📄 (তিন) একই সঙ্গে চারের অধিক স্ত্রী গ্রহণ
আলিমগণ বলিয়াছেন, উম্মাহ্র সদস্যগণের বিবাহের ক্ষেত্রে অভিভাবকের শর্ত আরোপ করার কারণ ছিল পারিবারিক সমতা সংরক্ষণ। আর রাসূলুল্লাহ (স) সর্বপ্রকার কৌলীন্যের ঊর্ধ্বে। অনুরূপ সাক্ষীর শর্ত আরোপ করার কারণ ছিল বিবাদ হইতে নিরাপদ থাকা। আর রাসূলুল্লাহ (স) এমন এক সত্তা যাঁহার ব্যাপারে বিবাদের কোন আশংকা ছিল না। উল্লিখিত এই স্বতন্ত্র বিধানের দলীল হইল হযরত যয়নাব বিনতে জাহ্শ (রা) বর্ণিত হাদীছ। হযরত যয়নাব বিনতে জাহ্শ (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যান্য সহধর্মিণীগণের সামনে গর্ব করিয়া বলিতেন, তোমাদের বিবাহ তোমাদের পরিবারের লোকেরা সম্পন্ন করিয়াছেন। পক্ষান্তরে আমার বিবাহ ৫০১ স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা সপ্ত আকাশের উপরে সম্পন্ন করিয়াছেন (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১৩ খ., নং ৭৪৩০)।
ইমাম নববী (র) মুসলিম শরীফের হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, হযরত আনাস (রা) বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কোন স্ত্রীর ব্যাপারে অধিক উত্তমভাবে ওলীমা (বিবাহ উত্তর আপ্যায়ন) করেন নাই, যতখানি হযরত যয়নাব (রা)-এর ব্যাপারে করিয়াছেন।
ইমাম নববী বলেন, সম্ভবত ইহার কারণ এই যে, কোন অভিভাবক ও সাক্ষী-সাবুদ ব্যতীত ওহীর মাধ্যমে হযরত যয়নাব (রা)-এর সঙ্গে তাঁহাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করিয়া আল্লাহ তাঁহার প্রতি যে অনুগ্রহ করিয়াছেন ইহা ছিল তাহারই শুকরিয়াস্বরূপ। কিন্তু অন্যান্য স্ত্রীদের অবস্থা ছিল ইহার ব্যতিক্রম। বস্তুত এই ব্যাপারে সুপ্রসিদ্ধ ও সঠিক অভিমত হইল, কোন সাক্ষী ও অভিভাবক ছাড়াই রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া সংগত ছিল। কেননা তাঁহার বেলায় ইহার কোন প্রয়োজন নাই (শারহুল নাবাবী, ৯/২২৯-২৩০)।
আল্লাহ তা'আলা তাঁহার বান্দাদের জন্য বিবাহ প্রথাকে বৈধ করিয়াছেন। এই বিবাহ প্রথায় বিরাট উপকারিতা ও গূঢ় তাৎপর্য নিহিত রহিয়াছে। যেমন মানুষের বংশধারা অব্যাহত রাখা, শয়তানের প্ররোচনা হইতে নিরাপদ থাকা, কাম-প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রিত ও প্রতিহত করা, দৃষ্টি সংযত রাখা ও লজ্জাস্থানের হিফাজত করা, আল্লাহর অনুমোদিত পন্থায় মানসিক তৃপ্তি ও সুখ ভোগ করা যাহাতে ইবাদতের শক্তি ও আগ্রহ বৃদ্ধি পায়, চেষ্টা ও সাধনা দ্বারা মনের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করা যায়, পরিবার-পরিজনের হক আদায় করা, হালাল জীবিকা অর্জনে ব্রতী হওয়া, সন্তান-সন্ততির সুশিক্ষার ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া ইত্যাদি উপকারিতা ও তাৎপর্য ইহাতে নিহিত আছে।
কিন্তু বিবাহ সংক্রান্ত বিষয়ে শরী'আতের দলীলসমূহ সাধারণ মুসলমানদের জন্য একই সঙ্গে কেবল চারজন স্ত্রী রাখাকে বৈধ করিয়াছে। চারের অধিককে নিষিদ্ধ করিয়া আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন:
وَإِنْ خِفْتُمْ أَلا تُقْسِطُوا فِي الْيَتْمَى فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلُثَ وَرُبَعَ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ. "তোমরা যদি আশংকা কর যে, ইয়াতীম মেয়েদের প্রতি সুবিচার করিতে পারিবে না, তবে বিবাহ করিবে নারীদের মধ্যে যাহাকে তোমাদের ভাল লাগে, দুই, তিন অথবা চার। আর তোমরা যদি আশংকা কর যে, সুবিচার করিতে পারিবে না তবে একজনকে অথবা তোমার অধিকারভুক্ত দাসীকে” (৪ঃ৩)।
হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) ও জমহুর আলিমগণ বলেন, উল্লিখিত আয়াত যে স্থলে নাযিল হইয়াছে সেই স্থলটি হইল দয়া প্রদর্শন ও বৈধতাদানের স্থল। সুতরাং একই সঙ্গে চারের
📄 রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক অধিক স্ত্রী গ্রহণের তাৎপর্য
৫০২ অধিক স্ত্রী গ্রহণ করা বৈধ হইলে তাহা অবশ্যই এখানে উল্লেখ করা হইত (তাফসীর ইব্ন কাছীর, ১/৪৬১)।
হযরত গায়লান ইবন সালামা আস-ছাকাফী যে সময় ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁহার অধীনে দশজন স্ত্রী ছিল, রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিয়াছিলেন, তুমি তাহাদের মধ্যে চারজনকে গ্রহণ কর (আবূ দাউদ, নং ২২৪১; তিরমিযী, নং ১১২৮; ইবন মাজা, নং ১৯৫৩; মুসনাদে আহমাদ, ২/১৪; ইব্ন কাছীর বলেন, আহমাদের সনদটি শায়খায়নের শর্ত অনুযায়ী হইয়াছে; তাফসীর ইব্ন্ন কাছীর, ১/৪৬১; মাজmaউয যাওয়াইদ, ৪খ., নং ২২৩)।
ইমাম শাফি'ঈ (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সুন্নাহ (যাহা আল্লাহর বাণীর ব্যাখ্যাস্বরূপ) হইতে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (স) ব্যতীত অন্য কাহারও জন্য একত্রে চারের অধিক স্ত্রী গ্রহণ করা বৈধ নয়।
হাফেজ ইব্ন কাছীর বলেন, "শাফি'ঈ (র)-এর কথিত উক্তির প্রতি আলিমগণের মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে” (তাফসীর ইব্ন কাছীর, ১/৪৬০)। সুতরাং উল্লিখিত বিধানটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি বৈশিষ্ট্য যাহা দ্বারা তিনি উম্মাহর অন্যান্য লোকদের তুলনায় স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী হইয়াছেন। আলিমগণ এই ব্যাপারে একমত যে, ইন্তিকালের সময় রাসূলুল্লাহ (স) নয়জন স্ত্রী রাখিয়া যান। তাঁহারা হইলন (১) সাওদা বিনতে যাম'আহ কুরাশিয়া, (২) আইশা বিনতে আবু বকর কুরাশিয়া, (৩) উম্মু সালামা হিন্দ বিনতে আবী উমায়্যা কুরাশিয়া, (৪) হাফসা বিনতে উমার কুরাশিয়া, (৫) যয়নাব বিনতে জাহ্শ আসাদিয়া, (৬) জুওয়ায়রিয়া বিনতুল হারিছ মুসতালিকিয়া, (৭) উম্মু হাবীবা রামলা বিনতে আবু সুফ্যান কুরাশিয়া, (৮) সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই নাদীরিয়া এবং (৯) মায়মূনা বিনতুল হারিছ হিলালিয়া (রা)।
হাফেজ ইব্ন হাজার বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর বহু বিবাহের তাৎপর্য সম্পর্কে মনীষিগণ যে সকল মতামত পেশ করিয়াছেন তাহা হইতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলি পরিস্ফুটিত হইয়া উঠে।
(এক) রাসূলুল্লাহ (স)-এর একান্ত গোপনীয় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অবস্থা প্রত্যক্ষকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। তিনি যাদুকর বা এই ধরনের কিছু বলিয়া মুশরিকরা অহেতুক ধারণা করিত, ইহার যেন অবসান ঘটে।
(দুই) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের সুবাদে আরব গোত্রসমূহের সম্মান বৃদ্ধি পাওয়া।
(তিন) ইহার মাধ্যমে তাহাদের সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করা।
(চার) দায়িত্ব পালনে কষ্টক্লেশ বৃদ্ধি করা। কেননা রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর এইরূপ কঠিন দায়িত্ব অর্পিত হইয়াছিল যে, স্ত্রীদের কাহারও প্রতি তাঁহার ভালবাসা যেন উত্তমরূপে দীনের প্রচারকার্য হইতে তাঁহাকে বিরত না রাখে।