📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবী ও অন্যান্যদের মধ্যে চারটি পর্যায়ে প্রভেদ

📄 নবী ও অন্যান্যদের মধ্যে চারটি পর্যায়ে প্রভেদ


নবীরাসূল-ও অন্যান্য কল্যাণকামীদের মধ্যে যে কত বিরাট বাব্যধান রহিয়াছে তাহা পূর্বোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতিভাত হইয়াছে। এই প্রভেদ চারটি পর্যায়ে পরিলক্ষিত হয়। তাঁহা হইল (১) উৎসের, (২) লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের, (৩) দাওআত দানের পন্থার এবং (৪) ইলম ও আমলের।
নবীগণের ইলমের উৎস ও উৎপত্তি স্থল হইল আল্লাহ পাকের শিক্ষাদান, অন্তরাত্মা খুলিয়া যাওয়া, ওহী ও ইলহাম। দার্শনিক-বৈজ্ঞানিকদের ইলমের উৎস হইল মানবিক শিক্ষাদান, অতীতের অভিজ্ঞতা, অনুসন্ধান, অনুমান, পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অর্থাৎ দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকগণ জ্ঞানবুদ্ধি দ্বারা আর নবীগণ বুদ্ধির সৃষ্টিকর্তার দ্বারা অবহিত হন। একজন দার্শনিকের সকল কথাবার্তা ও চেষ্টা-তদবীরের লক্ষ্য হয় সুনাম-সুখ্যাতি অর্জন, জ্ঞানের বিকাশ, দেশ ও জাতির ভালবাসা ও সেবা। পক্ষান্তরে একজন নবীর লক্ষ্য হইয়া থাকে আল্লাহ পাকের বিধান কার্যকরী করা, তাঁহার সন্তুষ্টি লাভের জন্য মাখলুকের কল্যাণ কামনা করা।
দাওয়াতদানের মধ্যে পার্থক্য হইল দার্শনিক তাহার সার্বিক আহবানের ভিত্তি রচনা করেন প্রজ্ঞা ও মনীষা, সংস্কার ও বিশুদ্ধতা অর্জন এবং কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয়ের উপর। নবীগণের দাওয়াত স্রষ্টার আনুগত্য ও ভালবাসার উপর প্রতিষ্ঠিত। দার্শনিক যাহা ব্যক্ত করেন সেই মুতাবিক কাজ নাও করিতে পারেন। কিন্তু নবী যাহা বলেন তাহা নিজে কার্যে পরিণত করিয়া দেখাইয়া দেন। নির্জনে ও জনসমাজে, প্রকাশ্যে ও গোপনে পুণ্য কাজ দ্বারা তিনি সুসজ্জিত থাকেন এবং অপরকেও সুসজ্জিত করেন এবং অপকর্ম হইতে বিরত থাকেন অপরকেও বিরত রাখেন।
জগতে দেখা যায়, সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টোটল প্রমুখ দার্শনিক একদিকে, পক্ষান্তরে ইবরাহীম (আ), মূসা (আ), মুহাম্মাদ (স) অন্যদিকে অবস্থান করিতেছেন। উভয় শ্রেণীর এক দলের চরিত্র, জীবনেতিহাস ও কর্মকাণ্ড অপর দল হইতে এতই পৃথক যে, তাহাদের মধ্যে সামান্যতম মিল ও সংযোগ খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। রাষ্ট্রনায়ক স্বীয় অস্ত্র ও সৈন্যদলের শক্তি প্রদর্শন করিয়া নাগরিকদেরকে রাষ্ট্রীয় আইনের অধীনে আবদ্ধ করেন, যাহাতে সন্ত্রাস ও ফিৎনা দূর হইয়া যায়। বৈজ্ঞানিক স্বীয় দাবিকে কেবল যুক্তি-প্রমাণের বলে প্রমাণ করিতে চাহেন। কিন্তু নবীগণ তাঁহাদের অনুসারীদের অন্তরকে এমনভাবে পরিবর্তন করিয়া দিতে চাহেন যাহাতে তাহারা নিজেরাই অমঙ্গলের পথ পরিহার করিয়া মঙ্গলের পথে ফিরিয়া আসে। যদি তাহারা কখনো আইন-কানুনের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াও থাকেন তাহা হইলে ইহা তাঁহাদের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ হইয়া থাকে। তাঁহাদের প্রাথমিক কাজ হইতেছে উম্মতদের অন্তরে আল্লাহ পাকের কুদরত এবং তাঁহার সর্বজ্ঞ হওয়ার এমন প্রত্যয় সৃষ্টি করা যাহাতে তাহারা নবীর দাওয়াত গ্রহণ করিতে কোন দ্বিধা না করে।
জাগতিক রাজা-বাদশাহ ও দিগ্বিজয়ীগণ নিজেদের শৌর্যবীর্য ও বাহুবল দ্বারা পৃথিবীর অবস্থাকে পাল্টাইয়া জনপদে শান্তি প্রতিষ্ঠা করিতে পারেন। এতদসত্ত্বেও তাহারা কোন মানুষের অন্তরকে পরিবর্তন করিয়া দিতে কি সক্ষম হইয়াছিলেন? তাহারা কি মানুষের অন্তর জগতকে নিজেদের আয়ত্বে আনিতে পারিয়াছেন? বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকগণ নিজেদের জ্ঞান ও মনীষার আলোকে যেই সকল অত্যাশ্চর্য বিষয়াবলী ও সৃষ্টিজগতের গোপন তথ্যাবলী প্রকাশ করিবার দাবি করেন, তাহারা কি মানুষের অন্তরজগতের রহস্যাবলী উদ্ঘাটন করিতে সক্ষম হইয়াছেন? ঊর্দ্ধ জগতের রহস্য অনুধাবন করিতে পারিয়াছেন, নিজেদের উদ্ভাবনী শক্তি দ্বারা মানুষের সংশোধন ও হিদায়াতের কোন ব্যবস্থাপত্র আবিষ্কার করিতে পারিয়াছেন? এরিস্টোটল নীতিশাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করিয়াছেন। অন্যান্য দার্শনিকগণও চরিত্র ও প্রবৃত্তির কারণ ও হেতুসমূহ সম্পর্কে বিচার-বিশ্লেষণ করিয়াছেন। কিন্তু ইহাতে কোন মানুষের অন্তর হইতে অমঙ্গলের বীজ কি দূর হইয়াছে? তাহাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও দার্শনিক শিক্ষার গোপন রহস্যগুলির প্রসার তাহাদের বিদ্যানিকেতনের বেষ্টনী প্রাচীর অতিক্রম করিতে পারে নাই। কারণ তাহারা যখন স্বীয় বিদ্যাপীঠের সীমানা অতিক্রম করিয়া মানব সমাজে পা রাখিতেন তখন তাহাদের চারিত্রিক জীবন ও অন্তরাত্মার পরিচ্ছন্নতা সাধারণ মানুষের জীবন হইতে কোনক্রমেই উন্নততর হইত না। পক্ষান্তরে তাওহীদ ও ইবাদতের পন্থা এমন যেখানে অপবিত্রতার সামান্যতম ছোঁয়াচও লাগিতে পারে না।
এই আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, সুললিত কণ্ঠের অধিকারী বক্তা, অভিজ্ঞ আইন প্রণেতা, দিগ্বিজয়ী সম্রাট, প্রত্যুৎপন্নমতি দার্শনিক কেহই এই রূপ যোগ্য নহেন যে, তাহাদের প্রতি নবুওয়াত ও রিসালাতের সুমহান পবিত্র দায়িত্ব অর্পিত হইবে। এই দায়িত্ব ও কর্তব্যের সিংহাসনে আরোহণ করিতে হইলে এমন কিছু শর্ত, অতি আবশ্যকীয় গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হইতে হইবে, যাহা ব্যতীত ইহার মূল অবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা করা যায় না। তাহা হইল :
(১) নবুওয়াত ও রিসালাতের সম্পর্ক রহস্যপূর্ণ অদৃশ্য জগতের সঙ্গে। তাঁহারা গায়ব বা অদৃশ্যের ধ্বনি শুনিতে পান, অদৃশ্যের বস্তুসমূহ দেখিতে পান, তথা হইতে জ্ঞান আহরণ করেন, ফেরেশতা জগতের সাহায্য তাঁহারা লাভ করেন। জিবরাঈল (আ) তাঁহাদের সহায়তায় থাকেন।
২। আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের মধ্য হইতে তাঁহাদিগকে এই মহান পদে মনোনীত করেন।
৩। আল্লাহ তাআলার নির্দেশে তাঁহাদের নিকট হইতে এমন অনেক বিস্ময়কর অচিন্তনীয় অলৌকিক ঘটনাবলী প্রকাশিত হয় যাহার দ্বারা তাঁহারা যে আল্লাহ্র বরণীয় বান্দা তাহা বুঝা যায়।
৪। উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে তাঁহাদের জীবন মাধুর্যপূর্ণ থাকে, তাঁহারা পূত ও পবিত্র এবং নিখুঁত চরিত্রের অধিকারী হন। কারণ অপবিত্র হাত দ্বারা ময়লা কাপড় কখনও পরিষ্কার হয় না।
৫। তাঁহারা মানবজাতিকে আল্লাহর উপর ও অদৃশ্য জগতের উপর বিশ্বাস স্থাপনের দাওয়াত দেন, সচ্চরিত্রতা শিক্ষাদান করেন। মানুষ রূহানী জগতে আল্লাহকে যে প্রতিপালক হিসাবে স্বীকৃতিদান করিয়াছিল (দ্র. ৭:১৭২) সেই কথা স্মরণ করাইয়া দেন।
৬। কেবল শিক্ষাদান করিয়াই তাঁহারা ক্ষান্ত হন না, বরং তাঁহারা পাপিষ্ঠদেরকে পুণ্যবান ও পথহারাদেরকে সঠিক পাথের সন্ধান দেন, যাহারা আল্লাহ্র নির্দেশের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ছিল তাঁহাদের আল্লাহর পথে ফিরাইয়া আনেন।
৭। তাঁহাদের আগমনের পূর্ববর্তী কালে যেই সকল নীতি আল্লাহ্ পক্ষ হইতে আসিয়াছিল, তাঁহার সেইগুলিকে বিকৃতির হাত হইতে পরিচ্ছন্ন রাখিবার চেষ্টা করেন।
৮। তাঁহাদের দাওয়াত, শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্য পার্থিব কোন বিনিময়, সুখ্যাতি, বিত্ত বা ক্ষমতা অর্জন ছিল না, বরং তাঁহাদের একমাত্র লক্ষ্য হইত আল্লাহ পাকের নির্দেশ পালন ও মাখলুকের হিদায়াত।
এই সকল গুণ দুনিয়ার সকল নবীর মধ্যে সমভাবে বিদ্যমান ছিল। চলমান দুনিয়ার ধর্মগ্রন্থরাজির প্রতি তাকাইলে ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠে। বিশেষত সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থ আল-কুরআন নবুওয়াত ও রিসালাতের হাকীকত ও শর্তাবলী সবিস্তারে ব্যাখ্যা করিয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
وَتِلْكَ حُجَّتُنَا أَتَيْنَهَا إِبْرَاهِيمَ عَلَى قَوْمِهِ نَرْفَعُ دَرَجَت مَّنْ نَّشَاءُ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ. وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ كُلاً هَدَيْنَا وَلُوْطًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ دَاوُدَ وَسُلَيْمَانَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَى هَارُونَ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ، وَزَكَرِيَّا وَيَحْيَى وَعِيسَى وَالْيَاسَ كُلٌّ مِّنَ الصَّالِحِينَ. وَاسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوْطًا وَكُلاً فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ، وَمِنْ آبَائِهِمْ وَذُرِّيَّتِهِمْ وَإِخْوَانِهِمْ وَاجْتَبَيْنَهُمْ وَهَدَيْنَهُمْ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ ذَلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِي بِهِ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ. أُولَئِكَ الَّذِينَ أَتَيْنَهُمُ الْكِتٰبَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ فَإِنْ يُكْفُرْ بِهَا هُولا ، فَقَدْ وَكَّلْنَا بِهَا قَوْمًا لَيْسُوا بِهَا بِكَفِرِينَ. أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ فَبِهُدُهُمُ اقْتَدِهُ قُلْ لا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرَى لِلْعَالَمِينَ. (الانعام ٨٣-٩٠).
"এবং ইহা আমার যুক্তি-প্রমাণ যাহা ইবরাহীমকে দিয়াছিলাম তাহার সম্প্রদায়ের মুকাবিলায়। যাহাকে ইচ্ছা মর্যাদায় আমি উন্নীত করি। তোমার প্রতিপালক প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। আমি তাহাকে দান কারিয়াছিলাম ইসহাক ও ইয়া'কূব, ইহাদের প্রত্যেককে সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম। পূর্বে নূহকেও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম এবং তাহার বংশধর দাউদ, সুলায়মান, আয়্যব, ইউসুফ, মূসা ও হারুনকে; আর এইভাবেই সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করি এবং যাকারিয়‍্যা, য়াহয়া, ঈসা, ইলয়াসকেও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম; ইহারা সকলে সজ্জনদিগের অন্তর্ভুক্ত। আরও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম ইসমাঈল, আল-ইয়াসা, ইউনুস ও লূতকে; এবং শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছিলাম বিশ্বজগতের উপর প্রত্যেককে এবং ইহাদের পিতৃ-পুরুষ, বংশধর এবং ভ্রাতৃবৃন্দের কতককে আমি তাহাদিগকে মনোনীত করিয়াছিলাম এবং সরল পথে পরিচালিত করিয়াছিলাম। ইহা আল্লাহ্র হিদায়াত, স্বীয় বান্দাদিগের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা তিনি ইহা দ্বারা সৎপথে পরিচালিত করেন। তাহারা যদি শিরক করিত তবে তাহাদিগের কৃতকর্ম নিষ্ফল হইত। আমি উহাদিগকে কিতাব, কর্তৃত্ব ও নবুওয়াত দান করিয়াছি। অতঃপর যদি ইহারা এইগুলিকে প্রত্যাখ্যানও করে তবে আমি তো এমন এক সম্প্রদায়ের প্রতি এইগুলির ভার অর্পণ করিয়াছি যাহারা এইগুলি প্রত্যাখ্যান করিবে না। উহাদিগকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করিয়াছেন। সুতরাং তুমি তাহাদিগের পথের অনুসরণ কর। বল, ইহার জন্য আমি তোমাদিগের নিকট পারিশ্রমিক চাহি না, ইহা তো শুধু বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ" (৬:৮৩-৯০)।
এই আয়াতগুলিতে আল্লাহ তা'আলা অধিকাংশ নবী-রাসূলের উল্লেখ করিয়া তাঁহাদের নবী-সুলভ গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলিয়া ধরিয়াছেন, যাহার সারমর্ম নিম্নরূপ:
১। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন, "আমি ইবরাহীমকে দলীল ও প্রামাণ দিয়াছি এবং আমি তাহাকে হিদায়াতও প্রদান করিয়াছি"। ইহা হইতে বুঝা যায় তাঁহার ইলম ও হিদায়াতের উৎস ঊর্ধ্ব জগত (আলমে মালাকৃত)।
২। ইরশাদ হইয়াছে, "আমি তাহাদেরকে সরল পথে চালাইয়াছিলাম, তাঁহারা সকলে ছিলেন পুণ্যবান"। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, তাঁহারা নিষ্পাপ ও নিষ্কলংক ছিলেন।
৩। "আমি তাহাদেরকে বরণ করিয়া মনোনীত করিয়াছি এবং স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা এই হিদায়াত করি"। ইহা হইতে বুঝা যায়, এই মর্যাদাটি চেষ্টা ও অধ্যবসায় দ্বারা অর্জিত হয় না, বরং ইহা আল্লাহ্র ইচ্ছা ও তাঁহার মনোনয়নের উপর নির্ভরশীল।
৪। "আমি তাহাদেরকে কিতাব ও সত্য-মিথ্যার তফাৎকারী শক্তি, হিকমত ও অদৃশ্য জগতের শিক্ষা দিয়াছি"। ইহা হইতে নবুওয়াত ও রিসালাতের অধিকারিগণকে যে কত বড় সম্মান দিয়াছেন তাহা ফুটিয়া উঠে। "তোমরা তাহাদের হিদায়াত অনুসরণ কর"। ইহা হইতে স্পষ্টত বুঝা যায়, তাঁহারা মানুষের পথপ্রদর্শন এবং দাওয়াত দানের জন্য আদিষ্ট ছিলেন। মানুষ তাঁহাদের অনুসরণ করিয়া পুণ্যবান ও সৎকর্মশীল হয়।
৫। "বল, আমি আমার এই কাজের বিনিময়ে কোনও প্রতিফল তোমাদের নিকট হইত গ্রহণ করিবার প্রত্যাশা করিতেছি না; ইহা শুধু দুনিয়াবাসীর জন্য উপদেশ ও নিয়ামতের স্বীকৃতি মাত্র"। ইহার দ্বারা বুঝা যায়, আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি এবং ইহার সাহায্যে মাখলুকের কল্যাণ কামনা ব্যতীত নবীগণের অন্য কোন লক্ষ্য ছিল না।
অন্যান্য নবীগণ ছাড়াও স্বয়ং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর বৈশিষ্ট্যাবলী আল-কুরআনে বহুবার উল্লিখিত হইয়াছে। যেমনঃ
১। গায়বের বস্তুসমূহ ও কল্যাণকর কার্যাবলীর কারণ সম্পর্কে তাঁহার ইল্ম আল্লাহ প্রদত্ত শিক্ষায় পূর্ণ ছিল।
২। আল্লাহ প্রদত্ত শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন তিনি পরিপূর্ণভাবে ঘটাইয়াছিলেন।
৩। তিনি অন্যদেরকে এই ইলমের শিক্ষা দান করিতেন।
৪। তিনি স্বীয় শিক্ষা ও সান্নিধ্যের দ্বারা সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁহার অনুসারিগণকে পূর্ণতা দান করিতেন। আল-কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তাঁহার সম্পর্কে এই মর্মে ইরশাদ হইয়াছে: يَتْلُوا عَلَيْهِمْ ايْته وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ (الجمعة - ٢).
"যে তাহাদের নিকট আবৃত্তি করে তাঁহার আয়াতসমূহ, তাহাদিগকে পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমত" (৬২: ২)।
এই আয়াতে উপরিউক্ত চারিটি বিষয় একই স্থানে উল্লেখ করা হইয়াছে। কারণ অজ্ঞদেরকে শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োজন হইল, নিজে এই আয়াত তিলাওয়াত করিবেন এবং কিতাব ও হিকমত শিখিবেন। অনুরূপ অন্যদের পাক-সাফ করার জন্য ইহা জরুরী যে, তিনি স্বয়ং পাকসাফ থাকিবেন। এক মূর্খ অপর মূর্খকে জ্ঞানী এবং এক অপবিত্র অপর অপবিত্র লোককে পবিত্র করিতে পারে না। অপর এক আয়াতে ইরশাদ হইয়াছেঃ سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنْسَى إِلا مَا شَاءَ اللهُ إِنَّهُ يَعْلَمُ الْجَهْرَ وَمَا يَخْفَى. وَنُيَسِرُكَ الْيُسْرَى. فَذَكِّرْ أَنْ نَّفَعَتِ الذكرى. سَيَذَّكَّرُ مَنْ يَخْشَى وَيَتَجَنَّبُهَا الْأَشْقَى (الاعلى : ٦-١١).
"নিশ্চয় আমি তোমাকে পাঠ করাইব, ফলে তুমি বিস্তৃত হইবে না, আল্লাহ যাহা ইচ্ছা করিবেন তাহা ব্যতীত। তিনি জানেন যাহা প্রকাশ্য ও যাহা গোপনীয়। আমি তোমার জন্য সুগম করিয়া দিব সহজ পথ। উপদেশ যদি ফলপ্রসূ হয় তবে উপদেশ দাও। যে ভয় করে সে উপদেশ গ্রহণ করিবে। আর উহা উপেক্ষা করিবে যে নিতান্ত হতভাগ্য" (৮৭ঃ ৬-১১)।
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন, "তোমাকে পাঠ করাইব, ফলে তুমি বিস্তৃত হইবে না"। এইভাবে পাঠ করানোই হইল নবীগণের রূহানী তা'লীম। নবীকে পর্যায়ক্রমে সহজতর পথে লইয়া যাওয়া এবং তাঁহার জন্য সুকঠিন গন্তব্যকে সহজলভ্য করিয়া দেওয়ার মধ্যে যেই গূঢ় রহস্য নিহিত আছে তাহা হইল, তাঁহার ব্যক্তিগত আমলকে এইভাবে পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌছাইয়া দেওয়া যাহাতে সকল কল্যাণকর কাজ তাঁহার দ্বারা স্বভাবতই বিকশিত। দুনিয়াবাসীকে বুঝাইবার জন্য নবীকে আদ্রশদানের মধ্যে হিকমত হইল, তিনি শিক্ষাদান ও উপদেশ দানের পদে অধিষ্ঠিত (ইমাম রাযী, বরাত শিবলী নু'মানী-সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন নবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, ৩৭ টীকা দ্র)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াতের বৈশিষ্ট্যাবলীর ব্যাখ্যা

📄 নবুওয়াতের বৈশিষ্ট্যাবলীর ব্যাখ্যা


নবুওয়াতের বৈশিষ্ট্যাবলীর ব্যাখ্যা
নবুওয়াতের উপকরণ ও বৈশিষ্ট্যাবলী সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত এই আলোচনার পর চলমান কালের কতিপয় ভুল বুঝাবুঝির অপনোদন করা প্রয়োজন। এই সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে নবুওয়াতের বৈশিষ্ট্যাবলীর ব্যাখ্যা জানা আবশ্যক।
এই জগতের প্রতিটি শ্রেণীতে এবং সেই শ্রেণীর অধীন শাখা-প্রশাখায় কিছু না কিছু নির্দিষ্ট গুণাবলীর বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। এই বিশেষ গুণাবলী সংশ্লিষ্ট শ্রেণীতে এবং ইহার প্রত্যেক শাখা-প্রশাখায় সমভাবে লক্ষ্য করা যায়। এইগুলিকেই 'খুসূসিয়াত' বা বৈশিষ্ট্যাবলী বলিয়া অভিহিত করা হয়। ফল, ফুল, চতুস্পদ জন্তু, পক্ষিকুল এবং সকল মানুষের মধ্যে এমন কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য-আছে যাহা অন্যদের মধ্যে পাওয়া যায় না। এই বৈশিষ্ট্যাবলীর ভিত্তিতেই একটি শ্রেণী অপর শ্রেণী হইতে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত হয় এবং পরস্পরের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা যায়।
গোলাপ ফুলের বিশেষ রঙ রহিয়াছে, ইহার সৌরভ ভিন্ন প্রকৃতির এবং তাহার পাতা-পল্লবও বিশেষ ধরনের হইয়া থাকে। গোলাপ ফুল হইলেই তাহাতে এই বৈশিষ্ট্য অবশ্যই থাকিবে। গোলাপ ফুলের বৈচিত্র্য এখানেই শেষ নয়। গোলাপের মধ্যেও রহিয়াছে বিভিন্ন গুণ এবং প্রকারভেদ। ইহার প্রতিটি পর্যায় ও প্রকারের মধ্যে কিছু কিছু এমন অবশ্যম্ভাবী গুণের সমারোহ রহিয়াছে যাহার দরুণ প্রত্যেকটি প্রকারকে অন্যান্য প্রকার হইতে স্পষ্টত পৃথক মনে হয়।
মানুষের দেহে বিশেষ বিশেষ উপকরণ ও গুণ রহিয়াছে। যেমন হাত-পা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, দেহ, বাকশক্তি ও বুদ্ধি-বিবেচনা ইত্যাদি। মধুতে মিষ্টি, আগুনে উত্তাপ ও বরফের মধ্যে শীতলতা প্রভৃতি শ্রেণীভিত্তিক বৈশিষ্ট্য স্বভাবতই বিরাজমান। অনুরূপ মানুষের মধ্যেও মানবতাসুলভ উপরোল্লিখিত গুণাবলী সৃষ্টিগতভাবে বিদ্যমান রহিয়াছে। এই গুণাবলী সকল মানুষের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও গোলাপের নানা প্রকারের মত মানুষের মধ্যেও বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ রহিয়াছে। এইভাবে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে ব্যক্তিবিশেষের বিভিন্নতাও লক্ষ্য করা যায়। আল্লাহ তা'আলা তাহাদের প্রত্যেককে ভিন্ন ভিন্ন যোগ্যতা ও কর্মপ্রেরণা দান করিয়াছেন। ফলে কেহ হয় কবি, কেহ হয় বাগ্মী, আবার কেহ হয় বৈজ্ঞানিক ইত্যাদি। এই কবি ও বাগ্মীদের মধ্যেও কত বৈচিত্র রহিয়াছে। এই বিভিন্ন প্রকৃতির মানুষের মধ্যে এক শ্রেণীর মানুষ হইলেন নবীগণ। তাঁহাদের বিশেষ বিশেষ খুসূসিয়াত বা বৈশিষ্ট্যাবলী রহিয়াছে যাহা তাঁহাদিগকে অন্যান্য মানব শ্রেণী হইতে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত করিয়া তুলিয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতা

📄 আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতা


আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতা
বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে যে সহজাত যোগ্যতা রহিয়াছে ইহার দিকেই তাহার স্বভাবজাত আকর্ষণ থাকে। ইহার দিকে সে অগ্রসরমান থাকে এবং এক সময় সে পরিপূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। যেই গাছকে আল্লাহ আমগাছ হিসাবে সৃষ্টি করিয়াছেন তাহা হইতেই কেবল এই ফল উৎপন্ন হয়, অন্যান্য গাছ হইতে নয়। আমগাছ যখন বীজের আকারে থাকে তখন হইতেই তাহার মধ্যে আমগাছের চিহ্ন, বিশেষত, স্বাদ, রঙ ও সুগন্ধি নিহিত থাকে। সেই বীজ চারার রূপ ধারণ করে, ইহার পর চারা বৃদ্ধি পায়। তাহা হইতে শাখা-প্রশাখার সৃষ্টি হয়। কিছু দিন পর ইহাতে কুড়িও দেখা দেয়। কিন্তু বৃদ্ধি পাওয়ার সব ক্ষেত্রেই ইহার মধ্যে সেই বৈশিষ্ট্য গোপন থাকে যাহা অনুকূল পরিবেশে একদিন পরিপূর্ণতা লাভ করে। এই উদাহরণ হইতে এই কথা অনুমান করা যায় যে, কোন মানুষ চেষ্টার বদৌলতে নবী হইতে পারেন না, বরং তাঁহারাই সেই পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন যাঁহাদেরকে আল্লাহ নবী হিসাবে সৃষ্টি করিয়াছেন। নবুওয়াতের সেই লক্ষণাদি ও গুণাবলী তাঁহাদের মধ্যে কার্যত সেই সময় হইতেই বিদ্যমান থাকে যখন তাঁহাদের রূহ তাঁহাদের দেহের সহিত সংযুক্ত হয় নাই। সম্ভবত রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিম্নোক্ত বাণীর অর্থ ইহাই :
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ مَتَى وَجَبَتْ لَكَ النُّبُوَّةَ قَالَ وَادَمُ بَيْنَ الرُّوحِ وَالْجَسَدِ ( رواه الترمذي - ٢/٢٠١ دهلی).
"আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহ্ রাসূল! আপনার জন্য নবুওয়াত কখন সাব্যস্ত হইয়াছে? তিনি বলিলেন, যখন আদম (আ) রূহ ও দেহের মধ্যবর্তী অবস্থানে ছিলেন" (তিরমিযী, দিল্লী, ২খ., ২০১)।
নবীগণের জীবনচরিতের প্রতি গভীরভাবে লক্ষ্য করিলে বুঝা যায় যে, তাঁহারা যখন ধুলার ধরণীতে পা রাখিতেন তখন হইতে ভবিষ্যতের দায়িত্বের নমুনা তাহাদের মধ্যে প্রকাশিত হইতে শুরু করিত। তাঁহারা বংশমর্যাদা ও আচার-আচরণে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত হইতেন। শিরক ও কুফরীতে পরিবেশ তমসাচ্ছন্ন থাকা সত্ত্বেও তাঁহারা এই আবিলতা হইতে মুক্ত থাকিতেন। সচ্চরিত্রতার ভূষণে তাঁহারা ভূষিত থাকিতেন। তাঁহাদের বিশ্বস্ততা ও সত্যবাদিতা সর্বজনস্বীকৃত হইত। নবুওয়াত লাভের পূর্বে এই পূর্বাভাষ এইজন্য দেওয়া হইত যাহাতে তাঁহাদের প্রতি পূর্ব হইতে মানুষের মন আকৃষ্ট থাকে এবং নবুওয়াতকে স্বীকার করা সহজ হয়। ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইউসুফ, মূসা, সুলায়মান, ইয়াহয়া, ঈসা (আ) ও মুহাম্মাদ (স)-এর নবুওয়াত লাভের পূর্ববর্তী ঘটনাবলী পর্যালোচনা করিলে ইহার সত্যতা প্রমাণিত হইবে। ইবরাহীম (আ) নবুওয়াত লাভের পূর্বেই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টিকর্তার সন্ধানে লাগিয়া চন্দ্র, সূর্য ও তারকারাজির উপর গবেষণামূলক দৃষ্টিপাত এবং প্রতিমা পূজার প্রতি সম্পূর্ণ বীতশ্রদ্ধ হওয়া কিসের সাক্ষ্য বহন করে? ইসমাঈল (আ)-এর আহার্য-পানীয়বিহীন স্থানে লালিত-পালিত হওয়া, যমযমের কূপের উৎপত্তি, যাতায়াতকারী কাফেলার তাঁহার বাসস্থানের প্রতি আকর্ষণ, সর্বোপরি এত অল্প বয়সে পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিজে কুরবানী হইতে সংকল্পবদ্ধ হওয়া তাঁহার কোন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করে? ইসহাক (আ)-এর ফেরেশতাদের সুসংবাদ দানের মাধ্যমে জন্মলাভ করা, জন্মলাভের পূর্বেই غُلَامٌ حَلَيْمٌ “ধৈর্যশীল যুবক” উপাধি পাওয়া, পিতার স্থলাভিষিক্ত এবং জেরুসালেম মসজিদের মুতাওয়াল্লী হইবার জন্য মনোনয়ন লাভ কিসের উদ্দেশ্যে ছিল?
ইউসুফ (আ)-এর শিশুকাল হইতে সত্য স্বপ্ন দর্শন, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা ও সম্ভ্রম রক্ষা কিসের সাক্ষী বহন করে? মূসা (আ)-এর জন্ম ভীতিকর পরিবেশে হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁহাকে হিফাযত ও লালনপালন এবং নবুওয়াত লাভের পূর্বেই ফিরআওনের সহিত জিহাদী আচরণ কোন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করে? সুলায়মান (আ)-এর বাল্যকালেই জ্ঞানশক্তি ও বিবাদ-বিসম্বাদের ফায়সালা দান কোন পরিণতির ইঙ্গিত বহন করে? ঈসা (আ)-এর অভিনব পন্থায় জন্ম, বাল্যকালেই তাঁহার পূণ্যময় ক্রিয়াকলাপ, সদাচরণ ও তাওরাত গ্রন্থের প্রকৃত অর্থ উদঘাটন কোন উজ্জ্বল দিবসের সাক্ষ্য বহন করে? সর্বশেষ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আ)-এর দু'আ, ঈসা (আ)-এর সুসংবাদ দান, মাতা আমিনার স্বপ্ন, জন্মকালীন অভূতপূর্ব ঘটনা, লালন-পালন, শিরক হইতে তাঁহার দূরে থাকা, সচ্চরিত্রতা, আল-আমীন উপাধি লাভ, বরকত ও কল্যাণের লক্ষণাদি প্রকাশ, তাওহীদের প্রতি তাঁহার একাগ্রতা ও চিন্তা-ভাবনা কোন সুসংবাদের ইঙ্গিতবাহী ছিল? ইসমাঈল (আ) সম্পর্কে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
فَبَشِّرْنَاهُ بِغُلامٍ حَلِيمٍ فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ.
"অতঃপর আমি তাহাকে এক স্থিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর সে যখন তাহার পিতার সঙ্গে কাজ করিবার মত বয়সে উপনীত হইল তখন ইবরাহীম বলিল, বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি তোমাকে যবাহ করিতেছি, এখন তোমার অভিমত কি? সে বলিল, হে আমার পিতা। আপনি যাহা আদিষ্ট হইয়াছেন তাহাই করুন। আল্লাহ ইচ্ছা করিলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাইবেন" (৩৭ঃ ১০২)।
ইয়াহ্ইয়া (আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
يَا يَحْيَ خُذِ الْكِتَابَ بِقُوَّةٍ وَآتَيْنَاهُ الْحُكْمَ صَبِيًّا وَحَنَانًا مِنْ لَدُنَّا وَزَكُوةً وَكَانَ تَقِيًّا. وَبَرًّا (مريم ۱۲-۱٥). بِوَالِدَيْهِ وَلَمْ يَكُنْ جَبَّارًا عَصِيًّا. وَسَلَامٌ عَلَيْهِ يَوْمَ وُلِدَ ...
"আমি বলিলাম, হে ইয়াহ্ইয়া! এই কিতাব দৃঢ়তার সহিত গ্রহণ কর। আমি তাহাকে শৈশবেই দান করিয়াছিলাম জ্ঞান এবং আমার নিকট হইতে হৃদয়ের কোমলতা ও পবিত্রতা। সে ছিল মুত্তাকী, পিতা-মাতার অনুগত এবং সে ছিল না উদ্ধত অবাধ্য। তাহার প্রতি ছিল শান্তি যেই দিন সে জন্ম লাভ করে...." (১৯ : ১২-১৫)।
মূসা (আ)-কে সম্বোধন মূলক ইরশাদ হইয়াছে:
وََلَقَدْ مَنَنَّا عَلَيْكَ مَرَّةً أُخْرى. إِذْ أَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّكَ مَا يُوحَى (طه - ۳۷-۳۸).
"এবং আমি তো তোমার প্রতি আরও একবার অনুগ্রহ করিয়াছিলাম, যখন আমি তোমার মাতাকে ইঙ্গিত দ্বারা নির্দেশ দিয়াছিলাম যাহা নির্দেশ করিবার ছিল" (২০: ৩৭-৩৮)।
ঈসা (আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
كَيْفَ نُكَلِّمُ مَنْ كَانَ فِي الْمَهْدِ صَبِيًّا. قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ أَتْنِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا . وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَمَا كُنْتُ (مريم - ۲۹-۳۱).
"যে কোলের শিশু তাহার সহিত আমরা কেমন করিয়া কথা বলিব? সে বলিল, আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়াছেন, আমাকে নবী করিয়াছেন, যেখানেই আমি থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করিয়াছেন" (১৯: ২৯-৩১)।
মক্কার 'আল-আমীন' মুহাম্মাদ (স) নবুওয়াতের পূর্বের সম্পূর্ণ জীবন কোন কোন ক্ষেত্রে সকলের সম্মুখে তুলিয়া ধরিতেন। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
فَقَدْ لَبِثْتُ فِيكُمْ عُمُراً مِّنْ قَبْلِهِ أَفَلا تَعْقِلُونَ (يونس - ١٦).
"আমি তো ইহার পূর্বে তোমাদিগের মধ্যে জীবনের দীর্ঘকাল অবস্থান করিয়াছি; তবুও কি তোমরা বুঝিতে পার না” (১০: ৬)?

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গায়ব বা অদৃশ্যের জ্ঞান

📄 গায়ব বা অদৃশ্যের জ্ঞান


গায়ব বা অদৃশ্যের জ্ঞান
নবুওয়াতের দ্বিতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হইল গায়ব বা অদৃশ্যের জ্ঞান। ইহা সেই জ্ঞান যাহা সাধারণ মানুষের ইচ্ছা, অনুভূতি, বুদ্ধি ও বিবেকের সাহায্য ব্যতিরেকে সরাসরি কিংবা স্বপ্নে অথবা ফেরেশতাগণের মাধ্যমে আল্লাহ্ পক্ষ হইতে অর্জিত হয়। ইহা হইতেই নবুওয়াতের যাত্রা শুরু হয়।
মানবিক জ্ঞানের উৎস
মানুষের জ্ঞান দুই প্রকার: (১) যাহা বিনা মাধ্যমে অর্জিত হয় এবং (২) যাহা কাহারও মাধ্যমে অর্জিত হয়। মাধ্যমবিহীন জ্ঞান আবার তিন প্রকার, যথাঃ
১। অনুভূতি (وجدان) : মানুষের দৈহিক অস্তিত্ব এবং সেই অস্তিত্বের আভ্যন্তরীণ অনুভূতির জ্ঞান। প্রতিটি মানুষ নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত থাকে। তাহার ক্ষুধা-তৃষ্ণা, সুস্থতা- অসুস্থতা, আনন্দ, নিরানন্দ, ভয়-ভীতি ইত্যাদি সে বিনা মাধ্যমে অনুভব করিতে পারে।
২। স্বভাব (فطرة) : সকল প্রকার সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর পক্ষ হইতে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেওয়া থাকে যাহা অন্য প্রকার সৃষ্টির মধ্যে পাওয়া যায় না। এই শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্যের জ্ঞান সংশ্লিষ্ট মাখলুকের কোন মাধ্যম ছাড়াই আর্জিত হইয়া থাকে। ইহাকে কেহ কেহ স্বভাবজাত আর কেহ ইলহামী জ্ঞান বলিয়া থাকেন। দার্শনিকগণ ইহাকে সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য বলিয়া অভিহিত করেন। প্রাণীজগৎ নিজেদের সম্পর্কে অনেক জিনিস স্বভাবগতভাবে অবগত হইয়া থাকে। পক্ষীকুলের ছানাদেরকে খাদ্য গ্রহণ এবং উড্ডয়ন কে শিক্ষা দেয়? কে জলজ প্রাণীদেরকে সাঁতার শিখায়? বাঘের বাচ্চাকে হিংস্রতা কে শিক্ষা দেয়, মানব সন্তানকে জন্মলগ্নেই কান্নাকাটি, নিদ্রা এবং দুধপান করা কে শিখায়?
৩। প্রাথমিক জ্ঞান (بدیهیات اولیه): মানুষের মধ্যে কিছু অনুভূতি ও প্রভেদ-জ্ঞান আসার পর এমন কিছু কথা আপনা আপনি কিংবা সামান্য চিন্তার দ্বারা এমনভাবে জানা হইয়া যায় যে, ইহাতে কোন প্রকার সন্দেহের উদ্রেক হয় না। দুই দুই মিলিয়া চার হয়, একই সঙ্গে কোন জিনিস সাদা ও কাল উভয়টি হয় না। প্রত্যেক নির্মিত জিনিসের কোন একজন নির্মাতা আছে। এইরূপ অনেক জিনিস মানুষ সহজেই বুঝিয়া লইতে সক্ষম হয়।
কোন মাধ্যমে মানুষ যেই জ্ঞান লাভ করে তাহা দুই প্রকার। একটি হইল অনুভূতি আর অপরটি হইল বুদ্ধিমত্তা। অনুভূতি দ্বারা মানুষ চারিপাশের উপাদানগুলি বুঝিয়া লয়, আর বুদ্ধিমত্তা দ্বারা সেই বস্তুসমূহ সে অনুধাবন করিয়া লয় যাহা তাহার সম্মুখে বিদ্যমান নয় কিংবা গোড়া হইতেই তাহা দৃশ্যমান নয় বা মানুষের কেবল মন-মস্তিষ্কে আছে।
মানবদেহে পাঁচ প্রকার শারীরিক শক্তি রহিয়াছে। তাহা হইল : (১) দৃষ্টিশক্তি, (২) শ্রবণশক্তি, (৩) গন্ধ অনুভব করিবার শক্তি, (৪) স্বাদ গ্রহণ করিবার শক্তি এবং (৫) স্পর্শশক্তি। ইহাকে পঞ্চ ইন্দ্রিয় বলা হয়। ইহার দ্বারা মানুষ বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে জ্ঞাত হয়। ইহার নামই ইন্দ্রিয়ানুভূতি। আমরা চিবাইয়া স্বাদ গ্রহণ করি, শুনিয়া কাজের পরিচয় পাই, দেখিয়া আকৃতি সম্পর্কে অবহিত হই, স্পর্শ করিয়া শক্তি ও নরম সম্পর্কে জানি, শুঁকিয়া গন্ধ বুঝি। এই সকল ইন্দ্রিয় দ্বারা যে জ্ঞান অর্জিত হয় তাহা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্ভুল হয়, তবে ক্ষেত্রবিশেষ ভুল-ভ্রান্তিও পরিলক্ষিত হয়। যেমন কারণ নির্ণয়ে এইগুলি কোন কোন সময় ধোঁকাগ্রস্ত হয় বা অনেক সময় তাহার বিভিন্ন গতি-প্রকৃতি অসুস্থতা ইত্যাদির ফলে বিগড়াইয়া যায়।
মাধ্যম ভিত্তিক দ্বিতীয় প্রকার জ্ঞান যাহাকে আমরা বুদ্ধিমত্তা বলিয়া সংজ্ঞায়িত করি। ইহাকে আমরা বুদ্ধি, অনুমান, চিন্তা-ভাবনা ও দলীল-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে লাভ করিয়া থাকি। ইহার ভিত্তি মূলত সেই সকল উপলব্ধির উপর হইয়া থাকে যেইগুলির জ্ঞান আমাদের অনুভূতি, সহজাত ইলহাম (স্বভাব), প্রাথমিক জ্ঞান ও অনুভূতির পূর্বে অভিজ্ঞতা থাকে। এই সকল অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উদাহরণ ও প্রমাণ সাপেক্ষে সাদৃশ্যমূলক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অজ্ঞাত বস্তুগুলি সম্পর্কেও আমরা জ্ঞাত হইয়া যাই। এমনকি জানা বস্তুর বৈশিষ্ট্য ও চিহ্নাদি অবলম্বন করিয়া অজানা বস্তুর আকৃতি সম্পর্কে কল্পনা করিতে পারি। চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা ও অনুসন্ধান ও পর্যায় বিন্যাসের ক্ষেত্রে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। ইহা দ্বারা লব্ধ জ্ঞান সন্দেহাতীত নয়।
এই আলোচনা হইতে স্পষ্ট বুঝা গেল যে, সর্বাধিক প্রত্যয় সৃষ্টি করার মত আমাদের জ্ঞান হইল وجدان ও সহজাত স্বভাব লব্ধ জ্ঞান, যাহা আমাদেরকে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে দান করা হয়। আমাদের অস্তিত্বের স্থায়িত্ব ইহার উপরই নির্ভরশীল। যেমন ক্ষুধা-তৃষ্ণার অনুভূতি। এই দুই শ্রেণীর জ্ঞানের পর মানুষের ইন্দ্রিয়ানুভূতির জ্ঞান লাভ হয়। দেখা, শোনা, স্বাদ গ্রহণ করা, গন্ধ অনুভব করা ও স্পর্শ করা এইগুলি আমাদের পক্ষে ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান। এইগুলি ব্যতিরেকে বাহিরের কোন জ্ঞান আমাদের মধ্যে আসিতে পারে না।
ইহার পরবর্তী পর্যায়ের জ্ঞান হইল بدیهیات اولیه এর জ্ঞান। এই প্রকার জ্ঞানের দ্বারা মানুষ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, দুই দুই মিলিয়া চার হয়, দশ সংখ্যাটি হইল পাঁচের দ্বিগুণ। একই জিনিস একসঙ্গে দুইটি স্থানে থাকিতে পারে না। এই জ্ঞান মানুষের বাল্যকালেই হয় না, পার্থক্য করার মত অনুভূতি হইবার পর ইহা অর্জিত হয়। কারণ এই সময় হইতে এইরূপ জ্ঞান থাকা মানুষের জন্য প্রয়োজন হয়। সর্বশেষে উপরিউক্ত চার প্রকার জ্ঞানের উপর কিয়াস করিবার ফলে মানুষ যেই জ্ঞান অর্জন করে তাহাকে معقولات বা বুদ্ধিভিত্তিক জ্ঞান বলে। এই জ্ঞান এবং ইহার হ্রাস-বৃদ্ধির ফলেই মানুষকে জ্ঞান ভিত্তিক বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত হইতে দেখা যায়। স্বল্পতার দিক বৃদ্ধি পাইলে সেই মানুষ হয় বোকা, আর বর্দ্ধনের দিক বৃদ্ধি পাইলে হয় বুদ্ধিমান। বর্দ্ধনের মাত্রা যত বেশী হইবে মানুষ তত বেশী বুদ্ধিমান বলিয়া বিবেচিত হইবে। সাধারণত মানুষের জ্ঞান পাঁচটি মাধ্যম বা পন্থায় অর্জিত হয়। তবে প্রকৃতপক্ষে এইগুলি ছাড়া আরও একটি মাধ্যম রহিয়াছে যাহা বস্তু জগতের ঊর্ধ্বে, যাহার সম্পর্ক বস্তুজগতের সহিত ততটুকু নয় যতটুকু বুদ্ধিভিত্তিক ও মানসিক জ্ঞানের সহিত রহিয়াছে, এমনকি ইহা সর্বাংশে বস্তুজগত হইতে মুক্ত। ইলমও বিভিন্ন স্তরের হইয়া থাকে, যাহাকে আমরা দূরদর্শিতা ( فراست ), হাদাস, কাশফ, ইলহাম ও ওহী বলিয়া থাকি। যেইভাবে মানবিক 'ইলমের উপরিউক্ত পাঁচটি মাধ্যম মানুষের দৈহিক শক্তির সহিত সম্পর্কিত, অনুরূপ বস্তুজগতের সহিত সম্পর্কহীন এই 'ইল্মও মানুষের রূহানী শক্তির সহিত সম্পর্কিত। বস্তুজগতের ইলমের মধ্যে যেইভাবে বিভিন্ন স্তর রহিয়াছে অনুরূপ এই বস্তুহীন ইলম জগতের ফিরাসাত, হাদাছ, কাশফ, ইলহাম ও ওহীর মধ্যে বিভিন্ন স্তর রহিয়াছে।
এ বস্তুটি কোন সময় আপন সুরতে উদ্ভাসিত হয়, আবার কোন সময় প্রতিচ্ছবি হিসাবে প্রতিভাত হয়। সাধারণ লোকের বুঝিবার জন্য ইহার উত্তম উদাহরণ হইতেছে স্বপ্ন। তফাৎ কেবল এতটুকু যে, স্বপ্ন হইল স্বপ্নজগতের কথা আর কাশফ হইল জাগ্রত জগতের।
ইলহাম : ইহা হইল সেই ইল্ম যাহা পরিশ্রম, অনুসন্ধান, তাহকীক, চিন্তা ও গবেষণা ব্যতিরেকে মানুষের মনে আসিয়া যায়। এমনও হইতে পারে যে, দৈহিক সুস্থতা, পারদর্শিতা এবং বুদ্ধিভিত্তিক দলীলাদি দ্বারা এই জ্ঞানকে উপলব্ধি করা যায়। তবে এই জ্ঞান সর্বাগ্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বুদ্ধিভিত্তিক দলীলের ফল হিসাবে অন্তরে আসে না।
ওহী: ইহা হইল সেই জ্ঞান যাহা মহান আল্লাহ আপন বিশেষ বান্দাদেরকে কোন অদৃশ্য মাধ্যমে অবহিত করেন। ইহা হইল রূহানী মাধ্যমে জ্ঞান লাভ ও অবহিত হইবার চূড়ান্ত পর্যায়। যেইভাবে বিজদানিয়‍্যাত, হিস্যিয়াত ও বাদীহিয়‍্যাত সাধারণ মানুষের ইলমে ইয়াকীনী বা প্রত্যয় সৃষ্টির মাধ্যম হইয়া থাকে, তেমনিভাবে রূহানী জগতের তিনটি ইল্ম কাশফ, ইলহাম ও ওহী নবীগণের জন্যও প্রত্যয় সৃষ্টিকারী মাধ্যম হইয়া থাকে।
ফিরাসাতঃ ইহা এমন এক শক্তি যাহা বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কাজের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় মানুষ অর্জন করিয়া থাকে, যাহার ফলে কোন জিনিস দেখা, শোনা, স্বাদ গ্রহণ, ঘ্রাণ কিংবা স্পর্শ করিবার সঙ্গে সঙ্গে কিছু আলামত সম্পর্কে অবগত হইলেই অন্যান্য অতীব প্রয়োজনীয় আলামতসমূহের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা ব্যতিরেকে জিনিসটি খুব দ্রুত চিনিয়া ফেলা যায়। তাহার এই দ্রুত অনুধাবন শক্তি দেখিয়া লোকেরা মনে করে যে, তিনি গায়বের কথা বলিতেছেন, প্রকৃতপক্ষে তাহার এই ইলম সম্পূর্ণরূপে আলামত নির্ভর হইয়া থাকে।
হাদাস : ফিরাসাতের পরবর্তী স্তর হইল হাদাস (حدس)-এর, ফিরাসতের প্রাথমিক ভূমিকা থাকে পঞ্চ ইন্দ্রিয় কেন্দ্রিক, কিন্তু হাদাসের সূচনাই হয় মেধা ও বিবেক হইতে। স্বভাবগত পূর্ণতা ও অর্জিত দক্ষতার ফলে এত দ্রুত লক্ষ্যে উপনীত হওয়া যায় যে, অর্জনকারী ব্যক্তিও তাহা এমন দ্রুত কিভাবে অর্জিত হইল তাহা অনুভব করিতে পারে না।
কাশফ : বস্তুভিত্তিক অন্ধকারের আবরণকে অপসারিত করিয়া বস্তুকে রূহানী জগতে প্রত্যক্ষ করাকে কাশফ বলে।
রূহানী ইলমের যে তিনটি প্রকারের কথা এখানে উল্লেখ করা হইল তাহা আল-কুরআনের পারিভাষিক নয়— রূহানীভাবে জ্ঞানার্জনের মাধ্যমের নাম। আল-কুরআনের পরিভাষায় ওহী বা আল্লাহ্র সহিত কথাবার্তা বলা, ইহার তিনটি পর্যায় রহিয়াছে:
১। ওহী (ইশারা) দ্বারা কথা বলা। অর্থাৎ অন্তরে শব্দ ও ধ্বনি ব্যতিরেকে কোন ভাব আসিয়া যাওয়া। ইহা জাগ্রত অবস্থায় হইলে তাহাকে কাশফ, আর ঘুমের মধ্যে হইলে তাহাকে স্বপ্ন বলা হয়।
২। আল্লাহ্ তা'আলার পর্দার অন্তরাল হইতে কথা বলা। অর্থাৎ কে বলিতেছেন তাহা গোচরীভূত হয় না কিন্তু অদৃশ্য হইতে শব্দ আসে এবং তাহা শ্রবণযোগ্য। ইহা হইল ইলহাম।
৩। ফেরেশতার মাধ্যমে কথা বলা। অর্থাৎ ফেরেশতা আল্লাহ্ তা'আলার বার্তা লইয়া সামনে আসেন। তাহার মুখ দিয়া যেই কথা বাহির হয় তাহা নবী মুখস্থ করিয়া ফেলেন। সাধারণ অর্থে ইহাকে ওহী বলা হয়। কারণ আল-কুরআন এই শেষ পন্থায়ই অবতীর্ণ হইয়াছে। ওহীর এই তিন প্রকারের উল্লেখ নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা প্রতিভাত হয়:
وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ تُكَلِّمَهُ اللهُ إِلَّا وَحْيَا أَوْ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ إِنَّهُ عَلَى حَكِيمٌ.
"মানুষের এমন মর্যাদা নাই যে, আল্লাহ্ তাহার সহিত কথা বলিবেন ওহীর মাধ্যম ব্যতিরেকে অথবা পর্দার অন্তরাল ব্যতিরেকে অথবা এমন দূত প্রেরণ ব্যতিরেকে, যেই দূত তাঁহার অনুমতিক্রমে তিনি যাহা চাহেন তাহা ব্যক্ত করেন; তিনি সমুন্নত, প্রজ্ঞাময়" (৪২: ৫১)।
আল্লাহ্র সহিত কথা বলিবার এই তিনটি পন্থাঃ ওহী বা ইঙ্গিতে কথা বলা, পর্দার অন্তরালে কথা বলা, ফেরেশতার মাধ্যমে কথা বলা। ওহী হিসাবে এই তিনটি প্রকার পৃথক পৃথকভাবে বুঝানো হইয়াছে। সংক্ষিপ্তভাবে এই তিন শ্রেণীর নামই ওহী। বর্ণিত তিনটি পন্থার যে কোন একটি দ্বারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে গায়বী শিক্ষাদান করা হইয়াছে (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ৪০-৪৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00