📄 যাহা কেবল নবী (স)-এর জন্য হারাম; অন্যের জন্য হারাম নয়
১. সাদাকা (যাকাত ও মানত): সাদাকা ভোগ ব্যবহার করা নবী কারীম (স)-এর জন্য হারাম। এই প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ
ان الصدقة لا تحل لمحمد ولا لال محمد انما هي اوساخ الناس. "সাদাকা ভোগ-ব্যবহার করা মুহাম্মাদ (স) ও তাঁহার পরিবারবর্গের জন্য হালাল নয়। ইহা তো মানুষের সম্পদের ময়লা” (মুসলিম, হাদীছ নং ২৪৭৩/১৬১/১০৬৯-২৪৮১/১৬৭/১০৭২)। আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) হাদিয়া গ্রহণ করিতেন; কিন্তু সাদাকা গ্রহণ করিতেন না (মুসলিম, হাদীছ নং ২৪৯১/১৭৫/১০৭৭)।
উপরিউক্ত হাদীছসমূহ ব্যাপক অর্থে বিবৃত হইয়াছে। ইহাতে ফরয ও নফল সাদাকার মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য করা হয় নাই। ইহাতে বুঝা যায়, উভয় প্রকার সাদাকাই রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য হারাম ছিল।
📄 (দুই) রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইতে যে মহিলা আগ্রহী নয়
হাফিয ইব্ন হাজার আসকালানী (র) বলেন, একাধিক আলিম এই বিষয়ে ইজমা নকল করিয়াছেন। তাঁহাদের মধ্যে আল্লামা খাত্তাবীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য (ফাতহুল বারী, ৩খ., পৃ. ৪১৫)।
আল্লামা নববী (র) বলেন, নফল সাদাকা গ্রহণ করার ব্যাপারে ইমাম শাফিঈ (র) হইতে তিন ধরনের মত বর্ণিত হইয়াছে। বিশুদ্ধতম মতে, এই জাতীয় সাদাকাও নবী কারীম (স)-এর জন্য হারাম (শারহুন নাবাবী আলা সাহীহ মুসলিম, ৭খ., পৃ. ১৭৬)।
আলিমগণের মতে সাদাকা ভক্ষণ হারাম হওয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য সাদাকা হারাম হওয়ার পিছনে তাৎপর্য হইল, মানুষের মালের ময়লা হইতে নবী (স) ও তাঁহার পদমর্যাদাকে পাক-পবিত্র রাখা। আর পরিবারবর্গের নিসবত বা সম্পর্ক যেহেতু তাঁহারই দিকে হয়, তাই তাঁহাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে তাঁহাদেরকেও তাঁহার অনুগামী হিসাবে এই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছে (ফুসূল, আল্লামা ইব্ন কাছীর, পৃ. ৩১৫; গায়াতুস সুউল, ইবনুল মুলাক্কিন, পৃ. ১৮৭; ফাতহুল বারী, ৩খ., পৃ. ৪১৫; খাসাইসুল কুবরা, আল্লামা সুয়ূতী, ৩খ., ৪০৪ ইত্যাদি)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হইল, কোন মহিলা যদি রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি অনাগ্রহ প্রকাশ করে এবং বিচ্ছেদ অবলম্বন করা পসন্দ করে, তবে তাহাকে আটক রাখা তাঁহার জন্য হারাম।
📄 তাহাকে আটক রাখা সম্পর্কে
কিন্তু উম্মতের বিষয়টি ইহার ব্যতিক্রম। অর্থাৎ কোন মহিলা যদি তাহার স্বামী হইতে বিচ্ছিন্ন হইতে চায় তাহাকে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেওয়া স্বামীর উপর ওয়াজিব নয়। বুখারী শরীফে বর্ণিত এক হাদীছে ইহার সুস্পষ্ট বিবরণ বিদ্যমান রহিয়াছে।
আইশা সিদ্দীকা (রা) বলেন, জাওন কন্যাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পেশ করার পর তিনি তাহার নিকটবর্তী হইলে সে বলিল, আমি আপনার হইতে আল্লাহ্র নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি। তখন তিনি তাঁহাকে বলেন, তুমি মহান সত্তার আশ্রয় চাহিয়াছ; কাজেই তুমি তোমার বাপের বাড়িতে চলিয়া যাও (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৯খ., কিতাবুত-তালাক বাব ৩, হাদীছ নং ৫২৫৪)।
ইবনুল মুলাক্কিন এই হাদীছ উল্লেখ করার পর বলেন, ইহাতে বুঝা যায়, যে মহিলা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সংসর্গ লাভের ব্যাপারে অনাগ্রহ প্রকাশ করে, তাহাকে বিবাহ করা তাঁহার জন্য হারাম। আর এমনটি হওয়াই যুক্তিযুক্ত। কারণ ইহাতে নবীকে কষ্ট দেওয়ার বিষয়টি লক্ষণীয়।
📄 (তিন) সামরিক পোশাক ত্যাগ না করা
নবী কারীম (স) এবং অপরাপর সমস্ত নবীগণের উপর হারাম ছিল-যুদ্ধের লেবাস পরিধান করার পর (যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত) তাহা খুলিয়া রাখা।
জাবির (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) উহুদ যুদ্ধের দিন বলিলেন, আমি স্বপ্নে দেখিয়াছি যে, আমি মযবুত লেবাস দ্বারা আবৃত আছি। আর আমি ইহাও দেখিয়াছি যে, গরু যবেহ করা হইয়াছে। আমার মতে ইহার ব্যাখ্যা হইল, মযবুত লেবাস দ্বারা মদীনা এবং গরু যবেহ করা দ্বারা সাহাবায়ে কিরামের শাহাদাতকে বুঝানো হইয়াছে। আল্লাহর শপথ! ইহার মধ্যেই কল্যাণ নিহিত রহিয়াছে। রাবী বলেন, তাহারপর নবী কারীম (স) তাঁহার সাহাবীগণকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, আমাদের জন্য মদীনায় অবস্থান করাই উত্তম। যদি তাহারা মদীনায় প্রবেশ করে, তবে আমরা তাহাদের সাথে লড়াই করিব। তখন সাহাবায়ে কিরাম বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! জাহিলী যুগেও তো কেহ মদীনায় প্রবেশ করিয়া আমাদের উপর হামলা করার সাহস করে নাই। কাজেই ইসলাম গ্রহণের পর এমনটি কেমন করিয়া হইতে পারে? তাঁহাদের এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহা হইলে তোমাদের অবস্থা সম্বন্ধে তোমরাই ভাল বুঝ।
এই বলিয়া তিনি রণসজ্জায় সজ্জিত হইলেন। তখন আনসার সাহাবীগণ বলিলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর রায় প্রত্যাখ্যান করিয়াছি (ইহা কেমন করিয়া হইতে পারে)? এই বলিয়া তাঁহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, হে আল্লাহ্ নবী! আপনার রায়ই যথাযথ। আমাদের রায় ঠিক নয়। তিনি বলিলেন, যুদ্ধের লেবাস পরিধান করার পর লড়াই না করিয়া তাহা খুলিয়া ফেলা কোন নবীর জন্য সমীচীন নয় (মুসনাদে আহমাদ, ৩খ., পৃ. ৩৫১; তাবাকাতুল কুবরা, ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ৪৫; দারিমী, হাদীছ নং ২১৬৫; হাফিয ইব্ন হাজার-এর মতে হাদীছটি সহীহ, ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৩৫৩; বুখারী, ফাতহুল বারী ১৩খ., পৃ. ৩৫১; মুসলিম, হাদীছ নং ৫৯৩৪/২০/২২৭২)।
হাফিয ইব্ন কাছীর বলেন, অধিকাংশ উলামায়ে কিরামের মতে, যুদ্ধের লেবাস পরিধান করার পর নবীর জন্য যুদ্ধ করা ওয়াজিব, লড়াই না করিয়া লেবাস খুলিয়া ফেলা হারাম (ফুসূল, পৃ. ৩৩৮)।