📄 সংযোজন
সুনানে তিরমিযীতে হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা) হইতে বর্ণিত হাদীছের শেষে আছে, বাহীরার পরামর্শ অনুযায়ী আবূ তালিব হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে আবূ বকর ও বিলালের সহিত মক্কায় প্রেরণ করেন। মক্কা রওয়ানা হওয়ার সময় বাহীরা পথে তাহাদের আহারের জন্য কিছু রুটি ও যয়তুন সাথে দিয়াছিলেন।
ইবন ইসহাকের সীরাতসহ অন্যান্য প্রায় সকল সীরাত গ্রন্থেই এই বিষয়টি কিছু পরিবর্তনসহ বর্ণিত হইয়াছে। ইহাদের মধ্যে সুনানে তিরমিযীর রিওয়ায়াতটিই সর্বোত্তম। কিন্তু কোন কোন মুহাদ্দিছ ও ঐতিহাসিক এবং সীরাত লেখক তিরমিযীর এই বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্য নয় বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন। কারণগুলি নিম্নরূপ:
(১) এই হাদীছের বর্ণনাকারীদের মধ্যে একজন হইলেন আবদুর রহমান ইব্ন গাযওয়ান। কোন কোন মুহাদ্দিছ তাঁহার মতামত গ্রহণযোগ্য নয় বলিয়া অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন।
(২) এই বর্ণনায় উল্লেখ করা হইয়াছে যে, আবূ তালিব কিশোর মুহাম্মাদ (স)-কে আবূ বকর ও বিলালের সহিত মক্কায় পাঠাইয়াছিলেন। কিন্তু ঐ সময় আবু বকরের বয়স ছিল ১০ বৎসর এবং বিলালের তখন জন্মই হয় নাই।
(৩) বাহীরার বর্ণনা অনুযায়ী বৃক্ষ ও পাথর নবী করীম (স)-কে সম্মানসূচক সিজদা করিয়াছিল। কিন্তু এই দৃশ্য বাহীরা ব্যতীত অন্য কেহ প্রত্যক্ষ করে নাই। ঘটনা যদি সত্যই হয় তাহা হইলে রাসূলুল্লাহ (স) নিজে অথবা অন্য কেহ দেখিতে পাইলেন না কেন? বৃক্ষ ও প্রস্তরের পক্ষে হযরতকে সম্মানসূচক সিজদা করা এবং সিজদার জন্য ভূপতিত হওয়া ইসলামের মূল শিক্ষা ও সত্যের বিপরীত কথা।
(৪) বাণিজ্য কাফেলার সহিত যে সমস্ত কুরায়শ বণিক ছিলেন তাহাদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন, কিন্তু কেহই এই ঘটনা বর্ণনা করেন নাই।
যে সমস্ত উলামায়ে কিরাম ও হাদীছ বিশারদ এই হাদীছকে গ্রহণযোগ্য বলিয়া মনে করিয়াছেন, তাঁহাদের যুক্তি ও প্রমাণ নিম্নে উপস্থাপন করা হইল:
(১) ইব্ন্ হাজার আস্কালানী তাঁহার আল-ইসাবা গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন যে, এই হাদীছের বর্ণনাকারী সকলেই বিশ্বস্ত এবং সকলেই সহীহ্ বুখারীর বর্ণনাকারী। আবদুর রহমান ইব্ন গাযওয়ানও বুখারীর রাবীগণে অন্তর্ভুক্ত। হাদীছ বিশারদদের মধ্যে অনেকেই আবদুর রহমানকে বিশ্বস্ত (সিকাহ্) বলিয়াছেন। এই হাদীছের শেষ বাক্য وَبَعَثَ أَبُو بَكْرٍ مَعَهُ অর্থাৎ নবী করীম (স)-এর সহিত আবূ বকর ও বিলালকে প্রেরণ করিয়াছেন, হয়ত কোন বর্ণনাকারী অন্য হাদীছের অংশ ভুলক্রমে এই হাদীছের সঙ্গে সংযুক্ত করিয়া দিয়াছেন। সুতরাং ইহা বলা যায় যে, এই বর্ণনায় আবূ বকর ও বিলালকে প্রেরণের ঘটনা মুদরাজ (مدرج) এবং একটি বাক্য مدرج হওয়ার কারণে সম্পূর্ণ হাদীছকে দুর্বল (ضعیف) বলা যায় না। এই বাক্য বাদ দিয়া অবশিষ্ট সম্পূর্ণ হাদীছ সহীহ্। ইমাম তিরমিযী (র) তাঁহার নিজস্ব পরিভাষায় হাদীছটিকে হাসান ও গরীব পর্যায়ভুক্ত করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন, আমরা কেবল উপরিউক্ত সনদসূত্রে হাদীছটি সম্পর্কে জানিতে পারিয়াছি। ইমাম ইব্ন কাছীরের মতে ইহা একটি মুরসাল হাদীস অর্থাৎ আবূ মূসা (রা)-র নিজস্ব বিবরণ।
(২) এই হাদীছের সর্বশেষ বর্ণনাকারী হযরত আবূ মূসা আশ্'আরী (রা) ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাহাবী। প্রত্যেক সাহাবীই হইলেন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য। তিনি হয়ত স্বয়ং নবী করীম (স)-এর নিকট অথবা অন্য কোন সাহাবীর নিকট ঘটনাটি শুনিয়াছেন। যদি কোন সাহাবী এইরূপ ঘটনা বর্ণনা করেন, যাহাতে তিনি অংশগ্রহণ করেন নাই, তাহা হইলে ঐ হাদীছকে মুহাদ্দিছগণের পরিভাষায় সাহাবীর মুরসাল (مرسل صحابی) বলা হয়, যাহা মুহাদ্দিছগণের নিকট সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণীয় ও নির্ভরযোগ্য। যদি তাহা না নয়, তবে হযরত আয়েশা (রা) এবং অন্যান্য কম বয়স্ক সাহাবাদের ঐ সমস্ত বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য হইত, যাহাতে তাঁহারা অংশগ্রহণ করেন নাই অথবা যাহা প্রত্যক্ষ করেন নাই। হাদীছ সহীহ্ হওয়ার জন্য ইহাই যথেষ্ট যে, সাহাবী পর্যন্ত যে সমস্ত বর্ণনাকারী রহিয়াছেন, তাঁহারা সকলেই বিশ্বস্ত। সাহাবায়ে কিরাম নবী করীম (স) সম্পর্কে যাহা কিছু বর্ণনা করিবেন, তাহা অবশ্যই কোন সূত্রে অথবা সরাসরি তাঁহার নিকট হইতে শুনিয়া থাকিবেন। আল্লামা সুয়ূতী (র) বলিয়াছেন, বুখারী ও মুসলিম শরীফে এই ধরনের অনেক হাদীছ বর্ণনা করা হইয়াছে।
এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, হযরত আবূ মূসা আশ্'আরী (রা), মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক এবং এই হাদীছের অন্যান্য বর্ণনাকারিগণ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের সনদ পরস্পর বর্ণনা না করার কারণ এই যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে এই ঘটনাটি সাহাবা, তাবিঈন এবং তাবে তাবিঈনের মধ্যে এত প্রসিদ্ধ ছিল যে, হযরত আবূ মূসা আশ্'আরী (রা) এবং ইবন ইসহাক প্রমুখ বর্ণনাকারী ইহার সনদ বর্ণনার কোন প্রয়োজন মনে করেন নাই। পরবর্তী যুগে হয়ত তাতারী ফিতনা অথবা অন্য কোন কারণে ইহার সনদ হ্রাস পাইতে পারে।
(৩) শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দিহলাবী (র) বলেন, নবী করীম (স)-কে বৃক্ষ ও পাথরের সম্মানসূচক সিজদা করার বিষয়টি ছিল বাহ্যিক সম্মান প্রদর্শনসূচক সিজদা হইতে আলাদা। সুতরাং বস্তুজগতের সহিত যাহাদের সম্পর্ক, তাহাদের নিকট ইহা অসম্ভব মনে হইতে পারে, কিন্তু যাঁহারা আধ্যাত্মিক জগতের সহিত সম্পর্ক রাখেন, তাঁহাদের জন্য ইহা মোটেই অসম্ভব নহে। একত্ববাদী, সত্যপন্থী, পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থে বিশ্বাসী ধর্মযাজক বাহীরা একজন আধ্যাত্মিক সাধক ছিলেন। এইজন্য তিনি অন্তরচক্ষু দ্বারা বৃক্ষ ও পাথরের সম্মান প্রদর্শনসূচক সিজদা প্রত্যক্ষ করিয়াছেন, যাহা প্রত্যক্ষ করা অন্য কাহারও পক্ষে সম্ভব হয় নাই। আর বৃক্ষ ও পাথরের উপর শরীআতের আইন প্রযোজ্য হয় না। সুতরাং এইগুলির সম্মান সূচক সিজদা করা ইসলামের মূলনীতি বিরোধী হইতে পারে না। বৃক্ষ ও পাথর তো বিবেকসম্পন্ন মানুষের মত নহে। তবে মাওলানা আকরাম খাঁ-এর মতানুযায়ী ইসলামের মূলনীতি বিরোধী হওয়ার কারণে যদিও বৃক্ষ এবং পাথরের জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-কে সম্মানসূচক সিজদা করা হারাম হয় এবং এইজন্য তিনি যদি এইগুলিকে পাপী বা মুশরিক মনে করেন তাহা হইলে হয়ত তিনি রোযা, নামায ইত্যাদি আদায় না করার জন্যও উহাদিগকে পাপী বলিয়া ফতওয়া প্রদান করিবেন। মাওলানা আকরাম খাঁ বলিয়াছেন, "বৃক্ষ ও পাথরের সিজদা করা নিত্য প্রত্যক্ষ সত্যের বিপরীত কথা।" নিত্য প্রত্যক্ষের বিপরীত অলৌকিক বিষয়কেই বলা হয় মু'জিযা।
মু'জিযা হইল নবুওয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অধিকাংশ আম্বিয়া কিরাম আলায়হিমুস সালামকে আল্লাহ্ তা'আলা মু'জিযা দান করিয়াছিলেন। মু'জিযা বিশ্বাস না করিলে আল্লাহ্র কুদরত ও অসীম ক্ষমতাকে বিশ্বাস করা যায় কিভাবে?
(৪) সিরিয়ার বাণিজ্য কাফেলার অন্তর্ভুক্ত যে সমস্ত কুরায়শ এই ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন নবুওয়াতের যুগে তাহারা যে জীবিত ছিলেন অথবা তাহাদের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন, ইহার কোন প্রমাণ নাই। যদি মনে করা হয় যে, তাহারা সকলেই অথবা তাহাদের মধ্য হইতে কিছু লোক নবুওয়াতের যুগে জীবিত ছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন, তবুও ঘটনাটি মিথ্যা হইতে পারে না। কেননা তাহারা যে ঘটনাটি বর্ণনা করেন নাই, ইহারই বা প্রমাণ কি? যদি তাহারা অথবা স্বয়ং মহানবী (স) এই ঘটনা বর্ণনা না করিতেন, তাহা হইলে হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) ইহা কাহার নিকট হইতে শুনিয়া বর্ণনা করিলেন? অথচ তিনি একজন বিশিষ্ট সাহাবী। আর প্রত্যেক সাহাবীই সত্যবাদী, বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য, যাহা সন্দেহাতীতভাবে দলীল দ্বারা প্রমাণিত। কোন মুসলমানের পক্ষেই ইহা অস্বীকার করা সম্ভব নয়।
এই হাদীছ প্রসঙ্গে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত হইয়া ইসলাম ও বিশ্বনবী (স) সম্পর্কে কাল্পনিক ও মনগড়া উক্তি করিয়াছে। তাহাদের মধ্যে ফরাসী ঐতিহাসিক Carra de vaux এই বিষয়ের উপর একটি গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন এবং ইহার নাম দিয়াছেন "কুরআন প্রণেতা"। তিনি এই গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, সিরিয়ার বুসরা নগরে সাক্ষাতের সময় বাহীরা কিশোর মুহাম্মাদ (স)-কে সমগ্র কুরআন মজীদ শিক্ষা দিয়াছেন। চল্লিশ বৎসর বয়সের সময় তিনি ইহা মানুষের নিকট প্রচার করেন।
ইহা ছাড়া ঐতিহাসিক উইলিয়াম স্যার মারগেলিয়থ প্রমুখ বলিয়াছেন যে, এই সফরে বাহীরার সহিত সাক্ষাতের সময় বালক মুহাম্মাদ তাহার নিকট হইতে ধর্ম সম্পর্কে সমস্ত বিষয় শিক্ষা লাভ করেন এবং এই শিক্ষার উপর ভিত্তি করিয়াই পরবর্তীতে তিনি 'ইসলাম' নামক একটি নূতন ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেন। সুতরাং খৃস্টান পাদ্রী বাহীরার শিক্ষাই হইল ইসলাম ধর্মের মূল উৎস।
উক্ত ঐতিহাসিকদের বাস্তবতা বিবর্জিত উক্তির দ্বারা ইহাই প্রমাণিত হয় যে, ইসলাম আল্লাহর মনোনীত ধর্ম হওয়া সত্ত্বেও ইহার বিরোধিতা করা যেন তাহাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য। নতুবা কোন সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ এই কথা বিশ্বাস করিতে পারে না যে, বার বৎসর বয়সের এক কিশোর বালক এক বেলা খাবার গ্রহণের সময় কিছু কথাবার্তার মাধ্যমে বাহীরার নিকট হইতে ধর্মের যাবতীয় শিক্ষা লাভ করিয়াছেন এবং ইসলাম নামক একটি নূতন ধর্মের প্রবর্তন করিয়াছেন। অবশ্য বাহীরা এই ধর্ম প্রচারের অনেক আগেই মৃত্যুবরণ করিয়াছেন।
এই সমস্ত খৃস্টান পাদ্রীদের বর্ণনা হইতে ইহাই প্রতীয়মান হয় যে, তাহারা তিরমিযী শরীফে হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) হইতে বর্ণিত হাদীছটি তাহাদের দাবীর স্বপক্ষে দলীল হিসাবে উল্লেখ করিয়াছেন। ইহার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তাহারা এই হাদীছের উপর বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছেন। যদি হাদীছের প্রতি তাহাদের যথার্থ বিশ্বাসই থাকে তাহা হইলে হাদীছটি নিয়া আলোচনা করিলেই তাহাদের স্বরূপ উদ্ঘাটিত হইয়া যাইবে। হাদীছে বর্ণনা করা হইয়াছে, বাহীরা আরবের বাণিজ্য কাফেলার মধ্যে কিশোর বালক মুহাম্মাদকে দেখিয়া তাঁহার হাত ধরিয়া বলিলেন, هَذَا سَيِّدُ الْعَلَمِينَ هَذَا رَسُولُ رَبِّ الْعُلَمِينَ অর্থাৎ 'তিনি হইলেন বিশ্বজাহানের নেতা, তিনি হইলেন আল্লাহ রব্বুল আলামীনের রাসূল।' এই উক্তি দ্বারা ইহা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বাহীরা হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে আল্লাহ্র রাসূল বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন। কিন্তু বাহীরা যে এই সমস্ত রাসূলুল্লাহ (স) শিক্ষা দিয়াছেন উক্ত হাদীছে এমন কোন ইঙ্গিত নাই।
যদি খৃস্টানগণ তাহাদের দাবির স্বপক্ষে এই হাদীছকে দলীল হিসাবে পেশ করিতে চান তাহা হইলে হাদীছের মর্মানুযায়ী হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে রাসূল হিসাবে বিশ্বাস করা অবশ্যই তাহাদের কর্তব্য হইয়া পড়ে।