📄 প্রথমবার বক্ষবিদারণের কারণ
শৈশবে প্রথমবার রাসূলে কারীম (স)-এর বক্ষ বিদারণের পশ্চাতে বহু কারণ ও রহস্য নিহিত রহিয়াছে। হাদীছ ও সীরাত ভাষ্যকারগণ উহা সবিস্তারে আলোচনা করিয়াছেন। উহার সারসংক্ষেপ এই যে, ফেরেশতাগণ তাঁহার কলব (হৃদপিণ্ড) চিরিয়া কিছু জমাট বাঁধা রক্ত বাহির করিয়া ফেলিয়া দিলেন এবং বলিলেনঃ ইহা শয়তানের অংশ। ফেরেশতাদের এই বাক্য হইতেই পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় যে, এই বক্ষবিদারণের মৌলিক উদ্দেশ্য কি ছিল? কলবের এই জমাট বাঁধা কালো অংশটিই হইল সকল পাপের উৎস, যাহা সৃষ্টিগতভাবে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান আছে। অতঃপর পবিত্র পানি দ্বারা উহা ভাল ভাবে ধৌত করিয়া দেওয়ার কারণ হইল যাহাতে ঐ অপবিত্র অংশের সামান্য মাত্রও তাঁহার কলবে অবশিষ্ট না থাকে। বরফ তথা শীতল পানি ব্যবহার করার কারণ সম্বন্ধে শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনুল আরাবী (র) বলেন, পাপের প্রকৃতি হইল উষ্ণ ও উত্তপ্ত। আর প্রাকৃতিক নিয়ম হইল যখনই কোন উষ্ণ ও উত্তপ্ত বস্তু আদ্রতা ও শীতলতার সংস্পর্শে আসে তখনই উহার প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটে এবং মূল প্রকৃতি হইতে সরিয়া আদ্রতা ও শীতলতার অনুকূলে আসিয়া যায়। তাই শীতল পানি দ্বারা তাঁহার কলব ধৌত করা হইয়াছিল, যাহাতে কলবের মাঝে অপবিত্র বস্তুর অবস্থানের কারণে যেই উষ্ণতার সৃষ্টি হইয়াছিল, তাহা সমূলে বিনাশ হইয়া যায় এবং দয়ামায়া ও আর্দ্রতার অনুকূলে আসিয়া যায় যাহাতে তিনি অদূর ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য একজন দয়ার্দ্রচিত্ত অভিভাবক হিসাবে আবির্ভূত হইতে পারেন।
📄 দ্বিতীয়বার বক্ষবিদারণ
দ্বিতীয়বার রাসূলে কারীম (স)-এর বক্ষ বিদারণ সংঘটিত হইয়াছিল যখন তিনি দশ বৎসরের বালক। ঘটনার বিবরণ এই যে, একদা তিনি কোন এক মরুমাঠে সমবয়সী ছেলেদের সহিত খেলায় রত ছিলেন। হঠাৎ দুইজন ফেরেশতা তাঁহার সম্মুখে আবির্ভূত হইলেন। রাসূল কারীম (স) তাঁহাদের বর্ণনা প্রসংগে বলেনঃ তাঁহারা ছিলেন মনুষ্য আকৃতির। তাঁহাদের মুখমণ্ডল এতই জ্যোতির্ময় ছিল যে, আমি ইতোপূর্বে এমন চেহারা কখনও দেখি নাই। তাঁহাদের শরীরের সুগন্ধির ন্যায় এত মন মাতানো সুগন্ধিও আমি আর কখনও পাই নাই। তাঁহাদের পরিহিত বস্ত্র এতই উজ্জল ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং পরিপাটি ছিল যে, এমন সুন্দর পোশাকও আমি আর কখনও দেখি নাই। তাঁহারা ছিলেন দুইজন ফেরেশতা জিবরাঈল ও মীকাঈল (আ)। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: তাঁহারা উভয়ে আমর নিকটবর্তী হইয়া আমার বাহুদ্বয় এমনভাবে ধরিলেন যে, আমি ইহাতে কোন প্রকার ব্যথা অনুভব করিলাম না। অতঃপর তাঁহারা খুব সতর্কতার সহিত আমাকে এমনভাবে শোয়াইয়া দিলেন যে, তাহাতে আমার অঙ্গ-প্রতঙ্গ স্থানচ্যুত হইল না। অতঃপর তাঁহারা আমার বক্ষ বিদীর্ণ করিলেন এবং একজন অপরজনকে বলিলেন, তাঁহার কালুব (হৃদপিণ্ড) চিরিয়া উহা হইতে হিংসা-দ্বেষ ও ঘৃণার পদার্থ বাহির করিয়া ফেলিয়া দাও। তখন একজন ফেরেশতা আমার হৃদপিণ্ডের মধ্যভাগ হইতে জমাট বাঁধা কিছু রক্ত বাহির করিয়া নিক্ষেপ করিলেন এবং তাঁহাদের সাথে আনিত একটি স্বর্ণের পেয়ালায় রক্ষিত পানি দ্বারা উহা খুব ভালভাবে পরিষ্কার করিয়া ধুইয়া দিলেন। অতঃপর ফেরেশতাদ্বয়ের একজন অপরজনকে বলিলেন, এখন তাঁহার হৃদয়াভ্যন্তরে স্নেহ, ভালবাসা ও মায়া-মমতা ঢালিয়া দাও। তখন তাঁহারা আমার হৃদয়াভ্যন্তরে কোমল এক জাতীয় পদার্থ ঢালিয়া দিলেন এবং হৃদয়টি যথাস্থানে পুনঃ স্থাপন করিয়া দিলেন। অতঃপর তাঁহারা আমার বৃদ্ধাঙ্গুল ধারণ করিয়া আমাকে টানিয়া উঠাইলেন এবং বলিলেন, শান্তিতে থাকুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, এই ঘটনার পর হইতে আমি পৃথিবীর সকলের প্রতি আমার হৃদয়ে সীমাহীন দয়া, মমতা ও ভালবাসা অনুভব করিতে লাগিলাম।
প্রামাণ্য হাদীছ: দশ বৎসর বয়সে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয়বার বক্ষবিদারণের ঘটনাটিও সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। তাবাকাত ইবন সা'দ গ্রন্থে হাদীছটি হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-এর সনদে বর্ণিত হইয়াছে। এই সনদের সকল রাবী সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের রাবীদের অন্তর্ভুক্ত। ইহা ছাড়াও এই ঘটনাটি হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর সনদে প্রখ্যাত সীরাত রচয়িতাগণ নিজ নিজ গ্রন্থে রিওয়ায়াত করিয়াছেন। যথা আবু নু'আয়ম, হাফিয মাকদিসী, আবদুল্লাহ ইবন আহমাদ ও ইবন হিব্বান প্রমুখ। তাঁহাদের প্রত্যেকের সনদ সহীহ। ইমাম মুসলিমও তাঁহার সহীহ মুসলিমে এই হাদীছটি হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-এর সনদে রিওয়ায়েত করিয়াছেন।
দ্বিতীয়বার বক্ষ বিদারণের রহস্য: প্রখ্যাত সীরাত গ্রন্থকার ইদরীস কান্ধলবী (র) বলেন, দশ বৎসর বয়সে সাধারণত বালকদের মন-মানসিকতা খেলাধুলার প্রতি খুব বেশী ঝুঁকিয়া পড়ে যাহা বালককে আল্লাহ্ হইতে গাফেল করিয়া দেয়। তাই এই সময় তাঁহার বক্ষবিদারণ করিয়া খেলাধুলার প্রবণতাকে বিদূরিত করা হইয়াছে।
📄 তৃতীয়বার বক্ষবিদারণ
তৃতীয়বার রাসূলে কারীম (স)-এর বক্ষবিদারণ করা হইয়াছিল যখন তিনি চল্লিশ বৎসরে পদার্পণ করিয়াছিলেন। নবুওয়াত প্রাপ্তির প্রাক্কালে এই ঘটনা সংঘটিত হয়। এই সময় তিনি হেরা গুহায় নির্জনে মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল ছিলেন। একদিন গভীর রজনীতে তিনি সময় নির্ণয়ের জন্য তারকার অবস্থান দেখিবার উদ্দেশ্যে গুহা হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। হঠাৎ তিনি একটি আওয়াজ শুনিতে পাইলেন, কেহ যেন তাঁহাকে মধুময় কণ্ঠে সালাম জানাইতেছেন। আমি তৎক্ষণাৎ গৃহে চলিয়া আসিলাম এবং খাদীজার নিকট বিষয়টি খুলিয়া বলিলাম। খাদিজা বলিলেন, ইহা তো সু-সংবাদ, আপনার ভয়ের কোন কারণ নাই। সালাম প্রদানকারী যিনিই হউন না কেন তিনি আপনার কোন ক্ষতি করিবেন না। কারণ সালাম তে নিরাপত্তা ও শান্তির বাণী। রাসূলে কারীম (স) বলেনঃ কিছু সময় পর আমি আবার গুহার বাহিরে আসিলাম। এইবার দেখিলাম যে, হযরত জিবরাঈল আলায়হিস সালাম দাঁড়াইয়া আছেন। তাঁহার একটি বাহু পশ্চিমাকাশের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত এবং অপর বাহুটি পূর্বাকাশের সীমান্ত পর্যন্ত প্রসারিত। জিবরাঈলের এই বিরাটকায় অবয়ব দেখিয়া আমি ভয় পাইয়া গেলাম এবং গুহায় চলিয়া যাইতে উদ্যত হইলাম। এমন সময় তিনি আমার পথ আগলাইয়া দাঁড়াইয়া গেলেন এবং বলিলেন, আপনি অমুক সময় অমুক স্থানে চলিয়া আসিবেন। আমি যথাসময়ে যথাস্থানে উপস্থিত হইলাম। দেখিলাম জিবরাঈলও উপস্থিত হইয়াছেন। আমার নিকটে আসিয়া আমাকে শোয়াইলেন এবং আমার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া হৃৎপিণ্ড বাহির করিয়া আনিলেন। হৃৎপিণ্ড চিরিয়া উহা হইতে এইবারও পীত বর্ণের কিছু পদার্থ বাহির করিয়া যমযমের পানি দ্বারা হৃৎপিণ্ডটি ভালভাবে ধৌত করিয়া দিলেন এবং যথাস্থানে পুনঃস্থাপন করিলেন।
প্রামাণ্য হাদীছ : তৃতীয়বারের বক্ষবিদারণের ঘটনাটিও সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। মুসনাদে আবূ দাউদ তায়ালিসী ও দালাইলে আবূ নু'আয়ম গ্রন্থদ্বয়ে ঘটনাটি হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত আছে। হাফিয ইবন মুকলিন তাঁহার সহীহ বুখারীর ভাষ্যগ্রন্থে এবং হাফেজ ইবন হাজার আসকালানী তাঁহার ফাতহুল বারী গ্রন্থের মি'রাজ ও ইসরা অধ্যায়ে এই কথা স্বীকার করিয়াছেন যে, নবুওয়াত প্রাপ্তির প্রাক্কালে শককে সদরের ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল। ইহা ছাড়াও মুসনাদে ইমাম বাযযায-এ হযরত আবূ যার গিফারী (রা)-এর সূত্রে উক্ত ঘটনাটি বর্ণিত আছে। আল্লামা হায়ছামী হযরত আবূ যার গিফারী (রা)-এর এই হাদীছটির বিশুদ্ধতা স্বীকার করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন যে, হাদীছটির সনদের সকল বর্ণনাকারী ছিকাহ ও নির্ভরযোগ্য।
তৃতীয়বার বক্ষবিদারণের কারণ ও হিকমত: এই তৃতীয়বার বক্ষ বিদারণের কারণ হইল রাসূলে কারীম (স)-কে ওহীর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রহস্যাবলী এবং আল্লাহর কালামকে ধারণের যোগ্য করিয়া তোলা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: إِنَّا سَنُلْقَى عَلَيْكَ قَوْلاً ثَقِيلاً "আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করিতেছি গুরুভার বাণী (৭৩:৫)।
বর্ণিত আছে যে, আল-কুরআন নাযিল হওয়ার সময় রাসূলে কারীম (স) দুর্বহ বোঝার ন্যায় ভার অনুভব করিতেন, এমনকি প্রচণ্ড শীতেও তাঁহার দেহ ঘর্মাক্ত হইয়া যাইত। তিনি তখন উটের উপর সওয়ার থাকিলে উহা ওজনের কারণে বসিয়া পড়িত। ফলকথা, দৈহিক ও আধ্যাত্মিক উভয় দিক হইতে ওহীর গুরুভার ধারণের উপযুক্ত করিয়া তোলাই হইল তৃতীয়বার বক্ষবিদারণের উদ্দেশ্য।
📄 চতুর্থবার বক্ষবিদারণ
চতুর্থবার রাসূলে কারীম (স)-এর বক্ষবিদারণের ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল মিরাজে যাওয়ার প্রাককালে। এই রজনীতে তিনি হযরত উম্মে হানী (রা)-এর গৃহে নিদ্রামগ্ন ছিলেন। তিনি দেখিলেনঃ অকস্মাৎ গৃহের ছাদ উন্মুক্ত হইয়া গেল। হযরত জিবরাঈল সেই পথে গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন এবং রাসূলে কারীম (স)-কে সঙ্গে লইয়া কাবাগৃহের চত্বরে আগমন করিলেন। হযরত জাফর ও হযরত হামযা (রা) পূর্ব হইতেই হাতীমে ঘুমাইয়াছিলেন। তিনি তাঁহাদের মধ্যখানে শুইয়া পড়িলেন। কিছুক্ষণ পর হযরত জিরবাঈল আবার আগমান করিলেন। তাঁহার সঙ্গে হযরত মীকাঈল এবং আরও একজন ফেরেশতা। ফেরেশতা তিনজনের একজন বলিলেন : এই দুইজনের মধ্যখানে শায়িত সায়িদুল কাওমকে লইয়া চল। অতঃপর তাহারা রাসূলে কারীম (স)-কে লইয়া যমযম কূপের কাছে গেলেন এবং তাঁহাকে শোয়াইয়া তাঁহার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া কলব (হৃৎপিণ্ড) বাহির করিয়া আনিলেন। এইবারও ফেরেশতাগণ তাঁহার হৃৎপিণ্ড চিরিয়া উহার মধ্য হইতে কিছু কালো বর্ণের পদার্থ বাহির করিয়া ফেলিয়া দিলেন। অতঃপর হযরত মীকাঈল একটি পাত্রে যমযম-এর পানি তুলিয়া আনিলেন এবং তাঁহার হৃৎপিণ্ডটি তিনবার ধৌত করিলেন। ইহার পর হযরত জিবরাঈল-এর হাতে রক্ষিত একটি সোনালী পাত্র যাহা ঈমান ও হিকমত দ্বারা ভর্তি ছিল, তাহা দ্বারা তাঁহার হৃদয় পরিপূর্ণ করিয়া দিলেন। অতঃপর জিবরাঈল (আ) নিজ হাতে তাঁহার হৃৎপিণ্ডটি যথাস্থানে বসাইয়া দিলেন।
প্রামাণ্য হাদীছ : এই চতুর্থ বারের বৃক্ষবিদারণের ঘটনাও সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিযী এবং ইমাম নাসাঈ নিজ নিজ গ্রন্থে এই হাদীছটি হযরত আবু যার গিফারী (রা)-এর সূত্রে রিওয়ায়াত করিয়াছেন। এই ঘটনা সম্পর্কিত রিওয়ায়াতসমূহ মুতাওয়াতির অথবা মশহুর।
চতুর্থবার বক্ষবিদারণের কারণ ও হিকমত : মি'রাজের উদ্দেশ্য যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ্র সাথে প্রত্যক্ষ সাক্ষাত, সরাসরি কথোপকথন এবং মহাসৃষ্টির গুরু রহস্যাবলী পরিদর্শন করানো। আর ইহার জন্য আবশ্যক ছিল রাসূলে কারীম (স)-কে আধ্যাত্মিক ও দৈহিক উভয় দিক হইতে ইহা বরদাশত করিবার উপযুক্ত করিয়া দেওয়া। সুতরাং সেই যোগ্যতা ও শক্তি প্রদানের উদ্দেশ্যেই মি'রাজে যাওয়ার প্রাককালে তাঁহার এই চতুর্থবার বক্ষবিদারণ করা হয়। ইহা ছাড়া আরও অনেক রহস্য রহিয়াছে যাহা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।