📄 (তিন) রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি মিথ্যা আরোপ অন্যের প্রতি মিথ্যা আরোপতুল্য নয়
মিথ্যাচার একটি নিকৃষ্ট আচরণ ও-মন্দ অভ্যাস। ইহা একটি নিকৃষ্ট পাপ, গর্হিত দোষ ও ঘৃণিত চরিত্র। মিথ্যা যেখানেই প্রভাব বিস্তার করে সেখানেই উহা বস্তুর মাপকাঠি ওলট-পালট করিয়া সত্যকে মুছিয়া ফেলে এবং সুন্দরকে কুৎসিত করে। মিথ্যাচার ব্যক্তির মনে অনিষ্টের প্ররোচনা দেয় এবং মিথ্যাচারের ফলেই ব্যক্তি পাপ ও কপটতার দিকে ধাবিত হয়। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, মিথ্যাচার পাপের পথ দেখায়, আর পাপ জাহান্নামে নিয়া যায় (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১০ খ., নং ৬০৯৪; মুসলিম, বির/আদাব, বাব ২৯, নং ৬৬৩৭/১০৩/২৬০৭)।
রাসুলুল্লাহ (স) আরও বলিয়াছেন, যাহার মাঝে চারটি বিষয় পাওয়া যায় সে নির্ভেজাল মুনাফিক। আর যাহার মাঝে এইগুলির যে কোন একটি পাওয়া যায় তাহার মাঝে মুনাফিকের একটি স্বভাব পাওয়া গেল, যতক্ষণ না সে তাহা পরিহার করে। বিষয়গুলি হইল, তাহার নিকট আমানত রাখা হইলে খিয়ানত করে, কথা বলিলে মিথ্যা বলে, অঙ্গীকার করিলে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং বিবাদ করিলে অপ্রাব্য কথা বলে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১/৩৪; মুসলিম, ৫৮)।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করা অন্য কাহারও প্রতি মিথ্যা আরপ করার মত নয়। সুতরাং যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে সে যেন জাহান্নামে তাহার ঠিকানা প্রস্তুত করিল (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৩ খ., নং ১২৯১; মুসলিম, নং ৪)।
রাসূলুল্লাহ (স) আরও বলেন, একটি মাত্র বাণী হইলেও আমার পক্ষ হইতে তোমরা তাহা পৌঁছাইয়া দিবে। তোমরা ইসরাঈলীদের হইতে বর্ণনা করিতে পার, ইহাতে কোন আপত্তি নাই। আর যে লোক আমার প্রতি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা আরোপ করে সে যেন জাহান্নামে তাহার ঠিকানা প্রস্তুত করিল (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৭ খ., নং ৩৭৬৮, নং মুসলিম, ৯১/২৪৪৭)।
অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি মিথ্যারোপকারীর প্রতি জাহান্নামের সাবধান বাণী উচ্চারণ প্রসঙ্গে একাধিক ও অকাট্য সূত্রে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হইয়াছে। এই জঘণ্য অপরাধের নির্মম পরিণতি সম্পর্কে অনেকে, যেমন ইমাম আহমাদ (র), ইয়াহ্ইয়া ইব্ন মাঈন ও আবূ বকর, হুমায়দী প্রমুখ মনীষী ফাতওয়া দিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি মিথ্যা আরোপকারীর তওবা গ্রহণযোগ্য নয় এবং একই কারণে তাহার রিওয়ায়াত গ্রহণ করা হইব না। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিমগণ ইহার বিপরীত মত পোষণ করেন।
পূর্বোক্ত আলোচনা হইতে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ (স) ব্যতীত অন্য কাহারও প্রতি মিথ্যা আরোপ করা পাপ ও অপরাধ হইলেও সর্বসম্মতিক্রমে তাহার আন্তরিক তাওবা গ্রহণযোগ্য।
📄 (চার) রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিশেষ ধরনের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি
হযরত আইশা (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে আইশা! তিনি জিবরাঈল। তিনি তোমাকে সালাম বলিয়াছেন। উত্তরে আমি বলিলাম, তাহার প্রতিও শান্তি, আল্লাহ্র রহমত ও কল্যাণ বর্ষিত হউক। আমি যাহা দেখি না আপনি তাহা দেখিতে পান (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৭ খ., নং ৩৭৬৮; মুসলিম, নং ৯১/২৪৪৭)।
হযরত আবূ যার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, আমি এমন কিছু দেখিতে পাই, যাহা তোমরা দেখিতে পাও না। আমি এমন কিছু শুনিয়া থাকি যাহা তোমরা শুনিতে পাও না। আকাশ চিৎকার করিতেছে এবং তাহার জন্য তাহা করাই বাঞ্ছনীয়। আকাশের কোথাও চার আঙ্গুলের মত জায়গাও খালি নাই যেখানে ফেরেশতাগণ অবনত মস্তকে আল্লাহকে সিজদা করিতেছে না। আল্লাহর শপথ! আমি যাহা জানি তোমরা যদি তাহা জানিতে পারিতে, তাহা হইলে তোমরা স্বল্পই হাসিতে এবং অধিক পরিমাণে কাঁদিতে; গৃহকোণে নারীদের সঙ্গে উপভোগে লিপ্ত হইতে না এবং সরবে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করিতে করিতে রাস্তায় বাহির হইয়া পড়িতে (তিরমিযী, যুহদ, বাব ৯, নং ২৩১২; এবং তাঁহার মতে হাদীছটি হাসান ও গরীব; ইবন মাজা, যুহদ, বাব ১৯, নং ৪১৯০; আহমাদ, ৫/১৭;, হাকেম, ২/৫১০, তিনি হাদীছটির সনদ সহীহ বলিয়াছেন। আলবানী ইহাকে হাসান বলিয়াছেন; সহীহ জামে সাগীর, নং ২৪৪৫)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের সঙ্গে নামায আদায় করেন। অতঃপর তিনি পিছনের দিকে ফিরিয়া বলেন, হে অমুক! তোমার কী হইয়াছে, ঠিকমত নামায পড় না কেন? মুসল্লীর কী হইল যে, কিভাবে নামায পড়ে সেদিকে লক্ষ্য করে না? সে তো নিজের উপকারের জন্যই নামায পড়ে। আল্লাহ্র শপথ! আমি পশ্চাতে এমনভাবে দেখিতে পাই যেভাবে আমার সম্মুখভাবে দেখিতে পাই (মুসলিম, সালাত, বাব ২৪, নং ৯৫৭/১০৮/৪২৩)।
"আমি আমার পশ্চাতে দেখিতে পাই" এই মর্মে আল্লামা নববী (র) আলিমদের উক্তি নকল করিয়া বলেন, ইহার অর্থ হইল: আল্লাহ্ রাসূলুল্লাহ (স)-এর পশ্চাৎদেশে এমন এক ইন্দ্রিয় সৃষ্টি করিয়াছেন যদ্দ্বারা তিনি দেখিতে পাইতেন। অনেক সময় ইহার ব্যতিক্রমও হইত। ইহা শরী'আতও বুদ্ধি-বিবেকের পরিপন্থী নয়, বরং বাহ্যত শরী'আত ইহার পক্ষে হওয়ায় তাহা স্বীকার করা আবশ্যক। কাযী ইয়ায বলেন, ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল এবং জমহুর উলামার মতে এই দর্শন বাস্তব চোখেই সংঘটিত হইত (শারহুন নাবাবী, ৪ খ., ১৪৯-১৫০)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: তোমরা কি এখানে আমার সম্মুখে দেখিতে পাও? আল্লাহর শপথ! আমার কাছে তোমাদের রুকু, তোমাদের সিজদা গোপন থাকে না। আমার পশ্চাত হইতেও আমি তোমাদেরকে অবশ্যই দেখিতে পাই, (বুখারী, ফাতহুল বারী, ২ খ., নং ৭৪১; মুসলিম, সালাত, বাব ২৪, নং ৯৫৮/১০৯/৪২৪)।
📄 (পাঁচ) রাসূলুল্লাহ (স)-এর বসিয়া বা দাঁড়াইয়া ইবাদত করার ছওয়াব একই সমান ছিল
নফল নামায বিধিবদ্ধ করার পিছনে বিরাট তাৎপর্য নিহিত আছে। ইহার একটি হইল, নেক আমল বৃদ্ধি করা এবং মর্যাদা উন্নত করা। এই প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স)-এর খাদিম রাবী'আ ইবন কা'ব আল-আসলামী (রা) বর্ণিত হাদীছ বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে রাত্রি যাপন করিতাম এবং তাঁহার উযূর পানি ও প্রয়োজনীয় জিনিস পরিবেশন করিতাম। একদিন তিনি বলিলেন, "আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করি"। আমি বলিলাম, আমি জান্নাতে আপনার সান্নিধ্য চাই। তিনি বলিলেন, অন্য কিছু? আমি বলিলাম, না, ইহাই চাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহা হইলে অধিক সিজদার মাধ্যমে তোমার বিষয়ে আমাকে সাহায্য কর (মুসলিম, সালাত, বাব ৪৩, নং ১০৯৪/২২৬/৪৮৯)।
নফল নামাযের আরেকটি উপকারিতা এই যে, ফরযের অপূর্ণতা ও ত্রুটির প্রতিকার। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, কিয়ামতের দিন বান্দার আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম নামাযের হিসাব গ্রহণ করা হইবে। এই হিসাব ঠিক হইলে সে কামিয়াব হইবে। পক্ষান্তরে এই হিসাব ঠিক না হইলে সে ব্যর্থ ও ধ্বংস হইবে। আর যদি ইহার সঙ্গে ফরযে কোন প্রকার অপূর্ণতা থাকে তবে আল্লাহ্ তা'আলা বলিবেন, দেখ আমার বান্দার কোন নফল ইবাদত আছে কিনা? অতঃপর তদ্দ্বারা ফরযের ত্রুটি পূর্ণ করিয়া দেয়া হইবে। তাহার পর একইভাবে অন্যান্য ইবাদতের হিসাব নেওয়া হইবে (আবূ দাউদ, নং ৮৬৪, তিরমিযী, নং ৪১৩, তিনি হাদীছটিকে হাসান বলিয়াছেন। নাসাঈ, ১ খ., ২৩২; ইবন মাজা, নং ১৪২৫; হাকেম, নং ১/২৬২, তিনি ইহার সনদকে বিশুদ্ধ আখ্যায়িত করিয়াছেন, যদিও বুখারী ও মুসলিমে তাহা উদ্ধৃত হয় নাই। কিন্তু ইহার সনদ মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী বিশুদ্ধ। যাহাবীও ইহার সঙ্গে একমত। শাওকানী বলেন, নাসাঈ উত্তম সনদে হাদীছটি উল্লেখ করিয়াছেন। এই বর্ণনাকারিগণের সকলেই ত্রুটিমুক্ত। ইরাকীর অভিমতও তাহাই। অনুরূপ ইব্ন আওন বলেন, ইবন হাজারও হাদীছটিকে সঠিক বলিয়াছেন। দালীলুল ফালিহীন, ৩ খ., ৫৮১)।
📄 নফল নামাযের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আছে
দাঁড়াইয়া আদায় করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নফল নামায বসিয়া আদায় করা জায়েয। তবে ফরয নামাযের ব্যাপারটি ইহা হইতে আলাদা। সুতরাং কোন লোক এভাবে নফল নামায আদায় করিলে তাহার নামায সঠিক হইবে বটে, কিন্তু সে দাঁড়াইয়া আদায়কারীর তুলনায় অর্ধেক ছওয়াবের অধিকারী হইবে। এই সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন : উপবিষ্ট অবস্থায় নামায আদায়ের ছওয়াব দণ্ডায়মান অবস্থায় আদায় করার অর্ধেক (আবূ দাউদ, নং ৯৫১; তিরমিযী, নং ৩৭১; তিনি হাদীছটিকে হাসান ও সহীহ বলিয়াছেন। নাসায়ী, ৩ খ., ২২৩-২২৪; ইব্ন মাজা, নং ১২৩০; যাওয়াইদ গ্রন্থে বুসীরী-এর সনদকে সহীহ বলিয়াছেন। বুখারী, ফাতহুল বারী, ২খ., নং ১১১৬)।
উক্ত বিধানটি উম্মতের সকলের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) এক্ষেত্রে স্বীয় উম্মত হইতে স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী। কেননা বিশেষ মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের কারণে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও উপবিষ্ট অবস্থায় তাঁহার নফল নামাযকে দণ্ডায়মান অবস্থার সমপর্যায়ের বলিয়া সাব্যস্ত করা হইয়াছে। এই মর্মে সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আমর (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে বলা হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন : উপবিষ্ট অবস্থায় আদায়কারী ব্যক্তির নামায হল অর্ধ নামায। তিনি বলেন, কথাটি শুনিয়া আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিয়া দেখিতে পাই যে, তিনি বসিয়া নফল নামায আদায় করিতেছেন। আমি তাঁহার মাথায় হাত রাখিলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আবদুল্লাহ ইব্ন আমর! তোমার কী হইয়াছে? আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে বলা হইয়াছে, আপনি বলিয়াছেন : বসিয়া নামায আদায়কারী ব্যক্তি অর্ধ-পরিমাণ নামাযের ছওয়াব পাইবে, অথচ আপনি বসিয়া নফল নামায আদায় করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, হাঁ, তাহা সত্য। তবে আমি তোমাদের কাহারও মত নই (মুসলিম, সালাত, বাব ১৬, নং ১৭১৫/১২০/৭৩৫)।
আল্লামা নববী ও অন্যান্য আলিমের মতে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও উপবিষ্ট অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নফল নামায আদায় করার ছওয়াব দণ্ডায়মান অবস্থায় আদায় করার ছওয়াবের সমান। আর ইহা হইল তাঁহার বৈশিষ্ট্যস্বরূপ।