📄 নবী-রাসূলগণের পরিচয়
বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী মানুষ যেইভাবে বিশেষ ধরনের মেধা ও মননশীলতা লইয়া সৃষ্টি হন, অনুরূপ নবী-রাসূলগণও বিশেষ ধরনের স্বভাব লইয়া এই ধরাধামে আবির্ভূত হন। জন্মসূত্রে প্রাপ্ত একজন কবির কথা শোনা মাত্রই বুঝা যায়, তিনি কাব্যের বিশেষ যোগ্যতা লইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। অন্যরা যতই সাধনা করুক তাহার মত কবিতা রচনা করিত সক্ষম হয় না। একজন জন্মগত বক্তা, নির্মাতা ও নেতার কাজও অনুরূপভাবে ফুটিয়া উঠে। কারণ তাহাদের সকলেই স্ব স্ব কার্যে অসাধারণ যোগ্যতা প্রকাশ করিয়া থাকেন, যাহা অন্যদের মধ্যে অনুপস্থিত থাকে। ইহা হইতে নবী-রাসূলগণের অবস্থা কিছুটা উপলব্ধি করা যায়। তাঁহাদের অন্তরে এমন সকল জিনিস উদ্ভাসিত হইয়া উঠে যাহা অন্য মানুষ কল্পনাও করিতে পারে না। নবী-রাসূলগণ এমন কিছু প্রত্যক্ষ করেন ও উহার বিবরণ দেন যাহা তাঁহারা ব্যতীত কেহই দিতে পারে না। তাঁহাদের দৃষ্টি এমন সকল সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয় যাহা হাজার বৎসরের সাধনা দ্বারাও কেহ লাভ করিতে সক্ষম হয় না। নবী বা রাসূল যাহা বলেন, আমাদের বিবেক তাহা গ্রহণ করিয়া লয় এবং সাক্ষ্য দেয় যে, নিশ্চয় ইহা সত্য। সৃষ্টিজগতকে প্রত্যক্ষ করিয়া এবং ইহার উপর গবেষণা করিয়া তাঁহার কথা সত্য বলিয়া প্রমাণিত হয়। তিনি সকল কাজে সত্য ও ভদ্রোচিত আচরণ করিয়া থাকেন, কোন সময়ই অস সত্য কথা বলেন না, অসৎ কাজ করেন না। সর্বদা পুণ্য ও সত্যবাদিতার শিক্ষা দেন এবং তিনি নিজেও সেই মুতাবিক চলেন, ইহাতে কোন বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয় না। তাঁহার কথা ও কাজে স্বীয় স্বার্থ উদ্ধারের কোন প্রয়াস দেখা যায় না। অন্যদের কল্যাণার্থে নিজের ক্ষতি সাধনেও তিনি ইতস্তত করেন না। তাঁহার সার্বিক জীবন সততা, শালীনতা, পুত-পবিত্রতা, উচ্চ ধারণা ও উন্নত মানবতার আদর্শ হইয়া থাকে। তালাশ করিলেও তাঁহার জীবনে কোন দোষত্রুটি পাওয়া যায় না। ইহা দেখিয়া পরিষ্কারভাবে জানা যায়, তিনি আল্লাহ্র সত্য নবী।
📄 নবী-রাসূলগণের মোট সংখ্যা
নবী-রাসূলগণের মোট সংখ্যা সম্পর্কে কুরআন মজীদে কোন স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় না। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلاً مِّنْ قَبْلِكَ مِنْهُمْ مَّنْ قَصَصْنَا عَلَيْكَ وَمِنْهُمْ مَّنْ لَّمْ نَقْصُصْ عَلَيْكَ.
"আমি তো তোমার পূর্বে অনেক রাসূল প্রেরণ করিয়াছিলাম। আমি তাহাদের কাহারও কাহারও কথা তোমার নিকট বিবৃত করিয়াছি এবং কাহারও কাহারও কথা তোমার নিকট বিবৃত করি নাই" (৪০: ৭৮)।
আদিকাল হইতে আল্লাহ প্রত্যেক জাতির প্রতিই তাহাদের হিদায়াতের জন্য সতর্ককারী নবী বা রাসূল পাঠাইয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে : وَإِنْ مِنْ أُمَّةٍ الأَخَلَا فِيْهَا نَذِيرٌ (৩৫ : ২৪) এবং (50 : 89) وَلِكُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولٌ
তবে এই সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহাবী আবূ যার ও আনাস ইবন মালিক (রা) হইতে হাদীছ বর্ণিত আছে। ইন্ন হিব্বান তাঁহার সহীহ গ্রন্থে এবং ইবন মারদাবিয়া তদীয় তাফসীর গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেনঃ عَنْ أَبِي ذَرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كَمِ الْأَبْنِيَاءُ قَالَ مِائَةُ أَلْفِ وَأَرْبَعَةٌ وعِشْرُونَ الْفًا قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كَمْ أُرْسِلَ مِنْهُمْ قَالَ ثَلَاثُ مِائَةٍ وَثَلَاثَةَ عَشَرَ جُمٌ غَفِيْرٌ.
"আবূ যার (রা) বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! নবীগণের সংখ্যা কত? তিনি বলিলেন: এক লক্ষ চব্বিশ হাজার। আমি আবার জিজ্ঞাসা করিলাম, হে আল্লাহ্ রাসূল! তাঁহাদের মধ্যে রাসূল ছিলেন কতজন? তিনি বলিলেন: তিন শত তেরজনের বিরাট দল"।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ اللهُ ثَمَانِيَةَ الْأَفِ نَبِيَّ أَرْبَعَةُ الْأَفِ إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ وَأَرْبَعَةُ الْأَفِ إِلَى سَائِرِ النَّاسِ.
"আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: আল্লাহ তাআলা আট হাজার নবী প্রেরণ-করিয়াছিলেন। চার হাজার নবীকে বানু ইসরাঈলের উদ্দেশে প্রেরণ করা হইয়াছিল এবং চার হাজারকে অন্যান্য মানুষের প্রতি” (আবূ ইয়ালা)।
হাফিজ আবূ বাকর আল-ইসমাঈলী সূত্রে আনাস (রা) হইতে অনুরূপ একটি হাদীছ বর্ণিত রহিয়াছে।
📄 নবী-রাসূল প্রেরণের প্রেক্ষিত
উপরিউক্ত বিষয় সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া আবশ্যক:
كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ وَأَنْزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيْمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ إِلَّا الَّذِينَ أُوتُوهُ مِنَ بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَتُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ فَهَدَى اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا لِمَا اخْتَلَفُوا فِيْهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِهِ وَاللَّهُ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ (البقرة ٢١٣).
"সমস্ত মানুষ ছিল একই উম্মত। অতঃপর আল্লাহ নবীগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেন। মানুষেরা যে বিষয়ে মতভেদ করিত তাহাদের মধ্যে সে বিষয়ে মীমাংসার জন্য তিনি তাহাদের সহিত সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেন এবং যাহাদিগকে তাহা দেওয়া হইয়াছিল, স্পষ্ট নিদর্শন তাহাদের নিকট আসিবার পরে, তাহারা শুধু পরস্পর বিদ্বেষ বশত সেই বিষয়ে বিরোধিতা করিত। যাহারা বিশ্বাস করে, তাহারা যে বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করিত, আল্লাহ তাহাদিগকে সে বিষয়ে নিজ অনুগ্রহে সত্য পথে পরিচালিত করেন। আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা সরল পথে পরিচালিত করেন" (২: ২১৩)।
'উম্মত' শব্দের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করিয়াছেন। মানুষ কখন এক উম্মতের অন্তর্ভুক্ত ছিল, সেই সম্পর্কে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। মানুষ একই উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত ছিল এই কথার ব্যাখ্যায় আল্লামা কুরতুবী বলেন, তাহারা একই ধর্মের অনুসারী ছিল। উবায় ইব্ন কা'ব ও ইবন যায়দ (র)-এর অভিমত হইল মানুষ বলিতে এখানে আদম সন্তানকে বুঝানো হইয়াছে। তাহাদের ধর্মীয় ঐক্য ছিল সেই সময় যখন আল্লাহ তা'আলা আদম সন্তানদেরকে তাহাদের পিতা আদম (আ)-এর পৃষ্ঠদেশ হইতে বাহির করিয়া তাহাদের নিকট হইতে আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকারোক্তি আদায় করিয়াছিলেন। এই সম্পর্কে ইবন আব্বাস (রা) ও কাতাদা (র)-এর অভিমত হইল, আদম (আ) ও নূহ (আ) পর্যন্ত যে দশটি যুগ অতিক্রান্ত হইয়াছিল সেই সময়কার মানুষ সঠিক ধর্মের উপর ছিল। অতঃপর তাহাদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হইলে আল্লাহ তা'আলা নূহ (আ) ও পরবর্তী কালের নবীগণকে প্রেরণ করিয়াছিলেন। ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে অপর একটি অভিমত বর্ণিত আছে যে, মানুষ নূহ (আ) অথবা ইবরাহীম (আ)-কে প্রেরণের সময় কুফরীর উপর একমত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা নূহ অথবা ইবরাহীম (আ) ও তৎপরবর্তী নবীগণকে প্রেরণ করিলেন। এই সম্পর্কে মুফতী শফী (র) তাহার তাফসীর গ্রন্থে বলেন, জমহুর তাফসীরকারগণের অভিমত হইল, মানবজাতি আল্লাহ্র একত্ববাদ এবং ঈমানের ব্যাপারে একতাবদ্ধ ছিল। অতঃপর তাহাদের মধ্যে অনৈক্যের সৃষ্টি হইলে আল্লাহ তা'আলা নবী-রাসূল প্রেরণ করেন।
অপর একটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন: رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا (النساء ١٦٥). "সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করিয়াছি, যাহাতে রাসূল আসার পর আল্লাহ্র বিরুদ্ধে মানুষের কোন অভিযোগ না থাকে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (৪: ১৬৫)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফতী শফী (র) বলেন, নবীগণকে সর্বদা আল্লাহ তাআলা এই উদ্দেশ্যে প্রেরণ করিতেন যাহাতে তাঁহারা মুমিনগণকে সুসংবাদ দান করেন এবং কাফিরদেরকে ভয় প্রদর্শন করেন। যাহাতে মানবজাতি কিয়ামতের দিন এই আপত্তি উঠাইতে না পারে যে, হে আল্লাহ! কিসে তোমার সন্তুষ্টি এবং কিসে অসন্তুষ্টি তাহা আমরা অবগত ছিলাম না। যদি আমরা জানিতাম তাহা হইলে সেই অনুসারে চলিতাম।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولاً أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوْتَ فَمِنْهُمْ مَنْ هَدَى اللَّهُ وَمِنْهُمْ مَنْ حَقَّتْ عَلَيْهِ الضَّلَالَةُ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ. "আল্লাহ্ ইবাদত করিবার ও তাগূতকে বর্জন করিবার নির্দেশ দিবার জন্য আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠাইছি। অতঃপর উহাদের কতককে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন এবং উহাদের কতকের উপর পথভ্রান্তি সাব্যস্ত হইয়াছিল। সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং দেখ, যাহারা সত্যকে মিথ্যা বলিয়াছে তাহাদের পরিণাম কী হইয়াছে” (১৬: ৩৬)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা তাবারসী বলেন, প্রতিটি জাতিতে ও সকল যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করা হইয়াছিল, যাহাতে তাঁহারা স্ব স্ব সম্প্রদায়কে বলিয়া দেন, তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর এবং শয়তান ও অন্য যাহারা ভ্রান্তির পথে আহবান করে তাহাদেরকে পরিহার কর।
আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূলগণকে মানবতার মুক্তির দূত হিসাবে পাঠাইয়াছেন, যাহাতে তাঁহারা মানবজাতিকে অজ্ঞতা, মূর্খতা ও পথভ্রষ্টতার অন্ধকার হইতে আলোর পথে ফিরাইয়া আনেন। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِأَيْتِنَا أَنْ أَخْرِجْ قَوْمَكَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوْرِ وَذَكِّرْهُمْ بِأَيَّامِ اللَّهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ (ابْرَاهِيمَ ايت-٥).
"মূসাকে আমি আমার নিদর্শনসহ প্রেরণ করিয়াছিলাম এবং বলিয়াছিলাম, তোমার সম্প্রদায়কে অন্ধকার হইতে আলোতে আনয়ন কর এবং উহাদিগকে আল্লাহ্র দিবসগুলির দ্বারা উপদেশ দাও। ইহাতে তো নিদর্শন রহিয়াছে প্রত্যেক পরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য” (১৪:৫)।
নবুওয়াত লাভের জন্য সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রয়োজন নাই। নবুওয়াত পদটিই সুমহান, ইহাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নাই। তবে উহার জন্য সামাজিকভাবে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন হইতে হইবে এমন কোন বাধ্যবধাকতা নাই। এই ক্ষেত্রে আল্লাহ্র জ্ঞান ও তাঁহার মনোনয়নই চূড়ান্ত। তদানিন্তন মক্কার কাফিররা মনে করিত, নবুওয়াত পদে আসীন হইবেন কেবল প্রভাবশালী অভিজাত বংশের কোন বিত্তবান লোক। সহায়-সম্বলহীন পিতৃ-মাতৃহারা কোন লোক নবুওয়াতের যোগ্য হইতে পরিবে না। আল-কুরআন তাহাদের এই ভ্রান্ত ধারণার উল্লেখ করিয়া সঙ্গে সঙ্গে উহার অসারতাও প্রকাশ করিয়া দিয়াছে:
وَقَالُوا لَوْلَا نُزِّلَ هذا الْقُرْآنُ عَلَى رَجُلٍ مِّنَ الْقَرْيَتَيْنِ عَظِيمٍ أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَةَ رَبِّكَ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُمْ مَعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَت لِيَتَّخِذَ بَعْضُهُمْ بَعْضًا سُخْرِيَّاً (الزخرف ٣١-٣٢).
“এবং ইহারা বলে, এই কুরআন কেন নাযিল করা হইল না দুই জনপদের কোন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির উপর? ইহারা কি তোমার প্রতিপালকের করুণা বণ্টন করে? আমিই উহাদের মধ্যে উহাদের জীবিকা বণ্টন করি, পার্থিব জীবনে এবং একজনকে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নত করি, যাহাতে একে অপরের দ্বারা কাজ করাইয়া লইতে পারে” (৪৩: ৩১-৩২)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা যামাখশারী বলেন, قریتین দ্বারা মক্কা ও তায়েফ জনপদ দুইটিকে বুঝানো হইয়াছে। তিনি أَهُمْ يَقْسِمُونَ الخ সম্পর্কে বলেন, এই স্থলে হামযা বর্ণটি অস্বীকার ও বিস্ময় প্রকাশার্থে আসিয়াছে। ইহার অর্থ হইল অবিশ্বাসীরা মনে করে, নবুওয়াত ও কল্যাণ লাভের যোগ্যতা কাহারা রাখেন সেই সম্পর্কে তাহারা সম্যক জ্ঞাত, অথচ বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহ্ এখতিয়ারাধীন। তিনিই তাঁহার পরিপূর্ণ জ্ঞান ও হিকমত দ্বারা এই পদের জন্য যোগ্যতর ব্যক্তিকে বাছাই করেন। এই সকল লোক তাহাদের পার্থিব লাভালাভ সম্পর্কে পর্যন্ত সম্যক জ্ঞান রাখে না, ফলে তাহাদের মধ্যে ধনী-নির্ধন, শক্তিমান ও দুর্বল ইত্যাদি নানান বৈষম্য পীড়িত লোক রহিয়াছে। অথচ তাহারা স্বীয় ইচ্ছা দ্বারা ইহার ব্যতিক্রম ঘটাইতে পারে নাই। তাহারা কি করিয়া ধর্মীয় ব্যাপার যাহা আল্লাহর মহান দান তাহা বণ্টন করিবার দাবিদার হয়।
মক্কার কুরায়শগণ মনে করিত যে, নবুওয়াতের জন্য জাগতিক ঐশ্বর্য ও মান-মর্যাদা অত্যন্ত জরুরী। রাসূলুল্লাহ (স) আবির্ভূত হইবার পর যখন মানুষকে আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের দিকে দাওয়াত দেন এবং শিরক ও প্রতিমা পূজা করিতে বারণ করেন তখন মক্কার কুরায়শগণ তাঁহাকে যাদুকর, উন্মাদ, কবি ইত্যাদি কুৎসামূলক আখ্যা দিতে শুরু করে। কুরআন মজীদে তাহাদের এই সকল উদ্ভট ধারণা খণ্ডন করা হয়। ফলে তাহারা নিরুত্তর হইয়া বলিতে শুরু করে, নবুওয়াত অনেক বড় উচ্চ মর্যাদা, একজন সাধারণ মানুষ তাহা কি করিয়া লাভ করিতে পারে? কুরআন যদি আল্লাহর পক্ষ হইতে অবতীর্ণ হইয়া থাকে তবে ইহা পার্থিব দৃষ্টিকোণ হইতে কোনও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী এবং সম্মানিত নেতার উপর অবতীর্ণ হওয়া উচিৎ ছিল। ইহারই প্রেক্ষিতে উপরিউক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়।
📄 নবুওয়াত হিদায়াত লাভের একমাত্র মাধ্যম
আল-কুরআন একাধিকবার ঘোষণা করিয়াছে যে, একমাত্র নবীগণ আল্লাহ্র অস্তিত্ব এবং তাঁহার গুণাবলী যথাযথ চিহ্নিতকরণের জন্য মনোনীত হইয়াছেন। আল্লাহ্র সঠিক মা'রিফাত যাহা অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতা হইতে পূত-পবিত্র কিংবা স্ববিরোধী ধারণা হইতে মুক্ত তাহা অর্জনের একমাত্র মাধ্যম হইলেন নবী-রাসূলগণ। তাঁহাদের অনুসৃত পদ্ধতিগুলি অনুসরণ ব্যতীত অন্য কোন সূত্র দ্বারা সেই মা'রিফাত লাভ করা সম্পূর্ণ দুরূহ। যুক্তি বা জ্ঞান ইহার সামান্যতম দিশা দিতে অক্ষম এবং ধীশক্তি ও মেধা এই ক্ষেত্রে অচল। জ্ঞান-বুদ্ধির অনুসন্ধান যেমন সেই পর্যন্ত পৌঁছিতে ব্যর্থ, অভিজ্ঞতার কোষাগারও তেমন সেই ক্ষেত্রে একেবারেই শূন্য। আল্লাহ পাক জান্নাতবাসী কতিপয় সত্যবাদী মানুষের উক্তি দ্বারা এই তথ্যটির বিশ্লেষণ দিতেছেন:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هَدَانَا لِهَذَا وَمَا كُنَّا لِنَهْتَدِى لَوْلا أَنْ هَدَانَا اللَّهُ (الاعراف ٤٣). "প্রশংসা আল্লাহ্রই যিনি আমাদিগকে ইহার পথ দেখাইয়াছেন, আল্লাহ আমাদিগকে পথ না দেখাইলে আমরা কখনও পথ পাইতাম না" (৭:৪৩)।
কুরআন মজীদে স্পষ্টভাবে বর্ণিত যে, নবীগণই সঠিক মারিফাত অর্জনের একমাত্র মাধ্যম এবং তাঁহারাই আল্লাহ্ত্র পরিচিতি লাভের দিশারী ছিলেন। ইরশাদ হইয়াছে:
لَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُ رَبِّنَا بِالْحَقِّ (الاعراف ٤٣). "আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ তো সত্য বাণী আনিয়াছিল" (৭:৪৩)।
এই সকল আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আম্বিয়ায়ে কিরামের আবির্ভাবের ফলেই মানুষের পক্ষে আল্লাহ্ মারিফাত অর্জন করা, তাঁহার সন্তুষ্টি এবং বিধিবিধান সম্পর্কে পরিজ্ঞাত হওয়া আর সেই মুতাবিক নিজেদেরকে সুশোভিত করা সম্ভব হইয়াছে। বুদ্ধি ও অনুভূতির ঊর্ধ্বের তথ্যাবলী অনুসন্ধানে মানুষের বিবেক ও আভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলি যে কত ক্ষীণ ও আস্থা স্থাপনের অনুপযোগী এই সম্পর্কে শায়খ আহমাদ সিরহিন্দী মুজাদ্দিদ আলফে ছানী (র) বলেন, মানুষের বুদ্ধি-বিবেক নবীগণের সহযোগিতা ও পথ প্রদর্শন ব্যতিরেকেও বিশ্বস্রষ্টার অস্তিত্ব নির্ণয় করিতে পারে, কিন্তু আল্লাহ্র অস্তিত্ব ও তাঁহার গুণাবলীর সঠিক পরিচিতি, তাঁহার পূত পবিত্রতা, নির্ভেজাল একত্ববাদ ইত্যাকার বিষয় অবগত হওয়া কস্মিন কালেও সম্ভব নয়।
আল্লাহর পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধতা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ নবীগণের অবহিতকরণ ও তালীম দানের উপর পুরাপুরি নির্ভরশীল। তাঁহারা আল্লাহ্র মারিফাতের ক্ষেত্রে দার্শনিকদের ভ্রান্তির নিদর্শনগুলি চিহ্নিত করিয়া দিয়াছেন। প্রমাণ করিয়াছেন যে, নবীগণের আবির্ভাব আল্লাহর অস্তিত্ব, গুণাবলী এবং বিধি-নিষেধের যথোচিত পরিচিতি প্রদানের একক ও অনিবার্য উপায়।
মুশরিকদের পথভ্রষ্টতা ও আল্লাহ্র সহিত শরীক করার অশোভনীয় ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন প্রসঙ্গে সূরা আস-সাফফাতে ইরশাদ হইয়াছে:
سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصْفُونَ. وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ. وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (الصفت ١٨٢-١٨٠)
"তাহারা যাহা আরোপ করে তাহা হইতে মহান ও পবিত্র আপনার প্রতিপালক। শান্তি বর্ষিত হউক রাসূলগণের প্রতি এবং প্রশংসা সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ্রই জন্য" (৩৭: ১৮০-১৮২)।
উপরিউক্ত তিনটি আয়াত যেন সুসংবদ্ধ শিকলের কড়া, যাহা পরস্পর একত্রে গাঁথা। কেননা আল্লাহ পাক স্বীয় অস্তিত্বকে মুশরিকদের অবাঞ্ছিত ও অমার্জিত উক্তি হইতে পবিত্র ঘোষণা দিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, বরং ইহার সহিত আম্বিয়ায়ে কিরাম সম্পর্কেও উল্লেখ করিয়াছেন। কারণ তাঁহারা আল্লাহ পাকের পূর্ণ পবিত্রতা ও মহত্বকে সঠিকভাবে ব্যক্ত করিয়াছেন। আল্লাহ পাক এইজন্য সপ্রশংস সালাম পাঠাইলেন তাঁহাদের উদ্দেশে। স্রষ্টার সঠিক পরিচিতি সৃষ্টির সমীপে উপস্থাপন এবং তাঁহার গুণাবলী সমুজ্জ্বল করার অনিবার্য বাহনই হইতেছে নবীগণের কণ্ঠ। তাঁহাদের আবির্ভাব বহিয়া আনিয়াছে সৃষ্টিকুলের জন্য অফুরন্ত কল্যাণ। মানবজাতির প্রতি তাঁহারা হইতেছেন আল্লাহ্ অসীম অনুগ্রহ।