📄 (দুই) অভিভাবক ও সাক্ষী ব্যতিরেকে বিবাহ বন্ধন
ইসলামে পারিবারিক ব্যবস্থার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করা হইয়াছে। এই পারিবারিক ব্যবস্থা ইসলামী সমাজের মূল ভিত্তি। পরিবারের সমন্বয়েই সৃষ্টি হয় সমাজ এবং এই পারিবারিক ব্যবস্থার উপরই সমাজের স্থিতি ও স্থায়িত্ব নির্ভরশীল। পরিবার ভাল হইলে সমাজও ভাল হইবে। পক্ষান্তরে পারিবারিক অশান্তি সামাজিক ধ্বংসকে অনিবার্য করিয়া তোলে। আর পরিবার গঠন ও মানুষের বংশধারা সংরক্ষণের একমাত্র বৈধ উপায় হইল এই বিবাহ প্রথা। তাই ইসলাম বিবাহ প্রথার উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব প্রদান করিয়াছে এবং ইহার প্রতি উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করিয়া সুনির্দিষ্ট বিধান প্রণয়ন করিয়াছে। এই সকল বিধানের একটি হইল, বরের সঙ্গে কনের অভিভাবকের মতৈক্যে উপনীত হওয়া। বিবাহ বন্ধন সঠিক হওয়ার জন্য এইরূপ মতৈক্যে উপনীত হওয়া শর্ত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন : অভিভাবক ব্যতীত কোন বিবাহই শুদ্ধ হইবে না (আবূ দাউদ, নং ২০৮৫; তিরমিযী; ইবন মাজা, নং ১৮৮১; মুসনাদে আহমাদ, ৪/৪১৩-৪১৮; হাকেম, ২/১৬৯; বায়হাকী, ৭/১০৭; সহীহ জামে সাগীর, নং ৭৪৩১; জামি' উসূল, ১১/৪৫৭)।
বস্তুত বিবাহ বন্ধন কেবল মেয়েকেই নয়, বরং তাহার পরিবার এবং অভিভাবককেও চিন্তাযুক্ত করে এবং তাহার ভুল নির্বাচনের জন্য যে ক্ষতি হয় পরিণামে তাহা তাহার পরিবারকেও স্পর্শ করে। আর পরিবারের প্রধান হইল, তাহার অভিভাবক। যেমন পিতা ও ভাই। কাজেই মেয়ের স্বামীর ব্যাপারে অভিভাবকের স্পষ্ট মতামত থাকিতে হইব।
বিবাহ সঠিক হওয়ার জন্য যেমন মেয়ের অভিভাবকের সম্মতি আবশ্যক, তদ্রূপ বিবাহবন্ধনের সময় সাক্ষীর উপস্থিতিও অপরিহার্য শর্ত যাহাতে বিবাহ বন্ধন সম্পর্কে জানা যায় ও তাহা প্রচার পায় এবং মেয়ের অধিকার সংরক্ষিত হয় ও বিবাদ হইতে নিরাপদ থাকা যায়। এইজন্যই রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: “অভিভাবক এবং দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোন বিবাহ শুদ্ধ হইবে না” (সুনানুল কুবরা, ৭/১২৫, তাবারানী কৃত আল-কাবীর, ১৮/১৪২, নং ২৯৯; দারা কুতনী, ৩/২২৫; ইরওয়াউল গালীলা, ৬/২৫৮-২৬০; সহীহ জামে সাগীর, নং ৭৪৩৩-৭৪৩৪)।
কিন্তু এই দুইটি বিধানের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় উম্মত হইতে স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের কারণে অভিভাবক ও সাক্ষী ছাড়া আল্লাহ তা'আলা তাঁহার জন্য বিবাহ বন্ধনকে বৈধ করিয়াছিলেন। কারণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর ক্ষেত্রে এগুলির প্রয়োজন ছিল না।
📄 (তিন) একই সঙ্গে চারের অধিক স্ত্রী গ্রহণ
আলিমগণ বলিয়াছেন, উম্মাহ্র সদস্যগণের বিবাহের ক্ষেত্রে অভিভাবকের শর্ত আরোপ করার কারণ ছিল পারিবারিক সমতা সংরক্ষণ। আর রাসূলুল্লাহ (স) সর্বপ্রকার কৌলীন্যের ঊর্ধ্বে। অনুরূপ সাক্ষীর শর্ত আরোপ করার কারণ ছিল বিবাদ হইতে নিরাপদ থাকা। আর রাসূলুল্লাহ (স) এমন এক সত্তা যাঁহার ব্যাপারে বিবাদের কোন আশংকা ছিল না। উল্লিখিত এই স্বতন্ত্র বিধানের দলীল হইল হযরত যয়নাব বিনতে জাহ্শ (রা) বর্ণিত হাদীছ। হযরত যয়নাব বিনতে জাহ্শ (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যান্য সহধর্মিণীগণের সামনে গর্ব করিয়া বলিতেন, তোমাদের বিবাহ তোমাদের পরিবারের লোকেরা সম্পন্ন করিয়াছেন। পক্ষান্তরে আমার বিবাহ ৫০১ স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা সপ্ত আকাশের উপরে সম্পন্ন করিয়াছেন (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১৩ খ., নং ৭৪৩০)।
ইমাম নববী (র) মুসলিম শরীফের হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, হযরত আনাস (রা) বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কোন স্ত্রীর ব্যাপারে অধিক উত্তমভাবে ওলীমা (বিবাহ উত্তর আপ্যায়ন) করেন নাই, যতখানি হযরত যয়নাব (রা)-এর ব্যাপারে করিয়াছেন।
ইমাম নববী বলেন, সম্ভবত ইহার কারণ এই যে, কোন অভিভাবক ও সাক্ষী-সাবুদ ব্যতীত ওহীর মাধ্যমে হযরত যয়নাব (রা)-এর সঙ্গে তাঁহাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করিয়া আল্লাহ তাঁহার প্রতি যে অনুগ্রহ করিয়াছেন ইহা ছিল তাহারই শুকরিয়াস্বরূপ। কিন্তু অন্যান্য স্ত্রীদের অবস্থা ছিল ইহার ব্যতিক্রম। বস্তুত এই ব্যাপারে সুপ্রসিদ্ধ ও সঠিক অভিমত হইল, কোন সাক্ষী ও অভিভাবক ছাড়াই রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া সংগত ছিল। কেননা তাঁহার বেলায় ইহার কোন প্রয়োজন নাই (শারহুল নাবাবী, ৯/২২৯-২৩০)।
আল্লাহ তা'আলা তাঁহার বান্দাদের জন্য বিবাহ প্রথাকে বৈধ করিয়াছেন। এই বিবাহ প্রথায় বিরাট উপকারিতা ও গূঢ় তাৎপর্য নিহিত রহিয়াছে। যেমন মানুষের বংশধারা অব্যাহত রাখা, শয়তানের প্ররোচনা হইতে নিরাপদ থাকা, কাম-প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রিত ও প্রতিহত করা, দৃষ্টি সংযত রাখা ও লজ্জাস্থানের হিফাজত করা, আল্লাহর অনুমোদিত পন্থায় মানসিক তৃপ্তি ও সুখ ভোগ করা যাহাতে ইবাদতের শক্তি ও আগ্রহ বৃদ্ধি পায়, চেষ্টা ও সাধনা দ্বারা মনের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করা যায়, পরিবার-পরিজনের হক আদায় করা, হালাল জীবিকা অর্জনে ব্রতী হওয়া, সন্তান-সন্ততির সুশিক্ষার ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া ইত্যাদি উপকারিতা ও তাৎপর্য ইহাতে নিহিত আছে।
কিন্তু বিবাহ সংক্রান্ত বিষয়ে শরী'আতের দলীলসমূহ সাধারণ মুসলমানদের জন্য একই সঙ্গে কেবল চারজন স্ত্রী রাখাকে বৈধ করিয়াছে। চারের অধিককে নিষিদ্ধ করিয়া আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন:
وَإِنْ خِفْتُمْ أَلا تُقْسِطُوا فِي الْيَتْمَى فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلُثَ وَرُبَعَ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ. "তোমরা যদি আশংকা কর যে, ইয়াতীম মেয়েদের প্রতি সুবিচার করিতে পারিবে না, তবে বিবাহ করিবে নারীদের মধ্যে যাহাকে তোমাদের ভাল লাগে, দুই, তিন অথবা চার। আর তোমরা যদি আশংকা কর যে, সুবিচার করিতে পারিবে না তবে একজনকে অথবা তোমার অধিকারভুক্ত দাসীকে” (৪ঃ৩)।
হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) ও জমহুর আলিমগণ বলেন, উল্লিখিত আয়াত যে স্থলে নাযিল হইয়াছে সেই স্থলটি হইল দয়া প্রদর্শন ও বৈধতাদানের স্থল। সুতরাং একই সঙ্গে চারের
📄 রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক অধিক স্ত্রী গ্রহণের তাৎপর্য
৫০২ অধিক স্ত্রী গ্রহণ করা বৈধ হইলে তাহা অবশ্যই এখানে উল্লেখ করা হইত (তাফসীর ইব্ন কাছীর, ১/৪৬১)।
হযরত গায়লান ইবন সালামা আস-ছাকাফী যে সময় ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁহার অধীনে দশজন স্ত্রী ছিল, রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিয়াছিলেন, তুমি তাহাদের মধ্যে চারজনকে গ্রহণ কর (আবূ দাউদ, নং ২২৪১; তিরমিযী, নং ১১২৮; ইবন মাজা, নং ১৯৫৩; মুসনাদে আহমাদ, ২/১৪; ইব্ন কাছীর বলেন, আহমাদের সনদটি শায়খায়নের শর্ত অনুযায়ী হইয়াছে; তাফসীর ইব্ন্ন কাছীর, ১/৪৬১; মাজমাউয যাওয়াইদ, ৪খ., নং ২২৩)।
ইমাম শাফি'ঈ (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সুন্নাহ (যাহা আল্লাহর বাণীর ব্যাখ্যাস্বরূপ) হইতে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (স) ব্যতীত অন্য কাহারও জন্য একত্রে চারের অধিক স্ত্রী গ্রহণ করা বৈধ নয়।
হাফেজ ইব্ন কাছীর বলেন, "শাফি'ঈ (র)-এর কথিত উক্তির প্রতি আলিমগণের মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে” (তাফসীর ইব্ন কাছীর, ১/৪৬০)। সুতরাং উল্লিখিত বিধানটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি বৈশিষ্ট্য যাহা দ্বারা তিনি উম্মাহর অন্যান্য লোকদের তুলনায় স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী হইয়াছেন। আলিমগণ এই ব্যাপারে একমত যে, ইন্তিকালের সময় রাসূলুল্লাহ (স) নয়জন স্ত্রী রাখিয়া যান। তাঁহারা হইলন (১) সাওদা বিনতে যাম'আহ কুরাশিয়া, (২) আইশা বিনতে আবু বকর কুরাশিয়া, (৩) উম্মু সালামা হিন্দ বিনতে আবী উমায়্যা কুরাশিয়া, (৪) হাফসা বিনতে উমার কুরাশিয়া, (৫) যয়নাব বিনতে জাহ্শ আসাদিয়া, (৬) জুওয়ায়রিয়া বিনতুল হারিছ মুসতালিকিয়া, (৭) উম্মু হাবীবা রামলা বিনতে আবু সুফ্যান কুরাশিয়া, (৮) সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই নাদীরিয়া এবং (৯) মায়মূনা বিনতুল হারিছ হিলালিয়া (রা)।
হাফেজ ইব্ন হাজার বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর বহু বিবাহের তাৎপর্য সম্পর্কে মনীষিগণ যে সকল মতামত পেশ করিয়াছেন তাহা হইতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলি পরিস্ফুটিত হইয়া উঠে।
(এক) রাসূলুল্লাহ (স)-এর একান্ত গোপনীয় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অবস্থা প্রত্যক্ষকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। তিনি যাদুকর বা এই ধরনের কিছু বলিয়া মুশরিকরা অহেতুক ধারণা করিত, ইহার যেন অবসান ঘটে।
(দুই) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের সুবাদে আরব গোত্রসমূহের সম্মান বৃদ্ধি পাওয়া।
(তিন) ইহার মাধ্যমে তাহাদের সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করা।
(চার) দায়িত্ব পালনে কষ্টক্লেশ বৃদ্ধি করা। কেননা রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর এইরূপ কঠিন দায়িত্ব অর্পিত হইয়াছিল যে, স্ত্রীদের কাহারও প্রতি তাঁহার ভালবাসা যেন উত্তমরূপে দীনের প্রচারকার্য হইতে তাঁহাকে বিরত না রাখে।
📄 যে সকল বিষয় কেবল রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর আবশ্যকীয় ছিল অন্য কাহারও উপর নয়
(পাঁচ) স্ত্রীদের হইতে অধিক পরিমাণে তাঁহার বংশের বিস্তার লাভ করা, যাহাতে শত্রুর মুকাবিলায় তাঁহার সাহায্যকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
(ছয়) পুরুষদের পক্ষে জ্ঞাত হওয়া সম্ভব নয় শরী'আতের এরূপ বিধান প্রকাশ করা। কেননা স্ত্রীর সঙ্গে সাধারণত এমন ঘটনা ঘটিয়া থাকে যাহা গোপন থাকাই বাঞ্ছনীয়।
(সাত) প্রশংসনীয় অপ্রকাশ্য চারিত্রিক গুণাবলী সম্পর্কে অবহিত হওয়া। হযরত উম্মে হাবীবা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) এমন এক সময়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন, স্বয়ং তাঁহার পিতা যখন তাঁহাকে জানী দুশমন হিসাবে ভাবিয়াছিল। অনুরূপ হযরত সাফিয়্যা (রা)-কে বিবাহ করেন তাঁহার পিতা, চাচা ও স্বামী নিহত হওয়ার পর। রাসূলুল্লাহ (স)-এর যদি চারিত্রিক পরাকাষ্ঠা না থাকিত, তাহা হইল অবশ্যই তাঁহারা তাঁহাকে ঘৃণা করিতেন; বরং বাস্তব সত্য হইল, তিনি তাঁহাদের কাছে তাহাদের পরিবার-পরিজনের চাইতেও অতিশয় প্রিয় ছিলেন।
(আট) নারীদের পবিত্রতা সংরক্ষণ ও তাহাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
(চার) নিরাপত্তার নগরী মক্কায় যুদ্ধ অনুষ্ঠান
আল্লাহ তা'আলা উম্মুল কুরা তথা সম্মানিত নগর মক্কাকে বিশেষ মর্যাদায় মহিমান্বিত করিয়াছেন। তিনি এই নগরীর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করিয়াছেন এবং বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও অসাধারণত্ব দানের মাধ্যমে ইহাকে নির্বাচিত করিয়াছেন। পৃথিবীর অন্য কোন শহর এতখানি গুরুত্ব পায় নাই যতখানি গুরুত্ব পাইয়াছে এই মক্কা নগরী। এই গুরুত্বের নিদর্শন এই যে, তাহাতে পৃথিবীর প্রাচীনতম ঘর কা'বা অবস্থিত।
এই কা'বা পৃথিবীর প্রথম ঘর যাহা মানুষের ইবাদত ও কুরবানীর জন্য নির্মিত হইয়াছে। লোকেরা তাহা তাওয়াফ করে এবং সেদিকে ফিরিয়া নামায আদায় করে ও তাহার নিকট অবস্থান করে। তাহাতে প্রবেশকারীরা নিরাপর্দ থাকে। তিনি ইহাকে মানুষের নিরাপদ ঠিকানারূপে প্রতিপন্ন করিয়াছেন। বৎসর পরিক্রমায় পৃথিবীর নানা অঞ্চল হইতে লোকের তাহাতে ছুটিয়া আসে। তাহার যিয়ারতে আকাঙ্ক্ষা কখনও ফুরায় না; বরং যতবার তাহার যিয়ারত নসীব হয় ততই তাহার আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়।
তাহাকে দেখিয়া ফিরেনা তো চোখ বারে বারে অতৃপ্ত দৃষ্টি শুধু সুখ।
কত কা'বা প্রেমিক কা'বাপ্রেমে তাহাদের জানমাল বিসর্জন দিয়াছে, কত প্রেমিক নিজ পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও স্বদেশভূমি ত্যাগ করিয়াছে। আল্লাহ কা'বা অঙ্গনকে তাঁহার প্রিয় বান্দাদের ইবাদতগাহে পরিণত করিয়াছেন। কা'বার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করাকে বাধ্যতামূলক করিয়া দিয়াছেন এবং ইহাকে ইসলামের একটি আবশ্যক কাজ হিসাবে সাব্যস্ত করিয়াছেন। তিনি ইহাকে সকল জনপদের মূল বা জননীরূপে আখ্যায়িত করিয়াছেন। সুতরাং পৃথিবীর বাকী জনপদগুলি ইহার অধীন ও শাখা। ইহার সমকক্ষ অন্য কোন জনপদ নাই। এই জনপদ একটি
সম্মানিত জনপদ। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টির সূচনালগ্নেই আল্লাহ ইহাকে সম্মানিত করিয়াছেন। কাজেই ইত্যাকার বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্বের কারণে তাহাতে কোনরূপ হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করা অবৈধ ও নিষিদ্ধ (যাদুল মা'আদ, ১ খ., পৃ. ৪৬-৫১, সংক্ষেপিত ও পরিবর্তিত)।
কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নবী (স)-এর ব্যাপারে বিজয়ের বৎসর মক্কা মুকাররামাকে এক দিনের জন্য হালাল করিয়া দেন। সেদিন তিনি ইহরামবিহীন অবস্থায় মক্কায় প্রবেশ করেন এবং মক্কার প্রায় বিশজন অধিবাসীকে হত্যা করেন। এই ঘটনা ছিল তাঁহার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যস্বরূপ এবং একাধিক বিশুদ্ধ হাদীছও এই কথার সত্যতা প্রমাণ করে। এগুলির মধ্যে সেদিন প্রথম প্রহরে তিনি যে ভাষণ প্রদান করিয়াছিলেন তাহাও শামিল রহিয়াছে। উক্ত ভাষণে তাঁহার বক্তব্য ছিল নিম্নরূপ:
আল্লাহ মক্কাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করিয়াছেন, লোকেরা নয়। সুতরাং আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রাখে এমন কোন ব্যক্তির পক্ষে তাহাতে রক্তপাত সংঘটিত করা এবং তাহার বৃক্ষরাজি কর্তন করা বৈধ নয়। এখন কোন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক রক্ত প্রবাহিত করার অজুহাতে ইহার সুযোগ নিতে চাহিলে তোমরা তাহাকে বলিয়া দিও, আল্লাহ তা'আলা কেবল তাঁহার রাসূল মুহাম্মাদ (স)-কেই ইহার অনুমতি দিয়াছিলেন, তোমাদেরকে নয়। বস্তুত আমাকে কেবল এক দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যই অনুমতি প্রদান করা হইয়াছিল। তাহার পর তাহার নিষিদ্ধারস্থাটি পূর্ববর্তী দিনের ন্যায় পুনরায় ফিরিয়া আসিয়াছে। যাহারা উপস্থিত তাহারা যেন অনুপস্থিতদের নিকট আমার পয়গাম পৌঁছাইয়া দেয় (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৪ খ., নং ১৮৩২; মুসলিম, নং ১৩৫৪)।