📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবী

📄 নবী


নবুওয়াতের সুমহান মর্যাদায় যাঁহাকে ভূষিত করা হইয়াছে তাঁহাকে নবী বলা হয়। আল্লামা রাগিব আল-ইসফাহানী বলেন, নবী শব্দটি فَعَيْلٌ -এর ওজনে فَاعل অর্থাৎ কতৃবাচক বিশেষ্য অর্থে ব্যবহৃত হইতে পারে। উহার সমর্থনে আল-কুরআনের নিম্নোক্ত দুইটি আয়াত উপস্থাপন করা যায় : قُلْ أَوْنَبِّئُكُمْ (৩:১৫); نَبِّئُ عِبَادِی (১৫:৪৯)।
ইহাও হইতে পারে যে, فَعَيْلٌ -এর ওজনে مَفْعُولُ বা কর্মবাচক অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। এই অর্থে নিম্নোক্ত আয়াতটি উদাহরণ স্বরূপ উপস্থাপন করা যায় : نَبَّانِيَ الْعَلِيمُ الْخَبِيرُ (৬৬ : ৩) : হে فعيل مفعول -এর অর্থে ব্যবহৃত হয় ইহার বহু প্রমাণ রহিয়াছে, যেমন قتيل -এর অর্থ مَقْتُولٌ এবং جريح-এর অর্থ مجروح ইত্যাদি। উচ্চারণে নবী শব্দের সহিত হামযা বর্ণ যুক্ত হয় না। আরবী ব্যাকরণবিদগণের মতে নবী শব্দের মূলে হামযা ছিল। অনেক আলিমের মত হইল, নবী শব্দটি নাবওয়াত (نبؤة) ধাতুমূল হইতে গৃহীত, যাহার অর্থ হইল উচ্চ মর্যাদা। এই অভিমত অনুযায়ী নবী নামকরণের যৌক্তিকতা এই যে, নবী হইলেন জগতের সকল মানুষ হইতে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। নবী শব্দের হামযাবিহীন উচ্চারণ হামযাযুক্ত উচ্চারণ হইতে অধিক গ্রহণযোগ্য। কারণ সকল সংবাদবাহকের মান উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন হয় না, কিন্তু সকল নবীই উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন। এমনকি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) হামযাযুক্ত উচ্চারণকে অস্বীকার করিয়াছেন বলিয়া বর্ণনা পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি বিদ্বেষ মনোভাবাপন্ন এক লোক আসিয়া তাঁহাকে يا نبي الله বলিয়া আহবান করিলে তিনি তাহার আহবান প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিলেন, لَسْتُ بِنَبِيِّ اللَّهِ وَلَكِنْ نَبِيُّ اللَّهِ
“আমি আল্লাহ্র সংবাদ বাহক মাত্র নই, বরং আল্লাহ কর্তৃক সম্মানে ভূষিত” (রাগিব আল-ইসফাহানী, আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন, প্রাগুক্ত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবী ও রাসূলের মধ্যে পার্থক্য

📄 নবী ও রাসূলের মধ্যে পার্থক্য


প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী নবী ও রাসূলের মধ্যে সামান্য পার্থক্য রহিয়াছে। নবী শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক এবং রাসূল শব্দটি নবী-র তুলনায় সীমিত সংখ্যকদের বেলায় প্রযোজ্য। এইজন্য বলা হয়, الرسول اخص من النبي “নবী হইতে রাসূল তুলনামূলকভাবে সীমিত”। প্রত্যেক নবী রাসূলও হইয়া থাকেন কিন্তু প্রত্যেক নবীকে রাসূল বলা যায় না। মাওলানা মুহাম্মাদ মিয়া বলেন, যেই সকল নবীকে আসমানী কিতাব দেওয়া হইয়াছে তাহাদেরকে রাসূল বলা হয়।
মুফতী মুহাম্মাদ শফী (রা) বায়ানুল কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়া বলেন, নবী ও রাসূলের মধ্যে সম্পর্ক হইল কোন কোন ক্ষেত্রে দুইটির প্রত্যেকটি অপরটি অপেক্ষা ব্যাপকতর (عموم خصوص من وجه); রাসূল হইলেন যিনি উম্মতের নিকট নূতন শরীআ'ত পৌঁছাইয়া দেন, এই শরীআ'ত সংশ্লিষ্ট রাসূল কর্তৃক আনীত নূতন বিধান হউক, যেমন তাওরাত ইত্যাদি কিতাব অথবা তাহা সংশ্লিষ্ট উম্মতের নিকট নূতন বিধান বলিয়া বিবেচিত হউক, যেমন ইসমা'ঈল (আ)-এর শরীআ'ত মূলত ইবরাহীম (আ)-এর পুরাতন শরীআ'ত ছিল। তবে যেই জুরহুম গোত্রের প্রতি ইসমা'ঈল (আ) প্রেরিত হইয়াছিলেন তাহাদের নিকট ইহা ছিল নূতন বিধান। ইসমা'ঈল (আ)-এর মাধ্যমেই তাহারা ইহা প্রাপ্ত হইয়াছিল। এই অর্থে রাসূল হইবার জন্য নবী হওয়া শর্ত নহে। যেমন ফেরেশতাদেরকে রাসূল বলা হইয়াছে কিন্তু তাহারা তো নবী নহেন, এমনকি 'ঈসা (আ) কর্তৃক প্রেরীত দূতগণকে রাসূল বলা হইয়াছে। যেমন আল-কুরআনের আয়াত إِذْ جَاءَهَا الْمُرْسَلُونَ “তাহাদের নিকট তো আসিয়াছিল রাসূলগণ” (৩৬ঃ ১৩)-এ তাহাদেরকে রাসূল হিসাবে অভিহিত করা হইয়াছে কিন্তু তাহারা তো নবী ছিলেন না। নবী হইলেন যাঁহার নিকট ওহী আসিত, তিনি নূতন শরীআত কিংবা পুরাতন যে কোন প্রকার শরী'আত পৌঁছাইয়া দিবার দায়িত্বে নিয়োজিত হইয়া থাকেন। বানু ইসরাঈল সম্প্রদায়ের বেশির ভাগ নবী মূসা (আ)-এর শরী'আতের অধীন ছিলেন। এই আলোচনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, এক অর্থে রাসূল নবী হইতে ব্যাপকার্থক, অন্য অর্থে নবী শব্দটি রাসূল শব্দ হইতে ব্যাপক বলিয়া মনে হয়।
আল-কুরআনে নবী ও রাসূল শব্দদ্বয় একসাথে মূসা (আ)-এর জন্য ব্যবহৃত হইয়াছে : إِنَّهُ كَانَ مُخْلِصًا وَكَانَ رَسُولاً نَبِيًّا. "তিনি ছিলেন নিষ্ঠাপূর্ণ এবং নবী-রাসূল" (১৯:৫১)। অনুরূপভাবে ইসমাঈল (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছে ,وَكَانَ رَسُولًا نُبِيئًا “সে ছিল রাসূল ও নবী” (১৯ঃ ৫৪)।
একই ব্যক্তিকে আল-কুরআনে কোথাও শুধু নবী, আবার কোথাও শুধু রাসূল বলা হইয়াছে। আবার কোথাও শব্দ দুইটি এমনভাবে ব্যবহৃত হইয়াছে যাহা দ্বারা বুঝা যায়, শব্দ দুইটির মধ্যে পারিভাষিক পার্থক্য অবশ্যই রহিয়াছে। যেমন ইরশাদ হইয়াছে, وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ وَلَا نَبِيَّ. "আমরা তোমার পূর্বে কোন রাসূল পাঠাই নাই, না কোন নবী (২২:৫২)।"
তবে এই বর্ণনাভঙ্গির কারণে মনে হয় শব্দ দুইটির মধ্যে পার্থক্য রহিয়াছে। ইহা হইতেই তাফসীরকারদের মধ্যে এই ব্যাপারে মতপার্থক্য দেখা দিয়াছে। খুব বেশী বলিলে বলা যায়, রাসূল শব্দটি নবী অপেক্ষা বিশেষ গুণের ইঙ্গিতবহ। অন্য কথায় সকল রাসূল নবী, কিন্তু সকল নবী রাসূল নহেন। আরও বলা যায়, নবীগণের মধ্যে রাসূল শুধু সেই সকল মহান মর্যাদাবান ব্যক্তি যাঁহাদেরকে সাধারণ নবীগণের অপেক্ষা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ পদে অভিষিক্ত করা হইয়াছে। এই সম্পর্কে আবূ যার (রা)-এর একটি হাদীছও রহিয়াছে যে, নবীগণের মধ্যে রাসূল ছিলেন ৩১৩ জন।
আল্লামা ইদরীস কান্দালাবী বলেন, মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের মতে প্রত্যেক নবীই রাসূল হইয়া থাকেন। তাহারা মনে করেন, দুইটি শব্দই সমার্থবোধক। তবে জমহুর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অভিমত হইল, নবী শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক (عام) এবং রাসূল শব্দ হইল বিশেষ অর্থবোধক (خاص)। রাসূল হইলেন যিনি আল্লাহ তা'আলার তরফ হইতে কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাঁহাকে কোন স্বতন্ত্র গ্রন্থ প্রদান করা হইয়াছে কিংবা কোন স্বতন্ত্র শরী'আত দেওয়া হইয়াছে অথবা মিথ্যাবাদী এবং শত্রুদের মুকাবিলায় অকাট্য মু'জিযা দিয়া পাঠানো হইয়াছিল। পক্ষান্তরে নবী হইলেন যিনি আল্লাহর পক্ষ হইতে পয়গাম বহন করেন, তাঁহার সহিত কোন স্বতন্ত্র গ্রন্থ কিংবা শরী'আত প্রদত্ত হয় নাই।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবী-রাসূলগণের পরিচয়

📄 নবী-রাসূলগণের পরিচয়


বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী মানুষ যেইভাবে বিশেষ ধরনের মেধা ও মননশীলতা লইয়া সৃষ্টি হন, অনুরূপ নবী-রাসূলগণও বিশেষ ধরনের স্বভাব লইয়া এই ধরাধামে আবির্ভূত হন। জন্মসূত্রে প্রাপ্ত একজন কবির কথা শোনা মাত্রই বুঝা যায়, তিনি কাব্যের বিশেষ যোগ্যতা লইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। অন্যরা যতই সাধনা করুক তাহার মত কবিতা রচনা করিত সক্ষম হয় না। একজন জন্মগত বক্তা, নির্মাতা ও নেতার কাজও অনুরূপভাবে ফুটিয়া উঠে। কারণ তাহাদের সকলেই স্ব স্ব কার্যে অসাধারণ যোগ্যতা প্রকাশ করিয়া থাকেন, যাহা অন্যদের মধ্যে অনুপস্থিত থাকে। ইহা হইতে নবী-রাসূলগণের অবস্থা কিছুটা উপলব্ধি করা যায়। তাঁহাদের অন্তরে এমন সকল জিনিস উদ্ভাসিত হইয়া উঠে যাহা অন্য মানুষ কল্পনাও করিতে পারে না। নবী-রাসূলগণ এমন কিছু প্রত্যক্ষ করেন ও উহার বিবরণ দেন যাহা তাঁহারা ব্যতীত কেহই দিতে পারে না। তাঁহাদের দৃষ্টি এমন সকল সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয় যাহা হাজার বৎসরের সাধনা দ্বারাও কেহ লাভ করিতে সক্ষম হয় না। নবী বা রাসূল যাহা বলেন, আমাদের বিবেক তাহা গ্রহণ করিয়া লয় এবং সাক্ষ্য দেয় যে, নিশ্চয় ইহা সত্য। সৃষ্টিজগতকে প্রত্যক্ষ করিয়া এবং ইহার উপর গবেষণা করিয়া তাঁহার কথা সত্য বলিয়া প্রমাণিত হয়। তিনি সকল কাজে সত্য ও ভদ্রোচিত আচরণ করিয়া থাকেন, কোন সময়ই অস সত্য কথা বলেন না, অসৎ কাজ করেন না। সর্বদা পুণ্য ও সত্যবাদিতার শিক্ষা দেন এবং তিনি নিজেও সেই মুতাবিক চলেন, ইহাতে কোন বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয় না। তাঁহার কথা ও কাজে স্বীয় স্বার্থ উদ্ধারের কোন প্রয়াস দেখা যায় না। অন্যদের কল্যাণার্থে নিজের ক্ষতি সাধনেও তিনি ইতস্তত করেন না। তাঁহার সার্বিক জীবন সততা, শালীনতা, পুত-পবিত্রতা, উচ্চ ধারণা ও উন্নত মানবতার আদর্শ হইয়া থাকে। তালাশ করিলেও তাঁহার জীবনে কোন দোষত্রুটি পাওয়া যায় না। ইহা দেখিয়া পরিষ্কারভাবে জানা যায়, তিনি আল্লাহ্র সত্য নবী।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবী-রাসূলগণের মোট সংখ্যা

📄 নবী-রাসূলগণের মোট সংখ্যা


নবী-রাসূলগণের মোট সংখ্যা সম্পর্কে কুরআন মজীদে কোন স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় না। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلاً مِّنْ قَبْلِكَ مِنْهُمْ مَّنْ قَصَصْنَا عَلَيْكَ وَمِنْهُمْ مَّنْ لَّمْ نَقْصُصْ عَلَيْكَ.
"আমি তো তোমার পূর্বে অনেক রাসূল প্রেরণ করিয়াছিলাম। আমি তাহাদের কাহারও কাহারও কথা তোমার নিকট বিবৃত করিয়াছি এবং কাহারও কাহারও কথা তোমার নিকট বিবৃত করি নাই" (৪০: ৭৮)।
আদিকাল হইতে আল্লাহ প্রত্যেক জাতির প্রতিই তাহাদের হিদায়াতের জন্য সতর্ককারী নবী বা রাসূল পাঠাইয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে : وَإِنْ مِنْ أُمَّةٍ الأَخَلَا فِيْهَا نَذِيرٌ (৩৫ : ২৪) এবং (50 : 89) وَلِكُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولٌ
তবে এই সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহাবী আবূ যার ও আনাস ইবন মালিক (রা) হইতে হাদীছ বর্ণিত আছে। ইন্ন হিব্বান তাঁহার সহীহ গ্রন্থে এবং ইবন মারদাবিয়া তদীয় তাফসীর গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেনঃ عَنْ أَبِي ذَرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كَمِ الْأَبْنِيَاءُ قَالَ مِائَةُ أَلْفِ وَأَرْبَعَةٌ وعِشْرُونَ الْفًا قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ كَمْ أُرْسِلَ مِنْهُمْ قَالَ ثَلَاثُ مِائَةٍ وَثَلَاثَةَ عَشَرَ جُمٌ غَفِيْرٌ.
"আবূ যার (রা) বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! নবীগণের সংখ্যা কত? তিনি বলিলেন: এক লক্ষ চব্বিশ হাজার। আমি আবার জিজ্ঞাসা করিলাম, হে আল্লাহ্ রাসূল! তাঁহাদের মধ্যে রাসূল ছিলেন কতজন? তিনি বলিলেন: তিন শত তেরজনের বিরাট দল"।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ اللهُ ثَمَانِيَةَ الْأَفِ نَبِيَّ أَرْبَعَةُ الْأَفِ إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ وَأَرْبَعَةُ الْأَفِ إِلَى سَائِرِ النَّاسِ.
"আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: আল্লাহ তাআলা আট হাজার নবী প্রেরণ-করিয়াছিলেন। চার হাজার নবীকে বানু ইসরাঈলের উদ্দেশে প্রেরণ করা হইয়াছিল এবং চার হাজারকে অন্যান্য মানুষের প্রতি” (আবূ ইয়ালা)।
হাফিজ আবূ বাকর আল-ইসমাঈলী সূত্রে আনাস (রা) হইতে অনুরূপ একটি হাদীছ বর্ণিত রহিয়াছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00