📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াত মানবতার কল্যাণ ও সভ্যতার অগ্রগতির মূল উপাদান

📄 নবুওয়াত মানবতার কল্যাণ ও সভ্যতার অগ্রগতির মূল উপাদান


আম্বিয়ায়ে কিরাম শুধু আল্লাহ তা'আলার বিশুদ্ধ মা'রিফাত এবং নিশ্চিত ইলমের প্রাণকেন্দ্র নন, বরং ইহার সহিত তাঁহারা মানব সমাজকে দান করেন আরও এক অমূল্য সম্পদ। তাহা হইল মানবতার কল্যাণ ও সভ্যতার অগ্রগতি সাধন। ইহার ফলে মানুষের মধ্যে মঙ্গলের প্রতি অনুরাগ, অমঙ্গলের প্রতি বিরাগের অনুভূতি সৃষ্টি হয়। শিরকের শক্তি ও ঘাটিগুলি ধূলিস্মাৎ করিয়া মঙ্গলের পথ উন্মুক্ত করিবার অনুপ্রেরণা লাভ করে। কল্যাণমণ্ডিত বিষয়াবলীর মূল উৎস আবহমান কাল হইতে নবীগণের শিক্ষায় নিহিত রহিয়াছে। তাঁহারা নবী হিসাবে আবির্ভূত হইয়াই নিজেদের উম্মত তথা সমাজকে ভাল কাজের প্রতি অনুপ্রেরণা দিতেন এবং মন্দ কাজ হইতে বিরত থাকিবার মানসিকতা সৃষ্টির প্রয়াস চালাইতেন। ন্যায়ের পথে সহায়তা করা ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করার আদর্শকে সমাজের মানুষের মন-মস্তিস্কে প্রবিষ্ট করিয়া দিবার জন্য তাঁহারা প্রাণপণ চেষ্টা চালাইয়া গিয়াছেন। সেই অব্যাহত প্রচেষ্টার বদৌলতে মানবতা বিবর্জিত হিংস্র সমাজের মধ্য হইতে জন্মগ্রহণ করিল এমন এক জাতি যাহাদের সৎকর্মের সুঘ্রাণে সমস্ত জগৎ বিমোহিত হইয়া উঠিল। সম্মান ও মর্যাদায় তাঁহারা ফেরেশতাগণ হইতে অগ্রগামী হইয়া গেলেন। এই অনুপম আদর্শের প্রচারকদের বরকতে ধ্বংসপ্রাপ্ত মানবতার ভাগ্যে ফিরিয়া আসিল এক নূতন জীবন। মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকাশে সেই মহান সম্প্রদায় যেই আদর্শ স্থাপন করিয়াছে পৃথিবীতে ইহার কোন তুলনা নাই। আম্বিয়ায়ে কিরামের আবির্ভাব যদি না হইত তাহা হইলে মানবতার তরী তাহার জ্ঞানবিজ্ঞান, দর্শন ও কৃষ্টি-কালচার লইয়া সাগরের অতলে তলাইয়া যাইত। তখন মানব নামধারী জাতি পানাহার ব্যতীত অন্য কিছুই চিনিত না। বর্তমান বিশ্বে যাহা কিছু মহৎ মানবিক নেতৃত্ব, পবিত্রতার তীক্ষ্ণ অনুভূতি, উত্তম মানের চরিত্র প্রশিক্ষণ, বিশুদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে যত সোচ্চার ধ্বনি শ্রুত হইতেছে সেই সবের ঐতিহাসিক সূত্র জড়িত রহিয়াছে নবীকুলের শিক্ষা এবং তাঁহাদের দাওয়াত ও তাবলীগের সহিত। তাঁহাদেরই প্রচারিত শিক্ষার জ্যোতিতে আজ দুনিয়াবাসী সম্মুখের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রয়াস পাইতেছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবীগণের দাওয়াতে আখিরাতের আকীদার গুরুত্ব

📄 নবীগণের দাওয়াতে আখিরাতের আকীদার গুরুত্ব


নবীগণের জীবন-চরিত ও তাঁহাদের বাণীসমূহ পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, তাঁহাদের দৃষ্টির সামনে আখিরাত যেন অহরহ বিরাজমান ছিল। আখিরাতের সুখ-দুঃখ, কৃতকার্যতা ও অকৃতকার্যতার প্রকৃত ছবি তাঁহাদের সামনে উদ্ভাসিত ছিল। জান্নাতের অশেষ প্রত্যাশা, জাহান্নামের কঠিন ভীতির জগতে তাঁহারা সর্বক্ষণ কালাতিপাত করিতেন। ইবরাহীম (আ)-এর একটি উক্তিতে ইহার একটি প্রতিচ্ছবি প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে। ইরশাদ হইয়াছে:
وَالَّذِي أَطْمَعُ أَنْ يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ. رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَالْحِقْنِي بالصَّالِحِينَ، وَاجْعَلْ لِى لِسَانَ صِدْقٍ فِي الْآخِرِينَ وَاجْعَلْنِي مِنْ وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ. وَاغْفِرْ لِأَبِي إِنَّهُ كَانَ مِنَ الضَّالِّينَ. وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ. يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبِ سَلِيمٍ وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ. وَبُرِّزَتِ الْجَحِيمُ لِلْغَاوِينَ (الشعراء - ٩١-٨٢).
"এবং আশা করি, তিনি কিয়ামত দিবসে আমার অপরাধ মার্জনা করিয়া দিবেন। হে আমার প্রতিপালক! আমাকে জ্ঞান দান কর এবং সৎকর্মপরায়ণদের শামিল কর। আমাকে পরবর্তীদের মধ্যে যশস্বী কর এবং আমাকে সুখময় জান্নাতের অধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর। আর আমার পিতাকে ক্ষমা কর। তিনি তো পথভ্রষ্টদের শামিল ছিলেন এবং আমাকে লাঞ্ছিত করিও না পুনরুত্থান দিবসে, যেদিন ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন উপকারে আসিবে না। সেদিন উপকৃত হইবে কেবল সে, যে আল্লাহ্র নিকট আসিবে বিশুদ্ধ অন্তকরণ লইয়া। মুত্তাকীদের নিকটবর্তী করা হইবে জান্নাত এবং পথভ্রষ্টদের জন্য উন্মোচিত করা হইবে জাহান্নাম" (২৬ : ৮২-৯১)।
আল্লাহ্ নবী ইউসুফ (আ)-ও আখিরাতকে অনুরূপ দৃষ্টিকোণ হইতে দেখিয়াছিলেন। অথচ তিনি তখন ছিলেন প্রভাব-প্রতিপত্তি ও শৌর্য-বীর্যের উচ্চ শিখরে। তাঁহারই করতলে ছিল তদানীন্তন বিশ্বের সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা মিসর রাষ্ট্র। প্রচলিত ছিল সেখানে তাঁহারই মুদ্রা। বৃদ্ধ পিতা এবং আপন বংশধরদের সহিত পুনর্মিলনের মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক তাঁহার নয়ন যুগলকে শীতল এবং অন্তরকে প্রশান্ত করিয়া দিয়াছিলেন। এদিকে তাঁহার অতুলনীয় মর্যাদা ও মহত্ত্ব অবলোকন করিয়া তাঁহার ঘনিষ্ঠতমদের হৃদয় প্রফুল্ল ও আনন্দে স্পন্দিত হইয়া উঠিয়াছিল। কিন্তু ইউসুফ (আ)-এর মন-মস্তিষ্ক ছিল আখিরাতের চিন্তায় বিভোর। তাই তিনি বলিয়াছিলেন:
رَبِّ قَدْ أَتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنْتَ وَلِي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَالْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ (يوسف - ١٠١).
"হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে রাজ্য দান করিয়াছ এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়াছ। হে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা! তুমিই ইহলোক ও পরলোকে আমার অভিভাবক। তুমি আমাকে মুসলিম হিসাবে মৃত্যু দাও এবং আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত কর” (১২: ১০১)।
আখিরাতের উপর ঈমান এবং তথাকার প্রত্যাশিত অনন্ত সৌভাগ্য ও অব্যাহত দুর্গতি এবং সেখানকার পুরস্কার এবং শাস্তির বিষয়টি মানসপটে উপস্থিতিই আম্বিয়ায়ে কিরাম-এর দাওয়াত এবং তাঁহাদের উপদেশ ও নসীহতের আসল চালিকাশক্তি ছিল। তাঁহারা দিবা-নিশি শুধু আখিরাতের চিন্তায় অস্থির থাকিতেন। কলুষতাসর্বস্ব সমাজ, পারিপার্শ্বিক অন্যায়-অনাচারের বিভীষিকার চিন্তার চেয়ে আখিরাতের চিন্তাকেই তাঁহারা দাওয়াত ও তাবলীগের মূল উৎস হিসাবে চিহ্নিত করেন। নূহ (আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَى قَوْمِهِ إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مُّبِينٌ، أَنْ لَا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ (هود - ٢٥-٢٦ ) .
"আমি তো নূহকে তাহার সম্প্রদায়ের নিকট পাঠাইয়াছিলাম। সে বলিয়াছিল, তোমাদের জন্য আমি সুস্পষ্ট সতর্ককারী, যেন তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অপর কিছুর ইবাদত না কর। আমি তো তোমাদের জন্য এক মর্মন্তুদ দিনের শাস্তি আশংকা করি" (১১: ২৫-২৬)।
আল্লাহ্ নবী হুদ (আ)-এর উক্তি আল-কুরআনে এইভাবে ইরশাদ হইয়াছেঃ
وَاتَّقُوا الَّذِي آمَدَّكُمْ بِمَا تَعْلَمُوْنَ آمَدَّكُمْ بِأَنْعَامِ وَبَنِينَ وَجَنَّتٍ وَعُيُونٍ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ (شعراء - ١٣٢-١٣٥).
"তোমরা ভয় কর তাহাকে, যিনি তোমাদিগকে দিয়াছেন সেই সমুদয় যাহা তোমরা জান। তিনি দিয়াছেন তোমাদিগকে জন্তু ও সন্তান-সন্ততি, উদ্যান ও প্রস্রবণ। আমি তোমাদের জন্য আশংকা করি মহাদিনের শাস্তি” (২৬ঃ ১৩২-১৩৫)।
এইরূপ অন্যান্য নবীগণও স্ব-স্ব উম্মতকে আখিরাতের ভীতি প্রদর্শন করিয়াছিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবীগণের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসার গুরুত্ব

📄 নবীগণের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসার গুরুত্ব


উম্মতের জন্য আম্বিয়ায়ে কিরামের প্রতি ঐকান্তিক শ্রদ্ধা-সম্মান ও ভক্তি প্রদর্শন আল-কুরআন তথা ঈমানের দাবি। উম্মতের পক্ষে নবীগণের প্রতি আত্মিক জযবা, মহব্বত ও শ্রদ্ধাশূন্য রাজনৈতিক নেতাদের সহিত কর্মীদের আচরণের ন্যায় নিছক অনুসরণই যথেষ্ট নয়। ইরশাদ হইয়াছে:
لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ (الفتح ٩) . "যেন তোমরা আল্লাহ এবং তাঁহার রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং রাসূলকে সাহায্য কর ও সম্মান কর" (৪৮:৯)।
فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ - (الاعراف ١٥٧) "সুতরাং যাহারা তাহার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাহাকে সম্মান করে" (৭: ১৫৭)। সুতরাং আল-কুরআন এমন সব নির্দেশ দান করে যাহাতে রহিয়াছে আম্বিয়ায়ে কিরামের ইজ্জত ও সম্মানের সংরক্ষণ। আম্বিয়ায়ে কিরামের সম্মানে অবহেলা প্রদর্শন, তাঁহাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে এমন সব আচরণ চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ। ইরশাদ হইয়াছে:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لاَ تَشْعُرُونَ إِنَّ الَّذِينَ يَغُضُّونَ أَصْوَاتَهُمْ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ أُولَئِكَ الَّذِينَ امْتَحَنَ اللهُ قَلُوبُهُمْ لِلتَّقْوَى لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ (الحجرات ٢-٣). "হে মু'মিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উচু করিও না এবং নিজেদের মধ্যে যেইভাবে উচ্চস্বরে কথা বল তাহার সহিত সেইরূপ উচ্চস্বরে কথা বলিও না। কারণ ইহাতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হইয়া যাইবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে। যাহারা আল্লাহ্র রাসূলের সম্মুখে নিজেদের কণ্ঠস্বর নীচু করে আল্লাহ তাহাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরীক্ষা করিয়া লইয়াছেন। তাহাদের জন্য রহিয়াছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার" (৪৯: ২-৩)।
ইহারই প্রেক্ষাপটে রাসূলুল্লাহ (স)-কে কোনভাবে কষ্ট দেওয়া কিংবা তাঁহার ওফাতের পর তাঁহার শ্রদ্ধেয়া পত্নীগণকে বিবাহ করা উম্মতের জন্য হারাম করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا كَانَ لَكُمْ أَنْ تُؤْذُوا رَسُولَ اللَّهِ وَلَا أَنْ تَنْكِحُوا أَزْوَاجَهُ مِنْ بَعْدِهِ أَبَدًا إِنَّ ذُلِكُمْ عِنْدَ الله عَظِيمًا - (الاحزاب ٥٣). "তোমাদের কাহারও পক্ষে আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া বা তাহার মৃত্যুর পর তাহার পত্নীগণকে বিবাহ করা কখনও সংগত নয়। আল্লাহ্ দৃষ্টিতে ইহা ঘোরতর অপরাধ" (৩৩:৫৩)।
قُلْ إِنْ كَانَ أَبَاءكُمْ وَأَبْنَاءَكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيْرَتُكُمْ وَأَمْوَالُ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ (التوبة ٢٤) .
"বল, তোমাদের নিকট যদি আল্লাহ, তাঁহার রাসূল এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা অপেক্ষা অধিক প্রিয় হয় তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভ্রাতা, তোমাদের পত্নী, তোমাদের স্বগোষ্ঠী, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যাহার মন্দা পড়ার আশংকা কর এবং তোমাদের বাসস্থান যাহা তোমরা ভালবাস, তবে অপেক্ষা কর আল্লাহ্ বিধান আসা পর্যন্ত। আল্লাহ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না" (৯: ২৪)।
ইহা ছাড়া সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ.
"ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কেহ পূর্ণ ঈমানদার হইবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তাহার নিকট তাহার পিতা, সন্তান এবং সমস্ত মানুষের তুলনায় অধিক প্রিয় হইব"।
ثَلاثَ مَنْ كُنْ فِيْهِ وَجَدٌ حَلَاوَةَ الْإِيْمَانِ مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا .
"তিনটি জিনিস যাহার মধ্যে পাওয়া যাইবে, সে ইহার দ্বারা ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করিবে। একটি হইল তাহার নিকট আল্লাহ ও আল্লাহ্র রাসূল অন্য সকল হইতে বেশী ভালবাসার পাত্র হওয়া"।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াত ও মু'জিযা

📄 নবুওয়াত ও মু'জিযা


নবী-রাসূলগণের পক্ষ হইতে যে সকল অস্বাভাবিক ঘটনা প্রকাশ পায় সেইগুলিকে সাধারণত মু'জিযা বলা হয়। তবে ইহা তাঁহাদের নিজেদের ক্ষমতাবলে প্রকাশ পায় না, বরং আল্লাহ্ পক্ষ হইতে প্রদত্ত হইয়া থাকে। ইরশাদ হইয়াছে: وَلَقَدْ جَاءَتْهُمْ رُسُلُنَا بِالْبَيِّنَات (المائدة - ٣٢). "তাহাদের নিকট তো আমার রাসূলগণ স্পষ্ট প্রমাণাদি আনিয়াছিল" (৫ঃ৩২)।
মু'জিযার সংজ্ঞাদানে সায়্যিদ মাহদী আস-সদর বলেন: وَالْمُرَادُ بِالْمُعْجِزَاتِ هِيَ الْأَفْعَالُ الْخَارِقَةُ الَّتِي يُعْجِزُ الْبَشَرُ عَنْهَا عَادَةَ الْمَقْرُونَةُ بِدَعْوَى النُّبُوَّةِ فَإِنْ لَمْ نَقْتَرِنْ بِذلِكَ سُمِّيَتْ كَرَامَةً وَإِرْهَاضًا وَهُوَ مَا يُشْعِرُ بِحُدُوثِ أَمْرٍ غَرِيبٍ خَطِيرٍ.
"মু'জিযা বলিতে সেই সকল কর্মকাণ্ড বুঝায় যাহা প্রদর্শন করিতে সাধারণত মানুষ অক্ষম। এই সকল কর্মকাণ্ডের সহিত নবুওয়াতের দাবি সংশ্লিষ্ট থাকে। নবুওয়াতের দাবি সম্পৃক্ত না থাকিলে ইহাকে কারামত অথবা ইরহাস বলে। ইহা অত্যাশ্চর্য কোন কাজ প্রকাশ হইবার সংবাদবহ হইয়া থাকে"।
মতিউর রহমান নূরী বলেন, নবী-রাসূলগণ দ্বারা যেই সকল অস্বভাবিক অবস্থা, ঘটনা ও ভারধারার সৃষ্টি হয় সাধারণত উহাকে মু'জিযা বলা হইয়া থাকে। কিন্তু কয়েকটি কারণে এই পরিভাষা সঠিক বলিয়া মনে হয় না। প্রথমত এই কারণে যে, পবিত্র কুরআন ও হাদীছের কোথাও এই শব্দটির প্রয়োগ নাই। ইহার পরিবর্তে আয়াত এবং বুরহান শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে। প্রাচীন কালের হাদীছ বিশারদগণ উহার পরিবর্তে দলীল বা আলামত শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন। দ্বিতীয়ত, সাধারণ ব্যবহারের কারণে মু'জিযা শব্দটির সহিত কতিপয় বিশেষ মানসিক ভাবধারা সম্পৃক্ত হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে তাহা ত্রুটিমুক্ত নহে। যেমন এই শব্দটি শুনিবামাত্রই সাধারণ মানুষের অন্তরে এই ধারণা সৃষ্টি হয় যে, ইহা স্বয়ং নবীর নিজস্ব ক্ষমতায় অনুষ্ঠিত ঘটনা। তাঁহারই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা সম্পাদিত হইয়াছে, উপরন্তু এই শব্দের কারণে উহার মু'জিযা হওয়া যেন উহার নিগূঢ় তত্ত্বের মধ্যেই একান্তভাবে বিলীন হইয়া গিয়াছে। দুইটি ধারণাই মৌলিকভাবে ভ্রান্ত। জ্ঞানবুদ্ধি ও বিবেকের দিক দিয়া মু'জিযা সম্পর্কে যেই সকল প্রশ্ন বা আপত্তি উত্থাপিত হইয়া থাকে, তাহার অধিকাংশ এই মু'জিযা শব্দের ভুল ব্যবহারের কারণে। অতঃপর উপরিউক্ত লেখক বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা কোন নবী ও রাসূলের নবুওয়াত দাবীর সত্যতা প্রমাণের জন্য দুনিয়ায় যেই সব ঘটনা ঘটাইয়া থাকেন কালাম শাস্ত্রবিদদের মতে তাহাই হইল মু'জিযা। ইহার জন্য কয়েকটি শর্ত রহিয়াছে। অন্যতম এই, ঘটনাটি স্বাভাবিক নিয়ম ভঙ্গকারী হইতে হইবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00