📄 (সাত) এই উম্মত সমূলে ধ্বংস হওয়া হইতে নিরাপদ
উম্মতে মুহাম্মাদী আল্লাহর হেফাজতাধীন ও অনুগ্রহপ্রাপ্ত উম্মত। এই উম্মতকে আল্লাহ্ তা'আলা সমস্ত অকল্যাণ হইতে হিফাযত করিয়া নিজ রহমতের মধ্যে আশ্রয় দিয়াছেন। সুতরাং তাহারা অনাহারে, দুর্ভিক্ষে এবং পানিতে ডুবিয়া সমূলে মারা যাইবে না। আর এমন শত্রুকেও তাহাদের উপর চাপাইয়া দেওয়া হইবে না যাহারা তাহাদেরকে সমূলে ধ্বংস করিয়া দিবে। সমস্ত পৃথিবীর মানুষ একত্র হইলেও তাহা সম্ভব হইবে না। ইহা এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য। অন্য কোন উম্মতের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য ছিল না। এই সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ্ (স) হইতে স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে। ছাওবান (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: আল্লাহ্ তা'আলা আমার জন্য পৃথিবীকে সংকুচিত করিয়া দিয়াছেন। ফলে আমি ইহার পূর্ব দিগন্ত হইতে পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত দেখিতে পাইয়াছি। আমার উম্মতের রাজত্ব এই পূর্ণ এলাকাব্যাপী বিস্তৃত হইবে। আমাকে লাল ও সাদা [লাল বলিয়া সোনা ও সাদা বলিয়া রূপার ভাণ্ডারকে বুঝানো হইয়াছে, আর এই দুই ভাণ্ডার হইল রোম ও পারস্যের ধনভাণ্ডার, ভিন্নমতে ইরাক ও সিরিয়ার ধনভাণ্ডার] দুইটি ধনভাণ্ডার প্রদান করা হইয়াছে।
আমি আমার রবের নিকট আমার উম্মতের ব্যাপারে প্রার্থনা করিয়াছিলাম যেন তাহাদেরকে ব্যাপক দুর্ভিক্ষের দ্বারা ধ্বংস না করা হয় এবং যেন তাহাদের উপর বহিরাগত এমন কোন শত্রুকে চাপাইয়া দেওয়া না হয় যাহারা তাহাদেরকে সমূলে ধ্বংস করিয়া দিবে। তখন আমার রব বলেন, হে মুহাম্মাদ! কোন বিষয়ে আমি সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর তাহা আর রদ হয় না। আমি আপনার উম্মতের ব্যাপারে আপনাকে এই প্রতিশ্রুতি দিতেছি যে, তাহাদেরকে আমি ব্যাপক দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে ধ্বংস করিব না এবং তাহাদের দুনিয়া হইতে খতম করিয়া দিবে এমন কোন বহিরাগত শত্রুকেও আমি তাহাদের উপর চাপাইয়া দিব না। তাহারা দুনিয়ার সমস্ত প্রান্ত হইতে একত্র হইয়াও মুসলমানদেরকে খতম করিতে পারিবে না। অবশ্য আপনার উদ্ধৃত পরস্পর পরস্পরকে হত্যা করিবে অথবা বন্দী করিবে (মুসলিম, হাদীছ নং ২৮৮৯)।
সা'দ (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ (স) আলিয়া (উচ্চভূমি) অঞ্চল হইতে আসিতেছিলেন। এই সময় তিনি বনূ মুআবিয়ার মসজিদের নিকট দিয়া অতিক্রমকালে তথায় প্রবেশ করিয়া দুই রাক'আত নামায আদায় করেন এবং আমরাও তাঁহার সাথে নামায আদায় করি। নামাযান্তে তিনি দীর্ঘক্ষণ দু'আ করেন। তাহার পর তিনি আমাদের দিকে ফিরিয়া বলেন আমি আমার রবের নিকট তিনটি বিষয়ে দু'আ করিয়াছিলাম। তিনি দুইটি কবুল করিয়াছেন, আর একটি প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। আমি আমার রবের নিকট দু'আ করিয়াছিলাম যেন তিনি আমার উম্মতকে দুর্ভিক্ষের দ্বারা ধ্বংস না করেন। ইহা তিনি মঞ্জুর করিয়াছেন। আমি দু'আ করিয়াছিলাম যেন আমার উম্মতকে পানিতে ডুবাইয়া না মারা হয়। ইহাও তিনি মঞ্জুর করিয়াছেন। আমি দু'আ করিয়াছিলাম যেন তাহারা পরস্পর সংর্ঘষে লিপ্ত না হয়। ইহা তিনি প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন (মুসলিম, ফিতান, বাব ৫, হাদীছ নং ২৮৯০)।
আবদুল্লাহ্ ইব্ন জাবির ইব্ন আতীক (রা) বলেন, একদা আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বনী মুআবিয়া এলাকায় আমাদের নিকট আসেন। ইহা আনসার সাহাবীদের একটি গ্রাম। তখন তিনি বলেন, তোমাদের এই মসজিদে রাসূলুল্লাহ্ (স) কোথায় নামায পড়িয়াছেন তাহা কি তোমরা জান? আমি বলিলাম, জানি। এই কথা বলিয়াই আমি কোণের দিকে তাঁহাকে ইশারা করিয়া দেখাইলাম। তিনি বলিলেন, এই মসজিদে রাসূলুল্লাহ (স) যে তিনটি দু'আ করিয়াছিলেন তাহা তোমরা জান কি? আমি বলিলাম, হাঁ, জানি। তিনি বলিলেন, তাহা আমাকে বলিয়া দাও। আমি বলিলাম, রাসূলুল্লাহ (স) দু'আ করেন যেন বহিরাগত কোন শত্রুকে মুসলমানদের উপর জয়ী না করা হয় এবং যেন তাহাদেরকে দুর্ভিক্ষের দ্বারা ধ্বংস না করা হয়। এ দুইটি দু'আ কবুল হইয়াছে। তিনি এই দু'আও করিয়াছিলেন যেন তাঁহার উম্মতেরা পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত না হয়, ইহা প্রত্যাখ্যাত হইয়াছে। ইবন উমার (রা) বলেন, হাঁ, তুমি সত্য বলিয়াছ। তিনি বলিলেন, এই কারণেই এই উম্মতের মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত সংর্ঘষ (বিবাদ ও অনৈক্য) চলিতে থাকিবে (মুওয়াত্তা লিল-মালিক, ১খ., পৃ. ২১৬; আবদুল কাদির আরনাউত বলেন, হাদীছের সনদ সহীহ, তা'লীক আলা জামিয়িল উসূল, ৯খ., পৃ. ১৯৯)।
আওফ ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতের উপর দুই তরবারিকে কখনও একত্র করিবেন না। একটি তাহাদের নিজেদের তরবারি। অপরটি শত্রুদের তরবারি (আবূ দাউদ, হাদীছ নং ৪৩০১; মুসনাদে আহমাদ, ৬খ., পৃ. ২৬; আলবানীর মতে হাদীছটি সহীহ, সহীহ আল-জামিউস সাগীর, হাদীছ ৫০৯৭)।
📄 (আট) এই উম্মত পথভ্রষ্টতার উপর একমত হইবে না এবং তাহাদের
আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতকে দুনিয়াতে বহু মর্যাদা দান করিয়াছেন। তন্মধ্যে একটি হইল, এই উম্মতের সকলকে একত্রে তিনি ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হওয়া হইতে হিফাযত করিবেন। ইহা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর খাতিরেই করা হইবে। আর এই উম্মতের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হইল, তাহাদের একটি দল সর্বদা, সর্বকালে ও সর্বযুগে সত্য ও হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকিবে এবং তাহারা বিজয়ী হিসাবে থাকিবে। যাহারা তাহাদের বিরোধিতা করিবে বা তাহাদেরকে অপদস্ত করার চেষ্টা করিবে, তাহারা তাহাদের কোন প্রকার ক্ষতি করিতে পারিবে না। কিয়ামত পর্যন্ত তাহারা তাহাদের অবস্থার উপর অটল থাকিবে।
শায়খ ইয্যুদ্দীন ইব্ন আবদুস সালাম বলেন, এই জাতীয় হাদীছ দ্বারা নবী কারীম (স)-এর বৈশিষ্ট্য বা তাঁহার উম্মতের পবিত্রতা প্রতীয়মান হয়। অর্থাৎ দীনের মৌলিক ও আনুষঙ্গিক কোন বিষয়েই এই উম্মত পথভ্রষ্টতায় একমত হইবে না।
কা'ব ইব্ন আলিম আশ'আরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: পথভ্রষ্টতার উপর একমত হওয়া হইতে আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতকে রক্ষা করিয়াছেন (কিতাবুস সুন্নাহ ইব্ন আবূ আসিম, পৃ. ৭৯)। আনাস (রা) হইতেও অনুরূপ বর্ণিত হইয়াছে। আলবানী হাদীছের দুইটি সূত্র উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছটি সামগ্রিকভাবে হাসান (সিলসিলাতুল আহাদীছ আস-সাহীহা, নং ১৩১১; সহীহ আল-জামিউস সাগীর, হাদীছ নং ১৭৮২)।
ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মত অথবা তিনি বলিয়াছেন, উম্মতে মুহাম্মাদীকে গোমরাহীর উপর একত্র করিবেন না। আল্লাহর সাহায্য জামাআতের সাথে। কেহ যদি মুসলিম জামাআত হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়, তবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায়ই সে জাহান্নামে প্রবেশ করিবে [তিরমিযী, হাদীছ নং ২১৬৭। ইমাম তিরমিযীর মতে হাদীছটি গরীব। আল-মাকাসিদুল হাসানা, আল্লামা সাখাবী, হাদীছটি সামগ্রিকভাবে মশহুর। ইহার বহু সনদ ও সমর্থন রহিয়াছে। ইহার কোন কোন সূত্র মারফু, পৃ. ৪৬০। সহীহ আল-জামিউস সাগীর গ্রন্থে আলবানী ইহাকে সহীহ বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন, নং ১৮৪৪। ইমাম তাবারীও হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। তাহার বর্ণিত হাদীছটি নিম্নরূপ:
عن ابن عمر لن تجتمع امتى على ضلالة فعليكم بالجماعة فان يد الله على الجماعة.
"ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেন, আমার উম্মত কখনও ভ্রষ্টতার উপর ঐক্যবদ্ধ হইবে না। অতএব তোমরা দলবদ্ধ থাকিবে। কেননা দলের উপরই রহিয়াছে আল্লাহর হাত"।
হাফিয হায়ছামী (র) তাবারানী হইতে হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। তবে তাবারানীর সূত্র দুইটি। ইহার একটির সমস্ত রাবীই নির্ভরযোগ্য এবং সকলেই সহীহ-এর শর্তে উত্তীর্ণ। অবশ্য মারযুক-এর বিষয়টি ইহার ব্যতিক্রম। তিনিও নির্ভরযোগ্য, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৫খ., পৃ. ২১৮]।
ছাওবান (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: আমার উম্মতের একদল লোক সব সময় হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকিবে। যাহারা তাহাদেরকে অপদস্ত করার চেষ্টা করিবে তাহারা তাহাদের কোন ক্ষতি করিতে পারিবে না। এইভাবে কিয়ামত আসিয়া যাইবে। কিন্তু তাহারা তাহাদের অবস্থার উপর সুদৃঢ় থাকিবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৬খ., নং ৩৬৪১; মুসলিম, হাদীছ নং ১৯২০)।
[ইমাম নববী বলেন, ইমাম বুখারীর মতে "আমার উম্মতের একদল লোক” বলিয়া উলামায়ে কিরামকে বুঝানো হইয়াছে। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, তাহারা যদি মুহাদ্দিছ না হন, তবে তাহারা কাহারা আমি জানি না। কাযী ইয়ায বলেন, ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল-এর মতে তাহারা হইলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-জামাআত এবং যাহারা তাহাদের আকীদা ও ফিক্সের অনুসারী। ইমাম নববী বলেন, তাহারা হইলেন মু'মিনদের বিভিন্ন জামাআত। তাহাদের মধ্যে রহিয়াছেন মুজাহিদ, ফকীহ, মুহাদ্দিছ, সূফী, মুবাল্লিগ ও দীনের অন্যান্য জামাআত। তাহাদের সকলের একই দলভুক্ত থাকা আবশ্যক নয়, বরং তাহারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন লোকও হইতে পারেন। শারহুন নাবাবী আলা সাহীহ মুসলিম, ১৩খ., পৃ. ৬৬-৬৭)।
আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাদের হৃদয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করার পর মুহাম্মাদ (স)-এর হৃদয়কে অন্যান্যদের তুলনায় সর্বোত্তম পাইলেন এবং তিনি তাঁহাকে নিজের জন্য নির্বাচিত করেন এবং তাঁহাকে রিসালাতের দায়িত্ব দিয়া রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেন। তিনি পুনরায় বান্দাদের হৃদয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া সাহাবায়ে কিরামের হৃদয়কে অন্যান্যদের তুলনায় সর্বোত্তম পাইলেন। তাই তিনি তাহাদেরকে নবী কারীম (স)-এর উযীর নির্বাচন করেন, যাহারা দীনের হেফাজতের জন্য লড়াই করেন। মুসলমানরা যে কাজকে উত্তম মনে কর তাহা আল্লাহ্ তা'আলার নিকটও উত্তম এবং যে কাজকে খারাপ মনে কর, তাহা আল্লাহ্ তা'আলার নিকটও খারাপ (মুসনাদে আহমদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৭৯)। হাফিয হায়ছামী বলেন, হাদীছটি ইমাম আহমাদ ও বাযযার বর্ণনা করিয়াছেন এবং ইমাম তাবারানীও তৎপ্রণীত কাবীর গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছের সূত্রে বর্ণিত সমস্ত রাবীই নির্ভরযোগ্য (মাজমাউয যাওয়াইদ, ১খ., পৃ. ১৭৮)।
📄 একটি দল সর্বদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকিবে
আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতকে দুনিয়াতে বহু মর্যাদা দান করিয়াছেন। তন্মধ্যে একটি হইল, এই উম্মতের সকলকে একত্রে তিনি ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হওয়া হইতে হিফাযত করিবেন। ইহা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর খাতিরেই করা হইবে। আর এই উম্মতের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হইল, তাহাদের একটি দল সর্বদা, সর্বকালে ও সর্বযুগে সত্য ও হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকিবে এবং তাহারা বিজয়ী হিসাবে থাকিবে। যাহারা তাহাদের বিরোধিতা করিবে বা তাহাদেরকে অপদস্ত করার চেষ্টা করিবে, তাহারা তাহাদের কোন প্রকার ক্ষতি করিতে পারিবে না। কিয়ামত পর্যন্ত তাহারা তাহাদের অবস্থার উপর অটল থাকিবে।
শায়খ ইয্যুদ্দীন ইব্ন আবদুস সালাম বলেন, এই জাতীয় হাদীছ দ্বারা নবী কারীম (স)-এর বৈশিষ্ট্য বা তাঁহার উম্মতের পবিত্রতা প্রতীয়মান হয়। অর্থাৎ দীনের মৌলিক ও আনুষঙ্গিক কোন বিষয়েই এই উম্মত পথভ্রষ্টতায় একমত হইবে না।
কা'ব ইব্ন আলিম আশ'আরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: পথভ্রষ্টতার উপর একমত হওয়া হইতে আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতকে রক্ষা করিয়াছেন (কিতাবুস সুন্নাহ ইব্ন আবূ আসিম, পৃ. ৭৯)। আনাস (রা) হইতেও অনুরূপ বর্ণিত হইয়াছে। আলবানী হাদীছের দুইটি সূত্র উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছটি সামগ্রিকভাবে হাসান (সিলসিলাতুল আহাদীছ আস-সাহীহা, নং ১৩১১; সহীহ আল-জামিউস সাগীর, হাদীছ নং ১৭৮২)।
ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মত অথবা তিনি বলিয়াছেন, উম্মতে মুহাম্মাদীকে গোমরাহীর উপর একত্র করিবেন না। আল্লাহর সাহায্য জামাআতের সাথে। কেহ যদি মুসলিম জামাআত হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়, তবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায়ই সে জাহান্নামে প্রবেশ করিবে [তিরমিযী, হাদীছ নং ২১৬৭। ইমাম তিরমিযীর মতে হাদীছটি গরীব। আল-মাকাসিদুল হাসানা, আল্লামা সাখাবী, হাদীছটি সামগ্রিকভাবে মশহুর। ইহার বহু সনদ ও সমর্থন রহিয়াছে। ইহার কোন কোন সূত্র মারফু, পৃ. ৪৬০। সহীহ আল-জামিউস সাগীর গ্রন্থে আলবানী ইহাকে সহীহ বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন, নং ১৮৪৪। ইমাম তাবারীও হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। তাহার বর্ণিত হাদীছটি নিম্নরূপ:
عن ابن عمر لن تجتمع امتى على ضلالة فعليكم بالجماعة فان يد الله على الجماعة.
"ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেন, আমার উম্মত কখনও ভ্রষ্টতার উপর ঐক্যবদ্ধ হইবে না। অতএব তোমরা দলবদ্ধ থাকিবে। কেননা দলের উপরই রহিয়াছে আল্লাহর হাত"।
হাফিয হায়ছামী (র) তাবারানী হইতে হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। তবে তাবারানীর সূত্র দুইটি। ইহার একটির সমস্ত রাবীই নির্ভরযোগ্য এবং সকলেই সহীহ-এর শর্তে উত্তীর্ণ। অবশ্য মারযুক-এর বিষয়টি ইহার ব্যতিক্রম। তিনিও নির্ভরযোগ্য, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৫খ., পৃ. ২১৮]।
ছাওবান (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: আমার উম্মতের একদল লোক সব সময় হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকিবে। যাহারা তাহাদেরকে অপদস্ত করার চেষ্টা করিবে তাহারা তাহাদের কোন ক্ষতি করিতে পারিবে না। এইভাবে কিয়ামত আসিয়া যাইবে। কিন্তু তাহারা তাহাদের অবস্থার উপর সুদৃঢ় থাকিবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৬খ., নং ৩৬৪১; মুসলিম, হাদীছ নং ১৯২০)।
[ইমাম নববী বলেন, ইমাম বুখারীর মতে "আমার উম্মতের একদল লোক” বলিয়া উলামায়ে কিরামকে বুঝানো হইয়াছে। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, তাহারা যদি মুহাদ্দিছ না হন, তবে তাহারা কাহারা আমি জানি না। কাযী ইয়ায বলেন, ইমাম আহমাদ ইব্ন হাম্বল-এর মতে তাহারা হইলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-জামাআত এবং যাহারা তাহাদের আকীদা ও ফিক্সের অনুসারী। ইমাম নববী বলেন, তাহারা হইলেন মু'মিনদের বিভিন্ন জামাআত। তাহাদের মধ্যে রহিয়াছেন মুজাহিদ, ফকীহ, মুহাদ্দিছ, সূফী, মুবাল্লিগ ও দীনের অন্যান্য জামাআত। তাহাদের সকলের একই দলভুক্ত থাকা আবশ্যক নয়, বরং তাহারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন লোকও হইতে পারেন। শারহুন নাবাবী আলা সাহীহ মুসলিম, ১৩খ., পৃ. ৬৬-৬৭)।
আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাদের হৃদয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করার পর মুহাম্মাদ (স)-এর হৃদয়কে অন্যান্যদের তুলনায় সর্বোত্তম পাইলেন এবং তিনি তাঁহাকে নিজের জন্য নির্বাচিত করেন এবং তাঁহাকে রিসালাতের দায়িত্ব দিয়া রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেন। তিনি পুনরায় বান্দাদের হৃদয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া সাহাবায়ে কিরামের হৃদয়কে অন্যান্যদের তুলনায় সর্বোত্তম পাইলেন। তাই তিনি তাহাদেরকে নবী কারীম (স)-এর উযীর নির্বাচন করেন, যাহারা দীনের হেফাজতের জন্য লড়াই করেন। মুসলমানরা যে কাজকে
📄 (নয়) এই উম্মত পৃথিবীতে আল্লাহ্র সাক্ষীস্বরূপ
উত্তম মনে কর তাহা আল্লাহ্ তা'আলার নিকটও উত্তম এবং যে কাজকে খারাপ মনে কর, তাহা আল্লাহ্ তা'আলার নিকটও খারাপ (মুসনাদে আহমদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৭৯)। হাফিয হায়ছামী বলেন, হাদীছটি ইমাম আহমাদ ও বাযযার বর্ণনা করিয়াছেন এবং ইমাম তাবারানীও তৎপ্রণীত কাবীর গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছের সূত্রে বর্ণিত সমস্ত রাবীই নির্ভরযোগ্য (মাজমাউয যাওয়াইদ, ১খ., পৃ. ১৭৮)।
এই উম্মতকে আল্লাহ্ তা'আলা বহু শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন এবং তাহাদের মর্যাদাকে সমুন্নত করিয়াছেন। তাহাদের কথা ও সাক্ষ্যকে গ্রহণ করিয়াছেন যাহার ঘোষণা কুরআন ও হাদীছে স্পষ্টভাবে বর্ণিত রহিয়াছে। ইহাতে তাহাদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় (বিদায়াতুস সুউল, পৃ. ৬৯)।
আনাস (রা) বলেন, একদা একটি লাশ বহন করিয়া লইয়া যাওয়ার সময় তাহার প্রশংসা করা হইলে নবী কারীম (স) বলিলেন, তাহার জন্য ওয়াজিব হইয়াছে, ওয়াজিব হইয়াছে, তিনবার। পরে আর একটি লাশ বহন করিয়া লইয়া যাওয়ার সময় তাহার দুর্নাম করা হইলে নবী কারীম (স) "তাহার জন্য ওয়াজিব হইয়াছে" কথাটি তিনবার বলিলেন। উমার (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আপনার জন্য আমার মাতা-পিতা উৎসর্গীত হউক, একটি জানাযা যাওয়ার সময় তাহার প্রশংসা করা হইলে আপনি "তাহার জন্য ওয়াজিব হইয়াছে" কথাটি তিনবার বলিলেন। কিছুক্ষণ পর অপর একটি জানাযা যাওয়ার সময় তাহার দুর্নাম করা হইলে আপনি পুনরায় "তাহার জন্য, ওয়াজিব হইয়াছে" কথাটি তিনবার বলিলেন, ইহার কারণ কি? জবাবে তিনি বলিলেন, যে লোকটির তোমরা প্রশংসা করিয়াছ, তাহার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হইয়াছে। আর যাহার তোমরা দুর্নাম করিয়াছ, তাহার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব হইয়াছে। তোমরা পৃথিবীতে আল্লাহ্ সাক্ষী (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৩খ., নং ১৩৬৭; মুসলিম, নং ৯৪৯)।
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, একদা সাহাবায়ে কিরাম একটি লাশ নিয়া নবী কারীম (স)-এর সামনে দিয়া গেলেন এবং তাহারা তাহার প্রশংসা করিলেন। নবী কারীম (স) বলিলেন, তাহার জন্য ওয়াজিব হইয়াছে। ইহার পর আরেকটি লাশ নিয়া যাওয়ার সময় তাহারা তাহার দুর্নাম করিলেন। তখনও নবী কারীম (স) বলিলেন, ওয়াজিব হইয়াছে। সাহাবীগণ জিজ্ঞসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! উপরিউক্ত জানাযা দুইটির ব্যাপারে "ওয়াজিব হইয়াছে" কথাটি আপনি বলিলেন, ইহার মর্ম কী? তিনি বলিলেন, ফেরেস্তাগণ আসমানে আল্লাহ্র সাক্ষী। আর তোমরা পৃথিবীতে আল্লাহ্ সাক্ষী (নাসাঈ, ৪খ., পৃ. ৫০)। মূল হাদীছটি বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হইয়াছে। আলবানী হাদীছটি সহীহ বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন (সহীহ আল-জামে, নং ৬৬০৪)।
কা'ব (রা) বলেন, এই উম্মতকে এমন তিনটি জিনিস প্রদান করা হইয়াছে, যাহা নবী-রাসূলগণ ব্যতীত অন্য কাহাকেও দেওয়া হয় নাই। যেমন পূর্ববর্তী নবীকে বলা হইয়াছে,