📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবীগণ ব্যতীত অন্য কেহ মা'সূম নহে

📄 নবীগণ ব্যতীত অন্য কেহ মা'সূম নহে


নবীগণ ব্যতীত অন্য কেহ মা'সূম নহে
নবী-রাসূল ব্যতীত অন্য কেহ কি মা'সূম হইতে পারেন? নবী-রাসূল ব্যতীত অন্য কেহ মা'সূম (নিষ্পাপ) ও সংরক্ষিত হইতে পারেন বলিয়া কোন প্রমাণ নাই। কারণ তাঁহারা ব্যতীত অন্য সকলেই সাধারণ মানুষের পর্যায়ে গণ্য যাহারা ভুল ভ্রান্তি হইতে ঊর্ধ্বে নহেন। তবে আল্লাহ তাঁহার কোন কোন ওলীকে কাবীরা গুনাহ হইতে মুক্ত রাখিতে পারেন। কেহ এইরূপ মুক্ত থাকিলে ইহা আল্লাহ্র বিশেষ অনুগ্রহের ব্যাপার। কিন্তু ইহা সেই ইসমাত বা নিষ্পাপতা নয়, যাহা আল্লাহ তা'আলা বিশেষভাবে নবী-রাসূলগণকে প্রদান করিয়াছেন। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَءَامِنُوا۟ بِرَسُولِهِۦ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِۦ وَيَجْعَل لَّكُمْ نُّورًا تَمْشُونَ بِهِۦ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ۚ وَٱللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (الحديد - ২৮)
"হে মু'মিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁহার রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি তাঁহার আনুগ্রহে তোমাদিগকে দিবেন দ্বিগুণ পুরস্কার এবং তিনি তোমাদিগকে দিবেন আলো যাহার সাহায্যে তোমরা চলিবে এবং তিনি তোমাদিগকে ক্ষমা করিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৫৭: ২৮)।
আয়াতটিতে যে নূরের কথা বলা হইয়াছে তাহা হইতেছে আল্লাহ্র বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহ যাহা আল্লাহ্ ওলী ও মুত্তাকীগণ লাভ করিয়া থাকেন। ইহা এক প্রকার সংরক্ষণ বটে, তবে তাহা কোনক্রমেই 'ইসমাত' নয়। ফলে তাঁহারা কেহই মা'সূম অভিহিত হইতে পারেন না। কেহ তেমন দাবি করিলে তাহা হইবে ভিত্তিহীন, ইহার পক্ষে শরী'আতের কোন দলীল নাই। কেননা মানুষের স্বভাবেই ভুল-ত্রুটির সংমিশ্রণ রহিয়াছে। এই কারণেই ইমাম মালিক (র) মদীনায় রাসূলে করীম (স)-এর কবরের প্রতি ইশারা করিয়া বলিয়াছিলেন:
مَا مِنَّا إِلَّا مَنْ رَّدَّ وَرُدَّ عَلَيْهِ إِلَّا صَاحِبُ هَذَا لَقَبْرِ. "আমাদের মধ্যকার প্রত্যেক ব্যক্তিই এমন যিনি কাহারও কথা রদ করিয়াছেন এবং তাহার কথাও রদ করা হইয়াছে। কিন্তু এই কবরের অধিবাসী ইহার ব্যতিক্রম"।
ইমাম মালিক (র)-এর বক্তব্য এভাবেও উদ্ধৃত হইয়াছে: كُلُّ أَحَدٍ يُؤْخَذُ مِنْهُ وَيُرَدُّ عَلَيْهِ الأَ صَاحِبَ هُذَا الْقَبْرِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. "প্রত্যেকের কথার মধ্যে গ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাখ্যানযোগ্য অংশ আছে, এই কবরবাসী (মহানবী স) ব্যতীত"।
ইমাম আবূ হানীফা (র) বলেন, مَا جَاءَنَا عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَلَى الرَّأْسِ وَالْعَيْنِ وَمَا جَاءَنَا عَنِ الصَّحَابَةِ اخْتَرْنَا وَمَا جَاءَنَا عَنِ التَّابِعِينَ فَهُمْ رِجَالٌ وَنَحْنُ رِجَالٌ. "রাসূলুল্লাহ' (স) হইতে যাহা আমাদের নিকট আসিয়াছে তাহা শিরোধার্য। আর সাহাবীগণের নিকট হইতে আমাদের নিকট যাহা আসিয়াছে তাহা আমরা যাচাই করিয়া গ্রহণ করিব। আর তাবিঈগণের নিকট হইতে আমাদের নিকট যাহা আসিয়াছে সেই ক্ষেত্রে তাহারাও মানুষ, আমরাও মানুষ"।
ইমাম আহমাদ ইবন জাম্বল (র) বলেন, لَيْسَ لِأَحَدٍ مَّعَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ كَلامٌ. "আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সম-পর্যায়ে অপর কাহারও কথা হইতে পারে না"।
ইমাম শাফিঈ (র) বলেন, لا حُجَّةَ فِي قَوْلِ أَحَدٍ دُونَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. "রাসূলুল্লাহ (স) ব্যতীত অপর কাহারও কথা দলীল হইতে পারে না"।
আর রাসূলে করীম (স)-এর এই অতুলনীয় মর্যাদা কেবল এইজন্যই যে, তিনি ছিলেন মা'সূম (মুহাম্মাদ আবদুর রহীম, আল-কুরআনে নবুওয়াত ও রিসালাত, পৃ. ৩২)।

নবীগণ ব্যতীত অন্য কেহ মা'সূম নহে
নবী-রাসূল ব্যতীত অন্য কেহ কি মা'সূম হইতে পারেন? নবী-রাসূল ব্যতীত অন্য কেহ মা'সূম (নিষ্পাপ) ও সংরক্ষিত হইতে পারেন বলিয়া কোন প্রমাণ নাই। কারণ তাঁহারা ব্যতীত অন্য সকলেই সাধারণ মানুষের পর্যায়ে গণ্য যাহারা ভুল ভ্রান্তি হইতে ঊর্ধ্বে নহেন। তবে আল্লাহ তাঁহার কোন কোন ওলীকে কাবীরা গুনাহ হইতে মুক্ত রাখিতে পারেন। কেহ এইরূপ মুক্ত থাকিলে ইহা আল্লাহ্র বিশেষ অনুগ্রহের ব্যাপার। কিন্তু ইহা সেই ইসমাত বা নিষ্পাপতা নয়, যাহা আল্লাহ তা'আলা বিশেষভাবে নবী-রাসূলগণকে প্রদান করিয়াছেন। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَءَامِنُوا۟ بِرَسُولِهِۦ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِۦ وَيَجْعَل لَّكُمْ نُّورًا تَمْشُونَ بِهِۦ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ۚ وَٱللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (الحديد - ২৮)
"হে মু'মিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁহার রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি তাঁহার আনুগ্রহে তোমাদিগকে দিবেন দ্বিগুণ পুরস্কার এবং তিনি তোমাদিগকে দিবেন আলো যাহার সাহায্যে তোমরা চলিবে এবং তিনি তোমাদিগকে ক্ষমা করিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৫৭: ২৮)।
আয়াতটিতে যে নূরের কথা বলা হইয়াছে তাহা হইতেছে আল্লাহ্র বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহ যাহা আল্লাহ্ ওলী ও মুত্তাকীগণ লাভ করিয়া থাকেন। ইহা এক প্রকার সংরক্ষণ বটে, তবে তাহা কোনক্রমেই 'ইসমাত' নয়। ফলে তাঁহারা কেহই মা'সূম অভিহিত হইতে পারেন না। কেহ তেমন দাবি করিলে তাহা হইবে ভিত্তিহীন, ইহার পক্ষে শরী'আতের কোন দলীল নাই। কেননা মানুষের স্বাভাবই ভুল-ত্রুটির সংমিশ্রণ রহিয়াছে। এই কারণেই ইমাম মালিক (র) মদীনায় রাসূলে করীম (স)-এর কবরের প্রতি ইশারা করিয়া বলিয়াছিলেন:
مَا مِنَّا إِلَّا مَنْ رَّدَّ وَرُدَّ عَلَيْهِ إِلَّا صَاحِبُ هَذَا لَقَبْرِ. "আমাদের মধ্যকার প্রত্যেক ব্যক্তিই এমন যিনি কাহারও কথা রদ করিয়াছেন এবং তাহার কথাও রদ করা হইয়াছে। কিন্তু এই কবরের অধিবাসী ইহার ব্যতিক্রম"।
ইমাম মালিক (র)-এর বক্তব্য এভাবেও উদ্ধৃত হইয়াছে: كُلُّ أَحَدٍ يُؤْخَذُ مِنْهُ وَيُرَدُّ عَلَيْهِ الأَ صَاحِبَ هُذَا الْقَبْرِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. "প্রত্যেকের কথার মধ্যে গ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাখ্যানযোগ্য অংশ আছে, এই কবরবাসী (মহানবী স) ব্যতীত"।
ইমাম আবূ হানীফা (র) বলেন, مَا جَاءَنَا عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَلَى الرَّأْسِ وَالْعَيْنِ وَمَا جَاءَنَا عَنِ الصَّحَابَةِ اخْتَرْنَا وَمَا جَاءَنَا عَنِ التَّابِعِينَ فَهُمْ رِجَالٌ وَنَحْنُ رِجَالٌ. "রাসূলুল্লাহ' (স) হইতে যাহা আমাদের নিকট আসিয়াছে তাহা শিরোধার্য। আর সাহাবীগণের নিকট হইতে আমাদের নিকট যাহা আসিয়াছে তাহা আমরা যাচাই করিয়া গ্রহণ করিব। আর তাবিঈগণের নিকট হইতে আমাদের নিকট যাহা আসিয়াছে সেই ক্ষেত্রে তাহারাও মানুষ, আমরাও মানুষ"।
ইমাম আহমাদ ইবন জাম্বল (র) বলেন, لَيْسَ لِأَحَدٍ مَّعَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ كَلامٌ. "আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সম-পর্যায়ে অপর কাহারও কথা হইতে পারে না"।
ইমাম শাফিঈ (র) বলেন, لا حُجَّةَ فِي قَوْلِ أَحَدٍ دُونَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. "রাসূলুল্লাহ (স) ব্যতীত অপর কাহারও কথা দলীল হইতে পারে না"।
আর রাসূলে করীম (স)-এর এই অতুলনীয় মর্যাদা কেবল এইজন্যই যে, তিনি ছিলেন মা'সূম (মুহাম্মাদ আবদুর রহীম, আল-কুরআনে নবুওয়াত ও রিসালাত, পৃ. ৩২)।

নবী-রাসূল ব্যতীত অন্য কেহ কি মা'সূম হইতে পারেন? নবী-রাসূল ব্যতীত অন্য কেহ মা'সূম (নিষ্পাপ) ও সংরক্ষিত হইতে পারেন বলিয়া কোন প্রমাণ নাই। কারণ তাঁহারা ব্যতীত অন্য সকলেই সাধারণ মানুষের পর্যায়ে গণ্য যাহারা ভুল ভ্রান্তি হইতে ঊর্ধ্বে নহেন। তবে আল্লাহ তাঁহার কোন কোন ওলীকে কাবীরা গুনাহ হইতে মুক্ত রাখিতে পারেন। কেহ এইরূপ মুক্ত থাকিলে ইহা আল্লাহ্র বিশেষ অনুগ্রহের ব্যাপার। কিন্তু ইহা সেই ইসমাত বা নিষ্পাপতা নয়, যাহা আল্লাহ তা'আলা বিশেষভাবে নবী-রাসূলগণকে প্রদান করিয়াছেন। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَءَامِنُوا۟ بِرَسُولِهِۦ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِۦ وَيَجْعَل لَّكُمْ نُّورًا تَمْشُونَ بِهِۦ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ۚ وَٱللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ. "হে মু'মিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁহার রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি তাঁহার আনুগ্রহে তোমাদিগকে দিবেন দ্বিগুণ পুরস্কার এবং তিনি তোমাদিগকে দিবেন আলো যাহার সাহায্যে তোমরা চলিবে এবং তিনি তোমাদিগকে ক্ষমা করিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৫৭: ২৮)।
আয়াতটিতে যে নূরের কথা বলা হইয়াছে তাহা হইতেছে আল্লাহ্র বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহ যাহা আল্লাহ্ ওলী ও মুত্তাকীগণ লাভ করিয়া থাকেন। ইহা এক প্রকার সংরক্ষণ বটে, তবে তাহা কোনক্রমেই 'ইসমাত' নয়। ফলে তাঁহারা কেহই মা'সূম অভিহিত হইতে পারেন না। কেহ তেমন দাবি করিলে তাহা হইবে ভিত্তিহীন, ইহার পক্ষে শরী'আতের কোন দলীল নাই। কেননা মানুষের স্বভাবেই ভুল-ত্রুটির সংমিশ্রণ রহিয়াছে। এই কারণেই ইমাম মালিক (র) মদীনায় রাসূলে করীম (স)-এর কবরের প্রতি ইশারা করিয়া বলিয়াছিলেন: مَا مِنَّا إِلَّا مَنْ رَّدَّ وَرُدَّ عَلَيْهِ إِلَّا صَاحِبُ هَذَا لَقَبْرِ. "আমাদের মধ্যকার প্রত্যেক ব্যক্তিই এমন যিনি কাহারও কথা রদ করিয়াছেন এবং তাহার কথাও রদ করা হইয়াছে। কিন্তু এই কবরের অধিবাসী ইহার ব্যতিক্রম"।
ইমাম মালিক (র)-এর বক্তব্য এভাবেও উদ্ধৃত হইয়াছে: كُلُّ أَحَدٍ يُؤْخَذُ مِنْهُ وَيُرَدُّ عَلَيْهِ الأَ صَاحِبَ هُذَا الْقَبْرِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. "প্রত্যেকের কথার মধ্যে গ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাখ্যানযোগ্য অংশ আছে, এই কবরবাসী (মহানবী স) ব্যতীত"।
ইমাম আবূ হানীফা (র) বলেন, مَا جَاءَنَا عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَلَى الرَّأْسِ وَالْعَيْنِ وَمَا جَاءَنَا عَنِ الصَّحَابَةِ اخْتَرْنَا وَمَا جَاءَنَا عَنِ التَّابِعِينَ فَهُمْ رِجَالٌ وَنَحْنُ رِجَالٌ. "রাসূলুল্লাহ' (স) হইতে যাহা আমাদের নিকট আসিয়াছে তাহা শিরোধার্য। আর সাহাবীগণের নিকট হইতে আমাদের নিকট যাহা আসিয়াছে তাহা আমরা যাচাই করিয়া গ্রহণ করিব। আর তাবিঈগণের নিকট হইতে আমাদের নিকট যাহা আসিয়াছে সেই ক্ষেত্রে তাহারাও মানুষ, আমরাও মানুষ"।
ইমাম আহমাদ ইবন জাম্বল (র) বলেন, لَيْسَ لِأَحَدٍ مَّعَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ كَلامٌ. "আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সম-পর্যায়ে অপর কাহারও কথা হইতে পারে না"।
ইমাম শাফিঈ (র) বলেন, لا حُجَّةَ فِي قَوْلِ أَحَدٍ دُونَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. "রাসূলুল্লাহ (স) ব্যতীত অপর কাহারও কথা দলীল হইতে পারে না"।
আর রাসূলে করীম (স)-এর এই অতুলনীয় মর্যাদা কেবল এইজন্যই যে, তিনি ছিলেন মা'সূম।

টিকাঃ
১. মুহাম্মাদ আবদুর রহীম, আল-কুরআনে নবুওয়াত ও রিসালাত, পৃ. ৩২।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াত ও রিসালাত প্রমাণের পন্থা

📄 নবুওয়াত ও রিসালাত প্রমাণের পন্থা


নবুওয়াত ও রিসালাত প্রমাণের পন্থা
বুদ্ধিমত্তা ও মেধার কারণে মানুষ সকল প্রাণীর উপর শ্রেষ্ঠত্বে অভিষিক্ত এবং সকল প্রাণীর উপর আধিপত্য কায়েম করিয়া ইহাদিগকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করে। অনুরূপভাবে আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামও তাঁহাদের পবিত্র সত্তার কারণে মানব জগতের উপর শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন থাকেন। তাঁহারা তাঁহাদের পবিত্র সত্তা ও নবীসুলভ আচরণ দ্বারা অন্যদিগকে সরল পথে আহবান করেন।
তাঁহাদের নবীসুলভ বিবেক-বুদ্ধি ও অনুধাবনশক্তি সকল মানবিক বিবেক-বুদ্ধির ঊর্ধ্বে। আল্লাহ প্রদত্ত বৈশিষ্ট্যের ফলে তাঁহারা সকল মানুষের আত্মার সংশোধন ও পরিমার্জন করিয়া থাকেন। নবীর অত্যদ্ভূত কার্যকলাপ সাধারণ মানুষের নিকট মু’জিযারূপে প্রতিভাত হইয়া থাকে। যদিও নবীগণও মানবীয় গুণাবলীর অধিকারী থাকেন তবুও বুদ্ধিবৃত্তি এবং মৌল গুণাবলীতে তাঁহারা সাধারণ মানব সমাজ হইতে সম্পূর্ণ আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। কারণ নবীর মধ্যে ওহী গ্রহণ করিবার যে যোগ্যতা বিদ্যমান তাহা অন্যান্য মানুষের মধ্যে সম্পূর্ণই অনুপস্থিত। এই বিষয়ে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى (الكهف - (۱۱). “আমি তোমাদেরই মত একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয়” (১৮: ১১০)।
মানবীয় গুণে যদিও নবীগণ মানুষের পর্যায়ভুক্ত, কিন্তু 'ওহী' প্রাপ্তির ব্যাপারে উভয়ের মধ্যে সীমারেখা টানা হইয়াছে।
নিম্নোক্ত তিনটি বিশ্লেষণে বিষয়টি আরও প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে: (এক) মানুষের মধ্যে তিন ধরনের ঐচ্ছিক আচরণ বিদ্যমান রহিয়াছেঃ চিন্তাগত, বক্তব্যগত ও কর্মগত। এই তিনটি প্রক্রিয়ায় মানুষ যে কর্ম সম্পাদন করে তাহা ভালও হইতে পারে, মন্দও হইতে পারে। চিন্তাধারা শুদ্ধও হইতে পারে, ভুলও হইতে পারে। বক্তব্য সত্যও হইতে পারে মিথ্যাও হইতে পারে। কর্ম ভালও হইতে পারে, আবার মন্দও হইতে পারে। এখন প্রশ্ন হইল, শুদ্ধ ও ভুল, সত্য ও মিথ্যা, ভাল ও মন্দ নিরূপিত হইবে কিভাবে? এই নিরূপণ কি সকলের দ্বারা সম্ভব, না ইহা কেহই করিতে পারিবে না, না কেহ করিতে পারে, আর কেহ পারে না? প্রথম দুই সম্ভাবনা সর্বৈব ভুল। তৃতীয় সম্ভাবনা অর্থাৎ কেহ কেহ ইহা নিরূপণ করিতে পারেন যে, অমুক পথ ও মত শুদ্ধ আর অমুকটি ভুল। অমুক ব্যক্তি সত্যবাদী, আর অমুক মিথ্যাবাদী, এই কাজটি কল্যাণকর, আর এই কাজ অকল্যাণকর। যেই ব্যক্তিকে জগৎস্রষ্টা আপন করুণা ও অনুগ্রহে এই শক্তি দান করিয়াছেন তিনিই হইলেন নবী ও শরীআতের বিধানদাতা।
(দুই) মানবজাতির জন্য স্বীয় কর্ম, আচার-আচরণ ও লেনদেনের মধ্যে পারস্পরিক একতা ও সহযোগিতার প্রয়োজন রহিয়াছে। যদি তাহাদের মধ্যে এই সহযোগিতা ও সহমর্মিতা না থাকে তাহা হইলে তাহাদের জানমাল ও ইজ্জত-সম্মানের সংরক্ষণের উপায় থাকিবে না। জান-মাল ও ইজ্জত-সম্মান সংরক্ষণ রাখিবার এই বিধানের নামই হইল শরী'আত। তাই মানুষের জন্য দুই ধরনের কাজের প্রয়োজন। একটি হইল, ভাল কাজে একে অপরের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা। দ্বিতীয়টি হইল, মন্দ কাজ হইতে একজন অপরজনকে বিরত রাখিবার চেষ্টা করা। এই সহযোগিতার ফলেই মানুষ খাওয়া-পরা ও বাসস্থানের উপাদান উপকরণ যোগাড় করিয়া থাকে। ইহারই দ্বারা বিবাহ বন্ধন, আত্মীয়তা, সন্তান, বন্ধু-বান্ধব ও প্রিয়জনদের অধিকার ও সম্পর্ক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত ও সংরক্ষিত হয়। পরস্পরকে মন্দ কাজ হইতে বিরত রাখার মাধ্যমে প্রত্যেকেরই জীবন, ধন-সম্পত্তি, ইজ্জত-সম্মান হিফাজতের ও নিরাপত্তার পন্থা-পদ্ধতি বাহির হইয়া আসে। এই সহযোগিতা ও বিরত রাখার মূলনীতিতে প্রয়োজনীয় হইল তাহা যেন সুশৃংখলিত ও সুপরিজ্ঞাত হয় এবং তাহা যেন এমনভাবে প্রণয়ন করা হয় যে, ইহাতে কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী জাতি ও দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া না হয়, এই ব্যাপারে যেন সকলেরই এমন কল্যাণের কথা বিবেচনা করা হয়। ইহা অত্যন্ত পরিষ্কার যে, এইরূপ বিধান প্রবর্তন কোন মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়, বরং ইহা আল্লাহ প্রদত্ত ওহী এবং তাঁহারই শিক্ষাদানের মাধ্যমে প্রণীত হওয়া সম্ভব। আরও কথা হইল কোন মানুষের বুদ্ধিমত্তা দ্বারা ইহা সম্ভব নয়। কারণ মানুষ তো বিশেষ ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠী বা বিশেষ কোন দেশের অধিবাসী। সমগ্র ভূমণ্ডলের সকল সৃষ্টিকুলের জন্য একইরূপে অনুসরণযোগ্য সমতা ভিত্তিক পক্ষপাতহীন বিধান প্রর্বতন করা মানবীয় জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার পক্ষে সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব। এইজন্য প্রয়োজন যে, এই বিধানগুলি তাঁহারই পক্ষ হইতে প্রেরিত হইবে, যাহার হাতে রহিয়াছে সমগ্র বিশ্বের চাবিকাঠি, যিনি সমগ্র মানবমণ্ডলীর ভিতর-বাহিরের সামগ্রিক অবস্থা ও প্রয়োজন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। এই মূলনীতিরাজি মহান আল্লাহর পক্ষ হইতে যাহার উপর ওহীরূপে প্রেরিত হয় তিনি হইলেন রাসূল বা নবী।
(তিন) আল্লাহ তা'আলার একটি কাজ হইল সৃজন করা। দ্বিতীয়টি হইল, আমর বা আদেশ করা। যেইভাবে ফেরেশতাগণ সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মধ্যে দূত-এর ভূমিকা পালন করেন, তেমনিভাবে নবী আল্লাহ ও মানুষের মধ্যে আদেশ-নিষেধ পৌঁছাইবার জন্য মধ্যস্থতা করিয়া থাকেন। যেইভাবে আল্লাহ্র উপর সৃষ্টিকর্তা ও আদেশদাতা হিসাবে ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব সেইভাবে ফেরেশতাগণের উপর ঈমান আনা জরুরী যে, তাহারা সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মধ্যে সংবাদ বহনে দূতের ভূমিকা পালন করিয়া থাকেন। অনুরূপভাবে নবীগণের উপর ঈমান আনা আবশ্যক যে, তাঁহারা হইলেন আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে আদেশ-নিষেধ পৌঁছাইয়া দিবার মাধ্যম।
নিম্নে কতিপয় প্রণিধানযোগ্য বিষয়ের আলোচনা করা হইল। (১) যাহা সম্ভব তাহার অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব একই সমান। এই কারণে অস্তিত্বে আসার জন্য একজন অগ্রাধিকারদাতার প্রয়োজন, যাহার কারণে অস্তিত্বও অনস্তিত্বের উপর প্রাধান্য পাইবে এবং বস্তুটি অস্তিত্বে আসিবে। এই প্রাধান্য লাভকারী হইল সম্ভাবনার কারণ।
(২) সর্বপ্রকার আলোড়নের জন্য একজন আলোড়নকারীর প্রয়োজন হয়, যিনি সব সময় নব নব আলোড়ন সৃষ্টি করিতে থাকিবেন। আলোড়নও আবার দুই প্রকার : প্রকৃতিগত ও ইচ্ছাকৃত। ইচ্ছাকৃত আলোড়নের জন্য প্রয়োজন হইল আলোড়নকারীর মধ্যে ইচ্ছা ও অভিপ্রায় থাকা। অনুরূপ প্রকৃতিগত আলোড়নের জন্যও প্রয়োজন হইল আলোড়নকারী বুদ্ধিমান ও কার্যনির্বাহী হইবেন। চন্দ্র, সূর্য ও অন্যান্য নভোমণ্ডলীয় সৃষ্টির আলোড়ন যদিও প্রকৃতিগত, তবুও ইহাতে আলোড়ন সৃষ্টির জন্য কোন বুদ্ধিমান ও কার্যনির্বাহীর প্রয়োজন রহিয়াছে এই কারণেই আল-কুরআনে এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছেঃ
وَأَوْحَى فِي كُلِّ سَمَاء أَمْرَهَا (حم السجده ١٢٠) "এবং তিনি প্রত্যেক আকাশে উহার বিধান ব্যক্ত করিলেন" (৪১: ২২)।
(৩) এখন যেমন মানবীয় আচরণ আলোড়ন, অভিপ্রায় ও ইচ্ছার মুখাপেক্ষী অর্থাৎ ইচ্ছা অভিপ্রায় ব্যতীত ইহা সংঘটিত হইতে পারে না তেমনিভাবে এই আলোড়নসমূহের জন্য এমন দিশারীর প্রয়োজন যিনি সেই কর্ম ও আলোড়নের সঠিক পন্থা দেখাইয়া দিবেন। হককে বাতিল হইতে, সত্যকে মিথ্যা হইতে এবং শুভকে অশুভ হইতে পৃথক করিয়া দিবেন।
(৪) আল্লাহ্র আদেশ দুই প্রকার: ব্যবস্থাপনামূলক ( تدبیری ) ও বাধ্যতামূলক ( تکلیفی )। প্রথম প্রকার আদেশটি বিশ্ব-ব্যবস্থাপনায় চালু রহিয়াছে, যাহার কারণে সমগ্র বিশ্বে সুন্দর ব্যবস্থাপনা দৃশ্যমান। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছেঃ
وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتِ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ (الاعراف - ٥٤ ) .
"আর সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি যাহা তাঁহারই আজ্ঞাধীন, তাহা তিনিই সৃষ্টি করিয়াছেন। জানিয়া রাখ, সৃজন ও আদেশ তাঁহারই" (৭:৫৪)।
বাধ্যতামূলক আদেশ কেবল মানুষের জন্য। সুতরাং আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
يَأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ (البقرة - ٢١).
"হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন" (২: ২১)।
উপরিউক্ত আলোচনা হইতে প্রমাণিত হইল যে, মানুষের সকল আলোড়ন সম্ভাবনাময়। এইজন্য অগ্রাধিকার দানকারীর প্রয়োজন ভাল ও মন্দের, নির্দেশের জন্য দিশারীর প্রয়োজন। এই দিশারীর নাম হইল নবী (শিবলী নু'মানীও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ১৭)।

নবুওয়াত ও রিসালাত প্রমাণের পন্থা
বুদ্ধিমত্তা ও মেধার কারণে মানুষ সকল প্রাণীর উপর শ্রেষ্ঠত্বে অভিষিক্ত এবং সকল প্রাণীর উপর আধিপত্য কায়েম করিয়া ইহাদিগকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করে। অনুরূপভাবে আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামও তাঁহাদের পবিত্র সত্তার কারণে মানব জগতের উপর শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন থাকেন। তাঁহারা তাঁহাদের পবিত্র সত্তা ও নবীসুলভ আচরণ দ্বারা অন্যদিগকে সরল পথে আহবান করেন।
তাঁহাদের নবীসুলভ বিবেক-বুদ্ধি ও অনুধাবনশক্তি সকল মানবিক বিবেক-বুদ্ধির ঊর্ধ্বে। আল্লাহ প্রদত্ত বৈশিষ্ট্যের ফলে তাঁহারা সকল মানুষের আত্মার সংশোধন ও পরিমার্জন করিয়া থাকেন। নবীর অত্যদ্ভূত কার্যকলাপ সাধারণ মানুষের নিকট মু’জিযারূপে প্রতিভাত হইয়া থাকে। যদিও নবীগণও মানবীয় গুণাবলীর অধিকারী থাকেন তবুও বুদ্ধিবৃত্তি এবং মৌল গুণাবলীতে তাঁহারা সাধারণ মানব সমাজ হইতে সম্পূর্ণ আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। কারণ নবীর মধ্যে ওহী গ্রহণ করিবার যে যোগ্যতা বিদ্যমান তাহা অন্যান্য মানুষের মধ্যে সম্পূর্ণই অনুপস্থিত। এই বিষয়ে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى (الكهف - (۱۱). “আমি তোমাদেরই মত একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয়” (১৮: ১১০)।
মানবীয় গুণে যদিও নবীগণ মানুষের পর্যায়ভুক্ত, কিন্তু 'ওহী' প্রাপ্তির ব্যাপারে উভয়ের মধ্যে সীমারেখা টানা হইয়াছে।
নিম্নোক্ত তিনটি বিশ্লেষণে বিষয়টি আরও প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে: (এক) মানুষের মধ্যে তিন ধরনের ঐচ্ছিক আচরণ বিদ্যমান রহিয়াছেঃ চিন্তাগত, বক্তব্যগত ও কর্মগত। এই তিনটি প্রক্রিয়ায় মানুষ যে কর্ম সম্পাদন করে তাহা ভালও হইতে পারে, মন্দও হইতে পারে। চিন্তাধারা শুদ্ধও হইতে পারে, ভুলও হইতে পারে। বক্তব্য সত্যও হইতে পারে মিথ্যাও হইতে পারে। কর্ম ভালও হইতে পারে, আবার মন্দও হইতে পারে। এখন প্রশ্ন হইল, শুদ্ধ ও ভুল, সত্য ও মিথ্যা, ভাল ও মন্দ নিরূপিত হইবে কিভাবে? এই নিরূপণ কি সকলের দ্বারা সম্ভব, না ইহা কেহই করিতে পারিবে না, না কেহ করিতে পারে, আর কেহ পারে না? প্রথম দুই সম্ভাবনা সর্বৈব ভুল। তৃতীয় সম্ভাবনা অর্থাৎ কেহ কেহ ইহা নিরূপণ করিতে পারেন যে, অমুক পথ ও মত শুদ্ধ আর অমুকটি ভুল। অমুক ব্যক্তি সত্যবাদী, আর অমুক মিথ্যাবাদী, এই কাজটি কল্যাণকর, আর এই কাজ অকল্যাণকর। যেই ব্যক্তিকে জগৎস্রষ্টা আপন করুণা ও অনুগ্রহে এই শক্তি দান করিয়াছেন তিনিই হইলেন নবী ও শরীআতের বিধানদাতা।
(দুই) মানবজাতির জন্য স্বীয় কর্ম, আচার-আচরণ ও লেনদেনের মধ্যে পারস্পরিক একতা ও সহযোগিতার প্রয়োজন রহিয়াছে। যদি তাহাদের মধ্যে এই সহযোগিতা ও সহমর্মিতা না থাকে তাহা হইলে তাহাদের জানমাল ও ইজ্জত-সম্মানের সংরক্ষণের উপায় থাকিবে না। জান-মাল ও ইজ্জত-সম্মান সংরক্ষণ রাখিবার এই বিধানের নামই হইল শরী'আত। তাই মানুষের জন্য দুই ধরনের কাজের প্রয়োজন। একটি হইল, ভাল কাজে একে অপরের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা। দ্বিতীয়টি হইল, মন্দ কাজ হইতে একজন অপরজনকে বিরত রাখিবার চেষ্টা করা। এই সহযোগিতার ফলেই মানুষ খাওয়া-পরা ও বাসস্থানের উপাদান উপকরণ যোগাড় করিয়া থাকে। ইহারই দ্বারা বিবাহ বন্ধন, আত্মীয়তা, সন্তান, বন্ধু-বান্ধব ও প্রিয়জনদের অধিকার ও সম্পর্ক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত ও সংরক্ষিত হয়। পরস্পরকে মন্দ কাজ হইতে বিরত রাখার মাধ্যমে প্রত্যেকেরই জীবন, ধন-সম্পত্তি, ইজ্জত-সম্মান হিফাজতের ও নিরাপত্তার পন্থা-পদ্ধতি বাহির হইয়া আসে। এই সহযোগিতা ও বিরত রাখার মূলনীতিতে প্রয়োজনীয় হইল তাহা যেন সুশৃংখলিত ও সুপরিজ্ঞাত হয় এবং তাহা যেন এমনভাবে প্রণয়ন করা হয় যে, ইহাতে কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী জাতি ও দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া না হয়, এই ব্যাপারে যেন সকলেরই এমন কল্যাণের কথা বিবেচনা করা হয়। ইহা অত্যন্ত পরিষ্কার যে, এইরূপ বিধান প্রবর্তন কোন মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়, বরং ইহা আল্লাহ প্রদত্ত ওহী এবং তাঁহারই শিক্ষাদানের মাধ্যমে প্রণীত হওয়া সম্ভব। আরও কথা হইল কোন মানুষের বুদ্ধিমত্তা দ্বারা ইহা সম্ভব নয়। কারণ মানুষ তো বিশেষ ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠী বা বিশেষ কোন দেশের অধিবাসী। সমগ্র ভূমণ্ডলের সকল সৃষ্টিকুলের জন্য একইরূপে অনুসরণযোগ্য সমতা ভিত্তিক পক্ষপাতহীন বিধান প্রর্বতন করা মানবীয় জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার পক্ষে সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব। এইজন্য প্রয়োজন যে, এই বিধানগুলি তাঁহারই পক্ষ হইতে প্রেরিত হইবে, যাহার হাতে রহিয়াছে সমগ্র বিশ্বের চাবিকাঠি, যিনি সমগ্র মানবমণ্ডলীর ভিতর-বাহিরের সামগ্রিক অবস্থা ও প্রয়োজন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। এই মূলনীতিরাজি মহান আল্লাহর পক্ষ হইতে যাহার উপর ওহীরূপে প্রেরিত হয় তিনি হইলেন রাসূল বা নবী।
(তিন) আল্লাহ তা'আলার একটি কাজ হইল সৃজন করা। দ্বিতীয়টি হইল, আমর বা আদেশ করা। যেইভাবে ফেরেশতাগণ সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মধ্যে দূত-এর ভূমিকা পালন করেন, তেমনিভাবে নবী আল্লাহ ও মানুষের মধ্যে আদেশ-নিষেধ পৌঁছাইবার জন্য মধ্যস্থতা করিয়া থাকেন। যেইভাবে আল্লাহ্র উপর সৃষ্টিকর্তা ও আদেশদাতা হিসাবে ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব সেইভাবে ফেরেশতাগণের উপর ঈমান আনা জরুরী যে, তাহারা সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মধ্যে সংবাদ বহনে দূতের ভূমিকা পালন করিয়া থাকেন। অনুরূপভাবে নবীগণের উপর ঈমান আনা আবশ্যক যে, তাঁহারা হইলেন আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে আদেশ-নিষেধ পৌঁছাইয়া দিবার মাধ্যম।
নিম্নে কতিপয় প্রণিধানযোগ্য বিষয়ের আলোচনা করা হইল। (১) যাহা সম্ভব তাহার অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব একই সমান। এই কারণে অস্তিত্বে আসার জন্য একজন অগ্রাধিকারদাতার প্রয়োজন, যাহার কারণে অস্তিত্বও অনস্তিত্বের উপর প্রাধান্য পাইবে এবং বস্তুটি অস্তিত্বে আসিবে। এই প্রাধান্য লাভকারী হইল সম্ভাবনার কারণ।
(২) সর্বপ্রকার আলোড়নের জন্য একজন আলোড়নকারীর প্রয়োজন হয়, যিনি সব সময় নব নব আলোড়ন সৃষ্টি করিতে থাকিবেন। আলোড়নও আবার দুই প্রকার : প্রকৃতিগত ও ইচ্ছাকৃত। ইচ্ছাকৃত আলোড়নের জন্য প্রয়োজন হইল আলোড়নকারীর মধ্যে ইচ্ছা ও অভিপ্রায় থাকা। অনুরূপ প্রকৃতিগত আলোড়নের জন্যও প্রয়োজন হইল আলোড়নকারী বুদ্ধিমান ও কার্যনির্বাহী হইবেন। চন্দ্র, সূর্য ও অন্যান্য নভোমণ্ডলীয় সৃষ্টির আলোড়ন যদিও প্রকৃতিগত, তবুও ইহাতে আলোড়ন সৃষ্টির জন্য কোন বুদ্ধিমান ও কার্যনির্বাহীর প্রয়োজন রহিয়াছে এই কারণেই আল-কুরআনে এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছেঃ
وَأَوْحَى فِي كُلِّ سَمَاء أَمْرَهَا (حم السجده ١٢٠) "এবং তিনি প্রত্যেক আকাশে উহার বিধান ব্যক্ত করিলেন" (৪১: ২২)।
(৩) এখন যেমন মানবীয় আচরণ আলোড়ন, অভিপ্রায় ও ইচ্ছার মুখাপেক্ষী অর্থাৎ ইচ্ছা অভিপ্রায় ব্যতীত ইহা সংঘটিত হইতে পারে না তেমনিভাবে এই আলোড়নসমূহের জন্য এমন দিশারীর প্রয়োজন যিনি সেই কর্ম ও আলোড়নের সঠিক পন্থা দেখাইয়া দিবেন। হককে বাতিল হইতে, সত্যকে মিথ্যা হইতে এবং শুভকে অশুভ হইতে পৃথক করিয়া দিবেন।
(৪) আল্লাহ্র আদেশ দুই প্রকার: ব্যবস্থাপনামূলক ( تدبیری ) ও বাধ্যতামূলক ( تکلیفی )। প্রথম প্রকার আদেশটি বিশ্ব-ব্যবস্থাপনায় চালু রহিয়াছে, যাহার কারণে সমগ্র বিশ্বে সুন্দর ব্যবস্থাপনা দৃশ্যমান। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছেঃ
وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتِ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ (الاعراف - ٥٤ ) .
"আর সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি যাহা তাঁহারই আজ্ঞাধীন, তাহা তিনিই সৃষ্টি করিয়াছেন। জানিয়া রাখ, সৃজন ও আদেশ তাঁহারই" (৭:৫৪)।
বাধ্যতামূলক আদেশ কেবল মানুষের জন্য। সুতরাং আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
يَأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ (البقرة - ٢١).
"হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন" (২: ২১)।
উপরিউক্ত আলোচনা হইতে প্রমাণিত হইল যে, মানুষের সকল আলোড়ন সম্ভাবনাময়। এইজন্য অগ্রাধিকার দানকারীর প্রয়োজন ভাল ও মন্দের, নির্দেশের জন্য দিশারীর প্রয়োজন। এই দিশারীর নাম হইল নবী (শিবলী নু'মানীও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ১৭)।

বুদ্ধিমত্তা ও মেধার কারণে মানুষ সকল প্রাণীর উপর শ্রেষ্ঠত্বে অভিষিক্ত এবং সকল প্রাণীর উপর আধিপত্য কায়েম করিয়া ইহাদিগকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করে। অনুরূপভাবে আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামও তাঁহাদের পবিত্র সত্তার কারণে মানব জগতের উপর শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন থাকেন। তাঁহারা তাঁহাদের পবিত্র সত্তা ও নবীসুলভ আচরণ দ্বারা অন্যদিগকে সরল পথে আহবান করেন।
তাঁহাদের নবীসুলভ বিবেক-বুদ্ধি ও অনুধাবনশক্তি সকল মানবিক বিবেক-বুদ্ধির ঊর্ধ্বে। আল্লাহ প্রদত্ত বৈশিষ্ট্যের ফলে তাঁহারা সকল মানুষের আত্মার সংশোধন ও পরিমার্জন করিয়া থাকেন। নবীর অত্যদ্ভূত কার্যকলাপ সাধারণ মানুষের নিকট মু’জিযারূপে প্রতিভাত হইয়া থাকে। যদিও নবীগণও মানবীয় গুণাবলীর অধিকারী থাকেন তবুও বুদ্ধিবৃত্তি এবং মৌল গুণাবলীতে তাঁহারা সাধারণ মানব সমাজ হইতে সম্পূর্ণ আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। কারণ নবীর মধ্যে ওহী গ্রহণ করিবার যে যোগ্যতা বিদ্যমান তাহা অন্যান্য মানুষের মধ্যে সম্পূর্ণই অনুপস্থিত। এই বিষয়ে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى. “আমি তোমাদেরই মত একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয়” (১৮: ১১০)।
মানবীয় গুণে যদিও নবীগণ মানুষের পর্যায়ভুক্ত, কিন্তু 'ওহী' প্রাপ্তির ব্যাপারে উভয়ের মধ্যে সীমারেখা টানা হইয়াছে।
নিম্নোক্ত তিনটি বিশ্লেষণে বিষয়টি আরও প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে: (এক) মানুষের মধ্যে তিন ধরনের ঐচ্ছিক আচরণ বিদ্যমান রহিয়াছেঃ চিন্তাগত, বক্তব্যগত ও কর্মগত। এই তিনটি প্রক্রিয়ায় মানুষ যে কর্ম সম্পাদন করে তাহা ভালও হইতে পারে, মন্দও হইতে পারে। চিন্তাধারা শুদ্ধও হইতে পারে, ভুলও হইতে পারে। বক্তব্য সত্যও হইতে পারে মিথ্যাও হইতে পারে। কর্ম ভালও হইতে পারে, আবার মন্দও হইতে পারে। এখন প্রশ্ন হইল, শুদ্ধ ও ভুল, সত্য ও মিথ্যা, ভাল ও মন্দ নিরূপিত হইবে কিভাবে? এই নিরূপণ কি সকলের দ্বারা সম্ভব, না ইহা কেহই করিতে পারিবে না, না কেহ করিতে পারে, আর কেহ পারে না? প্রথম দুই সম্ভাবনা সর্বৈব ভুল। তৃতীয় সম্ভাবনা অর্থাৎ কেহ কেহ ইহা নিরূপণ করিতে পারেন যে, অমুক পথ ও মত শুদ্ধ আর অমুকটি ভুল। অমুক ব্যক্তি সত্যবাদী, আর অমুক মিথ্যাবাদী, এই কাজটি কল্যাণকর, আর এই কাজ অকল্যাণকর। যেই ব্যক্তিকে জগৎস্রষ্টা আপন করুণা ও অনুগ্রহে এই শক্তি দান করিয়াছেন তিনিই হইলেন নবী ও শরীআতের বিধানদাতা।
(দুই) মানবজাতির জন্য স্বীয় কর্ম, আচার-আচরণ ও লেনদেনের মধ্যে পারস্পরিক একতা ও সহযোগিতার প্রয়োজন রহিয়াছে। যদি তাহাদের মধ্যে এই সহযোগিতা ও সহমর্মিতা না থাকে তাহা হইলে তাহাদের জানমাল ও ইজ্জত-সম্মানের সংরক্ষণের উপায় থাকিবে না। জান-মাল ও ইজ্জত-সম্মান সংরক্ষণ রাখিবার এই বিধানের নামই হইল শরী'আত। তাই মানুষের জন্য দুই ধরনের কাজের প্রয়োজন। একটি হইল, ভাল কাজে একে অপরের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা। দ্বিতীয়টি হইল, মন্দ কাজ হইতে একজন অপরজনকে বিরত রাখিবার চেষ্টা করা। এই সহযোগিতার ফলেই মানুষ খাওয়া-পরা ও বাসস্থানের উপাদান উপকরণ যোগাড় করিয়া থাকে। ইহারই দ্বারা বিবাহ বন্ধন, আত্মীয়তা, সন্তান, বন্ধু-বান্ধব ও প্রিয়জনদের অধিকার ও সম্পর্ক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত ও সংরক্ষিত হয়। পরস্পরকে মন্দ কাজ হইতে বিরত রাখার মাধ্যমে প্রত্যেকেরই জীবন, ধন-সম্পত্তি, ইজ্জত-সম্মান হিফাজতের ও নিরাপত্তার পন্থা-পদ্ধতি বাহির হইয়া আসে। এই সহযোগিতা ও বিরত রাখার মূলনীতিতে প্রয়োজনীয় হইল তাহা যেন সুশৃংখলিত ও সুপরিজ্ঞাত হয় এবং তাহা যেন এমনভাবে প্রণয়ন করা হয় যে, ইহাতে কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী জাতি ও দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া না হয়, এই ব্যাপারে যেন সকলেরই এমন কল্যাণের কথা বিবেচনা করা হয়। ইহা অত্যন্ত পরিষ্কার যে, এইরূপ বিধান প্রবর্তন কোন মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়, বরং ইহা আল্লাহ প্রদত্ত ওহী এবং তাঁহারই শিক্ষাদানের মাধ্যমে প্রণীত হওয়া সম্ভব। আরও কথা হইল কোন মানুষের বুদ্ধিমত্তা দ্বারা ইহা সম্ভব নয়। কারণ মানুষ তো বিশেষ ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠী বা বিশেষ কোন দেশের অধিবাসী। সমগ্র ভূমণ্ডলের সকল সৃষ্টিকুলের জন্য একইরূপে অনুসরণযোগ্য সমতা ভিত্তিক পক্ষপাতহীন বিধান প্রর্বতন করা মানবীয় জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার পক্ষে সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব। এইজন্য প্রয়োজন যে, এই বিধানগুলি তাঁহারই পক্ষ হইতে প্রেরিত হইবে, যাহার হাতে রহিয়াছে সমগ্র বিশ্বের চাবিকাঠি, যিনি সমগ্র মানবমণ্ডলীর ভিতর-বাহিরের সামগ্রিক অবস্থা ও প্রয়োজন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। এই মূলনীতিরাজি মহান আল্লাহর পক্ষ হইতে যাহার উপর ওহীরূপে প্রেরিত হয় তিনি হইলেন রাসূল বা নবী।
(তিন) আল্লাহ তা'আলার একটি কাজ হইল সৃজন করা। দ্বিতীয়টি হইল, আমর বা আদেশ করা। যেইভাবে ফেরেশতাগণ সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মধ্যে দূত-এর ভূমিকা পালন করেন, তেমনিভাবে নবী আল্লাহ ও মানুষের মধ্যে আদেশ-নিষেধ পৌঁছাইবার জন্য মধ্যস্থতা করিয়া থাকেন। যেইভাবে আল্লাহ্র উপর সৃষ্টিকর্তা ও আদেশদাতা হিসাবে ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব সেইভাবে ফেরেশতাগণের উপর ঈমান আনা জরুরী যে, তাহারা সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মধ্যে সংবাদ বহনে দূতের ভূমিকা পালন করিয়া থাকেন। অনুরূপভাবে নবীগণের উপর ঈমান আনা আবশ্যক যে, তাঁহারা হইলেন আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে আদেশ-নিষেধ পৌঁছাইয়া দিবার মাধ্যম।
নিম্নে কতিপয় প্রণিধানযোগ্য বিষয়ের আলোচনা করা হইল। (১) যাহা সম্ভব তাহার অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব একই সমান। এই কারণে অস্তিত্বে আসার জন্য একজন অগ্রাধিকারদাতার প্রয়োজন, যাহার কারণে অস্তিত্বও অনস্তিত্বের উপর প্রাধান্য পাইবে এবং বস্তুটি অস্তিত্বে আসিবে। এই প্রাধান্য লাভকারী হইল সম্ভাবনার কারণ।
(২) সর্বপ্রকার আলোড়নের জন্য একজন আলোড়নকারীর প্রয়োজন হয়, যিনি সব সময় নব নব আলোড়ন সৃষ্টি করিতে থাকিবেন। আলোড়নও আবার দুই প্রকার : প্রকৃতিগত ও ইচ্ছাকৃত। ইচ্ছাকৃত আলোড়নের জন্য প্রয়োজন হইল আলোড়নকারীর মধ্যে ইচ্ছা ও অভিপ্রায় থাকা। অনুরূপ প্রকৃতিগত আলোড়নের জন্যও প্রয়োজন হইল আলোড়নকারী বুদ্ধিমান ও কার্যনির্বাহী হইবেন। চন্দ্র, সূর্য ও অন্যান্য নভোমণ্ডলীয় সৃষ্টির আলোড়ন যদিও প্রকৃতিগত, তবুও ইহাতে আলোড়ন সৃষ্টির জন্য কোন বুদ্ধিমান ও কার্যনির্বাহীর প্রয়োজন রহিয়াছে এই কারণেই আল-কুরআনে এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে: وَأَوْحَى فِي كُلِّ سَمَاء أَمْرَهَا. "এবং তিনি প্রত্যেক আকাশে উহার বিধান ব্যক্ত করিলেন" (৪১: ২২)।
(৩) এখন যেমন মানবীয় আচরণ আলোড়ন, অভিপ্রায় ও ইচ্ছার মুখাপেক্ষী অর্থাৎ ইচ্ছা অভিপ্রায় ব্যতীত ইহা সংঘটিত হইতে পারে না তেমনিভাবে এই আলোড়নসমূহের জন্য এমন দিশারীর প্রয়োজন যিনি সেই কর্ম ও আলোড়নের সঠিক পন্থা দেখাইয়া দিবেন। হককে বাতিল হইতে, সত্যকে মিথ্যা হইতে এবং শুভকে অশুভ হইতে পৃথক করিয়া দিবেন।
(৪) আল্লাহ্র আদেশ দুই প্রকার: ব্যবস্থাপনামূলক ( تدبیری ) ও বাধ্যতামূলক ( تکلیفی )। প্রথম প্রকার আদেশটি বিশ্ব-ব্যবস্থাপনায় চালু রহিয়াছে, যাহার কারণে সমগ্র বিশ্বে সুন্দর ব্যবস্থাপনা দৃশ্যমান। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتِ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ. "আর সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি যাহা তাঁহারই আজ্ঞাধীন, তাহা তিনিই সৃষ্টি করিয়াছেন। জানিয়া রাখ, সৃজন ও আদেশ তাঁহারই" (৭:৫৪)।
বাধ্যতামূলক আদেশ কেবল মানুষের জন্য। সুতরাং আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: يَأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ. "হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন" (২: ২১)।
উপরিউক্ত আলোচনা হইতে প্রমাণিত হইল যে, মানুষের সকল আলোড়ন সম্ভাবনাময়। এইজন্য অগ্রাধিকার দানকারীর প্রয়োজন ভাল ও মন্দের, নির্দেশের জন্য দিশারীর প্রয়োজন। এই দিশারীর নাম হইল নবী।

টিকাঃ
১. শিবলী নু'মানীও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ১৭।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবী-রাসূলের প্রয়োজনীয়তা

📄 নবী-রাসূলের প্রয়োজনীয়তা


নবী-রাসূলের প্রয়োজনীয়তা
মানুষের মধ্যে দুই প্রকার শক্তি রহিয়াছে। একটি হইল পশুশক্তি আর একটি ফেরেশতা- সুলভশক্তি। পানাহার, কামনা-বাসনা, লোভ-লালসা, বিজয়ী হওয়া, বাধ্য হওয়া ইত্যাদি হইল পশু শক্তির লক্ষণ। চিন্তা-ভাবনা, ইল্ম-মা'রিফাত, সচ্চরিত্রতা, ধৈর্যধারণ, কৃতজ্ঞতা, ইবাদত ও আনুগত্য ইত্যাদি হইল ফেরেশতাসুলভ শক্তির পরিচায়ক। মানুষের আত্মিক সাফল্যের জন্য প্রয়োজন হইল তাহার পশুশক্তি ফেরেশতা শক্তির অধীন থাকিবে। যদিও সুস্থ বুদ্ধিমত্তা এই নীতিমালা ও পন্থাসমূহ অনুধাবন করিতে পারে, পশুশক্তি ফেরেশতাসুলভ শক্তির অধীন হইবার লাভসমূহ এবং গুনাহ ও অবাধ্যতার ক্ষতিসমূহ বুঝিতে পারে। সুস্থ বুদ্ধিমত্তা এই জ্ঞান দ্বারা মানুষ নিজের সংশোধন করিতে পারে। কিন্তু ইহা হইল বুদ্ধিগত একটি সম্ভাবনা মাত্র। বাস্তব অবস্থা হইল, মানুষের চক্ষুর উপর পার্থিব আকর্ষণ, লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা এবং উদাসীনতার এত গাঢ় আবরণ পড়িয়া যায় যে, তাহার মৌল ও স্বাভাবিক বোধশক্তির উপাদান বিনষ্ট হইয়া যায়। (রুগ্ন হইবার ফলে যেই ভাবে মানুষের মুখের স্বাদ এতই বিকৃত হইয়া পড়ে যে, সুনির্দিষ্ট বস্তুও তাহার নিকট তিক্ত মনে হয়। অনুরূপ আভ্যন্তরীণ বোধ ও অনুভূতিশক্তি লোপ পাইলে মানুষ-হক ও বাতিল, পাপ ও পুণ্যের পার্থক্য নিরূপণ করিতে বিস্তৃত হইয়া যায়। এই কারণে মানবজাতির জন্য এমন সঠিক পথপ্রদর্শক ও আত্মিক শিক্ষকগণের প্রয়োজন যাহাদের অনুভূতি ও বোধশক্তি আবিলতামুক্ত। যদি ব্যক্তি সমাজ ও দেশবাসীর জন্য এমন কোন ব্যক্তির প্রয়োজন হয়, যিনি তাহার রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে তাহাদের মধ্যে সৌহার্দ, সম্প্রীতি ও নিরাপত্তা বিধান করিয়া দিবেন, তাহা হইলে কেবল একটি জাতি তো বটেই— সমগ্র জগদ্বাসীর জন্য এমন এক ব্যক্তির প্রয়োজন হইবে না কেন, যিনি সকলের যোগ্যতা ও দক্ষতার আলোকে তাহাদের অধিকার ও কর্তব্যসমূহ নির্ধারণ করিয়া দিবেন। এমন গুরুদায়িত্ব পালনকারী লোকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হইয়া থাকে, যেইভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও দক্ষ মানুষের সংখ্যা কম হয়। জাতির সার্বিক কল্যাণমূলক বিষয়টি যেই পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ ও সুক্ষ্ম তাহা অনুধাবন করা ও সঠিকভাবে নির্ণয় করা কি সকল বুদ্ধিমান ও নির্বোধের কাজ হইতে পারে? কস্মিন কালেও ইহা সম্ভব নয়। এই কারণেই নবী বা পথপ্রদর্শক প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে। যিনি এই পথ প্রদর্শনের জন্য নিয়োজিত হইবেন তাঁহাকে ইহা প্রমাণ করিতে হইবে যে, তিনি সেই সকল আইন-কানুন ও বিধিবিধান সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত। নিজ জ্ঞানে ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তিনি ভুল-ত্রুটি হইতে সম্পূর্ণ নিরাপদ বা মাসূম। এই দাবি ততক্ষণ পর্যন্ত কাহারও পক্ষে উত্থাপন করা সম্ভব হইবে না যতক্ষণ তাঁহার জ্ঞানের উৎস সার্বিকভাবে ভুল-ত্রুটি হইতে পবিত্র ও মুক্ত না হইবে। বিষয়সমূহের জ্ঞান তিনি ক্ষুধা-তৃষ্ণার অনুভূতির মত প্রত্যক্ষভাবে প্রাপ্ত হন। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অনুভূতির ব্যাপারে মানুষ যেমন ভুল করে না ঠিক সেইভাবে পথপ্রদর্শক নিশ্চিতভাবে সত্য ও মিথ্যা, ভাল-মন্দের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করিতে ভুল করিবেন না। ক্ষুধা-তৃষ্ণার অনুভূতির ব্যাপারে দলীল-প্রমাণের প্রয়োজন হয় না। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার প্রিয় মনোনীত পবিত্রাত্মাদের মধ্যে এমন বিশেষ ধরনের অনুভূতি ও সঠিক চেতনা দান করিয়াছেন যাহাদের সার্বিক কর্মকাণ্ড বিশুদ্ধ ও নির্মল। তাঁহাদের সিদ্ধান্ত সর্বদাই যথার্থ (শিবল নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ১৯; শাহ ওলীউল্লাহ্ মুহাদ্দিছে দিহলাবী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, ১খ., পৃ. ৮২)।

নবী-রাসূলের প্রয়োজনীয়তা
মানুষের মধ্যে দুই প্রকার শক্তি রহিয়াছে। একটি হইল পশুশক্তি আর একটি ফেরেশতা- সুলভশক্তি। পানাহার, কামনা-বাসনা, লোভ-লালসা, বিজয়ী হওয়া, বাধ্য হওয়া ইত্যাদি হইল পশু শক্তির লক্ষণ। চিন্তা-ভাবনা, ইল্ম-মা'রিফাত, সচ্চরিত্রতা, ধৈর্যধারণ, কৃতজ্ঞতা, ইবাদত ও আনুগত্য ইত্যাদি হইল ফেরেশতাসুলভ শক্তির পরিচায়ক। মানুষের আত্মিক সাফল্যের জন্য প্রয়োজন হইল তাহার পশুশক্তি ফেরেশতা শক্তির অধীন থাকিবে। যদিও সুস্থ বুদ্ধিমত্তা এই নীতিমালা ও পন্থাসমূহ অনুধাবন করিতে পারে, পশুশক্তি ফেরেশতাসুলভ শক্তির অধীন হইবার লাভসমূহ এবং গুনাহ ও অবাধ্যতার ক্ষতিসমূহ বুঝিতে পারে। সুস্থ বুদ্ধিমত্তা এই জ্ঞান দ্বারা মানুষ নিজের সংশোধন করিতে পারে। কিন্তু ইহা হইল বুদ্ধিগত একটি সম্ভাবনা মাত্র। বাস্তব অবস্থা হইল, মানুষের চক্ষুর উপর পার্থিব আকর্ষণ, লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা এবং উদাসীনতার এত গাঢ় আবরণ পড়িয়া যায় যে, তাহার মৌল ও স্বাভাবিক বোধশক্তির উপাদান বিনষ্ট হইয়া যায়। (রুগ্ন হইবার ফলে যেই ভাবে মানুষের মুখের স্বাদ এতই বিকৃত হইয়া পড়ে যে, সুনির্দিষ্ট বস্তুও তাহার নিকট তিক্ত মনে হয়। অনুরূপ আভ্যন্তরীণ বোধ ও অনুভূতিশক্তি লোপ পাইলে মানুষ-হক ও বাতিল, পাপ ও পুণ্যের পার্থক্য নিরূপণ করিতে বিস্তৃত হইয়া যায়। এই কারণে মানবজাতির জন্য এমন সঠিক পথপ্রদর্শক ও আত্মিক শিক্ষকগণের প্রয়োজন যাহাদের অনুভূতি ও বোধশক্তি আবিলতামুক্ত। যদি ব্যক্তি সমাজ ও দেশবাসীর জন্য এমন কোন ব্যক্তির প্রয়োজন হয়, যিনি তাহার রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে তাহাদের মধ্যে সৌহার্দ, সম্প্রীতি ও নিরাপত্তা বিধান করিয়া দিবেন, তাহা হইলে কেবল একটি জাতি তো বটেই— সমগ্র জগদ্বাসীর জন্য এমন এক ব্যক্তির প্রয়োজন হইবে না কেন, যিনি সকলের যোগ্যতা ও দক্ষতার আলোকে তাহাদের অধিকার ও কর্তব্যসমূহ নির্ধারণ করিয়া দিবেন। এমন গুরুদায়িত্ব পালনকারী লোকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হইয়া থাকে, যেইভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও দক্ষ মানুষের সংখ্যা কম হয়। জাতির সার্বিক কল্যাণমূলক বিষয়টি যেই পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ ও সুক্ষ্ম তাহা অনুধাবন করা ও সঠিকভাবে নির্ণয় করা কি সকল বুদ্ধিমান ও নির্বোধের কাজ হইতে পারে? কস্মিন কালেও ইহা সম্ভব নয়। এই কারণেই নবী বা পথপ্রদর্শক প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে। যিনি এই পথ প্রদর্শনের জন্য নিয়োজিত হইবেন তাঁহাকে ইহা প্রমাণ করিতে হইবে যে, তিনি সেই সকল আইন-কানুন ও বিধিবিধান সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত। নিজ জ্ঞানে ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তিনি ভুল-ত্রুটি হইতে সম্পূর্ণ নিরাপদ বা মাসূম। এই দাবি ততক্ষণ পর্যন্ত কাহারও পক্ষে উত্থাপন করা সম্ভব হইবে না যতক্ষণ তাঁহার জ্ঞানের উৎস সার্বিকভাবে ভুল-ত্রুটি হইতে পবিত্র ও মুক্ত না হইবে। বিষয়সমূহের জ্ঞান তিনি ক্ষুধা-তৃষ্ণার অনুভূতির মত প্রত্যক্ষভাবে প্রাপ্ত হন। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অনুভূতির ব্যাপারে মানুষ যেমন ভুল করে না ঠিক সেইভাবে পথপ্রদর্শক নিশ্চিতভাবে সত্য ও মিথ্যা, ভাল-মন্দের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করিতে ভুল করিবেন না। ক্ষুধা-তৃষ্ণার অনুভূতির ব্যাপারে দলীল-প্রমাণের প্রয়োজন হয় না। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার প্রিয় মনোনীত পবিত্রাত্মাদের মধ্যে এমন বিশেষ ধরনের অনুভূতি ও সঠিক চেতনা দান করিয়াছেন যাহাদের সার্বিক কর্মকাণ্ড বিশুদ্ধ ও নির্মল। তাঁহাদের সিদ্ধান্ত সর্বদাই যথার্থ (শিবল নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ১৯; শাহ ওলীউল্লাহ্ মুহাদ্দিছে দিহলাবী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, ১খ., পৃ. ৮২)।

মানুষের মধ্যে দুই প্রকার শক্তি রহিয়াছে। একটি হইল পশুশক্তি আর একটি ফেরেশতা- সুলভশক্তি। পানাহার, কামনা-বাসনা, লোভ-লালসা, বিজয়ী হওয়া, বাধ্য হওয়া ইত্যাদি হইল পশু শক্তির লক্ষণ। চিন্তা-ভাবনা, ইল্ম-মা'রিফাত, সচ্চরিত্রতা, ধৈর্যধারণ, কৃতজ্ঞতা, ইবাদত ও আনুগত্য ইত্যাদি হইল ফেরেশতাসুলভ শক্তির পরিচায়ক। মানুষের আত্মিক সাফল্যের জন্য প্রয়োজন হইল তাহার পশুশক্তি ফেরেশতা শক্তির অধীন থাকিবে। যদিও সুস্থ বুদ্ধিমত্তা এই নীতিমালা ও পন্থাসমূহ অনুধাবন করিতে পারে, পশুশক্তি ফেরেশতাসুলভ শক্তির অধীন হইবার লাভসমূহ এবং গুনাহ ও অবাধ্যতার ক্ষতিসমূহ বুঝিতে পারে। সুস্থ বুদ্ধিমত্তা এই জ্ঞান দ্বারা মানুষ নিজের সংশোধন করিতে পারে। কিন্তু ইহা হইল বুদ্ধিগত একটি সম্ভাবনা মাত্র। বাস্তব অবস্থা হইল, মানুষের চক্ষুর উপর পার্থিব আকর্ষণ, লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা এবং উদাসীনতার এত গাঢ় আবরণ পড়িয়া যায় যে, তাহার মৌল ও স্বাভাবিক বোধশক্তির উপাদান বিনষ্ট হইয়া যায়। (রুগ্ন হইবার ফলে যেই ভাবে মানুষের মুখের স্বাদ এতই বিকৃত হইয়া পড়ে যে, সুনির্দিষ্ট বস্তুও তাহার নিকট তিক্ত মনে হয়। অনুরূপ আভ্যন্তরীণ বোধ ও অনুভূতিশক্তি লোপ পাইলে মানুষ-হক ও বাতিল, পাপ ও পুণ্যের পার্থক্য নিরূপণ করিতে বিস্তৃত হইয়া যায়। এই কারণে মানবজাতির জন্য এমন সঠিক পথপ্রদর্শক ও আত্মিক শিক্ষকগণের প্রয়োজন যাহাদের অনুভূতি ও বোধশক্তি আবিলতামুক্ত। যদি ব্যক্তি সমাজ ও দেশবাসীর জন্য এমন কোন ব্যক্তির প্রয়োজন হয়, যিনি তাহার রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে তাহাদের মধ্যে সৌহার্দ, সম্প্রীতি ও নিরাপত্তা বিধান করিয়া দিবেন, তাহা হইলে কেবল একটি জাতি তো বটেই— সমগ্র জগদ্বাসীর জন্য এমন এক ব্যক্তির প্রয়োজন হইবে না কেন, যিনি সকলের যোগ্যতা ও দক্ষতার আলোকে তাহাদের অধিকার ও কর্তব্যসমূহ নির্ধারণ করিয়া দিবেন। এমন গুরুদায়িত্ব পালনকারী লোকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হইয়া থাকে, যেইভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও দক্ষ মানুষের সংখ্যা কম হয়। জাতির সার্বিক কল্যাণমূলক বিষয়টি যেই পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ ও সুক্ষ্ম তাহা অনুধাবন করা ও সঠিকভাবে নির্ণয় করা কি সকল বুদ্ধিমান ও নির্বোধের কাজ হইতে পারে? কস্মিন কালেও ইহা সম্ভব নয়। এই কারণেই নবী বা পথপ্রদর্শক প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে। যিনি এই পথ প্রদর্শনের জন্য নিয়োজিত হইবেন তাঁহাকে ইহা প্রমাণ করিতে হইবে যে, তিনি সেই সকল আইন-কানুন ও বিধিবিধান সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত। নিজ জ্ঞানে ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তিনি ভুল-ত্রুটি হইতে সম্পূর্ণ নিরাপদ বা মাসূম। এই দাবি ততক্ষণ পর্যন্ত কাহারও পক্ষে উত্থাপন করা সম্ভব হইবে না যতক্ষণ তাঁহার জ্ঞানের উৎস সার্বিকভাবে ভুল-ত্রুটি হইতে পবিত্র ও মুক্ত না হইবে। বিষয়সমূহের জ্ঞান তিনি ক্ষুধা-তৃষ্ণার অনুভূতির মত প্রত্যক্ষভাবে প্রাপ্ত হন। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অনুভূতির ব্যাপারে মানুষ যেমন ভুল করে না ঠিক সেইভাবে পথপ্রদর্শক নিশ্চিতভাবে সত্য ও মিথ্যা, ভাল-মন্দের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করিতে ভুল করিবেন না। ক্ষুধা-তৃষ্ণার অনুভূতির ব্যাপারে দলীল-প্রমাণের প্রয়োজন হয় না। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার প্রিয় মনোনীত পবিত্রাত্মাদের মধ্যে এমন বিশেষ ধরনের অনুভূতি ও সঠিক চেতনা দান করিয়াছেন যাহাদের সার্বিক কর্মকাণ্ড বিশুদ্ধ ও নির্মল। তাঁহাদের সিদ্ধান্ত সর্বদাই যথার্থ।

টিকাঃ
১. শিবল নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ১৯; শাহ ওলীউল্লাহ্ মুহাদ্দিছে দিহলাবী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, ১খ., পৃ. ৮২।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াতের মর্যাদা

📄 নবুওয়াতের মর্যাদা


নবুওয়াতের মর্যাদা
সম্মান ও মর্যাদা, 'ইলম ও আমলের পার্থক্যের অনুপাতে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণীভেদ লক্ষ্য করা যায়। তাহাদের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী হইলেন বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ। শাহ ওলীউল্লাহ্ মুহাদ্দিছ দেহলাবীর ভাষায় ইহারা হইলেন 'মুফহিমূন'। তিনি বলেন, ইহারা হইলেন সেই সকল লোক, যাহাদের রহিয়াছে সর্বোচ্চ ফেরেশতাসুলভ প্রকৃতি। যাহারা এই অবস্থানে পৌঁছিবার যোগ্যতাসম্পন্ন, তাঁহারা সঠিক পরিকল্পনা ও সত্য দিকনির্দেশনার মাধ্যমে বিশ্বজোড়া এক নিয়মতান্ত্রিকতা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁহাদের উপর আল্লাহ্র দরবার হইতে এমন প্রজ্ঞা ও প্রাণসঞ্জীবনী শক্তির বিকাশ ঘটে, যেইগুলির মধ্যে আল্লাহ্ প্রত্যক্ষ নির্দেশাবলীর লক্ষণাদি দেখিতে পাওয়া যায়। তাঁহারা সঠিক বিবেকবান এবং আকার-আকৃতি, আচার-আচরণ, বুদ্ধি ও মেধায় মধ্যমপন্থী হইয়া থাকেন। তাঁহারা সঠিক প্রবৃত্তির উপর অবিচল থাকেন।
তাঁহাদের আচার-আচরণ মনোমুগ্ধকর হইয়া থাকে। আল্লাহ্র সহিত তাঁহাদের সম্পর্ক থাকে ইবাদত ও আনুগত্যের এবং বান্দাদের সহিত সম্পর্ক হয় ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচারের। তাঁহারা সিদ্ধান্ত দানে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের প্রতি মোটেই ভ্রুক্ষেপ করেন না, বরং তাহাদের দৃষ্টি থাকে সর্বসাধারণের কল্যাণের প্রতি। জগৎ স্রষ্টা তাঁহাদিগকে সাহায্য করিতে থাকেন। তাই অল্প আয়াসেই তাঁহাদের নৈকট্যলাভ ও শান্তির সেই দ্বার উন্মুক্ত হইয়া যায় যাহা অন্যদের জন্য সম্ভব হয় না।
এই 'মুফহিমূন' বা প্রজ্ঞা ও মনীষার অধিকারিগণ বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত। যোগ্যতা ও দক্ষতার তারতম্যেই এই শ্রেণীবিভেদ। এই যোগ্যতার নিরিখেই তাহাদেরকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। যাহারা অধিকতর ইবাদতের মাধ্যমে আত্মসংশোধনের স্তর লাভ করেন তাঁহারা হইলেন 'কামিল'। যাহারা উত্তম চরিত্রের অধিকারী হইয়া সঠিক পরিকল্পনার জ্ঞানসমূহ লাভের অধিকারী হইয়াছেন, তাঁহারা হইলেন 'হাকীম'। যাহারা পরিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জ্ঞান লাভ করিয়াছেন এবং তাঁহাদেরকে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা দেওয়া হইয়াছে তাঁহাদেরকে বলা হয় 'খলীফা'। যাঁহার নিকট জিবরাঈল ('আ)-এর আগমন ঘটে, তাঁহার নিকট হইতে তিনি জ্ঞান লাভ করেন, বিভিন্ন মুজিযার প্রকাশ ঘটে তাঁহাকে مؤيد بروح القدس জিবরাঈল কর্তৃক সাহায্যকৃত বলিয়া অভিহিত করা হয়। যাঁহার চেহারা ও অন্তরে নূর বা জ্যোতি থাকে, তাঁহার সংসর্গে মানুষ জীবনজিজ্ঞাসার সন্ধান পায়, তাঁহার নূর বিচ্ছুরিত হইয়া তাঁহার সঙ্গীদেরকে আলোকিত করে এবং তাঁহারাও কামালিয়াতের স্তর লাভ করেন, তাঁহাকে 'হাদী' (হিদায়াতকারী) এবং 'মুযাক্কী' (পবিত্রতা প্রদানকারী) বলা হয়। যাঁহার ইলমের বড় অংশ ধর্মের মূলনীতি, নিয়ম-পদ্ধতি ও ইহার সফলসমূহের অবগতির লক্ষ্যে হয়। আর তাঁহার মাধ্যমে ধর্মের বিলুপ্ত ও নিষ্প্রাণ বিধানসমূহকে পুনর্জীবিত করা সম্ভব হয় তাঁহাকে ইমাম বলা হয়। যাঁহার অন্তরে এই প্রেরণা প্রদান করা হয় যে, তিনি মানুষকে সেই মহা দুর্ভোগ হইতে সাবধান করিবেন, যাহা তাহাদের কৃতকর্মের ফলে এই জগতে নির্দিষ্ট করিয়া রাখা হইয়াছে, অপকর্মের ফলে তাহারা যে আল্লাহ্ রহমত হইতে বঞ্চিত হইবেন এবং কবর ও হাশরে তাহাদের উপর যেই বিপদ আসিবে তাহার সম্পর্কে যিনি লোকদিগকে অবহিত করেন, তিনি হইলেন মুনযির বা ভীতি প্রদর্শনকারী।
যখন আল্লাহর ইচ্ছা হয় তখন সৃষ্টিকুলের হিদায়াত ও সংশোধনের জন্য এবং অন্ধকার হইতে আলোর পথে লইয়া আসার জন্য 'মুফহিমূন'-এর মধ্য হইতে কাহাকেও, প্রেরণ করেন। বান্দাদের উপর এই প্রেরিত ব্যক্তির অনুসরণ করা আবশ্যকীয় করা হয়। আল্লাহ্র পক্ষ হইতে তাকীদ করা হয় যে, যেই ব্যক্তি তাঁহার অনুসরণ করিবে তিনি তাহার উপর সন্তুষ্ট হইবেন এবং যে তাহার বিরুদ্ধাচরণ করিবে তাহার উপর তিনি নারাজ হইবেন। এইরূপ ব্যক্তিকেই নবী বলা হয়। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (স)-এর আবির্ভাবের পূর্বে যত নবী আগমন করিয়াছিলেন তাঁহাদের কেহ কেহ মুফহীমূনের উপরিউক্তস্তরসমূহের মধ্য হইতে এক-দুইটি স্তরের অধিকারী

নবুওয়াতের মর্যাদা
সম্মান ও মর্যাদা, 'ইলম ও আমলের পার্থক্যের অনুপাতে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণীভেদ লক্ষ্য করা যায়। তাহাদের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী হইলেন বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ। শাহ ওলীউল্লাহ্ মুহাদ্দিছ দেহলাবীর ভাষায় ইহারা হইলেন 'মুফহিমূন'। তিনি বলেন, ইহারা হইলেন সেই সকল লোক, যাহাদের রহিয়াছে সর্বোচ্চ ফেরেশতাসুলভ প্রকৃতি। যাহারা এই অবস্থানে পৌঁছিবার যোগ্যতাসম্পন্ন, তাঁহারা সঠিক পরিকল্পনা ও সত্য দিকনির্দেশনার মাধ্যমে বিশ্বজোড়া এক নিয়মতান্ত্রিকতা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁহাদের উপর আল্লাহ্র দরবার হইতে এমন প্রজ্ঞা ও প্রাণসঞ্জীবনী শক্তির বিকাশ ঘটে, যেইগুলির মধ্যে আল্লাহ্ প্রত্যক্ষ নির্দেশাবলীর লক্ষণাদি দেখিতে পাওয়া যায়। তাঁহারা সঠিক বিবেকবান এবং আকার-আকৃতি, আচার-আচরণ, বুদ্ধি ও মেধায় মধ্যমপন্থী হইয়া থাকেন। তাঁহারা সঠিক প্রবৃত্তির উপর অবিচল থাকেন।
তাঁহাদের আচার-আচরণ মনোমুগ্ধকর হইয়া থাকে। আল্লাহ্র সহিত তাঁহাদের সম্পর্ক থাকে ইবাদত ও আনুগত্যের এবং বান্দাদের সহিত সম্পর্ক হয় ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচারের। তাঁহারা সিদ্ধান্ত দানে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের প্রতি মোটেই ভ্রুক্ষেপ করেন না, বরং তাহাদের দৃষ্টি থাকে সর্বসাধারণের কল্যাণের প্রতি। জগৎ স্রষ্টা তাঁহাদিগকে সাহায্য করিতে থাকেন। তাই অল্প আয়াসেই তাঁহাদের নৈকট্যলাভ ও শান্তির সেই দ্বার উন্মুক্ত হইয়া যায় যাহা অন্যদের জন্য সম্ভব হয় না।
এই 'মুফহিমূন' বা প্রজ্ঞা ও মনীষার অধিকারিগণ বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত। যোগ্যতা ও দক্ষতার তারতম্যেই এই শ্রেণীবিভেদ। এই যোগ্যতার নিরিখেই তাহাদেরকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। যাহারা অধিকতর ইবাদতের মাধ্যমে আত্মসংশোধনের স্তর লাভ করেন তাঁহারা হইলেন 'কামিল'। যাহারা উত্তম চরিত্রের অধিকারী হইয়া সঠিক পরিকল্পনার জ্ঞানসমূহ লাভের অধিকারী হইয়াছেন, তাঁহারা হইলেন 'হাকীম'। যাহারা পরিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জ্ঞান লাভ করিয়াছেন এবং তাঁহাদেরকে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা দেওয়া হইয়াছে তাঁহাদেরকে বলা হয় 'খলীফা'। যাঁহার নিকট জিবরাঈল ('আ)-এর আগমন ঘটে, তাঁহার নিকট হইতে তিনি জ্ঞান লাভ করেন, বিভিন্ন মুজিযার প্রকাশ ঘটে তাঁহাকে مؤيد بروح القدس জিবরাঈল কর্তৃক সাহায্যকৃত বলিয়া অভিহিত করা হয়। যাঁহার চেহারা ও অন্তরে নূর বা জ্যোতি থাকে, তাঁহার সংসর্গে মানুষ জীবনজিজ্ঞাসার সন্ধান পায়, তাঁহার নূর বিচ্ছুরিত হইয়া তাঁহার সঙ্গীদেরকে আলোকিত করে এবং তাঁহারাও কামালিয়াতের স্তর লাভ করেন, তাঁহাকে 'হাদী' (হিদায়াতকারী) এবং 'মুযাক্কী' (পবিত্রতা প্রদানকারী) বলা হয়। যাঁহার ইলমের বড় অংশ ধর্মের মূলনীতি, নিয়ম-পদ্ধতি ও ইহার সফলসমূহের অবগতির লক্ষ্যে হয়। আর তাঁহার মাধ্যমে ধর্মের বিলুপ্ত ও নিষ্প্রাণ বিধানসমূহকে পুনর্জীবিত করা সম্ভব হয় তাঁহাকে ইমাম বলা হয়। যাঁহার অন্তরে এই প্রেরণা প্রদান করা হয় যে, তিনি মানুষকে সেই মহা দুর্ভোগ হইতে সাবধান করিবেন, যাহা তাহাদের কৃতকর্মের ফলে এই জগতে নির্দিষ্ট করিয়া রাখা হইয়াছে, অপকর্মের ফলে তাহারা যে আল্লাহ্ রহমত হইতে বঞ্চিত হইবেন এবং কবর ও হাশরে তাহাদের উপর যেই বিপদ আসিবে তাহার সম্পর্কে যিনি লোকদিগকে অবহিত করেন, তিনি হইলেন মুনযির বা ভীতি প্রদর্শনকারী।
যখন আল্লাহর ইচ্ছা হয় তখন সৃষ্টিকুলের হিদায়াত ও সংশোধনের জন্য এবং অন্ধকার হইতে আলোর পথে লইয়া আসার জন্য 'মুফহিমূন'-এর মধ্য হইতে কাহাকেও, প্রেরণ করেন। বান্দাদের উপর এই প্রেরিত ব্যক্তির অনুসরণ করা আবশ্যকীয় করা হয়। আল্লাহ্র পক্ষ হইতে তাকীদ করা হয় যে, যেই ব্যক্তি তাঁহার অনুসরণ করিবে তিনি তাহার উপর সন্তুষ্ট হইবেন এবং যে তাহার বিরুদ্ধাচরণ করিবে তাহার উপর তিনি নারাজ হইবেন। এইরূপ ব্যক্তিকেই নবী বলা হয়। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (স)-এর আবির্ভাবের পূর্বে যত নবী আগমন করিয়াছিলেন তাঁহাদের কেহ কেহ মুফহীমূনের উপরিউক্তস্তরসমূহের মধ্য হইতে এক-দুইটি স্তরের অধিকারী

সম্মান ও মর্যাদা, 'ইলম ও আমলের পার্থক্যের অনুপাতে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণীভেদ লক্ষ্য করা যায়। তাহাদের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী হইলেন বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ। শাহ ওলীউল্লাহ্ মুহাদ্দিছ দেহলাবীর ভাষায় ইহারা হইলেন 'মুফহিমূন'। তিনি বলেন, ইহারা হইলেন সেই সকল লোক, যাহাদের রহিয়াছে সর্বোচ্চ ফেরেশতাসুলভ প্রকৃতি। যাহারা এই অবস্থানে পৌঁছিবার যোগ্যতাসম্পন্ন, তাঁহারা সঠিক পরিকল্পনা ও সত্য দিকনির্দেশনার মাধ্যমে বিশ্বজোড়া এক নিয়মতান্ত্রিকতা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁহাদের উপর আল্লাহ্র দরবার হইতে এমন প্রজ্ঞা ও প্রাণসঞ্জীবনী শক্তির বিকাশ ঘটে, যেইগুলির মধ্যে আল্লাহ্ প্রত্যক্ষ নির্দেশাবলীর লক্ষণাদি দেখিতে পাওয়া যায়। তাঁহারা সঠিক বিবেকবান এবং আকার-আকৃতি, আচার-আচরণ, বুদ্ধি ও মেধায় মধ্যমপন্থী হইয়া থাকেন। তাঁহারা সঠিক প্রবৃত্তির উপর অবিচল থাকেন। তাঁহাদের আচার-আচরণ মনোমুগ্ধকর হইয়া থাকে। আল্লাহ্র সহিত তাঁহাদের সম্পর্ক থাকে ইবাদত ও আনুগত্যের এবং বান্দাদের সহিত সম্পর্ক হয় ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচারের। তাঁহারা সিদ্ধান্ত দানে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের প্রতি মোটেই ভ্রুক্ষেপ করেন না, বরং তাহাদের দৃষ্টি থাকে সর্বসাধারণের কল্যাণের প্রতি। জগৎ স্রষ্টা তাঁহাদিগকে সাহায্য করিতে থাকেন। তাই অল্প আয়াসেই তাঁহাদের নৈকট্যলাভ ও শান্তির সেই দ্বার উন্মুক্ত হইয়া যায় যাহা অন্যদের জন্য সম্ভব হয় না।
এই 'মুফহিমূন' বা প্রজ্ঞা ও মনীষার অধিকারিগণ বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত। যোগ্যতা ও দক্ষতার তারতম্যেই এই শ্রেণীবিভেদ। এই যোগ্যতার নিরিখেই তাহাদেরকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। যাহারা অধিকতর ইবাদতের মাধ্যমে আত্মসংশোধনের স্তর লাভ করেন তাঁহারা হইলেন 'কামিল'। যাহারা উত্তম চরিত্রের অধিকারী হইয়া সঠিক পরিকল্পনার জ্ঞানসমূহ লাভের অধিকারী হইয়াছেন, তাঁহারা হইলেন 'হাকীম'। যাহারা পরিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জ্ঞান লাভ করিয়াছেন এবং তাঁহাদেরকে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা দেওয়া হইয়াছে তাঁহাদেরকে বলা হয় 'খলীফা'। যাঁহার নিকট জিবরাঈল ('আ)-এর আগমন ঘটে, তাঁহার নিকট হইতে তিনি জ্ঞান লাভ করেন, বিভিন্ন মুজিযার প্রকাশ ঘটে তাঁহাকে مؤيد بروح القدس জিবরাঈল কর্তৃক সাহায্যকৃত বলিয়া অভিহিত করা হয়। যাঁহার চেহারা ও অন্তরে নূর বা জ্যোতি থাকে, তাঁহার সংসর্গে মানুষ জীবনজিজ্ঞাসার সন্ধান পায়, তাঁহার নূর বিচ্ছুরিত হইয়া তাঁহার সঙ্গীদেরকে আলোকিত করে এবং তাঁহারাও কামালিয়াতের স্তর লাভ করেন, তাঁহাকে 'হাদী' (হিদায়াতকারী) এবং 'মুযাক্কী' (পবিত্রতা প্রদানকারী) বলা হয়। যাঁহার ইলমের বড় অংশ ধর্মের মূলনীতি, নিয়ম-পদ্ধতি ও ইহার সফলসমূহের অবগতির লক্ষ্যে হয়। আর তাঁহার মাধ্যমে ধর্মের বিলুপ্ত ও নিষ্প্রাণ বিধানসমূহকে পুনর্জীবিত করা সম্ভব হয় তাঁহাকে ইমাম বলা হয়। যাঁহার অন্তরে এই প্রেরণা প্রদান করা হয় যে, তিনি মানুষকে সেই মহা দুর্ভোগ হইতে সাবধান করিবেন, যাহা তাহাদের কৃতকর্মের ফলে এই জগতে নির্দিষ্ট করিয়া রাখা হইয়াছে, অপকর্মের ফলে তাহারা যে আল্লাহ্ রহমত হইতে বঞ্চিত হইবেন এবং কবর ও হাশরে তাহাদের উপর যেই বিপদ আসিবে তাহার সম্পর্কে যিনি লোকদিগকে অবহিত করেন, তিনি হইলেন মুনযির বা ভীতি প্রদর্শনকারী।
যখন আল্লাহর ইচ্ছা হয় তখন সৃষ্টিকুলের হিদায়াত ও সংশোধনের জন্য এবং অন্ধকার হইতে আলোর পথে লইয়া আসার জন্য 'মুফহিমূন'-এর মধ্য হইতে কাহাকেও, প্রেরণ করেন। বান্দাদের উপর এই প্রেরিত ব্যক্তির অনুসরণ করা আবশ্যকীয় করা হয়। আল্লাহ্র পক্ষ হইতে তাকীদ করা হয় যে, যেই ব্যক্তি তাঁহার অনুসরণ করিবে তিনি তাহার উপর সন্তুষ্ট হইবেন এবং যে তাহার বিরুদ্ধাচরণ করিবে তাহার উপর তিনি নারাজ হইবেন। এইরূপ ব্যক্তিকেই নবী বলা হয়। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (স)-এর আবির্ভাবের পূর্বে যত নবী আগমন করিয়াছিলেন তাঁহাদের কেহ কেহ মুফহীমূনের উপরিউক্তস্তরসমূহের মধ্য হইতে এক-দুইটি স্তরের অধিকারী ছিলেন।

টিকাঃ
১. শাহ ওলীউল্লাহ্ মুহাদ্দিছ দেহলাবী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, ১খ., পৃ. ৮৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00