📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বাভাষ

📄 নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বাভাষ


রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে নানাবিধ নিদর্শন প্রকাশ পাইয়াছিল। আরবের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ইয়াহুদী পণ্ডিত ও খৃস্টান ধর্মযাজক এবং গণকরা একজন রাসূলের আগমন অত্যাসন্ন বলিয়া অভিমত প্রকাশ করিয়াছিলেন। ইয়াহুদী ও খৃস্টান ধর্মের কিছু পুস্তকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আগমনের যেইসব নিদর্শন উল্লিখিত হইয়াছিল, সেইগুলিই একে একে সত্য হইতে লাগিল। আবার তাহাদের নিকট বিদ্যমান পূর্বেকার নবীগণের বাণীও তাহারা যাচাই করিয়া বুঝিতে পারিল যে, সর্বশেষ নবী শীঘ্রই আবির্ভূত হইবেন। গণকদের নিকটও অবাধ্য জিনেরা আগমন করিয়া এই ব্যাপারে আভাস দিতে লাগিল এবং তাহাদেরকে চিন্তাক্লিষ্ট করিতে থাকিল। যদিও সাধারণ আরবগণ এই বিষয়ে তত বেশী জ্ঞাত ছিল না। কিঞ্চিত জানিলেও তাহারা ইহার প্রতি তেমন গুরুত্বারোপ করিত না। ক্রমে ক্রমে এই বিষয়ে অনেকের মধ্যে জল্পনা-কল্পনা শুরু হইল। তাহারা নবীর আবির্ভাবের জন্য অধীর অপেক্ষায় প্রহর গুণিতে থাকিল।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) একদা যায়দ ইব্‌ন আমর ইব্‌ন নুফায়ল-এর সাক্ষাত পাইলেন। তখনও নবী করীম (স)-এর উপর ওহী নাযিল হয় নাই। নবী করীম (স)-কে দেখিতে পাইয়া তিনি একটি গোশতের থলে আগাইয়া দিলেন। নবী করীম (স) তাহা হইতে খাদ্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাইলেন এবং যায়দ ইব্‌ন আমরকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, তোমরা তোমাদের মূর্তির নামে যেইসব প্রাণী কুরবানী কর, সেইসব গোশত আমি ভক্ষণ করিতে পারি না। শুধুমাত্র আল্লাহ্ নামে যেই প্রাণী যবেহ করা হয়, তাহাই আমি গ্রহণ করিয়া থাকি। যায়দ ইবন 'আমর কুরায়শগণের যবেহের ব্যাপারে পূর্ব হইতেই দ্বিমত পোষণ করিতেন ও বলিতেন, বকরীকে আল্লাহ তা'আলাই সৃষ্টি করিয়াছেন, ইহার জন্য তিনিই আকাশ হইতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, আবার যমিন হইতে উদ্ভিদ উদগত করেন। তাহা হইলে কেন ও কিভাবে তোমরা ইহাকে তাঁহার নাম ছাড়া অন্য কাহারও নামে কিংবা কোন মূর্তির নামে যবেহ করিয়া থাক? এইভাবে তিনি তাহাদের কার্যকলাপের প্রতিবাদ করিতেন এবং সত্য বিষয়কে প্রকাশ করিতে তৎপর থাকিতেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের পূর্বাভাষ ক্রমান্বয়ে প্রকাশিত হইতেছিল। এই প্রসঙ্গে ইব্‌ন ইসহাক (র) বর্ণনা করিয়াছেন, "যায়দ ইব্‌ন আমর ইব্‌ন নুফায়ল দীনে ইবরাহীম (আ)-এর সন্ধানে সিরিয়ার উদ্দেশে বাহির হইলেন। তিনি মনে করিয়াছিলেন যে, সিরিয়ার পাদ্রীদের নিকট জিজ্ঞাসা করিয়া এই বিষয়ে সঠিক সন্ধান লাভ করিতে পারিবেন। তিনি 'বালকা' নামক স্থানে জনৈক প্রসিদ্ধ পাদ্রীর শরণাপন্ন হইলেন। ইহার পর তিনি দীনে ইবরাহীমের বিষয়ে তাহার নিকট জিজ্ঞাসা করিলেন। উত্তরে পাদ্রী বলিলেন, আজ আমি তোমাকে ঐ দিনের যথাযথ পরিচয় দিতে পারিব না। আবার কেহ তাহা তোমাকে শিখাইয়াও দিতে পারিবে না। তবে তোমার সৌভাগ্য যে, তুমি নবী করীম (স)-এর যুগ লাভ করিবে এবং তোমার শহর (মক্কা মুকাররমা) হইতে তিনি আবির্ভূত হইবেন। তিনি হযরত ইবরাহীম (আ)-এর দীনেরই পুন প্রচার করিবেন। তিনি (যায়দ ইবন আমর) ইয়াহুদী ও খৃষ্ট ধর্মও চর্চা করিতেন, তবে ইহাতে তিনি সন্তুষ্ট হইতে পারিতেছিলেন না। এইরূপ পরিস্থিতিতে তিনি ঐ পাদ্রীর উপদেশে নব উদ্দীপনা লাভ করিলেন এবং মক্কা শরীফের উদ্দেশে রওয়ানা হইলেন, কিন্তু পথিমধ্যে শত্রুর অকস্মাৎ আক্রমণের শিকার হইয়া নিহত হইলেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। একবার রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার বাল্যসঙ্গী হযরত আবূ বাক্স (রা) ব্যবসায়ের উদ্দেশে সিরিয়া গমনের ইচ্ছা করিলেন। এক সময় তাঁহারা একটি গাছের ছায়ায় অপেক্ষা করিতেছিলেন। তখন আবূ বাক্স (রা) "বাহীরা" (বুহায়রা) নামক জনৈক পাদ্রীর পরিচয় পাইলেন। পাদ্রী তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ঐ ব্যক্তি কে যিনি গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতেছেন? আবূ বাক্স (রা) উত্তর দিলেন, তিনি হইলেন মুহাম্মাদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব। পাদ্রী বলিলেন, এই গাছের নিচে হযরত ঈসা (আ)-এর পরে হযরত মুহাম্মাদ (স) ছাড়া আর কেহই বিশ্রাম করিতে পারে না। আল্লাহ্‌ শপথ! তিনিই নবী (স) হইবেন। হযরত আবূ বক্র (রা)-এর অন্তরে তখন হইতেই এই বিশ্বাস সুদৃঢ় হইল। নবী করীম (স) নবুওয়াত প্রাপ্তির পর ইসলামের দাওয়াত দিলে সর্বপ্রথম তিনি ঈমান আনিলেন।
প্রাক-ইসলামী যুগের প্রখ্যাত বক্তা কুস্স ইন্ন সাঈদ (মৃ. ৬০০ খৃ.)-এর বক্তব্যে নবী করীম (স)-এর নবুওয়াতের পূর্বাভাষ পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, কুস্ ইব্‌ন সাঈদ একদা আরবের প্রসিদ্ধ উকায মেলায় সমবেত জনতার উদ্দেশে বলিলেন, এই প্রান্ত হইতে অচিরেই তোমাদের নিকট ব্যাপকভাবে সত্য প্রকাশিত হইবে (তিনি স্বীয় হাত দ্বারা মক্কা শরীফের দিকে ইঙ্গিত করিলেন)। সমবেত শ্রোতাদের মধ্য হইতে কয়েকজন বলিল, ঐ সত্য কি? তিনি বলিলেন, (আমাদের পূর্বপুরুষ) লুয়ায়্যি ইব্‌ন গালিব-এর বংশধরদের মধ্যে সর্বাধিক পূত ও বিচক্ষণ এক মহামানব তোমাদিগকে সত্যের আহ্বান জানাইবেন। তিনি চিরশান্তির আবাস ও অশেষ নি'মাতেরও সন্ধান দিবেন। তিনি তোমাদেরকে সত্যের দিকে ডাকিলে তোমরা তাঁহার ডাকে সাড়া দিও। আমি যদি তাঁহার সাক্ষাত পাইতাম, তবে অবশ্যই প্রথম ব্যক্তি হিসাবে তাঁহার অনুসরণ করিতাম।
এভাবে নবী করীম (স)-এর নবুওয়াতের পূর্বাভাষ নানাভাবে প্রকাশিত হইতে থাকে, এমনকি মূর্তি হইতেও ইহার সত্যতা প্রচারিত হইয়াছিল। এই প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন সা'ঈদ আল-হুযালী (রা) তাহার পিতা সাঈদা আল-হুযালী হইতে রিওয়ায়াত করিয়াছেন, তিনি বলিয়াছেন, "আমি একদা মূর্তির ভিতর হইতে একটি আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। কে যেন ডাকিয়া বলিতেছে, 'জিনদের প্রতারণা' শেষ হইয়াছে। আমাদের প্রতি জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড নিক্ষিপ্ত হইয়াছে। নিশ্চয় 'আহমاد' নামের নবী আগমন করিতেছেন।” আমি বলিলাম, আমি বুঝিতে পারিয়াছি। তাহার পর আমি বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করিতে লাগিলাম। পথে এক লোকের সহিত আমার সাক্ষাত হইল। তিনি আল্লাহ্র রাসূল (স)-এর আবির্ভাবের সংবাদ জানাইলেন।
হযরত সালামা ইবন সাল্লাম (রা) বলিয়াছেন, আমার জনৈক ইয়াহুদী প্রতিবেশী ছিল। সে একদা আমাকে জানাইল, একজন নবী অচিরেই এই শহর হইতে আবির্ভূত হইবেন। সে তাঁহার হাত দ্বারা মক্কা শরীফের দিকে ইঙ্গিত করিল। তখন উপস্থিত লোকজন জিজ্ঞাসা করিল, আচ্ছা! কখন তাঁহাকে আমরা দেখিতে পাইব? বর্ণনাকারী বলিলেন, সে তখন আমার প্রতি তাকাইল। আমি ছিলাম উপস্থিত সকলের মধ্যে কনিষ্ঠ। সে বলিল, এই ছেলেটি যখন যৌবনে পৌঁছিবে তখন তাঁহাকে পাইবে। সালামা ইব্‌ন সাল্লাম (রা) বলিয়াছেন, আল্লাহ্র শপথ! ইহার পর একদিন ও এক রাত অতিক্রান্ত না হইতেই তিনি নবুওয়াতের ঘোষণা দিলেন। আমরা আনন্দে তাঁহার প্রতি ঈমান আনিলাম অথচ বর্ণনাকারী লোকটি উগ্রতা ও হিংসাবশত তাঁহাকে পরিত্যাগ করিল।
হযরত আসমা বিনত আবূ বাক্ (রা) বলিয়াছেন, একদা আমি যায়দ ইব্‌ন আমরকে কা'বা শরীফের দেয়ালে হেলান দিয়া উপবিষ্ট অবস্থায় দেখিতে পাইলাম। তিনি কুরায়শগণকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিতেছিলেন, "ওহে কুরায়শ সম্প্রদায়! অদ্য প্রত্যুষে ইবরাহীম (আ)-এর প্রদর্শিত দীনের উপর শুধুমাত্র আমিই অটল রহিয়াছি।" অতঃপর আরও বলিলেন, হে আল্লাহ! আমি যদি জানিতে পারিতাম কোন মুখাবয়ব আপনার নিকট অতি প্রিয়, তাহা হইলে তাহার সহিত আমি আপনার ইবাদত করিতাম। কিন্তু আমি তো সেই সম্পর্কে কিছুই জানি না। তাহার পর তিনি তাহার বাহনে আরোহণ করিয়া সিজদা করিলেন। যায়দ ইব্‌ন আমর উদার প্রকৃতির লোক ছিলেন। জাহিলী যুগে কোন মেয়েকে জীবন্ত কবরস্থ করিতে দেখিলে তিনি অর্থব্যয়ে তাহাকে ক্রয় করিয়া মুক্ত করিয়া দিতেন। স্বীয় কন্যাকে জীবন্ত কবরস্থ করার মনোভাব কোন লোকের মধ্যে দেখিলে তাহাকে বলিতেন, "তুমি তাহাকে হত্যা করিও না, বরং আমি তোমাকে তাহার যথাযথ বিনিময় প্রদান করিতেছি, তাহার বদলে মেয়েটি আমাকে প্রদান কর।" এইভাবে তিনি মেয়ে গ্রহণ করিতেন। তাহার পর মেয়েটি যখন অস্থিরতা প্রদর্শন করিত, তিনি তাহার পিতাকে বলিতেন, তুমি চাহিলে তাহাকে তোমার নিকট ফিরাইয়া দিব, আর তুমি চাহিলে তাহার পূর্ণ বিনিময় দিয়াই গ্রহণ করিব। নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বলগ্নে তথা ওহী অবতরণের পূর্বে হইতেই নবী করীম (স) প্রায়ই চিন্তামগ্ন হইয়া পড়িতেন। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলার বাণী: وَوَجَدَكَ ضَالاً فَهَدَى "আর তিনি (আল্লাহ) আপনাকে পথ সম্পর্কে অনবহিত পাইয়াছেন, অতঃপর পথের সন্ধান দিলেন" (৯৩ঃ ৭)।
এই প্রসঙ্গে ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযী (র) উল্লেখ করিয়াছেন, নবী করীম (স)-কে যখন হালীমা (রা)-এর তত্ত্বাবধানে রাখা হইয়াছিল তখন হালীমা (রা) একদা তাঁহাকে নিয়া তাঁহার দাদা আবদুল মুত্তালিব-এর নিকট আসিতেছিলেন। পথিমধ্যে "হুবল” মূর্তির নিকট তিনি (হালীমা) কিছু বলিতে ইচ্ছা করিলেন, তখন অকস্মাৎ মূর্তিটি ছিটকাইয়া পড়িল। তিনি তাহার ভিতর হইতে স্পষ্ট কিছু কথা উচ্চারিত হইতে শুনিলেন: انما هلاكنا بيد هذا الصبى "নিশ্চয় আমাদের ধ্বংস এই শিশুর হাতেই নিহিত রহিয়াছে" (আত-তাফসীরুল- কাবীর, ৩২খ., পৃ. ৩১৭)।
হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা) বলিয়াছেন, আল্লাহর রাসূল (স)-এর প্রতি সর্বপ্রথম যে ওহী নাযিল হইতেছিল অর্থাৎ নবুওয়াতের পূর্বাভাষস্বরূপ যাহা প্রকাশিত হইয়াছিল, তাহা ছিল নিদ্রায় সুস্বপ্ন, যাহা সত্য সত্যই বাস্তবে পরিণত হইত, এমনকি নবী করীম (স) যে স্বপ্ন দেখিতেন, তাহা প্রভাতের সূর্য রশ্মির ন্যায় সত্য হিসাবে প্রতিভাত হইত। অতঃপর তাঁহার নিকট একাকীত্ব পছন্দনীয় হইল। তিনি হেরা গুহায় একাকী রাত্রি যাপন করিতেন। (যাওয়ার সময়) পাথেয় নিতেন, আবার তাহা ফুরাইয়া গেলে বাড়ীতে খাদীজা (রা)-এর নিকট হইতে পূর্বানুরূপ পাথেয় লইয়া আসিতেন। এইভাবে একদিন তাঁহার নিকট ওহী নাযিল হইল।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের পূর্বাভাষস্বরূপ ঘটনাবলীর বিবরণ শুনিয়া ওয়ারাকা ইব্‌ন নাওফাল বলিয়াছিলেন, "আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি অবশ্যই সেই ব্যক্তি, যাঁহার সম্পর্কে আল-মাসীহ ইব্‌ন মারইয়াম (আ) সুসংবাদ প্রদান করিয়াছিলেন। আপনার অবতারিত সেই ফেরেশতা জিবরাঈল (আ) আগমন করিয়াছেন, যিনি মূসা (আ)-এর নিকটও আগমন করিয়াছিলেন। সন্দেহ নাই যে, আপনিই আল্লাহ্ (সর্বশেষ) রাসূল, সত্য নবী"।
হযরত জাবির ইবন সামুরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিয়াছেন, আমি মক্কার ঐ সকল পাথরকে এখনও ভালভাবেই চিনি, যেগুলি নবুওয়াত প্রকাশের পূর্বে আমাকে সালাম করিত। হযরত আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) বলেন, আমি নবী করীম (স)-এর সহিত একদা মক্কা শরীফের পার্শ্বে হাঁটিতেছিলাম। হাঁটিতে হাঁটিতে আমরা মক্কা শরীফের বাহিরে পাহাড় ও গাছপালা ঘেরা স্থানে আসিয়া পড়িলাম। নবী করীম (স) যে কোন গাছের বা পাথরের নিকট দিয়া অতিক্রম করিতেন উহা তাঁহাকে "আস-সালামু আলায়কা ইয়া রাসূলাল্লাহ" বলিয়া সালাম করিত। এই প্রসঙ্গে হযরত বারা (রা) বলিয়াছেন, নবী করীম (স) নবুওয়াতের প্রথম অবস্থায় কোন প্রয়োজনে কখনও লোকচক্ষুর অন্তরালে বিজন মরু প্রান্তরে গমন করিতেন, সেথায় কোন গৃহ দেখিতেন না, বরং নিকটস্থ টিলা-উপত্যকায় বিচরণ করিতেন। তিনি সেথায় কোন পাথর ও গাছের পার্শ্ব দিয়া গমন করিলে উহারা তাঁহাকে সালাম করিত। নবী করীম (স) তখন ডানে, বামে ও পিছনে তাকাইতেন, কিন্তু তিনি সেথায় কাহাকেও দেখিতেন না।
নবী করীম (স)-এর নবুওয়াতের তথ্যাদি প্রসঙ্গে ইকরিমা হইতে বর্ণিত হইয়াছে, কুরায়শ সম্প্রদায়ের একদল লোক একদা সমুদ্রের তীর দিয়া বাণিজ্যের উদ্দেশে গমন করিতেছিল। তখন তাহারা জুরহুম গোত্রের একজন জ্ঞানী বৃদ্ধ ব্যক্তির সাক্ষাত পাইল। তিনি বলিলেন, তোমরা কাহারা? তাহারা বলিল, আমরা মক্কাবাসী কুরায়শ সম্প্রদায়ের লোক। জ্ঞানী ব্যক্তি তাহাদিগকে বলিলেন, "রাত্রিতে এমন একটি তারকার উদয় হইয়াছে, যাহা ইতোপূর্বে উদিত হয় নাই। নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে এক নবীর আবির্ভাব এই রাত্রেই ঘটিয়াছে।" কাফেলার লোকজন পরবর্তীতে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করিয়া হিসাবের মাধ্যমে স্পষ্টত বুঝিল যে, ঐ রাত্রেই নবী করীম (স) নবুওওয়াত লাভ করিয়াছেন।
নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বলগ্নে রাসূলুল্লাহ (স) প্রায়ই হেরা গুহায় অবস্থান করিতেন। সেখানেই তাঁহার নবুওয়াতের সূচনা হইয়াছিল। হেরা গুহাতে নবী করীম (স)-এর যাতায়াত ক্রমশ বৃদ্ধি পাইতে থাকিল। সেইখানে যাতায়াতের পথ ছিল বন্ধুর। কিন্তু গুহাটি পবিত্র কা'বা গৃহ বরাবর হওয়ায় নবী করীম (স) কায়মনোবাক্যে ইবাদতের জন্য ইহাকেই পছন্দ করিলেন। এই গুহাটি মক্কা শরীফের পূর্বদিকে কা'বা শরীফ হইতে তিন মাইল দূরে অবস্থিত।
এই প্রসঙ্গে আবূ মায়সারা (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্ব হইতে কিছুদিন যাবত নবী করীম (স) একাকী বিচরণকালে কিছু ধ্বনি শুনিতে পাইতেন। হঠাৎ কেহ যেন বলিতেছে, 'হে মুহাম্মাদ!' তিনি ঐরকম আওয়াজ শুনিয়া ভীত হইতেন এবং দ্রুত অন্যত্র সরিয়া যাইতেন। একদা খাদীজা (রা)-কে ঐ বিষয়টি অবহিত করিলেন এবং বলিলেন, "খাদীজা! আমি ভীত হইয়া পড়িয়াছি যে, পাছে আমার সুস্থ জ্ঞানে কিছু বিভ্রাট ঘটে কিনা। একাকী বিচরণকালে উন্মুক্ত স্থান হইতে হঠাৎ আমি কথোপকথন শুনিতে পাই, অথচ কিছুই দেখিতে পাই না। তখন আমি দ্রুত অন্যত্র চলিয়া যাই।” খাদীজা (রা) তাহা শুনিয়া বলিলেন, "আল্লাহ আপনাকে কখনও ঐরূপ অবস্থায় ফেলিবেন না"।
তাহার পর খাদীজা (রা) উক্ত বিষয়ে আবূ বাকর (রা)-এর সহিত আলোচনা করিলেন। তিনি জাহিলী যুগ হইতেই নবী করীম (স)-এর বিশ্বস্ত সহচর ছিলেন। আবূ বাকর (রা) বিষয়টি অবগত হইয়া নবী করীম (স)-কে ওয়ারাকা ইবন নাওফাল-এর নিকট নিয়া যান। ওয়ারাকা ইবন নাওফাল বলিলেন, কি ব্যাপার, কি মনে করিয়া আসিলেন? তখন আবূ বাকর (রা)-কে খাদীজা (রা) যেই তথ্যসমূহ জানাইয়াছিলেন, তিনি সেইগুলি বলিলেন। ওয়ারাকা সব শুনিয়া নবী করীম (স)-কে বলিলেন, আপনি কিছু দেখিয়াছেন কি? নবী করীম (স) বলিলেন, না, বরং ধ্বনি শুনিতে পাইয়াছি। একাকী চলাচলের সময় আমি কিছু ধ্বনি শুনিতে পাই, তবে কাহাকেও দেখি না। এইরূপ অবস্থায় আমি দ্রুত চলিয়া আসি। তখন কেহ যেন আমার নিকট হইতেই আমাকে ডাকিতেছে এইরূপ মনে হয়। ওয়ারাকা বলিলেন, আপনি 'আওয়াজ শুনিয়া ভীত অবস্থায় চলিয়া আসিবেন না, বরং আওয়াজ শুনিলে স্থির থাকিবেন ও ধৈর্য সহকারে যাহা বলা হয় তাহা শুনিবেন। ইহার পর নবী করীম (স) একাকী অবস্থায় শুনিতে পাইলেন, হে মুহাম্মাদ! তিনি উত্তরে বলিলেন, লাব্বায়ক (আমি হাজির আছি)। আগন্তুক বলিলেন, আপনি বলুন:
أَشْهَدُ أَنْ لا اله الا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْ لُهُ. "আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নাই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিতেছি যে, নিশ্চয় মুহাম্মাদ তাঁহার বান্দা ও রাসূল"।
তাহার পর (আগন্তুক) আরো বলিলেন, আপনি বলুন, الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (সকল প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য)। এমনকি সূরা আল-ফাতিহা-এর শেষ অবধি তিনি পাঠ করিলেন।
হযরত জাবির ইবন ‘আবদুল্লাহ (রা) বলিয়াছেন, রাসুলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিয়াছেন, আমি ‘হেরা’ গুহায় একমাস অবস্থান করিয়াছিলাম। আমি যখন পাথয় সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নিচে আসিতেছিলাম, তখন কেহ আমাকে ডাকিতেছে ইহা বুঝিতে পারিলাম। তাহাতে আমি নিশ্চিত হইবার জন্য আমার ডানে তাকাইলাম, কিন্তু কিছুই দেখিতে পাইলাম না। আমার বাম পার্শ্বে তাকাইলাম, তাহাতেও আমি কিছুই দেখিতে পাইলাম না। তাহার পর আমার পিছনে তাকাইলাম, সেখানেও কাহাকেও দেখিলাম না। সর্বশেষে আমার মাথার উপর তাকাইলাম। সেই দিকে কিছু দেখিতে পাইলাম, কিন্তু সেইখানে আমি স্থির থাকিতে পারিলাম না। বাড়ীতে আসিয়া খাদীজাকে বলিলাম, আমাকে কম্বল দ্বারা ঢাকিয়া দাও।
মূসা ইবন উকবা (র) ইবন শিহাব যুহরী (R) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, নবী করীম (স) সর্বপ্রথম ওহী হিসাবে যাহা পাইতেন, তাহা ছিল নিদ্রায় স্বপ্ন অবলোকন। ক্রমে তাহা তাঁহার নিকট কঠিন মনে হইল। ফলে তিনি খাদীজা (রা)-কে বিষয়টি অবহিত করিলেন। তিনি শুনিয়া বলিলেন, অত্যন্ত শুভ সংবাদপূর্ণ স্বপ্ন! নিশ্চয় আল্লাহ আপনার ব্যাপারে মঙ্গল ব্যতীত কিছুই করিবেন না। ইহার পর খাদীজা (রা) কাজে চলিয়া গেলেন। নবী করীম (স) প্রয়োজনে প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং খাদীজা (রা)-কে সংবাদ জানাইলেন যে, তিনি দেখিয়াছেন, তাঁহার বক্ষ মুবারক বিদীর্ণ করা হইয়াছে, তাহার পর তাঁহাকে পবিত্র করা হইয়াছে, ধৌত করা হইয়াছে, ইহার পর পূর্বে যেমন ছিল, তেমনভাবে রাখিয়া দেওয়া হইয়াছে। খাদীজা (R) এই সংবাদ শুনিয়া বলিলেন, আল্লাহ্‌র শপথ! ইহা তো খুবই সুসংবাদ।
তাহার পর নবী করীম (স)-এর সহিত জিবরাঈল (আ)-এর সাক্ষাত ঘটে। এমতাবস্থায় তিনি মক্কা শরীফের সর্বোচ্চ স্থানে ছিলেন (অর্থাৎ পাহাড়ের চূড়ায় ছিলেন)। হযরত জিবরাঈল (আ) তাঁহাকে মহান এক বৈঠাকে উপবেশন করাইলেন। সেইখানে ইয়াকুত ও মুক্তাপূর্ণ কোমল কাপড়ের উপর সযত্নে আমাকে উপবেশন করাইলেন। ইহার পর জিবরাঈল (আ) নবী করীম (স)-কে নবুওয়াতের সুসংবাদ প্রদান করিলেন। তখন নবী করীম (স) অত্যন্ত প্রশান্তি অনুভব করিলেন। তখন সূরা ‘আল-আলাক’-এর প্রথম অংশ পাঠ করাইলেন। নবী করীম (স) রিসালাত লাভ করিলেন এবং প্রত্যাবর্তন করিলেন। তিনি যেই সকল গাছ বা পাথর অতিক্রম করিলেন উহারা তাঁহাকে সালাম করিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াতের হাকীকত ও মর্যাদা

📄 নবুওয়াতের হাকীকত ও মর্যাদা


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


এই ধরাধামে আল্লাহ্র শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তথা আশরাফুল মাখলুকাত হইল মানুষ। সৃষ্টির সেরা এই মানবজাতির উপর মহান আল্লাহ কত যে নিয়ামত ও অনুগ্রহ দান করিয়াছেন তাহার কোন হিসাব নাই। ইরশাদ হইয়াছে:
وَأَنْ تَعُدُّوا نِعْمَةَ الله لا تُحْصُوهَا (النحل - ١٨). "তোমরা আল্লাহ্র অনুগ্রহ গণনা করিলে উহার সংখ্যা নির্ণয় করিতে পারিবে না" (১৬:১৮)।
করুণা নিধান আল্লাহ্ এই নিয়ামতরাজির মধ্যে সর্বোত্তম নিয়ামত হইল তাঁহার বান্দাগণের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণার্থে নবুওয়াত ও রিসালাতের ক্রমধারা চালু রাখা। বান্দাদের যখনই হিদায়াতের প্রয়োজন হইত তখন আল্লাহ তা'আলা তাহাদের মধ্য হইতেই একজনকে নবী বা রাসূল হিসাবে প্রেরণ করিতেন। মানবজাতিকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শনই ছিল রাসূলগণের প্রধান দায়িত্ব। তাঁহারা কেবল আল্লাহ্ ওহী বা নির্দেশমত পরিচালিত হইতেন, যদিও তাঁহারা মানবিক প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। নবী-রাসূল প্রেরণের এই ক্রমধারা আদিকাল হইতে চালু ছিল। সর্বপ্রথম নবী ছিলেন আদি মানব আদম (আ)। তিনি একাধারে সর্বপ্রথম মানব এবং নবী ছিলেন। নবী প্রেরণের এই ক্রমধারা হাজার হাজার বৎসর অবধি চালু ছিল। ইহার সমাপ্তি ঘটে আমাদের প্রিয় নবী দুই জাহানের সরদার রহমাতুল্লিল আলামীন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাধ্যমে। তাঁহার নবুওয়াত কিয়ামত কাল পর্যন্ত চালু থাকিবে। তিনি হইলেন সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, তাঁহার উম্মতও হইল সর্বোত্তম উম্মত। তাঁহার আনীত বিধান দুনিয়ার বুকে যত দিন চালু থাকিবে দুনিয়াও তত দিন কায়েম থাকিবে। এই বিধান বিস্মৃত হইয়া গেলে দুনিয়ার ধ্বংসের ঘণ্টা বাজিয়া উঠিবে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শাব্দিক বিশ্লেষণ

📄 শাব্দিক বিশ্লেষণ


নবুওয়াত শব্দের আভিধানিক অর্থ সম্পর্কে প্রধানত দুইটি অভিমত পাওয়া যায়। এই দুইটি মতের উদ্ভব হইয়াছে ইহার শব্দমূল (ماخذ) সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকার ফলে। একদল অভিধানবেত্তা মনে করেন, নবুওয়াত শব্দটি (ن-بء) ধাতু হইতে নির্গত হইয়াছে, যাহার অর্থ হইল সংবাদ প্রদান, পয়গাম বহন। অপর দলের অভিমত হইল, নবুওয়াত শব্দটি النبوة এবং النَّبَاوَةُ অর্থাৎ ন-ব-ও ধাতু হইতে নির্গত, যাহার অর্থ হইল উচ্চ ভূমি, উচ্চ স্থান। প্রথম অভিমত পোষণকারীদের যুক্তি হইল নবুওয়াত এমন একটি বিশেষ মর্যাদা যাহার মাধ্যমে আল্লাহ সম্পর্কে সংবাদ অবহিত হওয়া যায়। দ্বিতীয় অভিমত পোষণকারীদের যুক্তি হইল, নবুওয়াত সর্বাধিক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পদ হওয়ায় উহাকে নবুওয়াত বলিয়া অভিহিত করা হয়। যাঁহারা নবুওয়াতের সুমহান মর্যাদা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন তাঁহাদিগকে নবী বলা হয়।
নবুওয়াতের পারিভার্ষিক অর্থঃ আল্লামা রাগিব ইসফাহানী বলেন, النُّبُوَّةُ سَفَارَةٌ بَيْنَ اللهِ وَبَيْنَ ذَوِي الْعُقُولِ مِنْ عِبَادِهِ لَا زَاحَةِ عِلَّتِهِمْ فِي أَمْرِ مَعَادِهِمْ وَمَعَاشِهِمْ.
"নবুওয়াত হইল আল্লাহ ও তাঁহার বিবেক সম্পন্ন বান্দাগণের মধ্যে মধ্যস্থতা বা বার্তা বহন করিবার একটি ব্যবস্থা, যাহার উদ্দেশ্য হইল বান্দাদের ইহকালীন ও পরকালীন অকল্যাণ-অমঙ্গল দূরীভূত করা"।
নবুওয়াত এমন একটি মর্যাদা যাহা কোন ব্যক্তির আকাঙ্খা, দক্ষতা, অধ্যবসায় ও বিচক্ষণতা দ্বারা অর্জিত হয় না, বরং ইহা সম্পূর্ণ আল্লাহ্র ইচ্ছাধীন। তিনি যাহাকে ইচ্ছা এই মহান মর্যাদা দান করিয়া থাকেন। ইবন হাজার আল-আসকালানীর নিম্নোক্ত সংজ্ঞা দ্বারা উহা অত্যন্ত সুন্দরভাবে পরিস্ফুটিত হইয়া উঠে: النُّبُوَّةُ نِعْمَةٌ يَمُنُّ بِهَا عَلَى مَنْ يَشَاءُ لَا يَبْلُغُهَا أَحَدٌ بِعِلْمِهِ وَلَا كَشْفِهِ وَلَا يَسْتَحِقُهَا بِاسْتِعْدَادِ وَلَا يَتَهُ وَمَعْنَاهَا الْحَقِيقِيُّ شَرْعًا مَنْ حَصَلَتْ لَهُ النُّبُوَّةُ وَلَيْسَتْ رَاجِعَةٌ إِلَى جِسْمِ النَّبِيِّ وَلَا إِلَى عِرْضِ مِنْ أَعْرَاضِهِ بَلْ وَلَا إِلى عِلْمِهِ بِكَوْنِهِ نَبِيًّا بَلِ الْمَرْجِعُ إِلَى أَعْلَامِ اللَّهِ لَهُ بِأَنِّي نَبَأْتُكَ أَوْ جَعَلْتُكَ نَبِيًّا وَعَلَى هذا فَلَا تَبْطُلُ بِالْمَوْتِ كَمَا لَا تَبْطُلُ بِالنَّوْمِ وَالْغَفْلَةِ.
"নবুওয়াত আল্লাহ তা'আলার এমন একটি নি'মাত যাহা দ্বারা তিনি যাহাকে ইচ্ছা ভূষিত করেন। এই স্তরে কেহ স্বীয় জ্ঞান ও দিব্যদৃষ্টি দ্বারা পৌঁছিতে পারে না। আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের সামর্থ্য অর্জনের মাধ্যমেও কেহ তাহা লাভ করার যোগ্য হয় না। শরী'আতের পরিভাষায় তিনিই নবী যিনি নবুওয়াত প্রাপ্ত হইয়াছেন। নবুওয়াত নবীর দেহ ও তাঁহার অনুসঙ্গিক গুণাবলীর প্রতি আরোপিত হয় না, এমনকি নবী হিসাবে তাঁহার 'ইল্মের প্রতিও নয়। ইহার ভিত্তি হইল আল্লাহ কর্তৃক জানাইয়া দেওয়া যে, আমি তোমাকে নবী হিসাবে মনোনীত করিলাম। যেইভাবে নিদ্রা ও তন্দ্রার কারণে নবুওয়াত বাতিল হয় না অনুরূপ নবী ইন্তিকাল করিলেও তাঁহার নবুওয়াত বাতিল হয় না"।
নবুওয়াত অর্জনযোগ্য বিষয় নহে। এই সম্পর্কে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:
وَاللَّهُ يَخْتَصُّ بِرَحْمَتِهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ العظيم (البقرة - ١٠٥).
"অথচ আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা নিজ রহমতের জন্য বিশেষভাবে মনোনীত করেন এবং আল্লাহ মহাঅনুগ্রহশীল" (২:১০৫)।
এই আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে আলী ইব্‌ন আবু তালিব (রা) বলেন, يَخْتَصٌ بِرَحْمَتِهِ -এর অর্থ হইল بنبوته অর্থাৎ আল্লাহ্ যাহাকে ইচ্ছা তাহাকে নবুওয়াত দানের দ্বারা বিশেষিত করেন। এই ব্যাখ্যা হইতে বুঝা যায় যে, নবুওয়াত দান করা একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। উত্তরাধিকার সূত্রে ইহা প্রাপ্তব্য নহে। ক্ষমতা ও আধিপত্য দ্বারাও ইহা অর্জনযোগ্য নহে। আল্লাহ তা'আলা যাহাকে এই মর্যাদায় মনোনীত করেন কেবল তিনিই ইহা দ্বারা ভূষিত হন। ইরশাদ হইয়াছে:
اللهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلَائِكَةِ رُسُلاً وَمِنَ النَّاسِ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ. (لحج - ٧٥)
"আল্লাহ ফেরেশতাদের মধ্য হইতে মনোনীত করেন বাণীবাহক এবং মানুষের মধ্য হইতেও; আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা" (২২ঃ ৭৫)।
স্বীয় ইচ্ছায় আল্লাহ তা'আলা নবী মনোনীত করিবার আরও একটি প্রমাণ হইল নিম্নোক্ত আয়াত:
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعُلَمِينَ.
"নিশ্চয় আল্লাহ আদমকে, নূহকে ও ইবরাহীমের বংশধর এবং 'ইমরানের বংশধরকে বিশ্বজগতে মনোনীত করিয়াছেন" (৩ঃ ৩৩)।
অন্যত্র ইরশাদ হইয়াছে:
وَأَنَّهُمْ عِنْدَنَا لَمِنَ الْمُصْطَفَيْنَ الْأَخْيَارِ. (ص - ٤٧)
"অবশ্যই তাহারা ছিল আমার মনোনীত উত্তম বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত” (৩৮:৪৭)।
কাফিররা আমাদের নবী মুহাম্মাদ (স)-এর নবুওয়াতের উপর ঈমান আনিতে অস্বীকৃতি জানাইবার প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করিয়াছেন:
اللَّهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ (الانعام - ١٢٤)
"আল্লাহ তাঁহার রিসালাতের ভার কাহার উপর অর্পণ করিবেন তাহা তিনিই ভাল জানেন" (৬:১২৪)।
আল্লাহ তা'আলা নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা ও গুণাবলী জন্মগত ও স্বভাবগতভাবে নবীগণের মধ্যে সৃষ্টি করিয়া দেন। তিনি নিজ ইচ্ছায় যাঁহাকে এই দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত মনে করেন, তাঁহাকেই এই মর্যাদায় ভূষিত করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00