📄 গায়ব বা অদৃশ্যের জ্ঞান
গায়ব বা অদৃশ্যের জ্ঞান
নবুওয়াতের দ্বিতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হইল গায়ব বা অদৃশ্যের জ্ঞান। ইহা সেই জ্ঞান যাহা সাধারণ মানুষের ইচ্ছা, অনুভূতি, বুদ্ধি ও বিবেকের সাহায্য ব্যতিরেকে সরাসরি কিংবা স্বপ্নে অথবা ফেরেশতাগণের মাধ্যমে আল্লাহ্ পক্ষ হইতে অর্জিত হয়। ইহা হইতেই নবুওয়াতের যাত্রা শুরু হয়।
মানবিক জ্ঞানের উৎস
মানুষের জ্ঞান দুই প্রকার: (১) যাহা বিনা মাধ্যমে অর্জিত হয় এবং (২) যাহা কাহারও মাধ্যমে অর্জিত হয়। মাধ্যমবিহীন জ্ঞান আবার তিন প্রকার, যথাঃ
১। অনুভূতি (وجدان) : মানুষের দৈহিক অস্তিত্ব এবং সেই অস্তিত্বের আভ্যন্তরীণ অনুভূতির জ্ঞান। প্রতিটি মানুষ নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত থাকে। তাহার ক্ষুধা-তৃষ্ণা, সুস্থতা- অসুস্থতা, আনন্দ, নিরানন্দ, ভয়-ভীতি ইত্যাদি সে বিনা মাধ্যমে অনুভব করিতে পারে।
২। স্বভাব (فطرة) : সকল প্রকার সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর পক্ষ হইতে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেওয়া থাকে যাহা অন্য প্রকার সৃষ্টির মধ্যে পাওয়া যায় না। এই শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্যের জ্ঞান সংশ্লিষ্ট মাখলুকের কোন মাধ্যম ছাড়াই আর্জিত হইয়া থাকে। ইহাকে কেহ কেহ স্বভাবজাত আর কেহ ইলহামী জ্ঞান বলিয়া থাকেন। দার্শনিকগণ ইহাকে সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য বলিয়া অভিহিত করেন। প্রাণীজগৎ নিজেদের সম্পর্কে অনেক জিনিস স্বভাবগতভাবে অবগত হইয়া থাকে। পক্ষীকুলের ছানাদেরকে খাদ্য গ্রহণ এবং উড্ডয়ন কে শিক্ষা দেয়? কে জলজ প্রাণীদেরকে সাঁতার শিখায়? বাঘের বাচ্চাকে হিংস্রতা কে শিক্ষা দেয়, মানব সন্তানকে জন্মলগ্নেই কান্নাকাটি, নিদ্রা এবং দুধপান করা কে শিখায়?
৩। প্রাথমিক জ্ঞান (بدیهیات اولیه): মানুষের মধ্যে কিছু অনুভূতি ও প্রভেদ-জ্ঞান আসার পর এমন কিছু কথা আপনা আপনি কিংবা সামান্য চিন্তার দ্বারা এমনভাবে জানা হইয়া যায় যে, ইহাতে কোন প্রকার সন্দেহের উদ্রেক হয় না। দুই দুই মিলিয়া চার হয়, একই সঙ্গে কোন জিনিস সাদা ও কাল উভয়টি হয় না। প্রত্যেক নির্মিত জিনিসের কোন একজন নির্মাতা আছে। এইরূপ অনেক জিনিস মানুষ সহজেই বুঝিয়া লইতে সক্ষম হয়।
কোন মাধ্যমে মানুষ যেই জ্ঞান লাভ করে তাহা দুই প্রকার। একটি হইল অনুভূতি আর অপরটি হইল বুদ্ধিমত্তা। অনুভূতি দ্বারা মানুষ চারিপাশের উপাদানগুলি বুঝিয়া লয়, আর বুদ্ধিমত্তা দ্বারা সেই বস্তুসমূহ সে অনুধাবন করিয়া লয় যাহা তাহার সম্মুখে বিদ্যমান নয় কিংবা গোড়া হইতেই তাহা দৃশ্যমান নয় বা মানুষের কেবল মন-মস্তিষ্কে আছে।
মানবদেহে পাঁচ প্রকার শারীরিক শক্তি রহিয়াছে। তাহা হইল : (১) দৃষ্টিশক্তি, (২) শ্রবণশক্তি, (৩) গন্ধ অনুভব করিবার শক্তি, (৪) স্বাদ গ্রহণ করিবার শক্তি এবং (৫) স্পর্শশক্তি। ইহাকে পঞ্চ ইন্দ্রিয় বলা হয়। ইহার দ্বারা মানুষ বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে জ্ঞাত হয়। ইহার নামই ইন্দ্রিয়ানুভূতি। আমরা চিবাইয়া স্বাদ গ্রহণ করি, শুনিয়া কাজের পরিচয় পাই, দেখিয়া আকৃতি সম্পর্কে অবহিত হই, স্পর্শ করিয়া শক্তি ও নরম সম্পর্কে জানি, শুঁকিয়া গন্ধ বুঝি। এই সকল ইন্দ্রিয় দ্বারা যে জ্ঞান অর্জিত হয় তাহা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্ভুল হয়, তবে ক্ষেত্রবিশেষ ভুল-ভ্রান্তিও পরিলক্ষিত হয়। যেমন কারণ নির্ণয়ে এইগুলি কোন কোন সময় ধোঁকাগ্রস্ত হয় বা অনেক সময় তাহার বিভিন্ন গতি-প্রকৃতি অসুস্থতা ইত্যাদির ফলে বিগড়াইয়া যায়।
মাধ্যম ভিত্তিক দ্বিতীয় প্রকার জ্ঞান যাহাকে আমরা বুদ্ধিমত্তা বলিয়া সংজ্ঞায়িত করি। ইহাকে আমরা বুদ্ধি, অনুমান, চিন্তা-ভাবনা ও দলীল-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে লাভ করিয়া থাকি। ইহার ভিত্তি মূলত সেই সকল উপলব্ধির উপর হইয়া থাকে যেইগুলির জ্ঞান আমাদের অনুভূতি, সহজাত ইলহাম (স্বভাব), প্রাথমিক জ্ঞান ও অনুভূতির পূর্বে অভিজ্ঞতা থাকে। এই সকল অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উদাহরণ ও প্রমাণ সাপেক্ষে সাদৃশ্যমূলক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অজ্ঞাত বস্তুগুলি সম্পর্কেও আমরা জ্ঞাত হইয়া যাই। এমনকি জানা বস্তুর বৈশিষ্ট্য ও চিহ্নাদি অবলম্বন করিয়া অজানা বস্তুর আকৃতি সম্পর্কে কল্পনা করিতে পারি। চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা ও অনুসন্ধান ও পর্যায় বিন্যাসের ক্ষেত্রে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। ইহা দ্বারা লব্ধ জ্ঞান সন্দেহাতীত নয়।
এই আলোচনা হইতে স্পষ্ট বুঝা গেল যে, সর্বাধিক প্রত্যয় সৃষ্টি করার মত আমাদের জ্ঞান হইল وجدان ও সহজাত স্বভাব লব্ধ জ্ঞান, যাহা আমাদেরকে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে দান করা হয়। আমাদের অস্তিত্বের স্থায়িত্ব ইহার উপরই নির্ভরশীল। যেমন ক্ষুধা-তৃষ্ণার অনুভূতি। এই দুই শ্রেণীর জ্ঞানের পর মানুষের ইন্দ্রিয়ানুভূতির জ্ঞান লাভ হয়। দেখা, শোনা, স্বাদ গ্রহণ করা, গন্ধ অনুভব করা ও স্পর্শ করা এইগুলি আমাদের পক্ষে ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান। এইগুলি ব্যতিরেকে বাহিরের কোন জ্ঞান আমাদের মধ্যে আসিতে পারে না।
ইহার পরবর্তী পর্যায়ের জ্ঞান হইল بدیهیات اولیه এর জ্ঞান। এই প্রকার জ্ঞানের দ্বারা মানুষ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, দুই দুই মিলিয়া চার হয়, দশ সংখ্যাটি হইল পাঁচের দ্বিগুণ। একই জিনিস একসঙ্গে দুইটি স্থানে থাকিতে পারে না। এই জ্ঞান মানুষের বাল্যকালেই হয় না, পার্থক্য করার মত অনুভূতি হইবার পর ইহা অর্জিত হয়। কারণ এই সময় হইতে এইরূপ জ্ঞান থাকা মানুষের জন্য প্রয়োজন হয়। সর্বশেষে উপরিউক্ত চার প্রকার জ্ঞানের উপর কিয়াস করিবার ফলে মানুষ যেই জ্ঞান অর্জন করে তাহাকে معقولات বা বুদ্ধিভিত্তিক জ্ঞান বলে। এই জ্ঞান এবং ইহার হ্রাস-বৃদ্ধির ফলেই মানুষকে জ্ঞান ভিত্তিক বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত হইতে দেখা যায়। স্বল্পতার দিক বৃদ্ধি পাইলে সেই মানুষ হয় বোকা, আর বর্দ্ধনের দিক বৃদ্ধি পাইলে হয় বুদ্ধিমান। বর্দ্ধনের মাত্রা যত বেশী হইবে মানুষ তত বেশী বুদ্ধিমান বলিয়া বিবেচিত হইবে। সাধারণত মানুষের জ্ঞান পাঁচটি মাধ্যম বা পন্থায় অর্জিত হয়। তবে প্রকৃতপক্ষে এইগুলি ছাড়া আরও একটি মাধ্যম রহিয়াছে যাহা বস্তু জগতের ঊর্ধ্বে, যাহার সম্পর্ক বস্তুজগতের সহিত ততটুকু নয় যতটুকু বুদ্ধিভিত্তিক ও মানসিক জ্ঞানের সহিত রহিয়াছে, এমনকি ইহা সর্বাংশে বস্তুজগত হইতে মুক্ত। ইলমও বিভিন্ন স্তরের হইয়া থাকে, যাহাকে আমরা দূরদর্শিতা ( فراست ), হাদাস, কাশফ, ইলহাম ও ওহী বলিয়া থাকি। যেইভাবে মানবিক 'ইলমের উপরিউক্ত পাঁচটি মাধ্যম মানুষের দৈহিক শক্তির সহিত সম্পর্কিত, অনুরূপ বস্তুজগতের সহিত সম্পর্কহীন এই 'ইল্মও মানুষের রূহানী শক্তির সহিত সম্পর্কিত। বস্তুজগতের ইলমের মধ্যে যেইভাবে বিভিন্ন স্তর রহিয়াছে অনুরূপ এই বস্তুহীন ইলম জগতের ফিরাসাত, হাদাছ, কাশফ, ইলহাম ও ওহীর মধ্যে বিভিন্ন স্তর রহিয়াছে।
এ বস্তুটি কোন সময় আপন সুরতে উদ্ভাসিত হয়, আবার কোন সময় প্রতিচ্ছবি হিসাবে প্রতিভাত হয়। সাধারণ লোকের বুঝিবার জন্য ইহার উত্তম উদাহরণ হইতেছে স্বপ্ন। তফাৎ কেবল এতটুকু যে, স্বপ্ন হইল স্বপ্নজগতের কথা আর কাশফ হইল জাগ্রত জগতের।
ইলহাম : ইহা হইল সেই ইল্ম যাহা পরিশ্রম, অনুসন্ধান, তাহকীক, চিন্তা ও গবেষণা ব্যতিরেকে মানুষের মনে আসিয়া যায়। এমনও হইতে পারে যে, দৈহিক সুস্থতা, পারদর্শিতা এবং বুদ্ধিভিত্তিক দলীলাদি দ্বারা এই জ্ঞানকে উপলব্ধি করা যায়। তবে এই জ্ঞান সর্বাগ্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বুদ্ধিভিত্তিক দলীলের ফল হিসাবে অন্তরে আসে না।
ওহী: ইহা হইল সেই জ্ঞান যাহা মহান আল্লাহ আপন বিশেষ বান্দাদেরকে কোন অদৃশ্য মাধ্যমে অবহিত করেন। ইহা হইল রূহানী মাধ্যমে জ্ঞান লাভ ও অবহিত হইবার চূড়ান্ত পর্যায়। যেইভাবে বিজদানিয়্যাত, হিস্যিয়াত ও বাদীহিয়্যাত সাধারণ মানুষের ইলমে ইয়াকীনী বা প্রত্যয় সৃষ্টির মাধ্যম হইয়া থাকে, তেমনিভাবে রূহানী জগতের তিনটি ইল্ম কাশফ, ইলহাম ও ওহী নবীগণের জন্যও প্রত্যয় সৃষ্টিকারী মাধ্যম হইয়া থাকে।
ফিরাসাতঃ ইহা এমন এক শক্তি যাহা বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কাজের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় মানুষ অর্জন করিয়া থাকে, যাহার ফলে কোন জিনিস দেখা, শোনা, স্বাদ গ্রহণ, ঘ্রাণ কিংবা স্পর্শ করিবার সঙ্গে সঙ্গে কিছু আলামত সম্পর্কে অবগত হইলেই অন্যান্য অতীব প্রয়োজনীয় আলামতসমূহের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা ব্যতিরেকে জিনিসটি খুব দ্রুত চিনিয়া ফেলা যায়। তাহার এই দ্রুত অনুধাবন শক্তি দেখিয়া লোকেরা মনে করে যে, তিনি গায়বের কথা বলিতেছেন, প্রকৃতপক্ষে তাহার এই ইলম সম্পূর্ণরূপে আলামত নির্ভর হইয়া থাকে।
হাদাস : ফিরাসাতের পরবর্তী স্তর হইল হাদাস (حدس)-এর, ফিরাসতের প্রাথমিক ভূমিকা থাকে পঞ্চ ইন্দ্রিয় কেন্দ্রিক, কিন্তু হাদাসের সূচনাই হয় মেধা ও বিবেক হইতে। স্বভাবগত পূর্ণতা ও অর্জিত দক্ষতার ফলে এত দ্রুত লক্ষ্যে উপনীত হওয়া যায় যে, অর্জনকারী ব্যক্তিও তাহা এমন দ্রুত কিভাবে অর্জিত হইল তাহা অনুভব করিতে পারে না।
কাশফ : বস্তুভিত্তিক অন্ধকারের আবরণকে অপসারিত করিয়া বস্তুকে রূহানী জগতে প্রত্যক্ষ করাকে কাশফ বলে।
রূহানী ইলমের যে তিনটি প্রকারের কথা এখানে উল্লেখ করা হইল তাহা আল-কুরআনের পারিভাষিক নয়— রূহানীভাবে জ্ঞানার্জনের মাধ্যমের নাম। আল-কুরআনের পরিভাষায় ওহী বা আল্লাহ্র সহিত কথাবার্তা বলা, ইহার তিনটি পর্যায় রহিয়াছে:
১। ওহী (ইশারা) দ্বারা কথা বলা। অর্থাৎ অন্তরে শব্দ ও ধ্বনি ব্যতিরেকে কোন ভাব আসিয়া যাওয়া। ইহা জাগ্রত অবস্থায় হইলে তাহাকে কাশফ, আর ঘুমের মধ্যে হইলে তাহাকে স্বপ্ন বলা হয়।
২। আল্লাহ্ তা'আলার পর্দার অন্তরাল হইতে কথা বলা। অর্থাৎ কে বলিতেছেন তাহা গোচরীভূত হয় না কিন্তু অদৃশ্য হইতে শব্দ আসে এবং তাহা শ্রবণযোগ্য। ইহা হইল ইলহাম।
৩। ফেরেশতার মাধ্যমে কথা বলা। অর্থাৎ ফেরেশতা আল্লাহ্ তা'আলার বার্তা লইয়া সামনে আসেন। তাহার মুখ দিয়া যেই কথা বাহির হয় তাহা নবী মুখস্থ করিয়া ফেলেন। সাধারণ অর্থে ইহাকে ওহী বলা হয়। কারণ আল-কুরআন এই শেষ পন্থায়ই অবতীর্ণ হইয়াছে। ওহীর এই তিন প্রকারের উল্লেখ নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা প্রতিভাত হয়:
وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ تُكَلِّمَهُ اللهُ إِلَّا وَحْيَا أَوْ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ إِنَّهُ عَلَى حَكِيمٌ.
"মানুষের এমন মর্যাদা নাই যে, আল্লাহ্ তাহার সহিত কথা বলিবেন ওহীর মাধ্যম ব্যতিরেকে অথবা পর্দার অন্তরাল ব্যতিরেকে অথবা এমন দূত প্রেরণ ব্যতিরেকে, যেই দূত তাঁহার অনুমতিক্রমে তিনি যাহা চাহেন তাহা ব্যক্ত করেন; তিনি সমুন্নত, প্রজ্ঞাময়" (৪২: ৫১)।
আল্লাহ্র সহিত কথা বলিবার এই তিনটি পন্থাঃ ওহী বা ইঙ্গিতে কথা বলা, পর্দার অন্তরালে কথা বলা, ফেরেশতার মাধ্যমে কথা বলা। ওহী হিসাবে এই তিনটি প্রকার পৃথক পৃথকভাবে বুঝানো হইয়াছে। সংক্ষিপ্তভাবে এই তিন শ্রেণীর নামই ওহী। বর্ণিত তিনটি পন্থার যে কোন একটি দ্বারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে গায়বী শিক্ষাদান করা হইয়াছে (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ৪০-৪৬)।
📄 মানবিক জ্ঞানের উৎস
মানবিক জ্ঞানের উৎস
মানুষের জ্ঞান দুই প্রকার: (১) যাহা বিনা মাধ্যমে অর্জিত হয় এবং (২) যাহা কাহারও মাধ্যমে অর্জিত হয়। মাধ্যমবিহীন জ্ঞান আবার তিন প্রকার, যথাঃ
১। অনুভূতি (وجدان) : মানুষের দৈহিক অস্তিত্ব এবং সেই অস্তিত্বের আভ্যন্তরীণ অনুভূতির জ্ঞান। প্রতিটি মানুষ নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত থাকে। তাহার ক্ষুধা-তৃষ্ণা, সুস্থতা- অসুস্থতা, আনন্দ, নিরানন্দ, ভয়-ভীতি ইত্যাদি সে বিনা মাধ্যমে অনুভব করিতে পারে।
২। স্বভাব (فطرة) : সকল প্রকার সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর পক্ষ হইতে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেওয়া থাকে যাহা অন্য প্রকার সৃষ্টির মধ্যে পাওয়া যায় না। এই শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্যের জ্ঞান সংশ্লিষ্ট মাখলুকের কোন মাধ্যম ছাড়াই আর্জিত হইয়া থাকে। ইহাকে কেহ কেহ স্বভাবজাত আর কেহ ইলহামী জ্ঞান বলিয়া থাকেন। দার্শনিকগণ ইহাকে সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য বলিয়া অভিহিত করেন। প্রাণীজগৎ নিজেদের সম্পর্কে অনেক জিনিস স্বভাবগতভাবে অবগত হইয়া থাকে। পক্ষীকুলের ছানাদেরকে খাদ্য গ্রহণ এবং উড্ডয়ন কে শিক্ষা দেয়? কে জলজ প্রাণীদেরকে সাঁতার শিখায়? বাঘের বাচ্চাকে হিংস্রতা কে শিক্ষা দেয়, মানব সন্তানকে জন্মলগ্নেই কান্নাকাটি, নিদ্রা এবং দুধপান করা কে শিখায়?
৩। প্রাথমিক জ্ঞান (بدیهیات اولیه): মানুষের মধ্যে কিছু অনুভূতি ও প্রভেদ-জ্ঞান আসার পর এমন কিছু কথা আপনা আপনি কিংবা সামান্য চিন্তার দ্বারা এমনভাবে জানা হইয়া যায় যে, ইহাতে কোন প্রকার সন্দেহের উদ্রেক হয় না। দুই দুই মিলিয়া চার হয়, একই সঙ্গে কোন জিনিস সাদা ও কাল উভয়টি হয় না। প্রত্যেক নির্মিত জিনিসের কোন একজন নির্মাতা আছে। এইরূপ অনেক জিনিস মানুষ সহজেই বুঝিয়া লইতে সক্ষম হয়।
কোন মাধ্যমে মানুষ যেই জ্ঞান লাভ করে তাহা দুই প্রকার। একটি হইল অনুভূতি আর অপরটি হইল বুদ্ধিমত্তা। অনুভূতি দ্বারা মানুষ চারিপাশের উপাদানগুলি বুঝিয়া লয়, আর বুদ্ধিমত্তা দ্বারা সেই বস্তুসমূহ সে অনুধাবন করিয়া লয় যাহা তাহার সম্মুখে বিদ্যমান নয় কিংবা গোড়া হইতেই তাহা দৃশ্যমান নয় বা মানুষের কেবল মন-মস্তিষ্কে আছে।
মানবদেহে পাঁচ প্রকার শারীরিক শক্তি রহিয়াছে। তাহা হইল : (১) দৃষ্টিশক্তি, (২) শ্রবণশক্তি, (৩) গন্ধ অনুভব করিবার শক্তি, (৪) স্বাদ গ্রহণ করিবার শক্তি এবং (৫) স্পর্শশক্তি। ইহাকে পঞ্চ ইন্দ্রিয় বলা হয়। ইহার দ্বারা মানুষ বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে জ্ঞাত হয়। ইহার নামই ইন্দ্রিয়ানুভূতি। আমরা চিবাইয়া স্বাদ গ্রহণ করি, শুনিয়া কাজের পরিচয় পাই, দেখিয়া আকৃতি সম্পর্কে অবহিত হই, স্পর্শ করিয়া শক্তি ও নরম সম্পর্কে জানি, শুঁকিয়া গন্ধ বুঝি। এই সকল ইন্দ্রিয় দ্বারা যে জ্ঞান অর্জিত হয় তাহা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্ভুল হয়, তবে ক্ষেত্রবিশেষ ভুল-ভ্রান্তিও পরিলক্ষিত হয়। যেমন কারণ নির্ণয়ে এইগুলি কোন কোন সময় ধোঁকাগ্রস্ত হয় বা অনেক সময় তাহার বিভিন্ন গতি-প্রকৃতি অসুস্থতা ইত্যাদির ফলে বিগড়াইয়া যায়।
মাধ্যম ভিত্তিক দ্বিতীয় প্রকার জ্ঞান যাহাকে আমরা বুদ্ধিমত্তা বলিয়া সংজ্ঞায়িত করি। ইহাকে আমরা বুদ্ধি, অনুমান, চিন্তা-ভাবনা ও দলীল-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে লাভ করিয়া থাকি। ইহার ভিত্তি মূলত সেই সকল উপলব্ধির উপর হইয়া থাকে যেইগুলির জ্ঞান আমাদের অনুভূতি, সহজাত ইলহাম (স্বভাব), প্রাথমিক জ্ঞান ও অনুভূতির পূর্বে অভিজ্ঞতা থাকে। এই সকল অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উদাহরণ ও প্রমাণ সাপেক্ষে সাদৃশ্যমূলক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অজ্ঞাত বস্তুগুলি সম্পর্কেও আমরা জ্ঞাত হইয়া যাই। এমনকি জানা বস্তুর বৈশিষ্ট্য ও চিহ্নাদি অবলম্বন করিয়া অজানা বস্তুর আকৃতি সম্পর্কে কল্পনা করিতে পারি। চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা ও অনুসন্ধান ও পর্যায় বিন্যাসের ক্ষেত্রে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। ইহা দ্বারা লব্ধ জ্ঞান সন্দেহাতীত নয়।
📄 গায়বের সংজ্ঞা
গায়ব শব্দটি ক্রিয়াবিশেষ্য )مصدر(। কোন জিনিস লোকচক্ষুর আড়ালে হইলে ইহাকে 'গায়ব' বলা হয়। যেমন غَابَتِ الشَّمْسُ 'সূর্য চক্ষুর আড়ালে চলিয়া গিয়াছে'। কেহ কোথায়ও অনুপস্থিত থাকিলে সে অদৃশ্য থাকে বলিয়াই বলা হয়। যেমন غَابَ সে গায়ব হইয়া গিয়াছে। আল-কুরআনে বলা হইয়াছে : كَانَ مِنَ الْغَائِبِيْنَ "কিংবা সে অনুপস্থিত নাকি” (২৭: ২০)? মূলত গায়ব হইল মানুষের ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানের আওতার বাহিরের জগত। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا مِنْ غَائِبَةٍ فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ (النمل - ٧٥).
"আকাশে ও পৃথিবীতে এমন কোন গোপন রহস্য নাই যাহা সুস্পষ্ট কিতাবে নাই" (২৭: ৭৫)।
তাই বলা হয়, কোন কিছু 'গায়ব হইবার বিষয়টি' কেবল মানুষের ক্ষেত্রেই হইয়া থাকে, আল্লাহ্র নিকট কোন কিছুই গায়ব বা অদৃশ্য নয়। কোন কিছুই তাঁহার অগোচরে থাকিতে পারে না। ইরশাদ হইয়াছে: غَالَمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَة "তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা" (৫৯: ২২; রাগিব আল-ইসফাহানী, আল-মুফরাদাত, ৩৬৬)।
📄 গায়ব সম্পর্কে নবী-রাসূলগণের ইল্ম
গায়ব সম্পর্কে নবী-রাসূলগণের 'ইল্ম
ইসলামী আকীদামতে গায়বের ইল্ম আল্লাহ ব্যতীত আর কাহারও নাই। আল-কুরআনে বহুবার রাসূলুল্লাহ (স)-কে ইহার ঘোষণাদানের জন্য বলা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
فَقُلْ إِنَّمَا الْغَيْبُ الله (يونس - ٢٠). "বল, অদৃশ্যের জ্ঞান তো কেবল আল্লাহ্রই আছে” (১০-২০)।
قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلا الله (النمل - ٦٥). "বল, আল্লাহ ব্যতীত আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে কেহই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না" (২৭: ৬৫)।
قُلْ لَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ (الانعام - ٥٠).
"বল, আমি তোমাদিগকে ইহা বলি না যে, আমার নিকট আল্লাহর ধনভাণ্ডার আছে, অদৃশ্য সম্পর্কেও আমি অবগত নহি" (৬:৫০)।
কিন্তু অপর দুইটি স্থানে বলা হইয়াছে যে, ইহা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলা তাঁহার মনোনীত নবীগণকে গায়ব সম্পর্কে অবহিত করেন। ইরশাদ হইয়াছেঃ
فَلا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَداً . إِلا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَّسُولٍ (الجن - ٢٦ ) .
"তিনি তাঁহার অদৃশ্যের জ্ঞান কাহারও নিকট প্রকাশ করেন না তাঁহার মনোনীত রাসূল ব্যতীত” (২: ২৬-২৭)।
وَمَا كَانَ اللهُ لِيُطْلِعَكُمْ عَلَى الْغَيْبِ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَجْتَبِي مِنْ رُّسُلِهِ مَنْ يَشَاءُ (ال عمران - ১৭৯))
"অদৃশ্য সম্পর্কে তোমাদিগকে আল্লাহ অবহিত করিবার নহেন; তবে আল্লাহ তাঁহার রাসূলগণের মধ্য যাহাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন” (৩ঃ ১৭৯)।
উক্ত দুই আয়াত হইতে বুঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় মনোনীত নবীদেরকে গায়ব সম্পর্কে অবহিত করেন। ইহা হইতে প্রতিভাত হয় যে, যেই সকল আয়াতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কেহ গায়ব জানেন না বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে ইহার অর্থ হইল সত্তাগত ও প্রকৃত অর্থে গায়ব জানা। অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেহ সত্তাগতভাবে গায়েব জানিতে পারেন না। তবে আল্লাহ্র সাহায্যে ও তাঁহার জ্ঞান দেওয়ায় এবং অবহিত করায় নবীগণেরও এই জ্ঞান অর্জিত হইতে পারে। আয়াতুল কুরসীতে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلا بِمَا شَاءَ (البقرة - ٢٥٥)
"যাহা তিনি ইচ্ছা করেন তদ্ব্যতীত তাঁহার জ্ঞানের কিছুই তাহারা আয়ত্ত করিতে পারে না" (২: ২৫৫)।
অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গায়বী 'ইলমসমূহ হইতে যতটুকু ইচ্ছা করেন এবং কল্যাণকর মনে করেন ততটুকু তাঁহাদেরকে ওহীর মাধ্যমে অবহিত করান। এতদসত্ত্বেও কিয়ামতের নির্দিষ্ট তারিখ, বৃষ্টিপাত, মৃত্যু, মাতৃগর্ভের সন্তান কী হইবে, আগামী কল্য কী হইবে ইত্যাদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেহ জানেন না।
অনুরূপ কিছু কিছু আয়াতে আল্লাহ তা'আলা আমাদের নবী (স)-কে সম্বোধন করিয়া বলিয়াছেন, "ইহা সম্পর্কে তোমার জ্ঞান ছিল না।" যেমন তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করিবার জন্য কিছু লোক রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট মিথ্যা শপথ করিয়া তাহাদের অক্ষমতার অজুহাত পেশ করার পর তিনি তাহাদিগকে যুদ্ধে না যাওয়ার অনুমতি দেন। এই ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন:
عَفَا اللَّهُ عَنْكَ لِمَ أَذِنْتَ لَهُمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَتَعْلَمَ الْكَاذِبِينَ (التوبة - ٤٣ ) .
"আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করিয়াছেন, কাহারা সত্যবাদী তাহা তোমার নিকট স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত এবং কাহারা মিথ্যাবাদী তাহা না জানা পর্যন্ত তুমি কেন উহাদিগকে অব্যাহতি দিলে" (৯:৪৩)?