📄 মানবজাতির মধ্যে নবী-রাসূল প্রেরণের কারণ
মানবজাতির মধ্যে নবী-রাসূল প্রেরণের কারণ
যেই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য জগতের প্রতিটি অণু-পরমাণু সৃষ্টি করা হইয়াছে তাহা নিজস্ব ইচ্ছা ও সংকল্প ব্যতিরেকেই স্বভাবতই যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করিয়া চলিতেছে। সৃষ্টি লগ্নে স্রষ্টা যেই নির্দেশ প্রদান করিয়াছিলেন তাহা মান্য করিতে কোন বস্তুই চুল পরিমাণও ত্রুটি করিতেছে না। নভোমণ্ডল হইতে ভূমণ্ডল পর্যন্ত বিস্তৃত সকল জিনিস নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে ব্রতী রহিয়াছে। সূর্য পৃথিবীকে তাপ ও আলো দানের কাজে নিয়োজিত। ভূমি সবুজ শ্যামল থাকিবার কাজে ব্যস্ত। মেঘপূঞ্জ পানি দান ও সিক্তকরণের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করিয়া যাইতেছে। বৃক্ষ নির্দেশমত ফলমূল দানে রত রহিয়াছে। প্রাণীকুলের উপর যেই ভার ন্যস্ত করা হইয়াছে তাহারা সানন্দে তাহা পালন করিয়া যাইতেছে। ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে মানবজাতির উপর অনুরূপ কোন দায়িত্ব অর্পণ করা হইয়াছে কিনা? যদি করা হইয়া থাকে তাহা হইলে তাহারা ইহা কি সম্পাদন করিতেছে?
বাহ্যত মানুষ খানাপিনা, হাঁটাচলা ও উঠাবসা করিয়া জীবন যাপন করিতেছে। এক সময় সে ইন্তিকালও করিতেছে। এখানেই কি মানব জীবনের সমাপ্তি? যদি তাহাই হয় তাহা হইলে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে কি পার্থক্য? ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন ও ইচ্ছাশক্তিহীনের মধ্যে তফাৎটি কি, বুদ্ধিমান ও নির্বোধের মধ্যে ফারাক কোথায়? এইজন্যই আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا (المؤمنون - ١١٥). "তোমরা কি মনে করিয়াছিলে যে, আমি তোমাদিগকে অনর্থক সৃষ্টি করিয়াছি" (২৩: ১১৫)।
أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَنْ يُتْرَكَ سُدًى (القيامة - ৩৬) . "মানুষকি মনে করে যে, তাহাকে নিরর্থক ছাড়িয়া দেওয়া হইবে" (৭৫: ৩৬)।
আয়াত দুইটির মমার্থ হইতে বুঝা যায় মানুষ কোন উদ্দেশ্যে ও লক্ষ্যে সৃজিত হইয়াছে। সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি? মানুষের সার্বিক অস্তিত্বও যদি ভূমণ্ডল হইতে নিশ্চিহ্ন হইয়া যায় তাহা হইলেও সূর্য সমভাবে আলো দিতে থাকিবে, সমুদ্র তরঙ্গায়িত হইতে থাকিবে, বাতাস বহিতে থাকিবে, পানি বর্ষিত হইবে, সবুজ তৃণলতা একইভাবে উদগত হইবে, বৃক্ষ ফল-ফলাদি দান করিবে। পক্ষান্তরে যদি বৃক্ষ ফল দান না করে, তৃণলতা উৎপন্ন না হয়, পানি বর্ষিত না হয়, বায়ু প্রবাহিত না হয় তাহা হইলে মানুষ মৃত্যুপথের যাত্রী হইবে। ভূমণ্ডল না হইলে মানুষ দাঁড়াইবারও স্থান পাইবে না। সূর্য উদিত না হইলে মনুষের অস্তিত্বের বাতি নির্বাপিত হইয়া পড়িবে। মোটকথা, পৃথিবীর কোন জিনিস তাহার অস্তিত্ব বিকাশের জন্য মানুষের মুখাপেক্ষী নয়, কিন্তু মানুষ নিজের অস্তিত্ব বিকাশের জন্য নিখিলবিশ্বের প্রতিটি বস্তুর মুখাপেক্ষী। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, এই জগতের প্রতিটি জিনিসের সৃষ্টির উদ্দেশ্য হইল মানুষের অস্তিত্ব টিকাইয়া রাখা। কিন্তু মানুষের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য হইল অন্য কোন গুরুত্ববহ বিষয়। অন্যান্য সৃষ্টিকুল সম্পর্কে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا (البقرة - ৩৪). "তিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন” (২: ২৯)
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ (الحج - ৬৫). "তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করিয়াছেন পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে তৎসমুদয়কে" (২২: ৬৫)।
ভূমণ্ডলে যাহা কিছু রহিয়াছে তাহার কথা উল্লেখ করিবার পর নভোমণ্ডল সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَسَخَّرَ لَكُمُ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتِ بِأَمْرِهِ (النحل -১২). "তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করিয়াছেন রজনী, দিবস, সূর্য এবং চন্দ্রকে। আর নক্ষত্ররাজিও অধীন হইয়াছে তাঁহারই নির্দেশে” (১৬: ১২)।
লক্ষণীয় যে, সৃষ্টিকুলের অধস্থন বস্তু তাহার তুলনায় উর্দ্ধতনের সেবা করিতেছে। জড়জগৎ উদ্ভিদ জগতের, উদ্ভিদ জগৎ প্রাণী জগতের, আবার জড়, উদ্ভিদ ও প্রাণী এই তিন জগতই মানবজাতির কল্যাণ সাধনে নিয়োজিত। তাই মানবজাতিকেও উন্নততর কোন অস্তিত্বের কাজে রত থাকা উচিৎ। সৃষ্টিকূলে মানবজাতির ঊর্ধ্বে কোন কিছুর অস্তিত্ব নাই। ফলে তাহার সৃষ্টি স্বয়ং স্রষ্টার জন্যই। যেমন ইরশাদ হইয়াছে।
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُون (الذاريات - ٥٦) . “আমি সৃষ্টি করিয়াছি জিন এবং মানুষকে এইজন্য যে, তাহারা আমারই ইবাদত করিবে” (৫১:৫৬)।
সৃষ্টিজগৎ মূলত তিন শ্রেণীতে বিভক্ত: (এক) যাহা বুদ্ধি-বিবেকও কল্পনাশক্তি হইতে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। যেমন, চন্দ্র সূর্য, পৃথিবী, পাথর, মাটি, বৃক্ষ ও ফলমূল।
(দুই) যাহাদের প্রাথমিক অনুভূতি ও বিবেকবুদ্ধি রহিয়াছে কিন্তু চিন্তালব্ধ সিদ্ধান্ত কিংবা উদাহরণ ও উপাত্তকে অবলম্বন করিয়া নূতন কিছুর আবিষ্কার করা তাহাদের ক্ষমতা বহির্ভূত। তাহাদের ইচ্ছা ও অনুভূতি কেবলমাত্র দৃশ্যমান বস্তু পর্যন্ত সীমিত। যেমন প্রাণী জগৎ।
(তিন) যেই জগৎ বিবেক-বুদ্ধি এবং চিন্তাশক্তি সম্পন্ন। তাহারা গবেষণা করে, অনুসন্ধান ও দৃষ্টান্ত অবলম্বনে জীবন সমস্যার সমাধান করিতে পারে। ক্ষুদ্র হইতে বৃহৎ ও বৃহৎ হইতে ক্ষুদ্র বস্তু আবিষ্কার করে। কল্পনাশক্তির সাহায্যে নূতন বাস্তবতায় উপনীত হয়। প্রথম প্রকার সৃষ্টি হইতে যেই গতি ও লক্ষণাদি প্রকাশ পায় তাহা বাধ্যতামূলক অনিচ্ছাকৃত সমভাবে স্থায়ী। এই কারণে তাহাদের এই গুণকে সৃষ্টিগত শক্তি ও স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য বলা হয়। দ্বিতীয় প্রকার সৃষ্টি হইতে যেই সকল প্রভাব ও গতি পরিলক্ষিত হয় তাহা ইচ্ছা, অনুভূতি ও প্রাথমিক বোধ-জ্ঞানের অধীন। তাহাদের প্রত্যেকের কাজে স্পন্দন ও গতিময়তা সমভাবে প্রকাশ পায়। এই নিয়মতান্ত্রিকতায় ব্যতিক্রম হয় না। উহাদের কাজ ও গতিময়তাকে তাহাদের সহজাত স্বভাব বলিয়া আখ্যায়িত করা হয়। ইহার বাহিরে কোন কাজ করিবার শক্তি ইহাদের নাই। তৃতীয় শ্রেণীর মাখলুকের কিছু কিছু কর্মকাণ্ড অন্যান্য শ্রেণীর মাখলুকাতের মতই স্বভাবজাত, তবুও তাহাদের বহু কাজ এমনও রহিয়াছে যাহা কেবল তাহাদের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষায় ঘটিয়া থাকে। এই শ্রেণীর কাজের ভিত্তিতেই মঙ্গল-অমঙ্গল ও পাপ-পূণ্য নির্ণীত হয়। তাহাদের সার্বিক বুদ্ধিমত্তার কাজ, পরিণামদর্শিতা ও কাজের ভালমন্দ তাহাদের ইচ্ছারই প্রতিফলন। ইহার ফলেই তাহাদের উপর দায়িত্বশীলতা আরোপিত হয়। মানব ও জিন্ন ব্যতিরেকে সকল প্রাণী ভাল-মন্দের দায়িত্ব হইতে মুক্ত। জড় ও উদ্ভিদ জগৎ সর্বদিক দিয়া বাধ্য। প্রাণী জগতের সকল কাজও স্বভাব জাত। ফলে তাহারাও দায়িত্বশীলতা হইতে মুক্ত। ফেরেশতাগণও সৃষ্টিগত স্বভাব অনুযায়ী কেবল আল্লাহর আনুগত্যে বাধ্য। তাহাদের দ্বারা কোন গুনাহের কাজ সংঘটিত হয় না। তাই তাহারাও যিম্মাদারি হইতে মুক্ত।
কেবল মানুষ ও জিনই এমন মাখলুক যাহার অনেক কথা ও কাজে নিজ নিজ ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা ও জ্ঞানানুশীলনের বিকাশ দেখা যায়। পাপ ও পুণ্য এবং মঙ্গল ও অমঙ্গল উভয় প্রকার কার্যের কোন একটির ব্যাপারে মানুষ বাধ্য নয়। মানুষ বুদ্ধিমত্তা ও অনুধাবন শক্তির সাহায্যে কাজের পরিণাম বুঝিয়া কার্য সম্পাদন করে। এইজন্য সত্য-মিথ্যা ও ভাল-মন্দের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের জন্য মানুষ আল্লাহ্ প্রদত্ত ওহীর মুখাপেক্ষী। জড়জগৎ, উদ্ভিদ জগৎ ও অন্যান্য সৃষ্টি আল্লাহ্ পাকের নির্দেশ পালনে বাধ্য, তাহা আল-কুরআনে এইভাবে তুলিয়া ধরা হইয়াছে:
وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مِنْ دَابَّةٍ وَالْمَلَائِكَةُ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ. (النحل - ٤٩ ) .
"আল্লাহকেই সিজদা করে যাহা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে, পৃথিবীতে যত জীবজন্তু আছে সে সমস্ত এবং ফেরেশতাগণও; উহারা অহংকার করে না" (১৬ : ৪৯)।
এই সহজাত আনুগত্যকে সৃষ্টিগত ওহীও বলা চলে। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا وَمِنَ الشَّجَرِ وَمِمَّا يَعْرِشُونَ. ثُمَّ على مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ فَاسْلُكِي سُبُلَ رَبِّكَ ذُلُلاً (النحل - ٦٨) .
"তোমার প্রতিপালক মৌমাছিকে উহার অন্তরে ইংগিত দ্বারা নির্দেশ দিয়াছেন, গৃহ নির্মাণ কর পাহাড়ে, বৃক্ষে ও মানুষ যে গৃহ নির্মাণ করে তাহাতে, ইহার পর প্রত্যেক ফল হইতে কিছু কিছু আহার কর, অতঃপর তোমার প্রতিপালকের সহজ অনুসরণ কর" (২৬ : ৬৮-৬৯)।
এই আয়াতে সহজাত ইলহামকে বাধ্যতামূলক আল্লাহ পাকের আনুগত্য হিসাবে চিত্রায়িত করা হইয়াছে। অন্যত্র তাহাদেরকে স্বীয় সৃষ্টিকর্তার এই হুকুমকে সহজাতভাবে পালন করিবার অবস্থাকে সালাত ও তাসবীহ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللهَ يُسَبِّحُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالطَّيْرُ صُفْتِ كُلٌّ قَدْ عَلِمَ صَلَاتَهُ وَتَسْبِيحَهُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِمَا يَفْعَلُوْنَ (النور - ٤١) .
"তুমি কি দেখ না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যাহারা আছে তাহারা এবং উড্ডীয়মান বিহংগকুল আল্লাহ্র পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই জানে তাহার ইবাদতের ও পবিত্রতা ঘোষণার পদ্ধতি এবং উহারা যাহা করে সে বিষয়ে আল্লাহ্ সম্যক জ্ঞাত" (২৪ : ৪১)।
কিন্তু মানবজাতিকে অন্যান্য মাখলুকাতের মত নিছক মুখাপেক্ষী করিয়া সৃষ্টি করা হয় নাই। তাহার উপর জগতের মত আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্য প্রকাশের বাধ্যতামূলক বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয় নাই, বরং ইচ্ছাগত আনুগত্যের জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَنْ يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنْسَانُ (الاحزاب -৭২).
"আমি তো আসমান, যমীন ও পর্বতমালার প্রতি এই আমানত পেশ করিয়াছিলাম, উহারা ইহা বহন করিতে অস্বীকার করিল এবং উহাতে শংকিত হইল, কিন্তু মানুষ উহা বহন করিল" (৩৩ঃ ৭২)।
এই আমানত হইতেছে পাপ-পুণ্য ও ভাল-মন্দের বিচার-বিশ্লেষণের জ্ঞানের নাম, যাহার ভিত্তিতে আল্লাহ্ বিধান নাযিল করা হইয়াছে। এই আমানতের যিম্মাদারি পরিপূর্ণভাবে আদায় করিবার লক্ষ্যে মানুষের জন্য ইচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ড ও অনিচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ডের মত আল্লাহ পাকের বিধানাবলীর অনুসরণ করা আবশ্যক। অর্থাৎ যেইভাবে অনিচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ডে সহজাত অনুভূতির মাধ্যমে আল্লাহ পাকের নির্দেশাবলী সুষ্ঠুভাবে পালন করা হয় সেইভাবে ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগ করিয়া স্বেচ্ছায় শরী'আতের বিধানাবলী পালন করিয়া পরিপূর্ণভাবে আমানতের যিম্মাদারি আদায় করা কর্তব্য।
কিন্তু কাহারও প্রতি আনুগত্য প্রকাশ সেই পর্যন্ত সম্ভব নয় যতক্ষণ পর্যন্ত তাহার আদেশ-নিষেধ ও বিধিবিধান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত না হওয়া যায়। তাই নবী ও রাসূলের উপরই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় আহকাম ও বিধানাবলীর ওহী প্রেরণ করেন। তাহারা ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন বান্দাদেরকে এই সম্পর্কে সচেতন করেন এবং আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্য প্রকাশের আহবান জানান। সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করিলে প্রতীয়মান হয় যে, মানব ব্যতীত সকল সৃষ্টিজগৎ আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য সহজাত প্রবৃত্তির দ্বারা স্বীকার করিয়া চলিতেছে। কিন্তু পরিমিত ইচ্ছাশক্তির অধিকারী মানুষ বহু ক্ষেত্রে স্বীয় সৃষ্টিকর্তার নির্দেশের বিরোধিতা করিবার প্রয়াস পায়। এই অবস্থা আল-কুরআনে এইভাবে ইরশাদ হইয়াছে:
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوابُ وَكَثِيرٌ مِّنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ (الحج - ۱۸).
"তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যাহা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে, আবার অনেকের প্রতি অবধারিত হইয়াছে শাস্তি" (২২:১৮)।
লক্ষণীয় বিষয় হইল, মানুষ ব্যতীত ইচ্ছাশক্তি ও বুদ্ধিমত্তাহীন অন্যান্য সকল মাখলুক আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য প্রকাশ করে। কিন্তু জ্ঞানবান পরিণামদর্শী ও ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন মানুষ আনুগত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে দ্বিধাবিভক্ত হইয়া পড়িয়াছে। ইহাদের একদল হইতেছে অনুগত বান্দা আর অপর দল হইতেছে পাপাচারী। যাহারা সর্বযুগে নবী-রাসূলের অনুগামী ছিল তাহারা হইল আল্লাহর অনুগত বান্দা। আর যাহারা স্ব-স্ব যুগে নবীর আনীত বিধানের প্রতি ঈমান আনে নাই ও তদনুযায়ী আমল করে নাই তাহারা হইল অবাধ্য পাপাচারী (শিবলী নু'মানী-সুলায়মান নাদবী,, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩-২৭)।
মানবজাতির মধ্যে নবী-রাসূল প্রেরণের কারণ
যেই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য জগতের প্রতিটি অণু-পরমাণু সৃষ্টি করা হইয়াছে তাহা নিজস্ব ইচ্ছা ও সংকল্প ব্যতিরেকেই স্বভাবতই যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করিয়া চলিতেছে। সৃষ্টি লগ্নে স্রষ্টা যেই নির্দেশ প্রদান করিয়াছিলেন তাহা মান্য করিতে কোন বস্তুই চুল পরিমাণও ত্রুটি করিতেছে না। নভোমণ্ডল হইতে ভূমণ্ডল পর্যন্ত বিস্তৃত সকল জিনিস নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে ব্রতী রহিয়াছে। সূর্য পৃথিবীকে তাপ ও আলো দানের কাজে নিয়োজিত। ভূমি সবুজ শ্যামল থাকিবার কাজে ব্যস্ত। মেঘপূঞ্জ পানি দান ও সিক্তকরণের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করিয়া যাইতেছে। বৃক্ষ নির্দেশমত ফলমূল দানে রত রহিয়াছে। প্রাণীকুলের উপর যেই ভার ন্যস্ত করা হইয়াছে তাহারা সানন্দে তাহা পালন করিয়া যাইতেছে। ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে মানবজাতির উপর অনুরূপ কোন দায়িত্ব অর্পণ করা হইয়াছে কিনা? যদি করা হইয়া থাকে তাহা হইলে তাহারা ইহা কি সম্পাদন করিতেছে?
বাহ্যত মানুষ খানাপিনা, হাঁটাচলা ও উঠাবসা করিয়া জীবন যাপন করিতেছে। এক সময় সে ইন্তিকালও করিতেছে। এখানেই কি মানব জীবনের সমাপ্তি? যদি তাহাই হয় তাহা হইলে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে কি পার্থক্য? ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন ও ইচ্ছাশক্তিহীনের মধ্যে তফাৎটি কি, বুদ্ধিমান ও নির্বোধের মধ্যে ফারাক কোথায়? এইজন্যই আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا (المؤمنون - ١١٥). "তোমরা কি মনে করিয়াছিলে যে, আমি তোমাদিগকে অনর্থক সৃষ্টি করিয়াছি" (২৩: ১১৫)।
أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَنْ يُتْرَكَ سُدًى (القيامة - ৩৬) . "মানুষকি মনে করে যে, তাহাকে নিরর্থক ছাড়িয়া দেওয়া হইবে" (৭৫: ৩৬)।
আয়াত দুইটির মমার্থ হইতে বুঝা যায় মানুষ কোন উদ্দেশ্যে ও লক্ষ্যে সৃজিত হইয়াছে। সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি? মানুষের সার্বিক অস্তিত্বও যদি ভূমণ্ডল হইতে নিশ্চিহ্ন হইয়া যায় তাহা হইলেও সূর্য সমভাবে আলো দিতে থাকিবে, সমুদ্র তরঙ্গায়িত হইতে থাকিবে, বাতাস বহিতে থাকিবে, পানি বর্ষিত হইবে, সবুজ তৃণলতা একইভাবে উদগত হইবে, বৃক্ষ ফল-ফলাদি দান করিবে। পক্ষান্তরে যদি বৃক্ষ ফল দান না করে, তৃণলতা উৎপন্ন না হয়, পানি বর্ষিত না হয়, বায়ু প্রবাহিত না হয় তাহা হইলে মানুষ মৃত্যুপথের যাত্রী হইবে। ভূমণ্ডল না হইলে মানুষ দাঁড়াইবারও স্থান পাইবে না। সূর্য উদিত না হইলে মনুষের অস্তিত্বের বাতি নির্বাপিত হইয়া পড়িবে। মোটকথা, পৃথিবীর কোন জিনিস তাহার অস্তিত্ব বিকাশের জন্য মানুষের মুখাপেক্ষী নয়, কিন্তু মানুষ নিজের অস্তিত্ব বিকাশের জন্য নিখিলবিশ্বের প্রতিটি বস্তুর মুখাপেক্ষী। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, এই জগতের প্রতিটি জিনিসের সৃষ্টির উদ্দেশ্য হইল মানুষের অস্তিত্ব টিকাইয়া রাখা। কিন্তু মানুষের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য হইল অন্য কোন গুরুত্ববহ বিষয়। অন্যান্য সৃষ্টিকুল সম্পর্কে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا (البقرة - ৩৪). "তিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন” (২: ২৯)
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ (الحج - ৬৫). "তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করিয়াছেন পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে তৎসমুদয়কে" (২২: ৬৫)।
ভূমণ্ডলে যাহা কিছু রহিয়াছে তাহার কথা উল্লেখ করিবার পর নভোমণ্ডল সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَسَخَّرَ لَكُمُ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتِ بِأَمْرِهِ (النحل -১২). "তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করিয়াছেন রজনী, দিবস, সূর্য এবং চন্দ্রকে। আর নক্ষত্ররাজিও অধীন হইয়াছে তাঁহারই নির্দেশে” (১৬: ১২)।
লক্ষণীয় যে, সৃষ্টিকুলের অধস্থন বস্তু তাহার তুলনায় উর্দ্ধতনের সেবা করিতেছে। জড়জগৎ উদ্ভিদ জগতের, উদ্ভিদ জগৎ প্রাণী জগতের, আবার জড়, উদ্ভিদ ও প্রাণী এই তিন জগতই মানবজাতির কল্যাণ সাধনে নিয়োজিত। তাই মানবজাতিকেও উন্নততর কোন অস্তিত্বের কাজে রত থাকা উচিৎ। সৃষ্টিকূলে মানবজাতির ঊর্ধ্বে কোন কিছুর অস্তিত্ব নাই। ফলে তাহার সৃষ্টি স্বয়ং স্রষ্টার জন্যই। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُون (الذاريات - ٥٦) . “আমি সৃষ্টি করিয়াছি জিন এবং মানুষকে এইজন্য যে, তাহারা আমারই ইবাদত করিবে” (৫১:৫৬)।
সৃষ্টিজগৎ মূলত তিন শ্রেণীতে বিভক্ত: (এক) যাহা বুদ্ধি-বিবেকও কল্পনাশক্তি হইতে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। যেমন, চন্দ্র সূর্য, পৃথিবী, পাথর, মাটি, বৃক্ষ ও ফলমূল।
(দুই) যাহাদের প্রাথমিক অনুভূতি ও বিবেকবুদ্ধি রহিয়াছে কিন্তু চিন্তালব্ধ সিদ্ধান্ত কিংবা উদাহরণ ও উপাত্তকে অবলম্বন করিয়া নূতন কিছুর আবিষ্কার করা তাহাদের ক্ষমতা বহির্ভূত। তাহাদের ইচ্ছা ও অনুভূতি কেবলমাত্র দৃশ্যমান বস্তু পর্যন্ত সীমিত। যেমন প্রাণী জগৎ।
(তিন) যেই জগৎ বিবেক-বুদ্ধি এবং চিন্তাশক্তি সম্পন্ন। তাহারা গবেষণা করে, অনুসন্ধান ও দৃষ্টান্ত অবলম্বনে জীবন সমস্যার সমাধান করিতে পারে। ক্ষুদ্র হইতে বৃহৎ ও বৃহৎ হইতে ক্ষুদ্র বস্তু আবিষ্কার করে। কল্পনাশক্তির সাহায্যে নূতন বাস্তবতায় উপনীত হয়। প্রথম প্রকার সৃষ্টি হইতে যেই গতি ও লক্ষণাদি প্রকাশ পায় তাহা বাধ্যতামূলক অনিচ্ছাকৃত সমভাবে স্থায়ী। এই কারণে তাহাদের এই গুণকে সৃষ্টিগত শক্তি ও স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য বলা হয়। দ্বিতীয় প্রকার সৃষ্টি হইতে যেই সকল প্রভাব ও গতি পরিলক্ষিত হয় তাহা ইচ্ছা, অনুভূতি ও প্রাথমিক বোধ-জ্ঞানের অধীন। তাহাদের প্রত্যেকের কাজে স্পন্দন ও গতিময়তা সমভাবে প্রকাশ পায়। এই নিয়মতান্ত্রিকতায় ব্যতিক্রম হয় না। উহাদের কাজ ও গতিময়তাকে তাহাদের সহজাত স্বভাব বলিয়া আখ্যায়িত করা হয়। ইহার বাহিরে কোন কাজ করিবার শক্তি ইহাদের নাই। তৃতীয় শ্রেণীর মাখলুকের কিছু কিছু কর্মকাণ্ড অন্যান্য শ্রেণীর মাখলুকাতের মতই স্বভাবজাত, তবুও তাহাদের বহু কাজ এমনও রহিয়াছে যাহা কেবল তাহাদের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষায় ঘটিয়া থাকে। এই শ্রেণীর কাজের ভিত্তিতেই মঙ্গল-অমঙ্গল ও পাপ-পূণ্য নির্ণীত হয়। তাহাদের সার্বিক বুদ্ধিমত্তার কাজ, পরিণামদর্শিতা ও কাজের ভালমন্দ তাহাদের ইচ্ছারই প্রতিফলন। ইহার ফলেই তাহাদের উপর দায়িত্বশীলতা আরোপিত হয়। মানব ও জিন্ন ব্যতিরেকে সকল প্রাণী ভাল-মন্দের দায়িত্ব হইতে মুক্ত। জড় ও উদ্ভিদ জগৎ সর্বদিক দিয়া বাধ্য। প্রাণী জগতের সকল কাজও স্বভাব জাত। ফলে তাহারাও দায়িত্বশীলতা হইতে মুক্ত। ফেরেশতাগণও সৃষ্টিগত স্বভাব অনুযায়ী কেবল আল্লাহর আনুগত্যে বাধ্য। তাহাদের দ্বারা কোন গুনাহের কাজ সংঘটিত হয় না। তাই তাহারাও যিম্মাদারি হইতে মুক্ত।
কেবল মানুষ ও জিনই এমন মাখলুক যাহার অনেক কথা ও কাজে নিজ নিজ ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা ও জ্ঞানানুশীলনের বিকাশ দেখা যায়। পাপ ও পুণ্য এবং মঙ্গল ও অমঙ্গল উভয় প্রকার কার্যের কোন একটির ব্যাপারে মানুষ বাধ্য নয়। মানুষ বুদ্ধিমত্তা ও অনুধাবন শক্তির সাহায্যে কাজের পরিণাম বুঝিয়া কার্য সম্পাদন করে। এইজন্য সত্য-মিথ্যা ও ভাল-মন্দের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের জন্য মানুষ আল্লাহ্ প্রদত্ত ওহীর মুখাপেক্ষী। জড়জগৎ, উদ্ভিদ জগৎ ও অন্যান্য সৃষ্টি আল্লাহ্ পাকের নির্দেশ পালনে বাধ্য, তাহা আল-কুরআনে এইভাবে তুলিয়া ধরা হইয়াছে:
وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مِنْ دَابَّةٍ وَالْمَلَائِكَةُ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ. (النحل - ٤٩ ) .
"আল্লাহকেই সিজদা করে যাহা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে, পৃথিবীতে যত জীবজন্তু আছে সে সমস্ত এবং ফেরেশতাগণও; উহারা অহংকার করে না" (১৬ : ৪৯)।
এই সহজাত আনুগত্যকে সৃষ্টিগত ওহীও বলা চলে। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا وَمِنَ الشَّجَرِ وَمِمَّا يَعْرِشُونَ. ثُمَّ على مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ فَاسْلُكِي سُبُلَ رَبِّكَ ذُلُلاً (النحل - ٦٨) .
"তোমার প্রতিপালক মৌমাছিকে উহার অন্তরে ইংগিত দ্বারা নির্দেশ দিয়াছেন, গৃহ নির্মাণ কর পাহাড়ে, বৃক্ষে ও মানুষ যে গৃহ নির্মাণ করে তাহাতে, ইহার পর প্রত্যেক ফল হইতে কিছু কিছু আহার কর, অতঃপর তোমার প্রতিপালকের সহজ অনুসরণ কর" (২৬ : ৬৮-৬৯)।
এই আয়াতে সহজাত ইলহামকে বাধ্যতামূলক আল্লাহ পাকের আনুগত্য হিসাবে চিত্রায়িত করা হইয়াছে। অন্যত্র তাহাদেরকে স্বীয় সৃষ্টিকর্তার এই হুকুমকে সহজাতভাবে পালন করিবার অবস্থাকে সালাত ও তাসবীহ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللهَ يُسَبِّحُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالطَّيْرُ صُفْتِ كُلٌّ قَدْ عَلِمَ صَلَاتَهُ وَتَسْبِيحَهُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِمَا يَفْعَلُوْنَ (النور - ٤١) .
"তুমি কি দেখ না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যাহারা আছে তাহারা এবং উড্ডীয়মান বিহংগকুল আল্লাহ্র পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই জানে তাহার ইবাদতের ও পবিত্রতা ঘোষণার পদ্ধতি এবং উহারা যাহা করে সে বিষয়ে আল্লাহ্ সম্যক জ্ঞাত" (২৪ : ৪১)।
কিন্তু মানবজাতিকে অন্যান্য মাখলুকাতের মত নিছক মুখাপেক্ষী করিয়া সৃষ্টি করা হয় নাই। তাহার উপর জগতের মত আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্য প্রকাশের বাধ্যতামূলক বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয় নাই, বরং ইচ্ছাগত আনুগত্যের জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَنْ يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنْسَانُ (الاحزاب -৭২).
"আমি তো আসমান, যমীন ও পর্বতমালার প্রতি এই আমানত পেশ করিয়াছিলাম, উহারা ইহা বহন করিতে অস্বীকার করিল এবং উহাতে শংকিত হইল, কিন্তু মানুষ উহা বহন করিল" (৩৩ঃ ৭২)।
এই আমানত হইতেছে পাপ-পুণ্য ও ভাল-মন্দের বিচার-বিশ্লেষণের জ্ঞানের নাম, যাহার ভিত্তিতে আল্লাহ্ বিধান নাযিল করা হইয়াছে। এই আমানতের যিম্মাদারি পরিপূর্ণভাবে আদায় করিবার লক্ষ্যে মানুষের জন্য ইচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ড ও অনিচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ডের মত আল্লাহ পাকের বিধানাবলীর অনুসরণ করা আবশ্যক। অর্থাৎ যেইভাবে অনিচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ডে সহজাত অনুভূতির মাধ্যমে আল্লাহ পাকের নির্দেশাবলী সুষ্ঠুভাবে পালন করা হয় সেইভাবে ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগ করিয়া স্বেচ্ছায় শরী'আতের বিধানাবলী পালন করিয়া পরিপূর্ণভাবে আমানতের যিম্মাদারি আদায় করা কর্তব্য।
কিন্তু কাহারও প্রতি আনুগত্য প্রকাশ সেই পর্যন্ত সম্ভব নয় যতক্ষণ পর্যন্ত তাহার আদেশ-নিষেধ ও বিধিবিধান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত না হওয়া যায়। তাই নবী ও রাসূলের উপরই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় আহকাম ও বিধানাবলীর ওহী প্রেরণ করেন। তাহারা ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন বান্দাদেরকে এই সম্পর্কে সচেতন করেন এবং আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্য প্রকাশের আহবান জানান। সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করিলে প্রতীয়মান হয় যে, মানব ব্যতীত সকল সৃষ্টিজগৎ আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য সহজাত প্রবৃত্তির দ্বারা স্বীকার করিয়া চলিতেছে। কিন্তু পরিমিত ইচ্ছাশক্তির অধিকারী মানুষ বহু ক্ষেত্রে স্বীয় সৃষ্টিকর্তার নির্দেশের বিরোধিতা করিবার প্রয়াস পায়। এই অবস্থা আল-কুরআনে এইভাবে ইরশাদ হইয়াছে:
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوابُ وَكَثِيرٌ مِّنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ (الحج - ۱۸).
"তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যাহা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে, আবার অনেকের প্রতি অবধারিত হইয়াছে শাস্তি" (২২:১৮)।
লক্ষণীয় বিষয় হইল, মানুষ ব্যতীত ইচ্ছাশক্তি ও বুদ্ধিমত্তাহীন অন্যান্য সকল মাখলুক আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য প্রকাশ করে। কিন্তু জ্ঞানবান পরিণামদর্শী ও ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন মানুষ আনুগত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে দ্বিধাবিভক্ত হইয়া পড়িয়াছে। ইহাদের একদল হইতেছে অনুগত বান্দা আর অপর দল হইতেছে পাপাচারী। যাহারা সর্বযুগে নবী-রাসূলের অনুগামী ছিল তাহারা হইল আল্লাহর অনুগত বান্দা। আর যাহারা স্ব-স্ব যুগে নবীর আনীত বিধানের প্রতি ঈমান আনে নাই ও তদনুযায়ী আমল করে নাই তাহারা হইল অবাধ্য পাপাচারী (শিবলী নু'মানী-সুলায়মান নাদবী,, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩-২৭)।
📄 নবী ও অন্যান্য কল্যাণকামীদের মধ্যে তুলনা
নবী ও অন্যান্য কল্যাণকর্মীদের মধ্যে তুলনা
মানব সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের কাজ তো একজন রাষ্ট্রনায়ক করিতে পারেন, চরিত্রবান একজন শিক্ষকও করিতে সক্ষম, এমনকি একজন বৈজ্ঞানিক কিংবা একজন বিচারকও করিতে পারেন। সুতরাং এই কাজের জন্য নবী-রাসূল প্রেরণের হেতু কি? এই বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে যেই বিরাট পার্থক্য রহিয়াছে তাহা অনুধাবনের মধ্যেই এই প্রশ্নের জবাব নিহিত রহিয়াছে। লক্ষণীয় যে, বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞগণ একই জিনিসের প্রতি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ হইতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া থাকেন। দৃষ্টিকোণের বিভিন্নতার কারণেই তাহাদের গবেষণার বিষয়ও পৃথক পৃথক হইয়া যায়। পদার্থের গঠন, ধর্ম ও ক্রিয়া-বিক্রিয়া লইয়া গবেষণা করিলে, তাহা হয় রসায়ন শাস্ত্র। প্রাণী দেহের জীবন ও উপকরণ লইয়া গবেষণা করিলে তাহা হয় প্রাণী বিজ্ঞান। মানসিক শক্তি ও ইহার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া লইয়া গবেষণা করিলে তাহা হয় মনোবিজ্ঞান। মানব জীবনের গতি-প্রকৃতি, ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিগত কার্যকলাপের সীমা ও ইহার কারণ ও পরিণতি সম্পর্কে গবেষণা করিলে তাহা হয় নীতিবিজ্ঞান। মানুষের সামজিক বৈশিষ্ট্যাবলী ও প্রয়োজনাদি সম্পর্কে গবেষণা করা হইলে ইহাকে সমাজবিজ্ঞান বলা হয়। শরীরের সুস্থতা ও অসুস্থতা লইয়া গবেষণা করা হইলে ইহাকে চিকিৎসা বিজ্ঞান বলা হয়। লক্ষণীয়, একটিমাত্র দেহ কিংবা দেহ সম্পর্কিত জিনিসের উপর গবেষণা হইতে বিভিন্ন শাস্ত্রের উদ্ভব হইয়াছে। এই সকল শাস্ত্রের উৎস কিন্তু দেহ। তবে শাস্ত্রগুলি স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত এবং বিশেষজ্ঞগণও পৃথক পৃথক।
অনুরূপ নবী-রাসূলের কাজ ও রাজা-বাদশাহ্ দার্শনিকও বৈজ্ঞানিকগণের ন্যায় মানুষেরই সংশোধনের লক্ষ্যে পরিচালিত, কিন্তু তাহাদের কাহারও কাজ অপরের কাজের সহিত অভিন্ন নয়। রাজা-বাদশাহবা রাষ্ট্রনায়কের দায়িত্ব হইল নিজের বাহুবল ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। দার্শনিক মানুষের কাজকর্ম ও চিন্তা-চেতনার কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ধারণের প্রচেষ্টা চালান এবং ব্যবহারিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে যুক্তি নির্ভর সমাধানে পৌছিবার চেষ্টা করেন। তেমনি একজন নীতিশাস্ত্রবিদ চরিত্র সম্পর্কিত বিষয়াবলী ও ইহার গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৎপর হন। একজন বাগ্মীর কাজ হইল চরিত্র সংশোধনের জন্য অতন্ত প্রাণস্পর্শী ভাষায় মনোজ্ঞ বর্ণনা এবং বাক্য-সম্ভার উপহার দেওয়া। কিন্তু তাহাদের কেহই অন্তরাত্মাসমূহের পথপ্রদর্শক হইতে পারেন না। যাহারা মানুষের অনুভূতি ও ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে ভুল পথে পরিচালিত হওয়া থেকে বিরত রাখিতে এবং চরিত্র অভ্যাস ও সহজাত স্বভাব পবিত্র করিতে মানুষের অন্তরে যেই সকল শক্তির বিকাশ প্রয়োজন তাহা পরিপূর্ণ করিতে পারেন না, তাহাদের পক্ষে অন্তরের নিভৃত কোণ হইতে অমঙ্গল ও ক্ষতিকর চিন্তাভাবনার বীজ উৎপাটন করিয়া কল্যাণ ও বরকতের স্রোতধারা প্রবাহিত করা সম্ভব হয় না। পক্ষান্তরে নবী-রাসূলগণ এই সকল কাজ অতি সহজেই সম্পাদন করিতে সক্ষম হইয়া থাকেন। তাঁহারা মানুষের অনুভূতি ও ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার বিস্মৃত যিম্মাদারিকে স্মরণ করাইয়া দেন এবং এইগুলির প্রাণশক্তি যেই আত্মা হইতে উদগত হয় তাহা সংশোধন করিয়া দেন।
নবী-রাসূলগণ রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের মত হাট-বাজার, সভা-সমিতি ও লোকালয়সমূহে শুধু সময়িক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করেন না, বরং তাঁহারা ব্যক্তির অন্তরাত্মায়ও শান্তি-শৃংখলা প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করেন। তাঁহারা চরিত্র সম্পর্কে জ্ঞানদাতাদের মত কারণ ও হেতুর সন্ধানই দেন না, বরং দুশচরিত্রতার মূলোৎপাটন করেন এবং সচ্চরিত্রতা প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হন। তাঁহারা মানুষের ভ্রান্ত ধারণাসমূহকে নিশ্চিহ্ন করিয়া দেন, মানুষের গোলামীর শৃংখল হইতে মানুষকে মুক্তি দেন। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهُهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ اصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ (الاعراف - ١٥٧)
"যে তাহাদিগকে সৎকার্যের নির্দেশ দেয় ও অসৎকার্যে বাধা দেয়, যে তাহাদের জন্য পবিত্র বস্তু বৈধ করে ও অপবিত্র বস্তু অবৈধ করে এবং যে মুক্ত করে তাহাদিগকে তাহাদিগের গুরুভার হইতে ও শৃংখল হইতে যাহা তাহাদের উপর ছিল" (৭: ১৫৮)।
رُسُلاً مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ (النساء - ١٦٥ ) .
"সুসংবাদবাহী ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করিয়াছি যাহাতে রাসূল আসার পর আল্লাহ্র বিরুদ্ধে মানুষের কোন অভিযোগ না থাকে" (৪: ১৬৫)।
لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَتِ وَاَنْزَلْنَا مَعَهُمُ وَالْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ (الحديد - ٢٥)
"নিশ্চয় আমি আমার রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাহাদিগের সংগে দিয়াছি কিতাব ও ন্যায়নীতি যাহাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে" (৫৭:২৫)।
মানবজাতির অন্যান্য কল্যাণকামী ব্যক্তিবর্গ তাহাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য যেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে পালন করিয়া থাকেন তাহার পরিধি ইহকালের ভাল-মন্দের বিচার-বিশ্লেষণের বাহিরের কিছু নয়। কিন্তু নবী-রাসূলগণ ইহকালীন কল্যাণকর কাজ এই উদ্দেশ্যে করিয়া থাকেন যে, ইহার প্রভাব মানুষের পরকালীন কল্যাণে কার্যকর হয়। তাঁহারা দেহের যত্ন ও পরিচর্যা কেবল দৈহিক উন্নতির জন্য করেন না, বরং তাঁহাদের লক্ষ্য থাকে আত্মার উন্নতিসাধন। তাঁহারা মাখলুকের সেবাযত্ন করেন স্রষ্টার ইচ্ছা ও অভিপ্রায় মাফিক। ইহাতে কেবল এক মাখলুক হিসাবে অপর মাখলুকের সেবাযত্ন করাই নহে, রবং তাহাদের মূল লক্ষ্য হইল স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির যোগসূত্র স্থাপন করা এবং প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা।
নবী-রাসূলগণ শুধু সুমধুর বাচনভঙ্গি দ্বারা মানুষকে বিমোহিত করিতেন না, রবং তাঁহারা সর্বোত্তম পন্থায় কাজ করিতেন এবং অন্যাদেরকে নেক কাজে অভ্যস্ত করিতেন। তাঁহারা ঐসব কল্পনাবিলাসী কবি ও দার্শনিকদের মত ছিলেন না, যাহারা বাণী দেন কিন্তু নিজেরা সেই মত কাজ করেন না, সেই উদ্ভট কল্পনাবিলাসীদের সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُنَ. أَلَمْ تَرَ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ. وَأَنَّهُمْ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ (الشعراء - ٢٢٤).
"এবং কবিদিগকে অনুসরণ করে বিভ্রান্তরাই। তুমি কি দেখ না উহারা উদভ্রান্ত হইয়া প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরিয়া বেড়ায়? এবং তাহারা তো বলে যাহা তাহারা করে না" (২৬ : ২২৪-২২৬)।
নবী ও রাসূল মানুষের মধ্যে এই দাবি লইয়া আসেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাহাদের জীবন যাপনের জন্য যেই সকল উপকরণ সৃষ্টি করিয়াছেন এবং যিনি মানুষের আত্মার প্রশান্তি লাভের উপাদান দান করিয়াছেন, তিনি তাঁহাদেরকে এই কারণে প্রেরণ করিয়াছেন যেন তাঁহারা মানুষের অন্তরাত্মায় পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ বলিয়া দেন। রাসূল এই উপদেশ দেন যে, আল্লাহ পাকের ইচ্ছা হইল সকল বান্দার এমন চিন্তা-চেতনা ও ইচ্ছাসমূহ গ্রহণ করা যাহা তিনি পসন্দ করেন। এইভাবে বান্দা অন্ধকার হইতে শান্তি ও নিরাপদ জীবনে ফিরিয়া আসিবে। ইরশাদ হইয়াছে :
هُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ عَلَى عَبْدِهِ أَيْت بَيِّنَتِ لِيُخْرِجَكُمْ مِّنَ الظُّلُمُتِ إِلَى النُّورِ وَإِنَّ اللَّهَ بِكُمْ لَرَءُوفٌ رَّحِيمٌ (الحديد - ٩).
"তিনিই তাঁহার বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াত অবতীর্ণ করেন তোমাদিগকে অন্ধকার হইতে আলোকে আনিবার জন্য। আল্লাহ্ তো তোমাদিগের প্রতি করুণাময়, পরম দয়ালু" (৫৭ : ৯)।
নবী-রাসূলগণ রাজা-বাদশাহের ন্যায় জনগোষ্ঠীর ব্যবস্থাপনা করেন। তবে তাঁহাদের কাজ দেশের খাজনা ও ভূমি আবাদের নিমিত্ত নয়, বরং মনেপ্রাণে আল্লাহ্র নির্দেশাবলী পালন করিবার নিয়ম ও বিধান মানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা। তাঁহারা রাজকীয় পুরস্কার ও ভাতা লইয়া জাগতিক কোন রাজা-বাদশাহের আজ্ঞাবহ হন না, বরং তাঁহারা বিশ্বজগতে আল্লাহর হুকুম পালন করেন। তাঁহারা দার্শনিকদের ন্যায় বিভিন্ন কাজ ও কথার মর্ম প্রকাশ করেন। কিন্তু ইহা প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ নয়, বরং মহাজ্ঞানী ও পরম কৌশলী আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের আলোকে প্রকাশ করিয়া থাকেন। তাঁহারা বাগ্মীর মত হৃদয়স্পর্শী কথা বলেন। কিন্তু তাঁহাদের এই কথা অন্তর হইতে সৃষ্ট নয়, বরং আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে প্রাপ্ত। তাঁহারা কেবল বলেন না বরং যাহা বলেন তাহা নিজেরা করেন এবং অন্যদের দ্বারা করান। এক কথায় তাঁহারা আল্লাহ্র নিকট হইতে যাহা লাভ করেন তাহা জগদ্বাসীর নিকট প্রচার করেন। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে :
وَالنَّجْمِ إِذَا هَوَى مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى عَلَمَهُ شَدِيدُ القوى. ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوى وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى (النجم -১).
"শপথ নক্ষত্রের, যখন উহা হয় অস্তমিত। তোমাদিগের সংগী বিভ্রান্ত নয়, বিগথগামীও নয়, এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। ইহা তো ওহী, যাহা তাহার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। তাহাকে শিক্ষাদান করে শক্তিশালী, প্রজ্ঞাসম্পন্ন। সে নিজ আকৃতিতে স্থির হইয়াছিল, তখন সে ঊর্ধ্ব দিগন্তে” (৫৩ঃ ৭)।
فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى أَفَتُمَارُونَهُ عَلَى مَا يَرَى . ( النجم - ১০)
"তখন আল্লাহ্ তাঁহার বান্দার প্রতি যাহা ওহী করিবার তাহা ওহী করিলেন। যাহা সে দেখিয়াছে তাহার অন্তঃকরণ তাহা অস্বীকার করে নাই। সে যাহা দেখিয়াছে তোমরা কি সে বিষয়ে তাহার সংগে বিতর্ক করিবে” (৫৩ : ১০-১২)
مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى لَقَدْ رَأَى مِنْ أَيْتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى.
"তাহার দৃষ্টি বিভ্রম হয় নাই, দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয় নাই, সে তাহার প্রতিপালকের মহান নিদর্শনাবলী দেখিয়াছিল" (৫৩ : ১৭-১৮)।
قُلْ إِنَّمَا أَتَّبِعُ مَا يُوحَى إِلَيَّ مِنْ رَبِّي هَذَا بَصَائِرُ مِنْ رَّبِّكُمْ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ ( الاعراف -২০৩).
"বল, আমার প্রতিপালক দ্বারা আমি যে বিষয়ে প্রত্যাদিষ্ট হই, আমিতো শুধু তাহারই অনুসরণ করি। এই কুরআন তোমাদিগের প্রতিপালকের নিদর্শন, বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য ইহা পথনির্দেশ ও দয়া" (৭ঃ ২০৩)।
وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ. نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ. عَلَى قَلْبِكَ لِتَكُوْنَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ. بلسان عربي مبين.
"নিশ্চয় আল-কুরআন জগতসমূহের প্রতিপালক হইতে অবতীর্ণ। জিবরাঈল ইহা লইয়া অবতরণ করিয়াছে তোমার হৃদয়ে, যাহাতে তুমি সতর্ককারী হইতে পার। অবতীর্ণ করা হইয়াছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়" (২৬ : ১৯২-১৯৫)।
মোটকথা, একই কাজ বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে সম্পাদন করে। যে যেই উদ্দেশ্যেই করুক না কেন তাহাতে পার্থিব উদ্দেশ্য ইহার থাকে। নবী-রাসূলগণের নিকট পার্থিব সকল উদ্দেশ্যই দ্বিতীয় শ্রেণীর বিষয়। তাঁহাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল অন্তর বা কলবকে বিশুদ্ধ করা। তাঁহারা ইহাকেই মৌলিক কাজ মনে করিতেন। তাঁহাদের উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর আনুগত্য, ভালবাসা ও মারিফাত। এই কারণে নবীগণের দাওয়াত সফল হইলে দেশ-জাতি ইলম অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে বিশাল সাম্রাজ্য লাভ করিয়া বিত্ত-বিবভ ও অর্জন করিত (শিবলী নু'মানী-সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ৩০-৩৩)।
নবী ও অন্যান্য কল্যাণকর্মীদের মধ্যে তুলনা
মানব সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের কাজ তো একজন রাষ্ট্রনায়ক করিতে পারেন, চরিত্রবান একজন শিক্ষকও করিতে সক্ষম, এমনকি একজন বৈজ্ঞানিক কিংবা একজন বিচারকও করিতে পারেন। সুতরাং এই কাজের জন্য নবী-রাসূল প্রেরণের হেতু কি? এই বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে যেই বিরাট পার্থক্য রহিয়াছে তাহা অনুধাবনের মধ্যেই এই প্রশ্নের জবাব নিহিত রহিয়াছে। লক্ষণীয় যে, বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞগণ একই জিনিসের প্রতি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ হইতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া থাকেন। দৃষ্টিকোণের বিভিন্নতার কারণেই তাহাদের গবেষণার বিষয়ও পৃথক পৃথক হইয়া যায়। পদার্থের গঠন, ধর্ম ও ক্রিয়া-বিক্রিয়া লইয়া গবেষণা করিলে, তাহা হয় রসায়ন শাস্ত্র। প্রাণী দেহের জীবন ও উপকরণ লইয়া গবেষণা করিলে তাহা হয় প্রাণী বিজ্ঞান। মানসিক শক্তি ও ইহার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া লইয়া গবেষণা করিলে তাহা হয় মনোবিজ্ঞান। মানব জীবনের গতি-প্রকৃতি, ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিগত কার্যকলাপের সীমা ও ইহার কারণ ও পরিণতি সম্পর্কে গবেষণা করিলে তাহা হয় নীতিবিজ্ঞান। মানুষের সামজিক বৈশিষ্ট্যাবলী ও প্রয়োজনাদি সম্পর্কে গবেষণা করা হইলে ইহাকে সমাজবিজ্ঞান বলা হয়। শরীরের সুস্থতা ও অসুস্থতা লইয়া গবেষণা করা হইলে ইহাকে চিকিৎসা বিজ্ঞান বলা হয়। লক্ষণীয়, একটিমাত্র দেহ কিংবা দেহ সম্পর্কিত জিনিসের উপর গবেষণা হইতে বিভিন্ন শাস্ত্রের উদ্ভব হইয়াছে। এই সকল শাস্ত্রের উৎস কিন্তু দেহ। তবে শাস্ত্রগুলি স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত এবং বিশেষজ্ঞগণও পৃথক পৃথক।
অনুরূপ নবী-রাসূলের কাজ ও রাজা-বাদশাহ্ দার্শনিকও বৈজ্ঞানিকগণের ন্যায় মানুষেরই সংশোধনের লক্ষ্যে পরিচালিত, কিন্তু তাহাদের কাহারও কাজ অপরের কাজের সহিত অভিন্ন নয়। রাজা-বাদশাহবা রাষ্ট্রনায়কের দায়িত্ব হইল নিজের বাহুবল ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। দার্শনিক মানুষের কাজকর্ম ও চিন্তা-চেতনার কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ধারণের প্রচেষ্টা চালান এবং ব্যবহারিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে যুক্তি নির্ভর সমাধানে পৌছিবার চেষ্টা করেন। তেমনি একজন নীতিশাস্ত্রবিদ চরিত্র সম্পর্কিত বিষয়াবলী ও ইহার গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৎপর হন। একজন বাগ্মীর কাজ হইল চরিত্র সংশোধনের জন্য অতন্ত প্রাণস্পর্শী ভাষায় মনোজ্ঞ বর্ণনা এবং বাক্য-সম্ভার উপহার দেওয়া। কিন্তু তাহাদের কেহই অন্তরাত্মাসমূহের পথপ্রদর্শক হইতে পারেন না। যাহারা মানুষের অনুভূতি ও ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে ভুল পথে পরিচালিত হওয়া থেকে বিরত রাখিতে এবং চরিত্র অভ্যাস ও সহজাত স্বভাব পবিত্র করিতে মানুষের অন্তরে যেই সকল শক্তির বিকাশ প্রয়োজন তাহা পরিপূর্ণ করিতে পারেন না, তাহাদের পক্ষে অন্তরের নিভৃত কোণ হইতে অমঙ্গল ও ক্ষতিকর চিন্তাভাবনার বীজ উৎপাটন করিয়া কল্যাণ ও বরকতের স্রোতধারা প্রবাহিত করা সম্ভব হয় না। পক্ষান্তরে নবী-রাসূলগণ এই সকল কাজ অতি সহজেই সম্পাদন করিতে সক্ষম হইয়া থাকেন। তাঁহারা মানুষের অনুভূতি ও ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার বিস্মৃত যিম্মাদারিকে স্মরণ করাইয়া দেন এবং এইগুলির প্রাণশক্তি যেই আত্মা হইতে উদগত হয় তাহা সংশোধন করিয়া দেন।
নবী-রাসূলগণ রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের মত হাট-বাজার, সভা-সমিতি ও লোকালয়সমূহে শুধু সময়িক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করেন না, বরং তাঁহারা ব্যক্তির অন্তরাত্মায়ও শান্তি-শৃংখলা প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করেন। তাঁহারা চরিত্র সম্পর্কে জ্ঞানদাতাদের মত কারণ ও হেতুর সন্ধানই দেন না, বরং দুশচরিত্রতার মূলোৎপাটন করেন এবং সচ্চরিত্রতা প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হন। তাঁহারা মানুষের ভ্রান্ত ধারণাসমূহকে নিশ্চিহ্ন করিয়া দেন, মানুষের গোলামীর শৃংখল হইতে মানুষকে মুক্তি দেন। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهُهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ اصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ (الاعراف - ١٥٧)
"যে তাহাদিগকে সৎকার্যের নির্দেশ দেয় ও অসৎকার্যে বাধা দেয়, যে তাহাদের জন্য পবিত্র বস্তু বৈধ করে ও অপবিত্র বস্তু অবৈধ করে এবং যে মুক্ত করে তাহাদিগকে তাহাদিগের গুরুভার হইতে ও শৃংখল হইতে যাহা তাহাদের উপর ছিল" (৭: ১৫৮)।
رُسُلاً مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ (النساء - ١٦٥ ) .
"সুসংবাদবাহী ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করিয়াছি যাহাতে রাসূল আসার পর আল্লাহ্র বিরুদ্ধে মানুষের কোন অভিযোগ না থাকে" (৪: ১৬৫)।
لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَتِ وَاَنْزَلْنَا مَعَهُمُ وَالْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ (الحديد - ٢٥)
"নিশ্চয় আমি আমার রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাহাদিগের সংগে দিয়াছি কিতাব ও ন্যায়নীতি যাহাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে" (৫৭:২৫)।
মানবজাতির অন্যান্য কল্যাণকামী ব্যক্তিবর্গ তাহাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য যেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে পালন করিয়া থাকেন তাহার পরিধি ইহকালের ভাল-মন্দের বিচার-বিশ্লেষণের বাহিরের কিছু নয়। কিন্তু নবী-রাসূলগণ ইহকালীন কল্যাণকর কাজ এই উদ্দেশ্যে করিয়া থাকেন যে, ইহার প্রভাব মানুষের পরকালীন কল্যাণে কার্যকর হয়। তাঁহারা দেহের যত্ন ও পরিচর্যা কেবল দৈহিক উন্নতির জন্য করেন না, বরং তাঁহাদের লক্ষ্য থাকে আত্মার উন্নতিসাধন। তাঁহারা মাখলুকের সেবাযত্ন করেন স্রষ্টার ইচ্ছা ও অভিপ্রায় মাফিক। ইহাতে কেবল এক মাখলুক হিসাবে অপর মাখলুকের সেবাযত্ন করাই নহে, রবং তাহাদের মূল লক্ষ্য হইল স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির যোগসূত্র স্থাপন করা এবং প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা।
নবী-রাসূলগণ শুধু সুমধুর বাচনভঙ্গি দ্বারা মানুষকে বিমোহিত করিতেন না, রবং তাঁহারা সর্বোত্তম পন্থায় কাজ করিতেন এবং অন্যাদেরকে নেক কাজে অভ্যস্ত করিতেন। তাঁহারা ঐসব কল্পনাবিলাসী কবি ও দার্শনিকদের মত ছিলেন না, যাহারা বাণী দেন কিন্তু নিজেরা সেই মত কাজ করেন না, সেই উদ্ভট কল্পনাবিলাসীদের সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُنَ. أَلَمْ تَرَ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ. وَأَنَّهُمْ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ (الشعراء - ٢٢٤).
"এবং কবিদিগকে অনুসরণ করে বিভ্রান্তরাই। তুমি কি দেখ না উহারা উদভ্রান্ত হইয়া প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরিয়া বেড়ায়? এবং তাহারা তো বলে যাহা তাহারা করে না" (২৬ : ২২৪-২২৬)।
নবী ও রাসূল মানুষের মধ্যে এই দাবি লইয়া আসেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাহাদের জীবন যাপনের জন্য যেই সকল উপকরণ সৃষ্টি করিয়াছেন এবং যিনি মানুষের আত্মার প্রশান্তি লাভের উপাদান দান করিয়াছেন, তিনি তাঁহাদেরকে এই কারণে প্রেরণ করিয়াছেন যেন তাঁহারা মানুষের অন্তরাত্মায় পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ বলিয়া দেন। রাসূল এই উপদেশ দেন যে, আল্লাহ পাকের ইচ্ছা হইল সকল বান্দার এমন চিন্তা-চেতনা ও ইচ্ছাসমূহ গ্রহণ করা যাহা তিনি পসন্দ করেন। এইভাবে বান্দা অন্ধকার হইতে শান্তি ও নিরাপদ জীবনে ফিরিয়া আসিবে। ইরশাদ হইয়াছে :
هُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ عَلَى عَبْدِهِ أَيْت بَيِّنَتِ لِيُخْرِجَكُمْ مِّنَ الظُّلُمُتِ إِلَى النُّورِ وَإِنَّ اللَّهَ بِكُمْ لَرَءُوفٌ رَّحِيمٌ (الحديد - ٩).
"তিনিই তাঁহার বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াত অবতীর্ণ করেন তোমাদিগকে অন্ধকার হইতে আলোকে আনিবার জন্য। আল্লাহ্ তো তোমাদিগের প্রতি করুণাময়, পরম দয়ালু" (৫৭ : ৯)।
নবী-রাসূলগণ রাজা-বাদশাহের ন্যায় জনগোষ্ঠীর ব্যবস্থাপনা করেন। তবে তাঁহাদের কাজ দেশের খাজনা ও ভূমি আবাদের নিমিত্ত নয়, বরং মনেপ্রাণে আল্লাহ্র নির্দেশাবলী পালন করিবার নিয়ম ও বিধান মানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা। তাঁহারা রাজকীয় পুরস্কার ও ভাতা লইয়া জাগতিক কোন রাজা-বাদশাহের আজ্ঞাবহ হন না, বরং তাঁহারা বিশ্বজগতে আল্লাহর হুকুম পালন করেন। তাঁহারা দার্শনিকদের ন্যায় বিভিন্ন কাজ ও কথার মর্ম প্রকাশ করেন। কিন্তু ইহা প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ নয়, বরং মহাজ্ঞানী ও পরম কৌশলী আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের আলোকে প্রকাশ করিয়া থাকেন। তাঁহারা বাগ্মীর মত হৃদয়স্পর্শী কথা বলেন। কিন্তু তাঁহাদের এই কথা অন্তর হইতে সৃষ্ট নয়, বরং আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে প্রাপ্ত। তাঁহারা কেবল বলেন না বরং যাহা বলেন তাহা নিজেরা করেন এবং অন্যদের দ্বারা করান। এক কথায় তাঁহারা আল্লাহ্র নিকট হইতে যাহা লাভ করেন তাহা জগদ্বাসীর নিকট প্রচার করেন। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে :
وَالنَّجْمِ إِذَا هَوَى مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى عَلَمَهُ شَدِيدُ القوى. ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوى وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى (النجم -১).
"শপথ নক্ষত্রের, যখন উহা হয় অস্তমিত। তোমাদিগের সংগী বিভ্রান্ত নয়, বিগথগামীও নয়, এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। ইহা তো ওহী, যাহা তাহার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। তাহাকে শিক্ষাদান করে শক্তিশালী, প্রজ্ঞাসম্পন্ন। সে নিজ আকৃতিতে স্থির হইয়াছিল, তখন সে ঊর্ধ্ব দিগন্তে” (৫৩ঃ ৭)।
فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى أَفَتُمَارُونَهُ عَلَى مَا يَرَى . ( النجم - ১০)
"তখন আল্লাহ্ তাঁহার বান্দার প্রতি যাহা ওহী করিবার তাহা ওহী করিলেন। যাহা সে দেখিয়াছে তাহার অন্তঃকরণ তাহা অস্বীকার করে নাই। সে যাহা দেখিয়াছে তোমরা কি সে বিষয়ে তাহার সংগে বিতর্ক করিবে” (৫৩ : ১০-১২)
مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى لَقَدْ رَأَى مِنْ أَيْتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى.
"তাহার দৃষ্টি বিভ্রম হয় নাই, দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয় নাই, সে তাহার প্রতিপালকের মহান নিদর্শনাবলী দেখিয়াছিল" (৫৩ : ১৭-১৮)।
قُلْ إِنَّمَا أَتَّبِعُ مَا يُوحَى إِلَيَّ مِنْ رَبِّي هَذَا بَصَائِرُ مِنْ رَّبِّكُمْ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ ( الاعراف -২০৩).
"বল, আমার প্রতিপালক দ্বারা আমি যে বিষয়ে প্রত্যাদিষ্ট হই, আমিতো শুধু তাহারই অনুসরণ করি। এই কুরআন তোমাদিগের প্রতিপালকের নিদর্শন, বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য ইহা পথনির্দেশ ও দয়া" (৭ঃ ২০৩)।
وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ. نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ. عَلَى قَلْبِكَ لِتَكُوْنَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ. بلسان عربي مبين.
"নিশ্চয় আল-কুরআন জগতসমূহের প্রতিপালক হইতে অবতীর্ণ। জিবরাঈল ইহা লইয়া অবতরণ করিয়াছে তোমার হৃদয়ে, যাহাতে তুমি সতর্ককারী হইতে পার। অবতীর্ণ করা হইয়াছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়" (২৬ : ১৯২-১৯৫)।
মোটকথা, একই কাজ বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে সম্পাদন করে। যে যেই উদ্দেশ্যেই করুক না কেন তাহাতে পার্থিব উদ্দেশ্য ইহার থাকে। নবী-রাসূলগণের নিকট পার্থিব সকল উদ্দেশ্যই দ্বিতীয় শ্রেণীর বিষয়। তাঁহাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল অন্তর বা কলবকে বিশুদ্ধ করা। তাঁহারা ইহাকেই মৌলিক কাজ মনে করিতেন। তাঁহাদের উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর আনুগত্য, ভালবাসা ও মারিফাত। এই কারণে নবীগণের দাওয়াত সফল হইলে দেশ-জাতি ইলম অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে বিশাল সাম্রাজ্য লাভ করিয়া বিত্ত-বিবভ ও অর্জন করিত (শিবলী নু'মানী-সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ৩০-৩৩)।
📄 নবী ও অন্যান্যদের মধ্যে চারটি পর্যায়ে প্রভেদ
নবীরাসূল-ও অন্যান্য কল্যাণকামীদের মধ্যে যে কত বিরাট বাব্যধান রহিয়াছে তাহা পূর্বোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতিভাত হইয়াছে। এই প্রভেদ চারটি পর্যায়ে পরিলক্ষিত হয়। তাঁহা হইল (১) উৎসের, (২) লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের, (৩) দাওআত দানের পন্থার এবং (৪) ইলম ও আমলের।
নবীগণের ইলমের উৎস ও উৎপত্তি স্থল হইল আল্লাহ পাকের শিক্ষাদান, অন্তরাত্মা খুলিয়া যাওয়া, ওহী ও ইলহাম। দার্শনিক-বৈজ্ঞানিকদের ইলমের উৎস হইল মানবিক শিক্ষাদান, অতীতের অভিজ্ঞতা, অনুসন্ধান, অনুমান, পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অর্থাৎ দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকগণ জ্ঞানবুদ্ধি দ্বারা আর নবীগণ বুদ্ধির সৃষ্টিকর্তার দ্বারা অবহিত হন। একজন দার্শনিকের সকল কথাবার্তা ও চেষ্টা-তদবীরের লক্ষ্য হয় সুনাম-সুখ্যাতি অর্জন, জ্ঞানের বিকাশ, দেশ ও জাতির ভালবাসা ও সেবা। পক্ষান্তরে একজন নবীর লক্ষ্য হইয়া থাকে আল্লাহ পাকের বিধান কার্যকরী করা, তাঁহার সন্তুষ্টি লাভের জন্য মাখলুকের কল্যাণ কামনা করা।
দাওয়াতদানের মধ্যে পার্থক্য হইল দার্শনিক তাহার সার্বিক আহবানের ভিত্তি রচনা করেন প্রজ্ঞা ও মনীষা, সংস্কার ও বিশুদ্ধতা অর্জন এবং কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয়ের উপর। নবীগণের দাওয়াত স্রষ্টার আনুগত্য ও ভালবাসার উপর প্রতিষ্ঠিত। দার্শনিক যাহা ব্যক্ত করেন সেই মুতাবিক কাজ নাও করিতে পারেন। কিন্তু নবী যাহা বলেন তাহা নিজে কার্যে পরিণত করিয়া দেখাইয়া দেন। নির্জনে ও জনসমাজে, প্রকাশ্যে ও গোপনে পুণ্য কাজ দ্বারা তিনি সুসজ্জিত থাকেন এবং অপরকেও সুসজ্জিত করেন এবং অপকর্ম হইতে বিরত থাকেন অপরকেও বিরত রাখেন।
জগতে দেখা যায়, সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টোটল প্রমুখ দার্শনিক একদিকে, পক্ষান্তরে ইবরাহীম (আ), মূসা (আ), মুহাম্মাদ (স) অন্যদিকে অবস্থান করিতেছেন। উভয় শ্রেণীর এক দলের চরিত্র, জীবনেতিহাস ও কর্মকাণ্ড অপর দল হইতে এতই পৃথক যে, তাহাদের মধ্যে সামান্যতম মিল ও সংযোগ খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। রাষ্ট্রনায়ক স্বীয় অস্ত্র ও সৈন্যদলের শক্তি প্রদর্শন করিয়া নাগরিকদেরকে রাষ্ট্রীয় আইনের অধীনে আবদ্ধ করেন, যাহাতে সন্ত্রাস ও ফিৎনা দূর হইয়া যায়। বৈজ্ঞানিক স্বীয় দাবিকে কেবল যুক্তি-প্রমাণের বলে প্রমাণ করিতে চাহেন। কিন্তু নবীগণ তাঁহাদের অনুসারীদের অন্তরকে এমনভাবে পরিবর্তন করিয়া দিতে চাহেন যাহাতে তাহারা নিজেরাই অমঙ্গলের পথ পরিহার করিয়া মঙ্গলের পথে ফিরিয়া আসে। যদি তাহারা কখনো আইন-কানুনের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াও থাকেন তাহা হইলে ইহা তাঁহাদের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ হইয়া থাকে। তাঁহাদের প্রাথমিক কাজ হইতেছে উম্মতদের অন্তরে আল্লাহ পাকের কুদরত এবং তাঁহার সর্বজ্ঞ হওয়ার এমন প্রত্যয় সৃষ্টি করা যাহাতে তাহারা নবীর দাওয়াত গ্রহণ করিতে কোন দ্বিধা না করে।
জাগতিক রাজা-বাদশাহ ও দিগ্বিজয়ীগণ নিজেদের শৌর্যবীর্য ও বাহুবল দ্বারা পৃথিবীর অবস্থাকে পাল্টাইয়া জনপদে শান্তি প্রতিষ্ঠা করিতে পারেন। এতদসত্ত্বেও তাহারা কোন মানুষের অন্তরকে পরিবর্তন করিয়া দিতে কি সক্ষম হইয়াছিলেন? তাহারা কি মানুষের অন্তর জগতকে নিজেদের আয়ত্বে আনিতে পারিয়াছেন? বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকগণ নিজেদের জ্ঞান ও মনীষার আলোকে যেই সকল অত্যাশ্চর্য বিষয়াবলী ও সৃষ্টিজগতের গোপন তথ্যাবলী প্রকাশ করিবার দাবি করেন, তাহারা কি মানুষের অন্তরজগতের রহস্যাবলী উদ্ঘাটন করিতে সক্ষম হইয়াছেন? ঊর্দ্ধ জগতের রহস্য অনুধাবন করিতে পারিয়াছেন, নিজেদের উদ্ভাবনী শক্তি দ্বারা মানুষের সংশোধন ও হিদায়াতের কোন ব্যবস্থাপত্র আবিষ্কার করিতে পারিয়াছেন? এরিস্টোটল নীতিশাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করিয়াছেন। অন্যান্য দার্শনিকগণও চরিত্র ও প্রবৃত্তির কারণ ও হেতুসমূহ সম্পর্কে বিচার-বিশ্লেষণ করিয়াছেন। কিন্তু ইহাতে কোন মানুষের অন্তর হইতে অমঙ্গলের বীজ কি দূর হইয়াছে? তাহাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও দার্শনিক শিক্ষার গোপন রহস্যগুলির প্রসার তাহাদের বিদ্যানিকেতনের বেষ্টনী প্রাচীর অতিক্রম করিতে পারে নাই। কারণ তাহারা যখন স্বীয় বিদ্যাপীঠের সীমানা অতিক্রম করিয়া মানব সমাজে পা রাখিতেন তখন তাহাদের চারিত্রিক জীবন ও অন্তরাত্মার পরিচ্ছন্নতা সাধারণ মানুষের জীবন হইতে কোনক্রমেই উন্নততর হইত না। পক্ষান্তরে তাওহীদ ও ইবাদতের পন্থা এমন যেখানে অপবিত্রতার সামান্যতম ছোঁয়াচও লাগিতে পারে না।
এই আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, সুললিত কণ্ঠের অধিকারী বক্তা, অভিজ্ঞ আইন প্রণেতা, দিগ্বিজয়ী সম্রাট, প্রত্যুৎপন্নমতি দার্শনিক কেহই এই রূপ যোগ্য নহেন যে, তাহাদের প্রতি নবুওয়াত ও রিসালাতের সুমহান পবিত্র দায়িত্ব অর্পিত হইবে। এই দায়িত্ব ও কর্তব্যের সিংহাসনে আরোহণ করিতে হইলে এমন কিছু শর্ত, অতি আবশ্যকীয় গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হইতে হইবে, যাহা ব্যতীত ইহার মূল অবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা করা যায় না। তাহা হইল :
(১) নবুওয়াত ও রিসালাতের সম্পর্ক রহস্যপূর্ণ অদৃশ্য জগতের সঙ্গে। তাঁহারা গায়ব বা অদৃশ্যের ধ্বনি শুনিতে পান, অদৃশ্যের বস্তুসমূহ দেখিতে পান, তথা হইতে জ্ঞান আহরণ করেন, ফেরেশতা জগতের সাহায্য তাঁহারা লাভ করেন। জিবরাঈল (আ) তাঁহাদের সহায়তায় থাকেন।
২। আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের মধ্য হইতে তাঁহাদিগকে এই মহান পদে মনোনীত করেন।
৩। আল্লাহ তাআলার নির্দেশে তাঁহাদের নিকট হইতে এমন অনেক বিস্ময়কর অচিন্তনীয় অলৌকিক ঘটনাবলী প্রকাশিত হয় যাহার দ্বারা তাঁহারা যে আল্লাহ্র বরণীয় বান্দা তাহা বুঝা যায়।
৪। উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে তাঁহাদের জীবন মাধুর্যপূর্ণ থাকে, তাঁহারা পূত ও পবিত্র এবং নিখুঁত চরিত্রের অধিকারী হন। কারণ অপবিত্র হাত দ্বারা ময়লা কাপড় কখনও পরিষ্কার হয় না।
৫। তাঁহারা মানবজাতিকে আল্লাহর উপর ও অদৃশ্য জগতের উপর বিশ্বাস স্থাপনের দাওয়াত দেন, সচ্চরিত্রতা শিক্ষাদান করেন। মানুষ রূহানী জগতে আল্লাহকে যে প্রতিপালক হিসাবে স্বীকৃতিদান করিয়াছিল (দ্র. ৭:১৭২) সেই কথা স্মরণ করাইয়া দেন।
৬। কেবল শিক্ষাদান করিয়াই তাঁহারা ক্ষান্ত হন না, বরং তাঁহারা পাপিষ্ঠদেরকে পুণ্যবান ও পথহারাদেরকে সঠিক পাথের সন্ধান দেন, যাহারা আল্লাহ্র নির্দেশের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ছিল তাঁহাদের আল্লাহর পথে ফিরাইয়া আনেন।
৭। তাঁহাদের আগমনের পূর্ববর্তী কালে যেই সকল নীতি আল্লাহ্ পক্ষ হইতে আসিয়াছিল, তাঁহার সেইগুলিকে বিকৃতির হাত হইতে পরিচ্ছন্ন রাখিবার চেষ্টা করেন।
৮। তাঁহাদের দাওয়াত, শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্য পার্থিব কোন বিনিময়, সুখ্যাতি, বিত্ত বা ক্ষমতা অর্জন ছিল না, বরং তাঁহাদের একমাত্র লক্ষ্য হইত আল্লাহ পাকের নির্দেশ পালন ও মাখলুকের হিদায়াত।
এই সকল গুণ দুনিয়ার সকল নবীর মধ্যে সমভাবে বিদ্যমান ছিল। চলমান দুনিয়ার ধর্মগ্রন্থরাজির প্রতি তাকাইলে ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠে। বিশেষত সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থ আল-কুরআন নবুওয়াত ও রিসালাতের হাকীকত ও শর্তাবলী সবিস্তারে ব্যাখ্যা করিয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
وَتِلْكَ حُجَّتُنَا أَتَيْنَهَا إِبْرَاهِيمَ عَلَى قَوْمِهِ نَرْفَعُ دَرَجَت مَّنْ نَّشَاءُ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ. وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ كُلاً هَدَيْنَا وَلُوْطًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ دَاوُدَ وَسُلَيْمَانَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَى هَارُونَ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ، وَزَكَرِيَّا وَيَحْيَى وَعِيسَى وَالْيَاسَ كُلٌّ مِّنَ الصَّالِحِينَ. وَاسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوْطًا وَكُلاً فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ، وَمِنْ آبَائِهِمْ وَذُرِّيَّتِهِمْ وَإِخْوَانِهِمْ وَاجْتَبَيْنَهُمْ وَهَدَيْنَهُمْ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ ذَلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِي بِهِ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ. أُولَئِكَ الَّذِينَ أَتَيْنَهُمُ الْكِتٰبَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ فَإِنْ يُكْفُرْ بِهَا هُولا ، فَقَدْ وَكَّلْنَا بِهَا قَوْمًا لَيْسُوا بِهَا بِكَفِرِينَ. أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ فَبِهُدُهُمُ اقْتَدِهُ قُلْ لا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرَى لِلْعَالَمِينَ. (الانعام ٨٣-٩٠).
"এবং ইহা আমার যুক্তি-প্রমাণ যাহা ইবরাহীমকে দিয়াছিলাম তাহার সম্প্রদায়ের মুকাবিলায়। যাহাকে ইচ্ছা মর্যাদায় আমি উন্নীত করি। তোমার প্রতিপালক প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। আমি তাহাকে দান কারিয়াছিলাম ইসহাক ও ইয়া'কূব, ইহাদের প্রত্যেককে সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম। পূর্বে নূহকেও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম এবং তাহার বংশধর দাউদ, সুলায়মান, আয়্যব, ইউসুফ, মূসা ও হারুনকে; আর এইভাবেই সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করি এবং যাকারিয়্যা, য়াহয়া, ঈসা, ইলয়াসকেও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম; ইহারা সকলে সজ্জনদিগের অন্তর্ভুক্ত। আরও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম ইসমাঈল, আল-ইয়াসা, ইউনুস ও লূতকে; এবং শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছিলাম বিশ্বজগতের উপর প্রত্যেককে এবং ইহাদের পিতৃ-পুরুষ, বংশধর এবং ভ্রাতৃবৃন্দের কতককে আমি তাহাদিগকে মনোনীত করিয়াছিলাম এবং সরল পথে পরিচালিত করিয়াছিলাম। ইহা আল্লাহ্র হিদায়াত, স্বীয় বান্দাদিগের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা তিনি ইহা দ্বারা সৎপথে পরিচালিত করেন। তাহারা যদি শিরক করিত তবে তাহাদিগের কৃতকর্ম নিষ্ফল হইত। আমি উহাদিগকে কিতাব, কর্তৃত্ব ও নবুওয়াত দান করিয়াছি। অতঃপর যদি ইহারা এইগুলিকে প্রত্যাখ্যানও করে তবে আমি তো এমন এক সম্প্রদায়ের প্রতি এইগুলির ভার অর্পণ করিয়াছি যাহারা এইগুলি প্রত্যাখ্যান করিবে না। উহাদিগকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করিয়াছেন। সুতরাং তুমি তাহাদিগের পথের অনুসরণ কর। বল, ইহার জন্য আমি তোমাদিগের নিকট পারিশ্রমিক চাহি না, ইহা তো শুধু বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ" (৬:৮৩-৯০)।
এই আয়াতগুলিতে আল্লাহ তা'আলা অধিকাংশ নবী-রাসূলের উল্লেখ করিয়া তাঁহাদের নবী-সুলভ গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলিয়া ধরিয়াছেন, যাহার সারমর্ম নিম্নরূপ:
১। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন, "আমি ইবরাহীমকে দলীল ও প্রামাণ দিয়াছি এবং আমি তাহাকে হিদায়াতও প্রদান করিয়াছি"। ইহা হইতে বুঝা যায় তাঁহার ইলম ও হিদায়াতের উৎস ঊর্ধ্ব জগত (আলমে মালাকৃত)।
২। ইরশাদ হইয়াছে, "আমি তাহাদেরকে সরল পথে চালাইয়াছিলাম, তাঁহারা সকলে ছিলেন পুণ্যবান"। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, তাঁহারা নিষ্পাপ ও নিষ্কলংক ছিলেন।
৩। "আমি তাহাদেরকে বরণ করিয়া মনোনীত করিয়াছি এবং স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা এই হিদায়াত করি"। ইহা হইতে বুঝা যায়, এই মর্যাদাটি চেষ্টা ও অধ্যবসায় দ্বারা অর্জিত হয় না, বরং ইহা আল্লাহ্র ইচ্ছা ও তাঁহার মনোনয়নের উপর নির্ভরশীল।
৪। "আমি তাহাদেরকে কিতাব ও সত্য-মিথ্যার তফাৎকারী শক্তি, হিকমত ও অদৃশ্য জগতের শিক্ষা দিয়াছি"। ইহা হইতে নবুওয়াত ও রিসালাতের অধিকারিগণকে যে কত বড় সম্মান দিয়াছেন তাহা ফুটিয়া উঠে। "তোমরা তাহাদের হিদায়াত অনুসরণ কর"। ইহা হইতে স্পষ্টত বুঝা যায়, তাঁহারা মানুষের পথপ্রদর্শন এবং দাওয়াত দানের জন্য আদিষ্ট ছিলেন। মানুষ তাঁহাদের অনুসরণ করিয়া পুণ্যবান ও সৎকর্মশীল হয়।
৫। "বল, আমি আমার এই কাজের বিনিময়ে কোনও প্রতিফল তোমাদের নিকট হইত গ্রহণ করিবার প্রত্যাশা করিতেছি না; ইহা শুধু দুনিয়াবাসীর জন্য উপদেশ ও নিয়ামতের স্বীকৃতি মাত্র"। ইহার দ্বারা বুঝা যায়, আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি এবং ইহার সাহায্যে মাখলুকের কল্যাণ কামনা ব্যতীত নবীগণের অন্য কোন লক্ষ্য ছিল না।
অন্যান্য নবীগণ ছাড়াও স্বয়ং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর বৈশিষ্ট্যাবলী আল-কুরআনে বহুবার উল্লিখিত হইয়াছে। যেমনঃ
১। গায়বের বস্তুসমূহ ও কল্যাণকর কার্যাবলীর কারণ সম্পর্কে তাঁহার ইল্ম আল্লাহ প্রদত্ত শিক্ষায় পূর্ণ ছিল।
২। আল্লাহ প্রদত্ত শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন তিনি পরিপূর্ণভাবে ঘটাইয়াছিলেন।
৩। তিনি অন্যদেরকে এই ইলমের শিক্ষা দান করিতেন।
৪। তিনি স্বীয় শিক্ষা ও সান্নিধ্যের দ্বারা সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁহার অনুসারিগণকে পূর্ণতা দান করিতেন। আল-কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তাঁহার সম্পর্কে এই মর্মে ইরশাদ হইয়াছে: يَتْلُوا عَلَيْهِمْ ايْته وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ (الجمعة - ٢).
"যে তাহাদের নিকট আবৃত্তি করে তাঁহার আয়াতসমূহ, তাহাদিগকে পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমত" (৬২: ২)।
এই আয়াতে উপরিউক্ত চারিটি বিষয় একই স্থানে উল্লেখ করা হইয়াছে। কারণ অজ্ঞদেরকে শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োজন হইল, নিজে এই আয়াত তিলাওয়াত করিবেন এবং কিতাব ও হিকমত শিখিবেন। অনুরূপ অন্যদের পাক-সাফ করার জন্য ইহা জরুরী যে, তিনি স্বয়ং পাকসাফ থাকিবেন। এক মূর্খ অপর মূর্খকে জ্ঞানী এবং এক অপবিত্র অপর অপবিত্র লোককে পবিত্র করিতে পারে না। অপর এক আয়াতে ইরশাদ হইয়াছেঃ سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنْسَى إِلا مَا شَاءَ اللهُ إِنَّهُ يَعْلَمُ الْجَهْرَ وَمَا يَخْفَى. وَنُيَسِرُكَ الْيُسْرَى. فَذَكِّرْ أَنْ نَّفَعَتِ الذكرى. سَيَذَّكَّرُ مَنْ يَخْشَى وَيَتَجَنَّبُهَا الْأَشْقَى (الاعلى : ٦-١١).
"নিশ্চয় আমি তোমাকে পাঠ করাইব, ফলে তুমি বিস্তৃত হইবে না, আল্লাহ যাহা ইচ্ছা করিবেন তাহা ব্যতীত। তিনি জানেন যাহা প্রকাশ্য ও যাহা গোপনীয়। আমি তোমার জন্য সুগম করিয়া দিব সহজ পথ। উপদেশ যদি ফলপ্রসূ হয় তবে উপদেশ দাও। যে ভয় করে সে উপদেশ গ্রহণ করিবে। আর উহা উপেক্ষা করিবে যে নিতান্ত হতভাগ্য" (৮৭ঃ ৬-১১)।
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন, "তোমাকে পাঠ করাইব, ফলে তুমি বিস্তৃত হইবে না"। এইভাবে পাঠ করানোই হইল নবীগণের রূহানী তা'লীম। নবীকে পর্যায়ক্রমে সহজতর পথে লইয়া যাওয়া এবং তাঁহার জন্য সুকঠিন গন্তব্যকে সহজলভ্য করিয়া দেওয়ার মধ্যে যেই গূঢ় রহস্য নিহিত আছে তাহা হইল, তাঁহার ব্যক্তিগত আমলকে এইভাবে পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌছাইয়া দেওয়া যাহাতে সকল কল্যাণকর কাজ তাঁহার দ্বারা স্বভাবতই বিকশিত। দুনিয়াবাসীকে বুঝাইবার জন্য নবীকে আদ্রশদানের মধ্যে হিকমত হইল, তিনি শিক্ষাদান ও উপদেশ দানের পদে অধিষ্ঠিত (ইমাম রাযী, বরাত শিবলী নু'মানী-সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন নবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, ৩৭ টীকা দ্র)।
📄 নবুওয়াতের বৈশিষ্ট্যাবলীর ব্যাখ্যা
নবুওয়াতের বৈশিষ্ট্যাবলীর ব্যাখ্যা
নবুওয়াতের উপকরণ ও বৈশিষ্ট্যাবলী সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত এই আলোচনার পর চলমান কালের কতিপয় ভুল বুঝাবুঝির অপনোদন করা প্রয়োজন। এই সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে নবুওয়াতের বৈশিষ্ট্যাবলীর ব্যাখ্যা জানা আবশ্যক।
এই জগতের প্রতিটি শ্রেণীতে এবং সেই শ্রেণীর অধীন শাখা-প্রশাখায় কিছু না কিছু নির্দিষ্ট গুণাবলীর বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। এই বিশেষ গুণাবলী সংশ্লিষ্ট শ্রেণীতে এবং ইহার প্রত্যেক শাখা-প্রশাখায় সমভাবে লক্ষ্য করা যায়। এইগুলিকেই 'খুসূসিয়াত' বা বৈশিষ্ট্যাবলী বলিয়া অভিহিত করা হয়। ফল, ফুল, চতুস্পদ জন্তু, পক্ষিকুল এবং সকল মানুষের মধ্যে এমন কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য-আছে যাহা অন্যদের মধ্যে পাওয়া যায় না। এই বৈশিষ্ট্যাবলীর ভিত্তিতেই একটি শ্রেণী অপর শ্রেণী হইতে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত হয় এবং পরস্পরের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা যায়।
গোলাপ ফুলের বিশেষ রঙ রহিয়াছে, ইহার সৌরভ ভিন্ন প্রকৃতির এবং তাহার পাতা-পল্লবও বিশেষ ধরনের হইয়া থাকে। গোলাপ ফুল হইলেই তাহাতে এই বৈশিষ্ট্য অবশ্যই থাকিবে। গোলাপ ফুলের বৈচিত্র্য এখানেই শেষ নয়। গোলাপের মধ্যেও রহিয়াছে বিভিন্ন গুণ এবং প্রকারভেদ। ইহার প্রতিটি পর্যায় ও প্রকারের মধ্যে কিছু কিছু এমন অবশ্যম্ভাবী গুণের সমারোহ রহিয়াছে যাহার দরুণ প্রত্যেকটি প্রকারকে অন্যান্য প্রকার হইতে স্পষ্টত পৃথক মনে হয়।
মানুষের দেহে বিশেষ বিশেষ উপকরণ ও গুণ রহিয়াছে। যেমন হাত-পা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, দেহ, বাকশক্তি ও বুদ্ধি-বিবেচনা ইত্যাদি। মধুতে মিষ্টি, আগুনে উত্তাপ ও বরফের মধ্যে শীতলতা প্রভৃতি শ্রেণীভিত্তিক বৈশিষ্ট্য স্বভাবতই বিরাজমান। অনুরূপ মানুষের মধ্যেও মানবতাসুলভ উপরোল্লিখিত গুণাবলী সৃষ্টিগতভাবে বিদ্যমান রহিয়াছে। এই গুণাবলী সকল মানুষের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও গোলাপের নানা প্রকারের মত মানুষের মধ্যেও বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ রহিয়াছে। এইভাবে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে ব্যক্তিবিশেষের বিভিন্নতাও লক্ষ্য করা যায়। আল্লাহ তা'আলা তাহাদের প্রত্যেককে ভিন্ন ভিন্ন যোগ্যতা ও কর্মপ্রেরণা দান করিয়াছেন। ফলে কেহ হয় কবি, কেহ হয় বাগ্মী, আবার কেহ হয় বৈজ্ঞানিক ইত্যাদি। এই কবি ও বাগ্মীদের মধ্যেও কত বৈচিত্র রহিয়াছে। এই বিভিন্ন প্রকৃতির মানুষের মধ্যে এক শ্রেণীর মানুষ হইলেন নবীগণ। তাঁহাদের বিশেষ বিশেষ খুসূসিয়াত বা বৈশিষ্ট্যাবলী রহিয়াছে যাহা তাঁহাদিগকে অন্যান্য মানব শ্রেণী হইতে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত করিয়া তুলিয়াছে।