📄 নফল নামাযের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আছে
দাঁড়াইয়া আদায় করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নফল নামায বসিয়া আদায় করা জায়েয। তবে ফরয নামাযের ব্যাপারটি ইহা হইতে আলাদা। সুতরাং কোন লোক এভাবে নফল নামায আদায় করিলে তাহার নামায সঠিক হইবে বটে, কিন্তু সে দাঁড়াইয়া আদায়কারীর তুলনায় অর্ধেক ছওয়াবের অধিকারী হইবে। এই সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন : উপবিষ্ট অবস্থায় নামায আদায়ের ছওয়াব দণ্ডায়মান অবস্থায় আদায় করার অর্ধেক (আবূ দাউদ, নং ৯৫১; তিরমিযী, নং ৩৭১; তিনি হাদীছটিকে হাসান ও সহীহ বলিয়াছেন। নাসায়ী, ৩ খ., ২২৩-২২৪; ইব্ন মাজা, নং ১২৩০; যাওয়াইদ গ্রন্থে বুসীরী-এর সনদকে সহীহ বলিয়াছেন। বুখারী, ফাতহুল বারী, ২খ., নং ১১১৬)।
উক্ত বিধানটি উম্মতের সকলের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) এক্ষেত্রে স্বীয় উম্মত হইতে স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী। কেননা বিশেষ মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের কারণে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও উপবিষ্ট অবস্থায় তাঁহার নফল নামাযকে দণ্ডায়মান অবস্থার সমপর্যায়ের বলিয়া সাব্যস্ত করা হইয়াছে। এই মর্মে সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আমর (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে বলা হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন : উপবিষ্ট অবস্থায় আদায়কারী ব্যক্তির নামায হল অর্ধ নামায। তিনি বলেন, কথাটি শুনিয়া আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিয়া দেখিতে পাই যে, তিনি বসিয়া নফল নামায আদায় করিতেছেন। আমি তাঁহার মাথায় হাত রাখিলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আবদুল্লাহ ইব্ন আমর! তোমার কী হইয়াছে? আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে বলা হইয়াছে, আপনি বলিয়াছেন : বসিয়া নামায আদায়কারী ব্যক্তি অর্ধ-পরিমাণ নামাযের ছওয়াব পাইবে, অথচ আপনি বসিয়া নফল নামায আদায় করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, হাঁ, তাহা সত্য। তবে আমি তোমাদের কাহারও মত নই (মুসলিম, সালাত, বাব ১৬, নং ১৭১৫/১২০/৭৩৫)।
আল্লামা নববী ও অন্যান্য আলিমের মতে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও উপবিষ্ট অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নফল নামায আদায় করার ছওয়াব দণ্ডায়মান অবস্থায় আদায় করার ছওয়াবের সমান। আর ইহা হইল তাঁহার বৈশিষ্ট্যস্বরূপ।
📄 (ছয়) নবীগণের পরিত্যক্ত সম্পদ ওয়ারিছদের মধ্যে বণ্টিত হয় না
নবীগণ হইলেন মানুষের প্রতি আল্লাহর দূতস্বরূপ। তাঁহারা ওহী বাহক। তাঁহাদের মিশন হইল মানুষের নিকট আল্লাহর পয়গাম পৌছাইয়া দেয়া, আল্লাহর দিকে ডাকা, মানবাত্মাকে পরিশোধিত ও নির্মল করা, বিভ্রান্তি ও আকীদার দুর্বলতা দূর করা এবং প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করা ও উম্মতকে সৎ পথে পরিচালিত করা। সম্পদ পুঞ্জীভূত করা এবং উত্তরাধিকার বণ্টন তাঁহাদের কাজ নয়। তবে তাঁহারা যে উত্তরাধিকার রাখিয়া গিয়াছেন তাহা হইল আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান, শরী'আত এবং মানুষের প্রতি দাওয়াত। তাঁহাদের রাখিয়া যাওয়া উত্তরাধিকার অতীব উত্তম ও অনুপম।
এই মর্মে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আলিমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী। আর নবীগণ স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার উত্তরাধিকার রাখিয়া যান না, বরং তাঁহারা রাখিয়া যান আল্লাহ প্রদত্ত ইলম। সুতরাং যে ব্যক্তি তাহা গ্রহণ করিয়াছে, সে একটি মহাসম্পদ লাভ করিয়াছে (আবূ দাউদ, নং ৩৬৫; তিরমিযী, নং ২৬৫২; ইবন মাজা, নং ২২৩; আহমাদ, ৫খ., ১৯৬; আলবানী হাদীছটিকে সহীহ বলিয়াছেন, জামে সগীর, নং ৬১৭৩)।
ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু উম্মতের অবস্থা ইহার বিপরীত। কাজেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর রাখিয়া যাওয়া সম্পদে উত্তরাধিকারিত্ব বর্তাইবে না, বরং তাহা সাদাকারূপে গণ্য হইব। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আমাদের (নবীদের) উত্তরাধিকারী হয় না, বরং আমরা যাহা রাখিয়া যাই তাহা সাদাকারূপে গণ্য হয় (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১২খ., নং ৬৭৩০; মুসলিম, জিহাদ, বাব ১৬, নং ৪৫৭৯/৫১/১৭৫৮)।
রাসূলুল্লাহ (স) আরও বলিয়াছেন: আমাদের নবীদের জামা'আতে ধন-সম্পদের উত্তরাধিকারী কেহ হয় না (আহমাদ, ২/৪৬৩; বুখারী, ফাতহুল বারী, ১২খ., নং ৬৭৩০; মুসলিম, নং ১৭৫৮)।
তিনি আরও বলেন: দীনারের মত আমার উত্তরাধিকার বণ্টিত হইবে না, বরং আমার রাখিয়া যাওয়া সম্পদ আমার স্ত্রীদের খোরপোষ এবং আমার কর্মচারীদের খরচ মিটানোর পর সাদাকা হিসাবে গণ্য হইবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১২খ., নং ৬৭২৯; মুসলিম, নং ১৭৬০)।
আল্লামা ইব্ন কাছীর বলেন, এই ব্যাপারে সকল চিন্তাশীল একমত। আর শী'আ ও রাফিযিয়া সম্প্রদায় যে প্রলাপ বকে তাহা ভ্রুক্ষেপযোগ্য নয়। কারণ তাহাদের অজ্ঞতা তো সীমাহীন (ইব্ন কাছীরকৃত আল-ফুসূল, পৃ. ৩২৫)।
আলিমগণ বলেন, আম্বিয়া (আ)-এর উত্তরাধিকারী নিযুক্ত না করার কারণ এই যে, উত্তরাধিকারীদের মাঝে এমন লোকও থাকিতে পারে যে সম্পদের মোহে নবীর মৃত্যু কামনা করিয়া বসিবে। ইহার ফলে সেই ব্যক্তির ধ্বংস অনিবার্য হইয়া উঠিতে পারে। অনুরূপভাবে কোন লোক এই রকমও ভাবিতে পারে যে, নবীরা বিষয়-সম্পদের প্রতি অনুরক্ত এবং তাঁহারা নিজ নিজ উত্তরাধিকারীদের জন্য তাহা সঞ্চয় করিয়াছেন। এভাবে ধারণাকারী যেমন নিজের ধ্বংস অনিবার্য করিয়া তোলে তদ্রূপ লোকেরাও আম্বিয়া (আ) হইতে দূরে সরিয়া যাইতে পারে। বস্তুত নিজ নিজ উম্মতের জন্য আম্বিয়া (আ) হইলন পিতৃতুল্য। কাজেই তাঁহাদের উত্তরাধিকার সকলের জন্যই প্রযোজ্য।
📄 (সাত) রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্ত্রীগণ মু'মিনদের মাতা
আল্লাহ তা'আলা তাঁহার রাসূল (স)-এর সম্মানার্থে পৃথিবীর সমস্ত নারীদের হইতে নবী কারীম (স)-এর স্ত্রীগণকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদায় ভূষিত করিয়াছেন। এই সমস্ত বৈশিষ্ট্যের একটি হইল, তিনি তাহাদেরকে মু'মিনদের মাতৃতুল্য ঘোষণা করিয়াছেন। এই মর্মে পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে:
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَتُهُمْ.
"নবী মু'মিনদের নিকট তাহাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর এবং তাহার স্ত্রীগণ তাহাদের মাতা" (৩৩ঃ ৬)।
এই মাতৃত্বের অর্থ হইল, তাঁহাদেরকে সম্মান করা, মর্যাদা দেয়া, তাঁহাদের সম্ভ্রম রক্ষা করা, তাঁহাদের মাহাত্ম্য ও মহিমা স্বীকার করা, তাঁহাদের প্রতি অনুগত থাকা এবং তাঁহাদের অবাধ্য না হওয়া। তবে তাঁহাদের সঙ্গে নির্জনে সাক্ষাৎ করা বৈধ নয় এবং অন্য যে কোন পুরুষের জন্য তাহাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া হারাম। কিন্তু তাহাদের মেয়ে এবং বোনদের বিবাহ করা হারাম নয়। এই মর্মে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَا كَانَ لَكُمْ أَنْ تُؤْذُوا رَسُولَ اللهِ وَلَا أَنْ تَنْكِحُوا أَزْوَاجَهُ مِنْ بَعْدِهِ أَبَدًا إِنَّ ذَلِكُمْ كَانَ عِنْدَ اللهِ عَظِيمًا .
"তোমাদের কাহারও পক্ষে আল্লাহ্র রাসূলকে কষ্ট দেওয়া সংগত নহে এবং তাহার মৃত্যুর পর তাহার স্ত্রীদেরকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য কখনও বৈধ নহে। আল্লাহর দৃষ্টিতে ইহা ঘোরতর অপরাধ" (৩৩ঃ ৫৩)।
আলিমগণের সকলেই এই ব্যাপারে একমত যে, যে স্ত্রীগণকে রাখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) ইনতিকাল করেন তাঁহার পর সেই স্ত্রীগণকে অন্য কাহার ও বিবাহ করা সম্পূর্ণ হারাম। কেননা তাঁহারা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানেই তাঁহার স্ত্রী এবং মু'মিনদের মাতা।
📄 (আট) স্বপ্নযোগে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দর্শন লাভ সত্য
ইহাও রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি বৈশিষ্ট্য যে, যে লোক স্বপ্নযোগে তাঁহার দর্শন লাভ করিল সে যেন চর্মচোখেই তাঁহাকে দেখিতে পাইল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর আকৃতি ধারণ শয়তানের শক্তির অতীত করিয়া দেওয়া হইয়াছে যাহাতে সে ঘুমন্ত অবস্থায় ধোঁকা দিতে না পারে। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মানার্থে জাগ্রত অবস্থায়ও তাঁহার আকৃতি ধারণের ব্যাপারে শয়তানের শক্তি রহিত করিয়া দেওয়া হইয়াছে। এই মর্মে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: যে লোক ঘুমন্ত অবস্থায় আমাকে দেখিল, সে আমাকেই দেখিল। কেননা শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করিতে পারে না (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১২খ., নং ৬৯৯৪; মুসলিম, রু'য়া, বাব ২, নং ৫৯১৯/১০/২২৬৬)।
উল্লিখিত হাদীছের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে একাধিক উক্তি উদ্ধৃত করার পর আল্লামা কুরতুবী (র) বলেন, হাদীছটির সঠিক ব্যাখ্যা হইল, কোন অবস্থায়ই রাসূলুল্লাহ (স)-এর দর্শন মিথ্যা ও অমূলক নয়; বরং তাহা যথার্থ ও সত্য। কাযী আবু বকর ইবনুত তায়্যিবসহ আরও অনেকে এই মত গ্রহণ করিয়াছেন (ফাতহুল বারী, ১২খ., পৃ. ৪০১)।
আলিমগণ পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) দুনিয়াতে যে আকৃতিতে ছিলেন এবং হাদীছ শরীফে যেভাবে তাঁহাকে চিত্রায়িত করা হইয়াছে দর্শন লাভকারীর দর্শনটি হুবহু সেভাবে হইতে হইবে।
হাফেজ ইব্ন কাছীর বলেন, আলিমগণ এই ব্যাপারে একমত হইয়াছেন যে, যে ব্যক্তি ঘুমন্ত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) হইতে কোন হাদীছ বর্ণনা করে তাহার (দর্শন লাভকারীর) স্মৃতির দুর্বলতার কারণে সেই হাদীছটি গ্রহণযোগ্য হইবে না। কেননা নিদ্রা এমন একটি বিষয় যাহা রূহ ও স্মৃতিকে দুর্বল করিয়া দেয় (ইব্ন কাছীরকৃত আল-ফুসূল ফী সীরাতির রাসূল, পৃ. ২৯৮-২৯৯)।