📄 মানবিক জ্ঞানের উৎস
মানবিক জ্ঞানের উৎস
মানুষের জ্ঞান দুই প্রকার: (১) যাহা বিনা মাধ্যমে অর্জিত হয় এবং (২) যাহা কাহারও মাধ্যমে অর্জিত হয়। মাধ্যমবিহীন জ্ঞান আবার তিন প্রকার, যথাঃ
১। অনুভূতি (وجدان) : মানুষের দৈহিক অস্তিত্ব এবং সেই অস্তিত্বের আভ্যন্তরীণ অনুভূতির জ্ঞান। প্রতিটি মানুষ নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত থাকে। তাহার ক্ষুধা-তৃষ্ণা, সুস্থতা- অসুস্থতা, আনন্দ, নিরানন্দ, ভয়-ভীতি ইত্যাদি সে বিনা মাধ্যমে অনুভব করিতে পারে।
২। স্বভাব (فطرة) : সকল প্রকার সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর পক্ষ হইতে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেওয়া থাকে যাহা অন্য প্রকার সৃষ্টির মধ্যে পাওয়া যায় না। এই শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্যের জ্ঞান সংশ্লিষ্ট মাখলুকের কোন মাধ্যম ছাড়াই আর্জিত হইয়া থাকে। ইহাকে কেহ কেহ স্বভাবজাত আর কেহ ইলহামী জ্ঞান বলিয়া থাকেন। দার্শনিকগণ ইহাকে সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য বলিয়া অভিহিত করেন। প্রাণীজগৎ নিজেদের সম্পর্কে অনেক জিনিস স্বভাবগতভাবে অবগত হইয়া থাকে। পক্ষীকুলের ছানাদেরকে খাদ্য গ্রহণ এবং উড্ডয়ন কে শিক্ষা দেয়? কে জলজ প্রাণীদেরকে সাঁতার শিখায়? বাঘের বাচ্চাকে হিংস্রতা কে শিক্ষা দেয়, মানব সন্তানকে জন্মলগ্নেই কান্নাকাটি, নিদ্রা এবং দুধপান করা কে শিখায়?
৩। প্রাথমিক জ্ঞান (بدیهیات اولیه): মানুষের মধ্যে কিছু অনুভূতি ও প্রভেদ-জ্ঞান আসার পর এমন কিছু কথা আপনা আপনি কিংবা সামান্য চিন্তার দ্বারা এমনভাবে জানা হইয়া যায় যে, ইহাতে কোন প্রকার সন্দেহের উদ্রেক হয় না। দুই দুই মিলিয়া চার হয়, একই সঙ্গে কোন জিনিস সাদা ও কাল উভয়টি হয় না। প্রত্যেক নির্মিত জিনিসের কোন একজন নির্মাতা আছে। এইরূপ অনেক জিনিস মানুষ সহজেই বুঝিয়া লইতে সক্ষম হয়।
কোন মাধ্যমে মানুষ যেই জ্ঞান লাভ করে তাহা দুই প্রকার। একটি হইল অনুভূতি আর অপরটি হইল বুদ্ধিমত্তা। অনুভূতি দ্বারা মানুষ চারিপাশের উপাদানগুলি বুঝিয়া লয়, আর বুদ্ধিমত্তা দ্বারা সেই বস্তুসমূহ সে অনুধাবন করিয়া লয় যাহা তাহার সম্মুখে বিদ্যমান নয় কিংবা গোড়া হইতেই তাহা দৃশ্যমান নয় বা মানুষের কেবল মন-মস্তিষ্কে আছে।
মানবদেহে পাঁচ প্রকার শারীরিক শক্তি রহিয়াছে। তাহা হইল : (১) দৃষ্টিশক্তি, (২) শ্রবণশক্তি, (৩) গন্ধ অনুভব করিবার শক্তি, (৪) স্বাদ গ্রহণ করিবার শক্তি এবং (৫) স্পর্শশক্তি। ইহাকে পঞ্চ ইন্দ্রিয় বলা হয়। ইহার দ্বারা মানুষ বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে জ্ঞাত হয়। ইহার নামই ইন্দ্রিয়ানুভূতি। আমরা চিবাইয়া স্বাদ গ্রহণ করি, শুনিয়া কাজের পরিচয় পাই, দেখিয়া আকৃতি সম্পর্কে অবহিত হই, স্পর্শ করিয়া শক্তি ও নরম সম্পর্কে জানি, শুঁকিয়া গন্ধ বুঝি। এই সকল ইন্দ্রিয় দ্বারা যে জ্ঞান অর্জিত হয় তাহা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্ভুল হয়, তবে ক্ষেত্রবিশেষ ভুল-ভ্রান্তিও পরিলক্ষিত হয়। যেমন কারণ নির্ণয়ে এইগুলি কোন কোন সময় ধোঁকাগ্রস্ত হয় বা অনেক সময় তাহার বিভিন্ন গতি-প্রকৃতি অসুস্থতা ইত্যাদির ফলে বিগড়াইয়া যায়।
মাধ্যম ভিত্তিক দ্বিতীয় প্রকার জ্ঞান যাহাকে আমরা বুদ্ধিমত্তা বলিয়া সংজ্ঞায়িত করি। ইহাকে আমরা বুদ্ধি, অনুমান, চিন্তা-ভাবনা ও দলীল-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে লাভ করিয়া থাকি। ইহার ভিত্তি মূলত সেই সকল উপলব্ধির উপর হইয়া থাকে যেইগুলির জ্ঞান আমাদের অনুভূতি, সহজাত ইলহাম (স্বভাব), প্রাথমিক জ্ঞান ও অনুভূতির পূর্বে অভিজ্ঞতা থাকে। এই সকল অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উদাহরণ ও প্রমাণ সাপেক্ষে সাদৃশ্যমূলক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অজ্ঞাত বস্তুগুলি সম্পর্কেও আমরা জ্ঞাত হইয়া যাই। এমনকি জানা বস্তুর বৈশিষ্ট্য ও চিহ্নাদি অবলম্বন করিয়া অজানা বস্তুর আকৃতি সম্পর্কে কল্পনা করিতে পারি। চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা ও অনুসন্ধান ও পর্যায় বিন্যাসের ক্ষেত্রে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। ইহা দ্বারা লব্ধ জ্ঞান সন্দেহাতীত নয়।
📄 গায়বের সংজ্ঞা
গায়ব শব্দটি ক্রিয়াবিশেষ্য )مصدر(। কোন জিনিস লোকচক্ষুর আড়ালে হইলে ইহাকে 'গায়ব' বলা হয়। যেমন غَابَتِ الشَّمْسُ 'সূর্য চক্ষুর আড়ালে চলিয়া গিয়াছে'। কেহ কোথায়ও অনুপস্থিত থাকিলে সে অদৃশ্য থাকে বলিয়াই বলা হয়। যেমন غَابَ সে গায়ব হইয়া গিয়াছে। আল-কুরআনে বলা হইয়াছে : كَانَ مِنَ الْغَائِبِيْنَ "কিংবা সে অনুপস্থিত নাকি” (২৭: ২০)? মূলত গায়ব হইল মানুষের ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানের আওতার বাহিরের জগত। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا مِنْ غَائِبَةٍ فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ (النمل - ٧٥).
"আকাশে ও পৃথিবীতে এমন কোন গোপন রহস্য নাই যাহা সুস্পষ্ট কিতাবে নাই" (২৭: ৭৫)।
তাই বলা হয়, কোন কিছু 'গায়ব হইবার বিষয়টি' কেবল মানুষের ক্ষেত্রেই হইয়া থাকে, আল্লাহ্র নিকট কোন কিছুই গায়ব বা অদৃশ্য নয়। কোন কিছুই তাঁহার অগোচরে থাকিতে পারে না। ইরশাদ হইয়াছে: غَالَمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَة "তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা" (৫৯: ২২; রাগিব আল-ইসফাহানী, আল-মুফরাদাত, ৩৬৬)।
📄 গায়ব সম্পর্কে নবী-রাসূলগণের ইল্ম
গায়ব সম্পর্কে নবী-রাসূলগণের 'ইল্ম
ইসলামী আকীদামতে গায়বের ইল্ম আল্লাহ ব্যতীত আর কাহারও নাই। আল-কুরআনে বহুবার রাসূলুল্লাহ (স)-কে ইহার ঘোষণাদানের জন্য বলা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
فَقُلْ إِنَّمَا الْغَيْبُ الله (يونس - ٢٠). "বল, অদৃশ্যের জ্ঞান তো কেবল আল্লাহ্রই আছে” (১০-২০)।
قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلا الله (النمل - ٦٥). "বল, আল্লাহ ব্যতীত আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে কেহই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না" (২৭: ৬৫)।
قُلْ لَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ (الانعام - ٥٠).
"বল, আমি তোমাদিগকে ইহা বলি না যে, আমার নিকট আল্লাহর ধনভাণ্ডার আছে, অদৃশ্য সম্পর্কেও আমি অবগত নহি" (৬:৫০)।
কিন্তু অপর দুইটি স্থানে বলা হইয়াছে যে, ইহা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলা তাঁহার মনোনীত নবীগণকে গায়ব সম্পর্কে অবহিত করেন। ইরশাদ হইয়াছেঃ
فَلا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَداً . إِلا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَّسُولٍ (الجن - ٢٦ ) .
"তিনি তাঁহার অদৃশ্যের জ্ঞান কাহারও নিকট প্রকাশ করেন না তাঁহার মনোনীত রাসূল ব্যতীত” (২: ২৬-২৭)।
وَمَا كَانَ اللهُ لِيُطْلِعَكُمْ عَلَى الْغَيْبِ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَجْتَبِي مِنْ رُّسُلِهِ مَنْ يَشَاءُ (ال عمران - ১৭৯))
"অদৃশ্য সম্পর্কে তোমাদিগকে আল্লাহ অবহিত করিবার নহেন; তবে আল্লাহ তাঁহার রাসূলগণের মধ্য যাহাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন” (৩ঃ ১৭৯)।
উক্ত দুই আয়াত হইতে বুঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় মনোনীত নবীদেরকে গায়ব সম্পর্কে অবহিত করেন। ইহা হইতে প্রতিভাত হয় যে, যেই সকল আয়াতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কেহ গায়ব জানেন না বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে ইহার অর্থ হইল সত্তাগত ও প্রকৃত অর্থে গায়ব জানা। অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেহ সত্তাগতভাবে গায়েব জানিতে পারেন না। তবে আল্লাহ্র সাহায্যে ও তাঁহার জ্ঞান দেওয়ায় এবং অবহিত করায় নবীগণেরও এই জ্ঞান অর্জিত হইতে পারে। আয়াতুল কুরসীতে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلا بِمَا شَاءَ (البقرة - ٢٥٥)
"যাহা তিনি ইচ্ছা করেন তদ্ব্যতীত তাঁহার জ্ঞানের কিছুই তাহারা আয়ত্ত করিতে পারে না" (২: ২৫৫)।
অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গায়বী 'ইলমসমূহ হইতে যতটুকু ইচ্ছা করেন এবং কল্যাণকর মনে করেন ততটুকু তাঁহাদেরকে ওহীর মাধ্যমে অবহিত করান। এতদসত্ত্বেও কিয়ামতের নির্দিষ্ট তারিখ, বৃষ্টিপাত, মৃত্যু, মাতৃগর্ভের সন্তান কী হইবে, আগামী কল্য কী হইবে ইত্যাদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেহ জানেন না।
অনুরূপ কিছু কিছু আয়াতে আল্লাহ তা'আলা আমাদের নবী (স)-কে সম্বোধন করিয়া বলিয়াছেন, "ইহা সম্পর্কে তোমার জ্ঞান ছিল না।" যেমন তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করিবার জন্য কিছু লোক রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট মিথ্যা শপথ করিয়া তাহাদের অক্ষমতার অজুহাত পেশ করার পর তিনি তাহাদিগকে যুদ্ধে না যাওয়ার অনুমতি দেন। এই ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন:
عَفَا اللَّهُ عَنْكَ لِمَ أَذِنْتَ لَهُمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَتَعْلَمَ الْكَاذِبِينَ (التوبة - ٤٣ ) .
"আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করিয়াছেন, কাহারা সত্যবাদী তাহা তোমার নিকট স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত এবং কাহারা মিথ্যাবাদী তাহা না জানা পর্যন্ত তুমি কেন উহাদিগকে অব্যাহতি দিলে" (৯:৪৩)?
📄 গায়েবের স্বরূপ
গায়বের স্বরূপ
আল-কুরআনের পরিভাষায় 'গায়ব' বলিতে কি বুঝানো হইয়াছে তাহা জানা আবশ্যক। আল-কুরআনে যত স্থান 'গায়ব' শব্দের প্রয়োগ হইয়াছে সেই দিকে দৃষ্টিপাত করিলে ইহার সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত অর্থ পরিষ্কার হইয়া উঠে। সংক্ষিপ্ত অর্থে 'গায়ব' বলিতে ঐ সকল কাজ-কর্মকে বুঝায় যেইগুলির জ্ঞান মানুষ সহজাতভাবে এবং বিভিন্ন উপকরণের মাধ্যমে অর্জন করিতে পারে না। মানুষের জ্ঞানের স্বভাবগত তিনটি মাধ্যম আবেগ, অনুভূতি ও বুদ্ধি দ্বারা যেই জ্ঞান লাভ করা যায় না তাহাকে 'ইলমে গায়ব বলা হয়। আরও পরিষ্কার ভাষায় বলা যায়, যেই জিনিসের জ্ঞান মানুষ তাহার বাহ্যিক ও অন্তরলোকগত অনুভূতি এবং মস্তিষ্কপ্রসূত শক্তি দ্বারা আঁচ করিতে পারে না তাহাকে 'ইলমে গায়ব বলা হয়। ইহার বিপরীত কাজ হইল শাহাদাত (شهادت) অর্থাৎ যাহা সকল মানুষের অনুভূতি ও মেধার সামনে প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে। এই কারণেই আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেনঃ عَالَهُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَة "তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা" (৫৯: ২২)।
لَقَدِ ابْتَغُوا الْفِتْنَةَ مِنْ قَبْلُ وَقَلَّبُوا لَكَ الْأُمُورَ حَتَّى جَاءَ الْحَقُّ وَظَهَرَ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كرهُونَ (التوبة - ٤٨ ) .
"পূর্বেও উহারা ফিতনা সৃষ্টি করিতে চাহিয়াছিল এবং উহারা তোমার বহু কর্মে উলট-পালট করিয়াছিল যতক্ষণ না উহাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সত্য আসিল এবং আল্লাহ্র আদেশ বিজয়ী হইল" (৯:৪৮)।
এই আয়াতের কিছু পরেই ইরশাদ হইয়াছে:
مَرَدُوا عَلَى النِّفَاقِ لَا تَعْلَمُهُمْ نَحْنُ نَعْلَمُهُمْ (التوبة - ١٠١).
"উহারা কপটতায় সিদ্ধ। তুমি উহাদিগকে জান না; আমি উহাদিগকে জানি" (৯:১০১)।
এই আয়াতগুলির দ্বারা বুঝা যাইতেছে যে, নবী-রাসূলগণ গায়বের পূর্ণ জ্ঞান রাখেন না, বরং তাঁহাদেরকে ইহা অবহিত করা হয়। অবহিত করা সম্পর্কিত দুইটি আয়াতেই রাসূল শব্দটি আসায় এইদিকে ইঙ্গিত হইতেছে যে, গায়বের যেই বিষয়াবলী তাঁহাদেরকে অবহিত করানো হয় ঐগুলির সম্পর্ক হইল রিসালাতের দায়িত্ব, ইহার কল্যাণ ও শরীআ'তের বিধান সম্পর্কিত বিষয়ের সহিত (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ৪৭)।
বিস্তারিতভাবে আল-কুরআনে গায়ব শব্দের ব্যবহার চারটি ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়। (এক) অতীত কালের ঘটনাবলী যাহার 'ইল্ম না অনুভূতি দ্বারা অর্জিত হয়, না চিন্তা-ভাবনা ও বুদ্ধিমত্তার দ্বারা হাসিল হয়। কোন কোন ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হওয়া গেলেও তাহা কেবল বর্ণনা ও লিখনী নির্ভর হইয়া থাকে। কিন্তু যেই ব্যাপারে বর্ণনা ও লিখনীর কোন সন্ধান পাওয়া যায় না তাহা কেবল গায়বী মাধ্যমেই হাসিল হইতে পারে। নূহ্ (আ)-এর সংক্ষিপ্ত ঘটনা বিবৃত করিবার পর মহান আল্লাহ ইরশাদ করিয়াছেন:
تِلْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهَا إِلَيْكَ مَا كُنْتَ تَعْلَمُهَا أَنْتَ وَلَا قَوْمُكَ مِنْ قَبْلِ هذا (هود ٤٩ ) .
"এই সমস্ত অদৃশ্যলোকের সংবাদ আমি তোমাকে ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি, যাহা ইহার পূর্বে তুমি জানিতে না এবং তোমার সম্প্রদায়ও জানিত না" (১১:৪৯)।
মারয়াম (আ)-এর ঘটনা সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
تِلْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ... إِذْ يَخْتَصِمُونَ (ال عمران - ٤٤)
"ইহা অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ যাহা আমি তোমাকে ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি। মারয়ামের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাহাদের মধ্যে কে গ্রহণ করিবে ইহার জন্য যখন তাহারা তাহাদের কলমগুলি নিক্ষেপ করিতেছিল তুমি তখন তাহাদের নিকট ছিলে না এবং যখন তাহারা বাদানুবাদ করিতেছিল তখনও তুমি তাহাদের নিকট ছিলে না" (৩:৪৪)।
লক্ষণীয় যে, ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর জ্ঞান লাভের সহজাত পন্থা হইতেছে সেই সময় উপস্থিত থাকিয়া স্বচক্ষে তাহা দেখা এবং শ্রবণ করা। এই দুইটি পন্থা রাসূলুল্লাহ (স)-এর ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। কেননা তিনি তথায় উপস্থিতও ছিলেন না, শ্রবণও করেন নাই। অন্য কোন মানুষের মাধ্যমে শুনিবার কথাও আগেই অস্বীকার করা হইয়াছে। সুতরাং গায়বের এই 'ইল্ম রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রদান করা হইয়াছিল ওহীর মাধ্যমে। ইউসুফ (আ)-এর পূর্ণ ঘটনার বিবরণের পর ইরশাদ হইয়াছে।
ذلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ أَجْمَعُوا أَمْرَهُمْ وَهُمْ يَمْكُرُونَ (يوسف - ১০২). "ইহা অদৃশ্যলোকের সংবাদ যাহা তোমাকে আমি ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি। ষড়যন্ত্রকালে যখন উহারা মতৈক্যে পৌঁছাইয়াছিল তখন তুমি উহাদের নিকট ছিলে না” (১২: ১০২)।
এই তিনটি আয়াত দ্বারা অনুমেয় যে, অতীতের ঘটনাবলীকে অস্বাভাবিক পন্থায় অবগত হওয়াকে ইলমে গায়ব বলিয়া আখ্যায়িত করা হইয়াছে।
(দুই) অনুরূপভাবে ভবিষ্যতে সংঘটিত হইবে এইরূপ ঘটনাবলীকেও গায়ব বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। যেই বিষয়াবলীর জ্ঞান প্রমাণ ও সাদৃশ্যমূলক যুক্তির (কিয়াসের) স্বাভাবিক মাধ্যম ব্যতিরেকে অস্বাভাবিক পন্থায় হইয়া থাকে তাহাকেও 'ইলমে গায়বের শ্রেণীভুক্ত করা হইয়াছে। আল-কুরআনের একটি স্থানে মু'জিযা প্রত্যাশী কাফিরদের উদ্দেশে ইরশাদ হইয়াছেঃ
فَقُلْ إِنَّمَا الْغَيْبُ لِلَّهِ فَانْتَظِرُوا إِنِّي مَعَكُمْ مِنَ الْمُنْتَظِرِينَ (يونس - ২০)
"বল, অদৃশ্যের জ্ঞান তো কেবল আল্লাহ্ই আছে। সুতরাং তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদের সহিত প্রতীক্ষা করিতেছি” (১০: ২০)।
ভবিষ্যত কালে সংঘটিত হইবার এমন ঘটনাবলীকেও গায়ب বলা হইয়াছে। অনুরূপ কিয়ামত কালকেও একাধিকবার গায়ب বলা হইয়াছে। কেবল আল্লাহই এই সম্পর্কে অবহিত আছেন বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ (لقمان - ٣٤)
"কিয়ামতের জ্ঞান কেবল আল্লাহ্র নিকট রহিয়াছে” (৩১: ৩৪)।
يَسْتَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّي (الاعراف - ১৮৭)
"তাহারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে কিয়ামত কখন ঘটিবে। বল, এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আমার প্রতিপালকেরই আছে” (৭ঃ ১৮৭)।
এইভাবে ভবিষ্যত কালের অন্যান্য ঘটনাপঞ্জীর জ্ঞানও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় বলা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضِ تَمُوتُ (لقمان - ٣٤
"কেহ জানে না আগামী কল্য সে কি অর্জন করিবে এবং কেহ জানে না কোন স্থানে তাহার মৃত্যু ঘটিবে" (৩১: ৩৪)।
(তিন) এমন বস্তুকেও গায়ب বলা হইয়াছে যাহা বর্তমানে বিদ্যমান রহিয়াছে, তাহা সত্ত্বেও মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধিমত্তার সীমিত শক্তি দ্বারা এই সম্পর্কে অবগত হওয়া যায় না। আমাদেরকে দর্শন ও শ্রবণশক্তি দেওয়া হইয়াছে, কিন্তু ইহার জন্য দূরত্ব, পর্দার অন্তরাল ইত্যাদি কতিপয় অন্তরায় না থাকার শর্ত আরোপ করা হইয়াছে। এই সকল অন্তরায় দূর না হইলে আমাদের দর্শন ও শ্রবণশক্তি অকার্যকর হইয়া পড়ে। ঢাকাতে বসিয়া সিলেটের দৃশ্য স্বচক্ষে দেখা যায় না। যন্ত্রাদির সাহায্য ব্যতীত এই স্থান হইতে সেই স্থানের কথা শোনা যায় না। এই কারণে বর্তমান কালে মাধ্যমবিহীন যেই জ্ঞান লাভ করা যায় তাহাও 'ইলমে গায়ب হইবে। গর্ভবতী মহিলা সামনে আছে কিন্তু তাহার পেটে স্থিত সন্তান যেই আবরণের অভ্যন্তরে আছে তাহা সম্পর্কে মাধ্যম ব্যতীত কেহ জানে না। ইরশাদ হইয়াছে : وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ ( لقمان-৩৪) "এবং তিনি জানেন যাহা জরায়ুতে আছে" (৩১: ৩৪)। আকাশ ও ভূমণ্ডলে এই মুহূর্তে যাহা কিছু আছে তাহা বর্তমান কালের অন্তর্ভুক্ত। ইহা সকলের সম্মুখে সমুপস্থিত। তবুও তাহা আমাদের অনুভূতি এবং সীমিত বুদ্ধির বাহিরে। তবে ইহা আমাদের দেখার, শোনার এবং জানার জন্য মহান আল্লাহ যেই সকল প্রাকৃতিক শর্তাবলী আরোপ করিয়াছেন কেহ তাহা পূর্ণ করিলে ইহা সম্পর্কে অবহিত হইতে পারে। ইরশাদ হইয়াছে : وَلِلَّهِ غَيْبُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ "আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহ্রই" (১১: ১২৩)। "নিশ্চয় আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবগত আছেন" (৪৯: ১৮)।
(চার) অদৃশ্য জগতের সর্বশেষ বিষয় হইল যাহা বস্তু না হইবার কারণে আমাদের অনুভূতি ও বুদ্ধির সীমার অনেক ঊর্ধ্বে। আমরা ফেরেশতাগণকে দেখার, পৃথিবীতে আল্লাহকে প্রত্যক্ষ করার যোগ্যতা রাখি না। জান্নাত ও জাহান্নামকে আমরা এখান হইতে দেখি না। এই সকল জিনিসও হইল গায়ب। ইরশাদ হইয়াছে: الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَيْبِ (الانبياء - ٤٩) .
"যাহারা না দেখিয়াও তাহাদের প্রতিপালককে ভয় করে” (২১:৪৯)। الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ (البقرة -٣) “যাহারা অদৃশ্যে ঈমান আনে” (২:৩)। جَنَّتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدَ الرَّحْمَنُ عِبَادَهُ بِالْغَيْبِ (مريم - ٦١) . "এই স্থায়ী জান্নাত, যে অদৃশ্য বিষয়ের প্রতিশ্রুতি দয়াময় তাঁহার বান্দাদিগকে দিয়াছেন" (১৯:৬১)।
নবী-রাসূলকে আল্লাহ তা'আলা যেই সকল গায়েবের বিষয় অবহিত করেন তাহা উপরে উল্লিখিত চার প্রকার অদৃশ্য জগতের সহিত সম্পৃক্ত।
অতীতের কোন কোন সম্প্রদায় এবং নবীগণের উপদেশ ও দৃষ্টান্তমূলক ঘটনাবলী মহান আল্লাহ বর্ণনা বা লিখনী ছাড়াও ওহীর মাধ্যমে অনেক সময় তাঁহাদেরকে অবহিত করেন। যেমন আল-কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ পূর্বেই করা হইয়াছে। অনুরূপভাবে ভবিষ্যতে ঘটিতব্য বিশ্বের নানা রকম ফিতনা, উম্মতে মুহাম্মদীর বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড, কিয়ামতের আলামত ও ইহার পরের ঘটনাবলীর জ্ঞান রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেওয়া হইয়াছিল। ইহা ছাড়াও রাসূলুল্লাহ (স) ওহীর ভিত্তিতে বিভিন্ন অবস্থা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী, কিয়ামতের অবস্থার বর্ণনা, হাশরের মাঠের দৃশ্যাবলী সম্পর্কে বিবরণ প্রদান করিয়াছেন, যাহা আল-কুরআন ও সহীহ হাদীছসমূহে উল্লেখ করা হইয়াছে (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ৪৮)।