📄 নবী ও রাসূলের মধ্যে পার্থক্য
প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী নবী ও রাসূলের মধ্যে সামান্য পার্থক্য রহিয়াছে। নবী শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক এবং রাসূল শব্দটি নবী-র তুলনায় সীমিত সংখ্যকদের বেলায় প্রযোজ্য। এইজন্য বলা হয়, الرسول اخص من النبي “নবী হইতে রাসূল তুলনামূলকভাবে সীমিত”। প্রত্যেক নবী রাসূলও হইয়া থাকেন কিন্তু প্রত্যেক নবীকে রাসূল বলা যায় না। মাওলানা মুহাম্মাদ মিয়া বলেন, যেই সকল নবীকে আসমানী কিতাব দেওয়া হইয়াছে তাহাদেরকে রাসূল বলা হয়।
মুফতী মুহাম্মাদ শফী (রা) বায়ানুল কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়া বলেন, নবী ও রাসূলের মধ্যে সম্পর্ক হইল কোন কোন ক্ষেত্রে দুইটির প্রত্যেকটি অপরটি অপেক্ষা ব্যাপকতর (عموم خصوص من وجه); রাসূল হইলেন যিনি উম্মতের নিকট নূতন শরীআ'ত পৌঁছাইয়া দেন, এই শরীআ'ত সংশ্লিষ্ট রাসূল কর্তৃক আনীত নূতন বিধান হউক, যেমন তাওরাত ইত্যাদি কিতাব অথবা তাহা সংশ্লিষ্ট উম্মতের নিকট নূতন বিধান বলিয়া বিবেচিত হউক, যেমন ইসমা'ঈল (আ)-এর শরীআ'ত মূলত ইবরাহীম (আ)-এর পুরাতন শরীআ'ত ছিল। তবে যেই জুরহুম গোত্রের প্রতি ইসমা'ঈল (আ) প্রেরিত হইয়াছিলেন তাহাদের নিকট ইহা ছিল নূতন বিধান। ইসমা'ঈল (আ)-এর মাধ্যমেই তাহারা ইহা প্রাপ্ত হইয়াছিল। এই অর্থে রাসূল হইবার জন্য নবী হওয়া শর্ত নহে। যেমন ফেরেশতাদেরকে রাসূল বলা হইয়াছে কিন্তু তাহারা তো নবী নহেন, এমনকি 'ঈসা (আ) কর্তৃক প্রেরীত দূতগণকে রাসূল বলা হইয়াছে। যেমন আল-কুরআনের আয়াত إِذْ جَاءَهَا الْمُرْسَلُونَ “তাহাদের নিকট তো আসিয়াছিল রাসূলগণ” (৩৬ঃ ১৩)-এ তাহাদেরকে রাসূল হিসাবে অভিহিত করা হইয়াছে কিন্তু তাহারা তো নবী ছিলেন না। নবী হইলেন যাঁহার নিকট ওহী আসিত, তিনি নূতন শরীআত কিংবা পুরাতন যে কোন প্রকার শরী'আত পৌঁছাইয়া দিবার দায়িত্বে নিয়োজিত হইয়া থাকেন। বানু ইসরাঈল সম্প্রদায়ের বেশির ভাগ নবী মূসা (আ)-এর শরী'আতের অধীন ছিলেন। এই আলোচনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, এক অর্থে রাসূল নবী হইতে ব্যাপকার্থক, অন্য অর্থে নবী শব্দটি রাসূল শব্দ হইতে ব্যাপক বলিয়া মনে হয়।
আল-কুরআনে নবী ও রাসূল শব্দদ্বয় একসাথে মূসা (আ)-এর জন্য ব্যবহৃত হইয়াছে : إِنَّهُ كَانَ مُخْلِصًا وَكَانَ رَسُولاً نَبِيًّا. "তিনি ছিলেন নিষ্ঠাপূর্ণ এবং নবী-রাসূল" (১৯:৫১)। অনুরূপভাবে ইসমাঈল (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছে ,وَكَانَ رَسُولًا نُبِيئًا “সে ছিল রাসূল ও নবী” (১৯ঃ ৫৪)।
একই ব্যক্তিকে আল-কুরআনে কোথাও শুধু নবী, আবার কোথাও শুধু রাসূল বলা হইয়াছে। আবার কোথাও শব্দ দুইটি এমনভাবে ব্যবহৃত হইয়াছে যাহা দ্বারা বুঝা যায়, শব্দ দুইটির মধ্যে পারিভাষিক পার্থক্য অবশ্যই রহিয়াছে। যেমন ইরশাদ হইয়াছে, وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ وَلَا نَبِيَّ. "আমরা তোমার পূর্বে কোন রাসূল পাঠাই নাই, না কোন নবী (২২:৫২)।"
তবে এই বর্ণনাভঙ্গির কারণে মনে হয় শব্দ দুইটির মধ্যে পার্থক্য রহিয়াছে। ইহা হইতেই তাফসীরকারদের মধ্যে এই ব্যাপারে মতপার্থক্য দেখা দিয়াছে। খুব বেশী বলিলে বলা যায়, রাসূল শব্দটি নবী অপেক্ষা বিশেষ গুণের ইঙ্গিতবহ। অন্য কথায় সকল রাসূল নবী, কিন্তু সকল নবী রাসূল নহেন। আরও বলা যায়, নবীগণের মধ্যে রাসূল শুধু সেই সকল মহান মর্যাদাবান ব্যক্তি যাঁহাদেরকে সাধারণ নবীগণের অপেক্ষা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ পদে অভিষিক্ত করা হইয়াছে। এই সম্পর্কে আবূ যার (রা)-এর একটি হাদীছও রহিয়াছে যে, নবীগণের মধ্যে রাসূল ছিলেন ৩১৩ জন।
আল্লামা ইদরীস কান্দালাবী বলেন, মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের মতে প্রত্যেক নবীই রাসূল হইয়া থাকেন। তাহারা মনে করেন, দুইটি শব্দই সমার্থবোধক। তবে জমহুর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অভিমত হইল, নবী শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক (عام) এবং রাসূল শব্দ হইল বিশেষ অর্থবোধক (خاص)। রাসূল হইলেন যিনি আল্লাহ তা'আলার তরফ হইতে কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাঁহাকে কোন স্বতন্ত্র গ্রন্থ প্রদান করা হইয়াছে কিংবা কোন স্বতন্ত্র শরী'আত দেওয়া হইয়াছে অথবা মিথ্যাবাদী এবং শত্রুদের মুকাবিলায় অকাট্য মু'জিযা দিয়া পাঠানো হইয়াছিল। পক্ষান্তরে নবী হইলেন যিনি আল্লাহর পক্ষ হইতে পয়গাম বহন করেন, তাঁহার সহিত কোন স্বতন্ত্র গ্রন্থ কিংবা শরী'আত প্রদত্ত হয় নাই।
📄 নবী-রাসূলগণের পরিচয়
বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী মানুষ যেইভাবে বিশেষ ধরনের মেধা ও মননশীলতা লইয়া সৃষ্টি হন, অনুরূপ নবী-রাসূলগণও বিশেষ ধরনের স্বভাব লইয়া এই ধরাধামে আবির্ভূত হন। জন্মসূত্রে প্রাপ্ত একজন কবির কথা শোনা মাত্রই বুঝা যায়, তিনি কাব্যের বিশেষ যোগ্যতা লইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। অন্যরা যতই সাধনা করুক তাহার মত কবিতা রচনা করিত সক্ষম হয় না। একজন জন্মগত বক্তা, নির্মাতা ও নেতার কাজও অনুরূপভাবে ফুটিয়া উঠে। কারণ তাহাদের সকলেই স্ব স্ব কার্যে অসাধারণ যোগ্যতা প্রকাশ করিয়া থাকেন, যাহা অন্যদের মধ্যে অনুপস্থিত থাকে। ইহা হইতে নবী-রাসূলগণের অবস্থা কিছুটা উপলব্ধি করা যায়। তাঁহাদের অন্তরে এমন সকল জিনিস উদ্ভাসিত হইয়া উঠে যাহা অন্য মানুষ কল্পনাও করিতে পারে না। নবী-রাসূলগণ এমন কিছু প্রত্যক্ষ করেন ও উহার বিবরণ দেন যাহা তাঁহারা ব্যতীত কেহই দিতে পারে না। তাঁহাদের দৃষ্টি এমন সকল সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয় যাহা হাজার বৎসরের সাধনা দ্বারাও কেহ লাভ করিতে সক্ষম হয় না। নবী বা রাসূল যাহা বলেন, আমাদের বিবেক তাহা গ্রহণ করিয়া লয় এবং সাক্ষ্য দেয় যে, নিশ্চয় ইহা সত্য। সৃষ্টিজগতকে প্রত্যক্ষ করিয়া এবং ইহার উপর গবেষণা করিয়া তাঁহার কথা সত্য বলিয়া প্রমাণিত হয়। তিনি সকল কাজে সত্য ও ভদ্রোচিত আচরণ করিয়া থাকেন, কোন সময়ই অস সত্য কথা বলেন না, অসৎ কাজ করেন না। সর্বদা পুণ্য ও সত্যবাদিতার শিক্ষা দেন এবং তিনি নিজেও সেই মুতাবিক চলেন, ইহাতে কোন বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয় না। তাঁহার কথা ও কাজে স্বীয় স্বার্থ উদ্ধারের কোন প্রয়াস দেখা যায় না। অন্যদের কল্যাণার্থে নিজের ক্ষতি সাধনেও তিনি ইতস্তত করেন না। তাঁহার সার্বিক জীবন সততা, শালীনতা, পুত-পবিত্রতা, উচ্চ ধারণা ও উন্নত মানবতার আদর্শ হইয়া থাকে। তালাশ করিলেও তাঁহার জীবনে কোন দোষত্রুটি পাওয়া যায় না। ইহা দেখিয়া পরিষ্কারভাবে জানা যায়, তিনি আল্লাহ্র সত্য নবী।
📄 নবী-রাসূলগণের মোট সংখ্যা
নবী-রাসূলগণের মোট সংখ্যা সম্পর্কে কুরআন মজীদে কোন স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় না। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلاً مِّنْ قَبْلِكَ مِنْهُمْ مَّنْ قَصَصْنَا عَلَيْكَ وَمِنْهُمْ مَّنْ لَّمْ نَقْصُصْ عَلَيْكَ.
"আমি তো তোমার পূর্বে অনেক রাসূল প্রেরণ করিয়াছিলাম। আমি তাহাদের কাহারও কাহারও কথা তোমার নিকট বিবৃত করিয়াছি এবং কাহারও কাহারও কথা তোমার নিকট বিবৃত করি নাই" (৪০: ৭৮)।
আদিকাল হইতে আল্লাহ প্রত্যেক জাতির প্রতিই তাহাদের হিদায়াতের জন্য সতর্ককারী নবী বা রাসূল পাঠাইয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে : وَإِنْ مِنْ أُمَّةٍ الأَخَلَا فِيْهَا نَذِيرٌ (৩৫ : ২৪) এবং (50 : 89) وَلِكُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولٌ
তবে এই সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহাবী আবূ যার ও আনাস ইবন মালিক (রা) হইতে হাদীছ বর্ণিত আছে। ইন্ন হিব্বান তাঁহার সহীহ গ্রন্থে এবং ইবন মারদাবিয়া তদীয় তাফসীর গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেনঃ عَنْ أَبِي ذَرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كَمِ الْأَبْنِيَاءُ قَالَ مِائَةُ أَلْفِ وَأَرْبَعَةٌ وعِشْرُونَ الْفًا قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كَمْ أُرْسِلَ مِنْهُمْ قَالَ ثَلَاثُ مِائَةٍ وَثَلَاثَةَ عَشَرَ جُمٌ غَفِيْرٌ.
"আবূ যার (রা) বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! নবীগণের সংখ্যা কত? তিনি বলিলেন: এক লক্ষ চব্বিশ হাজার। আমি আবার জিজ্ঞাসা করিলাম, হে আল্লাহ্ রাসূল! তাঁহাদের মধ্যে রাসূল ছিলেন কতজন? তিনি বলিলেন: তিন শত তেরজনের বিরাট দল"।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ اللهُ ثَمَانِيَةَ الْأَفِ نَبِيَّ أَرْبَعَةُ الْأَفِ إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ وَأَرْبَعَةُ الْأَفِ إِلَى سَائِرِ النَّاسِ.
"আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: আল্লাহ তাআলা আট হাজার নবী প্রেরণ-করিয়াছিলেন। চার হাজার নবীকে বানু ইসরাঈলের উদ্দেশে প্রেরণ করা হইয়াছিল এবং চার হাজারকে অন্যান্য মানুষের প্রতি” (আবূ ইয়ালা)।
হাফিজ আবূ বাকর আল-ইসমাঈলী সূত্রে আনাস (রা) হইতে অনুরূপ একটি হাদীছ বর্ণিত রহিয়াছে।
📄 নবী-রাসূল প্রেরণের প্রেক্ষিত
উপরিউক্ত বিষয় সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া আবশ্যক:
كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللَّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ وَأَنْزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيْمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ إِلَّا الَّذِينَ أُوتُوهُ مِنَ بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَتُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ فَهَدَى اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا لِمَا اخْتَلَفُوا فِيْهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِهِ وَاللَّهُ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ (البقرة ٢١٣).
"সমস্ত মানুষ ছিল একই উম্মত। অতঃপর আল্লাহ নবীগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেন। মানুষেরা যে বিষয়ে মতভেদ করিত তাহাদের মধ্যে সে বিষয়ে মীমাংসার জন্য তিনি তাহাদের সহিত সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেন এবং যাহাদিগকে তাহা দেওয়া হইয়াছিল, স্পষ্ট নিদর্শন তাহাদের নিকট আসিবার পরে, তাহারা শুধু পরস্পর বিদ্বেষ বশত সেই বিষয়ে বিরোধিতা করিত। যাহারা বিশ্বাস করে, তাহারা যে বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করিত, আল্লাহ তাহাদিগকে সে বিষয়ে নিজ অনুগ্রহে সত্য পথে পরিচালিত করেন। আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা সরল পথে পরিচালিত করেন" (২: ২১৩)।
'উম্মত' শব্দের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করিয়াছেন। মানুষ কখন এক উম্মতের অন্তর্ভুক্ত ছিল, সেই সম্পর্কে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। মানুষ একই উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত ছিল এই কথার ব্যাখ্যায় আল্লামা কুরতুবী বলেন, তাহারা একই ধর্মের অনুসারী ছিল। উবায় ইব্ন কা'ব ও ইবন যায়দ (র)-এর অভিমত হইল মানুষ বলিতে এখানে আদম সন্তানকে বুঝানো হইয়াছে। তাহাদের ধর্মীয় ঐক্য ছিল সেই সময় যখন আল্লাহ তা'আলা আদম সন্তানদেরকে তাহাদের পিতা আদম (আ)-এর পৃষ্ঠদেশ হইতে বাহির করিয়া তাহাদের নিকট হইতে আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকারোক্তি আদায় করিয়াছিলেন। এই সম্পর্কে ইবন আব্বাস (রা) ও কাতাদা (র)-এর অভিমত হইল, আদম (আ) ও নূহ (আ) পর্যন্ত যে দশটি যুগ অতিক্রান্ত হইয়াছিল সেই সময়কার মানুষ সঠিক ধর্মের উপর ছিল। অতঃপর তাহাদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হইলে আল্লাহ তা'আলা নূহ (আ) ও পরবর্তী কালের নবীগণকে প্রেরণ করিয়াছিলেন। ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে অপর একটি অভিমত বর্ণিত আছে যে, মানুষ নূহ (আ) অথবা ইবরাহীম (আ)-কে প্রেরণের সময় কুফরীর উপর একমত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা নূহ অথবা ইবরাহীম (আ) ও তৎপরবর্তী নবীগণকে প্রেরণ করিলেন। এই সম্পর্কে মুফতী শফী (র) তাহার তাফসীর গ্রন্থে বলেন, জমহুর তাফসীরকারগণের অভিমত হইল, মানবজাতি আল্লাহ্র একত্ববাদ এবং ঈমানের ব্যাপারে একতাবদ্ধ ছিল। অতঃপর তাহাদের মধ্যে অনৈক্যের সৃষ্টি হইলে আল্লাহ তা'আলা নবী-রাসূল প্রেরণ করেন।
অপর একটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন: رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا (النساء ١٦٥). "সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করিয়াছি, যাহাতে রাসূল আসার পর আল্লাহ্র বিরুদ্ধে মানুষের কোন অভিযোগ না থাকে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (৪: ১৬৫)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফতী শফী (র) বলেন, নবীগণকে সর্বদা আল্লাহ তাআলা এই উদ্দেশ্যে প্রেরণ করিতেন যাহাতে তাঁহারা মুমিনগণকে সুসংবাদ দান করেন এবং কাফিরদেরকে ভয় প্রদর্শন করেন। যাহাতে মানবজাতি কিয়ামতের দিন এই আপত্তি উঠাইতে না পারে যে, হে আল্লাহ! কিসে তোমার সন্তুষ্টি এবং কিসে অসন্তুষ্টি তাহা আমরা অবগত ছিলাম না। যদি আমরা জানিতাম তাহা হইলে সেই অনুসারে চলিতাম।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولاً أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوْتَ فَمِنْهُمْ مَنْ هَدَى اللَّهُ وَمِنْهُمْ مَنْ حَقَّتْ عَلَيْهِ الضَّلَالَةُ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ. "আল্লাহ্ ইবাদত করিবার ও তাগূতকে বর্জন করিবার নির্দেশ দিবার জন্য আমি তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠাইছি। অতঃপর উহাদের কতককে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন এবং উহাদের কতকের উপর পথভ্রান্তি সাব্যস্ত হইয়াছিল। সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং দেখ, যাহারা সত্যকে মিথ্যা বলিয়াছে তাহাদের পরিণাম কী হইয়াছে” (১৬: ৩৬)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা তাবারসী বলেন, প্রতিটি জাতিতে ও সকল যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করা হইয়াছিল, যাহাতে তাঁহারা স্ব স্ব সম্প্রদায়কে বলিয়া দেন, তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর এবং শয়তান ও অন্য যাহারা ভ্রান্তির পথে আহবান করে তাহাদেরকে পরিহার কর।
আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূলগণকে মানবতার মুক্তির দূত হিসাবে পাঠাইয়াছেন, যাহাতে তাঁহারা মানবজাতিকে অজ্ঞতা, মূর্খতা ও পথভ্রষ্টতার অন্ধকার হইতে আলোর পথে ফিরাইয়া আনেন। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِأَيْتِنَا أَنْ أَخْرِجْ قَوْمَكَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوْرِ وَذَكِّرْهُمْ بِأَيَّامِ اللَّهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ (ابْرَاهِيمَ ايت-٥).
"মূসাকে আমি আমার নিদর্শনসহ প্রেরণ করিয়াছিলাম এবং বলিয়াছিলাম, তোমার সম্প্রদায়কে অন্ধকার হইতে আলোতে আনয়ন কর এবং উহাদিগকে আল্লাহ্র দিবসগুলির দ্বারা উপদেশ দাও। ইহাতে তো নিদর্শন রহিয়াছে প্রত্যেক পরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য” (১৪:৫)।
নবুওয়াত লাভের জন্য সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রয়োজন নাই। নবুওয়াত পদটিই সুমহান, ইহাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নাই। তবে উহার জন্য সামাজিকভাবে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন হইতে হইবে এমন কোন বাধ্যবধাকতা নাই। এই ক্ষেত্রে আল্লাহ্র জ্ঞান ও তাঁহার মনোনয়নই চূড়ান্ত। তদানিন্তন মক্কার কাফিররা মনে করিত, নবুওয়াত পদে আসীন হইবেন কেবল প্রভাবশালী অভিজাত বংশের কোন বিত্তবান লোক। সহায়-সম্বলহীন পিতৃ-মাতৃহারা কোন লোক নবুওয়াতের যোগ্য হইতে পরিবে না। আল-কুরআন তাহাদের এই ভ্রান্ত ধারণার উল্লেখ করিয়া সঙ্গে সঙ্গে উহার অসারতাও প্রকাশ করিয়া দিয়াছে:
وَقَالُوا لَوْلَا نُزِّلَ هذا الْقُرْآنُ عَلَى رَجُلٍ مِّنَ الْقَرْيَتَيْنِ عَظِيمٍ أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَةَ رَبِّكَ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُمْ مَعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَت لِيَتَّخِذَ بَعْضُهُمْ بَعْضًا سُخْرِيَّاً (الزخرف ٣١-٣٢).
“এবং ইহারা বলে, এই কুরআন কেন নাযিল করা হইল না দুই জনপদের কোন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির উপর? ইহারা কি তোমার প্রতিপালকের করুণা বণ্টন করে? আমিই উহাদের মধ্যে উহাদের জীবিকা বণ্টন করি, পার্থিব জীবনে এবং একজনকে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নত করি, যাহাতে একে অপরের দ্বারা কাজ করাইয়া লইতে পারে” (৪৩: ৩১-৩২)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা যামাখশারী বলেন, قریتین দ্বারা মক্কা ও তায়েফ জনপদ দুইটিকে বুঝানো হইয়াছে। তিনি أَهُمْ يَقْسِمُونَ الخ সম্পর্কে বলেন, এই স্থলে হামযা বর্ণটি অস্বীকার ও বিস্ময় প্রকাশার্থে আসিয়াছে। ইহার অর্থ হইল অবিশ্বাসীরা মনে করে, নবুওয়াত ও কল্যাণ লাভের যোগ্যতা কাহারা রাখেন সেই সম্পর্কে তাহারা সম্যক জ্ঞাত, অথচ বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহ্ এখতিয়ারাধীন। তিনিই তাঁহার পরিপূর্ণ জ্ঞান ও হিকমত দ্বারা এই পদের জন্য যোগ্যতর ব্যক্তিকে বাছাই করেন। এই সকল লোক তাহাদের পার্থিব লাভালাভ সম্পর্কে পর্যন্ত সম্যক জ্ঞান রাখে না, ফলে তাহাদের মধ্যে ধনী-নির্ধন, শক্তিমান ও দুর্বল ইত্যাদি নানান বৈষম্য পীড়িত লোক রহিয়াছে। অথচ তাহারা স্বীয় ইচ্ছা দ্বারা ইহার ব্যতিক্রম ঘটাইতে পারে নাই। তাহারা কি করিয়া ধর্মীয় ব্যাপার যাহা আল্লাহর মহান দান তাহা বণ্টন করিবার দাবিদার হয়।
মক্কার কুরায়শগণ মনে করিত যে, নবুওয়াতের জন্য জাগতিক ঐশ্বর্য ও মান-মর্যাদা অত্যন্ত জরুরী। রাসূলুল্লাহ (স) আবির্ভূত হইবার পর যখন মানুষকে আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের দিকে দাওয়াত দেন এবং শিরক ও প্রতিমা পূজা করিতে বারণ করেন তখন মক্কার কুরায়শগণ তাঁহাকে যাদুকর, উন্মাদ, কবি ইত্যাদি কুৎসামূলক আখ্যা দিতে শুরু করে। কুরআন মজীদে তাহাদের এই সকল উদ্ভট ধারণা খণ্ডন করা হয়। ফলে তাহারা নিরুত্তর হইয়া বলিতে শুরু করে, নবুওয়াত অনেক বড় উচ্চ মর্যাদা, একজন সাধারণ মানুষ তাহা কি করিয়া লাভ করিতে পারে? কুরআন যদি আল্লাহর পক্ষ হইতে অবতীর্ণ হইয়া থাকে তবে ইহা পার্থিব দৃষ্টিকোণ হইতে কোনও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী এবং সম্মানিত নেতার উপর অবতীর্ণ হওয়া উচিৎ ছিল। ইহারই প্রেক্ষিতে উপরিউক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়।