📄 যে পাঁচটি ইজতিহাদী বিষয়ে সতর্ক করা হইয়াছিল
আরেকটি কথা স্মরণ রাখা দরকার যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবীসুলভ ইজতিহাদে যদি কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়, তাহা হইলে ইহার অর্থ এই নয় যে, তিনি যাহা গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা ছিল গুনাহ ও নিষিদ্ধ পন্থা, বরং ইহার অর্থ হইল দুইটি উত্তম পন্থা হইতে অধিকতর উত্তম পন্থাকে ছাড়িয়া তিনি অপেক্ষাকৃত কম উত্তম পন্থাকে অবলম্বন করিয়াছিলেন। ইহাতে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সাবধান করিয়া সর্বোত্তম পন্থা অনুসরণ করিবার তাকীদ করিয়াছেন। সতর্কীকরণকৃত বিষয়গুলির প্রতি তাকাইলেই বুঝা যায়, অপেক্ষাকৃত কম উত্তম বিষয়টি অবলম্বন করার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উদ্দেশ্য ছিল উম্মতের প্রতি তাঁহার সর্বদা দয়া প্রদর্শন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ছিল এই ক্ষেত্রে কঠোর মনোভার পোষণ করা।
(এক) হিজরতের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট একদা মক্কার বড় বড় কাফির নেতারা আসিয়া বসিল। তিনি তাহাদেরকে প্রতিমা পূজার কুফল এবং তাওহীদের কল্যাণ সম্পর্কে বুঝাইতেছিলেন। এই সময় তাঁহার মনস্কামনা ছিল যে, তাহারা যেন ইসলাম গ্রহণ করে। ইত্যবসরে সহজ-সরল মুসলমান আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম (রা) তাঁহার দরবারে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং কিছু বলিতে চাহিলেন। সামাজিক মর্যাদায় তিনি ঐ নেতাদের চেয়ে দুর্বল ছিলেন। মক্কার উক্ত কাফিররা ছিল অহংকারী অভিজাত শ্রেণীর লোক। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে এই অজুহাতে আসিতে চাহিত না যে, তাঁহার দরবারে সামাজিকভাবে নিম্নশ্রেণীর লোকেরা আসে। রাসূলুল্লাহ (স) লক্ষ্য করিয়াছিলেন যে, ঐ নেতাদের উপর তাঁহার প্রভাব পড়িতৈছে। এই কারণে এই মুহূর্তে আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম (রা)-এর আগমনকে রাসূলুল্লাহ (স) খুশিমনে গ্রহণ করিতে পারেন নাই। তিনি ভাবিয়াছিলেন, আবদুল্লাহ ইব্ন উম্মে মাকতূম (রা) তো মুসলমানই, সুতরাং এই মুহূর্তে তাহার প্রশ্নের জবাব না দেওয়াতে কোন ক্ষতি নাই। কিন্তু মক্কার ঐ কাফির নেতাগণ বিরক্তি বোধ করিলে মক্কার অধিবাসিগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হইবে। অপর দিকে তাহারা মুসলমান হইয়া গেলে মক্কাতে ইসলাম প্রচারের সকল বাধা দূর হইয়া যাইবে। এই কথা ভাবিয়া তিনি আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতূম (রা)-এর প্রতি অমনোযোগী হইয়া সর্বাত্মকভাবে ঐ নেতাগণের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিলেন। এই আচরণের উপর ওহী দ্বারা নিম্নভাবে সতর্ক করা হয়। ইরশাদ হইয়াছে:
عَبَسَ وَتَوَلَّى أَنْ جَاءَهُ الْأَعْمَى، وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّى. أَوْ يَذَّكَّرُ فَتَنْفَعَهُ الذِّكْرَى. أَمَّا مَنِ اسْتَغْنَى. فَأَنْتَ لَهُ تَصَدَّى وَمَا عَلَيْكَ اَلا يَزَّكَّى. وَأَمَّا مَنْ جَاءَكَ يَسْعَى، وَهُوَ يَخْشَى فَأَنْتَ عَنْهُ تَلَهَى كَلأَ إِنَّهَا تَذْكِرَةٌ. فَمَنْ شَاءَ ذَكَرَهُ (عبس ١-١٢).
"সে ভ্রুকুঞ্চিত করিল এবং মুখ ফিরাইয়া লইল, কারণ তাহার নিকট অন্ধ লোকটি আসিল। তুমি কেমন করিয়া জানিবে সে হয়ত পরিশুদ্ধ হইত অথবা উপদেশ গ্রহণ করিত, ফলে উপদেশ তাহার উপকারে আসিত। পক্ষান্তরে যে পরোয়া করে না, তুমি তাহার প্রতি মনোযোগ দিয়াছ। অথচ সে নিজে পরিশুদ্ধ না হইলে তোমার কোন দায়িত্ব নাই। অন্যপক্ষে যে তোমার নিকট ছুটিয়া আসিল, আর সে সশংকচিত্ত, তুমি তাহাকে উপেক্ষা করিলে। না, ইহা ঠিক নহে, ইহা তো উপদেশবাণী, যে ইচ্ছা করিবে সে ইহা স্মরণ রাখিবে" (৮০: ১-১২)।
এই আয়াত হইতে ইসলামের একটি মূলনীতির বিষয় জানা যায় যে, ইহাতে ধনী ও নির্ধন, মনিব ও গোলাম, সম্মানিত ও দুর্বলের মধ্যে কোন বৈষম্য নাই।
(দুই) ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরে জয়ী হইবার পর মুসলমানগণের গনীমতের মাল লাভ ও বন্দীদের নিকট হইতে মুক্তিপণ গ্রহণ সম্পর্কিত ঘটনা। তখনও গনীমতের মাল ও মুক্তিপণ (ফিদয়া) গ্রহণের বিধান অবতীর্ণ হয় নাই। মদীনায় হিজরত করিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) সারিয়্যায়ে নাখলা হইতে কিছু গনীমত লাভ করিয়াছিলেন। ইহার পরবর্তী পদক্ষেপই হইল বদর যুদ্ধ হইতে প্রাপ্ত গনীমত। এই যুদ্ধে কুরায়শ বংশের সত্তরজন কাফির বন্দী হইয়াছিল, যাহাদের অধিকাংশ মক্কায় ধনাঢ্য ও অভিজাত বংশের ছিল। তাহাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মুসলমানদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিল। কেহ বলিলেন, উহাদিগকে হত্যা করা হউক। কেহ বলিলেন, মুক্তিপণ লইয়া উহাদিগকে মুক্তি দেওয়া হউক। 'উমার (রা) তাহাদেরকে হত্যা করিবার পরামর্শ দিলেন। মুক্তিপণ লইয়া মুক্ত করিয়া দিবার পরামর্শ ছিল আবূ বাক্র (রা)-এর। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পরামর্শ গ্রহণ করিয়া উহাদেরকে মুক্ত করিয়া দিলেন। এই সময় রাসূলুল্লাহ (স) আবূ বাক্র ও উমার (রা) উভয়কে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেনঃ হে আবু বাক্র! তোমার উপমা হইলেন ইবরাহীম ও 'ঈসা (আ)। হে উমার! তোমার উপমা হইলেন নূহ্ ও মূসা (আ)। কিন্তু আল্লাহ্র ইচ্ছা ছিল 'উমার (রা)-এর পরামর্শের অনুকূলে। কারণ মুক্তিপণ গ্রহণের ফলে এই সহজ-সরল মুসলমানদের মনে সম্পদের প্রতি লোভ বৃদ্ধির আশংকা ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক এইরূপ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ওহী দ্বারা তাঁহাকে সাবধান করা হইয়াছিল। ইরশাদ হইয়াছে:
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُشْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ. لَوْلا كِتَابٌ مِّنَ اللهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيْمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ. فَكُلُوا مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلالاً طَيِّبًا وَاتَّقُوا اللهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (الانفال - ٦٧).
"দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্য সংগত নহে। তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ চাহেন পরলোকের কল্যাণ। আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহর পূর্ববিধান না থাকিলে তোমরা যাহা গ্রহণ করিয়াছ তজ্জন্য তোমাদের উপর মহাশাস্তি আপতিত হইত। যুদ্ধে যাহা তোমরা লাভ করিয়াছ তাহা বৈধ ও উত্তম বলিয়া ভোগ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৮: ৬৭-৬৯)।
শুধু ইহাই নহে, যেই বন্দীদের নিকট হইতে মুক্তিপণ আদায় করা হইয়াছিল বা হইতেছিল, তাহদিগকে এই বলিয়া সান্ত্বনা দেওয়া হইয়াছে: يٰاَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِّمَنْ فِيْٓ اَيْدِيْكُمْ مِّنَ الْاَسْرٰىٓ اِنْ يَّعْلَمِ اللّٰهُ فِيْ قُلُوْبِكُمْ خَيْرًا يُّؤْتِكُمْ خَيْرًا مِّمَّآ اُخِذَ مِنْكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللّٰهُ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ.
"হে নবী! তোমাদের করায়ত্ত যুদ্ধ বন্দীদিগকে বল, আল্লাহ যদি তোমাদের হৃদয়ে ভাল কিছু দেখেন তবে তোমাদের নিকট হইতে যাহা লওয়া হইয়াছে তাহা অপেক্ষা উত্তম কিছু তিনি তোমাদিগকে দান করিবেন এবং তোমাদিগকে ক্ষমা করিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৮:৭০)।
ওহী আসিবার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় ইজতিহাদ দ্বারা যেই মুক্তিপণ ও গণীমত গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং যাহার উপর সাবধানবাণীও আসিয়াছিল, পরবর্তী কালে ওহী আসিয়া তাহা বৈধ ঘোষণা করিয়া দিল।
(তিন) রাসূলুল্লাহ (স) তাবুক অভিযানে রওয়ানা করিলেন। এই অভিযানে অধিক সংখ্যক মুসলিম সৈন্যের অংশগ্রহণ প্রয়োজন ছিল। কারণ প্রতিপক্ষ ছিল রোমান বাহিনী। তাহাদের বাহিনী ছিল বিশাল। ইহা ছাড়া কোন প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ইহা ছিল মুসলমানদের প্রথম অভিযান। উপরন্তু সময়টি ছিল তীব্র গ্রীষ্মকাল। ত্রিশ হাজার মুসলিম বাহিনী রওয়ানা করিলেন। কিছু সংখ্যক নিবেদিতপ্রাণ মুসলমান ওযরবশত ইহাতে অংশগ্রহণ করিতে পারেন নাই। কিন্তু অধিকাংশ মুনাফিক ইচ্ছা করিয়াই ইহাতে যোগদান হইতে বিরত থাকিল। যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ধূর্ত মুনাফিকরা আসিয়া তাহাদের অনুপস্থিতির ব্যাপারে মিথ্যা শপথ করিতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের এই মিথ্যা ওযর গ্রহণ করিয়া তাহাদের অপরাধ ক্ষমা করিয়া দিলেন। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নোক্ত সতর্কবাণী অবতীর্ণ হয়।
وَسَيَحْلِفُوْنَ بِاللهِ لَوَاسْتَطَعْنَا لَخَرَجْنَا مَعَكُمْ يُهْلِكُونَ أَنْفُسَهُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ. عَفَا اللَّهُ عَنْكَ لِمَ أَذِنْتَ لَهُمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَتَعْلَمَ الْكَاذِبِينَ (التوبة - ٤٢-٤٣ ) .
“উহারা অচিরেই আল্লাহ্ নামে শপথ করিয়া বলিবে, পারিলে আমরা নিশ্চয়ই তোমাদের সংগে বাহির হইতাম। উহারা নিজদিগকেই ধ্বংস করে। আল্লাহ জানেন উহারা অবশ্যই মিথ্যাচারী। আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করিয়াছেন। কাহারা সত্যবাদী তাহা তোমার নিকট স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত এবং কাহারা মিথ্যাবাদী তাহা না জানা পর্যন্ত তুমি কেন উহাদিগকে অব্যাহতি দিলে” (৯:৪২-৪৩)?
স্পষ্টই রাসূলুল্লাহ (স) গায়ব সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। মুনাফিকদের আসল অবস্থা সম্পর্কেও তিনি জানিতেন না। এই কারণে তাহাদের বাহ্যিক কথার উপরই তাঁহাকে নির্ভর করিতে হইয়াছিল। কিন্তু আলিমুল গায়ব আল্লাহ্ তাহাদের মুখোশ উন্মোচন করিয়া দিয়াছেন।
(চার) মুনাফিকদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবহিত করা হইয়াছিল যে, তাহাদের অনুকূলে তাঁহার দু'আ কবুল হইবে না। ইরশাদ হইয়াছে: اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ (توبة - ٨٠).
“তুমি উহাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা উহাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না কর একই কথা। তুমি সত্তর বার উহাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিলেও আল্লাহ উহাদিগকে কখনও ক্ষমা করিবেন না। ইহা এইজন্য যে, উহারা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সহিত কুফরী করিয়াছে” (৯:৮০)।
এই আদেশ অবতীর্ণ হইবার পর মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি ইব্ন সালূল মারা যায়। তাহার ছেলে একজন খাঁটী মুসলমান ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিয়া তাহার পিতার সালাতে জানাযা আদায় করার জন্য আবেদন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার অফুরন্ত দয়ার্দ্রতার দরুন সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করিলেন না। উমার (রা) স্মরণ করাইয়াও দিয়াছিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! সে ক্ষমার অযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে তো হুকুম আসিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি সত্তরবার হইতেও বেশী তাহার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিব। উপরিউক্ত আয়াতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাগফিরাত চাওয়া ও না চাওয়াকে নিষ্ফল বলা হইয়াছে, কিন্তু স্পষ্টভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করাকে নিষেধ করা হয় নাই। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স) দয়াপরবশ হইয়া এই প্রার্থনা করিয়া ফেলিয়াছিলেন যাহাতে তাহার নিবেদিত-প্রাণ মুসলিম সন্তান ভগ্নহৃদয় না হয়। কিন্তু তিনি এই কথার প্রতি মনোনিবেশ করেন নাই যে, ইহার ফলে অসংখ্য মুনাফিক নিজদিগকে প্রচ্ছন্ন রাখিবার সুযোগ পাইয়া যাইবে এবং মুসলমানদের মধ্যে গণ্য হইয়া তাহাদের অভ্যন্তরে ফিতনা সৃষ্টি করার সুযোগ লাভ করিবে। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلاَ تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَدًا وَلاَ تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَسِقُونَ (التوبة - ٨٤) .
"উহাদের মধ্যে কাহারও মৃত্যু হইলে তুমি কখনও উহার জন্য জানাযার সালাত পড়িবে না এবং উহার কবর-পার্শ্বে দাঁড়াইবে না। উহারা তো আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলকে অস্বীকার করিয়াছিল এবং পাপাচারী অবস্থায় উহাদের মৃত্যু হইয়াছে” (৯:৮৪)।
(পাঁচ) রাসূলুল্লাহ (স) একদা স্বীয় স্ত্রীগণের কাহারও কাহারও পরিতুষ্টির জন্য তাঁহার প্রিয় খাবার এক হালাল জিনিস (মধু) কখনওব্যবহার না করিবার অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। কোন হালাল জিনিস সকলকে খাইতে হইবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নাই। স্বীয় ইচ্ছায় বা কাহারও মনোস্তুষ্টির জন্য ইহা ভক্ষণ না করিবার সংকল্প করিবার তাহার অধিকার রহিয়াছে। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স) যদি তাঁহার কোন স্ত্রীর মন পাইবার জন্য ঐ স্ত্রীর নিকট অপসন্দনীয় কোন বস্তু ভক্ষণ না করিবার উদ্দেশ্যে নিজের জন্য হারাম করিয়া থাকেন তাহা হইলে ইহা তেমন দূষণীয় নয়। একজন সুস্বামী হিসাবে ইহা স্ত্রীদের জন্য ইনসাফ বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে। কিন্তু এই সমস্যাটির অপর একটি দিকও ছিল যে, নবী হওয়া সত্ত্বেও একটি হালাল বস্তুকে নিজের জন্য হারাম করিয়া লওয়া এবং ভক্ষণ না করিবার জন্য শপথ করাকে অনুসরণ করিতে গিয়া উম্মতের কোন ব্যক্তি হয়ত সেই বস্তুটিকে নাজায়েয কিংবা অপসন্দ করিয়া বসিত। ইহার ফলে আল্লাহ্ বিধানে হেরফের হইবার আশংকা সৃষ্টি হইত। সুতরাং এই বিধান অবতীর্ণ হইল যে, এই সকল কাজে নবীর জন্য কাহারও মনোস্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য করা উচিত নয়। ইরশাদ হইয়াছে:
يُأَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (التحريم -١).
"হে নবী! আল্লাহ তোমার জন্য যাহা বৈধ করিয়াছেন তুমি তাহা নিষিদ্ধ করিতেছ কেন? তুমি তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি চাহিতেছ; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু” (৬৬ঃ ১)।
এই স্থলে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-কে নবী বলিয়া খেতাব করিয়াছেন। ইহা হইতে বুঝা যায়, একজন স্বামী হিসাবে তিনি তাহা করিতে পারিতেন, কিন্তু একজন নবী হিসাবে তাঁহার ইহা করিবার কোন অধিকার নাই।
মোটকথা, উপরোল্লিখিত পাঁচটি বিষয়েই রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইজতিহাদী ভুল হইয়াছিল। তবে ঘটনাবলীর বিশদ বিবরণ হইতে বুঝা যায়, এই ক্ষেত্রে রূপক অর্থে ভুল বলা হইয়াছে। নবীগণের উচ্চ মর্যাদা ও নিষ্পাপতার প্রেক্ষিতে তাঁহাদের পক্ষে এইরূপ ভুল করিবারও অনুমতি নাই। এই কারণে আল্লাহ্ ওহী দ্বারা প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তাঁহাদেরকে সতর্ক করা হইয়াছে এবং বিশুদ্ধ সিদ্ধান্তের প্রতি তাঁহাদেরকে পথ প্রদর্শন করা হইয়াছে (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ৭৭-৮২)।
📄 নবীগণকে হিকমত (প্রজ্ঞা) দান
নবীগণকে হিকমত (প্রজ্ঞা) দান
নবীগণকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে যেই সকল নি'মাত দান করা হইয়াছে তাহার মধ্যে বিশেষ একটি নি'মাতের কথা আল-কুরআনে বারংবার উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহা হইল হিকমত। ইবরাহীম ('আ)-এর বংশধরের উপর আল্লাহ তা'আলা যেই সকল অনুগ্রহ করিয়াছিলেন এইগুলির উল্লেখ করিয়া ইরশাদ হইয়াছে:
فَقَدْ أَتَيْنَا آلَ إِبْرَاهِيمَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَأَتَيْنَاهُمْ مُلْكًا عَظِيمًا (النساء - ٥٤ ) .
"আমি ইবরাহীমের বংশধরকেও তো কিতাব ও হিকমত দান করিয়াছিলাম এবং তাহাদিগকে বিশাল রাজ্য দান করিয়াছিলাম" (৪ঃ ৫৪)।
লুকমান ('আ) সম্পর্কে ইড়শাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ أَتَيْنَا لُقْمَانَ الحِكْمَةَ أَنِ اشْكُرْ لله . لقمان - (۱۲) .
"আমি লুকমানকে হিকমত দান করিয়াছিলাম এবং বলিয়াছিলাম, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর" (৩১: ১২)।
দাউদ ('আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَشَدَدْنَا مُلْكَهُ وَأَتَيْنُهُ الحِكْمَةَ وَفَصْلَ الخطاب (ص - ٢٠) .
"আমি তাহার রাজ্যকে সুদৃঢ় করিয়াছিলাম এবং তাহাকে দিয়াছিলাম প্রজ্ঞা ও ফায়সালাকারী বাগ্মিতা" (৩৮ঃ ২০)।
وَقَتَلَ دَاوُدُ جَالُوْتَ وَأَنْهُ اللهُ الْمُلْكَ وَالحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ (البقرة - ٢٥١).
"দাউদ জালুতকে সংহার করিল, আল্লাহ তাহাকে রাজত্ব ও হিকমত দান করিলেন এবং যাহা তিনি ইচ্ছা করিলেন তাহা তাহাকে শিক্ষা দিলেন" (২: ২৫১)।
আল-কুরআনে 'ঈসা ('আ)-এর উক্তি এইরূপ হইয়াছে:
قَدْ جِئْتُكُمْ بِالْحِكْمَةِ وَلَأُبَيِّنَ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي تَخْتَلِفُونَ فِيهِ (الزخرف ٦٣).
"আমি তো তোমাদের নিকট আসিয়াছি প্রজ্ঞাসহ এবং তোমরা যে কতক বিষয়ে মতভেদ করিতেছ তাহা স্পষ্ট করিয়া দিবার জন্য" (৪৩ঃ ৬৩)।
আল্লাহ তা'আলা ঈসা ('আ)-এর উপর তাঁহার অনুগ্রহের ব্যাপারে ইরশাদ করিয়াছেন:
وَاذْ عَلَّمْتُكَ الكتاب والحكمة والتَّوراة والانجيل (المائدة - ١١٠).
"আমি তোমাকে কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল শিক্ষা দিয়াছিলাম” (৫: ১১০)। সকল নবীর ব্যাপারে ইরশাদ হইয়াছে:
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّنَ لَمَا أَتَيْتُكُمْ مِّنْ كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ (আল ইমরান - ৮১).
"স্মরণ কর, যখন আল্লাহ নবীদের অংগীকার লইয়াছিলেন যে, তোমাদিগকে কিতাব ও হিকমত যাহা কিছু দিয়াছি” (৩:৮১)।
ইবরাহীম (আ) রাসূলুল্লাহ (স)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে দু'আ করিতে গিয়া বলিয়াছিলেন:
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولاً مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ ايتك وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (আল-বাকারা - ১২৯).
"হে আমার প্রতিপালক! তুমি তাহাদের মধ্য হইতে তাহাদের নিকট এক রাসূল প্রেরণ করিও যে তোমার আয়াতসমূহ তাহাদের নিকট তিলাওয়াত করিবে, তাহাদিগকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবে এবং তাহাদিগকে পবিত্র করিবে। তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়" (২:১২৯)।
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার দু'আ কবুল করা প্রসঙ্গে ইরশাদ করিলেন:
كَمَا أَرْسَلْنَا فِيكُمْ رَسُولاً مِنْكُمْ يَتْلُوا عَلَيْكُمْ أَيْتِنَا وَيُزَكِّيكُمْ وَيُعَلِّمُكُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُمْ مَا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ (আল-বাকারা - ১৫১).
"যেমন আমি তোমাদের মধ্য হইতে তোমাদের নিকট একজন রাসূল প্রেরণ করিয়াছি, যে আমার আয়াতসমূহ তোমাদের নিকট তিলাওয়াত করে, তোমাদিগকে পবিত্র করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়, আর তোমরা যাহা জানিতে না তাহা শিক্ষা দেয়” (২:১৫১)।
ইবরাহীম (আ)-এর দু'আর ফসল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর আবির্ভাবের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা মুমিনগণের প্রতি যেই করুণা প্রদর্শন করিয়াছেন সেই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيُّتُه وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَّلٍ مُّبِينٍ (আল ইমরান - ১৬৪).
"আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি অবশ্যই অনুগ্রহ করিয়াছেন যে, তিনি তাহাদের নিজেদের মধ্য হইতে তাহাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন, যে তাঁহার আয়াতসমূহ তাহাদের নিকট তিলাওয়াত করে, তাহাদিগকে পরিশোধন করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়, যদিও তাহারা পূর্বে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে ছিল" (৩:১৬৪)।
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولاً مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُّبِينٍ.
"তিনিই উম্মীদের মধ্যে একজন রাসূল পাঠাইয়াছেন তাহাদের মধ্য হইতে, যে তাহাদের নিকট আবৃত্তি করে তাঁহার আয়াতসমূহ, তাহাদিগকে পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমত। ইতোপূর্বে তো ইহারা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে” (৬২: ২)।
স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)-কে লক্ষ্য করিয়া ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَوْلا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ وَرَحْمَتُهُ لَهَمَّتْ طَائِفَةٌ مِّنْهُمْ أَنْ يُضِلُّوكَ وَمَا يُضِلُّونَ إِلَّا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَضُرُّونَكَ مِنْ شَيْءٍ وَأَنْزَلَ اللهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا (النساء -١١٣).
"তোমার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকিলে তাহাদের একদল তোমাকে পথভ্রষ্ট করিতে চাহিতই। কিন্তু তাহারা নিজদিগকে ব্যতীত আর কাহাকেও পথভ্রষ্ট করে না এবং তোমার কোনই ক্ষতি করিতে পারে না। আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হikমত অবতীর্ণ করিয়াছেন এবং তুমি যাহা জানিতে না তাহা তোমাকে শিক্ষা দিয়াছেন, তোমার প্রতি আল্লাহ্ মহাঅনুগ্রহ রহিয়াছে” (৪: ১১৩)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে উদ্দেশ্য করিয়া আরও ইরশাদ হইয়াছে:
ذلِكَ مِمَّا أَوْحَى إِلَيْكَ رَبُّكَ مِنَ الْحِكْمَةِ (اسرائيل -٣٩).
"তোমার প্রতিপালক ওহীর দ্বারা তোমাকে যে হিকমত দান করিয়াছেন এইগুলি তাহার অন্তর্ভুক্ত” (১৭:৩৯)।
সাধারণ মুসলমানদের উদ্দেশ্যে ইরশাদ হইয়াছে:
وَاذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَمَا أَنْزَلَ عَلَيْكُمْ مِنَ الْكِتَابِ وَالْحِكَمَةِ يَعِظُكُمْ بِهِ (البقرة - ٢٣١).
"তোমাদের প্রতি আল্লাহর নি'মাত ও কিতাব এবং হিকমত যাহা তিনি তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করিয়াছেন, যদ্ধারা তিনি তোমাদিগকে উপদেশ দেন, তাহা স্মরণ কর" (২: ২৩১)।
বিশেষভাবে উম্মত জননীগণের উদ্দেশ্যে ইরশাদ হইয়াছে:
وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيت الله والحكمة (الاحزاب - ٣٤).
"আল্লাহ্ আয়াত ও জ্ঞানের কথা যাহা তোমাদের গৃহে পঠিত হয়, তাহা তোমরা স্মরণ রাখিবে" (৩৩ : ৩৪)।
যোগ্যতানুযায়ী সাধারণ মুসলমানগণও হিকমতের মত আল্লাহর উপহার লাভ করিয়া থাকে। ইরশাদ হইয়াছে:
يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَنْ يَّشَاءُ وَمَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا (البقرة - ٢٦٩).
"তিনি যাহাকে ইচ্ছা হিকমত দান করেন এবং যাহাকে হিকমত দান করা হয় তাহাকে প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়" (২ : ২৬৯)।
হিকমতের মাধ্যমে দীনের তাবলীগ ও দাওয়াত দানেরও হুকুম দেওয়া হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
أدْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ (النَّحْلُ - ١٢٥ ).
"তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং উহাদের সহিত তর্ক করিবে উত্তম পন্থায়" (১৬ : ১২৫)।
একটি স্থানে কিয়ামত ও উপদেশমূলক বাণী সম্পর্কে হিকমত শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مِنَ الْأَنْبَاءِ مَا فِيْهِ مُزْدَجَرٌ حِكْمَةٌ بَالِغَةٌ فَمَا تُغْنِ النُّذُرُ (القمر ٤ - ٥ ) .
"উহাদের নিকট আসিয়াছে সুসংবাদ, যাহাতে আছে সাবধান বাণী, ইহা পরিপূর্ণ জ্ঞান, তবে এই সতর্কবাণী উহাদের কোন উপকারে আসে নাই” (৫৪ : ৪-৫)।
উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহে হikমত শব্দ প্রয়োগ করা হইয়াছে। ইহাতে হিকমত শব্দটি কখনও একা এবং কখনও কিতাব শব্দের পরে আসিয়াছে। হিকমত শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা ও কাজ। কিন্তু আয়াতগুলিতে ইহা কোন অর্থে প্রয়োগ হইয়াছে, ইহা অনুধাবন করিবার জন্য আভিধানবেত্তা ও তাফসীর বিশেষজ্ঞগণের অভিমত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সর্বাধিক প্রাচীন আভিধানিক ইব্ন দুরায়দ হিকমত শব্দের অর্থ লিখিয়াছেন:
فَكُلُّ كَلِمَةٍ وَعَظَتْكَ أَوْ زَجَرَتْكَ أَوْ دَعَتْكَ إِلَى مُكَرَّمَةٍ أَوْ نَهَتَكَ مِنْ قَبِيحٍ فَهِيَ حِكْمَةٌ وَحُكم.
"যেসকল কথা উপদেশ দান করে, সতর্ক করে, সুপথে আহবান করে এবং অমঙ্গলের পথ হইতে বারণ করে তাহাই হইল হিকমত ও হুকুম" (জামহারাতুল লুগাত, ২খ, পৃ. ১৮৬)।
অভিধান শাস্ত্রের ইমাম আল-জাওহারী লিখিয়াছেন:
الْحِكْمَةُ مِنَ الْعِلْمِ وَالْحَكِيمُ الْعَالِمُ وَصَاحِبُ الحِكْمَةِ الْحَكِيمُ الْمُتَّقِنُ لِلْأُمُورِ. “হিকমত হইল ইলম বা জ্ঞান, হাকীম হইল ‘আলিম বা জ্ঞানী, জ্ঞানের অধিকারী, সুষ্ঠুভাবে কাজ সম্পাদনকারী” (সিহাহু’ল লুগাত, ২খ, পৃ. ২৭৬)।
আরবী ভাষার প্রামাণ্য অভিধান লিসানুল ‘আরাব-এ বলা হইয়াছে:
وَالْحِكْمَةُ عِبَارَةٌ عَنْ مَعْرِفَةِ أَفْضَلِ الْإِشْيَاءِ بِأَفْضَلِ الْعُلُومِ. “উত্তম বস্তুকে উত্তম জ্ঞানের দ্বারা অনুধাবন করার নাম হইল হিকমত” (ইব্ন মানজুর, লিসানু’ল ‘আরাব, বি, ১৫খ., পৃ. ৩)।
রাগিব ইসফাহানী বলেন:
وَالْحِكْمُةُ اصَابَةُ الْحَقِّ بِالْعِلْمِ وَالْعَقْلِ فَالْحِكْمَةُ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى مَعْرِفَةُ الْأَشْيَاءِ وَايْجَادُهَا عَلَى غَايَةِ الْأَحْكَامِ مِنَ الْإِنْفَاقِ مَعْرِفَةُ الْمَوْجُودَاتِ وَفِعْلُ الْخَيْرَاتِ. “হিকমত হইতেছে জ্ঞান ও বুদ্ধি দ্বারা সত্য ও সঠিক কথা অবহিত হওয়া। আল্লাহ্র ক্ষেত্রে হিকমত হইতেছে বস্তুসমূহের জ্ঞান এবং এইগুলিকে চূড়ান্ত সুকৌশলে উদ্ভাবন করা। মানবজাতির পক্ষে হিকমত হইতেছে বিদ্যমান জিনিসসমূহকে জানা এবং উত্তম কার্যাবলী সম্পাদন করা” (মুফরাদাতুল কুরআন, মিসর, পৃ. ১২৬)।
হিকমতের ব্যাখ্যা প্রদানে ইব্ন হিব্বান আন্দালুসী তাঁহার নিম্নোক্ত সংজ্ঞায় অভিধানবেত্তাদের অধিকাংশ অভিমতকে প্রায় একত্র করিয়াছেন। তিনি বলেন:
قَالَ مَالِكٌ وَأَبُو رَزِينِ الْحِكْمَةُ الْفِقْهُ فِي الدِّينِ وَالْفَهْمُ الَّذِي هُوَ سَجَلَةً وَنُورٌ مِّنَ اللَّهِ تعالى. “মালিক ও আবূ রাযীন বলেন, হিকমত হইতেছে দীন সম্পর্কিত প্রজ্ঞা ও অনুধাবন শক্তি যাহা সহজাত। ইহা একটি নূরও বটে যাহা আল্লাহর পক্ষ হইতে লাভ হয়”।
মুজাহিদ বলেন, হিকমত হইতেছে কুরআন উপলব্ধি করা। মুকাতিল বলেন: الْحِكْمَةُ الْعِلْمُ وَالْعَمَدُ بِهِ لَا يَكُونُ لِلرَّجُلِ حَكِيمًا حَتَّى يَجْمَعَمُهَا . “হিকমত হইতেছে ‘ইল্ল্ম ও সেই মুতাবিক আমল করা। কোন লোককে ততক্ষণ হাকীম বলা যাইবে না যতক্ষণ তাহার মধ্যে ইল্ম ও আমলের সমন্বয় সাধিত না হয়।”
কেহ কেহ বলিয়াছেন, হিকমত হইল যাহা রাসূলের মাধ্যম ব্যতীত জানা যায় না। আবু জা’ফার মুহাম্মাদ ইব্ন ইয়া’কূব বলেন, যেই সঠিক কথা সঠিক ‘আমল পয়দা করে তাহাকে হিকমত বলা হয়। ইব্ন জারীর তাবারী বলেন:
وَالصَّوابُ مِنَ الْقَوْلِ عِنْدَنَا فِي الْحِكْمَةِ أَنَّهَا الْعِلْمُ بِأَحْكَامِ اللَّهِ الَّتِي لَا يُدْرَكُ عِلْمُهَا الا بِبَيَانِ الرَّسُولِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْمَعْرِفَةُ بِهَا مَا دَلَّ عَلَيْهِ ذَلِكَ مِنْ نَظَائِرِهِ وَهُوَ عِنْدِي مَأْخُوذُ مِنْ الْحُكْمِ الَّذِي بِمَعْنَى الْفَصْلِ بَيْنَ الْحَقِّ وَالْبَاطِلِ) .
"হিকমতের সংজ্ঞা সম্পর্কে আমাদের নিকট সঠিক কথা হইতেছে এই যে, ইহা হইল আল্লাহ্ সেই সকল বিধানাবলীর জ্ঞান যাহা কেবল রাসূলুল্লাহ (স)-এর বর্ণনা দ্বারা জানা যায়। আর যেই সকল উদাহরণ তাঁহার মধ্যে পাওয়া যায় যাহা তিনি গ্রহণ করিয়াছেন অথবা উপস্থাপন করিয়াছেন সেই সম্পর্কে পরিচিত হওয়া। আমার মতে ইহা حکم শব্দ হইতে নির্গত, যাহার অর্থ হইল সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা"।
অভিধানবেত্তা ও তাফসীরবিদদের এই সকল অভিমত একই অর্থের বিভিন্ন অভিব্যক্তি মাত্র। সারকথা এই যে, হিকমত হইল বিবেক-বুদ্ধি ও অনুভূতির পূর্ণ বৈশিষ্ট্যের নাম যাহার দ্বারা শুদ্ধ-অশুদ্ধ, ভুল-নির্ভুল, সত্য-মিথ্যা, হক-বাতিল ও মঙ্গল-অমঙ্গলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা যায়। ইহার জন্য চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা, দলীল, অভিজ্ঞতা ও তত্ত্ব অনুসন্ধানের প্রয়োজন হয় না, বরং স্বভাবতই ইহার স্বরূপ উদঘাটিত হইয়া যায়। সেই অনুসারে হিকমতধারী ব্যক্তির 'কাজ'ও হইয়া থাকে। অন্য কথায়, কোন কোন মানুষের মধ্যে বস্তুরাজির সত্য-মিথ্যা, কার্যাবলীর ভাল-মন্দের সঠিক অনুভূতি এবং সঠিক মানসিকতা পাওয়া যায়। তাঁহারা ঐ সকল কাজের সূক্ষ্ম হইতে সূক্ষ্মতর অবস্থা ও সমাধান সম্পর্কে আল্লাহ প্রদত্ত প্রজ্ঞা ও মননশীলতার দ্বারা এমন সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারেন, যাহা অন্যান্য লোক দীর্ঘ পর্যালোচনা এবং গবেষণার পরও দিতে সক্ষম হয় না। ইহাই হইল সেই মা'রিফাত বা আল্লাহপ্রদত্ত নূর যাহা চেষ্টা ও সাধনায় অর্জিত হয় না। ইহাই হইল 'হিকমত'।
আল্লাহপ্রদত্ত অন্য সকল যোগ্যতা ও প্রকৃতিগত দানের মত হিকমতের দানও সকল মানুষ সমভাবে প্রাপ্ত হয় না। ইহা বিভিন্ন পর্যায় ও মাত্রায় মানুষ লাভ করিয়া থাকে। কিন্তু ইহার উচ্চতর ও পরিপূর্ণ মাত্রা নবীগণ লাভ করিয়া থাকেন। যেইভাবে আল্লাহ প্রদত্ত অনুভূতি, ধর্মীয় বুদ্ধি ও জ্যোতির্ময় শক্তির প্রতি হিকমতের প্রয়োগ হয়, অনুরূপভাবে এই শক্তির নিদর্শনাবলী, ফলাফল এবং ইহার শিক্ষার প্রতিও হিকমতের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। উল্লিখিত (১৩ : ১২) আয়াতে লুকমান ('আ)-কে হিকমত প্রদানের কথা বলা হইয়াছে। লুকমান ('আ)-কে যেই হিকমত প্রদান করা হইয়াছে তাহার বিবরণ হইল : আল্লাহ্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, শিরক হইতে বারণ করা, মাতাপিতার সেবা করা, ভাল লোকের অনুসরণ করা, সর্বত্র আল্লাহ্র 'ইল্ম, সালাতের আদেশ দান, ধৈর্য ধারণ, অহংকার না করা, মধ্যম পন্থা অবলম্বন, নীচু স্বরে কথা বলা ইত্যাদি। অনুরূপ হিকমতে মুহাম্মাদীর নিম্নলিখিত শিক্ষার বিশদ বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। শিরক হইতে নিষেধ, মাতা-পিতার প্রতি সদয় ব্যবহার, প্রতিবেশী ও দুঃস্থদের সহিত সদাচরণ, অপচয় হইতে নিষেধ, বিনয়ের সহিত কথা বলা ইত্যাদি বিষয়াদির উল্লেখ করিয়া আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন:
ذُلِكَ مِمَّا أَوْحَى إِلَيْكَ رَبُّكَ مِنَ الْحِكْمَةِ (الاسراء - ٣٩) .
"তোমার প্রতিপালক ওহীর দ্বারা তোমাকে যে হিকমত দান করিয়াছেন এইগুলি তাহার অন্তর্ভুক্ত” (১৭: ৩৯)
বস্তুত হিকমত এমন সকল কথা ও বার্তা যাহার বিশ্বজনীন সত্যতাকে স্বয়ং মানব স্বভাব ও নৈতিক অনুভূতি গ্রহণ করিয়া লয়। মোটকথা, হিকমতের এই শক্তি নবীগণ পরিপূর্ণভাবে অর্জন করিয়াছেন। ইহার ফলে তাঁহাদের প্রতিটি কথা প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং প্রতিটি কাজ বিচক্ষণতায় পরিপূর্ণ ছিল। হিকমতের লক্ষণাদি তাঁহাদের কথা ও কাজে বিকশিত হইয়া উঠিয়াছিল (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ৮৭)।
📄 নবীগণের ইল্ল্ম (জ্ঞান)
নবীগণের ইল্ল্ম (জ্ঞান)
'ইল্ম শব্দের আভিধানিক অর্থ 'জানা'। কিন্তু প্রত্যেক বিষয়ের জানার ধরন ও অবগতির মাধ্যম বিভিন্ন হইয়া থাকে। নবীগণের 'ইল্ম বলিতে স্বভাবতই আল্লাহ্ তাওহীদ, তাঁহার সত্তা, গুণাবলী, ধর্ম, শরী'আতের বিধানাবলী ও চারিত্রিক শিক্ষাকে বুঝানো হয়। ইবরাহীম ('আ) তাওহীদের দলীল উপস্থাপন করিয়া স্বীয় পিতাকে বলিলেন:
يَا أَبَتِ إِنِّي قَدْ جَاءَنِي مِنَ الْعِلْمِ مَالَمْ يَأْتِكَ (مريم ٤٣).
"হে আমার পিতা! আমার নিকট তো আসিয়াছে জ্ঞান যাহা তোমার নিকট আসে নাই" (১৯:৪৩)
খিযির ('আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَعَلَّمْنَاهُ مِنْ لَدُنَّا عَلمًا (الكهف - ٦٥ ) .
"আমার নিকট হইতে তাহাকে শিক্ষা দিয়াছিলাম এক বিশেষ জ্ঞান" (১৮: ৬৫)।
আল্লাহই তো সকল জিনিস দান করেন। তাহা সত্ত্বেও তাঁহার 'ইল্ম শিক্ষাদানের অর্থ কি? যাহা মানুষের পরিশ্রম ও চেষ্টা ব্যতীত অর্জিত হয় সেই সকল জিনিসকে 'আল্লাহ্র নিকট হইতে' বলা হয়। তাই আল্লাহ্র নিকট হইতে ইল্ম লাভের অর্থ হইল সেই ধরনের 'ইলম অর্জন করা যাহা মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞানোপকরণ, প্রমাণ উপস্থাপন ও চিন্তা-সাধনা ছাড়াই লাভ হয়। ইহাই হইল আল্লাহ প্রদত্ত ইল্ম। এই কারণে সূফীদের পরিভাষায় ইহাকে ইল্ম লাদুন্নী বলা হয়। দাউদ ('আ) ও সুলায়মান ('আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ أَتَيْنَا دَاوُدَ وَسُلَيْمَانَ علمًا (النمل - ١٥).
"আমি অবশ্যই দাউদ ও সুলায়মানকে জ্ঞান দান করিয়াছিলাম” (২৭: ১৫)। ইয়ূসুফ ('আ)-এর নবুওয়াতের ঊষালগ্ন সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَكَذَلِكَ يَجْتَبِيكَ رَبُّكَ وَيُعَلِّمُكَ مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ وَيُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَعَلَى آلِ يَعْقُوبَ ( يوسف -٦).
"এইভাবে তোমার প্রতিপালক তোমাকে মনোনীত করিবেন, তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিবেন এবং তোমার প্রতি ও ইয়াকূবের পরিজনের প্রতি তাঁহার অনুগ্রহ পূর্ণ করিবেন" (১২:৬)।
উক্ত আয়াতগুলিতে সেই 'ইলমের উল্লেখ নাই যাহা সময়ের সহিত সম্পৃক্ত থাকে। কারণ বাক্যের বিন্যাস হইতে অনুমিত হয় যে, এখানে একবারই ইল্ম দানের কথা বলা হইয়াছে, যাহা নির্ধারিত ওহীর শান হইতে পারে না। ইয়ূসুফ ('আ) কর্তৃক একটি স্বপ্নের ফলাফল বর্ণনা প্রসঙ্গে ইরশাদ হইয়াছেঃ
ذلِكَمَا مِمَّا عَلَّمَنِي رَبِّي (يوسف -۳۷). 'আমি যাহা তোমাদিগকে বলিব, তাহা আমার প্রতিপালক আমাকে যাহা শিক্ষা দিয়াছেন তাহা হইতে বলিব” (১২ঃ ৩৭)।
এই কথা কোথাও বলা হয় নাই যে, স্বপ্নের ফলাফল বলিবার সময় তাঁহার উপর ওহী অবতীর্ণ হইয়াছিল, বরং তাঁহার মধ্যে এই ইল্মের শক্তি স্থায়ীভাবে দান করা হইয়াছিল। এই প্রকারের জ্ঞানের কারণেই কোন কোন নবীকে শিশুকালেই 'আলীম )علیم( )দ্র. ১৫:৫৩ ও ৫১: ২৮) বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে।
ইহা হইতে বুঝা যায় সময় সময় নবীগণের নিকট নাযিলকৃত নির্দিষ্ট ওহী ছাড়া ও 'ইলমের একটি স্থায়ী দান নবীগণকে প্রদান করা হইয়াছিল। ইহাকে নবীগণের স্বাভাবিক ইল্ম বা জ্ঞান বলিয়া অভিহিত করা যায় (শিবলী নু'মানী-সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ৯৬)।
📄 সকল নবীর দীন এক ও অভিন্ন
সকল নবীর দীন এক ও অভিন্ন
এই জগতে যত নবী-রাসূল আগমন করিয়াছিলেন তাঁহাদের দীনের মূলনীতি ছিল এক ও অভিন্ন। অবশ্য তাঁহাদের ধর্মাচরণ ও বিধানাবলী সর্বক্ষেত্রে একই ধরনের ছিল না। নূহ ('আ) হইতে 'ঈসা ('আ) পর্যন্ত সময়ে শরীআতের বিধানে বহু পার্থক্য ছিল। তাহা সত্ত্বেও আল-কুরআনে ইহাকে একই ধর্ম বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
شَرَعَ لَكُمْ مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ (الشورى ۱۳).
“তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করিয়াছেন দীন যাহার নির্দেশ দিয়াছিলেন তিনি নূহকে, আর যাহা আমি ওহী করিয়াছি তোমাকে এবং যাহা নির্দেশ দিয়াছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও 'ঈসাকে এই বলিয়া যে, তোমরা দীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং উহাতে মতভেদ করিও না” (৪২: ১৩)।
আয়াতে উল্লিখিত নবীগণের বিধানাবলীর আনুষঙ্গিক বিষয়ে বিভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও ইহাকে আদ-দীন বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। যদি শাখা-প্রশাখার বিভিন্নতাকে তাঁহাদের দীনের বিভেদ বলিয়া গণ্য করা হইত তাহা হইলে (وَلاَ تَفَرَّقُوا فِيهِ) তোমরা উহাতে মতভেদ করিও না) এই ঘোষণা কি করিয়া যথার্থ হইত (বদরে ‘আলম মিরাঠী, তরজুমানুস সুন্নাহ, ১খ, পৃ. ৩৭)? এই সম্পর্কে শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবীর বক্তব্য হইল, পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল আসিয়াছিলেন, তাঁহারা একই ধর্মবিশ্বাস লইয়া আগমন করিয়াছিলেন। তাওহীদ, নবুওয়াত, 'ইবাদত, আখলাক, শান্তি ও পুরস্কার এবং আমল ও ইবাদতে তাহা ছিল এক ও অভিন্ন। এই দিক দিয়া নবীগণের শিক্ষায় কোন মৌলিক প্রভেদ ছিল না। তবে নবীগণের শিক্ষার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাওহীদের। ইহাই হইতেছে নবুওয়াতের মৌল অবিনশ্বর প্রবাহ। ইসলামের পূর্বে পৃথিবীতে বহু ভাল মানুষ আসিয়াছিলেন। তাঁহাদের দাওয়াতও ছিল উপকারী, তাহাদের চারিত্রিক পথনির্দেশও ছিল হৃদয়গ্রাহী। তবে গ্রীক দার্শনিক বা হিন্দুস্তানের অবতার বা অন্য কাহারও দাওয়াতে তাওহীদের শিক্ষা বিদ্যমান না থাকিলে তাহারা কস্মিন কালেও নবুওয়াতের মর্যাদার অধিকারী হইতে পারে না। নবীসুলভ শিক্ষার পরিচয়ই হইল তাওহীদের দাওআত। এই দাওয়াত পাওয়া না গেলে নবুওয়াতও পাওয়া যায় না। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে :
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلهُ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ.
"আমি তোমার পূর্বে এমন কোন রাসূল প্রেরণ করি নাই তাহার প্রতি এই ওহী ব্যতীত যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর” (২১: ২৫)।
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولاً أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ.
"আল্লাহ্ ইবাদত করিবার ও তাগূতকে বর্জন করিবার নির্দেশ দিবার জন্য আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠাইয়াছি” (১৬: ৩৬)।
ইহা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, তাওহীদের দ্বারাই নবুওয়াতের পরিচয় লাভ করা যায়। ইসলামের দাওআত আসিবার পূর্বে ধর্ম প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ যদি তাওহীদ ভিত্তিক না হয় তাহা হইলে তাহার নবুওয়াতের দাবির কোনই অবকাশ নাই (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদাবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ১১৪)।
সায়্যিদ আবুল 'আলা মওদূদী বলেন, নবীর পর নবী আসিয়াছেন বলিয়া আমরা আল-কুরআন দ্বারা অবগত হইয়াছি। তাঁহারা সকলেই স্বীয় গোত্রকে এই দাওআত দিয়াছেন :
يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهِ غَيْرُهُ (هود - ٥٠).
"হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ নাই" (১১:৫)।
ব্যাবিলন শহর হউক আর সাদৃম এলাকা হউক বা পৃথিবীর অন্য যে কোন অঞ্চলের হউক, তাঁহারা দাস শ্রেণীর হউক বা রাজেশ্বর হউক, সর্ব জাতিতে সর্বকালে সর্ব স্থানে আল্লাহর পক্ষ হইতে আগত পথপ্রদর্শকগণ মানবজাতির সামনে এই একই দাওয়াত পেশ করিয়াছিলেন। ইবরাহীম ('আ) তাঁহার জাতিকে বলিয়া দিয়াছিলেন, তোমাদের মধ্যে ও আমার মধ্যে কোন পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার বন্ধন সেই পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হইবে না যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহ্ তাওহীদে বিশ্বাস করিবে। ইরশাদ হইয়াছে:
كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ.
"আমরা তোমাদিগকে মানি না। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হইল শত্রুতা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য- যদি না তোমরা এক আল্লাহতে ঈমান আন" (৬০:৪)।
মূসা ('আ) ফিরআউনের সম্মুখে গিয়া বনূ ইসরাঈলকে তাঁহার সঙ্গে প্রেরণ করিবার পূর্বে তাহাকে বলিয়াছিলেন, তুমি তো আমার প্রভু নহ, আমার প্রভু হইলেন:
رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَى كُلَّ شَيْءٍ خَلَقَهُ ثُمَّ هَدَى (طه - ٥٠ ) .
"আমাদের প্রতিপালক তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তাহার আকৃতি দান করিয়াছেন, অতঃপর পথনির্দেশ করিয়াছেন" (২০:৫০)।
ঈসা ('আ) বনূ ইসরাঈলকে দাওআত দিয়াছিলেন এই বলিয়া:
إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٌ (ال عمران - ٥١ ) .
"নিশ্চয় আল্লাহ আমার প্রতিপালক এবং তোমাদের প্রতিপালক। সুতরাং তোমরা তাঁহার ইবাদত করিবে; ইহাই সরল পথ" (৩: ৫১)। (সায়্যিদ আবুল 'আলা মওদূদী, সীরাতে সারওয়ারে আলম, ১খ, পৃ. ৬৬)।