📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবীগণের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসার গুরুত্ব

📄 নবীগণের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসার গুরুত্ব


উম্মতের জন্য আম্বিয়ায়ে কিরামের প্রতি ঐকান্তিক শ্রদ্ধা-সম্মান ও ভক্তি প্রদর্শন আল-কুরআন তথা ঈমানের দাবি। উম্মতের পক্ষে নবীগণের প্রতি আত্মিক জযবা, মহব্বত ও শ্রদ্ধাশূন্য রাজনৈতিক নেতাদের সহিত কর্মীদের আচরণের ন্যায় নিছক অনুসরণই যথেষ্ট নয়। ইরশাদ হইয়াছে:
لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ (الفتح ٩) . "যেন তোমরা আল্লাহ এবং তাঁহার রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং রাসূলকে সাহায্য কর ও সম্মান কর" (৪৮:৯)।
فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ - (الاعراف ١٥٧) "সুতরাং যাহারা তাহার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাহাকে সম্মান করে" (৭: ১৫৭)। সুতরাং আল-কুরআন এমন সব নির্দেশ দান করে যাহাতে রহিয়াছে আম্বিয়ায়ে কিরামের ইজ্জত ও সম্মানের সংরক্ষণ। আম্বিয়ায়ে কিরামের সম্মানে অবহেলা প্রদর্শন, তাঁহাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে এমন সব আচরণ চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ। ইরশাদ হইয়াছে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لاَ تَشْعُرُونَ إِنَّ الَّذِينَ يَغُضُّونَ أَصْوَاتَهُمْ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ أُولَئِكَ الَّذِينَ امْتَحَنَ اللهُ قَلُوبُهُمْ لِلتَّقْوَى لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ (الحجرات ٢-٣). "হে মু'মিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উচু করিও না এবং নিজেদের মধ্যে যেইভাবে উচ্চস্বরে কথা বল তাহার সহিত সেইরূপ উচ্চস্বরে কথা বলিও না। কারণ ইহাতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হইয়া যাইবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে। যাহারা আল্লাহ্র রাসূলের সম্মুখে নিজেদের কণ্ঠস্বর নীচু করে আল্লাহ তাহাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরীক্ষা করিয়া লইয়াছেন। তাহাদের জন্য রহিয়াছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার" (৪৯: ২-৩)।
ইহারই প্রেক্ষাপটে রাসূলুল্লাহ (স)-কে কোনভাবে কষ্ট দেওয়া কিংবা তাঁহার ওফাতের পর তাঁহার শ্রদ্ধেয়া পত্নীগণকে বিবাহ করা উম্মতের জন্য হারাম করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا كَانَ لَكُمْ أَنْ تُؤْذُوا رَسُولَ اللَّهِ وَلَا أَنْ تَنْكِحُوا أَزْوَاجَهُ مِنْ بَعْدِهِ أَبَدًا إِنَّ ذُلِكُمْ عِنْدَ الله عَظِيمًا - (الاحزاب ٥٣). "তোমাদের কাহারও পক্ষে আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া বা তাহার মৃত্যুর পর তাহার পত্নীগণকে বিবাহ করা কখনও সংগত নয়। আল্লাহ্ দৃষ্টিতে ইহা ঘোরতর অপরাধ" (৩৩:৫৩)।
قُلْ إِنْ كَانَ أَبَاءكُمْ وَأَبْنَاءَكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيْرَتُكُمْ وَأَمْوَالُ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ (التوبة ٢٤) .
"বল, তোমাদের নিকট যদি আল্লাহ, তাঁহার রাসূল এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা অপেক্ষা অধিক প্রিয় হয় তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভ্রাতা, তোমাদের পত্নী, তোমাদের স্বগোষ্ঠী, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যাহার মন্দা পড়ার আশংকা কর এবং তোমাদের বাসস্থান যাহা তোমরা ভালবাস, তবে অপেক্ষা কর আল্লাহ্ বিধান আসা পর্যন্ত। আল্লাহ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না" (৯: ২৪)।
ইহা ছাড়া সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ.
"ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কেহ পূর্ণ ঈমানদার হইবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তাহার নিকট তাহার পিতা, সন্তান এবং সমস্ত মানুষের তুলনায় অধিক প্রিয় হইব"।
ثَلاثَ مَنْ كُنْ فِيْهِ وَجَدٌ حَلَاوَةَ الْإِيْمَانِ مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا .
"তিনটি জিনিস যাহার মধ্যে পাওয়া যাইবে, সে ইহার দ্বারা ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করিবে। একটি হইল তাহার নিকট আল্লাহ ও আল্লাহ্র রাসূল অন্য সকল হইতে বেশী ভালবাসার পাত্র হওয়া"।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াত ও মু'জিযা

📄 নবুওয়াত ও মু'জিযা


নবী-রাসূলগণের পক্ষ হইতে যে সকল অস্বাভাবিক ঘটনা প্রকাশ পায় সেইগুলিকে সাধারণত মু'জিযা বলা হয়। তবে ইহা তাঁহাদের নিজেদের ক্ষমতাবলে প্রকাশ পায় না, বরং আল্লাহ্ পক্ষ হইতে প্রদত্ত হইয়া থাকে। ইরশাদ হইয়াছে: وَلَقَدْ جَاءَتْهُمْ رُسُلُنَا بِالْبَيِّنَات (المائدة - ٣٢). "তাহাদের নিকট তো আমার রাসূলগণ স্পষ্ট প্রমাণাদি আনিয়াছিল" (৫ঃ৩২)।
মু'জিযার সংজ্ঞাদানে সায়্যিদ মাহদী আস-সদর বলেন: وَالْمُرَادُ بِالْمُعْجِزَاتِ هِيَ الْأَفْعَالُ الْخَارِقَةُ الَّتِي يُعْجِزُ الْبَشَرُ عَنْهَا عَادَةَ الْمَقْرُونَةُ بِدَعْوَى النُّبُوَّةِ فَإِنْ لَمْ نَقْتَرِنْ بِذلِكَ سُمِّيَتْ كَرَامَةً وَإِرْهَاضًا وَهُوَ مَا يُشْعِرُ بِحُدُوثِ أَمْرٍ غَرِيبٍ خَطِيرٍ.
"মু'জিযা বলিতে সেই সকল কর্মকাণ্ড বুঝায় যাহা প্রদর্শন করিতে সাধারণত মানুষ অক্ষম। এই সকল কর্মকাণ্ডের সহিত নবুওয়াতের দাবি সংশ্লিষ্ট থাকে। নবুওয়াতের দাবি সম্পৃক্ত না থাকিলে ইহাকে কারামত অথবা ইরহাস বলে। ইহা অত্যাশ্চর্য কোন কাজ প্রকাশ হইবার সংবাদবহ হইয়া থাকে"।
মতিউর রহমান নূরী বলেন, নবী-রাসূলগণ দ্বারা যেই সকল অস্বভাবিক অবস্থা, ঘটনা ও ভারধারার সৃষ্টি হয় সাধারণত উহাকে মু'জিযা বলা হইয়া থাকে। কিন্তু কয়েকটি কারণে এই পরিভাষা সঠিক বলিয়া মনে হয় না। প্রথমত এই কারণে যে, পবিত্র কুরআন ও হাদীছের কোথাও এই শব্দটির প্রয়োগ নাই। ইহার পরিবর্তে আয়াত এবং বুরহান শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে। প্রাচীন কালের হাদীছ বিশারদগণ উহার পরিবর্তে দলীল বা আলামত শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন। দ্বিতীয়ত, সাধারণ ব্যবহারের কারণে মু'জিযা শব্দটির সহিত কতিপয় বিশেষ মানসিক ভাবধারা সম্পৃক্ত হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে তাহা ত্রুটিমুক্ত নহে। যেমন এই শব্দটি শুনিবামাত্রই সাধারণ মানুষের অন্তরে এই ধারণা সৃষ্টি হয় যে, ইহা স্বয়ং নবীর নিজস্ব ক্ষমতায় অনুষ্ঠিত ঘটনা। তাঁহারই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা সম্পাদিত হইয়াছে, উপরন্তু এই শব্দের কারণে উহার মু'জিযা হওয়া যেন উহার নিগূঢ় তত্ত্বের মধ্যেই একান্তভাবে বিলীন হইয়া গিয়াছে। দুইটি ধারণাই মৌলিকভাবে ভ্রান্ত। জ্ঞানবুদ্ধি ও বিবেকের দিক দিয়া মু'জিযা সম্পর্কে যেই সকল প্রশ্ন বা আপত্তি উত্থাপিত হইয়া থাকে, তাহার অধিকাংশ এই মু'জিযা শব্দের ভুল ব্যবহারের কারণে। অতঃপর উপরিউক্ত লেখক বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা কোন নবী ও রাসূলের নবুওয়াত দাবীর সত্যতা প্রমাণের জন্য দুনিয়ায় যেই সব ঘটনা ঘটাইয়া থাকেন কালাম শাস্ত্রবিদদের মতে তাহাই হইল মু'জিযা। ইহার জন্য কয়েকটি শর্ত রহিয়াছে। অন্যতম এই, ঘটনাটি স্বাভাবিক নিয়ম ভঙ্গকারী হইতে হইবে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবীগণের চক্ষু ঘুমায়; অন্তর জাগ্রত থাকে

📄 নবীগণের চক্ষু ঘুমায়; অন্তর জাগ্রত থাকে


যেই অন্তরগুলিকে আল্লাহ্ তা'আলা ওহী অবতরণের উপযোগী করিয়া সৃষ্টি করেন তাঁহাদের সম্পর্ক আল্লাহ্র সহিত এমন ভাবে হইয়া থাকে যাহা সাধারণত অন্য কাহারও সহিত হয় না। এই জন্য তাঁহারা নিদ্রায় গেলেও তাহাদের কলব বা অন্তর জাগ্রত থাকে। এই কারণে তাহাঁদের স্বপ্নকেও ওহী হিসাবে গণ্য করা হয়। ইবরাহীম (আ) স্বীয় পুত্র ইসমা'ঈল (আ)-কে কুরবানী করিবার যেই আদেশ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন তাহা স্বপ্নেই লাভ করিয়াছিলেন। স্বপ্নের হাকীকত ইবরাহীম (আ) অবগত ছিলেন। ইহার সহিত ইসমা'ঈল (আ) ও এই সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন না। যেই কারণে তিনি অকপটে বলিয়াছিলেন: يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ "হে পিতা! আপনি যেই ব্যাপারে আদিষ্ট হইয়াছেন তাহা পালন করুন"। উক্ত আয়াতে স্বপ্নকে আল্লাহ্র আদেশ হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। এই সম্পর্কে বুখারীর হাদীছটি খুবই তাৎপর্যবহ। শারীক ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রা) বলেন:
سَمِعْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ يُحَدَّثُنَا عَنْ لَيْلَةٍ أُسْرِى بِالنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ مَسْجِدِ الْكَعْبَةِ جَاءَهُ ثَلَاثَةُ نَفَرٍ قَبْلَ أَنْ يُوحَى إِلَيْهِ وَهُوَ نَائِمٌ فِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ فَقَالَ أَوَّلُهُمْ أَيُّهُمْ هُوَ فَقَالَ أَوْسَطُهُمْ هُوَ خَيْرُهُمْ وَقَالَ آخِرُهُمْ خُذُوا خَيْرَهُمْ فَكَانَتْ تِلْكَ فَلَمْ يَرَهُمْ حَتَّى جَاءُوا لَيْلَةً أُخْرَى فِيْمَا يَرَى قَلْبُهُ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَائِمَةٌ عَيْنَاهُ وَلَا يَنَامُ قَلْبُهُ وَكَذَالِكَ الأَنْبِيَاءُ تَنَامُ عَيْنَاهُمْ وَلَا تَنَامُ قُلُوبُهُمْ فَتَوَلَاهُ جِبْرِيلُ ثُمَّ عُرِجَ بِهِ إِلَى السماء.
"আমি আনাস ইবন মালিক (রা)-কে বর্ণনা করিতে শুনিয়াছি, রাসূলল্লাহ (স)-এর নিকট ওহী আসিবার পূর্বে যেই রাত্রিতে তাঁহাকে সফর করানো হইয়াছিল সেই রাত্রে তাঁহার নিকট তিনজন ফেরেশতার একটি দল আগমন করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তখন মাসজিদুল হারামে ঘুমন্ত ছিলেন। এই তিনজন ফেরেশতার প্রথম জন জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি কোনজন? দ্বিতীয় ফেরেশতা জবাব দিলেন, তিনি এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে সর্বপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি। শেষের ফেরেশতা বলিলেন, সর্বাপেক্ষা উত্তম এই ব্যক্তিকে লইয়া আস। এই রাত্রিতে এই পর্যন্ত কথাবার্তার পর তাহাদেরকে আর দেখা গেল না। অপর এক রাত্রে তাহারা আবার রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁহার নিকট আসিলেন। তাঁহার চক্ষুদ্বয় ঘুমাইত কিন্তু অন্তর জাগ্রত থাকিত। অনুরূপ সকল নবীর চক্ষুদ্বয় ঘুমায় কিন্তু তাঁহাদের অন্তরসমূহ ঘুমায় না। অতঃপর জিবরাঈল (আ) তাঁহাকে নিজ দায়িত্বে লাইয়া ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করিলেন"।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াতের পদ কি একমাত্র পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট?

📄 নবুওয়াতের পদ কি একমাত্র পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট?


অতীত কালের কোন কোন স্ত্রীলোক বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অসামান্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন এবং ইলম ও মা'রিফাতেও পূর্ণতা লাভে সক্ষম হইয়াছিলেন। ইহাতে কাহারও কোন দ্বিমত নাই। কিন্তু স্ত্রীলোকদের কেহ নবী হইয়াছিলেন কিনা এই সম্পর্কে বিস্তর মতপার্থক্য রহিয়াছে। কেহ কেহ বলিয়াছেন, নবুওয়াতের পদটি সর্বদা একমাত্র পুরুষদের জন্যই নির্দিষ্ট, কোন স্ত্রীলোককে এই পদে মনোনীত করা হয় নাই। আবার কেহ কেহ বলিয়াছেন, কোন কোন স্ত্রীলোককে নবুওয়াতের পদে মনোনীত করা হইয়াছিল। যাহারা এই দ্বিতীয় অভিমত পোষণ করেন তাহারা আবার এই ব্যাপারে দ্বিধাবিভক্ত যে, কোন্ কোন্ স্ত্রীলোককে এই পদে মনোনীত করা হইয়াছিল।
এই ব্যাপারে মাওলানা হিফজুর রহমান সিউহারবী বলেন, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, শায়খ আবুল হাসান আশআরী, কুরতবী ও ইবন হাযম প্রমুখ এই অভিমতের প্রতি নমনীয় যে, স্ত্রীলোক নবী হইতে পারেন। এমনকি ইব্‌ন হায আন্দালুসী এইরূপ দাবি করিয়াছেন যে, হযরত হাওয়া, সারাহ, হাজার, মূসা (আ)-এর মাতা আসিয়া ও মারয়াম (আ) নবী ছিলেন। মুহাম্মাদ ইব্‌ন ইসহাক বলেন, অধিকাংশ ফকীহ এই অভিমত পোষণ করেন যে, স্ত্রীলোক নবী হইতে পারেন। কুরতুবী অবশ্য ইন্ন হাযমের সহিত সংখ্যার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করিয়াছেন। তিনি হযরত সারাহ ও হাজিরা (আ)-কে নবুওয়াতের তালিকা হইতে বাদ দিয়াছেন। পক্ষান্তরে হাসান বসরী, ইমামুল হারামায়ন শায়খ আবদুল আযীয, কাদী ইয়াদ ও ইব্‌ন কাছীর প্রমুখ স্ত্রীলোকদের নবুওয়াত পদে মনোনীত না হইবার অভিমতকে অগ্রধিকার দিয়াছেন। কাদী ইয়াদ ও ইব্‌ন কাছীর আরও বলিয়াছেন যে, উম্মতের বেশির ভাগ 'উলামায়ে কিরাম এই অভিমতকে সমর্থন করিয়াছেন।
নারী জাতির মধ্যে কেহ নবী হিসাবে মনোনীত হইতে পারেন কিনা এই প্রশ্নটি অনেকটা উত্থাপিত হইয়াছে হযরত মারয়াম (আ)-কে কেন্দ্র করিয়া। আল-কুরআনে তাঁহার সম্পর্কে যেই সকল প্রশংসামূলক বাণী রহিয়াছে তাহা সাধারণত নবীগণের বেলায়ই প্রযোজ্য হইয়া থাকে। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَاذْ قَالَتِ الْمَلائِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللهَ اصْطَفْكِ وَطَهَّرَكَ وَاصْطَفُكَ عَلَى نِسَاءِ الْعَلَمِينَ.
"যখন ফেরেশতাগণ বলিয়াছিল, হে মারয়াম! আল্লাহ তোমাকে মনোনীত ও পবিত্র করিয়াছেন এবং বিশ্বের নারীগণের মধ্যে তোমাকে মনোনীত করিয়াছেন" (৩ঃ ৪২)।
মহান আল্লাহ মারয়াম (আ) ও তৎপরবর্তী নবীগণের উল্লেখের পর তাঁহাদের সম্পর্কে ইরশাদ করেন:
أُولَئِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِّنَ النَّبِيِّينَ مِنْ ذُرِّيَّةِ أَدَمَ ...... "ইহারাই তাহারা নবীদের মধ্যে যাহাদিগকে আল্লাহ অনুগ্রহ করিয়াছেন আদমের বংশ হইতে ......." (১৯:৫৮)।
আল-কুরআনের আরও বহু আয়াতে মারয়াম (আ)-এর অপূর্ব গুণাবলী ও অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার কথা বর্ণিত হইয়াছে যাহা তাঁহার প্রমাণ বহন করে। ইহা ছাড়াও হযরত সারাহ, মূসা (আ)-এর মাতা ও মারয়াম (আ) সম্পর্কে আল-কুরআনের বিবরণ হইতে স্পষ্টত প্রতিভাত হয় যে, আল্লাহ্ ফেরেশতা তাঁহাদের নিকট ওহী লইয়া আগমন করিতেন। ফেরেশতা তাঁহাদেরকে সুসংবাদ শুনাইতেন, আল্লাহ্র পরিচয় ও তাঁহার ইবাদতের কথা তাঁহাদেরকে অবহিত করিতেন। সূরা হৃদ ও সূরা আয-যারিয়াতে হযরত সারাহ-কে, মূসা (আ)-এর মাতাকে সূরা কাসাসে এবং সূরা আল ইমরান ও সূরা মারায়ামে মারয়াম (আ)-কে ফেরেশতাদের মাধ্যমে এবং কোন মাধ্যম ব্যতীত সরাসরি আল্লাহ তাআলা সম্বোধন করিয়াছেন। নবুওয়াতের ধারা যদিও আদিকাল হইতে একমাত্র পুরুষদের মধ্যেই চলিয়া আসিতেছিল, কিন্তু উপরিউক্ত মহীয়সী স্ত্রীলোকগণের উল্লিখিত অবস্থানের কারণে নবুওয়াত লাভ কেবল পুরুষদের জন্যই সুনির্দিষ্ট, এই দাবির ভিত্তি দুর্বল হইয়া যায়। এই হাদীছটি এতই প্রসিদ্ধ যে, সহীহ বলিয়া স্বীকৃত হাদীছ গ্রন্থেই ইহার বর্ণনা রহিয়াছে। এই হাদীছের কথা বাদই দিলাম। তেমনি পূর্বে উল্লিখিত আল-কুরআনের আয়াত: إِنَّ اللَّهَ اصْطَفك وطَهَّرَك واصطفك .عَلَى نِسَاءِ الْعَلَمِينَ -এর কথাও বাদ দিলে তবুও নিম্নোক্ত আয়াতটি সম্পর্কে কথা থাকিয়া যায়। আছিয়া ও মারয়াম (আ) সম্পর্কে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিম্নরূপ উক্তি রহিয়াছে বলিয়া বুখারীতে বর্ণিত হইয়াছে:
عَنْ أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِى رضى اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَمُلَ مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرٌ وَلَمْ يَكْمُلْ مِنَ النِّسَاءِ إِلا أَسِيَةُ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ وَمَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ وَإِنَّ فَضْلَ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الشَّرِيدِ عَلَى الطَّعَامِ.
“আবূ মূসা আল-আশআরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: পুরুষদের মধ্যে বহু লোক পরিপূর্ণতা লাভ করিয়াছেন, কিন্তু স্ত্রীলোকদের মধ্যে ফিরআওন-স্ত্রী আছিয়া ও ইমরান-তনয়া মারয়াম ব্যতীত আর কেহই পরিপূর্ণতা লাভ করিতে পারে নাই। স্ত্রী জাতির মধ্যে আইশার মর্যাদা হইল সকল খাদ্যের মধ্যে ছারীদের শ্রেষ্ঠত্বের মত” (বুখারী অধ্যায় ৬০, পরিচ্ছেদ ৩২)।
যেই সকল আলিম মনে করেন, স্ত্রীজাতি নবী হইতে পারেন না তাহারা তাহাদের দাবির অনুকূলে নিম্নোক্ত আয়াত পেশ করেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلا رِجَالاً نُوحِي إِلَيْهِمْ فَاسْتَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ.
"তোমার পূর্বে আমি ওহীসহ পুরুষ মানুষই প্রেরণ করিয়াছিলাম। তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানিগণকে জিজ্ঞাসা কর" (নাহল: ৪৩)।
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُوحِي إِلَيْهِمْ مِّنْ أَهْلِ الْقُرَى.
"তোমার পূর্বেও জনপদবাসীদের মধ্য হইতে পুরুষগণকেই প্রেরণ করিয়াছিলাম, যাহাদের নিকট ওহী পাঠাইতাম" (১২: ১০৯)।
বিশেষভাবে হযরত মারয়াম (আ)-এর নবুওয়াতের প্রতিকূলে তাহারা এই দলীল পেশ করিয়া থাকেন যে, আল-কুরআনে তাঁহাকে সিদ্দীকা বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে:
مَا الْمَسِيحُ بْنُ مَرْيَمَ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ وَأُمُّهُ صِدِّيقَةٌ.
"মারয়াম-তনয় মাসীহ তো কেবল একজন রাসূল। তাহার পূর্বে বহু রাসূল গত হইয়াছে এবং তাহার মাতা সত্যনিষ্ঠ ছিল" (৫ঃ ৭৫)।
এই সম্পর্কে হিফজুর রহমান সিউহারবী বলেন, সূরা নিসায় পুরস্কৃত ব্যক্তিদের যেই তালিকা আল-কুরআন প্রদান করিয়াছে ইহাতে অকাট্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত হইয়াছে যে, নবুওয়াতের স্তর হইতে সিদ্দীকিয়াতের স্তর বহু গুণ নিম্নে। ইব্‌ন হাজার আল-আসকালানী বলেন, ইমাম নাওয়াবী তাঁহার 'আল-আযকার' গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন, ইমামুল হারামায়ন শায়খ আবদুল আযীয এই ব্যাপার উম্মতের ইজমা' (সর্বসম্মত অভিমত) প্রমাণ করিতে সক্ষম হইয়াছেন যে, মারয়াম (আ) নবী ছিলেন না। হাসান বসরী বলেন:
لَيْسَ فِي النِّسَاءِ نَبِيَّةٌ وَلَا فِي الْجِنِّ.
"নারী জাতির মধ্যে কোন নবী নাই, অনুরূপ জিন্নদের মধ্যেও কোন নবী নাই”।
স্ত্রীজাতির নবুওয়াতের পক্ষ ও বিপক্ষ এই দুই অভিমতের বাহিরে তৃতীয় আরও একটি অভিমত পাওয়া যায়, তাহা হইল এই ব্যাপারে নীরব থাকা। এই শ্রেণীর আলিমগণ মনে করেন, মহিলাদের নবী হওয়া বা না হওয়া এই সম্পর্কিত কোন অভিমত দান হইতে বিরত থাকা উত্তম। এই শ্রেণীর আলিমদের মধ্যে শায়খ তাকিয়্যুাদ্দীন আস-সুবকীর নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি বলিয়াছেন:
أُخْتُلِفَ فِي هَذِهِ الْمَسْئَلَةِ وَلَمْ يَصِحَ عِنْدِي فِي ذَلِكَ شَيْئً.
"এই সম্পর্কে বিতর্ক; তবে আমার মতে এই সম্পর্কিত কোন অভিমতই বিশুদ্ধ নয়"।
মহিলাদের নবুওয়াতের পক্ষে যাহারা অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন তাহাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হাদীছবেত্তা হইলেন ইব্‌ন্ন হাযম আন্দালুসী। তিনি তাঁহার সমসাময়িক স্পেনে এই সম্পর্কে তীব্র মতবিরোধের কথা উল্লেখ করিয়া বলেন, যাহারা মহিলাদের নবুওয়াত পদে মনোনীত হইবার বিরোধিতা করেন তাহাদের নিকট এই অস্বীকৃতির কোন দলীল পরিলক্ষিত হয় না। অবশ্য কেহ কেহ এই অস্বীকৃতির পিছনে এই দলীল উত্থাপন করিয়া থাকেন, وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلاَّ رِجَالاً نُوْحَى إِلَيْهِمْ অতঃপর তিনি বলেন যে, আল্লাহ্ তাআলা স্ত্রীলোককে মাখলুকের হিদায়াতের জন্য রাসূল হিসাবে প্রেরণ করিয়াছিলেন।
বিতর্ক হইল নবুওয়াত সম্পর্কে, রিসালাত সম্পর্কে নয়। অতএব আসা যাউক মধুওয়াত শব্দের বিশ্লেষণে। আরবী অভিধান অনুসারে নবুওয়াত শব্দটি اَنْبَاَ ধাতু হইতে নিস্পন্ন যাহার অর্থ হইল 'অবহিতকরণ'। সুতরাং ইহা হইতে বুঝা যায় যেই ব্যক্তিকে, আল্লাহ তাআলা কোন বিষয় সংঘটিত হইবার পূর্বে ওহীর মাধ্যমে অবহিত করেন কিংবা অন্য কোন বিষয়ে তাঁহার প্রতি ওহী নাযিল করেন, তিনিই হইলেন নিঃসন্দেহে নবী। এখানে ওহী বলিতে সেই ইলহাম অর্থ হইবে না যাহা আল্লাহ তা'আলা তাঁহার সৃষ্টির কোন কোন জীবের মধ্যে স্বভাবত প্রদান করিয়া থাকেন। যেমন মৌমাছি সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে: وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ অনুরূপ ওহী বলিতে ধারণা ও অনুমানও লওয়া যাইবে না। কারণ এই দুইটি অনুভূতিকে নিশ্চিত জ্ঞান (علم يقين) মনে করা যায় না। ওহী বলিতে এখানে শয়তানদের আকাশ হইতে চুরি করিয়া শ্রবণ করা বিষয়ও হইবে না, যাহার সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِي عَدُوا شَيْطِيْنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ يُوْحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ.
"এইরূপে আমি মানব'ও জিন্নের মধ্যে শয়তানদিগকে প্রত্যেক নবীর শত্রু করিয়াছি, প্রতারণার উদ্দেশে তাহাদের একে অন্যকে চমকপ্রদ বাক্য দ্বারা প্ররোচিত করে" (৬: ১১২)।
কারণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর আবির্ভাবের ফলে আকাশ হইতে এইরূপ কিছু শ্রবণ করিবার সুযোগ চিরতরে বন্ধ হইয়া গিয়াছে। অনুরূপ এখানে ওহী বলিতে জ্যোতিষবিদ্যাও নয় যাহা শিখা ও শিখানো দ্বারা অর্জিত হয়। ওহী বলিতে স্বপ্ন অর্থ লওয়া যাইবে না, যাহা সত্য হওয়ার কোন নিশ্চয়তা নাই বরং এখানে ওহী বলিতে সেই স্বতন্ত্র অর্থ হইবে যাহা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইচ্ছায় কোন ব্যক্তিকে এমন কিছু অবহিত করেন যাহা তিনি পূর্বে জানিতেন না। যাহারা মহিলাদের নবী হওয়াকে অস্বীকার করেন তাহারা যদি নবুওয়াতের এই অর্থ গ্রহণ না করেন, তাহা হইলে নবুওয়াতের আসল অর্থ কি তাহার ব্যাখ্যা আবশ্যক। প্রকৃত কথা হইল, তাহারা নবুওয়াতের এই অর্থ ব্যতীত অন্য কোন অর্থই প্রকাশ করিতে পারিবেন না। কুরআন মাজীদে উল্লেখ আছে, আল্লাহ তাআলা স্ত্রীলোকদের নিকট ফেরেশতা পাঠাইয়াছিলেন এবং তাহাদের মাধ্যমে ঐ স্ত্রীলোকদের নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছিলেন। ফেরেশতারা সারাহ্ (রা)-এর নিকট আসিয়া তাঁহাকে ইসহাক (আ)-এর সুসংবাদ দান প্রসঙ্গে ইরশাদ হইয়াছে: وَامْرَأَتُهُ قَائِمَةٌ فَضَحِكَتْ فَبَشِّرْنَهَا بِاسْحَقَ وَمَنْ وَرَاءِ اسْحَقَ يَعْقُوبَ قَالَتْ يُوَيْلَتَي ءَاَلِدٌ وَأَنَا عَجُوزٌ وَهُذَا بَعْلِى شَيْئًا إِنَّ هَذَا لَشَيْئً عَجِيْبُ. قَالُوا أَتَعْجَبِينَ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ رَحْمَتُ اللهِ وَبَرَكْتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْْبَيْتِ.
"আর তাহার স্ত্রী দণ্ডায়মান এবং সে হাসিয়া ফেলিল। অতঃপর আমি তাহাকে ইসহাকের ও ইসহাকের পরবর্তী ইয়া'কূবের সুসংবাদ দিলাম। সে বলিল, কি আশ্চর্য! সন্তানের জননী হইব আমি যখন আমি বৃদ্ধা এবং এই আমার স্বামী বৃদ্ধ! ইহা অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার। তাহারা বলিল, আল্লাহ্ কাজে তুমি বিস্ময় বোধ করিতেছ? হে পরিবারবর্গ! তোমাদের প্রতি রহিয়াছে আল্লাহ্ অনুগ্রহ ও কল্যাণ" (১১ : ৭১-৭২)।
এই আয়াতে ইসহাক জননী সারাহ্ (রা) নবী না হইলে ফেরেশতাদের মাধ্যমে তাঁহার সহিত কথা বলা কি করিয়া সম্ভব হইবে?
অনুরূপ দেখা যায়, আল্লাহ তাআলা জিবরাঈল (আ)-কে মারয়াম (আ)-এর নিকট পাঠাইলেন এবং তিনি মারয়াম (আ)-কে সম্বোধন করিয়া বলিলেন: إِنَّمَا أَنَا رَسُولُ رَبِّكِ لِأَهَبَ لَكِ غُلَامًا زَكِيًّا . "আমি তোমার প্রতিপালক প্রেরিত তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করিবার জন্য” (১৯: ১৯)।
এখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রহিয়াছে যে, মারয়াম (আ)-এর নিকট জিবরাঈল (আ)-এর আগমন ঘটিয়াছিল। এই প্রকৃত ওহী নবুওয়াত না হইলে নবুওয়াত বলিতে কী বুঝায়? অনুরূপ মূসা (আ)-এর মাতা সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَأَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَالْقِيْهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ.
"মূসা জননীর অন্তরে আমি ইংগিতে নির্দেশ করিলাম, শিশুটিকে স্তন্যদান করিতে থাক। যখন তুমি তাহার সম্পর্কে কোন আশংকা করিবে তখন ইহাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করিও এবং ভয় করিও না, দুঃখ করিও না। আমি অবশ্যই ইহাকে তোমার নিকট ফিরাইয়া দিব এবং ইহাকে রাসূলদের একজন করিব" (২৮ঃ ৭)।
এখানে আল্লাহ তা'আলা মূসা জননীর প্রতি ওহী প্রেরণের যেই কথা ব্যক্ত করিলেন তাহা জানিয়াও কেহ কি সংশয় করিবে যে, ইহা নবুওয়াতের বিষয় নয়? সামান্যতম বিবেকবান মানুষও এই কথা উপলব্ধি করিতে পারিবে যে, আল্লাহ প্রদত্ত নবুওয়াত ব্যতীত কেহ কেবল স্বপ্ন দর্শনের মাধ্যমে কিংবা মনের তাড়নায় এইরূপ কাজ করিতে সাহস পাইবে না। ইহা ছাড়াও মারয়াম (আ)-এর নবুওয়াত সম্পর্কে তো আরও দলীল রহিয়াছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁহার কথা নবীগণের সহিত উল্লেখ করিবার পর ইরশাদ করিয়াছেন:
أُولئِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ..
প্রতিপক্ষের একটি কথা যে মারয়াম (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছে, তিনি 'সিদ্দীকা'- তাঁহার এই উপাধি তাঁহার নবুওয়াতের পরিপন্থী নয়। যেমন সর্বজনস্বীকৃত নবী ইউসুফ (আ)-এর জন্য সিদ্দীক উপাধি তাঁহার নবুওয়াতের পরিপন্থী নয়। ইরশাদ হইয়াছে يُوْسُفُ أَيُّهَا الصديق সারাহ্, মারয়াম ও মূসা জননীর সহিত নবুওয়াত পদমর্যাদায় আছিয়াও সম্পৃক্ত হইয়া যাইবেন। কারণ হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
كَمُل مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرٌ وَلَمْ يَكْمُلْ مِنَ النِّسَاءِ إِلا مَرْيَمُ ابْنَةُ عمران واسية.
(আবূ মুহাম্মাদ আলী ইব্‌ন আহমদ ইব্‌ন হায্য, আল ফাসলু ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল, বৈরুত ১৯৭৫ খৃ. ৩খ., পৃ. ৫১৭; হিফজুর রহমান সিউহারূবী, কাসাসুল কুরআন, ৪খ., পৃ. ২৭)।
ইবন হাযম আন্দালুসীর এই দীর্ঘ বক্তব্য সম্পর্কে মন্তব্য করিতে গিয়া হিফজুর রহমান সিউহারবী বলেন, ওহীর অভিধানিক অর্থসমূহ, যেমন ভাব, মনের ধারণা, অন্তরের উদ্রেক ও ইলহাম ইত্যাদি যদি বাদ দিয়া পারিভাষিক অর্থ যাহা আল-কুরআন নবী ও রাসূলগণের জন্য কেবল নির্দিষ্ট করিয়াছে ইবন হাম্ এই প্রসিদ্ধ অর্থ গ্রহণ করিলে ইহার দুইটি রূপ হইবে। (এক) এই ওহীর সম্পর্ক হইবে হিদায়াত, শিক্ষাদান ও আদেশ-নিষেধাবলীর সহিত। (দুই) ইহার সম্পর্ক হইবে সুসংবাদদান, ভবিষ্যতে হইবে এমন কিছু অবহিতকরণ কিংবা প্রত্যাদিষ্ট ব্যক্তির বিশেষ করিয়া কোন আদেশ-নিষেধ সম্পর্কিত। প্রথম প্রকার ওহীর সম্পর্ক হইল এই নবুওয়াতের সহিত যাহার সহিত রিসালাত সম্পৃক্ত। এই প্রকারের নবুওয়াত কেবল পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট। এই ব্যাপারে কাহারও দ্বিমত নাই। দ্বিতীয় ধরনের ওহী ইব্‌ন হাযম ও তাঁহার অনুবর্তী উলামার মতে নবুওয়াতের একটি শ্রেণী। কারণ সূরা শূরায় নবীগণের উপর ওহী অবতীর্ণ হইবার যেই পন্থা বর্ণনা করা হইয়াছে ইহা এই ওহীর উপর আরোপিত হয়। ইরশাদ হইয়াছে: وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِمَهُ اللهُ إِلَّا وَحْيَا أَوْ مِنْ وَرَائِي حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوْحِيَ بِاذْنِهِ مَا يَشَاءُ إِنَّهُ عَلَى حَكِيمٌ.
"মানুষের এমন মর্যাদা নাই যে, আল্লাহ তাহার সহিত কথা বলিবেন ওহীর মাধ্যম ব্যতিরেকে অথবা পর্দার অন্তরাল ব্যতিরেকে অথবা এমন দূত প্রেরণ ব্যতিরেকে যেই দূত তাঁহার অনুমতিক্রমে তিনি যাহা চাহেন তাহা ব্যক্ত করেন; তিনি সমুন্নত প্রজ্ঞাময়" (৪২: ৫১)।
আল-কুরআন যখন ওহীর এই দ্বিতীয় প্রকারের প্রয়োগ সুস্পষ্ট 'নস' (نص) দ্বারা মারয়াম, সারাহ্, উম্মু মূসা (আ)-এর উপর করিয়াছে, সুতরাং এই বিদূষী মহিলাগণের বেলায় নবী শব্দের প্রয়োগ অকাট্যভাবে সহীহ। মাওলানা হিফজুর রহমান আরও বলেন, এই বিশ্লেষণ হইতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, স্ত্রীলোকদের নবুওয়াত লাভের অস্বীকৃতির ব্যাপারে ইমামুল হারামায়ন ইজমার যেই দাবি করিয়াছেন তাহা সহীহ নয়। তিনি বলেন, ইব্‌ন কাছীর যে এই দাবি করিয়াছেন যে, জমহুর মহিলাদের নবুওয়াত লাভের বিপক্ষে- এই কথার সহিত আমার দ্বিমত রহিয়াছে। অবশ্য বেশিরভাগ সম্ভবত পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দান করা হইতে বিরত থাকাকে পসন্দ করিয়াছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00