📄 (তিন) সামরিক পোশাক ত্যাগ না করা
নবী কারীম (স) এবং অপরাপর সমস্ত নবীগণের উপর হারাম ছিল-যুদ্ধের লেবাস পরিধান করার পর (যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত) তাহা খুলিয়া রাখা।
জাবির (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) উহুদ যুদ্ধের দিন বলিলেন, আমি স্বপ্নে দেখিয়াছি যে, আমি মযবুত লেবাস দ্বারা আবৃত আছি। আর আমি ইহাও দেখিয়াছি যে, গরু যবেহ করা হইয়াছে। আমার মতে ইহার ব্যাখ্যা হইল, মযবুত লেবাস দ্বারা মদীনা এবং গরু যবেহ করা দ্বারা সাহাবায়ে কিরামের শাহাদাতকে বুঝানো হইয়াছে। আল্লাহর শপথ! ইহার মধ্যেই কল্যাণ নিহিত রহিয়াছে। রাবী বলেন, তাহারপর নবী কারীম (স) তাঁহার সাহাবীগণকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আমাদের জন্য মদীনায় অবস্থান করাই উত্তম। যদি তাহারা মদীনায় প্রবেশ করে, তবে আমরা তাহাদের সাথে লড়াই করিব। তখন সাহাবায়ে কিরাম বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! জাহিলী যুগেও তো কেহ মদীনায় প্রবেশ করিয়া আমাদের উপর হামলা করার সাহস করে নাই। কাজেই ইসলাম গ্রহণের পর এমনটি কেমন করিয়া হইতে পারে? তাঁহাদের এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহা হইলে তোমাদের অবস্থা সম্বন্ধে তোমরাই ভাল বুঝ।
এই বলিয়া তিনি রণসজ্জায় সজ্জিত হইলেন। তখন আনসার সাহাবীগণ বলিলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর রায় প্রত্যাখ্যান করিয়াছি (ইহা কেমন করিয়া হইতে পারে)? এই বলিয়া তাঁহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, হে আল্লাহ্ নবী! আপনার রায়ই যথাযথ। আমাদের রায় ঠিক নয়। তিনি বলিলেন, যুদ্ধের লেবাস পরিধান করার পর লড়াই না করিয়া তাহা খুলিয়া ফেলা কোন নবীর জন্য সমীচীন নয় (মুসনাদে আহমাদ, ৩খ., পৃ. ৩৫১; তাবাকাতুল কুবরা, ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ৪৫; দারিমী, হাদীছ নং ২১৬৫; হাফিয ইব্ন হাজার-এর মতে হাদীছটি সহীহ, ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৩৫৩; বুখারী, ফাতহুল বারী ১৩খ., পৃ. ৩৫১; মুসলিম, হাদীছ নং ৫৯৩৪/২০/২২৭২)।
হাফিয ইব্ন কাছীর বলেন, অধিকাংশ উলামায়ে কিরামের মতে, যুদ্ধের লেবাস পরিধান করার পর নবীর জন্য যুদ্ধ করা ওয়াজিব, লড়াই না করিয়া লেবাস খুলিয়া ফেলা হারাম (ফুসূল, পৃ. ৩৩৮)।
📄 (চার) চোখের খিয়ানত (বিশ্বাসঘাতকতা)
গোপন চাহনি অর্থাৎ মুখের কথা বা অবস্থার দ্বারা যাহা বুঝানো কিংবা প্রকাশ করা হয়, ইহার বিপরীতে চোখ দ্বারা কাহাকেও হত্যা বা প্রহার করার জন্য ইশারা করা। নাজায়েয কোন কাজ না হইলে রাসূলুল্লাহ (স) ছাড়া অন্য মানুষের জন্য তাহা হারাম নয়। রাফিঈ অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন (খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৪১৫)।
আল্লামা খাত্তাবীর মতে, চোখের খিয়ানত অর্থ মুখে যাহা মানুষের সামনে প্রকাশ করা হয়; হৃদয়ে ইহার বিপরীত ধারণা পোষণ করা এবং যবান সংযত রাখিয়া হৃদয়ের ঐ কাজের প্রতি ইশারা করাকে খিয়ানত বলে। আর এই খিয়ানত যেহেতু চোখের দ্বারা হয়, তাই ইহাকে চোখের খিয়ানত বলে (হাশিয়াতুস সিন্ধী আলা সুনanিন্ নাসাঈ, ৭খ., পৃ. ১০৬)।
মুখের কথার দ্বারা যাহা প্রকাশ করা হয়, চোখের দ্বারা ইহার বিপরীত কাজের প্রতি ইংগিত করা রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য জায়েয নয়। আবদুল্লাহ্ ইবন সা'দ ইব্ন আবী সারহ (রা)-এর হাদীছে এই মতের সমর্থনে স্পষ্ট প্রমাণ রহিয়াছে। তিনি বলেন যে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (স) যাহাদেরকে সাধারণ হত্যার ঘোষণা দেন, তিনিও তাহাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। উছমান ইব্ন আফফান (রা) তাহার দুধ ভাই ছিলেন। তিনি তাহার নিকট গিয়া আত্মগোপন করেন। রাসূলুল্লাহ (স) যখন লোকদেরকে বায়আতের জন্য ডাকেন, তখন উছমান (রা) তাহাকে সাথে নিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে আসিয়া উপস্থিত হন এবং বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আবদুল্লাহ্র বায়'আত গ্রহণ করুন। তখন তিনি মাথা তুলিয়া তাহার প্রতি তিনবার তাকান এবং প্রত্যেকবারই তাহাকে বায়'আত করিতে অসম্মতি প্রকাশ করেন। অবশেষে তিনবারের পর তাহাকে বায়'আত করেন। ইহার পর সাহাবায়ে কিরামের সামনে আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, এই লোকটিকে বায়'আত না করার জন্য আমি আমার হাতকে সংকুচিত করিয়া রাখিয়াছি, তাহা দেখা সত্ত্বেও তোমাদের কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি তাহাকে হত্যা করিতে পারিলে না? সাহাবীগণ বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার মনে কি আছে তাহা তো আমরা জানি না। আপনি আমাদেরকে চোখের ইশারা করিলেন না কেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, চোখের খিয়ানত কোন নবীর জন্য সমীচীন নয় (আবু দাউদ, হুদুদ, ১ম বাব, নং ৪৩৫৯; নাসাঈ, ৭খ., পৃ. ১০৫-১০৬; মুসতাদরাক হাকেম, ৩খ., পৃ. ৪৫)। ইমাম হাকেম-এর মতে হাদীছটি ইমাম মুসলিম (র)-এর শর্তে উত্তীর্ণ। তবে বুখারী ও মুসলিম ইহা নিজ নিজ গ্রন্থে উদ্ধৃতকরেন নাই। আল্লামা যাহাবীও অনুরূপ কথা বলিয়াছেন (সুনানুল কুবরা, বায়হাকী, ৭খ., পৃ. ৪০)। হাফিয ইবন হাজার (র) তালখীসুল হাবীর গ্রন্থে বলিয়াছেন, ইহার সনদ সহীহ্ (৩খ., পৃ. ১৩০)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর পড়ালেখা সম্বন্ধে আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ وَمَا كُنْتَ تَتْلُوا مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتَبٍ وَلَا تَخُطُهُ بِيَمِينِكَ إِذَا لَأَرْتَابَ الْمُبْطِلُونَ. "তুমি তো ইহার পূর্বে কোন কিতাব পাঠ কর নাই এবং স্বহস্তে কোন কিতাব লিখ নাই যে, মিথ্যাচারীরা সন্দেহ পোষণ করিবে” (২৯:৪৮)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি কুরআন নাযিলের পূর্বে এক দীর্ঘকাল তিনি এমন অবস্থায় অতিক্রম করেন যে, তিনি কিতাব পাঠ করিতে পারিতেন না এবং উত্তমরূপে কোন কিছু লিখিতেও পারিতেন না অর্থাৎ তিনি লেখাপড়া জানিতেন না। বরং আপন-পর সকলেই তাঁহাকে এমন উম্মী হিসাবে জানিতেন, যিনি পাঠ করিতে পারিতেন না এবং লিখিতেও পারিতেন না। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই অবস্থার কথা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহেও বিবৃত হইয়াছে। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে: الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهُهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ . "যাহারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নবীর, যাহার উল্লেখ তাওরাত ও ইন্ন্জীল, যাহা তাহাদের নিকট আছে তাহাতে লিপিবদ্ধ পায়, যে তাহাদেরকে সৎকার্যের নির্দেশ দেয় ও অসৎকার্যে বাধা দেয়” (৭ঃ ১৫৭)।
জীবদ্দশায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর অবস্থা এইরূপ ছিল এবং কিয়ামত পর্যন্ত এইরূপ থাকিবে। তিনি উত্তমরূপে লিখিতে পারিতেন না এবং লেখা শিক্ষার জন্য তিনি ইচ্ছাও পোষণ করেন নাই। জীবনে কখনও কিছু নিজ হাতে লিখেন নাই, বরং তাঁহার সামনে সর্বদা লেখকবৃন্দ হাযির থাকিতেন, তাহারা ওহী লিপিবদ্ধ করিতেন এবং বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশাহদের নিকট প্রেরিতব্য পত্রসমূহ লিখিতেন। উল্লেখ্য যে, এই লিখিতে না পারাটা রাসূলুল্লাহ (স)-এর ক্ষেত্রে কোন দোষের বিষয় নয়, বরং ইহা নবৃওয়াতের বিশেষ আলামত। যাহাতে মূর্খ-অজ্ঞ লোকেরা এই বলিয়া সন্দেহ প্রকাশ করিতে না পারে যে, তিনি পূর্ববর্তী নবীগণের উপর নাযিলকৃত কিতাবের ভিত্তিতেই এই কুরআন রচনা করিয়াছেন। এই উদ্দেশ্যেই আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে উম্মী রাখিয়াছেন।
📄 (ছয়) কবিতা শেখা
কবিতা প্রসংঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: وَمَا عَلَّمْتُهُ الشَّعْرَ وَمَا يَنْبَغِي لَهُ. "আমি তাহাকে কাব্য রচনা করিতে শিখাই নাই এবং ইহা তাহার জন্য শোভনীয়ও নয়” (৩৬ঃ ৬৯)।
রাসূলুল্লাহ (স) কাব্য ও ছন্দজ্ঞানে পণ্ডিত ছিলেন না। এই বিষয়ে আলিমগণ সকলেই একমত। ইহাও নবুওয়াতের আলামতের অন্তর্ভুক্ত। বস্তুত রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাব্যজ্ঞান শিক্ষা না দেওয়ার পিছনে তাৎপর্য হইল, যাহাতে লোকেরা এই বলিয়া সন্দেহ প্রকাশ-না করে যে, তিনি যেহেতু কাব্যজ্ঞানে পাণ্ডিত্য রাখেন, তাই এই কুরআন রচনা করিয়াছেন।
এ দাবির সমর্থনে একাধিক প্রমাণ রহিয়াছে। ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ রহিয়াছে যে, হজ্জের মৌসুমে (জাহিলী যুগেও হজ্জের বিধান ছিল) আরবের বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা যখন হজ্জ পালনের জন্য মক্কা শরীফ আগমন করিত, তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর ব্যাপারে তাহাদেরকে কি বলা হইবে-এই বিষয়ে কুরায়শ নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলোচনা হইল। তাহাদের কেহ বলিল, তখন বিচক্ষণ লোকদের কেহ বলিল, একথা আরবের লোকেরা বিশ্বাস করিবে না। কারণ তাহারা কাব্য ও কবিতা সমস্ত প্রকার ও পদ্ধতি সম্বন্ধে সম্যক অবগত। আল্লাহ্র শপথ! মুহাম্মাদের কোন কথা কবিতার নয় এবং কবিতার সাথে ইহার কোন মিলও নাই।
এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (স) কখনও কবিতা আবৃত্তি করিয়াছেন বলিয়াও উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন হুনায়ন-এর যুদ্ধের দিন তিনি স্বীয় খচ্চরের পিঠে আরোহিত অবস্থায় শত্রুদের সামনে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন: انا النبي لا كذب - انا ابن عبد المطلب "আমি নবী, আমি মিথ্যাবাদী নই। আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর” (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৭খ., হাদীছ নং ৪৩১৬; মুসলিম, জিহাদ, বাব ২৮, নং ৪৬১৫/৭৮/১৭৭৬)।