📄 (পাঁচ) রাসূলুল্লাহ (স)-এর বসিয়া বা দাঁড়াইয়া ইবাদত করার ছওয়াব একই সমান ছিল
নফল নামায বিধিবদ্ধ করার পিছনে বিরাট তাৎপর্য নিহিত আছে। ইহার একটি হইল, নেক আমল বৃদ্ধি করা এবং মর্যাদা উন্নত করা। এই প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স)-এর খাদিম রাবী'আ ইবন কা'ব আল-আসলামী (রা) বর্ণিত হাদীছ বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে রাত্রি যাপন করিতাম এবং তাঁহার উযূর পানি ও প্রয়োজনীয় জিনিস পরিবেশন করিতাম। একদিন তিনি বলিলেন, "আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করি"। আমি বলিলাম, আমি জান্নাতে আপনার সান্নিধ্য চাই। তিনি বলিলেন, অন্য কিছু? আমি বলিলাম, না, ইহাই চাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহা হইলে অধিক সিজদার মাধ্যমে তোমার বিষয়ে আমাকে সাহায্য কর (মুসলিম, সালাত, বাব ৪৩, নং ১০৯৪/২২৬/৪৮৯)।
নফল নামাযের আরেকটি উপকারিতা এই যে, ফরযের অপূর্ণতা ও ত্রুটির প্রতিকার। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, কিয়ামতের দিন বান্দার আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম নামাযের হিসাব গ্রহণ করা হইবে। এই হিসাব ঠিক হইলে সে কামিয়াব হইবে। পক্ষান্তরে এই হিসাব ঠিক না হইলে সে ব্যর্থ ও ধ্বংস হইবে। আর যদি ইহার সঙ্গে ফরযে কোন প্রকার অপূর্ণতা থাকে তবে আল্লাহ্ তা'আলা বলিবেন, দেখ আমার বান্দার কোন নফল ইবাদত আছে কিনা? অতঃপর তদ্দ্বারা ফরযের ত্রুটি পূর্ণ করিয়া দেয়া হইবে। তাহার পর একইভাবে অন্যান্য ইবাদতের হিসাব নেওয়া হইবে (আবূ দাউদ, নং ৮৬৪, তিরমিযী, নং ৪১৩, তিনি হাদীছটিকে হাসান বলিয়াছেন। নাসাঈ, ১ খ., ২৩২; ইবন মাজা, নং ১৪২৫; হাকেম, নং ১/২৬২, তিনি ইহার সনদকে বিশুদ্ধ আখ্যায়িত করিয়াছেন, যদিও বুখারী ও মুসলিমে তাহা উদ্ধৃত হয় নাই। কিন্তু ইহার সনদ মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী বিশুদ্ধ। যাহাবীও ইহার সঙ্গে একমত। শাওকানী বলেন, নাসাঈ উত্তম সনদে হাদীছটি উল্লেখ করিয়াছেন। এই বর্ণনাকারিগণের সকলেই ত্রুটিমুক্ত। ইরাকীর অভিমতও তাহাই। অনুরূপ ইব্ন আওন বলেন, ইবন হাজারও হাদীছটিকে সঠিক বলিয়াছেন। দালীলুল ফালিহীন, ৩ খ., ৫৮১)।
📄 নফল নামাযের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আছে
দাঁড়াইয়া আদায় করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নফল নামায বসিয়া আদায় করা জায়েয। তবে ফরয নামাযের ব্যাপারটি ইহা হইতে আলাদা। সুতরাং কোন লোক এভাবে নফল নামায আদায় করিলে তাহার নামায সঠিক হইবে বটে, কিন্তু সে দাঁড়াইয়া আদায়কারীর তুলনায় অর্ধেক ছওয়াবের অধিকারী হইবে। এই সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন : উপবিষ্ট অবস্থায় নামায আদায়ের ছওয়াব দণ্ডায়মান অবস্থায় আদায় করার অর্ধেক (আবূ দাউদ, নং ৯৫১; তিরমিযী, নং ৩৭১; তিনি হাদীছটিকে হাসান ও সহীহ বলিয়াছেন। নাসায়ী, ৩ খ., ২২৩-২২৪; ইব্ন মাজা, নং ১২৩০; যাওয়াইদ গ্রন্থে বুসীরী-এর সনদকে সহীহ বলিয়াছেন। বুখারী, ফাতহুল বারী, ২খ., নং ১১১৬)।
উক্ত বিধানটি উম্মতের সকলের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) এক্ষেত্রে স্বীয় উম্মত হইতে স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী। কেননা বিশেষ মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের কারণে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও উপবিষ্ট অবস্থায় তাঁহার নফল নামাযকে দণ্ডায়মান অবস্থার সমপর্যায়ের বলিয়া সাব্যস্ত করা হইয়াছে। এই মর্মে সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আমর (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে বলা হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন : উপবিষ্ট অবস্থায় আদায়কারী ব্যক্তির নামায হল অর্ধ নামায। তিনি বলেন, কথাটি শুনিয়া আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিয়া দেখিতে পাই যে, তিনি বসিয়া নফল নামায আদায় করিতেছেন। আমি তাঁহার মাথায় হাত রাখিলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আবদুল্লাহ ইব্ন আমর! তোমার কী হইয়াছে? আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে বলা হইয়াছে, আপনি বলিয়াছেন : বসিয়া নামায আদায়কারী ব্যক্তি অর্ধ-পরিমাণ নামাযের ছওয়াব পাইবে, অথচ আপনি বসিয়া নফল নামায আদায় করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, হাঁ, তাহা সত্য। তবে আমি তোমাদের কাহারও মত নই (মুসলিম, সালাত, বাব ১৬, নং ১৭১৫/১২০/৭৩৫)।
আল্লামা নববী ও অন্যান্য আলিমের মতে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও উপবিষ্ট অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নফল নামায আদায় করার ছওয়াব দণ্ডায়মান অবস্থায় আদায় করার ছওয়াবের সমান। আর ইহা হইল তাঁহার বৈশিষ্ট্যস্বরূপ।
📄 (ছয়) নবীগণের পরিত্যক্ত সম্পদ ওয়ারিছদের মধ্যে বণ্টিত হয় না
নবীগণ হইলেন মানুষের প্রতি আল্লাহর দূতস্বরূপ। তাঁহারা ওহী বাহক। তাঁহাদের মিশন হইল মানুষের নিকট আল্লাহর পয়গাম পৌছাইয়া দেয়া, আল্লাহর দিকে ডাকা, মানবাত্মাকে পরিশোধিত ও নির্মল করা, বিভ্রান্তি ও আকীদার দুর্বলতা দূর করা এবং প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করা ও উম্মতকে সৎ পথে পরিচালিত করা। সম্পদ পুঞ্জীভূত করা এবং উত্তরাধিকার বণ্টন তাঁহাদের কাজ নয়। তবে তাঁহারা যে উত্তরাধিকার রাখিয়া গিয়াছেন তাহা হইল আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান, শরী'আত এবং মানুষের প্রতি দাওয়াত। তাঁহাদের রাখিয়া যাওয়া উত্তরাধিকার অতীব উত্তম ও অনুপম।
এই মর্মে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আলিমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী। আর নবীগণ স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার উত্তরাধিকার রাখিয়া যান না, বরং তাঁহারা রাখিয়া যান আল্লাহ প্রদত্ত ইলম। সুতরাং যে ব্যক্তি তাহা গ্রহণ করিয়াছে, সে একটি মহাসম্পদ লাভ করিয়াছে (আবূ দাউদ, নং ৩৬৫; তিরমিযী, নং ২৬৫২; ইবন মাজা, নং ২২৩; আহমাদ, ৫খ., ১৯৬; আলবানী হাদীছটিকে সহীহ বলিয়াছেন, জামে সগীর, নং ৬১৭৩)।
ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু উম্মতের অবস্থা ইহার বিপরীত। কাজেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর রাখিয়া যাওয়া সম্পদে উত্তরাধিকারিত্ব বর্তাইবে না, বরং তাহা সাদাকারূপে গণ্য হইব। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আমাদের (নবীদের) উত্তরাধিকারী হয় না, বরং আমরা যাহা রাখিয়া যাই তাহা সাদাকারূপে গণ্য হয় (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১২খ., নং ৬৭৩০; মুসলিম, জিহাদ, বাব ১৬, নং ৪৫৭৯/৫১/১৭৫৮)।
রাসূলুল্লাহ (স) আরও বলিয়াছেন: আমাদের নবীদের জামা'আতে ধন-সম্পদের উত্তরাধিকারী কেহ হয় না (আহমাদ, ২/৪৬৩; বুখারী, ফাতহুল বারী, ১২খ., নং ৬৭৩০; মুসলিম, নং ১৭৫৮)।
তিনি আরও বলেন: দীনারের মত আমার উত্তরাধিকার বণ্টিত হইবে না, বরং আমার রাখিয়া যাওয়া সম্পদ আমার স্ত্রীদের খোরপোষ এবং আমার কর্মচারীদের খরচ মিটানোর পর সাদাকা হিসাবে গণ্য হইবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১২খ., নং ৬৭২৯; মুসলিম, নং ১৭৬০)।
আল্লামা ইব্ন কাছীর বলেন, এই ব্যাপারে সকল চিন্তাশীল একমত। আর শী'আ ও রাফিযিয়া সম্প্রদায় যে প্রলাপ বকে তাহা ভ্রুক্ষেপযোগ্য নয়। কারণ তাহাদের অজ্ঞতা তো সীমাহীন (ইব্ন কাছীরকৃত আল-ফুসূল, পৃ. ৩২৫)।
আলিমগণ বলেন, আম্বিয়া (আ)-এর উত্তরাধিকারী নিযুক্ত না করার কারণ এই যে, উত্তরাধিকারীদের মাঝে এমন লোকও থাকিতে পারে যে সম্পদের মোহে নবীর মৃত্যু কামনা করিয়া বসিবে। ইহার ফলে সেই ব্যক্তির ধ্বংস অনিবার্য হইয়া উঠিতে পারে। অনুরূপভাবে কোন লোক এই রকমও ভাবিতে পারে যে, নবীরা বিষয়-সম্পদের প্রতি অনুরক্ত এবং তাঁহারা নিজ নিজ উত্তরাধিকারীদের জন্য তাহা সঞ্চয় করিয়াছেন। এভাবে ধারণাকারী যেমন নিজের ধ্বংস অনিবার্য করিয়া তোলে তদ্রূপ লোকেরাও আম্বিয়া (আ) হইতে দূরে সরিয়া যাইতে পারে। বস্তুত নিজ নিজ উম্মতের জন্য আম্বিয়া (আ) হইলন পিতৃতুল্য। কাজেই তাঁহাদের উত্তরাধিকার সকলের জন্যই প্রযোজ্য।
📄 (সাত) রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্ত্রীগণ মু'মিনদের মাতা
আল্লাহ তা'আলা তাঁহার রাসূল (স)-এর সম্মানার্থে পৃথিবীর সমস্ত নারীদের হইতে নবী কারীম (স)-এর স্ত্রীগণকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদায় ভূষিত করিয়াছেন। এই সমস্ত বৈশিষ্ট্যের একটি হইল, তিনি তাহাদেরকে মু'মিনদের মাতৃতুল্য ঘোষণা করিয়াছেন। এই মর্মে পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে:
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَتُهُمْ.
"নবী মু'মিনদের নিকট তাহাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর এবং তাহার স্ত্রীগণ তাহাদের মাতা" (৩৩ঃ ৬)।
এই মাতৃত্বের অর্থ হইল, তাঁহাদেরকে সম্মান করা, মর্যাদা দেয়া, তাঁহাদের সম্ভ্রম রক্ষা করা, তাঁহাদের মাহাত্ম্য ও মহিমা স্বীকার করা, তাঁহাদের প্রতি অনুগত থাকা এবং তাঁহাদের অবাধ্য না হওয়া। তবে তাঁহাদের সঙ্গে নির্জনে সাক্ষাৎ করা বৈধ নয় এবং অন্য যে কোন পুরুষের জন্য তাহাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া হারাম। কিন্তু তাহাদের মেয়ে এবং বোনদের বিবাহ করা হারাম নয়। এই মর্মে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَا كَانَ لَكُمْ أَنْ تُؤْذُوا رَسُولَ اللهِ وَلَا أَنْ تَنْكِحُوا أَزْوَاجَهُ مِنْ بَعْدِهِ أَبَدًا إِنَّ ذَلِكُمْ كَانَ عِنْدَ اللهِ عَظِيمًا .
"তোমাদের কাহারও পক্ষে আল্লাহ্র রাসূলকে কষ্ট দেওয়া সংগত নহে এবং তাহার মৃত্যুর পর তাহার স্ত্রীদেরকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য কখনও বৈধ নহে। আল্লাহর দৃষ্টিতে ইহা ঘোরতর অপরাধ" (৩৩ঃ ৫৩)।
আলিমগণের সকলেই এই ব্যাপারে একমত যে, যে স্ত্রীগণকে রাখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) ইনতিকাল করেন তাঁহার পর সেই স্ত্রীগণকে অন্য কাহার ও বিবাহ করা সম্পূর্ণ হারাম। কেননা তাঁহারা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানেই তাঁহার স্ত্রী এবং মু'মিনদের মাতা।