📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দ্বিতীয়বার বক্ষবিদারণ

📄 দ্বিতীয়বার বক্ষবিদারণ


দ্বিতীয়বার রাসূলে কারীম (স)-এর বক্ষ বিদারণ সংঘটিত হইয়াছিল যখন তিনি দশ বৎসরের বালক। ঘটনার বিবরণ এই যে, একদা তিনি কোন এক মরুমাঠে সমবয়সী ছেলেদের সহিত খেলায় রত ছিলেন। হঠাৎ দুইজন ফেরেশতা তাঁহার সম্মুখে আবির্ভূত হইলেন। রাসূল কারীম (স) তাঁহাদের বর্ণনা প্রসংগে বলেনঃ তাঁহারা ছিলেন মনুষ্য আকৃতির। তাঁহাদের মুখমণ্ডল এতই জ্যোতির্ময় ছিল যে, আমি ইতোপূর্বে এমন চেহারা কখনও দেখি নাই। তাঁহাদের শরীরের সুগন্ধির ন্যায় এত মন মাতানো সুগন্ধিও আমি আর কখনও পাই নাই। তাঁহাদের পরিহিত বস্ত্র এতই উজ্জল ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং পরিপাটি ছিল যে, এমন সুন্দর পোশাকও আমি আর কখনও দেখি নাই। তাঁহারা ছিলেন দুইজন ফেরেশতা জিবরাঈল ও মীকাঈল (আ)। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: তাঁহারা উভয়ে আমর নিকটবর্তী হইয়া আমার বাহুদ্বয় এমনভাবে ধরিলেন যে, আমি ইহাতে কোন প্রকার ব্যথা অনুভব করিলাম না। অতঃপর তাঁহারা খুব সতর্কতার সহিত আমাকে এমনভাবে শোয়াইয়া দিলেন যে, তাহাতে আমার অঙ্গ-প্রতঙ্গ স্থানচ্যুত হইল না। অতঃপর তাঁহারা আমার বক্ষ বিদীর্ণ করিলেন এবং একজন অপরজনকে বলিলেন, তাঁহার কালুব (হৃদপিণ্ড) চিরিয়া উহা হইতে হিংসা-দ্বেষ ও ঘৃণার পদার্থ বাহির করিয়া ফেলিয়া দাও। তখন একজন ফেরেশতা আমার হৃদপিণ্ডের মধ্যভাগ হইতে জমাট বাঁধা কিছু রক্ত বাহির করিয়া নিক্ষেপ করিলেন এবং তাঁহাদের সাথে আনিত একটি স্বর্ণের পেয়ালায় রক্ষিত পানি দ্বারা উহা খুব ভালভাবে পরিষ্কার করিয়া ধুইয়া দিলেন। অতঃপর ফেরেশতাদ্বয়ের একজন অপরজনকে বলিলেন, এখন তাঁহার হৃদয়াভ্যন্তরে স্নেহ, ভালবাসা ও মায়া-মমতা ঢালিয়া দাও। তখন তাঁহারা আমার হৃদয়াভ্যন্তরে কোমল এক জাতীয় পদার্থ ঢালিয়া দিলেন এবং হৃদয়টি যথাস্থানে পুনঃ স্থাপন করিয়া দিলেন। অতঃপর তাঁহারা আমার বৃদ্ধাঙ্গুল ধারণ করিয়া আমাকে টানিয়া উঠাইলেন এবং বলিলেন, শান্তিতে থাকুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, এই ঘটনার পর হইতে আমি পৃথিবীর সকলের প্রতি আমার হৃদয়ে সীমাহীন দয়া, মমতা ও ভালবাসা অনুভব করিতে লাগিলাম।
প্রামাণ্য হাদীছ: দশ বৎসর বয়সে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয়বার বক্ষবিদারণের ঘটনাটিও সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। তাবাকাত ইবন সা'দ গ্রন্থে হাদীছটি হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-এর সনদে বর্ণিত হইয়াছে। এই সনদের সকল রাবী সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের রাবীদের অন্তর্ভুক্ত। ইহা ছাড়াও এই ঘটনাটি হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর সনদে প্রখ্যাত সীরাত রচয়িতাগণ নিজ নিজ গ্রন্থে রিওয়ায়াত করিয়াছেন। যথা আবু নু'আয়ম, হাফিয মাকদিসী, আবদুল্লাহ ইবন আহমাদ ও ইবন হিব্বান প্রমুখ। তাঁহাদের প্রত্যেকের সনদ সহীহ। ইমাম মুসলিমও তাঁহার সহীহ মুসলিমে এই হাদীছটি হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-এর সনদে রিওয়ায়েত করিয়াছেন।
দ্বিতীয়বার বক্ষ বিদারণের রহস্য: প্রখ্যাত সীরাত গ্রন্থকার ইদরীস কান্ধলবী (র) বলেন, দশ বৎসর বয়সে সাধারণত বালকদের মন-মানসিকতা খেলাধুলার প্রতি খুব বেশী ঝুঁকিয়া পড়ে যাহা বালককে আল্লাহ্ হইতে গাফেল করিয়া দেয়। তাই এই সময় তাঁহার বক্ষবিদারণ করিয়া খেলাধুলার প্রবণতাকে বিদূরিত করা হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তৃতীয়বার বক্ষবিদারণ

📄 তৃতীয়বার বক্ষবিদারণ


তৃতীয়বার রাসূলে কারীম (স)-এর বক্ষবিদারণ করা হইয়াছিল যখন তিনি চল্লিশ বৎসরে পদার্পণ করিয়াছিলেন। নবুওয়াত প্রাপ্তির প্রাক্কালে এই ঘটনা সংঘটিত হয়। এই সময় তিনি হেরা গুহায় নির্জনে মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল ছিলেন। একদিন গভীর রজনীতে তিনি সময় নির্ণয়ের জন্য তারকার অবস্থান দেখিবার উদ্দেশ্যে গুহা হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। হঠাৎ তিনি একটি আওয়াজ শুনিতে পাইলেন, কেহ যেন তাঁহাকে মধুময় কণ্ঠে সালাম জানাইতেছেন। আমি তৎক্ষণাৎ গৃহে চলিয়া আসিলাম এবং খাদীজার নিকট বিষয়টি খুলিয়া বলিলাম। খাদিজা বলিলেন, ইহা তো সু-সংবাদ, আপনার ভয়ের কোন কারণ নাই। সালাম প্রদানকারী যিনিই হউন না কেন তিনি আপনার কোন ক্ষতি করিবেন না। কারণ সালাম তে নিরাপত্তা ও শান্তির বাণী। রাসূলে কারীম (স) বলেনঃ কিছু সময় পর আমি আবার গুহার বাহিরে আসিলাম। এইবার দেখিলাম যে, হযরত জিবরাঈল আলায়হিস সালাম দাঁড়াইয়া আছেন। তাঁহার একটি বাহু পশ্চিমাকাশের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত এবং অপর বাহুটি পূর্বাকাশের সীমান্ত পর্যন্ত প্রসারিত। জিবরাঈলের এই বিরাটকায় অবয়ব দেখিয়া আমি ভয় পাইয়া গেলাম এবং গুহায় চলিয়া যাইতে উদ্যত হইলাম। এমন সময় তিনি আমার পথ আগলাইয়া দাঁড়াইয়া গেলেন এবং বলিলেন, আপনি অমুক সময় অমুক স্থানে চলিয়া আসিবেন। আমি যথাসময়ে যথাস্থানে উপস্থিত হইলাম। দেখিলাম জিবরাঈলও উপস্থিত হইয়াছেন। আমার নিকটে আসিয়া আমাকে শোয়াইলেন এবং আমার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া হৃৎপিণ্ড বাহির করিয়া আনিলেন। হৃৎপিণ্ড চিরিয়া উহা হইতে এইবারও পীত বর্ণের কিছু পদার্থ বাহির করিয়া যমযমের পানি দ্বারা হৃৎপিণ্ডটি ভালভাবে ধৌত করিয়া দিলেন এবং যথাস্থানে পুনঃস্থাপন করিলেন।
প্রামাণ্য হাদীছ : তৃতীয়বারের বক্ষবিদারণের ঘটনাটিও সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। মুসনাদে আবূ দাউদ তায়ালিসী ও দালাইলে আবূ নু'আয়ম গ্রন্থদ্বয়ে ঘটনাটি হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত আছে। হাফিয ইবন মুকলিন তাঁহার সহীহ বুখারীর ভাষ্যগ্রন্থে এবং হাফেজ ইবন হাজার আসকালানী তাঁহার ফাতহুল বারী গ্রন্থের মি'রাজ ও ইসরা অধ্যায়ে এই কথা স্বীকার করিয়াছেন যে, নবুওয়াত প্রাপ্তির প্রাক্কালে শককে সদরের ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল। ইহা ছাড়াও মুসনাদে ইমাম বাযযায-এ হযরত আবূ যার গিফারী (রা)-এর সূত্রে উক্ত ঘটনাটি বর্ণিত আছে। আল্লামা হায়ছামী হযরত আবূ যার গিফারী (রা)-এর এই হাদীছটির বিশুদ্ধতা স্বীকার করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন যে, হাদীছটির সনদের সকল বর্ণনাকারী ছিকাহ ও নির্ভরযোগ্য।
তৃতীয়বার বক্ষবিদারণের কারণ ও হিকমত: এই তৃতীয়বার বক্ষ বিদারণের কারণ হইল রাসূলে কারীম (স)-কে ওহীর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রহস্যাবলী এবং আল্লাহর কালামকে ধারণের যোগ্য করিয়া তোলা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: إِنَّا سَنُلْقَى عَلَيْكَ قَوْلاً ثَقِيلاً "আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করিতেছি গুরুভার বাণী (৭৩:৫)।
বর্ণিত আছে যে, আল-কুরআন নাযিল হওয়ার সময় রাসূলে কারীম (স) দুর্বহ বোঝার ন্যায় ভার অনুভব করিতেন, এমনকি প্রচণ্ড শীতেও তাঁহার দেহ ঘর্মাক্ত হইয়া যাইত। তিনি তখন উটের উপর সওয়ার থাকিলে উহা ওজনের কারণে বসিয়া পড়িত। ফলকথা, দৈহিক ও আধ্যাত্মিক উভয় দিক হইতে ওহীর গুরুভার ধারণের উপযুক্ত করিয়া তোলাই হইল তৃতীয়বার বক্ষবিদারণের উদ্দেশ্য।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 চতুর্থবার বক্ষবিদারণ

📄 চতুর্থবার বক্ষবিদারণ


চতুর্থবার রাসূলে কারীম (স)-এর বক্ষবিদারণের ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল মিরাজে যাওয়ার প্রাককালে। এই রজনীতে তিনি হযরত উম্মে হানী (রা)-এর গৃহে নিদ্রামগ্ন ছিলেন। তিনি দেখিলেনঃ অকস্মাৎ গৃহের ছাদ উন্মুক্ত হইয়া গেল। হযরত জিবরাঈল সেই পথে গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন এবং রাসূলে কারীম (স)-কে সঙ্গে লইয়া কাবাগৃহের চত্বরে আগমন করিলেন। হযরত জাফর ও হযরত হামযা (রা) পূর্ব হইতেই হাতীমে ঘুমাইয়াছিলেন। তিনি তাঁহাদের মধ্যখানে শুইয়া পড়িলেন। কিছুক্ষণ পর হযরত জিরবাঈল আবার আগমান করিলেন। তাঁহার সঙ্গে হযরত মীকাঈল এবং আরও একজন ফেরেশতা। ফেরেশতা তিনজনের একজন বলিলেন : এই দুইজনের মধ্যখানে শায়িত সায়িদুল কাওমকে লইয়া চল। অতঃপর তাহারা রাসূলে কারীম (স)-কে লইয়া যমযম কূপের কাছে গেলেন এবং তাঁহাকে শোয়াইয়া তাঁহার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া কলব (হৃৎপিণ্ড) বাহির করিয়া আনিলেন। এইবারও ফেরেশতাগণ তাঁহার হৃৎপিণ্ড চিরিয়া উহার মধ্য হইতে কিছু কালো বর্ণের পদার্থ বাহির করিয়া ফেলিয়া দিলেন। অতঃপর হযরত মীকাঈল একটি পাত্রে যমযম-এর পানি তুলিয়া আনিলেন এবং তাঁহার হৃৎপিণ্ডটি তিনবার ধৌত করিলেন। ইহার পর হযরত জিবরাঈল-এর হাতে রক্ষিত একটি সোনালী পাত্র যাহা ঈমান ও হিকমত দ্বারা ভর্তি ছিল, তাহা দ্বারা তাঁহার হৃদয় পরিপূর্ণ করিয়া দিলেন। অতঃপর জিবরাঈল (আ) নিজ হাতে তাঁহার হৃৎপিণ্ডটি যথাস্থানে বসাইয়া দিলেন।
প্রামাণ্য হাদীছ : এই চতুর্থ বারের বৃক্ষবিদারণের ঘটনাও সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিযী এবং ইমাম নাসাঈ নিজ নিজ গ্রন্থে এই হাদীছটি হযরত আবু যার গিফারী (রা)-এর সূত্রে রিওয়ায়াত করিয়াছেন। এই ঘটনা সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ মুতাওয়াতির অথবা মশহুর।
চতুর্থবার বক্ষবিদারণের কারণ ও হিকমত : মি'রাজের উদ্দেশ্য যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ্র সাথে প্রত্যক্ষ সাক্ষাত, সরাসরি কথোপকথন এবং মহাসৃষ্টির গুরু রহস্যাবলী পরিদর্শন করানো। আর ইহার জন্য আবশ্যক ছিল রাসূলে কারীম (স)-কে আধ্যাত্মিক ও দৈহিক উভয় দিক হইতে ইহা বরদাশত করিবার উপযুক্ত করিয়া দেওয়া। সুতরাং সেই যোগ্যতা ও শক্তি প্রদানের উদ্দেশ্যেই মি'রাজে যাওয়ার প্রাককালে তাঁহার এই চতুর্থবার বক্ষবিদারণ করা হয়। ইহা ছাড়া আরও অনেক রহস্য রহিয়াছে যাহা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বক্ষবিদারণ সম্বন্ধে আহলুস সুন্নাহ-এর চিন্তাধারা

📄 বক্ষবিদারণ সম্বন্ধে আহলুস সুন্নাহ-এর চিন্তাধারা


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের জমহুর আলিমের ঐকমত্য এই যে, রাসূলে কারীম (স)-এর বক্ষবিদারণ দৈহিকভাবে বাস্তবে সংঘটিত হইয়াছিল। ইহাকে আধ্যাত্মিক বক্ষবিদারণ তথা শরহে সদর বা বক্ষ সম্প্রসারণ অর্থে প্রয়োগ করা সরাসরি হাদীছের ও সীরাত গ্রন্থের সুস্পষ্ট বক্তব্যকে অস্বীকার করার শামিল।
আল্লামা কাসতাল্লানী আল-মাওয়াহিব গ্রন্থে এবং আল্লামা যুরকানী শরহে মাওয়াহিব গ্রন্থে বক্ষবিদারণ সম্বন্ধে সীরাত ও হাদীছ বিশেষজ্ঞ আলিমদের সর্বসম্মত রায় বর্ণনা করিতে গিয়া লিখিয়াছেন,
“শককে সদর তথা বক্ষবিদারণ এবং হৃৎপিণ্ড বাহির করিয়া উহা চিরিয়া পানি দ্বারা ধৌতকরণ ইত্যাদি অলৌকিক ও অস্বাভাবিক ঘটনাবলী যেই রকমভাবে হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে ঠিক সেইভাবে মানিয়া লওয়া এবং বিশ্বাস করা আবশ্যক (ওয়াজিব)। ঘটনার বাস্তবতা অস্বীকার করা অথবা উহার মধ্যে কোন প্রকার ব্যাখ্যার আশ্রয় লওয়া বৈধ নহে। কারণ বিষয়টি মুজিযা, ইহা আল্লাহ্ পক্ষে অসম্ভব কিছু নহে। আল্লামা কুরতুবী, আল্লামা তীবি, আল্লামা তুরপুশতী, হাফিয ইবন হাজার আসকালানী ও আল্লামা সুয়ূতী (র) প্রমুখ মনীষী এই কথাই বলিয়াছেন। আর বিশুদ্ধ হাদীছও ইহাই সমর্থন করে। কেননা সহীহ হাদীছে রহিয়াছে যে, সাহাবায়ে কিরাম রাসূলে কারীম (স)-এর বক্ষ মুবারকে সেলাইয়ের চিহ্ন নিজেদের চর্মচক্ষে অবলোকন করিয়াছেন। আল্লামা সুয়ূতী বলেন, বর্তমান যুগে কতিপয় নির্বোধ বক্ষ বিদারণের ঘটনাকে অস্বীকার করিয়াছে এবং ইহাকে রূপক অর্থে গ্রহণ করিয়াছে। তাহাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল এবং সুস্পষ্ট অজ্ঞতা। তাহাদের এই ভ্রান্তির কারণ জড়বাদী দর্শনের মধ্যে তাহাদের সীমাতিরিক্ত নিমগ্নতা, উলূমে হাদীছ সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের অভাব এবং সর্বোপরি আল্লাহ্র হিদায়াতের তৌফীক হইতে বঞ্চিত থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে এই সমস্ত ভ্রান্তি হইতে হিফাজত করুন"।
কতিপয় ইতিহাসবিদ ও সীরাত লেখক বক্ষবিদারণের বাস্তবতা স্বীকারে সংশয় প্রকাশ করিয়াছেন। আর তাহাদের কতক, যেমন স্যার উইলিয়াম মুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই শককে সদরকে অস্বীকার করিয়াছেন। বস্তুত ইহারা হইলেন জড়বাদী ইউরোপীয়, ইসলাম ও তাহার রাসূলের ছিদ্রান্বেষী লেখকগোষ্ঠী। তাহারা ইহাকে রাসূলে কারীম (স)-এর Epilepcy বা Falling Disease অর্থাৎ মূর্ছা বা মৃগীরোগ বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। কেহ কেহ আবার ইহাকে Possessed অর্থাৎ ভূতে পাওয়া বলিতেও কুণ্ঠিত হয় নাই। আসলে তাহারা রাসূলে কারীম (স)-এর ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করা এবং ওহীর সত্যতাকে সন্দেহপূর্ণ করিয়া দেওয়ার ঘৃণ্য মানসিকতা লইয়াই বক্ষ বিদারণের মত একটি সত্য ও বাস্তব ঘটনাকে অস্বীকার করিতে চাহিয়াছেন। তাঁহারা এই কথাটি প্রমাণ করিতে চাহিয়াছেন যে, রাসূলের উপর জিন ভূতের প্রভাব বিস্তার অসম্ভব কিছু নহে। ফলে রাসূলের উপর অবতীর্ণ ওহীর মধ্যে জিন্ন-ভূতের পক্ষ হইতে কোন সংমিশ্রণ অকল্পনীয় নহে। এইভাবে তাহারা ইসলামকে একটি উদ্ভট ধর্মরূপে আখ্যা করিতে চাহিয়াছেন।
অপরদিকে এই সমস্ত জড় পূজারী ইউরোপীয় লেখকগোষ্ঠীর চেতনায় প্রভাবান্বিত কতিপয় মুসলিম লেখকও তাহাদের সুরে সুর মিলাইয়া সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত বক্ষবিদারণের ঘটনাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করিয়াছেন অথবা ইহাকে রূপক অর্থে ব্যবহার করিয়া অপব্যখ্যার প্রয়াস পাইয়াছেন। তাহাদের মতে ঘটনাটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক। আধ্যাত্মিকভাবে রাসূলের বক্ষ সম্প্রসারণ ও বিকাশকেই রূপক অর্থে বক্ষ বিদারণের ভাষায় প্রকাশ করা হইয়াছে। আসলে জড় পূজারী ইউরোপীয়দের মত এই মুসলিম গোষ্ঠীও সত্য ইহতে বহু দূরে সরিয়া পড়িয়াছে। তাহারা বক্ষবিদারণ ও বক্ষ সম্প্রসারণ এই দুইটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়কে এক ও অভিন্ন করিয়া ফেলিয়াছে। অথচ বিষয় দুইটি মোটেও এক নহে, বরং উভয়ের মাঝে রহিয়াছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। কারণ সম্প্রসারণের অর্থ হইল আধ্যাত্মিকভাবে জটিল সমস্যার সমাধান পাইয়া যাওয়া বা কোন কঠিন বিষয় বোধগম্য হইয়া যাওয়া। ইহাকে আরবী ভাষায় শরহে সদর বলা হয়।
স্বয়ং রাসূলে কারীম (স)-এর একটি হাদীছে এই শরহে সদরের ব্যাখ্যা রহিয়াছে। একদা সাহাবা-ই কেরাম (রা) জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! শরহে সদর বা বক্ষ সম্প্রসারণ কিভাবে হয়? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: অন্তরে একটি নূর প্রবেশ করে যাহার ফলে অন্তর খুলিয়া যায় অর্থাৎ হৃদয় পটে এমন একটি শক্তি ও যোগ্যতা অর্জিত হয়, যাহার ফলে যে কোন জটিল ও কঠিন বিষয় উপলব্ধি করা তাহার জন্য সম্ভব হইয়া যায়। সাহাবীগণ পুনরায় প্রশ্ন করিলেন, ইহার নিদর্শন কি? তিনি বলিলেন, আখিরাতের আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া, নশ্বর পৃথিবীর প্রতি অনীহা জাগ্রত হওয়া এবং মৃত্যুর আগমনের পূর্বেই পরপারের সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা। উল্লেখ্য যে, এই রক্ষ সম্প্রসারণের বিভিন্ন স্তর রহিয়াছে। ইহা নির্ভর করে ব্যক্তির চারিত্রিক ও নৈতিক উন্নতি সাধন এবং মানসাব তথা পদমর্যাদার উপর। আর এই বক্ষ সম্প্রসারণ কেবল নবী-রাসূলদের সহিতই সংশ্লিষ্ট নহে বরং নবী-রাসূল হইতে শুরু করিয়া সকল স্তরের আলিম ও সাধকদের জন্যও ইহা হইতে পারে। সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা)-কে হযরত উমার (রা) পরামর্শ দিলেন পবিত্র কুরআনকে একত্র করিয়া একটি মাসহাফে সংকলন করিবার জন্য। হযরত আবু বাক্স সিদ্দীক (রা) বলিলেন, স্বয়ং আল্লাহর রাসূল তাঁহার জীবদ্দশায় যাহা করিয়া যান নাই, তাহা আমি কিভাবে করিব? অর্থাৎ ইহা আমার জন্য করা শরঈ দৃষ্টিকোণ হইতে সহীহ হইবে কি না? হযরত উমার তাঁহাকে বিষয়টির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বারবার বুঝাইলেন। অবশেষে হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) বলিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা এই ব্যাপারে আমার বক্ষ খুলিয়া দিয়াছেন। অতঃপর তিনি পবত্রি কুরআন লিপিবদ্ধ করিবার নির্দেশ প্রদান করিলেন।
আল্লামা ইদরীস কান্ধলবী (র) বলেন, শককে সদর অর্থাৎ বক্ষবিদারণের অর্থ হইল বুক চিরিয়া ফেলা। সুতরাং বক্ষবিদারণ শব্দ দ্বারা শরহে সদর তথা বক্ষ সম্প্রসারণের অর্থ গ্রহণ করা নিতান্তই মূর্খতা। বক্ষবিদারণ রাসূলের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। ইহা একমাত্র তাঁহার দেহ মুবারকে ঘটিয়া যাওয়া একটি অলৌকিক ঘটনা। কিন্তু বক্ষ সম্প্রসারণ রাসূলের সহিত খাস নহে, বরং হযরত আবূ বাক্স, হযরত উমার-এর যুগ হইতে অদ্যাবধি শত সহস্র আলিম, সাধক ও মনীষীদের বক্ষের সম্প্রসারণ ঘটিয়াছে, ঘটিতেছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটিতে থাকিবে। উপরন্তু যদি বক্ষবিদারণকে সম্প্রসারণ অর্থে গ্রহণ করা হয়, তাহা হইলে ঐ-হাদীছের কি জওয়াব হইবে, যাহার মধ্যে সুস্পষ্ট শব্দে বর্ণিত হইয়াছে যে, সাহাবীগণ রাসূলের বক্ষ মুবারকে সেলাইয়ের দাগ নিজেদের চর্মচক্ষে অবলোকন করিতেন। তবে কি আধ্যাত্মিকভাবে শুধু বক্ষের সম্প্রসারণ ঘটিলেই বক্ষে দাগ পড়িয়া যায়?
এখন বাকী রহিল বক্ষবিদারণের ঘটনাকে সরাসরি অস্বীকারকারীদের প্রসংগ। এই সম্বন্ধে কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পবিত্র জীবনের সেই সমস্ত ঘটনা, যাহা মানবীয় যুক্তি-বুদ্ধির ঊর্ধ্বে, অস্বাভাবিক ও অলৌকিক, তাহাই তো মুজিযা। সুতরাং এই সকল স্থূল যুক্তি-বুদ্ধি দ্বারা উহার সত্যতা বিচার-বিশ্লেষণ করিতে যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। তাহা ছাড়া যাহারা রাসূলের আদর্শেই বিশ্বাসী নহে, তাহাদের এই সকল যুক্তিও অস্বীকারের কোন মূল্য থাকিতে পারে না।
তবে দুঃখজনক বিষয় এই যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিভিন্ন মুজিযা সম্পর্কে এক শ্রেণীর পাশ্চাত্য চিন্তাবিদের ঠুনকো যুক্তির বেড়াজালে মুসলিম সমাজের কতক লেখক জড়াইয়া পড়িয়াছেন। সুপ্রসিদ্ধ সীরাত গ্রন্থ 'বিশ্বনবী'তে বক্ষবিদারণ সম্বন্ধে ইউরোপীয় লেখকদের বক্তব্য উদ্ধৃত করিবার পর গ্রন্থকার লিখেন: "আমাদের মতে বক্ষবিদারণের উপযুক্ত কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অথবা নির্ভরযোগ্য কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত ইহাকে একটা প্রচলিত প্রবাদরূপে মানিয়া লওয়াই অপেক্ষাকৃত নিরাপদ।" গ্রন্থকারের উক্ত বক্তব্য যুক্তিসঙ্গত নহে। কারণ বক্ষ বিদারণের ঘটনা সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত।
বর্ণিত আছে যে, লোকেরা হালীমাকে যখন শিশু পুত্র মুহাম্মদকে জ্যোতিষীর নিকট লইয়া যাইতে পীড়াপীড়ি করিল, তখন মুহাম্মাদ (স) স্বয়ং ইহার প্রতিবাদ করিয়া বলিলেন, আল্লাহ্ কৃপায় আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। কোন জ্যোতিষীর নিকট আমাকে লইয়া যাওয়ার প্রয়োজন নাই। ভূত-প্রেতের প্রভাব সম্বন্ধে তোমরা যাহা ভাবিতেছ, আমি তাহা হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র।
আশ্চর্য হইলেও সত্য যে, যেখানে স্বয়ং আলোচিত ব্যক্তি নিজের সুস্থতার ও পবিত্রতার বলিষ্ঠ ঘোষণা দিতেছেন, সেখানে এই ঘটনাকে অজুহাত বানাইয়া কিছু সংখ্যক লেখকের সন্দেহ-সংশয় পোষণ গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না।
হযরত হালীমা যখন লোকদের পীড়াপীড়িতে বাধ্য হইয়া তাঁহাকে জ্যোতিষীর নিকট লইয়া গেলেন তখন হালীমা ঘটনাটি আদ্যোপান্ত বর্ণনা করিতে আরম্ভ করিলেন। কিন্তু জ্যোতিষী তাহাকে বাধা দিয়া বলিল, স্বয়ং মুহাম্মাদকেই বলিতে দাও। কারণ তাঁহার উপর যাহা ঘটিয়াছে, তাহা সে নিজেই অধিক জ্ঞাত। রাসূলুল্লাহ্ সে জ্যোতিষীর নিকট ঘটনাটি আদ্যোপান্ত খুলিয়া বলিলেন। ঘটনার বিবরণ শুনিয়া জ্যোতিষী তাহাকে কোলে তুলিয়া লইল এবং চিৎকার দিয়া বলিতে লাগিল, হে আরব জাতি! তোমরা আস। যেই বিপদের আশংকা করিতেছিলাম তাহা প্রকাশ পাইয়া গিয়াছে। তোমরা তাহাকে হত্যা করিয়া মুক্তি লাভ কর। অন্যথায় সে বড় হইয়া তোমাদের ধর্মের অসারতা প্রমাণ করিবে। তোমাদের বিজ্ঞজনদেরকে সে নির্বোধ বানাইয়া দিবে এবং সে এমন একটি ধর্মের দিকে তোমাদিগকে আহ্বান করিবে, যাহার সম্বন্ধে তোমরা অপরিচিত। হালীমা জ্যোতিষীর মুখে এই সমস্ত কথা শুনিয়া মুহাম্মাদ (স)-কে তাহার কোল হইতে ছিনাইয়া লইয়া আসিলেন এবং বলিলেন, জ্যোতিষী! প্রথমে তোমার পাগলামির চিকিৎসা হওয়া উচিৎ।
লক্ষণীয় যে, জ্যোতিষীর বক্তব্যে ইহাই প্রতীয়মান হয়, সে এই ঘটনার বিবরণ শুনিয়াই পরিষ্কার বুঝিতে পারিয়াছিল যে, ইনিই সেই প্রতীক্ষিত ও প্রতিশ্রুত শেষ নবী। তাঁহার উপর ঘটিয়া যাওয়া এই সমস্ত ঘটনা সম্পূর্ণ অলৌকিক। ইহা কোন প্রকারের অসুস্থতা বা কোন অপশক্তির প্রভাব নহে। মজার ব্যাপার এই যে, তখনকার সময়ের একজন বিধর্মী জ্যোতিষীর নিকট অলৌকিক ঘটনাটি বাস্তব এবং আল্লাহর পক্ষ হইতে হওয়া প্রতীয়মান হইলেও আমাদের কতিপয় মুসলিম পণ্ডিতদের নিকট তাহা অবাস্তব বলিয়া মনে হইল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00