📄 ওহী ও নবুওয়াতের যোগ্যতা
ওহী ও নবুওয়াতের যোগ্যতা
মুসলিম দার্শনিকগণ ওহীর হাকীকতকে নবুওয়াতের যোগ্যতা শব্দ দ্বারা প্রকাশ করিয়াছেন। সৃষ্টিজগতের উপর গবেষণা করিলে জানা যায়, প্রতিটি বস্তু জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার দ্বারা নিম্ন পর্যায় হইতে উন্নতির দিকে ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়। জড় পদার্থ অনুভূতিহীন, ইহার উপর রহিয়াছে উদ্ভিদ জগত। ইহাতে রহিয়াছে সীমিত আকারের অনুভূতি, কিন্তু চিন্তাশক্তি, স্মৃতিশক্তি, উপদেশ গ্রহণ ইত্যাদি কর্ম হইতে ইহারা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত। ইহাদের উপরস্থ স্তর হইল প্রাণীজগতের। ইহাদের এই সকল শক্তি পরিমিতভাবে লক্ষ্য করা যায়। ইহাদের সকলের উপর রহিয়াছে মানবজাতি। তাহাদের মধ্যে এই সকল ক্ষমতা পরিপূর্ণরূপে পরিলক্ষিত হয়। ক্ষমতা ও শক্তির এখানেই শেষ সীমা নয়। আমরা তৃণলতায় অনুভবশক্তির বিকাশ দেখিতে পাই। জড়জগত ইহা হইতে বঞ্চিত। আবার প্রাণীজগতের মধ্যে স্মৃতিশক্তি কল্পনাশক্তি ও বুদ্ধিমত্তার বিকাশ দেখিতে পাই, যাহা হইতে তৃণলতা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত। আবার মানুষের মধ্যে মন ও মস্তিষ্কের যেই শক্তি রহিয়াছে তাহা অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে মোটেই পাওয়া যায় না। এইভাবে নবীগণের মধ্যে জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার এমন শক্তি রহিয়াছে যাহা সাধারণ মানুষের মধ্যে পাওয়া যায় না। ইহার নামই হইল নবুওয়াতের যোগ্যতা।
অনুভূতিসমূহ কেবল বস্তুজগতকে উপলব্ধি করিতে পারে; চিন্তাশক্তি বস্তুজগতের উপরস্থ বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা সম্পর্কে অবহিত হইতে পারে, কিন্তু নবুওয়াতের যোগ্যতা এইসব কিছুর ঊর্ধ্বে। এই যোগ্যতা সকল কিছুর ঊর্ধ্বে অদৃশ্য জগতকে অনুধাবন করিতে পারে। ইহার জন্য গবেষণা ও তর্কশাস্ত্রের চিন্তা-ভাবনা ও কাব্যাবলীর বিন্যাস করিতে হয় না, বরং নবুওয়াতের যোগ্যতার আলোকরশ্মি দূর ও নিকটের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের রহস্যকে তাঁহাদের সম্মুখে নির্মল আকাশের তেজোদীপ্ত সূর্যের মত উদ্ভাসিত করিয়া তোলে, যেমন আমরা অনুভূতি, সহজাত প্রবৃত্তি, দলীল ভিত্তিক বিষয়াদি এবং দৃশ্যমান ঘটনাবলীকে প্রত্যক্ষ করি। যেহেতু এই ধরনের জ্ঞান সাধারণভাবে মানুষ চিত্তবৃত্তির দ্বারা, অনুভূতি ও সহজাত প্রবৃত্তির গতিময়তার দ্বারা অর্জন করিতে পারে না, বরং স্বয়ং (সর্বাত্মকভাবে অদৃশ্য জগৎ সম্পর্কে জ্ঞাত) আল্লাহ তা'আলা কোন প্রকার মানবীয় শক্তির মাধ্যম ছাড়াই তাহা নবী-রাসূলগণকে দিয়া থাকেন, ইহাকে শরীআতের পরিভাষায় ওহী ও ইলহাম বলা হয়। ধর্মতাত্ত্বিক দর্শনশাস্ত্রে ইহাকে নবুওয়াতের যোগ্যতা এবং সাধারণের কথায় ইহাকে গায়বী 'ইল্ম বলা হয়। মুহাদিছগণ ওহী বলিতে উপরের বিশ্লেষণকে গ্রহণ করেন না। তাঁহাদের মতে, আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক সময় সময় তাহার নির্দেশাবলী এবং ইচ্ছাসমূহ সম্পর্কে সঠিকভাবে ফেরেশতাদের মাধ্যমে নবীগণকে অবহিত করার নাম ওহী।
গভীরভাবে চিন্তা করিলে বুঝা যাইবে যে, বুদ্ধিভিত্তিক ইলমের অধিকারী ও মুহাদ্দিছগণের মধ্যে মতপার্থক্যের ভিত্তি হইল এই কথার উপর যে, এই ওহী নবীগণের শক্তি বহির্ভূত এবং আল্লাহ প্রদত্ত অসাধারণ জ্ঞান ও মনীষার ফলে হইয়া থাকে, নাকি সরাসরি বিভিন্ন সময় আল্লাহ্ শিক্ষাদানের ফলে হইয়া থাকে। আরও পরিষ্কারভাবে বলা যায় যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও মনীষার শক্তি জন্মকালেই প্রকৃতিগতভাবে দেওয়া থাকে। অনুরূপভাবে নবীগণের মধ্যে আল্লাহর ইচ্ছা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার শক্তি গোড়া হইতে প্রদান করা হয় অথবা তাঁহারা স্বভাবগতভাবে সাধারণ মানুষের ন্যায় স্বাভাবিক জ্ঞান ও বোধশক্তিসম্পন্ন হইয়া থাকেন, কিন্তু নবুওয়াত লাভের পর আল্লাহ তা'আলা নিজ ইচ্ছানুযায়ী তাঁহাদেরকে কোন গায়বী মাধ্যমে সময় সময় অবহিত করেন। নবীগণের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কৃপায় জন্মকাল হইতেই তাঁহাদের নবুওয়াতের সহিত সম্পৃক্ত এমন কিছু শক্তি ও সামর্থ্য দান করিয়া থাকেন যাহাকে দীন বলা হয়। এইরূপ শক্তি ও সামর্থ্য হইতে নবী নহেন এমন ব্যক্তিবর্গ সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত। এই প্রচ্ছন্ন শক্তির ব্যবহারিক প্রকাশ সেই সময় হইতে আরম্ভ হয় যখন তাঁহারা নবুওয়াত ও রিসালাতের পদে কার্যত অধিষ্ঠিত হন। ইহার নামই হইতেছে নবুওয়াতের যোগ্যতা এবং গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কার্যাবলী সম্পর্কে তাঁহাদেরকে যে বিভিন্ন সময়ে গায়বী পন্থায় অবহিত করানো হয় ইহাকেই ওহী বলা হয়।
অধুনা কুরআন বুঝার দাবিদার বুদ্ধিজীবী এবং বর্ণনার শাব্দিক ব্যাখ্যাদানকারিগণের মধ্যে যেই মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয় তাহা মূলত এই দুই শক্তির মধ্যে পার্থক্য করিতে না পারার কারণেই হইয়া থাকে। বর্ণনার শাব্দিক ব্যাখ্যাকারিগণ মনে করেন যে, যেই সকল শব্দ নবীর মুখ দিয়া বাহির হয় তাহা এই অর্থেই ওহী হিসাবে বিবেচ্য যেই অর্থে আল-কুরআনকে ওহী বলিয়া বিশ্বাস করা হয়। মূলত ইহা আল্লাহ তা'আলার গায়বী সংবাদমাত্র। বুদ্ধিজীবিগণ মনে করেন, আল-কুরআন সরাসরি আল্লাহ্ ওহী, কিন্তু ইহা ব্যতীত নবী-রাসূলগণ যাহা বলেন তাহা নবীসুলভ কথাবার্তা নহে, বরং তাহা হইল মানবিক জ্ঞান ও মনীষার ফল। এই দুই শ্রেণীর লোক যেই অর্থে ওহীকে বুঝিবার চেষ্টা করিতেছেন তাহা সঠিক বলিয়া মনে হয় না, বরং তৃতীয় একটি ব্যাখ্যাই সঠিক। সেই ব্যাখ্যা হইল, কুরআন বিষয়ক ওহী হইল সরাসরি ওহী, এইভাবে নবীর অন্যান্য আদেশসমূহ তাঁহার নবীসুলভ আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান ও বিবেচনার ফলে হইয়া থাকে। এই কারণে ইহাকে অন্য এক প্রকার ওহী বলা হয়। ইহা নবুওয়াতের যোগ্যতাকে বিকশিত করিয়া তোলে। সুতরাং ওহী ও নবুওয়াতের যোগ্যতা এই দুইটির বিধানাবলীকে মান্য করা ওয়াজিব।
('ইবন আমীরি'ল হাজ্জ, আত-তাকবীর ওয়াত তাবহীর শরহে তাহরীর ইবন হুমাম, ৩খ., ২৯৪-২৯৯; আত-তালবীহ ফী কাশফি হাকাইকিত তানকীহ ওয়াত-তাওদীহ ফী হাল্লি গাওয়ামিদিত তানকীহ, ২খ, পৃ. ৪৫২ বরাত পাদটীকা; শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ., ৫২)।
📄 নবীর ইজতিহাদে ত্রুটি হইতে পারে
নবীর ইজতিহাদে ত্রুটি হইতে পারে
আল-কুরআনের কিছু স্থানে রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাঁহার কতকগুলি কাজের জন্য সতর্ক করা হইয়াছে। ইহা হইতে অনুমিত হয় যে, আল্লাহ্ খাস ওহী ব্যতীত তিনি তাঁহার বুদ্ধি-বিবেচনায় যেই সকল আদেশ-নিষেধ দিতেন তাহা ভুলত্রুটি হইতে মুক্ত নয়। এখানে উল্লেখ্য যে, দুনিয়ার সকল মুসলমান এই কথার উপর ঐক্যমত পোষণ করিয়াছেন যে, যেই সমস্ত বিষয়ের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ না হইত সেইগুলিতে তিনি স্বীয় বিবেচনায় সিদ্ধান্ত দান করিতেন। তাঁহার এই সিদ্ধান্ত দানের ব্যাপারে যদি আল্লাহ্ পক্ষ হইতে কোন সতর্ক সংকেত না আসিত তাহা হইলে ইহাতে দুই ধরনের ধারণার সৃষ্টি হইতে পারিত। (এক) তাঁহার সকল সিদ্ধান্ত দান সঠিক এবং আল্লাহ্র ইচ্ছানুযায়ী হইয়া থাকে। (দুই) নবীর ইজতিহাদের শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতার দায়িত্ব আল্লাহ গ্রহণ করেন নাই, এই কারণে তাঁহাকে কোন প্রকার সতর্ক করা হয় না।
এই দুই ধারণার কোনটিই সঠিক নহে। আসল কথা হইল, নবীর কোন কোন সিদ্ধান্তে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সতর্ক করিয়াছেন, আবার কোনটি সম্পর্কে তাঁহাকে সতর্ক করা হয় নাই। ইহা হইতে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, নবীর ইজতিহাদে ভুল হওয়া সম্ভব কিন্তু এই ভুলের উপর স্থির থাকা সম্ভব নহে। ভুল হইলেই সঙ্গে সঙ্গে নির্ভুল ওহী আসিয়া তাহা সংশোধন করিয়া দিয়াছে। ইহা হইতে আরও একটি বিষয় পরিষ্কার হইয়া যায় যে, যেই সকল বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় বিবেচনায় ইজতিহাদ করিয়া আমল করিয়াছিলেন এই সম্পর্কে ওহী নীরব থাকিলে প্রতীয়মান হয় যে, এই কাজটি আল্লাহ তা'আলার মর্জিমত হইয়াছিল বিধায় বিষয়টি সত্য এবং ইহার মর্যাদা হইল ওহীর মর্যাদার অনুরূপ। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের সময়কাল ছিল তেইশ বৎসর। এই সময়ের শত শত বিষয়ে তিনি ইজতিহাদ করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহা হইতে মাত্র পাঁচটি বিষয়ে আল্লাহ্ ওহী দ্বারা তাঁহাকে সতর্ক করা হইয়াছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার হইল যে, এই পাঁচটি সাবধান বাণীর কোনটিই এমন ছিল না যাহার সম্পর্ক ধর্ম, ই'তিকাদ, ইবাদত কিংবা শরীআতের বিধিবিধানের সঙ্গে ছিল, বরং সবগুলি কাজ ছিল হয় ব্যক্তিগত, না হয় যুদ্ধ সংক্রান্ত। ইহা হইতে আরও বুঝা যায়, ধর্ম ও ইহার বিধানসমূহ ইজাতিহাদী ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে। সাধারণ মানুষের ইজতিহাদ বা চিন্তাধারায় নানা সীমাবদ্ধতার ফলে ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটে। যেমন হেতুর সন্ধানে ত্রুটি, সাদৃশ্য ও কারণ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানের অভাব ইত্যাদি। কিন্তু নবীর ইজতিহাদ এইগুলির উপর নির্ভরশীল নয়, বরং তাঁহার ইজতিহাদ হইল রিসালতের আলোকে, নবুওয়াতের উপলব্ধিতে, আল্লাহ প্রদত্ত প্রজ্ঞায় এবং বক্ষ সম্প্রসারণের ভিত্তিতে। সঙ্গত কারণেই নবীর ইজতিহাদ সাধারণের ইজতিহাদ হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আরেকটি কথা স্মরণ রাখা দরকার যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবীসুলভ ইজতিহাদে যদি কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়, তাহা হইলে ইহার অর্থ এই নয় যে, তিনি যাহা গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা ছিল গুনাহ ও নিষিদ্ধ পন্থা, বরং ইহার অর্থ হইল দুইটি উত্তম পন্থা হইতে অধিকতর উত্তম পন্থাকে ছাড়িয়া তিনি অপেক্ষাকৃত কম উত্তম পন্থাকে অবলম্বন করিয়াছিলেন। ইহাতে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সাবধান করিয়া সর্বোত্তম পন্থা অনুসরণ করিবার তাকীদ করিয়াছেন। সতর্কীকরণকৃত বিষয়গুলির প্রতি তাকাইলেই বুঝা যায়, অপেক্ষাকৃত কম উত্তম বিষয়টি অবলম্বন করার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উদ্দেশ্য ছিল উম্মতের প্রতি তাঁহার সর্বদা দয়া প্রদর্শন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ছিল এই ক্ষেত্রে কঠোর মনোভার পোষণ করা।
যে পাঁচটি ইজতিহাদী বিষয়ে সতর্ক করা হইয়াছিল
(এক) হিজরতের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট একদা মক্কার বড় বড় কাফির নেতারা আসিয়া বসিল। তিনি তাহাদেরকে প্রতিমা পূজার কুফল এবং তাওহীদের কল্যাণ সম্পর্কে বুঝাইতেছিলেন। এই সময় তাঁহার মনস্কামনা ছিল যে, তাহারা যেন ইসলাম গ্রহণ করে। ইত্যবসরে সহজ-সরল মুসলমান আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম (রা) তাঁহার দরবারে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং কিছু বলিতে চাহিলেন। সামাজিক মর্যাদায় তিনি ঐ নেতাদের চেয়ে দুর্বল ছিলেন। মক্কার উক্ত কাফিররা ছিল অহংকারী অভিজাত শ্রেণীর লোক। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে এই অজুহাতে আসিতে চাহিত না যে, তাঁহার দরবারে সামাজিকভাবে নিম্নশ্রেণীর লোকেরা আসে। রাসূলুল্লাহ (স) লক্ষ্য করিয়াছিলেন যে, ঐ নেতাদের উপর তাঁহার প্রভাব পড়িতৈছে। এই কারণে এই মুহূর্তে আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম (রা)-এর আগমনকে রাসূলুল্লাহ (স) খুশিমনে গ্রহণ করিতে পারেন নাই। তিনি ভাবিয়াছিলেন, আবদুল্লাহ ইব্ন উম্মে মাকতূম (রা) তো মুসলমানই, সুতরাং এই মুহূর্তে তাহার প্রশ্নের জবাব না দেওয়াতে কোন ক্ষতি নাই। কিন্তু মক্কার ঐ কাফির নেতাগণ বিরক্তি বোধ করিলে মক্কার অধিবাসিগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হইবে। অপর দিকে তাহারা মুসলমান হইয়া গেলে মক্কাতে ইসলাম প্রচারের সকল বাধা দূর হইয়া যাইবে। এই কথা ভাবিয়া তিনি আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতূম (রা)-এর প্রতি অমনোযোগী হইয়া সর্বাত্মকভাবে ঐ নেতাগণের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিলেন। এই আচরণের উপর ওহী দ্বারা নিম্নভাবে সতর্ক করা হয়। ইরশাদ হইয়াছে:
عَبَسَ وَتَوَلَّى أَنْ جَاءَهُ الْأَعْمَى، وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّى. أَوْ يَذَّكَّرُ فَتَنْفَعَهُ الذِّكْرَى. أَمَّا مَنِ اسْتَغْنَى. فَأَنْتَ لَهُ تَصَدَّى وَمَا عَلَيْكَ اَلا يَزَّكَّى. وَأَمَّا مَنْ جَاءَكَ يَسْعَى، وَهُوَ يَخْشَى فَأَنْتَ عَنْهُ تَلَهَى كَلأَ إِنَّهَا تَذْكِرَةٌ. فَمَنْ شَاءَ ذَكَرَهُ (عبس ١-١٢).
"সে ভ্রুকুঞ্চিত করিল এবং মুখ ফিরাইয়া লইল, কারণ তাহার নিকট অন্ধ লোকটি আসিল। তুমি কেমন করিয়া জানিবে সে হয়ত পরিশুদ্ধ হইত অথবা উপদেশ গ্রহণ করিত, ফলে উপদেশ তাহার উপকারে আসিত। পক্ষান্তরে যে পরোয়া করে না, তুমি তাহার প্রতি মনোযোগ দিয়াছ। অথচ সে নিজে পরিশুদ্ধ না হইলে তোমার কোন দায়িত্ব নাই। অন্যপক্ষে যে তোমার নিকট ছুটিয়া আসিল, আর সে সশংকচিত্ত, তুমি তাহাকে উপেক্ষা করিলে। না, ইহা ঠিক নহে, ইহা তো উপদেশবাণী, যে ইচ্ছা করিবে সে ইহা স্মরণ রাখিবে" (৮০: ১-১২)।
এই আয়াত হইতে ইসলামের একটি মূলনীতির বিষয় জানা যায় যে, ইহাতে ধনী ও নির্ধন, মনিব ও গোলাম, সম্মানিত ও দুর্বলের মধ্যে কোন বৈষম্য নাই।
(দুই) ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরে জয়ী হইবার পর মুসলমানগণের গনীমতের মাল লাভ ও বন্দীদের নিকট হইতে মুক্তিপণ গ্রহণ সম্পর্কিত ঘটনা। তখনও গনীমতের মাল ও মুক্তিপণ (ফিদয়া) গ্রহণের বিধান অবতীর্ণ হয় নাই। মদীনায় হিজরত করিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) সারিয়্যায়ে নাখলা হইতে কিছু গনীমত লাভ করিয়াছিলেন। ইহার পরবর্তী পদক্ষেপই হইল বদর যুদ্ধ হইতে প্রাপ্ত গনীমত। এই যুদ্ধে কুরায়শ বংশের সত্তরজন কাফির বন্দী হইয়াছিল, যাহাদের অধিকাংশ মক্কার ধনাঢ্য ও অভিজাত বংশের ছিল। তাহাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মুসলমানদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিল। কেহ বলিলেন, উহাদিগকে হত্যা করা হউক। কেহ বলিলেন, মুক্তিপণ লইয়া উহাদিগকে মুক্তি দেওয়া হউক। 'উমার (রা) তাহাদেরকে হত্যা করিবার পরামর্শ দিলেন। মুক্তিপণ লইয়া মুক্ত করিয়া দিবার পরামর্শ ছিল আবূ বাক্র (রা)-এর। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পরামর্শ গ্রহণ করিয়া উহাদেরকে মুক্ত করিয়া দিলেন। এই সময় রাসূলুল্লাহ (স) আবূ বাক্র ও উমার (রা) উভয়কে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেনঃ হে আবু বাক্র! তোমার উপমা হইলেন ইবরাহীম ও 'ঈসা (আ)। হে উমার! তোমার উপমা হইলেন নূহ্ ও মূসা (আ)। কিন্তু আল্লাহ্র ইচ্ছা ছিল 'উমার (রা)-এর পরামর্শের অনুকূলে। কারণ মুক্তিপণ গ্রহণের ফলে এই সহজ-সরল মুসলমানদের মনে সম্পদের প্রতি লোভ বৃদ্ধির আশংকা ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক এইরূপ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ওহী দ্বারা তাঁহাকে সাবধান করা হইয়াছিল। ইরশাদ হইয়াছে:
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُشْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ. لَوْلا كِتَابٌ مِّنَ اللهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيْمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ. فَكُلُوا مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلالاً طَيِّبًا وَاتَّقُوا اللهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (الانفال - ٦٧).
"দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্য সংগত নহে। তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ চাহেন পরলোকের কল্যাণ। আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহর পূর্ববিধান না থাকিলে তোমরা যাহা গ্রহণ করিয়াছ তজ্জন্য তোমাদের উপর মহাশাস্তি আপতিত হইত। যুদ্ধে যাহা তোমরা লাভ করিয়াছ তাহা বৈধ ও উত্তম বলিয়া ভোগ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৮: ৬৭-৬৯)।
শুধু ইহাই নহে, যেই বন্দীদের নিকট হইতে মুক্তিপণ আদায় করা হইয়াছিল বা হইতেছিল, তাহদিগকে এই বলিয়া সান্ত্বনা দেওয়া হইয়াছে: يٰاَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِّمَنْ فِيْٓ اَيْدِيْكُمْ مِّنَ الْاَسْرٰىٓ اِنْ يَّعْلَمِ اللّٰهُ فِيْ قُلُوْبِكُمْ خَيْرًا يُّؤْتِكُمْ خَيْرًا مِّمَّآ اُخِذَ مِنْكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللّٰهُ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ.
"হে নবী! তোমাদের করায়ত্ত যুদ্ধ বন্দীদিগকে বল, আল্লাহ যদি তোমাদের হৃদয়ে ভাল কিছু দেখেন তবে তোমাদের নিকট হইতে যাহা লওয়া হইয়াছে তাহা অপেক্ষা উত্তম কিছু তিনি তোমাদিগকে দান করিবেন এবং তোমাদিগকে ক্ষমা করিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৮:৭০)।
ওহী আসিবার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় ইজতিহাদ দ্বারা যেই মুক্তিপণ ও গণীমত গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং যাহার উপর সাবধানবাণীও আসিয়াছিল, পরবর্তী কালে ওহী আসিয়া তাহা বৈধ ঘোষণা করিয়া দিল।
(তিন) রাসূলুল্লাহ (স) তাবুক অভিযানে রওয়ানা করিলেন। এই অভিযানে অধিক সংখ্যক মুসলিম সৈন্যের অংশগ্রহণ প্রয়োজন ছিল। কারণ প্রতিপক্ষ ছিল রোমান বাহিনী। তাহাদের বাহিনী ছিল বিশাল। ইহা ছাড়া কোন প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ইহা ছিল মুসলমানদের প্রথম অভিযান। উপরন্তু সময়টি ছিল তীব্র গ্রীষ্মকাল। ত্রিশ হাজার মুসলিম বাহিনী রওয়ানা করিলেন। কিছু সংখ্যক নিবেদিতপ্রাণ মুসলমান ওযরবশত ইহাতে অংশগ্রহণ করিতে পারেন নাই। কিন্তু অধিকাংশ মুনাফিক ইচ্ছা করিয়াই ইহাতে যোগদান হইতে বিরত থাকিল। যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ধূর্ত মুনাফিকরা আসিয়া তাহাদের অনুপস্থিতির ব্যাপারে মিথ্যা শপথ করিতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের এই মিথ্যা ওযর গ্রহণ করিয়া তাহাদের অপরাধ ক্ষমা করিয়া দিলেন। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নোক্ত সতর্কবাণী অবতীর্ণ হয়।
وَسَيَحْلِفُوْنَ بِاللهِ لَوَاسْتَطَعْنَا لَخَرَجْنَا مَعَكُمْ يُهْلِكُونَ أَنْفُسَهُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ. عَفَا اللَّهُ عَنْكَ لِمَ أَذِنْتَ لَهُمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَتَعْلَمَ الْكَاذِبِينَ (التوبة - ٤٢-٤٣ ) .
“উহারা অচিরেই আল্লাহ্ নামে শপথ করিয়া বলিবে, পারিলে আমরা নিশ্চয়ই তোমাদের সংগে বাহির হইতাম। উহারা নিজদিগকেই ধ্বংস করে। আল্লাহ জানেন উহারা অবশ্যই মিথ্যাচারী। আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করিয়াছেন। কাহারা সত্যবাদী তাহা তোমার নিকট স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত এবং কাহারা মিথ্যাবাদী তাহা না জানা পর্যন্ত তুমি কেন উহাদিগকে অব্যাহতি দিলে” (৯:৪২-৪৩)?
স্পষ্টই রাসূলুল্লাহ (স) গায়ب সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। মুনাফিকদের আসল অবস্থা সম্পর্কেও তিনি জানিতেন না। এই কারণে তাহাদের বাহ্যিক কথার উপরই তাঁহাকে নির্ভর করিতে হইয়াছিল। কিন্তু আলিমুল গায়ب আল্লাহ্ তাহাদের মুখোশ উন্মোচন করিয়া দিয়াছেন।
(চার) মুনাফিকদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবহিত করা হইয়াছিল যে, তাহাদের অনুকূলে তাঁহার দু'আ কবুল হইবে না। ইরশাদ হইয়াছে: اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ (توبة - ٨٠).
“তুমি উহাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা উহাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না কর একই কথা। তুমি সত্তর বার উহাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিলেও আল্লাহ উহাদিগকে কখনও ক্ষমা করিবেন না। ইহা এইজন্য যে, উহারা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সহিত কুফরী করিয়াছে” (৯:৮০)।
এই আদেশ অবতীর্ণ হইবার পর মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি ইব্ন সালূল মারা যায়। তাহার ছেলে একজন খাঁটী মুসলমান ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিয়া তাহার পিতার সালাতে জানাযা আদায় করার জন্য আবেদন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার অফুরন্ত দয়ার্দ্রতার দরুন সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করিলেন না। উমার (রা) স্মরণ করাইয়াও দিয়াছিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! সে ক্ষমার অযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে তো হুকুম আসিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি সত্তরবার হইতেও বেশী তাহার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিব। উপরিউক্ত আয়াতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাগফিরাত চাওয়া ও না চাওয়াকে নিষ্ফল বলা হইয়াছে, কিন্তু স্পষ্টভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করাকে নিষেধ করা হয় নাই। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স) দয়াপরবশ হইয়া এই প্রার্থনা করিয়া ফেলিয়াছিলেন যাহাতে তাহার নিবেদিত-প্রাণ মুসলিম সন্তান ভগ্নহৃদয় না হয়। কিন্তু তিনি এই কথার প্রতি মনোনিবেশ করেন নাই যে, ইহার ফলে অসংখ্য মুনাফিক নিজদিগকে প্রচ্ছন্ন রাখিবার সুযোগ পাইয়া যাইবে এবং মুসলমানদের মধ্যে গণ্য হইয়া তাহাদের অভ্যন্তরে ফিতনা সৃষ্টি করার সুযোগ লাভ করিবে। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلاَ تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَدًا وَلاَ تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَسِقُونَ (التوبة - ٨٤) .
"উহাদের মধ্যে কাহারও মৃত্যু হইলে তুমি কখনও উহার জন্য জানাযার সালাত পড়িবে না এবং উহার কবর-পার্শ্বে দাঁড়াইবে না। উহারা তো আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলকে অস্বীকার করিয়াছিল এবং পাপাচারী অবস্থায় উহাদের মৃত্যু হইয়াছে” (৯:৮৪)।
(পাঁচ) রাসূলুল্লাহ (স) একদা স্বীয় স্ত্রীগণের কাহারও কাহারও পরিতুষ্টির জন্য তাঁহার প্রিয় খাবার এক হালাল জিনিস (মধু) কখনওব্যবহার না করিবার অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। কোন হালাল জিনিস সকলকে খাইতে হইবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নাই। স্বীয় ইচ্ছায় বা কাহারও মনোস্তুষ্টির জন্য ইহা ভক্ষণ না করিবার সংকল্প করিবার তাহার অধিকার রহিয়াছে। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স) যদি তাঁহার কোন স্ত্রীর মন পাইবার জন্য ঐ স্ত্রীর নিকট অপসন্দনীয় কোন বস্তু ভক্ষণ না করিবার উদ্দেশ্যে নিজের জন্য হারাম করিয়া থাকেন তাহা হইলে ইহা তেমন দূষণীয় নয়। একজন সুস্বামী হিসাবে ইহা স্ত্রীদের জন্য ইনসাফ বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে। কিন্তু এই সমস্যাটির অপর একটি দিকও ছিল যে, নবী হওয়া সত্ত্বেও একটি হালাল বস্তুকে নিজের জন্য হারাম করিয়া লওয়া এবং ভক্ষণ না করিবার জন্য শপথ করাকে অনুসরণ করিতে গিয়া উম্মতের কোন ব্যক্তি হয়ত সেই বস্তুটিকে নাজায়েয কিংবা অপসন্দ করিয়া বসিত। ইহার ফলে আল্লাহ্ বিধানে হেরফের হইবার আশংকা সৃষ্টি হইত। সুতরাং এই বিধান অবতীর্ণ হইল যে, এই সকল কাজে নবীর জন্য কাহারও মনোস্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য করা উচিত নয়। ইরশাদ হইয়াছে:
يُأَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (التحريم -١).
"হে নবী! আল্লাহ তোমার জন্য যাহা বৈধ করিয়াছেন তুমি তাহা নিষিদ্ধ করিতেছ কেন? তুমি তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি চাহিতেছ; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু” (৬৬ঃ ১)।
এই স্থলে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-কে নবী বলিয়া খেতাব করিয়াছেন। ইহা হইতে বুঝা যায়, একজন স্বামী হিসাবে তিনি তাহা করিতে পারিতেন, কিন্তু একজন নবী হিসাবে তাঁহার ইহা করিবার কোন অধিকার নাই।
মোটকথা, উপরোল্লিখিত পাঁচটি বিষয়েই রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইজতিহাদী ভুল হইয়াছিল। তবে ঘটনাবলীর বিশদ বিবরণ হইতে বুঝা যায়, এই ক্ষেত্রে রূপক অর্থে ভুল বলা হইয়াছে। নবীগণের উচ্চ মর্যাদা ও নিষ্পাপতার প্রেক্ষিতে তাঁহাদের পক্ষে এইরূপ ভুল করিবারও অনুমতি নাই। এই কারণে আল্লাহ্ ওহী দ্বারা প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তাঁহাদেরকে সতর্ক করা হইয়াছে এবং বিশুদ্ধ সিদ্ধান্তের প্রতি তাঁহাদেরকে পথ প্রদর্শন করা হইয়াছে (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ৭৭-৮২)।
📄 যে পাঁচটি ইজতিহাদী বিষয়ে সতর্ক করা হইয়াছিল
আরেকটি কথা স্মরণ রাখা দরকার যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবীসুলভ ইজতিহাদে যদি কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়, তাহা হইলে ইহার অর্থ এই নয় যে, তিনি যাহা গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা ছিল গুনাহ ও নিষিদ্ধ পন্থা, বরং ইহার অর্থ হইল দুইটি উত্তম পন্থা হইতে অধিকতর উত্তম পন্থাকে ছাড়িয়া তিনি অপেক্ষাকৃত কম উত্তম পন্থাকে অবলম্বন করিয়াছিলেন। ইহাতে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সাবধান করিয়া সর্বোত্তম পন্থা অনুসরণ করিবার তাকীদ করিয়াছেন। সতর্কীকরণকৃত বিষয়গুলির প্রতি তাকাইলেই বুঝা যায়, অপেক্ষাকৃত কম উত্তম বিষয়টি অবলম্বন করার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উদ্দেশ্য ছিল উম্মতের প্রতি তাঁহার সর্বদা দয়া প্রদর্শন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ছিল এই ক্ষেত্রে কঠোর মনোভার পোষণ করা।
(এক) হিজরতের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট একদা মক্কার বড় বড় কাফির নেতারা আসিয়া বসিল। তিনি তাহাদেরকে প্রতিমা পূজার কুফল এবং তাওহীদের কল্যাণ সম্পর্কে বুঝাইতেছিলেন। এই সময় তাঁহার মনস্কামনা ছিল যে, তাহারা যেন ইসলাম গ্রহণ করে। ইত্যবসরে সহজ-সরল মুসলমান আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম (রা) তাঁহার দরবারে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং কিছু বলিতে চাহিলেন। সামাজিক মর্যাদায় তিনি ঐ নেতাদের চেয়ে দুর্বল ছিলেন। মক্কার উক্ত কাফিররা ছিল অহংকারী অভিজাত শ্রেণীর লোক। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে এই অজুহাতে আসিতে চাহিত না যে, তাঁহার দরবারে সামাজিকভাবে নিম্নশ্রেণীর লোকেরা আসে। রাসূলুল্লাহ (স) লক্ষ্য করিয়াছিলেন যে, ঐ নেতাদের উপর তাঁহার প্রভাব পড়িতৈছে। এই কারণে এই মুহূর্তে আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম (রা)-এর আগমনকে রাসূলুল্লাহ (স) খুশিমনে গ্রহণ করিতে পারেন নাই। তিনি ভাবিয়াছিলেন, আবদুল্লাহ ইব্ন উম্মে মাকতূম (রা) তো মুসলমানই, সুতরাং এই মুহূর্তে তাহার প্রশ্নের জবাব না দেওয়াতে কোন ক্ষতি নাই। কিন্তু মক্কার ঐ কাফির নেতাগণ বিরক্তি বোধ করিলে মক্কার অধিবাসিগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হইবে। অপর দিকে তাহারা মুসলমান হইয়া গেলে মক্কাতে ইসলাম প্রচারের সকল বাধা দূর হইয়া যাইবে। এই কথা ভাবিয়া তিনি আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতূম (রা)-এর প্রতি অমনোযোগী হইয়া সর্বাত্মকভাবে ঐ নেতাগণের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিলেন। এই আচরণের উপর ওহী দ্বারা নিম্নভাবে সতর্ক করা হয়। ইরশাদ হইয়াছে:
عَبَسَ وَتَوَلَّى أَنْ جَاءَهُ الْأَعْمَى، وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّى. أَوْ يَذَّكَّرُ فَتَنْفَعَهُ الذِّكْرَى. أَمَّا مَنِ اسْتَغْنَى. فَأَنْتَ لَهُ تَصَدَّى وَمَا عَلَيْكَ اَلا يَزَّكَّى. وَأَمَّا مَنْ جَاءَكَ يَسْعَى، وَهُوَ يَخْشَى فَأَنْتَ عَنْهُ تَلَهَى كَلأَ إِنَّهَا تَذْكِرَةٌ. فَمَنْ شَاءَ ذَكَرَهُ (عبس ١-١٢).
"সে ভ্রুকুঞ্চিত করিল এবং মুখ ফিরাইয়া লইল, কারণ তাহার নিকট অন্ধ লোকটি আসিল। তুমি কেমন করিয়া জানিবে সে হয়ত পরিশুদ্ধ হইত অথবা উপদেশ গ্রহণ করিত, ফলে উপদেশ তাহার উপকারে আসিত। পক্ষান্তরে যে পরোয়া করে না, তুমি তাহার প্রতি মনোযোগ দিয়াছ। অথচ সে নিজে পরিশুদ্ধ না হইলে তোমার কোন দায়িত্ব নাই। অন্যপক্ষে যে তোমার নিকট ছুটিয়া আসিল, আর সে সশংকচিত্ত, তুমি তাহাকে উপেক্ষা করিলে। না, ইহা ঠিক নহে, ইহা তো উপদেশবাণী, যে ইচ্ছা করিবে সে ইহা স্মরণ রাখিবে" (৮০: ১-১২)।
এই আয়াত হইতে ইসলামের একটি মূলনীতির বিষয় জানা যায় যে, ইহাতে ধনী ও নির্ধন, মনিব ও গোলাম, সম্মানিত ও দুর্বলের মধ্যে কোন বৈষম্য নাই।
(দুই) ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরে জয়ী হইবার পর মুসলমানগণের গনীমতের মাল লাভ ও বন্দীদের নিকট হইতে মুক্তিপণ গ্রহণ সম্পর্কিত ঘটনা। তখনও গনীমতের মাল ও মুক্তিপণ (ফিদয়া) গ্রহণের বিধান অবতীর্ণ হয় নাই। মদীনায় হিজরত করিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) সারিয়্যায়ে নাখলা হইতে কিছু গনীমত লাভ করিয়াছিলেন। ইহার পরবর্তী পদক্ষেপই হইল বদর যুদ্ধ হইতে প্রাপ্ত গনীমত। এই যুদ্ধে কুরায়শ বংশের সত্তরজন কাফির বন্দী হইয়াছিল, যাহাদের অধিকাংশ মক্কায় ধনাঢ্য ও অভিজাত বংশের ছিল। তাহাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মুসলমানদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিল। কেহ বলিলেন, উহাদিগকে হত্যা করা হউক। কেহ বলিলেন, মুক্তিপণ লইয়া উহাদিগকে মুক্তি দেওয়া হউক। 'উমার (রা) তাহাদেরকে হত্যা করিবার পরামর্শ দিলেন। মুক্তিপণ লইয়া মুক্ত করিয়া দিবার পরামর্শ ছিল আবূ বাক্র (রা)-এর। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পরামর্শ গ্রহণ করিয়া উহাদেরকে মুক্ত করিয়া দিলেন। এই সময় রাসূলুল্লাহ (স) আবূ বাক্র ও উমার (রা) উভয়কে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেনঃ হে আবু বাক্র! তোমার উপমা হইলেন ইবরাহীম ও 'ঈসা (আ)। হে উমার! তোমার উপমা হইলেন নূহ্ ও মূসা (আ)। কিন্তু আল্লাহ্র ইচ্ছা ছিল 'উমার (রা)-এর পরামর্শের অনুকূলে। কারণ মুক্তিপণ গ্রহণের ফলে এই সহজ-সরল মুসলমানদের মনে সম্পদের প্রতি লোভ বৃদ্ধির আশংকা ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক এইরূপ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ওহী দ্বারা তাঁহাকে সাবধান করা হইয়াছিল। ইরশাদ হইয়াছে:
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُشْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ. لَوْلا كِتَابٌ مِّنَ اللهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيْمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ. فَكُلُوا مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلالاً طَيِّبًا وَاتَّقُوا اللهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (الانفال - ٦٧).
"দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্য সংগত নহে। তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ চাহেন পরলোকের কল্যাণ। আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহর পূর্ববিধান না থাকিলে তোমরা যাহা গ্রহণ করিয়াছ তজ্জন্য তোমাদের উপর মহাশাস্তি আপতিত হইত। যুদ্ধে যাহা তোমরা লাভ করিয়াছ তাহা বৈধ ও উত্তম বলিয়া ভোগ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৮: ৬৭-৬৯)।
শুধু ইহাই নহে, যেই বন্দীদের নিকট হইতে মুক্তিপণ আদায় করা হইয়াছিল বা হইতেছিল, তাহদিগকে এই বলিয়া সান্ত্বনা দেওয়া হইয়াছে: يٰاَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِّمَنْ فِيْٓ اَيْدِيْكُمْ مِّنَ الْاَسْرٰىٓ اِنْ يَّعْلَمِ اللّٰهُ فِيْ قُلُوْبِكُمْ خَيْرًا يُّؤْتِكُمْ خَيْرًا مِّمَّآ اُخِذَ مِنْكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللّٰهُ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ.
"হে নবী! তোমাদের করায়ত্ত যুদ্ধ বন্দীদিগকে বল, আল্লাহ যদি তোমাদের হৃদয়ে ভাল কিছু দেখেন তবে তোমাদের নিকট হইতে যাহা লওয়া হইয়াছে তাহা অপেক্ষা উত্তম কিছু তিনি তোমাদিগকে দান করিবেন এবং তোমাদিগকে ক্ষমা করিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৮:৭০)।
ওহী আসিবার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় ইজতিহাদ দ্বারা যেই মুক্তিপণ ও গণীমত গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং যাহার উপর সাবধানবাণীও আসিয়াছিল, পরবর্তী কালে ওহী আসিয়া তাহা বৈধ ঘোষণা করিয়া দিল।
(তিন) রাসূলুল্লাহ (স) তাবুক অভিযানে রওয়ানা করিলেন। এই অভিযানে অধিক সংখ্যক মুসলিম সৈন্যের অংশগ্রহণ প্রয়োজন ছিল। কারণ প্রতিপক্ষ ছিল রোমান বাহিনী। তাহাদের বাহিনী ছিল বিশাল। ইহা ছাড়া কোন প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ইহা ছিল মুসলমানদের প্রথম অভিযান। উপরন্তু সময়টি ছিল তীব্র গ্রীষ্মকাল। ত্রিশ হাজার মুসলিম বাহিনী রওয়ানা করিলেন। কিছু সংখ্যক নিবেদিতপ্রাণ মুসলমান ওযরবশত ইহাতে অংশগ্রহণ করিতে পারেন নাই। কিন্তু অধিকাংশ মুনাফিক ইচ্ছা করিয়াই ইহাতে যোগদান হইতে বিরত থাকিল। যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ধূর্ত মুনাফিকরা আসিয়া তাহাদের অনুপস্থিতির ব্যাপারে মিথ্যা শপথ করিতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের এই মিথ্যা ওযর গ্রহণ করিয়া তাহাদের অপরাধ ক্ষমা করিয়া দিলেন। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নোক্ত সতর্কবাণী অবতীর্ণ হয়।
وَسَيَحْلِفُوْنَ بِاللهِ لَوَاسْتَطَعْنَا لَخَرَجْنَا مَعَكُمْ يُهْلِكُونَ أَنْفُسَهُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ. عَفَا اللَّهُ عَنْكَ لِمَ أَذِنْتَ لَهُمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَتَعْلَمَ الْكَاذِبِينَ (التوبة - ٤٢-٤٣ ) .
“উহারা অচিরেই আল্লাহ্ নামে শপথ করিয়া বলিবে, পারিলে আমরা নিশ্চয়ই তোমাদের সংগে বাহির হইতাম। উহারা নিজদিগকেই ধ্বংস করে। আল্লাহ জানেন উহারা অবশ্যই মিথ্যাচারী। আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করিয়াছেন। কাহারা সত্যবাদী তাহা তোমার নিকট স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত এবং কাহারা মিথ্যাবাদী তাহা না জানা পর্যন্ত তুমি কেন উহাদিগকে অব্যাহতি দিলে” (৯:৪২-৪৩)?
স্পষ্টই রাসূলুল্লাহ (স) গায়ব সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। মুনাফিকদের আসল অবস্থা সম্পর্কেও তিনি জানিতেন না। এই কারণে তাহাদের বাহ্যিক কথার উপরই তাঁহাকে নির্ভর করিতে হইয়াছিল। কিন্তু আলিমুল গায়ব আল্লাহ্ তাহাদের মুখোশ উন্মোচন করিয়া দিয়াছেন।
(চার) মুনাফিকদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবহিত করা হইয়াছিল যে, তাহাদের অনুকূলে তাঁহার দু'আ কবুল হইবে না। ইরশাদ হইয়াছে: اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ (توبة - ٨٠).
“তুমি উহাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা উহাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না কর একই কথা। তুমি সত্তর বার উহাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিলেও আল্লাহ উহাদিগকে কখনও ক্ষমা করিবেন না। ইহা এইজন্য যে, উহারা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সহিত কুফরী করিয়াছে” (৯:৮০)।
এই আদেশ অবতীর্ণ হইবার পর মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি ইব্ন সালূল মারা যায়। তাহার ছেলে একজন খাঁটী মুসলমান ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিয়া তাহার পিতার সালাতে জানাযা আদায় করার জন্য আবেদন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার অফুরন্ত দয়ার্দ্রতার দরুন সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করিলেন না। উমার (রা) স্মরণ করাইয়াও দিয়াছিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! সে ক্ষমার অযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে তো হুকুম আসিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি সত্তরবার হইতেও বেশী তাহার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিব। উপরিউক্ত আয়াতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাগফিরাত চাওয়া ও না চাওয়াকে নিষ্ফল বলা হইয়াছে, কিন্তু স্পষ্টভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করাকে নিষেধ করা হয় নাই। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স) দয়াপরবশ হইয়া এই প্রার্থনা করিয়া ফেলিয়াছিলেন যাহাতে তাহার নিবেদিত-প্রাণ মুসলিম সন্তান ভগ্নহৃদয় না হয়। কিন্তু তিনি এই কথার প্রতি মনোনিবেশ করেন নাই যে, ইহার ফলে অসংখ্য মুনাফিক নিজদিগকে প্রচ্ছন্ন রাখিবার সুযোগ পাইয়া যাইবে এবং মুসলমানদের মধ্যে গণ্য হইয়া তাহাদের অভ্যন্তরে ফিতনা সৃষ্টি করার সুযোগ লাভ করিবে। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلاَ تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَدًا وَلاَ تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَسِقُونَ (التوبة - ٨٤) .
"উহাদের মধ্যে কাহারও মৃত্যু হইলে তুমি কখনও উহার জন্য জানাযার সালাত পড়িবে না এবং উহার কবর-পার্শ্বে দাঁড়াইবে না। উহারা তো আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলকে অস্বীকার করিয়াছিল এবং পাপাচারী অবস্থায় উহাদের মৃত্যু হইয়াছে” (৯:৮৪)।
(পাঁচ) রাসূলুল্লাহ (স) একদা স্বীয় স্ত্রীগণের কাহারও কাহারও পরিতুষ্টির জন্য তাঁহার প্রিয় খাবার এক হালাল জিনিস (মধু) কখনওব্যবহার না করিবার অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। কোন হালাল জিনিস সকলকে খাইতে হইবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নাই। স্বীয় ইচ্ছায় বা কাহারও মনোস্তুষ্টির জন্য ইহা ভক্ষণ না করিবার সংকল্প করিবার তাহার অধিকার রহিয়াছে। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স) যদি তাঁহার কোন স্ত্রীর মন পাইবার জন্য ঐ স্ত্রীর নিকট অপসন্দনীয় কোন বস্তু ভক্ষণ না করিবার উদ্দেশ্যে নিজের জন্য হারাম করিয়া থাকেন তাহা হইলে ইহা তেমন দূষণীয় নয়। একজন সুস্বামী হিসাবে ইহা স্ত্রীদের জন্য ইনসাফ বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে। কিন্তু এই সমস্যাটির অপর একটি দিকও ছিল যে, নবী হওয়া সত্ত্বেও একটি হালাল বস্তুকে নিজের জন্য হারাম করিয়া লওয়া এবং ভক্ষণ না করিবার জন্য শপথ করাকে অনুসরণ করিতে গিয়া উম্মতের কোন ব্যক্তি হয়ত সেই বস্তুটিকে নাজায়েয কিংবা অপসন্দ করিয়া বসিত। ইহার ফলে আল্লাহ্ বিধানে হেরফের হইবার আশংকা সৃষ্টি হইত। সুতরাং এই বিধান অবতীর্ণ হইল যে, এই সকল কাজে নবীর জন্য কাহারও মনোস্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য করা উচিত নয়। ইরশাদ হইয়াছে:
يُأَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (التحريم -١).
"হে নবী! আল্লাহ তোমার জন্য যাহা বৈধ করিয়াছেন তুমি তাহা নিষিদ্ধ করিতেছ কেন? তুমি তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি চাহিতেছ; আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু” (৬৬ঃ ১)।
এই স্থলে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-কে নবী বলিয়া খেতাব করিয়াছেন। ইহা হইতে বুঝা যায়, একজন স্বামী হিসাবে তিনি তাহা করিতে পারিতেন, কিন্তু একজন নবী হিসাবে তাঁহার ইহা করিবার কোন অধিকার নাই।
মোটকথা, উপরোল্লিখিত পাঁচটি বিষয়েই রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইজতিহাদী ভুল হইয়াছিল। তবে ঘটনাবলীর বিশদ বিবরণ হইতে বুঝা যায়, এই ক্ষেত্রে রূপক অর্থে ভুল বলা হইয়াছে। নবীগণের উচ্চ মর্যাদা ও নিষ্পাপতার প্রেক্ষিতে তাঁহাদের পক্ষে এইরূপ ভুল করিবারও অনুমতি নাই। এই কারণে আল্লাহ্ ওহী দ্বারা প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তাঁহাদেরকে সতর্ক করা হইয়াছে এবং বিশুদ্ধ সিদ্ধান্তের প্রতি তাঁহাদেরকে পথ প্রদর্শন করা হইয়াছে (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ৭৭-৮২)।
📄 নবীগণকে হিকমত (প্রজ্ঞা) দান
নবীগণকে হিকমত (প্রজ্ঞা) দান
নবীগণকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে যেই সকল নি'মাত দান করা হইয়াছে তাহার মধ্যে বিশেষ একটি নি'মাতের কথা আল-কুরআনে বারংবার উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহা হইল হিকমত। ইবরাহীম ('আ)-এর বংশধরের উপর আল্লাহ তা'আলা যেই সকল অনুগ্রহ করিয়াছিলেন এইগুলির উল্লেখ করিয়া ইরশাদ হইয়াছে:
فَقَدْ أَتَيْنَا آلَ إِبْرَاهِيمَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَأَتَيْنَاهُمْ مُلْكًا عَظِيمًا (النساء - ٥٤ ) .
"আমি ইবরাহীমের বংশধরকেও তো কিতাব ও হিকমত দান করিয়াছিলাম এবং তাহাদিগকে বিশাল রাজ্য দান করিয়াছিলাম" (৪ঃ ৫৪)।
লুকমান ('আ) সম্পর্কে ইড়শাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ أَتَيْنَا لُقْمَانَ الحِكْمَةَ أَنِ اشْكُرْ لله . لقمان - (۱۲) .
"আমি লুকমানকে হিকমত দান করিয়াছিলাম এবং বলিয়াছিলাম, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর" (৩১: ১২)।
দাউদ ('আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَشَدَدْنَا مُلْكَهُ وَأَتَيْنُهُ الحِكْمَةَ وَفَصْلَ الخطاب (ص - ٢٠) .
"আমি তাহার রাজ্যকে সুদৃঢ় করিয়াছিলাম এবং তাহাকে দিয়াছিলাম প্রজ্ঞা ও ফায়সালাকারী বাগ্মিতা" (৩৮ঃ ২০)।
وَقَتَلَ دَاوُدُ جَالُوْتَ وَأَنْهُ اللهُ الْمُلْكَ وَالحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ (البقرة - ٢٥١).
"দাউদ জালুতকে সংহার করিল, আল্লাহ তাহাকে রাজত্ব ও হিকমত দান করিলেন এবং যাহা তিনি ইচ্ছা করিলেন তাহা তাহাকে শিক্ষা দিলেন" (২: ২৫১)।
আল-কুরআনে 'ঈসা ('আ)-এর উক্তি এইরূপ হইয়াছে:
قَدْ جِئْتُكُمْ بِالْحِكْمَةِ وَلَأُبَيِّنَ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي تَخْتَلِفُونَ فِيهِ (الزخرف ٦٣).
"আমি তো তোমাদের নিকট আসিয়াছি প্রজ্ঞাসহ এবং তোমরা যে কতক বিষয়ে মতভেদ করিতেছ তাহা স্পষ্ট করিয়া দিবার জন্য" (৪৩ঃ ৬৩)।
আল্লাহ তা'আলা ঈসা ('আ)-এর উপর তাঁহার অনুগ্রহের ব্যাপারে ইরশাদ করিয়াছেন:
وَاذْ عَلَّمْتُكَ الكتاب والحكمة والتَّوراة والانجيل (المائدة - ١١٠).
"আমি তোমাকে কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল শিক্ষা দিয়াছিলাম” (৫: ১১০)। সকল নবীর ব্যাপারে ইরশাদ হইয়াছে:
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّنَ لَمَا أَتَيْتُكُمْ مِّنْ كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ (আল ইমরান - ৮১).
"স্মরণ কর, যখন আল্লাহ নবীদের অংগীকার লইয়াছিলেন যে, তোমাদিগকে কিতাব ও হিকমত যাহা কিছু দিয়াছি” (৩:৮১)।
ইবরাহীম (আ) রাসূলুল্লাহ (স)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে দু'আ করিতে গিয়া বলিয়াছিলেন:
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولاً مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ ايتك وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (আল-বাকারা - ১২৯).
"হে আমার প্রতিপালক! তুমি তাহাদের মধ্য হইতে তাহাদের নিকট এক রাসূল প্রেরণ করিও যে তোমার আয়াতসমূহ তাহাদের নিকট তিলাওয়াত করিবে, তাহাদিগকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবে এবং তাহাদিগকে পবিত্র করিবে। তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়" (২:১২৯)।
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার দু'আ কবুল করা প্রসঙ্গে ইরশাদ করিলেন:
كَمَا أَرْسَلْنَا فِيكُمْ رَسُولاً مِنْكُمْ يَتْلُوا عَلَيْكُمْ أَيْتِنَا وَيُزَكِّيكُمْ وَيُعَلِّمُكُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُمْ مَا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ (আল-বাকারা - ১৫১).
"যেমন আমি তোমাদের মধ্য হইতে তোমাদের নিকট একজন রাসূল প্রেরণ করিয়াছি, যে আমার আয়াতসমূহ তোমাদের নিকট তিলাওয়াত করে, তোমাদিগকে পবিত্র করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়, আর তোমরা যাহা জানিতে না তাহা শিক্ষা দেয়” (২:১৫১)।
ইবরাহীম (আ)-এর দু'আর ফসল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর আবির্ভাবের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা মুমিনগণের প্রতি যেই করুণা প্রদর্শন করিয়াছেন সেই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيُّتُه وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَّلٍ مُّبِينٍ (আল ইমরান - ১৬৪).
"আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি অবশ্যই অনুগ্রহ করিয়াছেন যে, তিনি তাহাদের নিজেদের মধ্য হইতে তাহাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন, যে তাঁহার আয়াতসমূহ তাহাদের নিকট তিলাওয়াত করে, তাহাদিগকে পরিশোধন করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়, যদিও তাহারা পূর্বে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে ছিল" (৩:১৬৪)।
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولاً مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُّبِينٍ.
"তিনিই উম্মীদের মধ্যে একজন রাসূল পাঠাইয়াছেন তাহাদের মধ্য হইতে, যে তাহাদের নিকট আবৃত্তি করে তাঁহার আয়াতসমূহ, তাহাদিগকে পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমত। ইতোপূর্বে তো ইহারা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে” (৬২: ২)।
স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)-কে লক্ষ্য করিয়া ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَوْلا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ وَرَحْمَتُهُ لَهَمَّتْ طَائِفَةٌ مِّنْهُمْ أَنْ يُضِلُّوكَ وَمَا يُضِلُّونَ إِلَّا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَضُرُّونَكَ مِنْ شَيْءٍ وَأَنْزَلَ اللهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا (النساء -١١٣).
"তোমার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকিলে তাহাদের একদল তোমাকে পথভ্রষ্ট করিতে চাহিতই। কিন্তু তাহারা নিজদিগকে ব্যতীত আর কাহাকেও পথভ্রষ্ট করে না এবং তোমার কোনই ক্ষতি করিতে পারে না। আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হikমত অবতীর্ণ করিয়াছেন এবং তুমি যাহা জানিতে না তাহা তোমাকে শিক্ষা দিয়াছেন, তোমার প্রতি আল্লাহ্ মহাঅনুগ্রহ রহিয়াছে” (৪: ১১৩)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে উদ্দেশ্য করিয়া আরও ইরশাদ হইয়াছে:
ذلِكَ مِمَّا أَوْحَى إِلَيْكَ رَبُّكَ مِنَ الْحِكْمَةِ (اسرائيل -٣٩).
"তোমার প্রতিপালক ওহীর দ্বারা তোমাকে যে হিকমত দান করিয়াছেন এইগুলি তাহার অন্তর্ভুক্ত” (১৭:৩৯)।
সাধারণ মুসলমানদের উদ্দেশ্যে ইরশাদ হইয়াছে:
وَاذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَمَا أَنْزَلَ عَلَيْكُمْ مِنَ الْكِتَابِ وَالْحِكَمَةِ يَعِظُكُمْ بِهِ (البقرة - ٢٣١).
"তোমাদের প্রতি আল্লাহর নি'মাত ও কিতাব এবং হিকমত যাহা তিনি তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করিয়াছেন, যদ্ধারা তিনি তোমাদিগকে উপদেশ দেন, তাহা স্মরণ কর" (২: ২৩১)।
বিশেষভাবে উম্মত জননীগণের উদ্দেশ্যে ইরশাদ হইয়াছে:
وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيت الله والحكمة (الاحزاب - ٣٤).
"আল্লাহ্ আয়াত ও জ্ঞানের কথা যাহা তোমাদের গৃহে পঠিত হয়, তাহা তোমরা স্মরণ রাখিবে" (৩৩ : ৩৪)।
যোগ্যতানুযায়ী সাধারণ মুসলমানগণও হিকমতের মত আল্লাহর উপহার লাভ করিয়া থাকে। ইরশাদ হইয়াছে:
يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَنْ يَّشَاءُ وَمَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا (البقرة - ٢٦٩).
"তিনি যাহাকে ইচ্ছা হিকমত দান করেন এবং যাহাকে হিকমত দান করা হয় তাহাকে প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়" (২ : ২৬৯)।
হিকমতের মাধ্যমে দীনের তাবলীগ ও দাওয়াত দানেরও হুকুম দেওয়া হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
أدْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ (النَّحْلُ - ١٢٥ ).
"তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং উহাদের সহিত তর্ক করিবে উত্তম পন্থায়" (১৬ : ১২৫)।
একটি স্থানে কিয়ামত ও উপদেশমূলক বাণী সম্পর্কে হিকমত শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مِنَ الْأَنْبَاءِ مَا فِيْهِ مُزْدَجَرٌ حِكْمَةٌ بَالِغَةٌ فَمَا تُغْنِ النُّذُرُ (القمر ٤ - ٥ ) .
"উহাদের নিকট আসিয়াছে সুসংবাদ, যাহাতে আছে সাবধান বাণী, ইহা পরিপূর্ণ জ্ঞান, তবে এই সতর্কবাণী উহাদের কোন উপকারে আসে নাই” (৫৪ : ৪-৫)।
উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহে হikমত শব্দ প্রয়োগ করা হইয়াছে। ইহাতে হিকমত শব্দটি কখনও একা এবং কখনও কিতাব শব্দের পরে আসিয়াছে। হিকমত শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা ও কাজ। কিন্তু আয়াতগুলিতে ইহা কোন অর্থে প্রয়োগ হইয়াছে, ইহা অনুধাবন করিবার জন্য আভিধানবেত্তা ও তাফসীর বিশেষজ্ঞগণের অভিমত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সর্বাধিক প্রাচীন আভিধানিক ইব্ন দুরায়দ হিকমত শব্দের অর্থ লিখিয়াছেন:
فَكُلُّ كَلِمَةٍ وَعَظَتْكَ أَوْ زَجَرَتْكَ أَوْ دَعَتْكَ إِلَى مُكَرَّمَةٍ أَوْ نَهَتَكَ مِنْ قَبِيحٍ فَهِيَ حِكْمَةٌ وَحُكم.
"যেসকল কথা উপদেশ দান করে, সতর্ক করে, সুপথে আহবান করে এবং অমঙ্গলের পথ হইতে বারণ করে তাহাই হইল হিকমত ও হুকুম" (জামহারাতুল লুগাত, ২খ, পৃ. ১৮৬)।
অভিধান শাস্ত্রের ইমাম আল-জাওহারী লিখিয়াছেন:
الْحِكْمَةُ مِنَ الْعِلْمِ وَالْحَكِيمُ الْعَالِمُ وَصَاحِبُ الحِكْمَةِ الْحَكِيمُ الْمُتَّقِنُ لِلْأُمُورِ. “হিকমত হইল ইলম বা জ্ঞান, হাকীম হইল ‘আলিম বা জ্ঞানী, জ্ঞানের অধিকারী, সুষ্ঠুভাবে কাজ সম্পাদনকারী” (সিহাহু’ল লুগাত, ২খ, পৃ. ২৭৬)।
আরবী ভাষার প্রামাণ্য অভিধান লিসানুল ‘আরাব-এ বলা হইয়াছে:
وَالْحِكْمَةُ عِبَارَةٌ عَنْ مَعْرِفَةِ أَفْضَلِ الْإِشْيَاءِ بِأَفْضَلِ الْعُلُومِ. “উত্তম বস্তুকে উত্তম জ্ঞানের দ্বারা অনুধাবন করার নাম হইল হিকমত” (ইব্ন মানজুর, লিসানু’ল ‘আরাব, বি, ১৫খ., পৃ. ৩)।
রাগিব ইসফাহানী বলেন:
وَالْحِكْمُةُ اصَابَةُ الْحَقِّ بِالْعِلْمِ وَالْعَقْلِ فَالْحِكْمَةُ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى مَعْرِفَةُ الْأَشْيَاءِ وَايْجَادُهَا عَلَى غَايَةِ الْأَحْكَامِ مِنَ الْإِنْفَاقِ مَعْرِفَةُ الْمَوْجُودَاتِ وَفِعْلُ الْخَيْرَاتِ. “হিকমত হইতেছে জ্ঞান ও বুদ্ধি দ্বারা সত্য ও সঠিক কথা অবহিত হওয়া। আল্লাহ্র ক্ষেত্রে হিকমত হইতেছে বস্তুসমূহের জ্ঞান এবং এইগুলিকে চূড়ান্ত সুকৌশলে উদ্ভাবন করা। মানবজাতির পক্ষে হিকমত হইতেছে বিদ্যমান জিনিসসমূহকে জানা এবং উত্তম কার্যাবলী সম্পাদন করা” (মুফরাদাতুল কুরআন, মিসর, পৃ. ১২৬)।
হিকমতের ব্যাখ্যা প্রদানে ইব্ন হিব্বান আন্দালুসী তাঁহার নিম্নোক্ত সংজ্ঞায় অভিধানবেত্তাদের অধিকাংশ অভিমতকে প্রায় একত্র করিয়াছেন। তিনি বলেন:
قَالَ مَالِكٌ وَأَبُو رَزِينِ الْحِكْمَةُ الْفِقْهُ فِي الدِّينِ وَالْفَهْمُ الَّذِي هُوَ سَجَلَةً وَنُورٌ مِّنَ اللَّهِ تعالى. “মালিক ও আবূ রাযীন বলেন, হিকমত হইতেছে দীন সম্পর্কিত প্রজ্ঞা ও অনুধাবন শক্তি যাহা সহজাত। ইহা একটি নূরও বটে যাহা আল্লাহর পক্ষ হইতে লাভ হয়”।
মুজাহিদ বলেন, হিকমত হইতেছে কুরআন উপলব্ধি করা। মুকাতিল বলেন: الْحِكْمَةُ الْعِلْمُ وَالْعَمَدُ بِهِ لَا يَكُونُ لِلرَّجُلِ حَكِيمًا حَتَّى يَجْمَعَمُهَا . “হিকমত হইতেছে ‘ইল্ল্ম ও সেই মুতাবিক আমল করা। কোন লোককে ততক্ষণ হাকীম বলা যাইবে না যতক্ষণ তাহার মধ্যে ইল্ম ও আমলের সমন্বয় সাধিত না হয়।”
কেহ কেহ বলিয়াছেন, হিকমত হইল যাহা রাসূলের মাধ্যম ব্যতীত জানা যায় না। আবু জা’ফার মুহাম্মাদ ইব্ন ইয়া’কূব বলেন, যেই সঠিক কথা সঠিক ‘আমল পয়দা করে তাহাকে হিকমত বলা হয়। ইব্ন জারীর তাবারী বলেন:
وَالصَّوابُ مِنَ الْقَوْلِ عِنْدَنَا فِي الْحِكْمَةِ أَنَّهَا الْعِلْمُ بِأَحْكَامِ اللَّهِ الَّتِي لَا يُدْرَكُ عِلْمُهَا الا بِبَيَانِ الرَّسُولِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْمَعْرِفَةُ بِهَا مَا دَلَّ عَلَيْهِ ذَلِكَ مِنْ نَظَائِرِهِ وَهُوَ عِنْدِي مَأْخُوذُ مِنْ الْحُكْمِ الَّذِي بِمَعْنَى الْفَصْلِ بَيْنَ الْحَقِّ وَالْبَاطِلِ) .
"হিকমতের সংজ্ঞা সম্পর্কে আমাদের নিকট সঠিক কথা হইতেছে এই যে, ইহা হইল আল্লাহ্ সেই সকল বিধানাবলীর জ্ঞান যাহা কেবল রাসূলুল্লাহ (স)-এর বর্ণনা দ্বারা জানা যায়। আর যেই সকল উদাহরণ তাঁহার মধ্যে পাওয়া যায় যাহা তিনি গ্রহণ করিয়াছেন অথবা উপস্থাপন করিয়াছেন সেই সম্পর্কে পরিচিত হওয়া। আমার মতে ইহা حکم শব্দ হইতে নির্গত, যাহার অর্থ হইল সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা"।
অভিধানবেত্তা ও তাফসীরবিদদের এই সকল অভিমত একই অর্থের বিভিন্ন অভিব্যক্তি মাত্র। সারকথা এই যে, হিকমত হইল বিবেক-বুদ্ধি ও অনুভূতির পূর্ণ বৈশিষ্ট্যের নাম যাহার দ্বারা শুদ্ধ-অশুদ্ধ, ভুল-নির্ভুল, সত্য-মিথ্যা, হক-বাতিল ও মঙ্গল-অমঙ্গলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা যায়। ইহার জন্য চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা, দলীল, অভিজ্ঞতা ও তত্ত্ব অনুসন্ধানের প্রয়োজন হয় না, বরং স্বভাবতই ইহার স্বরূপ উদঘাটিত হইয়া যায়। সেই অনুসারে হিকমতধারী ব্যক্তির 'কাজ'ও হইয়া থাকে। অন্য কথায়, কোন কোন মানুষের মধ্যে বস্তুরাজির সত্য-মিথ্যা, কার্যাবলীর ভাল-মন্দের সঠিক অনুভূতি এবং সঠিক মানসিকতা পাওয়া যায়। তাঁহারা ঐ সকল কাজের সূক্ষ্ম হইতে সূক্ষ্মতর অবস্থা ও সমাধান সম্পর্কে আল্লাহ প্রদত্ত প্রজ্ঞা ও মননশীলতার দ্বারা এমন সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারেন, যাহা অন্যান্য লোক দীর্ঘ পর্যালোচনা এবং গবেষণার পরও দিতে সক্ষম হয় না। ইহাই হইল সেই মা'রিফাত বা আল্লাহপ্রদত্ত নূর যাহা চেষ্টা ও সাধনায় অর্জিত হয় না। ইহাই হইল 'হিকমত'।
আল্লাহপ্রদত্ত অন্য সকল যোগ্যতা ও প্রকৃতিগত দানের মত হিকমতের দানও সকল মানুষ সমভাবে প্রাপ্ত হয় না। ইহা বিভিন্ন পর্যায় ও মাত্রায় মানুষ লাভ করিয়া থাকে। কিন্তু ইহার উচ্চতর ও পরিপূর্ণ মাত্রা নবীগণ লাভ করিয়া থাকেন। যেইভাবে আল্লাহ প্রদত্ত অনুভূতি, ধর্মীয় বুদ্ধি ও জ্যোতির্ময় শক্তির প্রতি হিকমতের প্রয়োগ হয়, অনুরূপভাবে এই শক্তির নিদর্শনাবলী, ফলাফল এবং ইহার শিক্ষার প্রতিও হিকমতের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। উল্লিখিত (১৩ : ১২) আয়াতে লুকমান ('আ)-কে হিকমত প্রদানের কথা বলা হইয়াছে। লুকমান ('আ)-কে যেই হিকমত প্রদান করা হইয়াছে তাহার বিবরণ হইল : আল্লাহ্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, শিরক হইতে বারণ করা, মাতাপিতার সেবা করা, ভাল লোকের অনুসরণ করা, সর্বত্র আল্লাহ্র 'ইল্ম, সালাতের আদেশ দান, ধৈর্য ধারণ, অহংকার না করা, মধ্যম পন্থা অবলম্বন, নীচু স্বরে কথা বলা ইত্যাদি। অনুরূপ হিকমতে মুহাম্মাদীর নিম্নলিখিত শিক্ষার বিশদ বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। শিরক হইতে নিষেধ, মাতা-পিতার প্রতি সদয় ব্যবহার, প্রতিবেশী ও দুঃস্থদের সহিত সদাচরণ, অপচয় হইতে নিষেধ, বিনয়ের সহিত কথা বলা ইত্যাদি বিষয়াদির উল্লেখ করিয়া আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন:
ذُلِكَ مِمَّا أَوْحَى إِلَيْكَ رَبُّكَ مِنَ الْحِكْمَةِ (الاسراء - ٣٩) .
"তোমার প্রতিপালক ওহীর দ্বারা তোমাকে যে হিকমত দান করিয়াছেন এইগুলি তাহার অন্তর্ভুক্ত” (১৭: ৩৯)
বস্তুত হিকমত এমন সকল কথা ও বার্তা যাহার বিশ্বজনীন সত্যতাকে স্বয়ং মানব স্বভাব ও নৈতিক অনুভূতি গ্রহণ করিয়া লয়। মোটকথা, হিকমতের এই শক্তি নবীগণ পরিপূর্ণভাবে অর্জন করিয়াছেন। ইহার ফলে তাঁহাদের প্রতিটি কথা প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং প্রতিটি কাজ বিচক্ষণতায় পরিপূর্ণ ছিল। হিকমতের লক্ষণাদি তাঁহাদের কথা ও কাজে বিকশিত হইয়া উঠিয়াছিল (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ৮৭)।