📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবী-রাসূল প্রেরণের প্রেক্ষিত

📄 নবী-রাসূল প্রেরণের প্রেক্ষিত


উপরিউক্ত বিষয় সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া আবশ্যক:
كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ وَأَنْزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيْمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ إِلَّا الَّذِينَ أُوتُوهُ مِنَ بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَتُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ فَهَدَى اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا لِمَا اخْتَلَفُوا فِيْهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِهِ وَاللَّهُ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ (البقرة ٢١٣).
"সমস্ত মানুষ ছিল একই উম্মত। অতঃপর আল্লাহ নবীগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেন। মানুষেরা যে বিষয়ে মতভেদ করিত তাহাদের মধ্যে সে বিষয়ে মীমাংসার জন্য তিনি তাহাদের সহিত সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেন এবং যাহাদিগকে তাহা দেওয়া হইয়াছিল, স্পষ্ট নিদর্শন তাহাদের নিকট আসিবার পরে, তাহারা শুধু পরস্পর বিদ্বেষ বশত সেই বিষয়ে বিরোধিতা করিত। যাহারা বিশ্বাস করে, তাহারা যে বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করিত, আল্লাহ তাহাদিগকে সে বিষয়ে নিজ অনুগ্রহে সত্য পথে পরিচালিত করেন। আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা সরল পথে পরিচালিত করেন" (২: ২১৩)।
'উম্মত' শব্দের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করিয়াছেন। মানুষ কখন এক উম্মতের অন্তর্ভুক্ত ছিল, সেই সম্পর্কে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। মানুষ একই উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত ছিল এই কথার ব্যাখ্যায় আল্লামা কুরতুবী বলেন, তাহারা একই ধর্মের অনুসারী ছিল। উবায় ইব্‌ন কা'ব ও ইবন যায়দ (র)-এর অভিমত হইল মানুষ বলিতে এখানে আদম সন্তানকে বুঝানো হইয়াছে। তাহাদের ধর্মীয় ঐক্য ছিল সেই সময় যখন আল্লাহ তা'আলা আদম সন্তানদেরকে তাহাদের পিতা আদম (আ)-এর পৃষ্ঠদেশ হইতে বাহির করিয়া তাহাদের নিকট হইতে আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকারোক্তি আদায় করিয়াছিলেন। এই সম্পর্কে ইবন আব্বাস (রা) ও কাতাদা (র)-এর অভিমত হইল, আদম (আ) ও নূহ (আ) পর্যন্ত যে দশটি যুগ অতিক্রান্ত হইয়াছিল সেই সময়কার মানুষ সঠিক ধর্মের উপর ছিল। অতঃপর তাহাদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হইলে আল্লাহ তা'আলা নূহ (আ) ও পরবর্তী কালের নবীগণকে প্রেরণ করিয়াছিলেন। ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে অপর একটি অভিমত বর্ণিত আছে যে, মানুষ নূহ (আ) অথবা ইবরাহীম (আ)-কে প্রেরণের সময় কুফরীর উপর একমত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা নূহ অথবা ইবরাহীম (আ) ও তৎপরবর্তী নবীগণকে প্রেরণ করিলেন। এই সম্পর্কে মুফতী শফী (র) তাহার তাফসীর গ্রন্থে বলেন, জমহুর তাফসীরকারগণের অভিমত হইল, মানবজাতি আল্লাহ্র একত্ববাদ এবং ঈমানের ব্যাপারে একতাবদ্ধ ছিল। অতঃপর তাহাদের মধ্যে অনৈক্যের সৃষ্টি হইলে আল্লাহ তা'আলা নবী-রাসূল প্রেরণ করেন।
অপর একটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন: رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا (النساء ١٦٥). "সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করিয়াছি, যাহাতে রাসূল আসার পর আল্লাহ্র বিরুদ্ধে মানুষের কোন অভিযোগ না থাকে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (৪: ১৬৫)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফতী শফী (র) বলেন, নবীগণকে সর্বদা আল্লাহ তাআলা এই উদ্দেশ্যে প্রেরণ করিতেন যাহাতে তাঁহারা মুমিনগণকে সুসংবাদ দান করেন এবং কাফিরদেরকে ভয় প্রদর্শন করেন। যাহাতে মানবজাতি কিয়ামতের দিন এই আপত্তি উঠাইতে না পারে যে, হে আল্লাহ! কিসে তোমার সন্তুষ্টি এবং কিসে অসন্তুষ্টি তাহা আমরা অবগত ছিলাম না। যদি আমরা জানিতাম তাহা হইলে সেই অনুসারে চলিতাম।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولاً أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوْتَ فَمِنْهُمْ مَنْ هَدَى اللَّهُ وَمِنْهُمْ مَنْ حَقَّتْ عَلَيْهِ الضَّلَالَةُ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ. "আল্লাহ্ ইবাদত করিবার ও তাগূতকে বর্জন করিবার নির্দেশ দিবার জন্য আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠাইছি। অতঃপর উহাদের কতককে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন এবং উহাদের কতকের উপর পথভ্রান্তি সাব্যস্ত হইয়াছিল। সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং দেখ, যাহারা সত্যকে মিথ্যা বলিয়াছে তাহাদের পরিণাম কী হইয়াছে” (১৬: ৩৬)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা তাবারসী বলেন, প্রতিটি জাতিতে ও সকল যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করা হইয়াছিল, যাহাতে তাঁহারা স্ব স্ব সম্প্রদায়কে বলিয়া দেন, তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর এবং শয়তান ও অন্য যাহারা ভ্রান্তির পথে আহবান করে তাহাদেরকে পরিহার কর।
আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূলগণকে মানবতার মুক্তির দূত হিসাবে পাঠাইয়াছেন, যাহাতে তাঁহারা মানবজাতিকে অজ্ঞতা, মূর্খতা ও পথভ্রষ্টতার অন্ধকার হইতে আলোর পথে ফিরাইয়া আনেন। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِأَيْتِنَا أَنْ أَخْرِجْ قَوْمَكَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوْرِ وَذَكِّرْهُمْ بِأَيَّامِ اللَّهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ (ابْرَاهِيمَ ايت-٥).
"মূসাকে আমি আমার নিদর্শনসহ প্রেরণ করিয়াছিলাম এবং বলিয়াছিলাম, তোমার সম্প্রদায়কে অন্ধকার হইতে আলোতে আনয়ন কর এবং উহাদিগকে আল্লাহ্র দিবসগুলির দ্বারা উপদেশ দাও। ইহাতে তো নিদর্শন রহিয়াছে প্রত্যেক পরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য” (১৪:৫)।
নবুওয়াত লাভের জন্য সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রয়োজন নাই। নবুওয়াত পদটিই সুমহান, ইহাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নাই। তবে উহার জন্য সামাজিকভাবে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন হইতে হইবে এমন কোন বাধ্যবধাকতা নাই। এই ক্ষেত্রে আল্লাহ্র জ্ঞান ও তাঁহার মনোনয়নই চূড়ান্ত। তদানিন্তন মক্কার কাফিররা মনে করিত, নবুওয়াত পদে আসীন হইবেন কেবল প্রভাবশালী অভিজাত বংশের কোন বিত্তবান লোক। সহায়-সম্বলহীন পিতৃ-মাতৃহারা কোন লোক নবুওয়াতের যোগ্য হইতে পরিবে না। আল-কুরআন তাহাদের এই ভ্রান্ত ধারণার উল্লেখ করিয়া সঙ্গে সঙ্গে উহার অসারতাও প্রকাশ করিয়া দিয়াছে:
وَقَالُوا لَوْلَا نُزِّلَ هذا الْقُرْآنُ عَلَى رَجُلٍ مِّنَ الْقَرْيَتَيْنِ عَظِيمٍ أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَةَ رَبِّكَ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُمْ مَعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَت لِيَتَّخِذَ بَعْضُهُمْ بَعْضًا سُخْرِيَّاً (الزخرف ٣١-٣٢).
“এবং ইহারা বলে, এই কুরআন কেন নাযিল করা হইল না দুই জনপদের কোন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির উপর? ইহারা কি তোমার প্রতিপালকের করুণা বণ্টন করে? আমিই উহাদের মধ্যে উহাদের জীবিকা বণ্টন করি, পার্থিব জীবনে এবং একজনকে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নত করি, যাহাতে একে অপরের দ্বারা কাজ করাইয়া লইতে পারে” (৪৩: ৩১-৩২)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা যামাখশারী বলেন, قریتین দ্বারা মক্কা ও তায়েফ জনপদ দুইটিকে বুঝানো হইয়াছে। তিনি أَهُمْ يَقْسِمُونَ الخ সম্পর্কে বলেন, এই স্থলে হামযা বর্ণটি অস্বীকার ও বিস্ময় প্রকাশার্থে আসিয়াছে। ইহার অর্থ হইল অবিশ্বাসীরা মনে করে, নবুওয়াত ও কল্যাণ লাভের যোগ্যতা কাহারা রাখেন সেই সম্পর্কে তাহারা সম্যক জ্ঞাত, অথচ বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহ্ এখতিয়ারাধীন। তিনিই তাঁহার পরিপূর্ণ জ্ঞান ও হিকমত দ্বারা এই পদের জন্য যোগ্যতর ব্যক্তিকে বাছাই করেন। এই সকল লোক তাহাদের পার্থিব লাভালাভ সম্পর্কে পর্যন্ত সম্যক জ্ঞান রাখে না, ফলে তাহাদের মধ্যে ধনী-নির্ধন, শক্তিমান ও দুর্বল ইত্যাদি নানান বৈষম্য পীড়িত লোক রহিয়াছে। অথচ তাহারা স্বীয় ইচ্ছা দ্বারা ইহার ব্যতিক্রম ঘটাইতে পারে নাই। তাহারা কি করিয়া ধর্মীয় ব্যাপার যাহা আল্লাহর মহান দান তাহা বণ্টন করিবার দাবিদার হয়।
মক্কার কুরায়শগণ মনে করিত যে, নবুওয়াতের জন্য জাগতিক ঐশ্বর্য ও মান-মর্যাদা অত্যন্ত জরুরী। রাসূলুল্লাহ (স) আবির্ভূত হইবার পর যখন মানুষকে আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের দিকে দাওয়াত দেন এবং শিরক ও প্রতিমা পূজা করিতে বারণ করেন তখন মক্কার কুরায়শগণ তাঁহাকে যাদুকর, উন্মাদ, কবি ইত্যাদি কুৎসামূলক আখ্যা দিতে শুরু করে। কুরআন মজীদে তাহাদের এই সকল উদ্ভট ধারণা খণ্ডন করা হয়। ফলে তাহারা নিরুত্তর হইয়া বলিতে শুরু করে, নবুওয়াত অনেক বড় উচ্চ মর্যাদা, একজন সাধারণ মানুষ তাহা কি করিয়া লাভ করিতে পারে? কুরআন যদি আল্লাহর পক্ষ হইতে অবতীর্ণ হইয়া থাকে তবে ইহা পার্থিব দৃষ্টিকোণ হইতে কোনও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী এবং সম্মানিত নেতার উপর অবতীর্ণ হওয়া উচিৎ ছিল। ইহারই প্রেক্ষিতে উপরিউক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াত হিদায়াত লাভের একমাত্র মাধ্যম

📄 নবুওয়াত হিদায়াত লাভের একমাত্র মাধ্যম


আল-কুরআন একাধিকবার ঘোষণা করিয়াছে যে, একমাত্র নবীগণ আল্লাহ্র অস্তিত্ব এবং তাঁহার গুণাবলী যথাযথ চিহ্নিতকরণের জন্য মনোনীত হইয়াছেন। আল্লাহ্র সঠিক মা'রিফাত যাহা অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতা হইতে পূত-পবিত্র কিংবা স্ববিরোধী ধারণা হইতে মুক্ত তাহা অর্জনের একমাত্র মাধ্যম হইলেন নবী-রাসূলগণ। তাঁহাদের অনুসৃত পদ্ধতিগুলি অনুসরণ ব্যতীত অন্য কোন সূত্র দ্বারা সেই মা'রিফাত লাভ করা সম্পূর্ণ দুরূহ। যুক্তি বা জ্ঞান ইহার সামান্যতম দিশা দিতে অক্ষম এবং ধীশক্তি ও মেধা এই ক্ষেত্রে অচল। জ্ঞান-বুদ্ধির অনুসন্ধান যেমন সেই পর্যন্ত পৌঁছিতে ব্যর্থ, অভিজ্ঞতার কোষাগারও তেমন সেই ক্ষেত্রে একেবারেই শূন্য। আল্লাহ পাক জান্নাতবাসী কতিপয় সত্যবাদী মানুষের উক্তি দ্বারা এই তথ্যটির বিশ্লেষণ দিতেছেন:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هَدَانَا لِهَذَا وَمَا كُنَّا لِنَهْتَدِى لَوْلا أَنْ هَدَانَا اللَّهُ (الاعراف ٤٣). "প্রশংসা আল্লাহ্রই যিনি আমাদিগকে ইহার পথ দেখাইয়াছেন, আল্লাহ আমাদিগকে পথ না দেখাইলে আমরা কখনও পথ পাইতাম না" (৭:৪৩)।
কুরআন মজীদে স্পষ্টভাবে বর্ণিত যে, নবীগণই সঠিক মারিফাত অর্জনের একমাত্র মাধ্যম এবং তাঁহারাই আল্লাহ্ত্র পরিচিতি লাভের দিশারী ছিলেন। ইরশাদ হইয়াছে:
لَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُ رَبِّنَا بِالْحَقِّ (الاعراف ٤٣). "আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ তো সত্য বাণী আনিয়াছিল" (৭:৪৩)।
এই সকল আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আম্বিয়ায়ে কিরামের আবির্ভাবের ফলেই মানুষের পক্ষে আল্লাহ্ মারিফাত অর্জন করা, তাঁহার সন্তুষ্টি এবং বিধিবিধান সম্পর্কে পরিজ্ঞাত হওয়া আর সেই মুতাবিক নিজেদেরকে সুশোভিত করা সম্ভব হইয়াছে। বুদ্ধি ও অনুভূতির ঊর্ধ্বের তথ্যাবলী অনুসন্ধানে মানুষের বিবেক ও আভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলি যে কত ক্ষীণ ও আস্থা স্থাপনের অনুপযোগী এই সম্পর্কে শায়খ আহমাদ সিরহিন্দী মুজাদ্দিদ আলফে ছানী (র) বলেন, মানুষের বুদ্ধি-বিবেক নবীগণের সহযোগিতা ও পথ প্রদর্শন ব্যতিরেকেও বিশ্বস্রষ্টার অস্তিত্ব নির্ণয় করিতে পারে, কিন্তু আল্লাহ্র অস্তিত্ব ও তাঁহার গুণাবলীর সঠিক পরিচিতি, তাঁহার পূত পবিত্রতা, নির্ভেজাল একত্ববাদ ইত্যাকার বিষয় অবগত হওয়া কস্মিন কালেও সম্ভব নয়।
আল্লাহর পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধতা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ নবীগণের অবহিতকরণ ও তালীম দানের উপর পুরাপুরি নির্ভরশীল। তাঁহারা আল্লাহ্র মারিফাতের ক্ষেত্রে দার্শনিকদের ভ্রান্তির নিদর্শনগুলি চিহ্নিত করিয়া দিয়াছেন। প্রমাণ করিয়াছেন যে, নবীগণের আবির্ভাব আল্লাহর অস্তিত্ব, গুণাবলী এবং বিধি-নিষেধের যথোচিত পরিচিতি প্রদানের একক ও অনিবার্য উপায়।
মুশরিকদের পথভ্রষ্টতা ও আল্লাহ্র সহিত শরীক করার অশোভনীয় ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন প্রসঙ্গে সূরা আস-সাফফাতে ইরশাদ হইয়াছে:
سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصْفُونَ. وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ. وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (الصفت ١٨٢-١٨٠)
"তাহারা যাহা আরোপ করে তাহা হইতে মহান ও পবিত্র আপনার প্রতিপালক। শান্তি বর্ষিত হউক রাসূলগণের প্রতি এবং প্রশংসা সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ্রই জন্য" (৩৭: ১৮০-১৮২)।
উপরিউক্ত তিনটি আয়াত যেন সুসংবদ্ধ শিকলের কড়া, যাহা পরস্পর একত্রে গাঁথা। কেননা আল্লাহ পাক স্বীয় অস্তিত্বকে মুশরিকদের অবাঞ্ছিত ও অমার্জিত উক্তি হইতে পবিত্র ঘোষণা দিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, বরং ইহার সহিত আম্বিয়ায়ে কিরাম সম্পর্কেও উল্লেখ করিয়াছেন। কারণ তাঁহারা আল্লাহ পাকের পূর্ণ পবিত্রতা ও মহত্বকে সঠিকভাবে ব্যক্ত করিয়াছেন। আল্লাহ পাক এইজন্য সপ্রশংস সালাম পাঠাইলেন তাঁহাদের উদ্দেশে। স্রষ্টার সঠিক পরিচিতি সৃষ্টির সমীপে উপস্থাপন এবং তাঁহার গুণাবলী সমুজ্জ্বল করার অনিবার্য বাহনই হইতেছে নবীগণের কণ্ঠ। তাঁহাদের আবির্ভাব বহিয়া আনিয়াছে সৃষ্টিকুলের জন্য অফুরন্ত কল্যাণ। মানবজাতির প্রতি তাঁহারা হইতেছেন আল্লাহ্ অসীম অনুগ্রহ।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গ্রীক দর্শনের ব্যর্থতার কারণ

📄 গ্রীক দর্শনের ব্যর্থতার কারণ


আম্বিয়ায়ে কিরামের অনুসৃত আদর্শ বহির্ভূত অন্য কোন পন্থায় কেহ আল্লাহর অস্তিত্ব, গুণাবলী এবং মহিমান্বিত নামসমূহের পরিচিতি হাসিল করিতে চাহিলে এবং এই দুনিয়ার সহিত আল্লাহ্র সম্পর্কের বিষয় আল্লাহ্ ক্ষমতা, তাঁহার অনুশাসন ও বিধি-বিধান সংক্রান্ত বিষয় সমাধানের চেষ্টা চালাইলে তাহার সেই প্রয়াস ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইবে। ঠিক তেমনি সে যদি স্বীয় বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান-গবেষণা, প্রতিভা ও মেধা কিংবা কোন বিশেষ বিষয়ে পারদর্শিতার দ্বারা এই ক্ষেত্রে সফলতা অর্জনের চেষ্টা চালায় তবে তাহা হইবে ধৃষ্টতা ও পথভ্রষ্টতার নামান্তর। আল্লাহ্ নিম্নোক্ত বাণীতে এই ধরনের লোকদের আসল রূপ তুলিয়া ধরা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
هَا أَنْتُمْ هُؤُلاءِ حَاجَّجْتُمْ فِيْمَا لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ فَلِمَ تَحَاجُّوْنَ فِيْمَا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ (الاعمران ٦٦) .
"হাঁ, তোমরা তো সেইসব লোক, যে বিষয়ে তোমাদের সামান্য জ্ঞান আছে সে বিষয়ে তোমরাই তো তর্ক করিয়াছ, তবে যে বিষয়ে তোমাদের কোন জ্ঞান নাই সে বিষয়ে কেন তর্ক করিতেছ? আল্লাহ জ্ঞাত আছেন এবং তোমরা জ্ঞাত নহ" (৩ঃ ৬৬)।
গ্রীকদের প্রাচীন স্রষ্টা-দর্শন এবং ইহার উদ্ভাবক ও বিশেষজ্ঞদের অকৃতকার্যতা ও ব্যর্থতার মূল কারণ ইহাই। তাহাদের নজীরবিহীন মেধা ও প্রতিভা, সাহিত্যিক অগ্রযাত্রা, তাহাদের কৃতিত্বপূর্ণ কাব্যচর্চা, সমর নৈপুণ্যের অমর কাহিনী, অংকশাস্ত্র, জ্যামিতি, পদার্থ বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান এক কথায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অপূর্ব দক্ষতা তাহাদিগকে প্রকৃতপক্ষে মস্তবড় গোলকধাঁধাঁয় নিক্ষেপ করিয়াছে। তাহাদের ধারণা, এই জ্ঞানরাশি তাহাদিগকে আধ্যাত্মিক তত্ত্ব ও স্রষ্টা-দর্শনের বিষয়েও সত্যের দিশারী করিয়া তুলিবে। তাইতো তাহারা নিজস্ব সীমা ডিঙ্গাইয়া স্রষ্টা-দর্শনের বিভিন্ন দিক এবং আল্লাহ্র অস্তিত্ব ও তাঁহার গুণাবলীর রহস্য উদঘাটনের প্রতি মনোনিবেশ করেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তাহারা দুনিয়াবাসীর সামনে যেসব ধারণা উপস্থাপন করিয়াছেন তাহা প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানের নামে মূর্খতার ছড়াছড়ি এবং বিপরীতধর্মী ও স্ববিরোধী মতামত এবং কল্পনা ও দাবির জগাখিচুড়ি মাত্র।..
ইমাম গাযালী (র) এই বিষয়ে এক তথ্যবহুল আলোচনায় অবতারণা করিয়াছেন। তিনি বলেন, "ইহাতে ভাঁজে ভাঁজে রহিয়াছে অন্ধকার আর অন্ধকার। যদি কেহ এই ধরনের কথাকে স্বপ্ন হিসাবেও বর্ণনা করিতে যায় তখন তাহাকে বিকৃত মস্তিষ্ক বলিয়া আখ্যায়িত করা হইবে"।
এমনিভাবে ইব্‌ন তায়মিয়া (র) দার্শনিকগণের উক্তিমালা বিশ্লেষণ করিয়া বলিয়াছেন, বিবেকবানদের একটু ভাবিয়া দেখা দরকার যে, সেইসব ব্যক্তির উক্তিগুলির মূল্য কী যাহারা নিজেদের পেশকৃত উক্তি দ্বারা খুবই গর্ববোধ করিতেছে এবং আম্বিয়ায়ে কিরামের নির্দেশিত আদর্শকে প্রত্যাখ্যান করিতে পারিয়াছে বলিয়া তৃপ্তি লাভ করিতেছে। ইহাদের দর্শনের উচ্চ পর্যায়ে যাহা পরিলক্ষিত হইতেছে তাহা মাতালের উক্তির মত। তাহারা স্থিরকৃত ও বিদিত সত্যকে স্বীয় কারচুপি ও প্রবঞ্চনা দিয়া ধামাচাপা দিবার অপচেষ্টা করে। পক্ষান্তরে স্পষ্ট ও অনস্বীকার্য বাতিলকে তাহারা গ্রহণ করিয়া লয়।
ইমাম ইব্‌ন তায়মিয়া (R) আরও লিখিয়াছেন, গ্রীক অধ্যাত্ম দর্শনের প্রথম গুরু এরিস্টোটলের উক্তি ও যুক্তিগুলি পর্যবেক্ষণ করিলে যে কোন অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে বাধ্য হইবে যে, গ্রীক দার্শনিকদের ন্যায় আল্লাহ রব্বুল আলামীনের মারিফাত বিমুখ অন্য কেহ ছিল না। কাহাকেও যখন দেখা যায় যে, নবীগণের ইলম ও তালীমের বিরুদ্ধে গ্রীক দর্শনের সাহায্যে বিতর্কে লিপ্ত হইতেছে তখন বিস্ময়ে অভিভূত হইতে হয়। ইহা যেন এক কামারের পক্ষে ফেরেশতার সহিত এবং এক গ্রামীণ জমিদারের পক্ষে সম্রাটের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হওয়ার শামিল।
মুজাদ্দিদ আলফে ছানী (র) লিখিয়াছেন, "যুক্তিজ্ঞানই যদি এই বিষয়ে যথেষ্ট হইত, তাহা হইলে যুক্তিকেই পথপ্রদর্শকরূপে গ্রহণকারী গ্রীক দার্শনিকগণ আর পথভ্রষ্টতার তমসাচ্ছন্ন পাথারে এইভাবে হাবুডুবু খাইতে থাকিত না। তাহারা অন্যদের অপেক্ষা আল্লাহ পাককে বেশী চিনিত। অথচ তাহারাই আল্লাহ পাকের অস্তিত্ব ও গুণাবলী সংক্রান্ত বিষয়টিতে সর্বাপেক্ষা অধিক বুদ্ধিভ্রষ্ট ও অজ্ঞ।” তিনি আরও বলেন, "আমি বিস্মিত যে, এক সম্প্রদায় সেই সকল মূঢ়দের (গ্রীক দার্শনিকগণ) "দার্শনিক” আখ্যা দিতেছে। তাহারা নাকি দর্শন শাস্ত্রের উদ্ভাবক অথচ উক্ত দর্শনের সিংহভাগই অবান্তর ও ভিত্তিহীন বলিয়া সাব্যস্ত হইয়াছে। বিশেষ করিয়া তাহাদের স্রষ্টা ও অধ্যাত্ম দর্শন বা ইলাহিয়‍্যাতের পর্বে প্রায় সব বিছুই কুরআন ও সুন্নাহ্ পরিপন্থী। অতএব যাহাদের পুঁজি একমাত্র অজ্ঞতা তাহাদেরকে দার্শনিক আখ্যা দেওয়া হয় কিভাবে? ইহা ব্যঙ্গার্থে দেওয়া যাইতে পারে। যেমন একজন অন্ধকে পদ্মলোচন নাম দেওয়া হয়"। আল্লাহ পাকের নিম্নোক্ত বাণীর জ্বলন্ত উদাহরণ তাহারাই:
أَشْهِدُوا خَلْقَهُمْ سَتُكْتَبُ شَهَادَتُهُمْ وَيُسْتَلُونَ (الزخرف ١٩).
"ইহাদের সৃষ্টি কি উহারা প্রত্যক্ষ করিয়াছিল? তাহাদের উক্তি অবশ্য লিপিবদ্ধ করা হইবে এবং তাহারা জিজ্ঞাসিত হইবে" (৪৩:১৯)।
مَا أَشْهَدْتُهُمْ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَا خَلْقَ انْفُسِهِمْ وَمَا كُنْتُ مُتَّخِذَ الْمُضِلَّينَ عَضُداً (الكهف ٥١).
"আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকালে আমি তাহাদেরকে ডাকি নাই এবং তাহাদের সৃজন কালেও নয়, আমি বিভ্রান্তকারীদের সাহায্য গ্রহণ করিবার নই” (১৮: ৫১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াত মানবতার কল্যাণ ও সভ্যতার অগ্রগতির মূল উপাদান

📄 নবুওয়াত মানবতার কল্যাণ ও সভ্যতার অগ্রগতির মূল উপাদান


আম্বিয়ায়ে কিরাম শুধু আল্লাহ তা'আলার বিশুদ্ধ মা'রিফাত এবং নিশ্চিত ইলমের প্রাণকেন্দ্র নন, বরং ইহার সহিত তাঁহারা মানব সমাজকে দান করেন আরও এক অমূল্য সম্পদ। তাহা হইল মানবতার কল্যাণ ও সভ্যতার অগ্রগতি সাধন। ইহার ফলে মানুষের মধ্যে মঙ্গলের প্রতি অনুরাগ, অমঙ্গলের প্রতি বিরাগের অনুভূতি সৃষ্টি হয়। শিরকের শক্তি ও ঘাটিগুলি ধূলিস্মাৎ করিয়া মঙ্গলের পথ উন্মুক্ত করিবার অনুপ্রেরণা লাভ করে। কল্যাণমণ্ডিত বিষয়াবলীর মূল উৎস আবহমান কাল হইতে নবীগণের শিক্ষায় নিহিত রহিয়াছে। তাঁহারা নবী হিসাবে আবির্ভূত হইয়াই নিজেদের উম্মত তথা সমাজকে ভাল কাজের প্রতি অনুপ্রেরণা দিতেন এবং মন্দ কাজ হইতে বিরত থাকিবার মানসিকতা সৃষ্টির প্রয়াস চালাইতেন। ন্যায়ের পথে সহায়তা করা ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করার আদর্শকে সমাজের মানুষের মন-মস্তিস্কে প্রবিষ্ট করিয়া দিবার জন্য তাঁহারা প্রাণপণ চেষ্টা চালাইয়া গিয়াছেন। সেই অব্যাহত প্রচেষ্টার বদৌলতে মানবতা বিবর্জিত হিংস্র সমাজের মধ্য হইতে জন্মগ্রহণ করিল এমন এক জাতি যাহাদের সৎকর্মের সুঘ্রাণে সমস্ত জগৎ বিমোহিত হইয়া উঠিল। সম্মান ও মর্যাদায় তাঁহারা ফেরেশতাগণ হইতে অগ্রগামী হইয়া গেলেন। এই অনুপম আদর্শের প্রচারকদের বরকতে ধ্বংসপ্রাপ্ত মানবতার ভাগ্যে ফিরিয়া আসিল এক নূতন জীবন। মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকাশে সেই মহান সম্প্রদায় যেই আদর্শ স্থাপন করিয়াছে পৃথিবীতে ইহার কোন তুলনা নাই। আম্বিয়ায়ে কিরামের আবির্ভাব যদি না হইত তাহা হইলে মানবতার তরী তাহার জ্ঞানবিজ্ঞান, দর্শন ও কৃষ্টি-কালচার লইয়া সাগরের অতলে তলাইয়া যাইত। তখন মানব নামধারী জাতি পানাহার ব্যতীত অন্য কিছুই চিনিত না। বর্তমান বিশ্বে যাহা কিছু মহৎ মানবিক নেতৃত্ব, পবিত্রতার তীক্ষ্ণ অনুভূতি, উত্তম মানের চরিত্র প্রশিক্ষণ, বিশুদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে যত সোচ্চার ধ্বনি শ্রুত হইতেছে সেই সবের ঐতিহাসিক সূত্র জড়িত রহিয়াছে নবীকুলের শিক্ষা এবং তাঁহাদের দাওয়াত ও তাবলীগের সহিত। তাঁহাদেরই প্রচারিত শিক্ষার জ্যোতিতে আজ দুনিয়াবাসী সম্মুখের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রয়াস পাইতেছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00