📄 নবুওয়াত হিদায়াত লাভের একমাত্র মাধ্যম
আল-কুরআন একাধিকবার ঘোষণা করিয়াছে যে, একমাত্র নবীগণ আল্লাহ্র অস্তিত্ব এবং তাঁহার গুণাবলী যথাযথ চিহ্নিতকরণের জন্য মনোনীত হইয়াছেন। আল্লাহ্র সঠিক মা'রিফাত যাহা অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতা হইতে পূত-পবিত্র কিংবা স্ববিরোধী ধারণা হইতে মুক্ত তাহা অর্জনের একমাত্র মাধ্যম হইলেন নবী-রাসূলগণ। তাঁহাদের অনুসৃত পদ্ধতিগুলি অনুসরণ ব্যতীত অন্য কোন সূত্র দ্বারা সেই মা'রিফাত লাভ করা সম্পূর্ণ দুরূহ। যুক্তি বা জ্ঞান ইহার সামান্যতম দিশা দিতে অক্ষম এবং ধীশক্তি ও মেধা এই ক্ষেত্রে অচল। জ্ঞান-বুদ্ধির অনুসন্ধান যেমন সেই পর্যন্ত পৌঁছিতে ব্যর্থ, অভিজ্ঞতার কোষাগারও তেমন সেই ক্ষেত্রে একেবারেই শূন্য। আল্লাহ পাক জান্নাতবাসী কতিপয় সত্যবাদী মানুষের উক্তি দ্বারা এই তথ্যটির বিশ্লেষণ দিতেছেন:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هَدَانَا لِهَذَا وَمَا كُنَّا لِنَهْتَدِى لَوْلا أَنْ هَدَانَا اللَّهُ (الاعراف ٤٣). "প্রশংসা আল্লাহ্রই যিনি আমাদিগকে ইহার পথ দেখাইয়াছেন, আল্লাহ আমাদিগকে পথ না দেখাইলে আমরা কখনও পথ পাইতাম না" (৭:৪৩)।
কুরআন মজীদে স্পষ্টভাবে বর্ণিত যে, নবীগণই সঠিক মারিফাত অর্জনের একমাত্র মাধ্যম এবং তাঁহারাই আল্লাহ্ত্র পরিচিতি লাভের দিশারী ছিলেন। ইরশাদ হইয়াছে:
لَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُ رَبِّنَا بِالْحَقِّ (الاعراف ٤٣). "আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ তো সত্য বাণী আনিয়াছিল" (৭:৪৩)।
এই সকল আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আম্বিয়ায়ে কিরামের আবির্ভাবের ফলেই মানুষের পক্ষে আল্লাহ্ মারিফাত অর্জন করা, তাঁহার সন্তুষ্টি এবং বিধিবিধান সম্পর্কে পরিজ্ঞাত হওয়া আর সেই মুতাবিক নিজেদেরকে সুশোভিত করা সম্ভব হইয়াছে। বুদ্ধি ও অনুভূতির ঊর্ধ্বের তথ্যাবলী অনুসন্ধানে মানুষের বিবেক ও আভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলি যে কত ক্ষীণ ও আস্থা স্থাপনের অনুপযোগী এই সম্পর্কে শায়খ আহমাদ সিরহিন্দী মুজাদ্দিদ আলফে ছানী (র) বলেন, মানুষের বুদ্ধি-বিবেক নবীগণের সহযোগিতা ও পথ প্রদর্শন ব্যতিরেকেও বিশ্বস্রষ্টার অস্তিত্ব নির্ণয় করিতে পারে, কিন্তু আল্লাহ্র অস্তিত্ব ও তাঁহার গুণাবলীর সঠিক পরিচিতি, তাঁহার পূত পবিত্রতা, নির্ভেজাল একত্ববাদ ইত্যাকার বিষয় অবগত হওয়া কস্মিন কালেও সম্ভব নয়।
আল্লাহর পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধতা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ নবীগণের অবহিতকরণ ও তালীম দানের উপর পুরাপুরি নির্ভরশীল। তাঁহারা আল্লাহ্র মারিফাতের ক্ষেত্রে দার্শনিকদের ভ্রান্তির নিদর্শনগুলি চিহ্নিত করিয়া দিয়াছেন। প্রমাণ করিয়াছেন যে, নবীগণের আবির্ভাব আল্লাহর অস্তিত্ব, গুণাবলী এবং বিধি-নিষেধের যথোচিত পরিচিতি প্রদানের একক ও অনিবার্য উপায়।
মুশরিকদের পথভ্রষ্টতা ও আল্লাহ্র সহিত শরীক করার অশোভনীয় ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন প্রসঙ্গে সূরা আস-সাফফাতে ইরশাদ হইয়াছে:
سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصْفُونَ. وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ. وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (الصفت ١٨٢-١٨٠)
"তাহারা যাহা আরোপ করে তাহা হইতে মহান ও পবিত্র আপনার প্রতিপালক। শান্তি বর্ষিত হউক রাসূলগণের প্রতি এবং প্রশংসা সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ্রই জন্য" (৩৭: ১৮০-১৮২)।
উপরিউক্ত তিনটি আয়াত যেন সুসংবদ্ধ শিকলের কড়া, যাহা পরস্পর একত্রে গাঁথা। কেননা আল্লাহ পাক স্বীয় অস্তিত্বকে মুশরিকদের অবাঞ্ছিত ও অমার্জিত উক্তি হইতে পবিত্র ঘোষণা দিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, বরং ইহার সহিত আম্বিয়ায়ে কিরাম সম্পর্কেও উল্লেখ করিয়াছেন। কারণ তাঁহারা আল্লাহ পাকের পূর্ণ পবিত্রতা ও মহত্বকে সঠিকভাবে ব্যক্ত করিয়াছেন। আল্লাহ পাক এইজন্য সপ্রশংস সালাম পাঠাইলেন তাঁহাদের উদ্দেশে। স্রষ্টার সঠিক পরিচিতি সৃষ্টির সমীপে উপস্থাপন এবং তাঁহার গুণাবলী সমুজ্জ্বল করার অনিবার্য বাহনই হইতেছে নবীগণের কণ্ঠ। তাঁহাদের আবির্ভাব বহিয়া আনিয়াছে সৃষ্টিকুলের জন্য অফুরন্ত কল্যাণ। মানবজাতির প্রতি তাঁহারা হইতেছেন আল্লাহ্ অসীম অনুগ্রহ।
📄 গ্রীক দর্শনের ব্যর্থতার কারণ
আম্বিয়ায়ে কিরামের অনুসৃত আদর্শ বহির্ভূত অন্য কোন পন্থায় কেহ আল্লাহর অস্তিত্ব, গুণাবলী এবং মহিমান্বিত নামসমূহের পরিচিতি হাসিল করিতে চাহিলে এবং এই দুনিয়ার সহিত আল্লাহ্র সম্পর্কের বিষয় আল্লাহ্ ক্ষমতা, তাঁহার অনুশাসন ও বিধি-বিধান সংক্রান্ত বিষয় সমাধানের চেষ্টা চালাইলে তাহার সেই প্রয়াস ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইবে। ঠিক তেমনি সে যদি স্বীয় বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান-গবেষণা, প্রতিভা ও মেধা কিংবা কোন বিশেষ বিষয়ে পারদর্শিতার দ্বারা এই ক্ষেত্রে সফলতা অর্জনের চেষ্টা চালায় তবে তাহা হইবে ধৃষ্টতা ও পথভ্রষ্টতার নামান্তর। আল্লাহ্ নিম্নোক্ত বাণীতে এই ধরনের লোকদের আসল রূপ তুলিয়া ধরা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
هَا أَنْتُمْ هُؤُلاءِ حَاجَّجْتُمْ فِيْمَا لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ فَلِمَ تَحَاجُّوْنَ فِيْمَا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ (الاعمران ٦٦) .
"হাঁ, তোমরা তো সেইসব লোক, যে বিষয়ে তোমাদের সামান্য জ্ঞান আছে সে বিষয়ে তোমরাই তো তর্ক করিয়াছ, তবে যে বিষয়ে তোমাদের কোন জ্ঞান নাই সে বিষয়ে কেন তর্ক করিতেছ? আল্লাহ জ্ঞাত আছেন এবং তোমরা জ্ঞাত নহ" (৩ঃ ৬৬)।
গ্রীকদের প্রাচীন স্রষ্টা-দর্শন এবং ইহার উদ্ভাবক ও বিশেষজ্ঞদের অকৃতকার্যতা ও ব্যর্থতার মূল কারণ ইহাই। তাহাদের নজীরবিহীন মেধা ও প্রতিভা, সাহিত্যিক অগ্রযাত্রা, তাহাদের কৃতিত্বপূর্ণ কাব্যচর্চা, সমর নৈপুণ্যের অমর কাহিনী, অংকশাস্ত্র, জ্যামিতি, পদার্থ বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান এক কথায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অপূর্ব দক্ষতা তাহাদিগকে প্রকৃতপক্ষে মস্তবড় গোলকধাঁধাঁয় নিক্ষেপ করিয়াছে। তাহাদের ধারণা, এই জ্ঞানরাশি তাহাদিগকে আধ্যাত্মিক তত্ত্ব ও স্রষ্টা-দর্শনের বিষয়েও সত্যের দিশারী করিয়া তুলিবে। তাইতো তাহারা নিজস্ব সীমা ডিঙ্গাইয়া স্রষ্টা-দর্শনের বিভিন্ন দিক এবং আল্লাহ্র অস্তিত্ব ও তাঁহার গুণাবলীর রহস্য উদঘাটনের প্রতি মনোনিবেশ করেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তাহারা দুনিয়াবাসীর সামনে যেসব ধারণা উপস্থাপন করিয়াছেন তাহা প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানের নামে মূর্খতার ছড়াছড়ি এবং বিপরীতধর্মী ও স্ববিরোধী মতামত এবং কল্পনা ও দাবির জগাখিচুড়ি মাত্র।..
ইমাম গাযালী (র) এই বিষয়ে এক তথ্যবহুল আলোচনায় অবতারণা করিয়াছেন। তিনি বলেন, "ইহাতে ভাঁজে ভাঁজে রহিয়াছে অন্ধকার আর অন্ধকার। যদি কেহ এই ধরনের কথাকে স্বপ্ন হিসাবেও বর্ণনা করিতে যায় তখন তাহাকে বিকৃত মস্তিষ্ক বলিয়া আখ্যায়িত করা হইবে"।
এমনিভাবে ইব্ন তায়মিয়া (র) দার্শনিকগণের উক্তিমালা বিশ্লেষণ করিয়া বলিয়াছেন, বিবেকবানদের একটু ভাবিয়া দেখা দরকার যে, সেইসব ব্যক্তির উক্তিগুলির মূল্য কী যাহারা নিজেদের পেশকৃত উক্তি দ্বারা খুবই গর্ববোধ করিতেছে এবং আম্বিয়ায়ে কিরামের নির্দেশিত আদর্শকে প্রত্যাখ্যান করিতে পারিয়াছে বলিয়া তৃপ্তি লাভ করিতেছে। ইহাদের দর্শনের উচ্চ পর্যায়ে যাহা পরিলক্ষিত হইতেছে তাহা মাতালের উক্তির মত। তাহারা স্থিরকৃত ও বিদিত সত্যকে স্বীয় কারচুপি ও প্রবঞ্চনা দিয়া ধামাচাপা দিবার অপচেষ্টা করে। পক্ষান্তরে স্পষ্ট ও অনস্বীকার্য বাতিলকে তাহারা গ্রহণ করিয়া লয়।
ইমাম ইব্ন তায়মিয়া (R) আরও লিখিয়াছেন, গ্রীক অধ্যাত্ম দর্শনের প্রথম গুরু এরিস্টোটলের উক্তি ও যুক্তিগুলি পর্যবেক্ষণ করিলে যে কোন অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে বাধ্য হইবে যে, গ্রীক দার্শনিকদের ন্যায় আল্লাহ রব্বুল আলামীনের মারিফাত বিমুখ অন্য কেহ ছিল না। কাহাকেও যখন দেখা যায় যে, নবীগণের ইলম ও তালীমের বিরুদ্ধে গ্রীক দর্শনের সাহায্যে বিতর্কে লিপ্ত হইতেছে তখন বিস্ময়ে অভিভূত হইতে হয়। ইহা যেন এক কামারের পক্ষে ফেরেশতার সহিত এবং এক গ্রামীণ জমিদারের পক্ষে সম্রাটের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হওয়ার শামিল।
মুজাদ্দিদ আলফে ছানী (র) লিখিয়াছেন, "যুক্তিজ্ঞানই যদি এই বিষয়ে যথেষ্ট হইত, তাহা হইলে যুক্তিকেই পথপ্রদর্শকরূপে গ্রহণকারী গ্রীক দার্শনিকগণ আর পথভ্রষ্টতার তমসাচ্ছন্ন পাথারে এইভাবে হাবুডুবু খাইতে থাকিত না। তাহারা অন্যদের অপেক্ষা আল্লাহ পাককে বেশী চিনিত। অথচ তাহারাই আল্লাহ পাকের অস্তিত্ব ও গুণাবলী সংক্রান্ত বিষয়টিতে সর্বাপেক্ষা অধিক বুদ্ধিভ্রষ্ট ও অজ্ঞ।” তিনি আরও বলেন, "আমি বিস্মিত যে, এক সম্প্রদায় সেই সকল মূঢ়দের (গ্রীক দার্শনিকগণ) "দার্শনিক” আখ্যা দিতেছে। তাহারা নাকি দর্শন শাস্ত্রের উদ্ভাবক অথচ উক্ত দর্শনের সিংহভাগই অবান্তর ও ভিত্তিহীন বলিয়া সাব্যস্ত হইয়াছে। বিশেষ করিয়া তাহাদের স্রষ্টা ও অধ্যাত্ম দর্শন বা ইলাহিয়্যাতের পর্বে প্রায় সব বিছুই কুরআন ও সুন্নাহ্ পরিপন্থী। অতএব যাহাদের পুঁজি একমাত্র অজ্ঞতা তাহাদেরকে দার্শনিক আখ্যা দেওয়া হয় কিভাবে? ইহা ব্যঙ্গার্থে দেওয়া যাইতে পারে। যেমন একজন অন্ধকে পদ্মলোচন নাম দেওয়া হয়"। আল্লাহ পাকের নিম্নোক্ত বাণীর জ্বলন্ত উদাহরণ তাহারাই:
أَشْهِدُوا خَلْقَهُمْ سَتُكْتَبُ شَهَادَتُهُمْ وَيُسْتَلُونَ (الزخرف ١٩).
"ইহাদের সৃষ্টি কি উহারা প্রত্যক্ষ করিয়াছিল? তাহাদের উক্তি অবশ্য লিপিবদ্ধ করা হইবে এবং তাহারা জিজ্ঞাসিত হইবে" (৪৩:১৯)।
مَا أَشْهَدْتُهُمْ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَا خَلْقَ انْفُسِهِمْ وَمَا كُنْتُ مُتَّخِذَ الْمُضِلَّينَ عَضُداً (الكهف ٥١).
"আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকালে আমি তাহাদেরকে ডাকি নাই এবং তাহাদের সৃজন কালেও নয়, আমি বিভ্রান্তকারীদের সাহায্য গ্রহণ করিবার নই” (১৮: ৫১)।
📄 নবুওয়াত মানবতার কল্যাণ ও সভ্যতার অগ্রগতির মূল উপাদান
আম্বিয়ায়ে কিরাম শুধু আল্লাহ তা'আলার বিশুদ্ধ মা'রিফাত এবং নিশ্চিত ইলমের প্রাণকেন্দ্র নন, বরং ইহার সহিত তাঁহারা মানব সমাজকে দান করেন আরও এক অমূল্য সম্পদ। তাহা হইল মানবতার কল্যাণ ও সভ্যতার অগ্রগতি সাধন। ইহার ফলে মানুষের মধ্যে মঙ্গলের প্রতি অনুরাগ, অমঙ্গলের প্রতি বিরাগের অনুভূতি সৃষ্টি হয়। শিরকের শক্তি ও ঘাটিগুলি ধূলিস্মাৎ করিয়া মঙ্গলের পথ উন্মুক্ত করিবার অনুপ্রেরণা লাভ করে। কল্যাণমণ্ডিত বিষয়াবলীর মূল উৎস আবহমান কাল হইতে নবীগণের শিক্ষায় নিহিত রহিয়াছে। তাঁহারা নবী হিসাবে আবির্ভূত হইয়াই নিজেদের উম্মত তথা সমাজকে ভাল কাজের প্রতি অনুপ্রেরণা দিতেন এবং মন্দ কাজ হইতে বিরত থাকিবার মানসিকতা সৃষ্টির প্রয়াস চালাইতেন। ন্যায়ের পথে সহায়তা করা ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করার আদর্শকে সমাজের মানুষের মন-মস্তিস্কে প্রবিষ্ট করিয়া দিবার জন্য তাঁহারা প্রাণপণ চেষ্টা চালাইয়া গিয়াছেন। সেই অব্যাহত প্রচেষ্টার বদৌলতে মানবতা বিবর্জিত হিংস্র সমাজের মধ্য হইতে জন্মগ্রহণ করিল এমন এক জাতি যাহাদের সৎকর্মের সুঘ্রাণে সমস্ত জগৎ বিমোহিত হইয়া উঠিল। সম্মান ও মর্যাদায় তাঁহারা ফেরেশতাগণ হইতে অগ্রগামী হইয়া গেলেন। এই অনুপম আদর্শের প্রচারকদের বরকতে ধ্বংসপ্রাপ্ত মানবতার ভাগ্যে ফিরিয়া আসিল এক নূতন জীবন। মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকাশে সেই মহান সম্প্রদায় যেই আদর্শ স্থাপন করিয়াছে পৃথিবীতে ইহার কোন তুলনা নাই। আম্বিয়ায়ে কিরামের আবির্ভাব যদি না হইত তাহা হইলে মানবতার তরী তাহার জ্ঞানবিজ্ঞান, দর্শন ও কৃষ্টি-কালচার লইয়া সাগরের অতলে তলাইয়া যাইত। তখন মানব নামধারী জাতি পানাহার ব্যতীত অন্য কিছুই চিনিত না। বর্তমান বিশ্বে যাহা কিছু মহৎ মানবিক নেতৃত্ব, পবিত্রতার তীক্ষ্ণ অনুভূতি, উত্তম মানের চরিত্র প্রশিক্ষণ, বিশুদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে যত সোচ্চার ধ্বনি শ্রুত হইতেছে সেই সবের ঐতিহাসিক সূত্র জড়িত রহিয়াছে নবীকুলের শিক্ষা এবং তাঁহাদের দাওয়াত ও তাবলীগের সহিত। তাঁহাদেরই প্রচারিত শিক্ষার জ্যোতিতে আজ দুনিয়াবাসী সম্মুখের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রয়াস পাইতেছে।
📄 নবীগণের দাওয়াতে আখিরাতের আকীদার গুরুত্ব
নবীগণের জীবন-চরিত ও তাঁহাদের বাণীসমূহ পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, তাঁহাদের দৃষ্টির সামনে আখিরাত যেন অহরহ বিরাজমান ছিল। আখিরাতের সুখ-দুঃখ, কৃতকার্যতা ও অকৃতকার্যতার প্রকৃত ছবি তাঁহাদের সামনে উদ্ভাসিত ছিল। জান্নাতের অশেষ প্রত্যাশা, জাহান্নামের কঠিন ভীতির জগতে তাঁহারা সর্বক্ষণ কালাতিপাত করিতেন। ইবরাহীম (আ)-এর একটি উক্তিতে ইহার একটি প্রতিচ্ছবি প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে। ইরশাদ হইয়াছে:
وَالَّذِي أَطْمَعُ أَنْ يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ. رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَالْحِقْنِي بالصَّالِحِينَ، وَاجْعَلْ لِى لِسَانَ صِدْقٍ فِي الْآخِرِينَ وَاجْعَلْنِي مِنْ وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ. وَاغْفِرْ لِأَبِي إِنَّهُ كَانَ مِنَ الضَّالِّينَ. وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ. يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبِ سَلِيمٍ وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ. وَبُرِّزَتِ الْجَحِيمُ لِلْغَاوِينَ (الشعراء - ٩١-٨٢).
"এবং আশা করি, তিনি কিয়ামত দিবসে আমার অপরাধ মার্জনা করিয়া দিবেন। হে আমার প্রতিপালক! আমাকে জ্ঞান দান কর এবং সৎকর্মপরায়ণদের শামিল কর। আমাকে পরবর্তীদের মধ্যে যশস্বী কর এবং আমাকে সুখময় জান্নাতের অধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর। আর আমার পিতাকে ক্ষমা কর। তিনি তো পথভ্রষ্টদের শামিল ছিলেন এবং আমাকে লাঞ্ছিত করিও না পুনরুত্থান দিবসে, যেদিন ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন উপকারে আসিবে না। সেদিন উপকৃত হইবে কেবল সে, যে আল্লাহ্র নিকট আসিবে বিশুদ্ধ অন্তকরণ লইয়া। মুত্তাকীদের নিকটবর্তী করা হইবে জান্নাত এবং পথভ্রষ্টদের জন্য উন্মোচিত করা হইবে জাহান্নাম" (২৬ : ৮২-৯১)।
আল্লাহ্ নবী ইউসুফ (আ)-ও আখিরাতকে অনুরূপ দৃষ্টিকোণ হইতে দেখিয়াছিলেন। অথচ তিনি তখন ছিলেন প্রভাব-প্রতিপত্তি ও শৌর্য-বীর্যের উচ্চ শিখরে। তাঁহারই করতলে ছিল তদানীন্তন বিশ্বের সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা মিসর রাষ্ট্র। প্রচলিত ছিল সেখানে তাঁহারই মুদ্রা। বৃদ্ধ পিতা এবং আপন বংশধরদের সহিত পুনর্মিলনের মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক তাঁহার নয়ন যুগলকে শীতল এবং অন্তরকে প্রশান্ত করিয়া দিয়াছিলেন। এদিকে তাঁহার অতুলনীয় মর্যাদা ও মহত্ত্ব অবলোকন করিয়া তাঁহার ঘনিষ্ঠতমদের হৃদয় প্রফুল্ল ও আনন্দে স্পন্দিত হইয়া উঠিয়াছিল। কিন্তু ইউসুফ (আ)-এর মন-মস্তিষ্ক ছিল আখিরাতের চিন্তায় বিভোর। তাই তিনি বলিয়াছিলেন:
رَبِّ قَدْ أَتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنْتَ وَلِي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَالْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ (يوسف - ١٠١).
"হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে রাজ্য দান করিয়াছ এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়াছ। হে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা! তুমিই ইহলোক ও পরলোকে আমার অভিভাবক। তুমি আমাকে মুসলিম হিসাবে মৃত্যু দাও এবং আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত কর” (১২: ১০১)।
আখিরাতের উপর ঈমান এবং তথাকার প্রত্যাশিত অনন্ত সৌভাগ্য ও অব্যাহত দুর্গতি এবং সেখানকার পুরস্কার এবং শাস্তির বিষয়টি মানসপটে উপস্থিতিই আম্বিয়ায়ে কিরাম-এর দাওয়াত এবং তাঁহাদের উপদেশ ও নসীহতের আসল চালিকাশক্তি ছিল। তাঁহারা দিবা-নিশি শুধু আখিরাতের চিন্তায় অস্থির থাকিতেন। কলুষতাসর্বস্ব সমাজ, পারিপার্শ্বিক অন্যায়-অনাচারের বিভীষিকার চিন্তার চেয়ে আখিরাতের চিন্তাকেই তাঁহারা দাওয়াত ও তাবলীগের মূল উৎস হিসাবে চিহ্নিত করেন। নূহ (আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَى قَوْمِهِ إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مُّبِينٌ، أَنْ لَا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ (هود - ٢٥-٢٦ ) .
"আমি তো নূহকে তাহার সম্প্রদায়ের নিকট পাঠাইয়াছিলাম। সে বলিয়াছিল, তোমাদের জন্য আমি সুস্পষ্ট সতর্ককারী, যেন তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অপর কিছুর ইবাদত না কর। আমি তো তোমাদের জন্য এক মর্মন্তুদ দিনের শাস্তি আশংকা করি" (১১: ২৫-২৬)।
আল্লাহ্ নবী হুদ (আ)-এর উক্তি আল-কুরআনে এইভাবে ইরশাদ হইয়াছেঃ
وَاتَّقُوا الَّذِي آمَدَّكُمْ بِمَا تَعْلَمُوْنَ آمَدَّكُمْ بِأَنْعَامِ وَبَنِينَ وَجَنَّتٍ وَعُيُونٍ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ (شعراء - ١٣٢-١٣٥).
"তোমরা ভয় কর তাহাকে, যিনি তোমাদিগকে দিয়াছেন সেই সমুদয় যাহা তোমরা জান। তিনি দিয়াছেন তোমাদিগকে জন্তু ও সন্তান-সন্ততি, উদ্যান ও প্রস্রবণ। আমি তোমাদের জন্য আশংকা করি মহাদিনের শাস্তি” (২৬ঃ ১৩২-১৩৫)।
এইরূপ অন্যান্য নবীগণও স্ব-স্ব উম্মতকে আখিরাতের ভীতি প্রদর্শন করিয়াছিলেন।