📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 চতুর্থবার বক্ষবিদারণ

📄 চতুর্থবার বক্ষবিদারণ


চতুর্থবার রাসূলে কারীম (স)-এর বক্ষবিদারণের ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল মিরাজে যাওয়ার প্রাককালে। এই রজনীতে তিনি হযরত উম্মে হানী (রা)-এর গৃহে নিদ্রামগ্ন ছিলেন। তিনি দেখিলেনঃ অকস্মাৎ গৃহের ছাদ উন্মুক্ত হইয়া গেল। হযরত জিবরাঈল সেই পথে গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন এবং রাসূলে কারীম (স)-কে সঙ্গে লইয়া কাবাগৃহের চত্বরে আগমন করিলেন। হযরত জাফর ও হযরত হামযা (রা) পূর্ব হইতেই হাতীমে ঘুমাইয়াছিলেন। তিনি তাঁহাদের মধ্যখানে শুইয়া পড়িলেন। কিছুক্ষণ পর হযরত জিরবাঈল আবার আগমান করিলেন। তাঁহার সঙ্গে হযরত মীকাঈল এবং আরও একজন ফেরেশতা। ফেরেশতা তিনজনের একজন বলিলেন : এই দুইজনের মধ্যখানে শায়িত সায়িদুল কাওমকে লইয়া চল। অতঃপর তাহারা রাসূলে কারীম (স)-কে লইয়া যমযম কূপের কাছে গেলেন এবং তাঁহাকে শোয়াইয়া তাঁহার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া কলব (হৃৎপিণ্ড) বাহির করিয়া আনিলেন। এইবারও ফেরেশতাগণ তাঁহার হৃৎপিণ্ড চিরিয়া উহার মধ্য হইতে কিছু কালো বর্ণের পদার্থ বাহির করিয়া ফেলিয়া দিলেন। অতঃপর হযরত মীকাঈল একটি পাত্রে যমযম-এর পানি তুলিয়া আনিলেন এবং তাঁহার হৃৎপিণ্ডটি তিনবার ধৌত করিলেন। ইহার পর হযরত জিবরাঈল-এর হাতে রক্ষিত একটি সোনালী পাত্র যাহা ঈমান ও হিকমত দ্বারা ভর্তি ছিল, তাহা দ্বারা তাঁহার হৃদয় পরিপূর্ণ করিয়া দিলেন। অতঃপর জিবরাঈল (আ) নিজ হাতে তাঁহার হৃৎপিণ্ডটি যথাস্থানে বসাইয়া দিলেন।
প্রামাণ্য হাদীছ : এই চতুর্থ বারের বৃক্ষবিদারণের ঘটনাও সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিযী এবং ইমাম নাসাঈ নিজ নিজ গ্রন্থে এই হাদীছটি হযরত আবু যার গিফারী (রা)-এর সূত্রে রিওয়ায়াত করিয়াছেন। এই ঘটনা সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ মুতাওয়াতির অথবা মশহুর।
চতুর্থবার বক্ষবিদারণের কারণ ও হিকমত : মি'রাজের উদ্দেশ্য যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ্র সাথে প্রত্যক্ষ সাক্ষাত, সরাসরি কথোপকথন এবং মহাসৃষ্টির গুরু রহস্যাবলী পরিদর্শন করানো। আর ইহার জন্য আবশ্যক ছিল রাসূলে কারীম (স)-কে আধ্যাত্মিক ও দৈহিক উভয় দিক হইতে ইহা বরদাশত করিবার উপযুক্ত করিয়া দেওয়া। সুতরাং সেই যোগ্যতা ও শক্তি প্রদানের উদ্দেশ্যেই মি'রাজে যাওয়ার প্রাককালে তাঁহার এই চতুর্থবার বক্ষবিদারণ করা হয়। ইহা ছাড়া আরও অনেক রহস্য রহিয়াছে যাহা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বক্ষবিদারণ সম্বন্ধে আহলুস সুন্নাহ-এর চিন্তাধারা

📄 বক্ষবিদারণ সম্বন্ধে আহলুস সুন্নাহ-এর চিন্তাধারা


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের জমহুর আলিমের ঐকমত্য এই যে, রাসূলে কারীম (স)-এর বক্ষবিদারণ দৈহিকভাবে বাস্তবে সংঘটিত হইয়াছিল। ইহাকে আধ্যাত্মিক বক্ষবিদারণ তথা শরহে সদর বা বক্ষ সম্প্রসারণ অর্থে প্রয়োগ করা সরাসরি হাদীছের ও সীরাত গ্রন্থের সুস্পষ্ট বক্তব্যকে অস্বীকার করার শামিল।
আল্লামা কাসতাল্লানী আল-মাওয়াহিব গ্রন্থে এবং আল্লামা যুরকানী শরহে মাওয়াহিব গ্রন্থে বক্ষবিদারণ সম্বন্ধে সীরাত ও হাদীছ বিশেষজ্ঞ আলিমদের সর্বসম্মত রায় বর্ণনা করিতে গিয়া লিখিয়াছেন,
“শককে সদর তথা বক্ষবিদারণ এবং হৃৎপিণ্ড বাহির করিয়া উহা চিরিয়া পানি দ্বারা ধৌতকরণ ইত্যাদি অলৌকিক ও অস্বাভাবিক ঘটনাবলী যেই রকমভাবে হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে ঠিক সেইভাবে মানিয়া লওয়া এবং বিশ্বাস করা আবশ্যক (ওয়াজিব)। ঘটনার বাস্তবতা অস্বীকার করা অথবা উহার মধ্যে কোন প্রকার ব্যাখ্যার আশ্রয় লওয়া বৈধ নহে। কারণ বিষয়টি মুজিযা, ইহা আল্লাহ্ পক্ষে অসম্ভব কিছু নহে। আল্লামা কুরতুবী, আল্লামা তীবি, আল্লামা তুরপুশতী, হাফিয ইবন হাজার আসকালানী ও আল্লামা সুয়ূতী (র) প্রমুখ মনীষী এই কথাই বলিয়াছেন। আর বিশুদ্ধ হাদীছও ইহাই সমর্থন করে। কেননা সহীহ হাদীছে রহিয়াছে যে, সাহাবায়ে কিরাম রাসূলে কারীম (স)-এর বক্ষ মুবারকে সেলাইয়ের চিহ্ন নিজেদের চর্মচক্ষে অবলোকন করিয়াছেন। আল্লামা সুয়ূতী বলেন, বর্তমান যুগে কতিপয় নির্বোধ বক্ষ বিদারণের ঘটনাকে অস্বীকার করিয়াছে এবং ইহাকে রূপক অর্থে গ্রহণ করিয়াছে। তাহাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল এবং সুস্পষ্ট অজ্ঞতা। তাহাদের এই ভ্রান্তির কারণ জড়বাদী দর্শনের মধ্যে তাহাদের সীমাতিরিক্ত নিমগ্নতা, উলূমে হাদীছ সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের অভাব এবং সর্বোপরি আল্লাহ্র হিদায়াতের তৌফীক হইতে বঞ্চিত থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে এই সমস্ত ভ্রান্তি হইতে হিফাজত করুন"।
কতিপয় ইতিহাসবিদ ও সীরাত লেখক বক্ষবিদারণের বাস্তবতা স্বীকারে সংশয় প্রকাশ করিয়াছেন। আর তাহাদের কতক, যেমন স্যার উইলিয়াম মুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই শককে সদরকে অস্বীকার করিয়াছেন। বস্তুত ইহারা হইলেন জড়বাদী ইউরোপীয়, ইসলাম ও তাহার রাসূলের ছিদ্রান্বেষী লেখকগোষ্ঠী। তাহারা ইহাকে রাসূলে কারীম (স)-এর Epilepcy বা Falling Disease অর্থাৎ মূর্ছা বা মৃগীরোগ বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। কেহ কেহ আবার ইহাকে Possessed অর্থাৎ ভূতে পাওয়া বলিতেও কুণ্ঠিত হয় নাই। আসলে তাহারা রাসূলে কারীম (স)-এর ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করা এবং ওহীর সত্যতাকে সন্দেহপূর্ণ করিয়া দেওয়ার ঘৃণ্য মানসিকতা লইয়াই বক্ষ বিদারণের মত একটি সত্য ও বাস্তব ঘটনাকে অস্বীকার করিতে চাহিয়াছেন। তাঁহারা এই কথাটি প্রমাণ করিতে চাহিয়াছেন যে, রাসূলের উপর জিন ভূতের প্রভাব বিস্তার অসম্ভব কিছু নহে। ফলে রাসূলের উপর অবতীর্ণ ওহীর মধ্যে জিন্ন-ভূতের পক্ষ হইতে কোন সংমিশ্রণ অকল্পনীয় নহে। এইভাবে তাহারা ইসলামকে একটি উদ্ভট ধর্মরূপে আখ্যা করিতে চাহিয়াছেন।
অপরদিকে এই সমস্ত জড় পূজারী ইউরোপীয় লেখকগোষ্ঠীর চেতনায় প্রভাবান্বিত কতিপয় মুসলিম লেখকও তাহাদের সুরে সুর মিলাইয়া সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত বক্ষবিদারণের ঘটনাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করিয়াছেন অথবা ইহাকে রূপক অর্থে ব্যবহার করিয়া অপব্যখ্যার প্রয়াস পাইয়াছেন। তাহাদের মতে ঘটনাটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক। আধ্যাত্মিকভাবে রাসূলের বক্ষ সম্প্রসারণ ও বিকাশকেই রূপক অর্থে বক্ষ বিদারণের ভাষায় প্রকাশ করা হইয়াছে। আসলে জড় পূজারী ইউরোপীয়দের মত এই মুসলিম গোষ্ঠীও সত্য ইহতে বহু দূরে সরিয়া পড়িয়াছে। তাহারা বক্ষবিদারণ ও বক্ষ সম্প্রসারণ এই দুইটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়কে এক ও অভিন্ন করিয়া ফেলিয়াছে। অথচ বিষয় দুইটি মোটেও এক নহে, বরং উভয়ের মাঝে রহিয়াছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। কারণ সম্প্রসারণের অর্থ হইল আধ্যাত্মিকভাবে জটিল সমস্যার সমাধান পাইয়া যাওয়া বা কোন কঠিন বিষয় বোধগম্য হইয়া যাওয়া। ইহাকে আরবী ভাষায় শরহে সদর বলা হয়।
স্বয়ং রাসূলে কারীম (স)-এর একটি হাদীছে এই শরহে সদরের ব্যাখ্যা রহিয়াছে। একদা সাহাবা-ই কেরাম (রা) জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! শরহে সদর বা বক্ষ সম্প্রসারণ কিভাবে হয়? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: অন্তরে একটি নূর প্রবেশ করে যাহার ফলে অন্তর খুলিয়া যায় অর্থাৎ হৃদয় পটে এমন একটি শক্তি ও যোগ্যতা অর্জিত হয়, যাহার ফলে যে কোন জটিল ও কঠিন বিষয় উপলব্ধি করা তাহার জন্য সম্ভব হইয়া যায়। সাহাবীগণ পুনরায় প্রশ্ন করিলেন, ইহার নিদর্শন কি? তিনি বলিলেন, আখিরাতের আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া, নশ্বর পৃথিবীর প্রতি অনীহা জাগ্রত হওয়া এবং মৃত্যুর আগমনের পূর্বেই পরপারের সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা। উল্লেখ্য যে, এই রক্ষ সম্প্রসারণের বিভিন্ন স্তর রহিয়াছে। ইহা নির্ভর করে ব্যক্তির চারিত্রিক ও নৈতিক উন্নতি সাধন এবং মানসাব তথা পদমর্যাদার উপর। আর এই বক্ষ সম্প্রসারণ কেবল নবী-রাসূলদের সহিতই সংশ্লিষ্ট নহে বরং নবী-রাসূল হইতে শুরু করিয়া সকল স্তরের আলিম ও সাধকদের জন্যও ইহা হইতে পারে। সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা)-কে হযরত উমার (রা) পরামর্শ দিলেন পবিত্র কুরআনকে একত্র করিয়া একটি মাসহাফে সংকলন করিবার জন্য। হযরত আবু বাক্স সিদ্দীক (রা) বলিলেন, স্বয়ং আল্লাহর রাসূল তাঁহার জীবদ্দশায় যাহা করিয়া যান নাই, তাহা আমি কিভাবে করিব? অর্থাৎ ইহা আমার জন্য করা শরঈ দৃষ্টিকোণ হইতে সহীহ হইবে কি না? হযরত উমার তাঁহাকে বিষয়টির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বারবার বুঝাইলেন। অবশেষে হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) বলিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা এই ব্যাপারে আমার বক্ষ খুলিয়া দিয়াছেন। অতঃপর তিনি পবত্রি কুরআন লিপিবদ্ধ করিবার নির্দেশ প্রদান করিলেন।
আল্লামা ইদরীস কান্ধলবী (র) বলেন, শককে সদর অর্থাৎ বক্ষবিদারণের অর্থ হইল বুক চিরিয়া ফেলা। সুতরাং বক্ষবিদারণ শব্দ দ্বারা শরহে সদর তথা বক্ষ সম্প্রসারণের অর্থ গ্রহণ করা নিতান্তই মূর্খতা। বক্ষবিদারণ রাসূলের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। ইহা একমাত্র তাঁহার দেহ মুবারকে ঘটিয়া যাওয়া একটি অলৌকিক ঘটনা। কিন্তু বক্ষ সম্প্রসারণ রাসূলের সহিত খাস নহে, বরং হযরত আবূ বাক্স, হযরত উমার-এর যুগ হইতে অদ্যাবধি শত সহস্র আলিম, সাধক ও মনীষীদের বক্ষের সম্প্রসারণ ঘটিয়াছে, ঘটিতেছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটিতে থাকিবে। উপরন্তু যদি বক্ষবিদারণকে সম্প্রসারণ অর্থে গ্রহণ করা হয়, তাহা হইলে ঐ-হাদীছের কি জওয়াব হইবে, যাহার মধ্যে সুস্পষ্ট শব্দে বর্ণিত হইয়াছে যে, সাহাবীগণ রাসূলের বক্ষ মুবারকে সেলাইয়ের দাগ নিজেদের চর্মচক্ষে অবলোকন করিতেন। তবে কি আধ্যাত্মিকভাবে শুধু বক্ষের সম্প্রসারণ ঘটিলেই বক্ষে দাগ পড়িয়া যায়?
এখন বাকী রহিল বক্ষবিদারণের ঘটনাকে সরাসরি অস্বীকারকারীদের প্রসংগ। এই সম্বন্ধে কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পবিত্র জীবনের সেই সমস্ত ঘটনা, যাহা মানবীয় যুক্তি-বুদ্ধির ঊর্ধ্বে, অস্বাভাবিক ও অলৌকিক, তাহাই তো মুজিযা। সুতরাং এই সকল স্থূল যুক্তি-বুদ্ধি দ্বারা উহার সত্যতা বিচার-বিশ্লেষণ করিতে যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। তাহা ছাড়া যাহারা রাসূলের আদর্শেই বিশ্বাসী নহে, তাহাদের এই সকল যুক্তিও অস্বীকারের কোন মূল্য থাকিতে পারে না।
তবে দুঃখজনক বিষয় এই যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিভিন্ন মুজিযা সম্পর্কে এক শ্রেণীর পাশ্চাত্য চিন্তাবিদের ঠুনকো যুক্তির বেড়াজালে মুসলিম সমাজের কতক লেখক জড়াইয়া পড়িয়াছেন। সুপ্রসিদ্ধ সীরাত গ্রন্থ 'বিশ্বনবী'তে বক্ষবিদারণ সম্বন্ধে ইউরোপীয় লেখকদের বক্তব্য উদ্ধৃত করিবার পর গ্রন্থকার লিখেন: "আমাদের মতে বক্ষবিদারণের উপযুক্ত কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অথবা নির্ভরযোগ্য কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত ইহাকে একটা প্রচলিত প্রবাদরূপে মানিয়া লওয়াই অপেক্ষাকৃত নিরাপদ।" গ্রন্থকারের উক্ত বক্তব্য যুক্তিসঙ্গত নহে। কারণ বক্ষ বিদারণের ঘটনা সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত।
বর্ণিত আছে যে, লোকেরা হালীমাকে যখন শিশু পুত্র মুহাম্মদকে জ্যোতিষীর নিকট লইয়া যাইতে পীড়াপীড়ি করিল, তখন মুহাম্মাদ (স) স্বয়ং ইহার প্রতিবাদ করিয়া বলিলেন, আল্লাহ্ কৃপায় আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। কোন জ্যোতিষীর নিকট আমাকে লইয়া যাওয়ার প্রয়োজন নাই। ভূত-প্রেতের প্রভাব সম্বন্ধে তোমরা যাহা ভাবিতেছ, আমি তাহা হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র।
আশ্চর্য হইলেও সত্য যে, যেখানে স্বয়ং আলোচিত ব্যক্তি নিজের সুস্থতার ও পবিত্রতার বলিষ্ঠ ঘোষণা দিতেছেন, সেখানে এই ঘটনাকে অজুহাত বানাইয়া কিছু সংখ্যক লেখকের সন্দেহ-সংশয় পোষণ গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না।
হযরত হালীমা যখন লোকদের পীড়াপীড়িতে বাধ্য হইয়া তাঁহাকে জ্যোতিষীর নিকট লইয়া গেলেন তখন হালীমা ঘটনাটি আদ্যোপান্ত বর্ণনা করিতে আরম্ভ করিলেন। কিন্তু জ্যোতিষী তাহাকে বাধা দিয়া বলিল, স্বয়ং মুহাম্মাদকেই বলিতে দাও। কারণ তাঁহার উপর যাহা ঘটিয়াছে, তাহা সে নিজেই অধিক জ্ঞাত। রাসূলুল্লাহ্ সে জ্যোতিষীর নিকট ঘটনাটি আদ্যোপান্ত খুলিয়া বলিলেন। ঘটনার বিবরণ শুনিয়া জ্যোতিষী তাহাকে কোলে তুলিয়া লইল এবং চিৎকার দিয়া বলিতে লাগিল, হে আরব জাতি! তোমরা আস। যেই বিপদের আশংকা করিতেছিলাম তাহা প্রকাশ পাইয়া গিয়াছে। তোমরা তাহাকে হত্যা করিয়া মুক্তি লাভ কর। অন্যথায় সে বড় হইয়া তোমাদের ধর্মের অসারতা প্রমাণ করিবে। তোমাদের বিজ্ঞজনদেরকে সে নির্বোধ বানাইয়া দিবে এবং সে এমন একটি ধর্মের দিকে তোমাদিগকে আহ্বান করিবে, যাহার সম্বন্ধে তোমরা অপরিচিত। হালীমা জ্যোতিষীর মুখে এই সমস্ত কথা শুনিয়া মুহাম্মাদ (স)-কে তাহার কোল হইতে ছিনাইয়া লইয়া আসিলেন এবং বলিলেন, জ্যোতিষী! প্রথমে তোমার পাগলামির চিকিৎসা হওয়া উচিৎ।
লক্ষণীয় যে, জ্যোতিষীর বক্তব্যে ইহাই প্রতীয়মান হয়, সে এই ঘটনার বিবরণ শুনিয়াই পরিষ্কার বুঝিতে পারিয়াছিল যে, ইনিই সেই প্রতীক্ষিত ও প্রতিশ্রুত শেষ নবী। তাঁহার উপর ঘটিয়া যাওয়া এই সমস্ত ঘটনা সম্পূর্ণ অলৌকিক। ইহা কোন প্রকারের অসুস্থতা বা কোন অপশক্তির প্রভাব নহে। মজার ব্যাপার এই যে, তখনকার সময়ের একজন বিধর্মী জ্যোতিষীর নিকট অলৌকিক ঘটনাটি বাস্তব এবং আল্লাহর পক্ষ হইতে হওয়া প্রতীয়মান হইলেও আমাদের কতিপয় মুসলিম পণ্ডিতদের নিকট তাহা অবাস্তব বলিয়া মনে হইল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00