📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বক্ষবিদারণের রহস্য

📄 বক্ষবিদারণের রহস্য


হযরত শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ (র) দেহলবী বলেন; সৃষ্টিগতভাবে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই মালাকুতী ও শয়তানী নামক দুইটি দৈহিক শক্তি বিদ্যমান আছে। প্রথমটি দ্বারা মানুষ ফেরেশতাদের স্বভাব গ্রহণ করে এবং দ্বিতীয়টি দ্বারা শয়তানী স্বভাব গ্রহণ করে। যেহেতু রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সংশ্রব হইবে জগতের সাথে আর সর্বদা তাঁহার সংবাদ আদান-প্রদান এবং কথোপকথন হইবে ফেরেশতাদের সাথে, তাই তাঁহার মালাকৃতী দিকটি শক্তিশালী হওয়া আবশ্যক (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, ২খ., পৃ. ১০৫)। পক্ষান্তরে শয়তান যে তাঁহাকে কোন প্রকার কুমন্ত্রণা দিতে পারিবে না, ইহাও প্রমাণিত। যেমন তিনি শয়তান সম্বন্ধে বলিয়াছেন, "আমি তাহার কুমন্ত্রণা হইতে রক্ষিত" অথবা "সে আমার আনুগত্য স্বীকার করিয়াছে"। সুতরাং তাঁহার দেহ মুবারকে শয়তানী শক্তি বিদ্যমান থাকার কোনই আশংকা নাই। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই রাসূলের বক্ষ বিদারণের অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয়।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর গোটা জীবনে বক্ষবিদারণের ঘটনা মোট চারবার সংঘটিত হইয়াছে। তবে কোন কোন রিওয়ায়াতে পাঁচবারের কথাও বর্ণিত আছে। কিন্তু তথ্যানুসন্ধানের পর প্রমাণিত হইয়াছে যে, এই পঞ্চমবার বক্ষবিদারণের ঘটনাটি সনদ ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ভরযোগ্য নহে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 প্রথম বক্ষবিদারণ

📄 প্রথম বক্ষবিদারণ


সর্বপ্রথম রাসূলে কারীম (স)-এর জীবনে বক্ষবিদারণের ঘটনা সংঘটিত হয় তাঁহার শৈশবকালে। তখন তিনি বানু সাদ গোত্রে তাঁহার দুধমাতা হযরত হালীমা সা'দিয়া (রা)-এর তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হইতেছিলেন। এই সময় তাঁহার বয়স কত হইয়াছিল এই প্রশ্নে সীরাত রচয়িতা ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রহিয়াছে। কতিপয় সীরাত রচয়িতা বলিয়াছেন যে, তখন তাঁহার বয়স হইয়াছিল দুই বৎসর কয়েক মাস। কিন্তু ইবন সা'দসহ অপর কতিপয় ঐতিহাসিক ও সীরাত রচয়িতার মতে এই সময় তাঁহার বয়স হইয়াছিল চার বৎসর।
ঘটনার বিবরণ এই যে, একদিন তিনি তাঁহার দুধভাইয়ের সহিত ছাগল ও মেষ চরাইতে চারণভূমিতে গমন করেন। হঠাৎ শ্বেত পোশাক পরিহিত দুইজন ফেরেশতা তাঁহার সামনে আবির্ভূত হইলেন। ফেরেশতাদ্বয়ের হাতে বরফের নির্মল পানিতে পরিপূর্ণ একটি স্বর্ণের পাত্র। তাঁহারা রাসূল কারীম (স)-কে মাটিতে শোয়াইয়া দিলেন এবং বক্ষ চিরিয়া তাঁহার কল্প (হৃদপিণ্ড) বাহির করিয়া আনিলেন। অতঃপর কল্ব চিরিয়া উহার মধ্য হইতে কালো বর্ণের জমাট বাঁধা কিছু রক্ত জাতীয় বস্তু বাহির করিলেন এবং বলিলেন, এই অংশটি শয়তানের অর্থাৎ এই অংশটির সাহায্যে শয়তান মানুষকে বিপথগামী করে। অতঃপর তাঁহারা কলবটিকে স্বর্ণের পাত্রে রাখিয়া বরফের পানি দ্বারা ভালভাবে ধৌত করিয়া আবার যথাস্থানে সংস্থাপন করিয়া দিলেন।
অতঃপর ফেরেশতাদ্বয় তাঁহার বক্ষ সুই দ্বারা সেলাই করিয়া দেন এবং দুই স্কন্ধের মধ্যখানে একটি মোহর স্থাপন করিয়া দেন। অতঃপর তাঁহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে বুকে জড়াইয়া ধরিলেন, কপালে চুমা খাইলেন এবং বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি ভীত হইবেন না। আপনি যদি জানিতে পারিতেন যে, মহান আল্লাহ আপনার সম্পর্কে কেমন অভিপ্রায় পোষণ করেন, তাহা হইলে আপনি অত্যন্ত খুশী ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করিতেন।
বক্ষবিদারণের কর্ম সমাপ্ত করিয়া একজন ফেরেশতা অন্য একজন ফেরেশতাকে বলিলেন, তাঁহাকে দশজন, লোকের সহিত ওজন দাও। ওজন করা হইল। ইহাতে তিনি ভারি হইলেন। ফেরেশতা আবার বলিলেন, তাঁহাকে একশতজন লোকের সহিত ওজন কর। ইহাতেও তিনি ভারি হইলেন। ফেরেশতা আবার বলিলেন, তাঁহাকে তাঁহার উম্মতের এক হাজার লোকের সহিত ওজন কর। ইহাতেও তিনি ভারি হইলেন। তখন আদেশকারী ফেরেশতা বলিলেন, আল্লাহ্র শপথ! যদি তাঁহাকে তাঁহার সমস্ত উম্মতের সহিতও ওজন কর তাহা হইলেও তিনিই ভারি হইবেন।
রাসূলে কারীম (স) বলেনঃ আমি উহার শীতলতা এখনও আমার বক্ষে অনুভব করিতেছি। তিনি আরও বলেনঃ যখন ফেরেশতাদ্বয় বক্ষবিদারণ সমাপ্ত করিয়া আসমানের দিকে ফিরিয়া যাইতেছিলেন, তখন আমার দৃষ্টি তাঁহাদের গমন পথ অনুসরণ করিতেছিল। রিওয়ায়াতকারী সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, আমি বক্ষবিদারণের চিহ্ন কখনো কখনো তাঁহার বক্ষে দেখিতে পাইতাম।
শৈশবকালে দুধমাতা হযরত হালীমা সা'দিয়া (রা)-এর তত্ত্বাবধানে অবস্থানের সময়ে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বক্ষ বিদারণের ঘটনা সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত এবং বিভিন্ন হাদীছ গ্রন্থে একাধিক সূত্রে তাহা বর্ণনা করা হইয়াছে।
প্রথম সূত্র: মুসনাদে আহমাদ ও মু'জামে তাবারানী গ্রন্থদ্বয়ে উক্ত হাদীছটি সাহাবী হযরত উতবা ইব্‌ন আব্দ (রা)-এর সূত্রে সবিস্তারে বর্ণনা করা হইয়াছে। ইমাম হাকেম তাঁহার আল-মুস্তাদরাক গ্রন্থে এই হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন এবং ইহার সত্যতা স্বীকার করিয়া বলিয়াছেন যে, এই হাদীছটি ইমাম মুসলিমের শর্তের উপর প্রতিষ্ঠিত। তবে হাদীছটির সনদে বাকিয়্যা ইবনুল ওয়ালীদ নামক একজন রাবী (বর্ণনাকারী) আছেন। তিনি কিছুটা বিতর্কিত। ইহার কারণে কোন কোন মুহাদ্দিছ হাদীছটিকে ইমাম মুসলিমের শর্তানুসারে সহীহ বলিয়া বিবেচনা করিতে সংশয় প্রকাশ করিয়াছেন। কিন্তু হযরত আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, হাফিজ ইয়াহইয়া ইব্‌ন মাঈন, আবূ যুরআ ইজালী, ইবন সা'দ প্রমুখ মুহাদ্দিছ বলেন, বাকিয়্যা ইবনুল ওয়ালীদ ব্যক্তিগতভাবে নির্ভরযোগ্য রাবী। সুতরাং তিনি যদি অপর কোন নির্ভরযোগ্য রাবী হইতে হাদীছ বর্ণনা করেন, তবে তাহা নিঃসন্দেহে গ্রহণযোগ্য। ইমাম নাসাঈ (র) বলেন: তিনি যদি হাদ্দাছানা বা আখবারানা এই জাতীয় স্পষ্ট শব্দ দ্বারা রিওয়ায়াত করেন তাহা হইলে গ্রহণযোগ্য হইবে, অন্যথায় নহে। উল্লেখ্য যে, এই হাদীছ খানার মধ্যে মুহাদ্দিসগণের ব্যবহৃত সকল শর্ত বিদ্যমান। কারণ এই হাদীছটি কোন সনদে "আন' দ্বারা বর্ণিত হইলেও মুস্তাদরাক হাকেম-এর রিওয়ায়াতে আখবারানা ও হাদ্দাছানা শব্দ ব্যবহার করা হইয়াছে এবং বাকিয়‍্যা ইবনুল ওয়ালীদ এই হাদীছটি যাহার সূত্রে রিওয়ায়াত করিয়াছেন তিনি হইলেন বাহর ইন্ন সাঈদ, যিনি একজন নির্ভরযোগ্য রাবী। হাফিজ ইব্‌ন হিব্বান, আবূ হাতিম, ইবন্ সা'দ, ইমাম নাসাঈ, আল্লামা ইজালী ও ইমাম আহমাদ ইব্‌ন হাম্বল প্রমুখ তাঁহাকে নির্ভরযোগ্য বলিয়া স্বীকৃতি দিয়াছেন। আল-হায়ছামী বলেন, উতবা ইব্‌ন আব্দ-এর সূত্রে বর্ণিত হাদীছটি যাহা ইমাম আহমাদ ও তাবারানী নিজ নিজ কিতাবে আনিয়াছেন, হাসান। আল্লামা যুরকানী বলেন, এই হাদীছটির সনদের বিশুদ্ধতা সন্দেহাতীত।
দ্বিতীয় সূত্র: আবূ যার (রা)-এর রিওয়ায়াত। শায়খ বায্যায় স্বীয় মুসনাদে এবং ইমাম দারিমী স্বীয় সুনানে তাঁহার সূত্রে শককে সদরের ঘটনাটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সবিস্তারে বর্ণনা করিয়াছেন। যুরকানী বলেন, আবূ যার গিফারী (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত উক্ত হাদীছটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। হাফেজ যিয়াউদ্দীন আল-মাকদিসীও হাদীছটিকে সহীহ বলিয়াছেন। মুহাদ্দিছগণ লিখিয়াছেন যে, সনদের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে হাফেজ মাকদিসীর মন্তব্য হাকেম-এর মন্তব্যের চেয়েও অধিক বিশুদ্ধ।
হাফিয ইবন হাজার আসকালানী বলেন, আবূ যার গিফারী (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত হাদীছটি উল্লিখিত কিতাবগুলি ছাড়াও নিম্নোক্ত কিতাবসমূহে সহীহ সনদে বর্ণিত হইয়াছে। যথা দালায়েলে আবু নুআয়ম, মুসনাদে আহমাদ, দালায়েলে বায়হাকী ইত্যাদি।
তৃতীয় সূত্র: সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-এর বর্ণনা। তাবাকাত ইবন সাদ গ্রন্থে হাদীছটি সহীহ সনদে বর্ণিত আছে। ইহার সকল রাবী নির্ভরযোগ্য এবং ইমাম বুখারী ও মুসলিম ইহা সমর্থন করিয়াছেন।
চতুর্থ সূত্র: সাহাবী হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর বর্ণনা। হাদীছটিকে আল্লামা সুয়ূতী ইমাম বায়হাকীর বরাতে রিওয়ায়াত করিয়াছেন। ইহা ছাড়া সুয়ূতী তাঁহার খাসাইস নামক গ্রন্থেও হাদীছটি একই সনদে বর্ণনা করিয়াছেন।
পঞ্চম সূত্র: সাহাবী হযরত শাদ্দাদ ইব্‌ন আওস (রা)-এর বর্ণনা। এই হাদীছটি ইব্‌ন হাজার আসকালানী তাঁহার ফাতহুল বারী গ্রন্থে এবং যুরকানী তাঁহার শরহে মাওয়াহিব এ রিওয়ায়াত করিয়াছেন। ইহা ছাড়া শায়খ আবু ইয়ালা তাঁহার মুসনাদে এবং আবূ নুআয়ম তাঁহার দালাইলে এই হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন।
ষষ্ঠ সূত্র: তাবিঈ হযরত খালিদ ইব্‌ন মা'দান (র) এই হাদীছটি ইবন সা'দ তাঁহার তাবাকাত গ্রন্থে (১খ., পৃ. ৯৬) মুরসালরূপে রিওয়ায়াত করিয়াছেন। কিন্তু মুহাম্মদ ইবন ইসহাকের সনদে সুস্পষ্ট রহিয়াছে যে, খালিদ বলেন, আমাকে সাহাবা-ই কেরামের এক জামা'আত শককে সদরের কথা বলিয়াছেন। ইব্‌ন কাছীর ইবন ইসহাকের এই রিওয়ায়াত নকল করিবার পর বলেন, এই সনদটি ভাল এবং মযবুত।
ইদরীস কান্ধলবী (র) বলেন, উল্লিখিত ইবন আব্বাস, শাদ্দাদ ইবন আওস ও খালিদ ইব্‌ন মা'দানের সূত্রে বর্ণিত রিওয়ায়াতসমূহের কোন কোন রাবী দুর্বল। এককভাবে যদিও এই হাদীছগুলি দুর্বল কিন্তু হাদীছখানা একাধিক সূত্রে বর্ণিত হওয়ার কারণে ইহার দুর্বলতা লাঘব হইয়া গিয়াছে এবং ইহা নির্ভরযোগ্য হাদীছে পরিণত হইয়াছে। কারণ মুহাদ্দিছীনে কিরামের সর্বসম্মত নীতি হইল যে, একাধিক সনদ সনদের দুর্বলতাকে লাঘব করিয়া দেয়। দ্বিতীয় কথা হইল যে, ইতোপূর্বে আমরা দেখিয়াছি, এই হাদীছটি একাধিক সহীহ সনদেও বর্ণিত হইয়াছে। সুতরাং এই দুর্বল রিওয়ায়াতগুলি ঐ সহীহ রিওয়ায়াতগুলির সমর্থক বলিয়া বিবেচিত হইবে, হাদীছটি সহীহ হওয়ার ব্যাপারে কোনরূপ সংশয় সৃষ্টির কারণ হইবে না।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 প্রথমবার বক্ষবিদারণের কারণ

📄 প্রথমবার বক্ষবিদারণের কারণ


শৈশবে প্রথমবার রাসূলে কারীম (স)-এর বক্ষ বিদারণের পশ্চাতে বহু কারণ ও রহস্য নিহিত রহিয়াছে। হাদীছ ও সীরাত ভাষ্যকারগণ উহা সবিস্তারে আলোচনা করিয়াছেন। উহার সারসংক্ষেপ এই যে, ফেরেশতাগণ তাঁহার কলব (হৃদপিণ্ড) চিরিয়া কিছু জমাট বাঁধা রক্ত বাহির করিয়া ফেলিয়া দিলেন এবং বলিলেনঃ ইহা শয়তানের অংশ। ফেরেশতাদের এই বাক্য হইতেই পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় যে, এই বক্ষবিদারণের মৌলিক উদ্দেশ্য কি ছিল? কলবের এই জমাট বাঁধা কালো অংশটিই হইল সকল পাপের উৎস, যাহা সৃষ্টিগতভাবে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই বিদ্যমান আছে। অতঃপর পবিত্র পানি দ্বারা উহা ভাল ভাবে ধৌত করিয়া দেওয়ার কারণ হইল যাহাতে ঐ অপবিত্র অংশের সামান্য মাত্রও তাঁহার কলবে অবশিষ্ট না থাকে। বরফ তথা শীতল পানি ব্যবহার করার কারণ সম্বন্ধে শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনুল আরাবী (র) বলেন, পাপের প্রকৃতি হইল উষ্ণ ও উত্তপ্ত। আর প্রাকৃতিক নিয়ম হইল যখনই কোন উষ্ণ ও উত্তপ্ত বস্তু আদ্রতা ও শীতলতার সংস্পর্শে আসে তখনই উহার প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটে এবং মূল প্রকৃতি হইতে সরিয়া আদ্রতা ও শীতলতার অনুকূলে আসিয়া যায়। তাই শীতল পানি দ্বারা তাঁহার কলব ধৌত করা হইয়াছিল, যাহাতে কলবের মাঝে অপবিত্র বস্তুর অবস্থানের কারণে যেই উষ্ণতার সৃষ্টি হইয়াছিল, তাহা সমূলে বিনাশ হইয়া যায় এবং দয়ামায়া ও আর্দ্রতার অনুকূলে আসিয়া যায় যাহাতে তিনি অদূর ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য একজন দয়ার্দ্রচিত্ত অভিভাবক হিসাবে আবির্ভূত হইতে পারেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দ্বিতীয়বার বক্ষবিদারণ

📄 দ্বিতীয়বার বক্ষবিদারণ


দ্বিতীয়বার রাসূলে কারীম (স)-এর বক্ষ বিদারণ সংঘটিত হইয়াছিল যখন তিনি দশ বৎসরের বালক। ঘটনার বিবরণ এই যে, একদা তিনি কোন এক মরুমাঠে সমবয়সী ছেলেদের সহিত খেলায় রত ছিলেন। হঠাৎ দুইজন ফেরেশতা তাঁহার সম্মুখে আবির্ভূত হইলেন। রাসূল কারীম (স) তাঁহাদের বর্ণনা প্রসংগে বলেনঃ তাঁহারা ছিলেন মনুষ্য আকৃতির। তাঁহাদের মুখমণ্ডল এতই জ্যোতির্ময় ছিল যে, আমি ইতোপূর্বে এমন চেহারা কখনও দেখি নাই। তাঁহাদের শরীরের সুগন্ধির ন্যায় এত মন মাতানো সুগন্ধিও আমি আর কখনও পাই নাই। তাঁহাদের পরিহিত বস্ত্র এতই উজ্জল ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং পরিপাটি ছিল যে, এমন সুন্দর পোশাকও আমি আর কখনও দেখি নাই। তাঁহারা ছিলেন দুইজন ফেরেশতা জিবরাঈল ও মীকাঈল (আ)। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: তাঁহারা উভয়ে আমর নিকটবর্তী হইয়া আমার বাহুদ্বয় এমনভাবে ধরিলেন যে, আমি ইহাতে কোন প্রকার ব্যথা অনুভব করিলাম না। অতঃপর তাঁহারা খুব সতর্কতার সহিত আমাকে এমনভাবে শোয়াইয়া দিলেন যে, তাহাতে আমার অঙ্গ-প্রতঙ্গ স্থানচ্যুত হইল না। অতঃপর তাঁহারা আমার বক্ষ বিদীর্ণ করিলেন এবং একজন অপরজনকে বলিলেন, তাঁহার কালুব (হৃদপিণ্ড) চিরিয়া উহা হইতে হিংসা-দ্বেষ ও ঘৃণার পদার্থ বাহির করিয়া ফেলিয়া দাও। তখন একজন ফেরেশতা আমার হৃদপিণ্ডের মধ্যভাগ হইতে জমাট বাঁধা কিছু রক্ত বাহির করিয়া নিক্ষেপ করিলেন এবং তাঁহাদের সাথে আনিত একটি স্বর্ণের পেয়ালায় রক্ষিত পানি দ্বারা উহা খুব ভালভাবে পরিষ্কার করিয়া ধুইয়া দিলেন। অতঃপর ফেরেশতাদ্বয়ের একজন অপরজনকে বলিলেন, এখন তাঁহার হৃদয়াভ্যন্তরে স্নেহ, ভালবাসা ও মায়া-মমতা ঢালিয়া দাও। তখন তাঁহারা আমার হৃদয়াভ্যন্তরে কোমল এক জাতীয় পদার্থ ঢালিয়া দিলেন এবং হৃদয়টি যথাস্থানে পুনঃ স্থাপন করিয়া দিলেন। অতঃপর তাঁহারা আমার বৃদ্ধাঙ্গুল ধারণ করিয়া আমাকে টানিয়া উঠাইলেন এবং বলিলেন, শান্তিতে থাকুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, এই ঘটনার পর হইতে আমি পৃথিবীর সকলের প্রতি আমার হৃদয়ে সীমাহীন দয়া, মমতা ও ভালবাসা অনুভব করিতে লাগিলাম।
প্রামাণ্য হাদীছ: দশ বৎসর বয়সে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয়বার বক্ষবিদারণের ঘটনাটিও সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। তাবাকাত ইবন সা'দ গ্রন্থে হাদীছটি হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-এর সনদে বর্ণিত হইয়াছে। এই সনদের সকল রাবী সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের রাবীদের অন্তর্ভুক্ত। ইহা ছাড়াও এই ঘটনাটি হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর সনদে প্রখ্যাত সীরাত রচয়িতাগণ নিজ নিজ গ্রন্থে রিওয়ায়াত করিয়াছেন। যথা আবু নু'আয়ম, হাফিয মাকদিসী, আবদুল্লাহ ইবন আহমাদ ও ইবন হিব্বান প্রমুখ। তাঁহাদের প্রত্যেকের সনদ সহীহ। ইমাম মুসলিমও তাঁহার সহীহ মুসলিমে এই হাদীছটি হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-এর সনদে রিওয়ায়েত করিয়াছেন।
দ্বিতীয়বার বক্ষ বিদারণের রহস্য: প্রখ্যাত সীরাত গ্রন্থকার ইদরীস কান্ধলবী (র) বলেন, দশ বৎসর বয়সে সাধারণত বালকদের মন-মানসিকতা খেলাধুলার প্রতি খুব বেশী ঝুঁকিয়া পড়ে যাহা বালককে আল্লাহ্ হইতে গাফেল করিয়া দেয়। তাই এই সময় তাঁহার বক্ষবিদারণ করিয়া খেলাধুলার প্রবণতাকে বিদূরিত করা হইয়াছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00