📄 (নয়) বাহ্যিকভাবে নিরস শব্দমালার আড়ালে করুণার বারিধারা
রাসূলুল্লাহ (স) কখনও অশ্লীলভাষী, অভিসম্পাৎকারী এবং নিজের জন্য প্রতিশোধ গ্রহণকারী ছিলেন না। তবে আল্লাহ্ সীমারেখা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তাঁহার সন্তুষ্টি বিধানে প্রতিশোধ নিতে তিনি কখনও ভুল করিতেন না। স্বভাবত তিনি ছিলেন একজন ক্ষমাপরায়ণ, ধৈর্যশীল, উম্মতের প্রতি অতিশয় দয়ার্দ্র, তাহাদের কল্যাণকামী, উপকার সাধনে অগ্রহী ও তাহাদেরকে সতর্ককারী। তুফায়ল আদ-দাওসী ও তাঁহার সাথীরা আসিয়া যখন বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! দাওস গোত্রের লোকেরা কাফির এবং অবাধ্য হইয়া গিয়াছে। আপনি তাহাদেরকে বদদু'আ করুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: “হে আল্লাহ! আপনি দাওস গোত্রকে হিদায়াত দান করুন এবং তাহাদের প্রতি দয়া করুন।" অনুরূপ ঘটনার বহু উদাহরণ বিদ্যমান।
তবে রাসূলুল্লাহ (স) হইতে কোথাও কোথাও বাহ্যত তিরস্কারমূলক যে দুই-একটি শব্দ পাওয়া যায়, সেই সম্পর্কে আল্লামা নববী (র) বলেন, সেগুলি উহার আক্ষরিক ও প্রকৃত অর্থে ব্যবহৃত হয় নাই এবং সেগুলি ইচ্ছাকৃতভাবেও ব্যবহৃত হয় নাই, বরং আরবদের বাকরীতি অনুযায়ী অনিচ্ছাকৃতভাবেই তাহা প্রযুক্ত হইয়াছে। যেমন রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: تریت يمينك 'তোমার দক্ষিণ হস্ত মাটিযুক্ত হউক" عقری حلقی "সে কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগ করুক"। অনুরূপভাবে জনৈক মহিলার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উক্তি: لاكبر سنك "তোমার বয়স দীর্ঘ না হউক"। মু'আবিয়া (রা)-কে বলিয়াছেন: لا اشبع الله بطنه আল্লাহ তাহার উদর পূর্তি না করুন" ইত্যাদি।
অথবা ইহার তাৎপর্য হইল, যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স) এরূপ উক্তি করিয়াছেন, শরী'আতগত কারণে বাহ্যিকভাবে সে তাহারই উপযুক্ত ছিল, যদিও অন্তর্নিহিত দৃষ্টিতে তাহার জন্য তাহা প্রযোজ্য ছিল না। কেননা বাহ্য বিষয়ে বিধান প্রবর্তনের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স) আদিষ্ট ছিলেন এবং অন্তর্নিহিত বিষয়গুলি আল্লাহ নিজ হাতে রাখিয়া দিয়াছেন (শারহুন নাবাবী 'আলা সাহীহ মুসলিম, ১৬খ., ১৫২)।
এজন্যই রাসূলুল্লাহ (স) নিজ মহানুভবতা ও মমত্ববোধের কারণে আশংকা করিতেন, না জানি এই কথাগুলি আল্লাহ্র নিকট কবূল হইয়া যায়। তাই পরক্ষণেই তিনি আল্লাহর নিকট বিনীত প্রার্থনা জানাইতেন যেন এই শব্দগুলিকে তাহার জন্য রহমত, গুনাহের কাফফারা, নৈকট্য, পবিত্রতা ও প্রতিদান লাভের উপায় হিসাবে গণ্য করা হয়। যাহার জন্য এই ধরনের শব্দ প্রযোজ্য ছিল না এবং সে মুসলমান ছিল, সাধারণত তাহার ব্যাপারেই তিনি এমনটি করিতেন। অন্যথা কাফির এবং মুনাফিকদের জন্য রাসূলুল্লাহ (স) বদদু'আ করিয়াছেন এবং তাহা তাহাদের জন্য আদৌ রহমতস্বরূপ ছিল না। সুতরাং বদদু'আর উপযুক্ত নয় এমন কাহাকেও বাহ্যত বদদু'আ করা হইলে তাহার জন্য তাহা গুনাহের কাফফারা, রহমত ও নৈকট্য লাভের উপায়ে পরিণত হইবে। উম্মত হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বহুবিধ স্বাতন্ত্র্যের মাঝে ইহাও একটি। স্বাতন্ত্র্য বা বৈশিষ্ট্য এই মর্মে নিম্নোক্ত হাদীছখানি সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট হইতে এমন অঙ্গীকার চাই, যাহাতে কখনও তুমি আমার খেলাফ করিবে না। আমি তো একজন মানুষ! যে কোন মু'মিনকে আমি কষ্ট দিয়াছি, গালি দিয়াছি, ভর্ৎসনা করিয়াছি এবং বেত্রাঘাত করিয়াছি—সেগুলিকে তাহার জন্য রহমত, উত্তম প্রতিদান ও নৈকট্য লাভের উপায় হিসাবে প্রতিপন্ন কর। এইগুলির বদৌলতে কিয়ামতের দিন তাহাকে তোমার নৈকট্য লাভকারী করিও (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১খ., হাদীছ নং ৬৩৬১; মুসলিম, বির, বাব ২৫, হাদীছ নং ৬৬২৯/৯০/২৬০১)।
টিকাঃ
* নিবন্ধটি 'নাদরাতুন নাঈম' (আরবী) শীর্ষক কিতাবের ১ম খণ্ডের বঙ্গানুবাদ গ্রন্থ হইতে প্রয়োজনীয় সংশোধনীশেষে সন্নিবিষ্ট করা হইয়াছে। বিস্তারিত বরাতের জন্য মূল কিতাব দেখা যাইতে পারে।