📄 (দুই) এই উম্মত কিয়ামতের দিন অন্যান্য উম্মতের পক্ষে-বিপক্ষে সাক্ষী হইবে
সমস্ত উম্মতের মধ্যে উম্মতে মুহাম্মাদীই হইল শ্রেষ্ঠতম এবং সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন। আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদেরকে পূর্ণাঙ্গ শরীআত ও জীবনব্যবস্থা প্রদান করিয়া বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করিয়াছেন। তাহারা অন্যান্য উম্মতের মধ্যে মধ্যপন্থী উম্মত। তাহাদের মধ্যে ইয়াহুদী-খৃষ্টানদের মত বাড়াবাড়ি ও প্রান্তিকতা (ইফরাত-তাফরীত) নাই। এই কারনেই আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাহাদেরকে অন্যান্য উম্মতের উপর সাক্ষী বানাইবেন। পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূলের উম্মত কিয়ামতের ময়দানে তাহাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টিকে যখন অস্বীকার করিবে, তখন উম্মতে মুহাম্মাদীই কেবল তাহাদের দায়িত্ব পালনের পক্ষে সাক্ষ্য দিবে এবং তাহাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হইবে। ইহাতেও এই উম্মতের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার বিষয়টি প্রতীয়মান হয়। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলিয়াছেনঃ
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا . "এইভাবে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী উম্মতরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি, যাহাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ এবং রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হইবে" (২ : ১৪৩)।
শায়খ 'ইয্যুদ্দীন ইব্ন আবদুস সালাম নবী কারীম (স)-এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত হাদীছের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উম্মতকে ন্যায়পরায়ণ বিচারকের মর্যাদা দান করিয়াছেন। অর্থাৎ তিনি যখন বান্দাদের বিচার করিবেন তখন পূর্ববর্তী উম্মতগণ তাহাদের নিকট রিসালাতের বাণী পৌঁছাইবার বিষয়টি অস্বীকার করিবে। আর সেই মুহূর্তে তিনি উম্মতে মুহাম্মাদীকে হাযির করিবেন। তাহারা ঐ সমস্ত লোকদের সামনে সাক্ষ্য প্রদান করিবে যে, নবী-রাসূলগণ সকলেই তাঁহাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করিয়াছেন। স্মর্তব্য যে, এই বৈশিষ্ট্য অন্য কোন নবী-রাসূলের উম্মতের মধ্যে পাওয়া যাইবে না। হাদীছে এই সম্বন্ধে সুস্পষ্ট বক্তব্য বিদ্যমান রহিয়াছে।
আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: কিয়ামতের দিন নূহ (আ)-কে ডাকা হইবে। তিনি উত্তর দিবেন, হে আমার রব! আমি আপনার দরবারে উপস্থিত। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, তুমি কি তোমার কওমের নিকট আল্লাহর বাণী পৌঁছাইয়া দিয়াছিলে? তিনি বলিবেন, হাঁ। তখন তাঁহার উম্মতকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করা হইরে, নূহ্ কি তোমাদের নিকট পয়গাম পৌঁছাইয়াছিল? তাহারা বলিবে, আমাদের নিকট কোন সতর্ককারী আগমন করেন নাই। তখন আল্লাহ্ তা'আলা নূহকে জিজ্ঞাসা করিবেন, তোমার দাবির পক্ষে কে সাক্ষ্য দিবে? তিনি বলিবেন, মুহাম্মাদ (স) ও তাঁহার উম্মতগণ। তাহারা সাক্ষ্য প্রদান করিবে যে, নূহ (আ) তাঁহার উম্মতের নিকট আল্লাহ্র পয়গাম প্রচার করিয়াছেন এবং রাসূলুল্লাহ (স) তোমাদের পক্ষে সাক্ষী হইবেন। ইহাই মহান আল্লাহর বাণীতে বিধৃত হইয়াছে:
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا . "এইভাবে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী উম্মতরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি, যাহাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ এবং রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হইবে" (২ : ১৪৩; বুখারী, ফাতহুল বারী, ৮খ., হাদীছ নং ৪৪৮৭)।
আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা) আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন, কিয়ামতের ময়দানে নবী-রাসূলগণ উপস্থিত হইবেন। কোন নবী দুইজন, কোন নবী তিনজন উম্মতসহ উপস্থিত হইবেন, আবার কেহ ইহার চেয়ে কম বা বেশি উম্মতসহ উপস্থিত হইবেন। তখন আল্লাহ্র পক্ষ হইতে প্রত্যেক নবীকে জিজ্ঞাসা করা হইবে, তুমি কি তোমার কওমের নিকট আমার পয়গাম পৌঁছাইয়াছিলে? জবাবে নবীগণ প্রত্যেকেই বলিবেন, হাঁ, পৌঁছাইয়াছিলাম। তখন তাঁহার উম্মতকে ডাকা হইবে এবং জিজ্ঞাসা করা হইবে, তোমাদের নিকট সে আমার পয়গাম পৌঁছাইয়াছিল কি? তাহারা বলিবে, না। আল্লাহ্ তা'আলা নবীকে জিজ্ঞাসা করিবেন, তোমার দাবির পক্ষে কে সাক্ষ্য দিবে? তিনি বলিবেন, মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মত। তখন উম্মতে মুহাম্মাদীকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করা হইবে, সে কি আমার পয়গাম পৌঁছাইয়াছিল? তাহারা বলিবে, হাঁ। আল্লাহ্ বলিবেন, তোমরা তাহা জানিলে কিভাবে? তাহারা বলিবে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ (স.) আমাদেরকে সংবাদ, দিয়াছেন যে, নবী-রাসূলগণ সকলেই আল্লাহর পয়গাম যথাযথভাবে পৌঁছাইয়াছেন। আর আমরা তাঁহার কথা বিশ্বাস করিয়াছি। তখন নবী কারীম (স) বলেন, মহান আল্লাহ্বর নিমোক্ত বাণীতে ইহাই-ঘোষিত হইয়াছে:
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا . "এইভাবে: আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী উম্মতরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি, যাহাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ এবং রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হইবে" (২ : ১৪৩; মুসনাদে আহমাদ, ৩খ., পৃ. ৫৮; ইবন মাজা, যুহদ, বাব ৩৪, নং ৪২৮৪; আলবানী হাদীছটিকে সহীহ বলিয়াছেন; সহীহ আল-জামেউস সাগীর, হাদীছ নং ৭৮৮৯)।
কা'ব আল-আহবার (র) বলেন, এই উম্মতকে এমন তিনটি বিষয় দান করা হইয়াছে, যাহা নবীগণ ব্যতীত অন্য কাহাকেও দান করা হয় নাই। নবীকে বলা হইত, প্রচার কর অসুবিধা নাই। তুমি তোমার কওমের ব্যাপারে সাক্ষী। আরও বলা হইত, দু'আ কর, কবুল করা হইবে। নবীগণের ন্যায় এই উম্মতের শানেও আল্লাহ্ তা'আলা বলিয়াছেন:
وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مَنْ حَرَج . "তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেন নাই" (২২ঃ ৭৮)।
📄 (তিন) এই উম্মতই সর্বপ্রথম পুলসিরাত পার হইয়া জান্নাতে প্রবেশ করিবে
লَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ . "যাহাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষী হইতে পার" (২ঃ১৪৩)।
أدْعُوني أَسْتَجِبْ لَكُمْ . "তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব" (৪০: ৬০)।
সিরাত জাহান্নামের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি দীর্ঘ সেতু। ইহা তরবারির ধার হইতে তীক্ষ্ণ এবং চুল হইতেও সূক্ষ্ম হইবে। যে ব্যক্তি এই পৃথিবীতে সিরাতে মুস্তাকীমের উপর কায়েম থাকিবে, তাহার জন্য আখিরাতে পুলসিরাত পার হওয়া সহজ হইবে এবং সে মুক্তি পাইবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি সঠিক পথ হইতে বিচ্যুত হইবে এবং নাফরমানিতে লিপ্ত হইবে, সে পুলসিরাত হইতে পদস্খলিত হইয়া জাহান্নামে পতিত হইবে।
আল্লাহ্ তা'আলা নবী (স) ও উম্মতে মুহাম্মাদীকে যে বৈশিষ্ট্য দান করিয়াছেন, ইহার অন্যতম হইল, তাহারাই প্রথমে পুলসিরাত পার হইবে এবংচিরশান্তির নিকেতন জান্নাতে প্রবেশ করিবে। এই সম্বন্ধে হাদীছের বিবরণ অত্যন্ত স্পষ্ট।
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, একদল সাহাবী রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! কিয়ামতের দিন কি আমরা আমাদের রবকে দেখিতে পাইব? রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, পূর্ণিমার রাতে চাঁদ দেখিতে তোমাদের কোন কষ্ট হয় কি? সাহাবাগণ বলিলেন, না, ইয়া রাসূলাল্লাহ্। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, যেঘমুক্ত আকাশে সূর্য দেখিতে তোমাদের কোন কষ্ট হয় কি? তাহারা বলেন, না, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, তদ্রূপ তোমরাও আল্লাহকে দেখিবে। কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ্ সকল মানুষকে জমায়েত করিয়া বলিবেন, পৃথিবীতে তোমরা যাহার ইবাদত করিয়াছিলে, আজ তাহাকেই অনুসরণ কর। সূর্যের উপাসক দল সূর্যের পিছনে, চন্দ্রের উপাসক দল চন্দ্রের পিছনে, মূর্তির উপাসক দল দেব-দেবীর পিছনে চলিবে। কেবল এই উন্নত অবশিষ্ট থাকিবে। তাহার মধ্যে মুনাফিকরাও থাকিবে। তখন আল্লাহ তা'আলা তাহাদের নিকট, এমন আকৃতিতে উপস্থিত হইবেন, যাহা তাহারা চিনে না। ইহার পর তিনি বলিবেন, আমিই তোমাদের রব। সুতরাং তোমরা আমার পিছনে চল। তখন তাহারা বলিবে; আমরা আল্লাহর নিকট তোমার হইতে পানাহ্ চাই! আমাদের রব না আসা পর্যন্ত আমরা এখানেই থাকিব। আর তিনি যখন আসিবেন, তখন আমরা তাঁহাকে চিনিতে পারিব। আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদের নিকট তাহাদের পরিচিত আকৃতিতে আবির্ভূত হইয়া বলিবেন-আমিই তোমাদের রব। তাহারা বলিবে, হাঁ, আপনিই আমাদের রব। এই বলিয়া তাহারা তাঁহার অনুসরণ করিবে। ইত্যবসরে জাহান্নামের উপর দিয়া, সিরাত (সেতু) স্থাপন করা হইবে এবং আমি ও আমার উম্মতই হইব প্রথম এই সীরাত অতিক্রমকারী (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১ খ., হাদীছ নং-৬৫৭৩; মুসলিম, হাদীছ নং ১৮২)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর মুক্তদাস ছাওবান (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে দাঁড়াইয়াছিলাম। ইতিমধ্যে ইয়াহুদীদের এক পণ্ডিত ব্যক্তি আসিয়া বলিল, আসসালামু আলাইকা ইয়া মুহাম্মাদ! তাহার কথা শুনিয়া আমি তাহাকে এমন ধাক্কা দিলাম যে, ইহাতে সে প্রায় পড়িয়াই গিয়াছিল। সে বলিল, তুমি আমাকে ধাক্কা মারিলে কেন? আমি বলিলাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্!' বলিতে পার না? ইয়াহুদী বলিল, আমরা তাঁহাকে তাঁহার পরিবার-পরিজন যেই নাম রাখিয়াছে, সেই নামেই ডাকি। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমার নাম মুহাম্মাদ। আমার পরিবারের লোকই এই নাম রাখিয়াছে।
📄 (চার) কাজ কম পারিশ্রমিক বেশি
ইয়াহুদী বলিল, আমি আপনাকে কয়েকটি কথা জিজ্ঞাসা করিতে আসিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমার কি লাভ হইবে, যদি আমি তোমাকে কিছু বলি? সে বলিল, আমি কান পাতিয়া শুনিব। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কাছে যে লাঠিটি ছিল তাহার দ্বারা মাটি খুঁড়িলেন, তারপর বলিলেন, জিজ্ঞাসা কর। ইয়াহুদী বলিল, যেদিন এই পৃথিবী ও আসমান পাল্টাইয়া অন্য যমীন ও আসমানে পরিণত হইবে (অর্থাৎ কিয়ামত হইবে) সেদিন সর্বপ্রথম (তাহা পার হইবার) অনুমতিক লাভ করিবে? তিনি বলিলেন, দরিদ্র মুহাজিরগণ। ইয়হুদী বলিল, জান্নাতে যখন তাহারা প্রবেশ করিবে তখন তাহাদের তোহফা কি হইবে? তিনি বলিলেন, মাছের কলিজা। সে বলিল, তাহাদের সকালের নাস্তা কি হইবে? তিনি বলিলেন, তাহাদের জন্য জান্নাতের ষাঁড় যবেহ করা হইবে, যাহা জান্নাতের আশেপাশে চড়িয়া বেড়ায়। সে বলিল, ইহার পর তাহাদের পানীয় কি হইবে? তিনি বলিলেন, সেখানকার একটি ঝর্ণার পানি যাহার নাম সাল্সাবীল। সে বলিল, আপনি ঠিক বলিয়াছেন।
সে আরও বলিল, আমি আপনার কাছে এমন একটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে আসিয়াছি যাহা কোন মৰী ছাড়া-পৃথিবীর কোন অধিবাসী জানে না'অথবা একজন কি দুইজন লোক ছাড়া। তিনি বলিলেন, আমি যদি তোমাকে তাহা বলিয়া দেই, তবে তোমার কি কোন উপকার হইবে? সে বলিল, আমি কান পাতিয়া শুনিব। সে বলিল, আমি আপনাকে সম্ভাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিতে আসিয়াছি। তিনি বলিলেন, পুরুষের বীর্য সাদা এবং মহিলাদের বীর্য হলুদ। যখন উভয়টি একত্র হয় এবং পুরুষের বীর্য মহিলাদের ডিম্বের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে তখন আল্লাহ্ হুকুমে পুত্র সন্তাস হয়। আর যখন মহিলাদের ডিম্ব পুরুষের বীর্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে তখন আল্লাহ্ হুকুমে কন্যা সন্তান হয়। ইয়াহুদী বলিল, আপনি ঠিকই বলিয়াছেন, এবং নিশ্চয় আপনি নবী। ইহার পর সে চলিয়া গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন এই লোক আমার কাছে যাহা জিজ্ঞাসা করিয়াছে, ইতিপূর্বে আমার সেই সম্পর্কে কোন জ্ঞানই ছিল না। আল্লাহ্ তা'আলা এক্ষণই আমাকে তাহা জানাইয়া দিলেন (মুসলিম, হাদীছ নং ৭১৬/৩৪/৩১৫)।
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: সৃষ্টির্গত দিক হইতে আমরা সর্বশেষ কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরা হইব অগ্রগামী। আমরাই প্রথমে জান্নাতে প্রবেশ করিব। পার্থক্য কেবল এতটুকু যে, তাহাদেরকে আমাদের পূর্বে কিতাব দেওয়া হইয়াছে; আর আমাদেরকে ৪৮৯ তাহাদের পরে কিতাব দেওয়া হইয়াছে। তাহারা (হকের ব্যাপারে) মতভেদ করিয়াছে। কিন্তু তাহারা যে হকের ব্যাপারে মতভেদ লিপ্ত হইয়াছে, আল্লাহ্ তা'আলা সেই ব্যাপারে আমাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করিয়াছেন। এই (জুমুআর) দিনটির ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের সঠিক পথ প্রদর্শন করিয়াছেন। এই দিনটি আমাদের জন্য (খাস)। ইহার পরের দিনটি ইয়াহুদীদের এবং ইহার পরের দিনটি খৃস্টানদের জন্য (বুখারী, ফাতহুল বারী, ২খ., হাদীছ নং ৮৭৬; মুসলিম, নং ৮৫৫; হাদীছের মূল পাঠ সহীহ মুসলিম হইতে গৃহীত)।
আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতকে বহু নিয়ামত ও বহু বৈশিষ্ট্য দান করিয়াছেন। ইহার মধ্যে একটি হইল, তাহারা পূর্ববর্তী উম্মতের তুলনায় কাজ কম করিবে, কিন্তু তাহাদেরকে পারিশ্রমিক বেশি দেওয়া হইবে। বস্তুত ইহা আল্লাহ্ তা'আলার বিশেষ অনুগ্রহ; তিনি তাহা যাহাকে ইচ্ছা দান করেন। তিনি তো মহাঅনুগ্রহশীল। শায়খ ইয্যুদ্দীন ইব্ন আবদুস সালাম ইহাকে এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য হিসাবে উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছেও ইহার প্রমাণ বিদ্যমান রহিয়াছে।
ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: পূর্বেকার উম্মতের হায়াত তথা স্থায়িত্বের তুলনায় তোমাদের স্থায়িত্ব হইল, আসর হইতে সূর্য অস্ত যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ের অনুরূপ। তোমাদের এবং ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের উদাহরণ হইল ঐ ব্যক্তির মত যে একদল লোককে কাজে নিয়োগ করিল এবং বলিল, আমার জন্য এক কীরাতের বিনিময়ে অর্ধদিন পর্যন্ত কাজ করিতে কে প্রস্তুত আছ? ইন্নাহুদী সম্প্রদায় ইহাতে ব্রাযী হইল এবং তাহারা এক কীরাতের বিনিময়ে অর্ধ দিবস পর্যন্ত কাজ করিল। তাহার পর সে আবার বলিল, আমার জন্য এক কীরাতের বিনিময়ে দুপুর হইতে আসর পর্যন্ত কাজ করিতে কে প্রস্তুত আছ? ইহাতে খৃস্টান সম্প্রদায় রাখী হইল এবং দুপুর হইতে আসর পর্যন্ত এক কীরাতের বিনিময়ে তাহারা কাজ করিল। ইহার পর সে পুনরায় বলিল, আমার জন্য দুই কীরাতের বিনিময়ে আসর হইতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কাজ করিতে কে প্রস্তুত আছ? জানিয়া রাখ, তোমরাই সেই সম্প্রদায় যাহারা আসর হইতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দুই কীরাতের বিনিময়ে আমল করিয়াছ। জানিয়া রাখ, তোমাদের জন্য রহিয়াছে দ্বিগুণ পুরস্কার। ইহাতে ইয়াহুদী এবং খৃস্টান সম্প্রদায় ভীষণ ক্ষেপিয়া গেল এবং বলিল, আমাদের আমল বেশি কিন্তু পারিশ্রমিক কম। তখন আল্লাহ্ তা'আলা বলিলেন, তোমাদের পারিশ্রমিকের ব্যাপারে আমি কি তোমাদের প্রতি কোনরূপ জুলুম করিয়াছি? তাহারা বলিল, না'। তিনি বলিলেন, ইহা আমার অনুগ্রহ; আমি যাহাকে ইচ্ছা তাহা দেই (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৬খ., হাদীছ নং ৩৪৫৯)।
উপরিউক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় হাফিয ইব্ন কাছীর (র) বলেন, এই উদাহরণের উদ্দেশ্য হইল, মুসলামান এবং কিতাবী লোকদের পুরস্কারের মধ্যে পার্থক্য হইবে এই কথা বুঝানো। আর এই বিষয়টি আমল কম-বেশি হওয়ার উপর নির্ভরশীল নয়, বরং এক্ষেত্রে অন্য বিষয়
লক্ষণীয়। কখনও অল্প আমল দ্বারা এত বেশি সওয়াব হাসিল হয়, যাহা অধিক আমল দ্বারা হয় না। উদাহরণস্বরূপ লায়লাতুল কদরের কথা বলা যায়। এই এক রাতের আমল হাজার মাসের আমল হইতেও উত্তম। অনুরূপভাবে সাহাবায়ে কিরাম দীনের পথে বিভিন্ন সময় অর্থ-সম্পদ ব্যয় করিয়াছেন। কিন্তু তাহাদের ব্যতীত অন্য কেহ যদি এই পথে উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও দান করে, তবে তাঁহারা এক মুদ্দ বা অর্ধমুদ্দ খেজুর দান করিয়া যে সওয়াব হাসিল করিয়াছেন, সেই পরিমাণ সওয়াব লাভ করাও তাহাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এমনিভাবে আমাদের নবী মুহাম্মাদ (স)-কে আল্লাহ্ তা'আলা চল্লিশ বৎসর বয়সের সময় নবুওয়াত দান করেন এবং প্রসিদ্ধ মতে ৬৩ বৎসর বয়সকালে তাঁহাকে এই পৃথিবী হইতে নিয়া যান। সর্বমোট নবুওয়াতকাল তেইশ বৎসর। এই তেইশ বৎসরের নবুওয়াতী জীবনে তাঁহার সত্তা হইতে যে ইলম ও আমলের বহিঃপ্রকাশ ও বাস্তবায়ন ঘটিয়াছে, তাহাতেও তিনি পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূল হইতে অগ্রগামী প্রমাণিত হইয়াছেন, এমনকি নূহ (আ) হইতেও। অথচ তিনি সাড়ে নয় শত বৎসর তাঁহার কওমের মধ্যে অবস্থান করিয়া তাহাদেরকে এক আল্লাহ্ ইবাদতের প্রতি আহবান করিয়াছেন এবং দিবানিশি, সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য করিয়াছেন। 'ঠিক তদ্রূপ নবী কারীম (স)-এর বরকতে এই উম্মতের সওয়াবকেও অন্য উম্মতের তুলনায় কয়েক গুণ বাড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে। ইহা এই উম্মতের প্রতি আল্লাহ্ বিশেষ অনুগ্রহ। যেমন কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে:
يٰأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَآمِنُوا بِرَسُولِهِ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِنْ رَّحْمَتِهِ وَيَجْعَلْ لَكُمْ نُورًا تَمْشُونَ بِهِ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ لِئَلَّا يَعْلَمَ أَهْلُ الكتب الا يَقْدِرُونَ عَلَى شَيْءٍ مِّنْ فَضْلِ الله وَأنَّ الفَضْلَ بيدِ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ ذُو الفَضْلِ العَظِيم. "হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁহার রাসূলের প্রতি ঈমান আন। তিনি তাঁহার অনুগ্রহে তোমাদেরকে দিবেন দ্বিগুণ পুরষ্কার এবং তিনি তোমাদেরকে দিবেন- আলো, যাহার সাহায্যে তোমরা চলিবে এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করিবেন; আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ইহা এইজন্য যে, কিতাবীগণ যেন জানিতে পারে, আল্লাহ্র সামান্যতম অনুগ্রহের উপরও তাহাদের কোন অধিকার নাই। অনুগ্রহ আল্লাহ্রই এখতিয়ারে, যাহাকে ইচ্ছা তিনি তাহা দান করেন। আল্লাহ্ মহাঅনুগ্রহশীল” (৫৭৪ ২৪-২৯)।-
আবূ মূসা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী কারীম (স) বলেন, মুসলিম এবং ইয়াহুদী-খৃস্টানদের উপমা হইল ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে একদল লোককে নিয়োগ করিয়াছে, যেন তাহারা তাহার জন্য নির্ধারিত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সকাল হইতে রাত পর্যন্ত কাজ করে। ইহার পর তাহারা অর্ধ দিবস পর্যন্ত কাজ করিয়া বলিল, তোমার পারিশ্রমিকের আমাদের কোন দরকার নাই। আমরা যাহা করিয়াছি তাহা বাতিল। নিয়োগকর্তা অহাদেরকে বলিল, তোমরা এরূপ করিও না।
তোমরা তোমাদের অবশিষ্ট কাজ পূর্ণ কর এবং তোমাদের পূর্ণ পারিশ্রমিক তোমরা নিয়া যাও। কিন্তু তাহারা তাহা অস্বীকার করিল এবং কাজ ফেলিয়া রাখিয়া চলিয়া গেল।
অতঃপর নিয়োগকর্তা অপর একদল লোককে কাজে নিয়োগ করিল এবং তাহাদেরকে বলিল, তোমরা এই দিনের অবশিষ্ট সময় কাজ কর, তাহাদের সঙ্গে পারিশ্রমিকের যেই শর্ত করিয়াছিলাম, তোমাদেরকে সেই পরিমাণই দিব। তাহারা কাজ শুরু করিয়া আসরের সময় হওয়ার পর বলিল, তোমার জন্য আমরা যে কাজ করিয়াছি তাহা বাতিল। আর যে পারিশ্রমিক আমাদের দেওয়ার কথা তাহা তোমার কাছেই থাকুক। সে বলিল, বাকী কাজ পুরা কর। এখন তো দিনের সামান্য সময়ই বাকী আছে। তাহারা ইহাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করিল।
ইহার পর নিয়োগকর্তা দিনের অবশিষ্ট সময় কাজ করার জন্য একদল লোককে নিয়োগ করিল। তাহারা সূর্যাস্ত পর্যন্ত দিনের অবশিষ্ট অংশ কাজ করিল এবং সেই দুই দলের পূর্ণ পারিশ্রমিক হাসিল করিল। ইহাই হইল তাহাদের এবং যাহারা এই নূর (ইসলাম) গ্রহণ করিয়াছে তাহাদের মধ্যকার উদাহারণ (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৪খ., হাদীছ নং ২২৭১)।
হাফিয ইবন হাজার (র) এই হাদীছের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন, ইহাতে এই উম্মতের শ্রেষ্ঠত্ব ও আমল কম হওয়া সত্ত্বেও সওয়াব বেশি পাওয়ার কথাটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় (ফাতহুল বারী, ৪খ., পৃ. ৫২৫)।
📄 (পাঁচ) জান্নাতীদের অধিকাংশই হইবে মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মত
এই উম্মতের বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্য হইল, জান্নাতীদের অধিকাংশই হইবে মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মত। ইহাতে রহিয়াছে রাসূলে কারীম (স) ও তাঁহার উম্মতের বিশেষ মর্যাদা। হাদীছেও এই বিষয়ে স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে।
ইবন মাসউদ (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) আমাদেরকে বলিলেন, তোমরা কি ইহাতে সন্তুষ্ট যে, তোমরা জান্নাতীদের এক-চতুর্থাংশ হইবে? (রাবী বলেন) এই কথা শুনিয়া আমরা খুশিতে 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি দিলাম। তিনি পুনরায় বলিলেন, তোমরা কি ইহাতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমরাই জান্নাতবাসীদের এক-তৃতীয়াংশ হইবে? সাহাবী বলেন; আমরা আবারও 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি দিলাম। তিনি আবার বলিলেন, তবে আমি আশাবাদী যে, তোমরাই জান্নাতবাসীদের অর্ধেক হইবে। ই সম্পর্কে আমি তোমাদেরকে আরও বলিতেছি 'যে; কাফিরদের তুলনায় তোমাদের অবস্থা (জাহান্নামে) এমন হইবে, যেমন কালো ষাঁড়ের গায়ে একটি সাদা পশম অথবা সাদা ষাঁড়ের গায়ে একটি কালো পশম (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১খ., হাদীছ নং ৬৫২৮, পৃ. ২২১)।
হযরত বুরায়দা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: জান্নাতীবাসীদের এক শত বিশটি কাতার হইবে। তন্মধ্যে আশিটি হইবে এই উম্মতের এবং বাকী চল্লিশটি হইবে অন্যান্য উম্মতের কাতায়। তিরমিযী, হাদীছ নং ২৫৪৬; ইমাম তিরমিযীর মতে হাদীছটি হাসান। হাফিয ইব্ন হাজার (র)-ও তাহার সূত্রে ফাতহুল বারীতে ইহা বর্ণনা করিয়াছেন, ১১খ., পৃ. ৩৯৫; মুসনাদে