَعَتْكَ إِلَى مُكَرَّمَةٍ أَوْ نَهَتَكَ مِنْ قَبِيحٍ فَهِيَ حِكْمَةٌ وَحُكم.
"যেসকল কথা উপদেশ দান করে, সতর্ক করে, সুপথে আহবান করে এবং অমঙ্গলের পথ হইতে বারণ করে তাহাই হইল হিকমত ও হুকুম" (জামহারাতুল লুগাত, ২খ, পৃ. ১৮৬)।
অভিধান শাস্ত্রের ইমাম আল-জাওহারী লিখিয়াছেন:
الْحِكْمَةُ مِنَ الْعِلْمِ وَالْحَكِيمُ الْعَالِمُ وَصَاحِبُ الحِكْمَةِ الْحَكِيمُ الْمُتَّقِنُ لِلْأُمُورِ. “হিকমত হইল ইলম বা জ্ঞান, হাকীম হইল ‘আলিম বা জ্ঞানী, জ্ঞানের অধিকারী, সুষ্ঠুভাবে কাজ সম্পাদনকারী” (সিহাহু’ল লুগাত, ২খ, পৃ. ২৭৬)।
আরবী ভাষার প্রামাণ্য অভিধান লিসানুল ‘আরাব-এ বলা হইয়াছে:
وَالْحِكْمَةُ عِبَارَةٌ عَنْ مَعْرِفَةِ أَفْضَلِ الْإِشْيَاءِ بِأَفْضَلِ الْعُلُومِ. “উত্তম বস্তুকে উত্তম জ্ঞানের দ্বারা অনুধাবন করার নাম হইল হিকমত” (ইব্ন মানজুর, লিসানু’ল ‘আরাব, বি, ১৫খ., পৃ. ৩)।
রাগিব ইসফাহানী বলেন:
وَالْحِكْمُةُ اصَابَةُ الْحَقِّ بِالْعِلْمِ وَالْعَقْلِ فَالْحِكْمَةُ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى مَعْرِفَةُ الْأَشْيَاءِ وَايْجَادُهَا عَلَى غَايَةِ الْأَحْكَامِ مِنَ الْإِنْفَاقِ مَعْرِفَةُ الْمَوْجُودَاتِ وَفِعْلُ الْخَيْرَاتِ. “হিকমত হইতেছে জ্ঞান ও বুদ্ধি দ্বারা সত্য ও সঠিক কথা অবহিত হওয়া। আল্লাহ্র ক্ষেত্রে হিকমত হইতেছে বস্তুসমূহের জ্ঞান এবং এইগুলিকে চূড়ান্ত সুকৌশলে উদ্ভাবন করা। মানবজাতির পক্ষে হিকমত হইতেছে বিদ্যমান জিনিসসমূহকে জানা এবং উত্তম কার্যাবলী সম্পাদন করা” (মুফরাদাতুল কুরআন, মিসর, পৃ. ১২৬)।
হিকমতের ব্যাখ্যা প্রদানে ইব্ন হিব্বান আন্দালুসী তাঁহার নিম্নোক্ত সংজ্ঞায় অভিধানবেত্তাদের অধিকাংশ অভিমতকে প্রায় একত্র করিয়াছেন। তিনি বলেন:
قَالَ مَالِكٌ وَأَبُو رَزِينِ الْحِكْمَةُ الْفِقْهُ فِي الدِّينِ وَالْفَهْمُ الَّذِي هُوَ سَجَلَةً وَنُورٌ مِّنَ اللَّهِ تعالى. “মালিক ও আবূ রাযীন বলেন, হিকমত হইতেছে দীন সম্পর্কিত প্রজ্ঞা ও অনুধাবন শক্তি যাহা সহজাত। ইহা একটি নূরও বটে যাহা আল্লাহর পক্ষ হইতে লাভ হয়”।
মুজাহিদ বলেন, হিকমত হইতেছে কুরআন উপলব্ধি করা। মুকাতিল বলেন: الْحِكْمَةُ الْعِلْمُ وَالْعَمَدُ بِهِ لَا يَكُونُ لِلرَّجُلِ حَكِيمًا حَتَّى يَجْمَعَمُهَا . “হিকমত হইতেছে ‘ইল্ল্ম ও সেই মুতাবিক আমল করা। কোন লোককে ততক্ষণ হাকীম বলা যাইবে না যতক্ষণ তাহার মধ্যে ইল্ম ও আমলের সমন্বয় সাধিত না হয়।”
কেহ কেহ বলিয়াছেন, হিকমত হইল যাহা রাসূলের মাধ্যম ব্যতীত জানা যায় না। আবু জা’ফার মুহাম্মাদ ইব্ন ইয়া’কূব বলেন, যেই সঠিক কথা সঠিক ‘আমল পয়দা করে তাহাকে হিকমত বলা হয়। ইব্ন জারীর তাবারী বলেন:
وَالصَّوابُ مِنَ الْقَوْلِ عِنْدَنَا فِي الْحِكْمَةِ أَنَّهَا الْعِلْمُ بِأَحْكَامِ اللَّهِ الَّتِي لَا يُدْرَكُ عِلْمُهَا الا بِبَيَانِ الرَّسُولِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْمَعْرِفَةُ بِهَا مَا دَلَّ عَلَيْهِ ذَلِكَ مِنْ نَظَائِرِهِ وَهُوَ عِنْدِي مَأْخُوذُ مِنْ الْحُكْمِ الَّذِي بِمَعْنَى الْفَصْلِ بَيْنَ الْحَقِّ وَالْبَاطِلِ) .
"হিকমতের সংজ্ঞা সম্পর্কে আমাদের নিকট সঠিক কথা হইতেছে এই যে, ইহা হইল আল্লাহ্ সেই সকল বিধানাবলীর জ্ঞান যাহা কেবল রাসূলুল্লাহ (স)-এর বর্ণনা দ্বারা জানা যায়। আর যেই সকল উদাহরণ তাঁহার মধ্যে পাওয়া যায় যাহা তিনি গ্রহণ করিয়াছেন অথবা উপস্থাপন করিয়াছেন সেই সম্পর্কে পরিচিত হওয়া। আমার মতে ইহা حکم শব্দ হইতে নির্গত, যাহার অর্থ হইল সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা"।
অভিধানবেত্তা ও তাফসীরবিদদের এই সকল অভিমত একই অর্থের বিভিন্ন অভিব্যক্তি মাত্র। সারকথা এই যে, হিকমত হইল বিবেক-বুদ্ধি ও অনুভূতির পূর্ণ বৈশিষ্ট্যের নাম যাহার দ্বারা শুদ্ধ-অশুদ্ধ, ভুল-নির্ভুল, সত্য-মিথ্যা, হক-বাতিল ও মঙ্গল-অমঙ্গলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা যায়। ইহার জন্য চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা, দলীল, অভিজ্ঞতা ও তত্ত্ব অনুসন্ধানের প্রয়োজন হয় না, বরং স্বভাবতই ইহার স্বরূপ উদঘাটিত হইয়া যায়। সেই অনুসারে হিকমতধারী ব্যক্তির 'কাজ'ও হইয়া থাকে। অন্য কথায়, কোন কোন মানুষের মধ্যে বস্তুরাজির সত্য-মিথ্যা, কার্যাবলীর ভাল-মন্দের সঠিক অনুভূতি এবং সঠিক মানসিকতা পাওয়া যায়। তাঁহারা ঐ সকল কাজের সূক্ষ্ম হইতে সূক্ষ্মতর অবস্থা ও সমাধান সম্পর্কে আল্লাহ প্রদত্ত প্রজ্ঞা ও মননশীলতার দ্বারা এমন সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারেন, যাহা অন্যান্য লোক দীর্ঘ পর্যালোচনা এবং গবেষণার পরও দিতে সক্ষম হয় না। ইহাই হইল সেই মা'রিফাত বা আল্লাহপ্রদত্ত নূর যাহা চেষ্টা ও সাধনায় অর্জিত হয় না। ইহাই হইল 'হিকমত'।
আল্লাহপ্রদত্ত অন্য সকল যোগ্যতা ও প্রকৃতিগত দানের মত হিকমতের দানও সকল মানুষ সমভাবে প্রাপ্ত হয় না। ইহা বিভিন্ন পর্যায় ও মাত্রায় মানুষ লাভ করিয়া থাকে। কিন্তু ইহার উচ্চতর ও পরিপূর্ণ মাত্রা নবীগণ লাভ করিয়া থাকেন। যেইভাবে আল্লাহ প্রদত্ত অনুভূতি, ধর্মীয় বুদ্ধি ও জ্যোতির্ময় শক্তির প্রতি হিকমতের প্রয়োগ হয়, অনুরূপভাবে এই শক্তির নিদর্শনাবলী, ফলাফল এবং ইহার শিক্ষার প্রতিও হিকমতের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। উল্লিখিত (১৩ : ১২) আয়াতে লুকমান ('আ)-কে হিকমত প্রদানের কথা বলা হইয়াছে। লুকমান ('আ)-কে যেই হিকমত প্রদান করা হইয়াছে তাহার বিবরণ হইল : আল্লাহ্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, শিরক হইতে বারণ করা, মাতাপিতার সেবা করা, ভাল লোকের অনুসরণ করা, সর্বত্র আল্লাহ্র 'ইল্ম, সালাতের আদেশ দান, ধৈর্য ধারণ, অহংকার না করা, মধ্যম পন্থা অবলম্বন, নীচু স্বরে কথা বলা ইত্যাদি। অনুরূপ হিকমতে মুহাম্মাদীর নিম্নলিখিত শিক্ষার বিশদ বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। শিরক হইতে নিষেধ, মাতা-পিতার প্রতি সদয় ব্যবহার, প্রতিবেশী ও দুঃস্থদের সহিত সদাচরণ, অপচয় হইতে নিষেধ, বিনয়ের সহিত কথা বলা ইত্যাদি বিষয়াদির উল্লেখ করিয়া আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন:
ذُلِكَ مِمَّا أَوْحَى إِلَيْكَ رَبُّكَ مِنَ الْحِكْمَةِ (الاسراء - ٣٩) .
"তোমার প্রতিপালক ওহীর দ্বারা তোমাকে যে হিকমত দান করিয়াছেন এইগুলি তাহার অন্তর্ভুক্ত” (১৭: ৩৯)
বস্তুত হিকমত এমন সকল কথা ও বার্তা যাহার বিশ্বজনীন সত্যতাকে স্বয়ং মানব স্বভাব ও নৈতিক অনুভূতি গ্রহণ করিয়া লয়। মোটকথা, হিকমতের এই শক্তি নবীগণ পরিপূর্ণভাবে অর্জন করিয়াছেন। ইহার ফলে তাঁহাদের প্রতিটি কথা প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং প্রতিটি কাজ বিচক্ষণতায় পরিপূর্ণ ছিল। হিকমতের লক্ষণাদি তাঁহাদের কথা ও কাজে বিকশিত হইয়া উঠিয়াছিল (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ৮৭)।
📄 নবীগণের ইল্ল্ম (জ্ঞান)
নবীগণের ইল্ল্ম (জ্ঞান)
'ইল্ম শব্দের আভিধানিক অর্থ 'জানা'। কিন্তু প্রত্যেক বিষয়ের জানার ধরন ও অবগতির মাধ্যম বিভিন্ন হইয়া থাকে। নবীগণের 'ইল্ম বলিতে স্বভাবতই আল্লাহ্ তাওহীদ, তাঁহার সত্তা, গুণাবলী, ধর্ম, শরী'আতের বিধানাবলী ও চারিত্রিক শিক্ষাকে বুঝানো হয়। ইবরাহীম ('আ) তাওহীদের দলীল উপস্থাপন করিয়া স্বীয় পিতাকে বলিলেন:
يَا أَبَتِ إِنِّي قَدْ جَاءَنِي مِنَ الْعِلْمِ مَالَمْ يَأْتِكَ (مريم ٤٣).
"হে আমার পিতা! আমার নিকট তো আসিয়াছে জ্ঞান যাহা তোমার নিকট আসে নাই" (১৯:৪৩)
খিযির ('আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَعَلَّمْنَاهُ مِنْ لَدُنَّا عَلمًا (الكهف - ٦٥ ) .
"আমার নিকট হইতে তাহাকে শিক্ষা দিয়াছিলাম এক বিশেষ জ্ঞান" (১৮: ৬৫)।
আল্লাহই তো সকল জিনিস দান করেন। তাহা সত্ত্বেও তাঁহার 'ইল্ম শিক্ষাদানের অর্থ কি? যাহা মানুষের পরিশ্রম ও চেষ্টা ব্যতীত অর্জিত হয় সেই সকল জিনিসকে 'আল্লাহ্র নিকট হইতে' বলা হয়। তাই আল্লাহ্র নিকট হইতে ইল্ম লাভের অর্থ হইল সেই ধরনের 'ইলম অর্জন করা যাহা মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞানোপকরণ, প্রমাণ উপস্থাপন ও চিন্তা-সাধনা ছাড়াই লাভ হয়। ইহাই হইল আল্লাহ প্রদত্ত ইল্ম। এই কারণে সূফীদের পরিভাষায় ইহাকে ইল্ম লাদুন্নী বলা হয়। দাউদ ('আ) ও সুলায়মান ('আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ أَتَيْنَا دَاوُدَ وَسُلَيْمَانَ علمًا (النمل - ١٥).
"আমি অবশ্যই দাউদ ও সুলায়মানকে জ্ঞান দান করিয়াছিলাম” (২৭: ১৫)। ইয়ূসুফ ('আ)-এর নবুওয়াতের ঊষালগ্ন সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَكَذَلِكَ يَجْتَبِيكَ رَبُّكَ وَيُعَلِّمُكَ مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ وَيُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَعَلَى آلِ يَعْقُوبَ ( يوسف -٦).
"এইভাবে তোমার প্রতিপালক তোমাকে মনোনীত করিবেন, তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিবেন এবং তোমার প্রতি ও ইয়াকূবের পরিজনের প্রতি তাঁহার অনুগ্রহ পূর্ণ করিবেন" (১২:৬)।
উক্ত আয়াতগুলিতে সেই 'ইলমের উল্লেখ নাই যাহা সময়ের সহিত সম্পৃক্ত থাকে। কারণ বাক্যের বিন্যাস হইতে অনুমিত হয় যে, এখানে একবারই ইল্ম দানের কথা বলা হইয়াছে, যাহা নির্ধারিত ওহীর শান হইতে পারে না। ইয়ূসুফ ('আ) কর্তৃক একটি স্বপ্নের ফলাফল বর্ণনা প্রসঙ্গে ইরশাদ হইয়াছেঃ
ذلِكَمَا مِمَّا عَلَّمَنِي رَبِّي (يوسف -۳۷). 'আমি যাহা তোমাদিগকে বলিব, তাহা আমার প্রতিপালক আমাকে যাহা শিক্ষা দিয়াছেন তাহা হইতে বলিব” (১২ঃ ৩৭)।
এই কথা কোথাও বলা হয় নাই যে, স্বপ্নের ফলাফল বলিবার সময় তাঁহার উপর ওহী অবতীর্ণ হইয়াছিল, বরং তাঁহার মধ্যে এই ইল্মের শক্তি স্থায়ীভাবে দান করা হইয়াছিল। এই প্রকারের জ্ঞানের কারণেই কোন কোন নবীকে শিশুকালেই 'আলীম )علیم( )দ্র. ১৫:৫৩ ও ৫১: ২৮) বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে।
ইহা হইতে বুঝা যায় সময় সময় নবীগণের নিকট নাযিলকৃত নির্দিষ্ট ওহী ছাড়া ও 'ইলমের একটি স্থায়ী দান নবীগণকে প্রদান করা হইয়াছিল। ইহাকে নবীগণের স্বাভাবিক ইল্ম বা জ্ঞান বলিয়া অভিহিত করা যায় (শিবলী নু'মানী-সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ৯৬)।
📄 সকল নবীর দীন এক ও অভিন্ন
সকল নবীর দীন এক ও অভিন্ন
এই জগতে যত নবী-রাসূল আগমন করিয়াছিলেন তাঁহাদের দীনের মূলনীতি ছিল এক ও অভিন্ন। অবশ্য তাঁহাদের ধর্মাচরণ ও বিধানাবলী সর্বক্ষেত্রে একই ধরনের ছিল না। নূহ ('আ) হইতে 'ঈসা ('আ) পর্যন্ত সময়ে শরীআতের বিধানে বহু পার্থক্য ছিল। তাহা সত্ত্বেও আল-কুরআনে ইহাকে একই ধর্ম বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
شَرَعَ لَكُمْ مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ (الشورى ۱۳).
“তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করিয়াছেন দীন যাহার নির্দেশ দিয়াছিলেন তিনি নূহকে, আর যাহা আমি ওহী করিয়াছি তোমাকে এবং যাহা নির্দেশ দিয়াছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও 'ঈসাকে এই বলিয়া যে, তোমরা দীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং উহাতে মতভেদ করিও না” (৪২: ১৩)।
আয়াতে উল্লিখিত নবীগণের বিধানাবলীর আনুষঙ্গিক বিষয়ে বিভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও ইহাকে আদ-দীন বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। যদি শাখা-প্রশাখার বিভিন্নতাকে তাঁহাদের দীনের বিভেদ বলিয়া গণ্য করা হইত তাহা হইলে (وَلاَ تَفَرَّقُوا فِيهِ) তোমরা উহাতে মতভেদ করিও না) এই ঘোষণা কি করিয়া যথার্থ হইত (বদরে ‘আলম মিরাঠী, তরজুমানুস সুন্নাহ, ১খ, পৃ. ৩৭)? এই সম্পর্কে শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবীর বক্তব্য হইল, পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল আসিয়াছিলেন, তাঁহারা একই ধর্মবিশ্বাস লইয়া আগমন করিয়াছিলেন। তাওহীদ, নবুওয়াত, 'ইবাদত, আখলাক, শান্তি ও পুরস্কার এবং আমল ও ইবাদতে তাহা ছিল এক ও অভিন্ন। এই দিক দিয়া নবীগণের শিক্ষায় কোন মৌলিক প্রভেদ ছিল না। তবে নবীগণের শিক্ষার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাওহীদের। ইহাই হইতেছে নবুওয়াতের মৌল অবিনশ্বর প্রবাহ। ইসলামের পূর্বে পৃথিবীতে বহু ভাল মানুষ আসিয়াছিলেন। তাঁহাদের দাওয়াতও ছিল উপকারী, তাহাদের চারিত্রিক পথনির্দেশও ছিল হৃদয়গ্রাহী। তবে গ্রীক দার্শনিক বা হিন্দুস্তানের অবতার বা অন্য কাহারও দাওয়াতে তাওহীদের শিক্ষা বিদ্যমান না থাকিলে তাহারা কস্মিন কালেও নবুওয়াতের মর্যাদার অধিকারী হইতে পারে না। নবীসুলভ শিক্ষার পরিচয়ই হইল তাওহীদের দাওআত। এই দাওয়াত পাওয়া না গেলে নবুওয়াতও পাওয়া যায় না। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে :
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلهُ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ.
"আমি তোমার পূর্বে এমন কোন রাসূল প্রেরণ করি নাই তাহার প্রতি এই ওহী ব্যতীত যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর” (২১: ২৫)।
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولاً أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ.
"আল্লাহ্ ইবাদত করিবার ও তাগূতকে বর্জন করিবার নির্দেশ দিবার জন্য আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠাইয়াছি” (১৬: ৩৬)।
ইহা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, তাওহীদের দ্বারাই নবুওয়াতের পরিচয় লাভ করা যায়। ইসলামের দাওআত আসিবার পূর্বে ধর্ম প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ যদি তাওহীদ ভিত্তিক না হয় তাহা হইলে তাহার নবুওয়াতের দাবির কোনই অবকাশ নাই (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদাবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ১১৪)।
সায়্যিদ আবুল 'আলা মওদূদী বলেন, নবীর পর নবী আসিয়াছেন বলিয়া আমরা আল-কুরআন দ্বারা অবগত হইয়াছি। তাঁহারা সকলেই স্বীয় গোত্রকে এই দাওআত দিয়াছেন :
يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهِ غَيْرُهُ (هود - ٥٠).
"হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ নাই" (১১:৫)।
ব্যাবিলন শহর হউক আর সাদৃম এলাকা হউক বা পৃথিবীর অন্য যে কোন অঞ্চলের হউক, তাঁহারা দাস শ্রেণীর হউক বা রাজেশ্বর হউক, সর্ব জাতিতে সর্বকালে সর্ব স্থানে আল্লাহর পক্ষ হইতে আগত পথপ্রদর্শকগণ মানবজাতির সামনে এই একই দাওয়াত পেশ করিয়াছিলেন। ইবরাহীম ('আ) তাঁহার জাতিকে বলিয়া দিয়াছিলেন, তোমাদের মধ্যে ও আমার মধ্যে কোন পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার বন্ধন সেই পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হইবে না যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহ্ তাওহীদে বিশ্বাস করিবে। ইরশাদ হইয়াছে:
كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ.
"আমরা তোমাদিগকে মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হইল শত্রুতা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য- যদি না তোমরা এক আল্লাহতে ঈমান আন" (৬০:৪)।
মূসা ('আ) ফিরআউনের সম্মুখে গিয়া বনূ ইসরাঈলকে তাঁহার সঙ্গে প্রেরণ করিবার পূর্বে তাহাকে বলিয়াছিলেন, তুমি তো আমার প্রভু নহ, আমার প্রভু হইলেন:
رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَى كُلَّ شَيْءٍ خَلَقَهُ ثُمَّ هَدَى (طه - ٥٠ ) .
"আমাদের প্রতিপালক তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তাহার আকৃতি দান করিয়াছেন, অতঃপর পথনির্দেশ করিয়াছেন" (২০:৫০)।
ঈসা ('আ) বনূ ইসরাঈলকে দাওআত দিয়াছিলেন এই বলিয়া:
إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٌ (ال عمران - ٥١ ) .
"নিশ্চয় আল্লাহ আমার প্রতিপালক এবং তোমাদের প্রতিপালক। সুতরাং তোমরা তাঁহার ইবাদত করিবে; ইহাই সরল পথ" (৩: ৫১)। (সায়্যিদ আবুল 'আলা মওদূদী, সীরাতে সারওয়ারে আলম, ১খ, পৃ. ৬৬)।
📄 নুবওয়াত লাভের পূর্বে নবীগণের অবস্থা
নুবওয়াত লাভের পূর্বে নবীগণের অবস্থা
আল-কুরআন হইতে জানা যায় যে, ওহী আসিবার পূর্বে নবীগণের 'ইল্ম সাধারণ মানুষের ইল্ম হইতে ভিন্নতর হয় না। সাধারণের মত তাঁহাদের নিকট ইল্ম আসিবার অন্য কোন মাধ্যমও থাকে না। ইরশাদ হইয়াছেঃ
مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيْمَانُ (الشورى - ٥٢ ) .
"তুমি তো জানিতে না কিতাব কি এবং ঈমান কি" (৪২ঃ ৫২)?
وَوَجَدَكَ ضَالاً فَهَدَى (الضحى (۷).
"তিনি তোমাকে পাইলেন পথ সম্পর্কে অনবহিত, অতঃপর তিনি পথের নির্দেশ দিলেন” (৯৩ঃ ৭)।
এতদসঙ্গে আল-কুরআন হইতে আমরা ইহাও অবগত হই যে, নবুওয়াত লাভের পূর্বে নবীগণ সাধারণের 'ইল্ম ও মারিফাতের মত 'ইল্ম দ্বারা গায়বের উপর ঈমান আনার সোপান অতিক্রম করিয়া থাকেন। ওহী আসিয়া কেবল তাহা সুদৃঢ় করিয়া থাকে। তাঁহাদের অন্তরে ঈমানের যেই রহস্য বদ্ধমূল থাকে ওহী আসিয়া ইহার অনুকূলে সাক্ষী দান করে যে, ইহাই সঠিক ও যথার্থ ঈমান, যাহাতে তাঁহারা পূর্ণ আস্থার সহিত দুনিয়াবাসীর সামনে ইহার সাক্ষ্য প্রদান করিতে পারেন। এই বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে নিম্নোক্ত আয়াতে পরিস্ফুটিত হইয়া উঠিয়াছে :
أَفَمَنْ كَانَ عَلَى بَيِّنَةٍ مِنْ رَبِّهِ وَيَتْلُوهُ شَاهِدٌ مِنْهُ وَمِنْ قَبْلِهِ كِتَابٌ مُوسَى إِمَامًا وَرَحْمَةً (হুদ- ১৭).
"তাহারা কি উহাদের সমতুল্য যাহারা প্রতিষ্ঠিত উহাদের প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণের উপর, যাহার অনুসরণ করে তাঁহার প্রেরিত সাক্ষী এবং যাহার পূর্বে ছিল মূসার কিতাব আদর্শ ও অনুগ্রহস্বরূপ” (১১:১৭)?
নূহ ('আ)-এর উক্তি আল-কুরআনে এইভাবে ব্যক্ত হইয়াছে :
يُقَوْمِ أَرَأَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّنْ رَّبِّي وَأَتْنِي رَحْمَةً مِّنْ عِنْدِهِ فَعُمِيَتْ عَلَيْكُمْ أَنْتَزِمُكُمُوهَا وَأَنْتُمْ لَهَا كُرْهُونَ (هود-২৮).
"হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে বল, আমি যদি আমার প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট নিদর্শনে প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং তিনি যদি আমাকে তাঁহার নিজ অনুগ্রহ হইতে দান করিয়া থাকেন, আর ইহা তোমাদের নিকট গোপন রাখা হইয়াছে, আমি কি এই বিষয়ে তোমাদিগকে বাধ্য করিতে পারি, যখন তোমরা ইহা অপসন্দ কর" (১১: ২৮)?
ঠিক এই বিষয়টি উক্ত সূরার ৬৩ নং আয়াতে এবং ৮৮ নং আয়াতে যথাক্রমে সালিহ ('আ) ও শু'আয়ব ('আ)-এর যবানীতে ব্যক্ত হইয়াছে। ইহা হইতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ওহীর মাধ্যমে পথনির্দেশ লাভের পূর্বে নবীগণ পর্যবেক্ষণ ও ধ্যান-ধারণার সৃষ্টিগত যোগ্যতা দ্বারা তাওহীদের রহস্য পর্যন্ত পৌঁছিয়া থাকেন। ইহার পর আল্লাহ তা'আলা আবার তাঁহাদিগকে ইহার অনুকূলে ইলমে ওহী দান করিয়া থাকেন। এই দান অর্জিত নহে, বরং আল্লাহ প্রদত্ত হইয়া থাকে (সায়্যিদ আবুল আ'লা মওদূদী, সীরাতে সারওয়ারে 'আলম, ১খ, পৃ. ৭২)।