📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর দৈহিক সৌন্দর্য

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর দৈহিক সৌন্দর্য


রাসূলুল্লাহ (স)-এর দৈহিক সৌন্দর্যের আলোচনা করিয়া শেষ করা সত্যই দুষ্কর। তাঁহার সর্বাঙ্গ ছিল অতুলনীয় সুন্দর। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁহাকে এক অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী করিয়া এই পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাঁহার দৈহিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। হযরত আনাস (রা) বলেন: كان النبي أحسن الناس. "মহানবী (স) ছিলেন সৌন্দর্যের সুন্দরের অধিকারী” (বুখারী, পৃ. ১২৮২, হা. ৬০৩৩)। হযরত বারা'আ ইবন 'আযিব (রা) বলেন: ما رأيت شيئا قط أحسن منه. "আমি রাসূলুল্লাহ (স) হইতে অধিক সুন্দর কখনও কোন কিছু দেখি নাই” (বুখারী, পৃ.৭২৯, হা. ৩৫৫১)। হযরত জাবির ইবন সামুরা (রা) বলেন: رأيت رسول الله ﷺ في ليلة اضحيان فجعلت انظر الى رسول الله ﷺ والى القمر وعليه حلة حمراء فاذا هو عندى أحسن من القمر. "আমি এক চাঁদনী রজনীতে লাল ডোরাকাটা লুঙ্গি ও চাদর পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখিতে পাইলাম। আমি কখনও চাঁদের দিকে, আবার কখনও তাঁহার দিকে তাকাইতেছিলাম। পরিশেষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছিলাম যে, তিনি চাঁদের চেয়েও অধিক উজ্জ্বল এবং সুন্দর” (তিরমিযী, ১০খ., পৃ. ২৫৩, হা. ২৮১৬)। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন: ما رأيت شيئا احسن من رسول الله ﷺ كانما الشمس تجرى في وجهه.
"আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেয়ে বেশী সুন্দর কোন কিছু দেখি নাই। তাঁহার ললাটে যেন সূর্য প্রবাহিত ছিল” (মাওয়ারিদুয যাম'আন ইলা যাওয়াইদে ইব্‌ন হিব্বান, ২খ., পৃ. ৯৪৫, হা. ২১১৮)।
হযরত 'আলী (রা) বলেনঃ
لم أر قبله ولا بعده مثله. "আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর পূর্বে ও পরে তাঁহার ন্যায় সুন্দর কোন লোক দেখি নাই" (শামাইল তিরমিযী, বাংলা অনু. আবদুল জলীল, পৃ. ৬, হা. ৫)।
তাঁহার অতুলনীয় সৌন্দর্যের বর্ণনায় সাহাবায়ে কিরাম (রা) হইতে এইভাবে আরও বহু হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুখমণ্ডলের বর্ণনা

📄 মুখমণ্ডলের বর্ণনা


রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখমণ্ডল এতই সুন্দর ছিল যে, সাহাবায়ে কেরাম (রা) তাঁহার মুখমণ্ডলের সাথে চন্দ্র-সূর্যকে তুলনা করিয়াছেন। বাস্তবিকপক্ষে তাঁহার চেহারা মুবারক চন্দ্র-সূর্যের চেয়েও ছিল উজ্জ্বল ও দীপ্তিময়।
হযরত বারা'আ (রা) বলেনঃ
كان رسول الله ﷺ احسن الناس وجها . "রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখমণ্ডল ছিল সর্বাধিক সুন্দর" (বুখারী, পৃ.৭২৯, নং ৩৫৪৯)।
হযরত বারা'আ (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল:
أكان وجه رسول الله له مثل السيف فقال لا بد مثل القمر. "রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখমণ্ডল কি তরবারির ন্যায় চকচকে ছিল? তিনি বলিলেন, না, বরং চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল ছিল" (বুখারী, পৃ. ৭২৯, হা. ৩৫৫২)।
এইখানে দুইটি বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, তাঁহার চেহারা মুবারককে তরবারির সহিত তুলনা করা যায় না। কারণ তরবারি হইতেছে লম্বা আর রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারা ছিল কিছুটা গোলাকার। দ্বিতীয়ত, উজ্জ্বলতার দিক হইতেও তরবারির সহিত তাঁহার চেহারা মুবারকের তুলনা হয় না। কারণ তাঁহার চেহারা ছিল তরবারির চেয়েও উজ্জ্বল। ইহা ছাড়া চন্দ্রের মধ্যে দুইটি গুণই বিদ্যমান। অর্থাৎ গোলাকৃতি ও উজ্জ্বলতা। সুতরাং বারা'আ (রা) তাঁহার চেহারা মুবারককে চন্দ্রের সহিত তুলনা করিয়াছেন (আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ২খ., পৃ. ২২০)।
হযরত জাবির ইবন সামুরা (রা)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিল, রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারা মুবারক কি তরবারির ন্যায় ছিল? জবাবে তিনি বলিলেন:
لا بل مثل الشمس والقمر وكان مستديرا ... "না; বরং চন্দ্র-সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল এবং গোলাকার” (মুসলিম, ৮খ., পৃ. ১০৬, হা. ২৩৪৪)।
এই গোলাকার বলিতে একেবারেই গোল ছিল তাহা নয়, বরং পরিমিত গোল্ব ছিল। যেমন হযরত আলী (রা) বলেন, ولا بالمكلثم وكان في وجهه تدوير "তাঁহার চেহারা মুবারক একেবারে গোলাকৃতির ছিল না, বরং কিছুটা গোল ছিল" (মুখতাসারুশ শামাইলিল মুহাম্মাদিয়্যা, পৃ. ১৬; শামায়েল ইমাম তিরমিযী, পৃ. ৭)।
হযরত আবৃত তুফাইল (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল: أرايت رسول الله ﷺ قال نعم كان ابيض مليح الوجه. "আপনি কি রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখিয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ, তিনি ছিলেন গৌর বর্ণের, সুন্দর কমনীয় চেহারাবিশিষ্ট” (মুসলিম, ৮খ., পৃ. ১০৩, হা. ২৩৪০)।
হযরত কা'ব ইবন মালিক (রা) বলেন: كان إذا سر استنار وجهه كانه قطعة قمر. "রাসূলুল্লাহ (স) যখন কোন কারণে উৎফুল্ল হইতেন তখন তাঁহার মুখমণ্ডল ঔজ্জ্বল্যের কারণে চমকাইতে থাকিত। মনে হইত যেন চন্দ্রের একটি টুকরা” (সাহীহ আল-জামে আস-সাগীর ওয়া-যিয়াদাতুহু, ৪খ., পৃ. ২২২, হা. ৪৬১৫)।
একবার তিনি হযরত 'আইশা (রা)-এর কাছে অবস্থান করিতেছিলেন। ঘর্মাক্ত হওয়ায় তাঁহার চেহারা আরও উজ্জ্বল দেখাইতেছিল। এই অবস্থা অবলোকন করিয়া হযরত 'আইশা (রা) আবূ কুবায়র হাজলীর এই কবিতা আবৃত্তি করিলেনঃ واذا نظرت الى أسرة وجهه - يرقت كبرق العارض المتهلل. "তাঁহার চেহারায় তাকাইয়া দেখিতে পাইলাম দ্যুতিময় মেঘ যেন চমকায় অবিরাম" (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৯৭)।
হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) তাঁহাকে দেখিয়া এই কবিতা আবৃত্তি করিতেন: أمين مصطفى بالخير يدعى كضوء البدر زايله الظلام. "মুসতাফা ছিলেন বিশ্বস্ত, ভালোর পথে দেন দাওয়াত, পূরণ করেন অঙ্গীকার, চতুর্দশীর চাঁদের ন্যায় অন্ধকারকে উহা দূরীভূত করেন" (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৯৭)।
হযরত উমার (রা) তাঁহাকে দেখিয়া কা'ব ইব্‌ন যুহায়র-এর এই কবিতা আবৃত্তি করিতেন : لو كنت من شيئ سوى بشر - كنت المنور ليلة البدر. "মানুষ যদি না হইতেন এই আল্লাহর প্রিয়জন, চতুর্দশীর রাত তিনি করিতেন তবে রওশন" (আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ২খ., পৃ. ২২৪)।
রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই সমস্ত বস্তুর সহিত তুলনা করা শুধু তাঁহার একটি উপমা পেশ করিবার জন্য। বাস্তবিকপক্ষে তাঁহার সত্তা তুলনাহীন। কেননা উপমার তো খুঁত আছে। কিন্তু তিনি এমন এক সত্তা যাঁহার কোন খুঁত নাই। কবি আবূ নুওয়াস বলেন: وتتيه الشمس والقمر المنير - إذا قلنا كانهما الامير وان الدر ينقصه المسير - لان الشمس تغرب حين تمسى
"দীপ্তিময় চন্দ্র-সূর্যকে আমরা আমীর হিসাবেই গণ্য করি। অথচ সন্ধ্যাবেলায়ই তো সূর্য অস্তমিত হইয়া যায়। আর চন্দ্র তো উহার কক্ষপথে চলিতে চলিতে ক্ষয় হইয়া যায়” (আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ২খ., পৃ. ২১৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মস্তক মুবারকের বর্ণনা

📄 মস্তক মুবারকের বর্ণনা


মহানবী (স)-এর মস্তক মুবারকের আকার ছিল কিছুটা বড়। হযরত আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর মস্তক ছিল ضخم الرأس (কিছুটা বড়) (শামাইল, ইমাম তিরমিযী, অনু. আবদুল জলীল, পৃ. ৬)।
হযরত হিন্দ ইব্‌ন আবু হালা (রা) বলেন, كان عظيم الهامة "রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র মস্তক একটু বড় ছিল” (মুখতাসারুশ শামাইলিল মুহাম্মাদিয়্য, পৃ. ১৮; ইমাম তিরমিযী, শামায়েল, পৃ. ৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 চুল মুবারকের বর্ণনা

📄 চুল মুবারকের বর্ণনা


মহানবী (স)-এর চুল মুbarক ছিল খুবই সুন্দর। তাঁহার চুল অত্যধিক কুঞ্চিতও ছিল না আবার একেবারে সোজাও ছিল না। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর চুল ছিল সামান্য কুঞ্চিত (সিলসিলাতুল আহাদীছ আস-সাহীহাহ্, ৫খ., পৃ. ৮২, হা. ২০৫৩; ইমাম তিরমিযী, শামায়েল, পৃ. ১২)।
কাতাদা (র) বলেন, আমি আনাস (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম : كيف كان شعر رسول الله ﷺ قال كان شعرا رجلا ليس بالجعد ولا السبط بين اذنيه وعاتقه.
"রাসূলুল্লাহ (স)-এর চুল মুবারক কেমন ছিল? তিনি বলিলেন, তাঁহার কেশ মুবারক না খুব বক্র ছিল আর না খুব সরল। তাঁহার মাথার চুল দুই কানের মধ্য পর্যন্ত লম্বা ছিল” (মুসলিম, ফাদাইল, ৮খ., পৃ. ১০১, হা. ৬০৬৭/৯৪/২৩৩৮)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) রাসূল (স)-এর চুলের বর্ণনা বলেন: شديد سواد الشعر.
"তাঁহার চুল ছিল খুবই কালেন” (সাহীহ আল-জামে আস-সাগীর ওয়া যিয়াদাতুহু, ৪খ.. পৃ. ১৯৯, হা. ৪৫০৯)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর তিন ধরনের চুল রাখার বর্ণনা হাদীছ শরীফে পাওয়া যায়। হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেনঃ
كان شعر رسول الله الى نصف اذنيه. "রাসূলুল্লাহ (স)-এর কেশগুচ্ছ কানের অর্ধেক পর্যন্ত প্রলম্বিত ছিল" (ইমাম তিরমিযী, শামায়েল, পৃ. ২৮)।
হযরত আনাস (রা) বলেন, "রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাথার চুল তাঁহার দুই কানের মাঝখান পর্যন্ত লম্বা ছিল” (মুসলিম, ৮ খ., পৃ. ১০১, হা. ৬০৬৭/৯৪/২৩৩৮)।
হযরত বারাআ (রা) বলেন: له شعر يبلغ شحمة اذنيه. "তাঁহার চুল তাঁহার দুই কানের লতি পর্যন্ত পৌছিত" (বুখালী, পৃ. ৭২-৯ হা. ৩৫৫১)।
হযরত বারা'আ (রা) আরও বলেন: ما رأيت من ذى لمة احسن في حلة حمراء من رسول الله له شعر يضرب منكبيه. "লাল ডোরাবিশিষ্ট লুঙ্গি পরিহিত 'লিম্মাহ' তথা ঘাড় পর্যন্ত প্রলম্বিত চুলওয়ালা কোন ব্যক্তিকেই আমি রাসূলুল্লাহ (স) অপেক্ষা সুন্দর দেখি নাই” (আবূ দাউদ, কিতাবুত-তারাজ্জল, ৪খ., পৃ. ৭৯, হা. ৪১৮৩)।
আল-বারা'আ (রা) বলেনঃ إن جمته لتضرب قريبا من منكبه. "তাঁহার মাথার চুল প্রায় তাঁহার কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছিত” (বুখারী, লিবাস, বাব আল-জা'দ, পৃ. ১২৬১, বা. ৫৯০১)।
হযরত 'আইশা (রা) বলেন: كان شعر رسول الله ﷺ فوق الوفرة ودون الجمة. "রাসূলুল্লাহ (স)-এর চুল মুবারক ছিল ওয়াফরাহ হইতে কম এবং জুম্মাহ হইতে বেশী” (আবূ দাউদ, ৪খ., পৃ. ৭৯, হা. ৪১৮৭)।
হযরত উম্মে হানী (রা) বলেনঃ قدم النبي ﷺ مكة وله أربع غدائر تعتى عقائص. "রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের কাছে মক্কায় আগমন করিলেন এমতাবস্থায় যে, তাঁহার মাথার চুল চার গুচ্ছে বিভক্ত ছিল” (আবূ দাউদ, ৪খ., পৃ. ৮০, হা. ৪১৯১)।
উল্লিখিত হাদীছসমূহের আলোকে বলা যায়, রাসূলুল্লাহ (স)-এর তিন ধরনের চুল ছিল। জুম্মাহ, লিম্মাহ ও ওয়াফরাহ। মাথার চুল লম্বা হইয়া কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছাইলে ইহাকে 'জুম্মাহ' বলা হয়; আর ঘাড়ের মধ্যভাগ পর্যন্ত পৌছাইলে ইহাকে 'লিম্মাহ' বলা হয় এবং কর্ণমূল বা কর্ণের মধ্যভাগ পর্যন্ত পৌঁছাইলে ইহাকে 'ওয়াফরাহ' বলা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00