📄 দু'আর গুরুত্ব ও ফযীলাত
মহান আল্লাহ্ তাঁহার নিকট দু’আ করার জন্য তাঁহার বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়াছেন এবং সেই দু’আ কবুলেরও আশ্বাস প্রদান করিয়াছেন। তিনি বলেন:
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ.
“তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব” (৪০: ৬০)।
وَاِذَا سَاَلَكَ عِبَادِيْ عَنِّيْ فَاِنِّيْ قَرِيْبٌ اُجِيْبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ اِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيْبُوْا لِيْ وَلْيُؤْمِنُوْا بِيْ لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُوْنَ.
"আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, আমি তো নিকটেই। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে আমি তাহার আহ্বানে সাড়া দেই। সুতরাং তাহারাও যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমাতে ঈমান আনয়ন করে যাহাতে তাহারা ঠিক পথে চলিতে পারে" (২: ১৮৬)।
রাসূলুল্লাহ (স) দু'আকে সকল ইবাদতের মগয তথা সারনির্যাস বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি বলেন:
الدعاء مخ العبادة.
"দু'আ সকল ইবাদতের মগয” (তিরমিযী, কিতাবুদ দা'আওয়াত, হাদীছ নং ৩৩৭১)।
অন্য এক রিওয়ায়াতে রাসূলুল্লাহ (স) দু'আকেই ইবাদত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেনঃ الدعاء هو العبادة "দু'আই ইবাদত” (তিরমিযী, কিতাবুত-তাফসীর, সূরা বাকারা, হাদীছ নং ২৯৬৯)।
দু'আ মানুষের তাকদীর পর্যন্ত পরিবর্তন করিয়া দেয়। রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ
لا يرد القضاء الا الدعاء ولا يزيد في العمر الا البر.
"দু'আ ছাড়া অন্য কোন কিছুই তাকদীর রদ করিতে পারে না। আর সৎকর্ম ব্যতীত অপর কিছুই হায়াত বাড়াইতে পারে না” (তিরমিযী, কিতাবুদ কাদর, হাদীছ নং ২১৪২)।
দু'আই আল্লাহ্র নিকট বান্দার সর্বাধিক প্রিয় আবেদন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ
ليس شيئ اكرم على الله تعالى بالدعاء.
"আল্লাহ্ তা'আলার নিকট দু'আ অপেক্ষা অধিক মর্যাদাপূর্ণ আর কিছু নাই” (তিরমিযী, কিতাবুদ দা'ওয়াত, হাদীছ নং ৩৩৭০)।
অপরপক্ষে আল্লাহ্র নিকট দু'আ না করিলে তিনি অসন্তুষ্ট হন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন:
من لم يدع الله سبحانه غضب عليه.
"যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করে না, আল্লাহ তাহার প্রতি অসন্তুষ্ট হন" (ইবন মাজা, কিতাবুদ-দু'আ, হাদীছ নং ৩৮২৭)।
দু'আর দ্বারা মানুষের বালা-মসীবত ও বিপদাপদ দূর হয়। রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ
الدعاء ينفع مما نزل ومما لم ينزل.
"যে সমস্ত বালা-মসীবত আসিয়াছে এবং যাহা এখনও আসে নাই সব ক্ষেত্রেই দু'আ উপকারী" (হিসনে হাসীন, পৃ. ১৫, হাকেম ও তাবারানীর বরাতে)।
মুসলমানের দু'আ আল্লাহ কবুল করেন, যেমন পূর্বোল্লিখিত আয়াতে ও হাদীছে আল্লাহ্ ওয়াদা উক্ত হইয়াছে। তবে কখনও বান্দা যাহা চায়, হুবহু তাহাই তাহাকে দেওয়া হয় অথবা তাহাকে প্রার্থিত জিনিস না দিয়া তাহার উপর আপতিত কোনও বিপদ হটাইয়া দেওয়া হয় অথবা কিয়ামতের জন্য তাহা জমা করিয়া রাখা হয়। রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ
ما من احد يدعو بدعاء الا اتاه الله ما سأل اوكف عنه من السوء مثله مالم يدع باثم او قطيعة رحم.
"কেহ যদি কোনও দু'আ করে আর তাহা যদি কোন গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার রদু'আ না হয়, তবে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই সে যাহা প্রার্থনা করে তাহা তাহাকে দান করেন অথবা তাহার উপর আসন্ন সেই পরিমাণ অনিষ্ট রোধ করেন" (তিরমিযী, হাদীছ নং ৩৩৮২)।
ইমাম আহমাদ (র)-এর বর্ণনায় উক্ত হইয়াছে:
ما من مسلم ينصب وجهه لله تعالى في مسألة الا اعطاها اياه اما ان يعجلها له واما ان يدخرها له.
"যে কোনও মুসলমান আল্লাহ্র নিকট কিছু চাহিবার জন্য মুখ তোলে আল্লাহ অবশ্যই তাহার প্রার্থিত জিনিস তাহাকে দান করেন। প্রার্থিত জিনিসই তাহাকে প্রদান করেন অথবা তাহার জন্য তাহা জমা করিয়া রাখেন" (মুসনাদে আহমাদ, রাবী আবূ হুরায়রা (রা), হিসনু হাসীন হইতে এখানে উদ্ধৃত পৃ. ১৯)।
📄 দু'আর আদব
দু'আ করার জন্য বেশ কিছ আদব (নিয়ম-কানুন) রহিয়াছে। উহার কিছু প্রসিদ্ধ আদব হইল: ১. খানা-পিনা, পোশাক-পরিচ্ছদ ও রোযগারের ক্ষেত্রে হারাম পরিহার করা; ২. ইখলাস তথা নিষ্ঠার সহিত দু'আ করা; ৩. দু'আর পূর্বে কিছু সৎকর্ম সম্পাদন করা, যথা সালাত আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত বা খতম করা অথবা কিছু দান-খয়রাত করা ইত্যাদি; ৪. পাক-পবিত্র হওয়া; ৫. উযূ করা, ৬. কিবলামুখী হওয়া; ৭. দু'আর পূর্বে সালাত আদায় করা; ৮. উভয় হাঁটু জোড় করিয়া আত্তাহিয়্যাতুর অবস্থায় বসা; ৯. দু'আর শুরু ও শেষে আল্লাহ্র প্রশংসা করা; ১০. প্রথমে রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি দুরূদ পাঠ করা; ১১. উভয় হাত প্রসারিত করিয়া উভয় কাঁধ পর্যন্ত অথবা বক্ষ বরাবর উত্তোলন করা; ১২. উভয় হাতের মধ্যে কিছুটা ফাঁক রাখা; ১৩. অত্যন্ত বিনয়-নম্রতা ও কাকুতি-মিনতি সহকারে দু'আ করা; ১৪. দু'আর সময় আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত না করা; ১৫. আল্লাহ তা'আলার সত্তাবাচক (যাতী) ও গুণবাচক (সিফাতী) নাম লইয়া দু'আ করা; ১৬. নবী-রাসূলগণের ও আল্লাহ্র সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের উসীলা দিয়া দু'আ করা; ১৭ নিম্নস্বরে দু'আ করা, একেবারে আস্তেও না, খুব বেশী জোরেও না; ১৮. গুনাহের কথা স্বীকার করিয়া দু'আ করা; ১৯. সহীহ হাদীছে বর্ণিত দু'আসমূহ বলা। তবে মাতৃভাষায় দু'আ করিতেও কোন বাধা নাই; ২০. নিজের জন্য প্রথমে দু'আ করা; অতঃপর পিতা-মাতা ও মুমিন ভাইদের জন্য দু'আ করা; ২১. ইমাম হইলে নিজের জন্য এবং অন্য সকলের জন্য দু'আ করা; ২২. দু'আ কবুল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস সহকারে দু'আ করা; ২৩. একাগ্রতা সহকারে দু'আ করা এবং আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা; ২৪. একই দু'আ বারবার বলা, অন্ততপক্ষে তিনবার বলা; ২৫. গুনাহ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দু'আ না করা; ২৬. দু'আর মধ্যে নিজের সমস্যাবলীর কথা উল্লেখ করা; ২৭. দু'আকারী ও শ্রোতা সকলের আমীন বলা; ২৮. দু'আ শেষ করার পর উভয় হাত মুখমণ্ডলে মোছা (হিসনে হাসীন, পৃ. ৩৯-৪২; কিতাবুল আযকার, পৃ. ৩৭০-৭২)।
📄 দু'আ কবুল হওয়ার সময়
মহানবী (স) তাঁহার হাদীছে বেশ কিছু সময়ের উল্লেখ রহিয়াছেন, যখন দু'আ করিলে তাহা কবুল হয়। উহা নিম্নরূপ:
প্রতিদিন রাত্রের শেষ প্রহরে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে তাঁহার নিকট দু'আ করিতে ও কিছু চাহিতে আহ্বান জানান। রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ
ينزل ربنا تبارك وتعالى حين يبقى ثلث الليل الآخر كل ليلة فيقول من يسألني فاعطيه من يدعنى فاستجيب له من يستغفرني فاغفر له حتى تطلع الفجر.
"প্রতি রাত্রেই উহার শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকিতে আল্লাহ তা'আলা (প্রথম আকাশে) অবতরণ করিয়া বলিতে থাকেন, আমার নিকট কে চাহিবে? আমি তাহাকে দান করিব, আমার নিকট কে দু'আ করিবে? আমি তাহার দু'আ কবুল করিব, আমার নিকট কে ক্ষমা প্রার্থনা করিবে? আমি তাহাকে ক্ষমা করিব। এভাবে ভোর হওয়া পর্যন্ত তিনি বলিতে থাকেন" (সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাহাজ্জুদ; ইবুন মাজা, কিতাবুস-সালাত, হাদীছ নং ১৩৬৬)।
১. কদর রজনীতে; ২. আরাফাত দিবসে; ৩. রমযানুল মুবারকে; ৪. জুমু'আর রাত্রে অর্থাৎ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত্রে; ৫. জুমু'আর দিনে। এই ব্যাপারে কয়েক ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়, তন্মধ্যে আবূ হুরায়রা (রা)-এর বর্ণনা হইল: আসরের পর হইতে মাগরিবের পূর্ব পর্যন্ত। এতদ্বতীত ইমাম মিম্বরে আরোহণ করা হইতে নামায শেষ করা পর্যন্ত সময়ের কথা হাদীছে উল্লিখিত আছে; ৬. অর্ধরাত্র অতিবাহিত হইবার পর; ৭. রাত্রের প্রথম তৃতীয়াংশে; ৮. রাত্রের শেষ তৃতীয়াংশে; ৯. প্রত্যেক রাত্রির শেষ তৃতীয়াংশের মধ্যভাগে; ১০. সাহরীর সময়।
📄 যেসব অবস্থায় দু'আ কবুল হয়
দু'আকারী নিম্নলিখিত অবস্থায় দু'আ করিলে তাহা কবুল হওয়ার আশা করা যায়: ১. নামাযের আযান হওয়ার সময় আযানের উত্তরদান ও আযানের দু'আ পড়ার পর; ২. আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে; ৩. বিপদাপদে নিপতিত ব্যক্তি মুআযযিনের (حى على الصلوة) হায়্যা 'আলাস-সালাহ) ও (حى على الفلاح) হায়্য আলাল-ফালাহ) বলার পর দু'আ করিলে; ৪. যুদ্ধের ময়দানে কাতার সোজা করার সময়; ৫. যুদ্ধের ময়দানে আক্রমনোদ্যত অবস্থায়; ৬. ফরয নামাযের পরে; ৭. সিজদারত অবস্থায়; ৮. কুরআন কারীম তিলাওয়াত শেষে; ৯. কুরআন কারীম খতম করার পর; ১০. যমযমের পানি পানরত অবস্থায়; ১১. কাহারও মৃত্যু উপস্থিত হইলে; মৃত্যুপথযাত্রী এবং উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ সকলেই দু'আ করিবে। ১২. মোরগের আওয়ায শুনিবার সময়; ১৩. মুসলমানদের সমাবেশে একাকী বা সম্মিলিতভাবে দু'আ করিলে। অনুরূপভাবে যিকিরের মজলিসে ও কুরআন হাদীছ-এর মজলিসে। ১৪. ইমাম (ولا الضالين) ওয়ালাদ্দুয়াল্লীন) বলার পরপর সকলে আমীন বলিলে; ১৫. মৃত ব্যক্তির চক্ষু বন্ধ করা অবস্থায়; ১৬ নামাযের ইকামত দেওয়ার সময়; ১৭. বৃষ্টি বর্ষিত হওয়ার সময়। ইমাম শাফি'ঈ (র) তাঁহার কিতাবুল উম্ম গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন, বৃষ্টি বর্ষণের সময় দু'আ কবুল হয় ইহা আমি বহু আলিমের মুখে শ্রবণ করিয়া মুখস্থ করিয়াছি এবং ১৮. কা'বা শরীফ দর্শনের সময়। উপরিউক্ত মুহূর্তগুলিতে দু'আ করিলে তাহা কবুল হওয়ার আশা করা যায় (আল-জাযারী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬১-৬২)।