📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াতের দুইটি পর্যায়

📄 নবুওয়াতের দুইটি পর্যায়


নবীর আবির্ভাবকে দুইটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। একটি হইল, একজন নবীর নবুওয়াত দ্বারা তাঁহার অনুসারী উম্মত হিদায়ত লাভ করিবে। দ্বিতীয় পর্যায় হইল, তাঁহার উম্মতের বিকীরিত হিদায়াত দ্বারা অন্যান্য উম্মতও অন্ধকার হইতে আলোর পথে আসিবে। যেই নবীর মধ্যে আবির্ভাবের এই দুই পর্যায় পাওয়া যাইবে তিনিই হইবেন নবুওয়াতের উচ্চ সোপানের অধিকারী। এই নবীর সত্তাগত আবির্ভাবকে প্রথম পর্যায় এবং তাঁহার উম্মতের দ্বারা অন্যান্য উম্মতের হিদায়াতের যে সুযোগ লাভ হয় ইহাকে দ্বিতীয় পর্যায়ভুক্ত আবির্ভাব বলা হয়। নবুওয়াতের প্রথম পর্যায়ের দিকে ইঙ্গিত করিয়া ইরশাদ হইয়াছেঃ
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولاً مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ والحكمة (الجمعة - ٢).
"তিনিই উম্মীদের মধ্যে একজন রাসূল পাঠাইয়াছেন তাহাদের মধ্য হহতে, যে তাহাদের নিকট আবৃত্তি করে তাঁহার আয়াতসমূহ, তাহাদিগকে পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমত" (৬২: ২)।
দ্বিতীয় পর্যায়ের আবির্ভাবের প্রতি এই আয়াতে ইঙ্গিত রহিয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ (ال عمران ۱۱).
"তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হইয়াছে; তোমরা সৎ কার্যের নির্দেশ দান কর, অসৎ কার্যের নিষেধ কর” (৩: ১১০)।
এই আয়াত হইতে প্রতীয়মান হয় যে, যেইভাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবী হিসাবে প্রেরণ তাঁহার উম্মতের জন্য হইয়াছিল অনুরূপ তাঁহার উম্মতের প্রেরণ ছিল অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর প্রতি। আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত হইতেও এই কথাই স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছেঃ
لِيَكُونَ الرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ (الحج ۷۷).
"যাহাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হয় এবং তোমরা সাক্ষীস্বরূপ হও মানবজতির জন্য" (২২ঃ ৭৭)।
এইজন্য হাদীছে বর্ণিত রহিয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সাহাবীগণকে উদ্দেশ্য করিয়া ইরশাদ করিয়াছেন :
فَإِنَّمَا بُعِثْتُمْ مُيَسِرِينَ وَلَمْ تُبْعَثُوا مُعَسِرِينَ.
"তোমাদেরকে সহজকরণের নিমিত্তে প্রেরণ করা হইয়াছে, কঠোরতা প্রদর্শনের জন্য তোমরা প্রেরিত হও নাই"।
রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই দুই পর্যায়ের পূর্ণ যোগ্যতা প্রদান করা হইয়াছিল (শাহ ওলীউল্লাহ্ মুহাদ্দিছ দেহলাবী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, ১খ., পৃ. ৮৪)।

নবীর আবির্ভাবকে দুইটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। একটি হইল, একজন নবীর নবুওয়াত দ্বারা তাঁহার অনুসারী উম্মত হিদায়ত লাভ করিবে। দ্বিতীয় পর্যায় হইল, তাঁহার উম্মতের বিকীরিত হিদায়াত দ্বারা অন্যান্য উম্মতও অন্ধকার হইতে আলোর পথে আসিবে। যেই নবীর মধ্যে আবির্ভাবের এই দুই পর্যায় পাওয়া যাইবে তিনিই হইবেন নবুওয়াতের উচ্চ সোপানের অধিকারী। এই নবীর সত্তাগত আবির্ভাবকে প্রথম পর্যায় এবং তাঁহার উম্মতের দ্বারা অন্যান্য উম্মতের হিদায়াতের যে সুযোগ লাভ হয় ইহাকে দ্বিতীয় পর্যায়ভুক্ত আবির্ভাব বলা হয়। নবুওয়াতের প্রথম পর্যায়ের দিকে ইঙ্গিত করিয়া ইরশাদ হইয়াছে:
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولاً مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ والحكمة (الجمعة - ٢).
"তিনিই উম্মীদের মধ্যে একজন রাসূল পাঠাইয়াছেন তাহাদের মধ্য হহতে, যে তাহাদের নিকট আবৃত্তি করে তাঁহার আয়াতসমূহ, তাহাদিগকে পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ও হিকমত" (৬২: ২)।
দ্বিতীয় পর্যায়ের আবির্ভাবের প্রতি এই আয়াতে ইঙ্গিত রহিয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ (ال عمران ۱۱).
"তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হইয়াছে; তোমরা সৎ কার্যের নির্দেশ দান কর, অসৎ কার্যের নিষেধ কর” (৩: ১১০)।
এই আয়াত হইতে প্রতীয়মান হয় যে, যেইভাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবী হিসাবে প্রেরণ তাঁহার উম্মতের জন্য হইয়াছিল অনুরূপ তাঁহার উম্মতের প্রেরণ ছিল অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর প্রতি। আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত হইতেও এই কথাই স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছেঃ
لِيَكُونَ الرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ (الحج ۷۷).
"যাহাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হয় এবং তোমরা সাক্ষীস্বরূপ হও মানবজতির জন্য" (২২ঃ ৭৭)।
এইজন্য হাদীছে বর্ণিত রহিয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সাহাবীগণকে উদ্দেশ্য করিয়া ইরশাদ করিয়াছেন :
فَإِنَّمَا بُعِثْتُمْ مُيَسِرِينَ وَلَمْ تُبْعَثُوا مُعَسِرِينَ.
"তোমাদেরকে সহজকরণের নিমিত্তে প্রেরণ করা হইয়াছে, কঠোরতা প্রদর্শনের জন্য তোমরা প্রেরিত হও নাই"।
রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই দুই পর্যায়ের পূর্ণ যোগ্যতা প্রদান করা হইয়াছিল (শাহ ওলীউল্লাহ্ মুহাদ্দিছ দেহলাবী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, ১খ., পৃ. ৮৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূল প্রেরণের জন্য কোন জাতি নির্বাচন

📄 রাসূল প্রেরণের জন্য কোন জাতি নির্বাচন


রাসূল প্রেরণের জন্য কোন জাতি নির্বাচন
ইহা সুস্পষ্ট যে, রাসূল প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা আল্লাহ পাকের হিকমত অনুযায়ী তখনই দেখা দেয় যখন বিশ্বের সার্বিক নিয়ম-শৃংখলা ও স্থিতিশীলতা প্রকট হইয়া উঠে। এই শৃংখলা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সেই কালে কেবল এই রাসূলের আবির্ভাবের সঙ্গেই সম্পৃক্ত হইয়া থাকে। বিশ্বের অগণিত জাতির মধ্য হইতে যেই জাতি আল্লাহ পাকের ইবাদত ও আনুগত্য প্রকাশের শক্তি ও যোগ্যতা বেশী রাখে এবং তাঁহার রহমত ও করুণা অধিক মাত্রায় ধারণ করিতে সক্ষম সেই জাতির প্রতিই সংশ্লিষ্ট রাসূল প্রেরিত হন। যেহেতু এই জাতির সংশোধন সেই নবীর অনুসরণের মধ্যে নিহিত থাকে, আল্লাহ তা'আলা সেই নবীর অনুসরণ করা তাহাদের সকলের উপর ওয়াজিব করিয়াছেন। রাসূলের আবির্ভাবের সময় যদি কোন ফাসাদ সৃষ্টিকারী সাম্রাজ্য নির্মূল করিয়া নূতন কোন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন হয় তাহা হইলে আল্লাহ তা'আলা সেখানে একজন রাসূল প্রেরণ করেন যিনি অপকর্মকারী জাতিকে ও ইহার ধর্ম সর্বাগ্রে সংশোধন করেন। পরে এই জাতির দ্বারা অন্যান্য জাতিও সংশোধিত হয়। এই লক্ষ্যে আমাদের নবী মুহাম্মাদ (স)-এর আবির্ভাব ঘটিয়াছিল।
আর আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট যদি এইরূপ হয় যে, আল্লাহ তা'আলা কোন জাতিকে স্থায়িত্ব দান ও শান্তিময় অবস্থানে সমুন্নত করিবার ইচ্ছা করেন, তখন তাহাদের মধ্যে এমন একজনকে প্রেরণ করেন যিনি তাহাদের যাবতীয় আবিলতা দূর করিয়া আল্লাহ্ কিতাবের শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করিবেন। এইরূপ আবির্ভাবের দৃষ্টান্ত হইলেন মূসা ('আ)। তাঁহার আবির্ভাবের লক্ষ্য ছিল বানু ইসরাঈলকে প্রতিষ্ঠা করা।
আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট যদি এইরূপ হয় যে, কোন জাতি সম্পর্কে আল্লাহ্র ফায়সালা হইল তাহাদেরকে দীর্ঘায়ু দান করা, তাহাদেরকে স্বীয় ধর্মে স্থির রাখা, তখন তাহাদের মধ্যে ধর্মের সংস্কারকগণ আবির্ভূত হন। যেমন বানু ইসরাঈলে বিভিন্ন সময়ে হযরত দাউদ ('আ), হযরত সুলায়মান ('আ) প্রমুখ নবীর আবির্ভাব ঘটিয়াছিল।

রাসূল প্রেরণের জন্য কোন জাতি নির্বাচন
ইহা সুস্পষ্ট যে, রাসূল প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা আল্লাহ পাকের হিকমত অনুযায়ী তখনই দেখা দেয় যখন বিশ্বের সার্বিক নিয়ম-শৃংখলা ও স্থিতিশীলতা প্রকট হইয়া উঠে। এই শৃংখলা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সেই কালে কেবল এই রাসূলের আবির্ভাবের সঙ্গেই সম্পৃক্ত হইয়া থাকে। বিশ্বের অগণিত জাতির মধ্য হইতে যেই জাতি আল্লাহ পাকের ইবাদত ও আনুগত্য প্রকাশের শক্তি ও যোগ্যতা বেশী রাখে এবং তাঁহার রহমত ও করুণা অধিক মাত্রায় ধারণ করিতে সক্ষম সেই জাতির প্রতিই সংশ্লিষ্ট রাসূল প্রেরিত হন। যেহেতু এই জাতির সংশোধন সেই নবীর অনুসরণের মধ্যে নিহিত থাকে, আল্লাহ তা'আলা সেই নবীর অনুসরণ করা তাহাদের সকলের উপর ওয়াজিব করিয়াছেন। রাসূলের আবির্ভাবের সময় যদি কোন ফাসাদ সৃষ্টিকারী সাম্রাজ্য নির্মূল করিয়া নূতন কোন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন হয় তাহা হইলে আল্লাহ তা'আলা সেখানে একজন রাসূল প্রেরণ করেন যিনি অপকর্মকারী জাতিকে ও ইহার ধর্ম সর্বাগ্রে সংশোধন করেন। পরে এই জাতির দ্বারা অন্যান্য জাতিও সংশোধিত হয়। এই লক্ষ্যে আমাদের নবী মুহাম্মাদ (স)-এর আবির্ভাব ঘটিয়াছিল।
আর আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট যদি এইরূপ হয় যে, আল্লাহ তা'আলা কোন জাতিকে স্থায়িত্ব দান ও শান্তিময় অবস্থানে সমুন্নত করিবার ইচ্ছা করেন, তখন তাহাদের মধ্যে এমন একজনকে প্রেরণ করেন যিনি তাহাদের যাবতীয় আবিলতা দূর করিয়া আল্লাহ্ কিতাবের শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করিবেন। এইরূপ আবির্ভাবের দৃষ্টান্ত হইলেন মূসা ('আ)। তাঁহার আবির্ভাবের লক্ষ্য ছিল বানু ইসরাঈলকে প্রতিষ্ঠা করা।
আবির্ভাবের প্রেক্ষাপাপট যদি এইরূপ হয় যে, কোন জাতি সম্পর্কে আল্লাহ্র ফায়সালা হইল তাহাদেরকে দীর্ঘায়ু দান করা, তাহাদেরকে স্বীয় ধর্মে স্থির রাখা, তখন তাহাদের মধ্যে ধর্মের সংস্কারকগণ আবির্ভূত হন। যেমন বানু ইসরাঈলে বিভিন্ন সময়ে হযরত দাউদ ('আ), হযরত সুলায়মান ('আ) প্রমুখ নবীর আবির্ভাব ঘটিয়াছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবীগণের সুনিশ্চিত সফলতা

📄 নবীগণের সুনিশ্চিত সফলতা


নবীগণের সুনিশ্চিত সফলতা
সকল নবীর আবির্ভাবের প্রাক্কালে আল্লাহ তা'আলার এই সিদ্ধান্ত থাকে যে, তিনি নবী ও তাঁহার অনুগামীগণকে সফলতা দান করিবেন, তাঁহার বিরুদ্ধবাদীদিগকে একের পর এক পরাজয়ের সম্মুখীন করিবেন, যাহাতে সত্যের প্রতিষ্ঠা ও দাওয়াতের কাজ পরিপূর্ণতা লাভ করে। এই সম্পর্কে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ سَبَقَتْ كَلِمَتُنَا لِعِبَادِنَا الْمُرْسَلِينَ. أَنَّهُمْ لَهُمُ الْمَنْصُورُونَ. وَإِنَّ جُنْدَنَا لَهُمُ الْغَالِبُونَ (الصفت - ۱۷۱-۱۷۳).
"আমার প্রেরিত বান্দাদের সম্পর্কে আমার এই বাক্য পূর্বেই স্থির হইয়াছে যে, অবশ্যই তাহারা সাহায্যপ্রাপ্ত হইবে এবং আমার বাহিনীই হইবে বিজয়ী (৩৭: ১৭১-১৭৩)।
ঘটনাবলী দ্বারা এই নীতি প্রমাণিত। জনগণের মনস্তত্ত্ব (Psychology of People) ও নেতৃত্বের মনস্তত্ত্বের (Psychology of Leadership) ঘটনাবলী ইহার প্রমাণ বহন করে। ইমাম গাযালী ও শাহ ওলীউল্লাহ্ মুহাদ্দিছ দেহলাবী নবুওয়াত ও ইহার সফলতা সম্পর্কে যেই সারগর্ভ আলোচনা করিয়াছেন উহাকে রূপক অর্থে নবুওয়াতের মনস্তত্ত্ব (নফসিয়াত নবুওয়াত) বলিয়া অভিহিত করা যায় (শিবলী নু'মানী-সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত)।

নবীগণের সুনিশ্চিত সফলতা
সকল নবীর আবির্ভাবের প্রাক্কালে আল্লাহ তা'আলার এই সিদ্ধান্ত থাকে যে, তিনি নবী ও তাঁহার অনুগামীগণকে সফলতা দান করিবেন, তাঁহার বিরুদ্ধবাদীদিগকে একের পর এক পরাজয়ের সম্মুখীন করিবেন, যাহাতে সত্যের প্রতিষ্ঠা ও দাওয়াতের কাজ পরিপূর্ণতা লাভ করে। এই সম্পর্কে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ سَبَقَتْ كَلِمَتُنَا لِعِبَادِنَا الْمُرْسَلِينَ. أَنَّهُمْ لَهُمُ الْمَنْصُورُونَ. وَإِنَّ جُنْدَنَا لَهُمُ الْغَالِبُونَ (الصفت - ۱۷۱-۱۷۳).
"আমার প্রেরিত বান্দাদের সম্পর্কে আমার এই বাক্য পূর্বেই স্থির হইয়াছে যে, অবশ্যই তাহারা সাহায্যপ্রাপ্ত হইবে এবং আমার বাহিনীই হইবে বিজয়ী (৩৭: ১৭১-১৭৩)।
ঘটনাবলী দ্বারা এই নীতি প্রমাণিত। জনগণের মনস্তত্ত্ব (Psychology of People) ও নেতৃত্বের মনস্তত্ত্বের (Psychology of Leadership) ঘটনাবলী ইহার প্রমাণ বহন করে। ইমাম গাযালী ও শাহ ওলীউল্লাহ্ মুহাদ্দিছ দেহলাবী নবুওয়াত ও ইহার সফলতা সম্পর্কে যেই সারগর্ভ আলোচনা করিয়াছেন উহাকে রূপক অর্থে নবুওয়াতের মনস্তত্ত্ব (নফসিয়াত নবুওয়াত) বলিয়া অভিহিত করা যায় (শিবলী নু'মানী-সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মানবজাতির মধ্যে নবী-রাসূল প্রেরণের কারণ

📄 মানবজাতির মধ্যে নবী-রাসূল প্রেরণের কারণ


মানবজাতির মধ্যে নবী-রাসূল প্রেরণের কারণ
যেই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য জগতের প্রতিটি অণু-পরমাণু সৃষ্টি করা হইয়াছে তাহা নিজস্ব ইচ্ছা ও সংকল্প ব্যতিরেকেই স্বভাবতই যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করিয়া চলিতেছে। সৃষ্টি লগ্নে স্রষ্টা যেই নির্দেশ প্রদান করিয়াছিলেন তাহা মান্য করিতে কোন বস্তুই চুল পরিমাণও ত্রুটি করিতেছে না। নভোমণ্ডল হইতে ভূমণ্ডল পর্যন্ত বিস্তৃত সকল জিনিস নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে ব্রতী রহিয়াছে। সূর্য পৃথিবীকে তাপ ও আলো দানের কাজে নিয়োজিত। ভূমি সবুজ শ্যামল থাকিবার কাজে ব্যস্ত। মেঘপূঞ্জ পানি দান ও সিক্তকরণের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করিয়া যাইতেছে। বৃক্ষ নির্দেশমত ফলমূল দানে রত রহিয়াছে। প্রাণীকুলের উপর যেই ভার ন্যস্ত করা হইয়াছে তাহারা সানন্দে তাহা পালন করিয়া যাইতেছে। ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে মানবজাতির উপর অনুরূপ কোন দায়িত্ব অর্পণ করা হইয়াছে কিনা? যদি করা হইয়া থাকে তাহা হইলে তাহারা ইহা কি সম্পাদন করিতেছে?
বাহ্যত মানুষ খানাপিনা, হাঁটাচলা ও উঠাবসা করিয়া জীবন যাপন করিতেছে। এক সময় সে ইন্তিকালও করিতেছে। এখানেই কি মানব জীবনের সমাপ্তি? যদি তাহাই হয় তাহা হইলে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে কি পার্থক্য? ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন ও ইচ্ছাশক্তিহীনের মধ্যে তফাৎটি কি, বুদ্ধিমান ও নির্বোধের মধ্যে ফারাক কোথায়? এইজন্যই আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا (المؤمنون - ١١٥). "তোমরা কি মনে করিয়াছিলে যে, আমি তোমাদিগকে অনর্থক সৃষ্টি করিয়াছি" (২৩: ১১৫)।
أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَنْ يُتْرَكَ سُدًى (القيامة - ৩৬) . "মানুষকি মনে করে যে, তাহাকে নিরর্থক ছাড়িয়া দেওয়া হইবে" (৭৫: ৩৬)।
আয়াত দুইটির মমার্থ হইতে বুঝা যায় মানুষ কোন উদ্দেশ্যে ও লক্ষ্যে সৃজিত হইয়াছে। সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি? মানুষের সার্বিক অস্তিত্বও যদি ভূমণ্ডল হইতে নিশ্চিহ্ন হইয়া যায় তাহা হইলেও সূর্য সমভাবে আলো দিতে থাকিবে, সমুদ্র তরঙ্গায়িত হইতে থাকিবে, বাতাস বহিতে থাকিবে, পানি বর্ষিত হইবে, সবুজ তৃণলতা একইভাবে উদগত হইবে, বৃক্ষ ফল-ফলাদি দান করিবে। পক্ষান্তরে যদি বৃক্ষ ফল দান না করে, তৃণলতা উৎপন্ন না হয়, পানি বর্ষিত না হয়, বায়ু প্রবাহিত না হয় তাহা হইলে মানুষ মৃত্যুপথের যাত্রী হইবে। ভূমণ্ডল না হইলে মানুষ দাঁড়াইবারও স্থান পাইবে না। সূর্য উদিত না হইলে মনুষের অস্তিত্বের বাতি নির্বাপিত হইয়া পড়িবে। মোটকথা, পৃথিবীর কোন জিনিস তাহার অস্তিত্ব বিকাশের জন্য মানুষের মুখাপেক্ষী নয়, কিন্তু মানুষ নিজের অস্তিত্ব বিকাশের জন্য নিখিলবিশ্বের প্রতিটি বস্তুর মুখাপেক্ষী। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, এই জগতের প্রতিটি জিনিসের সৃষ্টির উদ্দেশ্য হইল মানুষের অস্তিত্ব টিকাইয়া রাখা। কিন্তু মানুষের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য হইল অন্য কোন গুরুত্ববহ বিষয়। অন্যান্য সৃষ্টিকুল সম্পর্কে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا (البقرة - ৩৪). "তিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন” (২: ২৯)
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ (الحج - ৬৫). "তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করিয়াছেন পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে তৎসমুদয়কে" (২২: ৬৫)।
ভূমণ্ডলে যাহা কিছু রহিয়াছে তাহার কথা উল্লেখ করিবার পর নভোমণ্ডল সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَسَخَّرَ لَكُمُ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتِ بِأَمْرِهِ (النحل -১২). "তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করিয়াছেন রজনী, দিবস, সূর্য এবং চন্দ্রকে। আর নক্ষত্ররাজিও অধীন হইয়াছে তাঁহারই নির্দেশে” (১৬: ১২)।
লক্ষণীয় যে, সৃষ্টিকুলের অধস্থন বস্তু তাহার তুলনায় উর্দ্ধতনের সেবা করিতেছে। জড়জগৎ উদ্ভিদ জগতের, উদ্ভিদ জগৎ প্রাণী জগতের, আবার জড়, উদ্ভিদ ও প্রাণী এই তিন জগতই মানবজাতির কল্যাণ সাধনে নিয়োজিত। তাই মানবজাতিকেও উন্নততর কোন অস্তিত্বের কাজে রত থাকা উচিৎ। সৃষ্টিকূলে মানবজাতির ঊর্ধ্বে কোন কিছুর অস্তিত্ব নাই। ফলে তাহার সৃষ্টি স্বয়ং স্রষ্টার জন্যই। যেমন ইরশাদ হইয়াছে।
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُون (الذاريات - ٥٦) . “আমি সৃষ্টি করিয়াছি জিন এবং মানুষকে এইজন্য যে, তাহারা আমারই ইবাদত করিবে” (৫১:৫৬)।
সৃষ্টিজগৎ মূলত তিন শ্রেণীতে বিভক্ত: (এক) যাহা বুদ্ধি-বিবেকও কল্পনাশক্তি হইতে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। যেমন, চন্দ্র সূর্য, পৃথিবী, পাথর, মাটি, বৃক্ষ ও ফলমূল।
(দুই) যাহাদের প্রাথমিক অনুভূতি ও বিবেকবুদ্ধি রহিয়াছে কিন্তু চিন্তালব্ধ সিদ্ধান্ত কিংবা উদাহরণ ও উপাত্তকে অবলম্বন করিয়া নূতন কিছুর আবিষ্কার করা তাহাদের ক্ষমতা বহির্ভূত। তাহাদের ইচ্ছা ও অনুভূতি কেবলমাত্র দৃশ্যমান বস্তু পর্যন্ত সীমিত। যেমন প্রাণী জগৎ।
(তিন) যেই জগৎ বিবেক-বুদ্ধি এবং চিন্তাশক্তি সম্পন্ন। তাহারা গবেষণা করে, অনুসন্ধান ও দৃষ্টান্ত অবলম্বনে জীবন সমস্যার সমাধান করিতে পারে। ক্ষুদ্র হইতে বৃহৎ ও বৃহৎ হইতে ক্ষুদ্র বস্তু আবিষ্কার করে। কল্পনাশক্তির সাহায্যে নূতন বাস্তবতায় উপনীত হয়। প্রথম প্রকার সৃষ্টি হইতে যেই গতি ও লক্ষণাদি প্রকাশ পায় তাহা বাধ্যতামূলক অনিচ্ছাকৃত সমভাবে স্থায়ী। এই কারণে তাহাদের এই গুণকে সৃষ্টিগত শক্তি ও স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য বলা হয়। দ্বিতীয় প্রকার সৃষ্টি হইতে যেই সকল প্রভাব ও গতি পরিলক্ষিত হয় তাহা ইচ্ছা, অনুভূতি ও প্রাথমিক বোধ-জ্ঞানের অধীন। তাহাদের প্রত্যেকের কাজে স্পন্দন ও গতিময়তা সমভাবে প্রকাশ পায়। এই নিয়মতান্ত্রিকতায় ব্যতিক্রম হয় না। উহাদের কাজ ও গতিময়তাকে তাহাদের সহজাত স্বভাব বলিয়া আখ্যায়িত করা হয়। ইহার বাহিরে কোন কাজ করিবার শক্তি ইহাদের নাই। তৃতীয় শ্রেণীর মাখলুকের কিছু কিছু কর্মকাণ্ড অন্যান্য শ্রেণীর মাখলুকাতের মতই স্বভাবজাত, তবুও তাহাদের বহু কাজ এমনও রহিয়াছে যাহা কেবল তাহাদের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষায় ঘটিয়া থাকে। এই শ্রেণীর কাজের ভিত্তিতেই মঙ্গল-অমঙ্গল ও পাপ-পূণ্য নির্ণীত হয়। তাহাদের সার্বিক বুদ্ধিমত্তার কাজ, পরিণামদর্শিতা ও কাজের ভালমন্দ তাহাদের ইচ্ছারই প্রতিফলন। ইহার ফলেই তাহাদের উপর দায়িত্বশীলতা আরোপিত হয়। মানব ও জিন্ন ব্যতিরেকে সকল প্রাণী ভাল-মন্দের দায়িত্ব হইতে মুক্ত। জড় ও উদ্ভিদ জগৎ সর্বদিক দিয়া বাধ্য। প্রাণী জগতের সকল কাজও স্বভাব জাত। ফলে তাহারাও দায়িত্বশীলতা হইতে মুক্ত। ফেরেশতাগণও সৃষ্টিগত স্বভাব অনুযায়ী কেবল আল্লাহর আনুগত্যে বাধ্য। তাহাদের দ্বারা কোন গুনাহের কাজ সংঘটিত হয় না। তাই তাহারাও যিম্মাদারি হইতে মুক্ত।
কেবল মানুষ ও জিনই এমন মাখলুক যাহার অনেক কথা ও কাজে নিজ নিজ ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা ও জ্ঞানানুশীলনের বিকাশ দেখা যায়। পাপ ও পুণ্য এবং মঙ্গল ও অমঙ্গল উভয় প্রকার কার্যের কোন একটির ব্যাপারে মানুষ বাধ্য নয়। মানুষ বুদ্ধিমত্তা ও অনুধাবন শক্তির সাহায্যে কাজের পরিণাম বুঝিয়া কার্য সম্পাদন করে। এইজন্য সত্য-মিথ্যা ও ভাল-মন্দের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের জন্য মানুষ আল্লাহ্ প্রদত্ত ওহীর মুখাপেক্ষী। জড়জগৎ, উদ্ভিদ জগৎ ও অন্যান্য সৃষ্টি আল্লাহ্ পাকের নির্দেশ পালনে বাধ্য, তাহা আল-কুরআনে এইভাবে তুলিয়া ধরা হইয়াছে:
وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مِنْ دَابَّةٍ وَالْمَلَائِكَةُ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ. (النحل - ٤٩ ) .
"আল্লাহকেই সিজদা করে যাহা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে, পৃথিবীতে যত জীবজন্তু আছে সে সমস্ত এবং ফেরেশতাগণও; উহারা অহংকার করে না" (১৬ : ৪৯)।
এই সহজাত আনুগত্যকে সৃষ্টিগত ওহীও বলা চলে। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا وَمِنَ الشَّجَرِ وَمِمَّا يَعْرِشُونَ. ثُمَّ على مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ فَاسْلُكِي سُبُلَ رَبِّكَ ذُلُلاً (النحل - ٦٨) .
"তোমার প্রতিপালক মৌমাছিকে উহার অন্তরে ইংগিত দ্বারা নির্দেশ দিয়াছেন, গৃহ নির্মাণ কর পাহাড়ে, বৃক্ষে ও মানুষ যে গৃহ নির্মাণ করে তাহাতে, ইহার পর প্রত্যেক ফল হইতে কিছু কিছু আহার কর, অতঃপর তোমার প্রতিপালকের সহজ অনুসরণ কর" (২৬ : ৬৮-৬৯)।
এই আয়াতে সহজাত ইলহামকে বাধ্যতামূলক আল্লাহ পাকের আনুগত্য হিসাবে চিত্রায়িত করা হইয়াছে। অন্যত্র তাহাদেরকে স্বীয় সৃষ্টিকর্তার এই হুকুমকে সহজাতভাবে পালন করিবার অবস্থাকে সালাত ও তাসবীহ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللهَ يُسَبِّحُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالطَّيْرُ صُفْتِ كُلٌّ قَدْ عَلِمَ صَلَاتَهُ وَتَسْبِيحَهُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِمَا يَفْعَلُوْنَ (النور - ٤١) .
"তুমি কি দেখ না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যাহারা আছে তাহারা এবং উড্ডীয়মান বিহংগকুল আল্লাহ্র পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই জানে তাহার ইবাদতের ও পবিত্রতা ঘোষণার পদ্ধতি এবং উহারা যাহা করে সে বিষয়ে আল্লাহ্ সম্যক জ্ঞাত" (২৪ : ৪১)।
কিন্তু মানবজাতিকে অন্যান্য মাখলুকাতের মত নিছক মুখাপেক্ষী করিয়া সৃষ্টি করা হয় নাই। তাহার উপর জগতের মত আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্য প্রকাশের বাধ্যতামূলক বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয় নাই, বরং ইচ্ছাগত আনুগত্যের জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَنْ يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنْسَانُ (الاحزاب -৭২).
"আমি তো আসমান, যমীন ও পর্বতমালার প্রতি এই আমানত পেশ করিয়াছিলাম, উহারা ইহা বহন করিতে অস্বীকার করিল এবং উহাতে শংকিত হইল, কিন্তু মানুষ উহা বহন করিল" (৩৩ঃ ৭২)।
এই আমানত হইতেছে পাপ-পুণ্য ও ভাল-মন্দের বিচার-বিশ্লেষণের জ্ঞানের নাম, যাহার ভিত্তিতে আল্লাহ্ বিধান নাযিল করা হইয়াছে। এই আমানতের যিম্মাদারি পরিপূর্ণভাবে আদায় করিবার লক্ষ্যে মানুষের জন্য ইচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ড ও অনিচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ডের মত আল্লাহ পাকের বিধানাবলীর অনুসরণ করা আবশ্যক। অর্থাৎ যেইভাবে অনিচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ডে সহজাত অনুভূতির মাধ্যমে আল্লাহ পাকের নির্দেশাবলী সুষ্ঠুভাবে পালন করা হয় সেইভাবে ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগ করিয়া স্বেচ্ছায় শরী'আতের বিধানাবলী পালন করিয়া পরিপূর্ণভাবে আমানতের যিম্মাদারি আদায় করা কর্তব্য।
কিন্তু কাহারও প্রতি আনুগত্য প্রকাশ সেই পর্যন্ত সম্ভব নয় যতক্ষণ পর্যন্ত তাহার আদেশ-নিষেধ ও বিধিবিধান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত না হওয়া যায়। তাই নবী ও রাসূলের উপরই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় আহকাম ও বিধানাবলীর ওহী প্রেরণ করেন। তাহারা ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন বান্দাদেরকে এই সম্পর্কে সচেতন করেন এবং আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্য প্রকাশের আহবান জানান। সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করিলে প্রতীয়মান হয় যে, মানব ব্যতীত সকল সৃষ্টিজগৎ আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য সহজাত প্রবৃত্তির দ্বারা স্বীকার করিয়া চলিতেছে। কিন্তু পরিমিত ইচ্ছাশক্তির অধিকারী মানুষ বহু ক্ষেত্রে স্বীয় সৃষ্টিকর্তার নির্দেশের বিরোধিতা করিবার প্রয়াস পায়। এই অবস্থা আল-কুরআনে এইভাবে ইরশাদ হইয়াছে:
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوابُ وَكَثِيرٌ مِّنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ (الحج - ۱۸).
"তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যাহা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে, আবার অনেকের প্রতি অবধারিত হইয়াছে শাস্তি" (২২:১৮)।
লক্ষণীয় বিষয় হইল, মানুষ ব্যতীত ইচ্ছাশক্তি ও বুদ্ধিমত্তাহীন অন্যান্য সকল মাখলুক আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য প্রকাশ করে। কিন্তু জ্ঞানবান পরিণামদর্শী ও ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন মানুষ আনুগত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে দ্বিধাবিভক্ত হইয়া পড়িয়াছে। ইহাদের একদল হইতেছে অনুগত বান্দা আর অপর দল হইতেছে পাপাচারী। যাহারা সর্বযুগে নবী-রাসূলের অনুগামী ছিল তাহারা হইল আল্লাহর অনুগত বান্দা। আর যাহারা স্ব-স্ব যুগে নবীর আনীত বিধানের প্রতি ঈমান আনে নাই ও তদনুযায়ী আমল করে নাই তাহারা হইল অবাধ্য পাপাচারী (শিবলী নু'মানী-সুলায়মান নাদবী,, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩-২৭)।

মানবজাতির মধ্যে নবী-রাসূল প্রেরণের কারণ
যেই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য জগতের প্রতিটি অণু-পরমাণু সৃষ্টি করা হইয়াছে তাহা নিজস্ব ইচ্ছা ও সংকল্প ব্যতিরেকেই স্বভাবতই যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করিয়া চলিতেছে। সৃষ্টি লগ্নে স্রষ্টা যেই নির্দেশ প্রদান করিয়াছিলেন তাহা মান্য করিতে কোন বস্তুই চুল পরিমাণও ত্রুটি করিতেছে না। নভোমণ্ডল হইতে ভূমণ্ডল পর্যন্ত বিস্তৃত সকল জিনিস নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে ব্রতী রহিয়াছে। সূর্য পৃথিবীকে তাপ ও আলো দানের কাজে নিয়োজিত। ভূমি সবুজ শ্যামল থাকিবার কাজে ব্যস্ত। মেঘপূঞ্জ পানি দান ও সিক্তকরণের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করিয়া যাইতেছে। বৃক্ষ নির্দেশমত ফলমূল দানে রত রহিয়াছে। প্রাণীকুলের উপর যেই ভার ন্যস্ত করা হইয়াছে তাহারা সানন্দে তাহা পালন করিয়া যাইতেছে। ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে মানবজাতির উপর অনুরূপ কোন দায়িত্ব অর্পণ করা হইয়াছে কিনা? যদি করা হইয়া থাকে তাহা হইলে তাহারা ইহা কি সম্পাদন করিতেছে?
বাহ্যত মানুষ খানাপিনা, হাঁটাচলা ও উঠাবসা করিয়া জীবন যাপন করিতেছে। এক সময় সে ইন্তিকালও করিতেছে। এখানেই কি মানব জীবনের সমাপ্তি? যদি তাহাই হয় তাহা হইলে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে কি পার্থক্য? ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন ও ইচ্ছাশক্তিহীনের মধ্যে তফাৎটি কি, বুদ্ধিমান ও নির্বোধের মধ্যে ফারাক কোথায়? এইজন্যই আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا (المؤمنون - ١١٥). "তোমরা কি মনে করিয়াছিলে যে, আমি তোমাদিগকে অনর্থক সৃষ্টি করিয়াছি" (২৩: ১১৫)।
أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَنْ يُتْرَكَ سُدًى (القيامة - ৩৬) . "মানুষকি মনে করে যে, তাহাকে নিরর্থক ছাড়িয়া দেওয়া হইবে" (৭৫: ৩৬)।
আয়াত দুইটির মমার্থ হইতে বুঝা যায় মানুষ কোন উদ্দেশ্যে ও লক্ষ্যে সৃজিত হইয়াছে। সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি? মানুষের সার্বিক অস্তিত্বও যদি ভূমণ্ডল হইতে নিশ্চিহ্ন হইয়া যায় তাহা হইলেও সূর্য সমভাবে আলো দিতে থাকিবে, সমুদ্র তরঙ্গায়িত হইতে থাকিবে, বাতাস বহিতে থাকিবে, পানি বর্ষিত হইবে, সবুজ তৃণলতা একইভাবে উদগত হইবে, বৃক্ষ ফল-ফলাদি দান করিবে। পক্ষান্তরে যদি বৃক্ষ ফল দান না করে, তৃণলতা উৎপন্ন না হয়, পানি বর্ষিত না হয়, বায়ু প্রবাহিত না হয় তাহা হইলে মানুষ মৃত্যুপথের যাত্রী হইবে। ভূমণ্ডল না হইলে মানুষ দাঁড়াইবারও স্থান পাইবে না। সূর্য উদিত না হইলে মনুষের অস্তিত্বের বাতি নির্বাপিত হইয়া পড়িবে। মোটকথা, পৃথিবীর কোন জিনিস তাহার অস্তিত্ব বিকাশের জন্য মানুষের মুখাপেক্ষী নয়, কিন্তু মানুষ নিজের অস্তিত্ব বিকাশের জন্য নিখিলবিশ্বের প্রতিটি বস্তুর মুখাপেক্ষী। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, এই জগতের প্রতিটি জিনিসের সৃষ্টির উদ্দেশ্য হইল মানুষের অস্তিত্ব টিকাইয়া রাখা। কিন্তু মানুষের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য হইল অন্য কোন গুরুত্ববহ বিষয়। অন্যান্য সৃষ্টিকুল সম্পর্কে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا (البقرة - ৩৪). "তিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন” (২: ২৯)
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ (الحج - ৬৫). "তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করিয়াছেন পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে তৎসমুদয়কে" (২২: ৬৫)।
ভূমণ্ডলে যাহা কিছু রহিয়াছে তাহার কথা উল্লেখ করিবার পর নভোমণ্ডল সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَسَخَّرَ لَكُمُ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتِ بِأَمْرِهِ (النحل -১২). "তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করিয়াছেন রজনী, দিবস, সূর্য এবং চন্দ্রকে। আর নক্ষত্ররাজিও অধীন হইয়াছে তাঁহারই নির্দেশে” (১৬: ১২)।
লক্ষণীয় যে, সৃষ্টিকুলের অধস্থন বস্তু তাহার তুলনায় উর্দ্ধতনের সেবা করিতেছে। জড়জগৎ উদ্ভিদ জগতের, উদ্ভিদ জগৎ প্রাণী জগতের, আবার জড়, উদ্ভিদ ও প্রাণী এই তিন জগতই মানবজাতির কল্যাণ সাধনে নিয়োজিত। তাই মানবজাতিকেও উন্নততর কোন অস্তিত্বের কাজে রত থাকা উচিৎ। সৃষ্টিকূলে মানবজাতির ঊর্ধ্বে কোন কিছুর অস্তিত্ব নাই। ফলে তাহার সৃষ্টি স্বয়ং স্রষ্টার জন্যই। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُون (الذاريات - ٥٦) . “আমি সৃষ্টি করিয়াছি জিন এবং মানুষকে এইজন্য যে, তাহারা আমারই ইবাদত করিবে” (৫১:৫৬)।
সৃষ্টিজগৎ মূলত তিন শ্রেণীতে বিভক্ত: (এক) যাহা বুদ্ধি-বিবেকও কল্পনাশক্তি হইতে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। যেমন, চন্দ্র সূর্য, পৃথিবী, পাথর, মাটি, বৃক্ষ ও ফলমূল।
(দুই) যাহাদের প্রাথমিক অনুভূতি ও বিবেকবুদ্ধি রহিয়াছে কিন্তু চিন্তালব্ধ সিদ্ধান্ত কিংবা উদাহরণ ও উপাত্তকে অবলম্বন করিয়া নূতন কিছুর আবিষ্কার করা তাহাদের ক্ষমতা বহির্ভূত। তাহাদের ইচ্ছা ও অনুভূতি কেবলমাত্র দৃশ্যমান বস্তু পর্যন্ত সীমিত। যেমন প্রাণী জগৎ।
(তিন) যেই জগৎ বিবেক-বুদ্ধি এবং চিন্তাশক্তি সম্পন্ন। তাহারা গবেষণা করে, অনুসন্ধান ও দৃষ্টান্ত অবলম্বনে জীবন সমস্যার সমাধান করিতে পারে। ক্ষুদ্র হইতে বৃহৎ ও বৃহৎ হইতে ক্ষুদ্র বস্তু আবিষ্কার করে। কল্পনাশক্তির সাহায্যে নূতন বাস্তবতায় উপনীত হয়। প্রথম প্রকার সৃষ্টি হইতে যেই গতি ও লক্ষণাদি প্রকাশ পায় তাহা বাধ্যতামূলক অনিচ্ছাকৃত সমভাবে স্থায়ী। এই কারণে তাহাদের এই গুণকে সৃষ্টিগত শক্তি ও স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য বলা হয়। দ্বিতীয় প্রকার সৃষ্টি হইতে যেই সকল প্রভাব ও গতি পরিলক্ষিত হয় তাহা ইচ্ছা, অনুভূতি ও প্রাথমিক বোধ-জ্ঞানের অধীন। তাহাদের প্রত্যেকের কাজে স্পন্দন ও গতিময়তা সমভাবে প্রকাশ পায়। এই নিয়মতান্ত্রিকতায় ব্যতিক্রম হয় না। উহাদের কাজ ও গতিময়তাকে তাহাদের সহজাত স্বভাব বলিয়া আখ্যায়িত করা হয়। ইহার বাহিরে কোন কাজ করিবার শক্তি ইহাদের নাই। তৃতীয় শ্রেণীর মাখলুকের কিছু কিছু কর্মকাণ্ড অন্যান্য শ্রেণীর মাখলুকাতের মতই স্বভাবজাত, তবুও তাহাদের বহু কাজ এমনও রহিয়াছে যাহা কেবল তাহাদের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষায় ঘটিয়া থাকে। এই শ্রেণীর কাজের ভিত্তিতেই মঙ্গল-অমঙ্গল ও পাপ-পূণ্য নির্ণীত হয়। তাহাদের সার্বিক বুদ্ধিমত্তার কাজ, পরিণামদর্শিতা ও কাজের ভালমন্দ তাহাদের ইচ্ছারই প্রতিফলন। ইহার ফলেই তাহাদের উপর দায়িত্বশীলতা আরোপিত হয়। মানব ও জিন্ন ব্যতিরেকে সকল প্রাণী ভাল-মন্দের দায়িত্ব হইতে মুক্ত। জড় ও উদ্ভিদ জগৎ সর্বদিক দিয়া বাধ্য। প্রাণী জগতের সকল কাজও স্বভাব জাত। ফলে তাহারাও দায়িত্বশীলতা হইতে মুক্ত। ফেরেশতাগণও সৃষ্টিগত স্বভাব অনুযায়ী কেবল আল্লাহর আনুগত্যে বাধ্য। তাহাদের দ্বারা কোন গুনাহের কাজ সংঘটিত হয় না। তাই তাহারাও যিম্মাদারি হইতে মুক্ত।
কেবল মানুষ ও জিনই এমন মাখলুক যাহার অনেক কথা ও কাজে নিজ নিজ ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা ও জ্ঞানানুশীলনের বিকাশ দেখা যায়। পাপ ও পুণ্য এবং মঙ্গল ও অমঙ্গল উভয় প্রকার কার্যের কোন একটির ব্যাপারে মানুষ বাধ্য নয়। মানুষ বুদ্ধিমত্তা ও অনুধাবন শক্তির সাহায্যে কাজের পরিণাম বুঝিয়া কার্য সম্পাদন করে। এইজন্য সত্য-মিথ্যা ও ভাল-মন্দের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের জন্য মানুষ আল্লাহ্ প্রদত্ত ওহীর মুখাপেক্ষী। জড়জগৎ, উদ্ভিদ জগৎ ও অন্যান্য সৃষ্টি আল্লাহ্ পাকের নির্দেশ পালনে বাধ্য, তাহা আল-কুরআনে এইভাবে তুলিয়া ধরা হইয়াছে:
وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مِنْ دَابَّةٍ وَالْمَلَائِكَةُ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ. (النحل - ٤٩ ) .
"আল্লাহকেই সিজদা করে যাহা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে, পৃথিবীতে যত জীবজন্তু আছে সে সমস্ত এবং ফেরেশতাগণও; উহারা অহংকার করে না" (১৬ : ৪৯)।
এই সহজাত আনুগত্যকে সৃষ্টিগত ওহীও বলা চলে। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا وَمِنَ الشَّجَرِ وَمِمَّا يَعْرِشُونَ. ثُمَّ على مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ فَاسْلُكِي سُبُلَ رَبِّكَ ذُلُلاً (النحل - ٦٨) .
"তোমার প্রতিপালক মৌমাছিকে উহার অন্তরে ইংগিত দ্বারা নির্দেশ দিয়াছেন, গৃহ নির্মাণ কর পাহাড়ে, বৃক্ষে ও মানুষ যে গৃহ নির্মাণ করে তাহাতে, ইহার পর প্রত্যেক ফল হইতে কিছু কিছু আহার কর, অতঃপর তোমার প্রতিপালকের সহজ অনুসরণ কর" (২৬ : ৬৮-৬৯)।
এই আয়াতে সহজাত ইলহামকে বাধ্যতামূলক আল্লাহ পাকের আনুগত্য হিসাবে চিত্রায়িত করা হইয়াছে। অন্যত্র তাহাদেরকে স্বীয় সৃষ্টিকর্তার এই হুকুমকে সহজাতভাবে পালন করিবার অবস্থাকে সালাত ও তাসবীহ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللهَ يُسَبِّحُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالطَّيْرُ صُفْتِ كُلٌّ قَدْ عَلِمَ صَلَاتَهُ وَتَسْبِيحَهُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِمَا يَفْعَلُوْنَ (النور - ٤١) .
"তুমি কি দেখ না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যাহারা আছে তাহারা এবং উড্ডীয়মান বিহংগকুল আল্লাহ্র পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই জানে তাহার ইবাদতের ও পবিত্রতা ঘোষণার পদ্ধতি এবং উহারা যাহা করে সে বিষয়ে আল্লাহ্ সম্যক জ্ঞাত" (২৪ : ৪১)।
কিন্তু মানবজাতিকে অন্যান্য মাখলুকাতের মত নিছক মুখাপেক্ষী করিয়া সৃষ্টি করা হয় নাই। তাহার উপর জগতের মত আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্য প্রকাশের বাধ্যতামূলক বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয় নাই, বরং ইচ্ছাগত আনুগত্যের জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَنْ يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنْسَانُ (الاحزاب -৭২).
"আমি তো আসমান, যমীন ও পর্বতমালার প্রতি এই আমানত পেশ করিয়াছিলাম, উহারা ইহা বহন করিতে অস্বীকার করিল এবং উহাতে শংকিত হইল, কিন্তু মানুষ উহা বহন করিল" (৩৩ঃ ৭২)।
এই আমানত হইতেছে পাপ-পুণ্য ও ভাল-মন্দের বিচার-বিশ্লেষণের জ্ঞানের নাম, যাহার ভিত্তিতে আল্লাহ্ বিধান নাযিল করা হইয়াছে। এই আমানতের যিম্মাদারি পরিপূর্ণভাবে আদায় করিবার লক্ষ্যে মানুষের জন্য ইচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ড ও অনিচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ডের মত আল্লাহ পাকের বিধানাবলীর অনুসরণ করা আবশ্যক। অর্থাৎ যেইভাবে অনিচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ডে সহজাত অনুভূতির মাধ্যমে আল্লাহ পাকের নির্দেশাবলী সুষ্ঠুভাবে পালন করা হয় সেইভাবে ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগ করিয়া স্বেচ্ছায় শরী'আতের বিধানাবলী পালন করিয়া পরিপূর্ণভাবে আমানতের যিম্মাদারি আদায় করা কর্তব্য।
কিন্তু কাহারও প্রতি আনুগত্য প্রকাশ সেই পর্যন্ত সম্ভব নয় যতক্ষণ পর্যন্ত তাহার আদেশ-নিষেধ ও বিধিবিধান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত না হওয়া যায়। তাই নবী ও রাসূলের উপরই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় আহকাম ও বিধানাবলীর ওহী প্রেরণ করেন। তাহারা ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন বান্দাদেরকে এই সম্পর্কে সচেতন করেন এবং আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্য প্রকাশের আহবান জানান। সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করিলে প্রতীয়মান হয় যে, মানব ব্যতীত সকল সৃষ্টিজগৎ আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য সহজাত প্রবৃত্তির দ্বারা স্বীকার করিয়া চলিতেছে। কিন্তু পরিমিত ইচ্ছাশক্তির অধিকারী মানুষ বহু ক্ষেত্রে স্বীয় সৃষ্টিকর্তার নির্দেশের বিরোধিতা করিবার প্রয়াস পায়। এই অবস্থা আল-কুরআনে এইভাবে ইরশাদ হইয়াছে:
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوابُ وَكَثِيرٌ مِّنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ (الحج - ۱۸).
"তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যাহা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে, আবার অনেকের প্রতি অবধারিত হইয়াছে শাস্তি" (২২:১৮)।
লক্ষণীয় বিষয় হইল, মানুষ ব্যতীত ইচ্ছাশক্তি ও বুদ্ধিমত্তাহীন অন্যান্য সকল মাখলুক আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য প্রকাশ করে। কিন্তু জ্ঞানবান পরিণামদর্শী ও ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন মানুষ আনুগত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে দ্বিধাবিভক্ত হইয়া পড়িয়াছে। ইহাদের একদল হইতেছে অনুগত বান্দা আর অপর দল হইতেছে পাপাচারী। যাহারা সর্বযুগে নবী-রাসূলের অনুগামী ছিল তাহারা হইল আল্লাহর অনুগত বান্দা। আর যাহারা স্ব-স্ব যুগে নবীর আনীত বিধানের প্রতি ঈমান আনে নাই ও তদনুযায়ী আমল করে নাই তাহারা হইল অবাধ্য পাপাচারী (শিবলী নু'মানী-সুলায়মান নাদবী,, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩-২৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00