📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (ছয়) এই উম্মতের ভুল-ত্রুটি এবং পাপপ্রসূত কল্পনা ক্ষমাযোগ্য

📄 (ছয়) এই উম্মতের ভুল-ত্রুটি এবং পাপপ্রসূত কল্পনা ক্ষমাযোগ্য


আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতকে অসংখ্য ও অগণিত নি'য়ামত দান করিয়াছেন। ইহাতে রহিয়াছে আখিরী নবী মুহাম্মাদ (স)-এর প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শন। আল্লাহ্ প্রদত্ত নি'য়ামতসমূহের অন্যতম হইল, তিনি এই উম্মতের ভুল-ত্রুটি এবং মনের অবাস্তব জল্পনা-কল্পনা ইত্যাদি সব কিছু ক্ষমা করিবেন। মনের জল্পনা-কল্পনা যদি উচ্চারণ না করা হয় কিংবা তাহা বাস্তবে রূপায়িত না করা হয় তাহা হইলে এসব ক্ষমাযোগ্য। ইহা এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য। হাদীছে এই সম্বন্ধে স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মতের অহেতুক কল্পনা মাফ করিয়া দিয়াছেন যতক্ষণ না তাহারা তাহা উচ্চারণ করে কিংবা বাস্তবে রূপায়িত করে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৫৬০; মুসলিম নং ১২৭)।
للهِ مَا فِي السَّمواتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَإِنْ تُبْدُوا مَا فِي أَنْفُسِكُمْ أَوْ تُخْفُوهُ يُحَاسِبْكُمْ بِهِ اللَّهُ فَيَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَنْ يُشَاءُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.
"আসমান ও যমীনে যাহা কিছু আছে সমস্ত আল্লাহ্রই। তোমাদের মনে যাহা আছে তাহা প্রকাশ কর অথবা গোপন রাখ, আল্লাহ্ উহার হিসাব তোমাদের নিকট হইতে গ্রহণ করিবেন। অতঃপর যাহাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করিবেন এবং যাহাকে খুশী শাস্তি দিবেন। আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান” (২: ২৮৪)।
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উপর উপরিউক্ত আয়াত নাযিল হইলে বিষয়টি সাহাবীগণের খুবই কঠোর মনে হয়। তাই সবাই রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সালাত, সিয়াম, জিহাদ, সাদাকা প্রভৃতি যে সমস্ত আমল আমাদের সামর্থ্যানুযায়ী ছিল, এই যাবত আমাদেরকে সেগুলি করার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। বর্তমানে আপনার উপর এই আয়াত নাযিল হইয়াছে। বিষয়টি তো আমাদের সমর্থ্যের বাহিরে। একথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, কিতাবী তথা ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের ন্যায় তোমরাও কি এমন কথা বলিবে, "শুনিলাম, কিন্তু মানিলাম না"? বরং তোমরা বল, শুনিলাম ও মানিলাম। হে আমাদের রব! আমরা তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি, আর তুমিই আমাদের শেষ প্রত্যাবর্তনস্থল। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর এই নির্দেশ শুনিয়া সাহাবায়ে কিরাম বলেন, আমরা শুনিয়াছি ও মানিয়াছি, হে আমাদের রব! আমরা তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি; তুমিই আমাদের শেষ প্রত্যাবর্তনস্থল। রাবী বলেন, সাহাবীদের সকলেই এই আয়াত পাঠ করেন এবং বিনয়াপ্লুত হইয়া মনে-প্রাণে তাহা গ্রহণ করেন। ইহার পর আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন:
اَمَنَ الرَّسُولُ بِمَا اُنْزِلَ اِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلُّ اَمَنَ بِاللَّهِ وَمَلْئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ اَحَدٍ مِّنْ رُّسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَاَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَاِلَيْكَ الْمَصِبْرُ.
"রাসূল, তাহার প্রতি তাহার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে যাহা নাযিল হইয়াছে তাহাতে ঈমান আনিয়াছে এবং মু'মিনগণও। তাহাদের সকলে আল্লাহ, তাঁহার ফেরেশতাগণে, তাঁহার কিতাবসমূহে এবং তাঁহার রাসূলগণে ঈমান আনয়ন করিয়াছে। তাহারা বলে, আমরা তাঁহার রাসূলগণের মধ্যে কোন তারতম্য করি না। তাহারা আরও বলে, আমরা শুনিয়াছি এবং পালন করিয়াছি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তোমার ক্ষমা চাই এবং প্রত্যাবর্তন তোমারই নিকট” (২: ২৮৫)।
যখন তাহারা সর্বোতভাবে আনুগত্য জ্ঞাপন করিলেন, তখন আল্লাহ্ তা'আলা উক্ত আয়াতের হুকুম রহিত করিয়া নাযিল করিলেন:
لا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَّسِينَا أَوْ أَخْطَانًا
"আল্লাহ্ কাহারও উপর এমন কোন কষ্টদায়ক দায়-দায়িত্ব অর্পণ করেন না যাহা তাঁহার সাধ্যাতীত। সে ভাল যাহা উপার্জন করিয়াছে তাহা তাহারই জন্য এবং মন্দ যাহা উপার্জন করিয়াছে তাহাও তাহারই। হে আমাদেব রব! যদি আমরা বিস্মৃত হই কিংবা ভুল করিয়া ফেলি, তবে তুমি আমাদেরকে পাকড়াও করিও না"। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, "হাঁ, মানিয়া নিলাম।" আরও নাযিল হয়:
رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا .
“হে আমাদের রব! আমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর যেমন গুরুদায়িত্ব অর্পণ করিয়াছিলেন, আমাদের উপর তেমন দায়িত্ব অর্পণ করিবেন না"। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, হাঁ, মানিয়া নিলাম। আরও নাযিল হয়:
রَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ.
"হে আমাদের রব! এমন ভার আমাদের উপর অর্পণ করিবেন না যাহা বহনের ক্ষমতা আমাদের নাই"। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, হাঁ, মানিলাম। আরও নাযিল হইয়াছে:
وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنْتَ مَوْلَانَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَفِرِينَ.
"আমাদের পাপ মোচন কর, আমাদেরকে ক্ষমা কর এবং আমাদের প্রতি রহম কর। তুমিই আমাদের অভিভাবক। সুতরাং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে জয়যুক্ত কর" (সূরা বাকারা, আয়াত নং ২৮৬)। এবারও রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, হাঁ, মানিয়া নিলাম (মুসলিম, হাদীছ নং ১১৫)।
আবূ যার গিফারী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মতের ভুল-ভ্রান্তি এবং জোরপূর্বক তাহাদের দ্বারা 'যাহা করানো হয়, এমন সব কাজ মাফ করিয়া দিয়াছেন। ইহাতে উম্মতে মুহাম্মাদীর মর্যাদা প্রতীয়মান হয় এবং ইহা এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য। এই উম্মতের কোন ব্যক্তি যদি ভুলে কোন অপরাধ করিয়া বসে তবে তাহা না করার মধ্যেই গণ্য থাকিবে। পূর্ববর্তী উম্মতের বিষয়টি ইহার ব্যতিক্রম ছিল (ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৫৬০; ইব্‌ন মাজা, হাদীছ নং ২০৫৩; মুসতাদরাক হাকেম, ২খ., পৃ. ১৯৮; তাঁহার মতে হাদীছটি বুখারী-মুসলিমের শর্তে উত্তীর্ণ। তবে তাঁহারা ইহা বর্ণনা করেন নাই। যাহাবীও অনুরূপ বলিয়াছেন; দারু কুতনী, পৃ. ৭৯৭; বায়হাকী, ৭খ., পৃ. ৩৫৬। আলবানীও হাদীছটিকে সহীহ বলিয়াছেন)।
ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) আল্লাহ্ তা'আলা হইতে এই কথা বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা সমুদয় সৎ ও অসৎ কর্মের হিসাব লিখেন। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) ইহাকে আরও বিস্তারিত করিয়া বলেন, যে ব্যক্তি নেক কাজের ইচ্ছা করিয়াছে অথচ তাহা সম্পাদন করে নাই, আল্লাহ্ তা'আলা ইহার বিনিময়ে তাহার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ছওয়াব লিখিয়া দেন। আর ইচ্ছার পর তাহা কাজে পরিণত করিলে আল্লাহ্ তা'আলা ইহার বিনিময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ছওয়াব লিখিয়া দেন। পক্ষান্তরে কেহ যদি কোন মন্দ কাজের ইচ্ছা করিয়া তাহা কাজে পরিণত না করে, তবে আল্লাহ্ তা'আলা ইহার বিনিময়ে তাহার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ছওয়াব লিখিয়া দেন। আর ইচ্ছার পর সম্পাদন করিলে তিনি একটি মাত্র গুনাহ লিখেন (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১খ., হাদীছ নং ৬৪৯১; মুসলিম, হাদীছ নং ১৩১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (সাত) এই উম্মত সমূলে ধ্বংস হওয়া হইতে নিরাপদ

📄 (সাত) এই উম্মত সমূলে ধ্বংস হওয়া হইতে নিরাপদ


উম্মতে মুহাম্মাদী আল্লাহর হেফাজতাধীন ও অনুগ্রহপ্রাপ্ত উম্মত। এই উম্মতকে আল্লাহ্ তা'আলা সমস্ত অকল্যাণ হইতে হিফাযত করিয়া নিজ রহমতের মধ্যে আশ্রয় দিয়াছেন। সুতরাং তাহারা অনাহারে, দুর্ভিক্ষে এবং পানিতে ডুবিয়া সমূলে মারা যাইবে না। আর এমন শত্রুকেও তাহাদের উপর চাপাইয়া দেওয়া হইবে না যাহারা তাহাদেরকে সমূলে ধ্বংস করিয়া দিবে। সমস্ত পৃথিবীর মানুষ একত্র হইলেও তাহা সম্ভব হইবে না। ইহা এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য। অন্য কোন উম্মতের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য ছিল না। এই সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ্ (স) হইতে স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে। ছাওবান (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: আল্লাহ্ তা'আলা আমার জন্য পৃথিবীকে সংকুচিত করিয়া দিয়াছেন। ফলে আমি ইহার পূর্ব দিগন্ত হইতে পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত দেখিতে পাইয়াছি। আমার উম্মতের রাজত্ব এই পূর্ণ এলাকাব্যাপী বিস্তৃত হইবে। আমাকে লাল ও সাদা [লাল বলিয়া সোনা ও সাদা বলিয়া রূপার ভাণ্ডারকে বুঝানো হইয়াছে, আর এই দুই ভাণ্ডার হইল রোম ও পারস্যের ধনভাণ্ডার, ভিন্নমতে ইরাক ও সিরিয়ার ধনভাণ্ডার] দুইটি ধনভাণ্ডার প্রদান করা হইয়াছে।

আমি আমার রবের নিকট আমার উম্মতের ব্যাপারে প্রার্থনা করিয়াছিলাম যেন তাহাদেরকে ব্যাপক দুর্ভিক্ষের দ্বারা ধ্বংস না করা হয় এবং যেন তাহাদের উপর বহিরাগত এমন কোন শত্রুকে চাপাইয়া দেওয়া না হয় যাহারা তাহাদেরকে সমূলে ধ্বংস করিয়া দিবে। তখন আমার রব বলেন, হে মুহাম্মাদ! কোন বিষয়ে আমি সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর তাহা আর রদ হয় না। আমি আপনার উম্মতের ব্যাপারে আপনাকে এই প্রতিশ্রুতি দিতেছি যে, তাহাদেরকে আমি ব্যাপক দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে ধ্বংস করিব না এবং তাহাদের দুনিয়া হইতে খতম করিয়া দিবে এমন কোন বহিরাগত শত্রুকেও আমি তাহাদের উপর চাপাইয়া দিব না। তাহারা দুনিয়ার সমস্ত প্রান্ত হইতে একত্র হইয়াও মুসলমানদেরকে খতম করিতে পারিবে না। অবশ্য আপনার উদ্ধৃত পরস্পর পরস্পরকে হত্যা করিবে অথবা বন্দী করিবে (মুসলিম, হাদীছ নং ২৮৮৯)।

সা'দ (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ (স) আলিয়া (উচ্চভূমি) অঞ্চল হইতে আসিতেছিলেন। এই সময় তিনি বনূ মুআবিয়ার মসজিদের নিকট দিয়া অতিক্রমকালে তথায় প্রবেশ করিয়া দুই রাক'আত নামায আদায় করেন এবং আমরাও তাঁহার সাথে নামায আদায় করি। নামাযান্তে তিনি দীর্ঘক্ষণ দু'আ করেন। তাহার পর তিনি আমাদের দিকে ফিরিয়া বলেন আমি আমার রবের নিকট তিনটি বিষয়ে দু'আ করিয়াছিলাম। তিনি দুইটি কবুল করিয়াছেন, আর একটি প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। আমি আমার রবের নিকট দু'আ করিয়াছিলাম যেন তিনি আমার উম্মতকে দুর্ভিক্ষের দ্বারা ধ্বংস না করেন। ইহা তিনি মঞ্জুর করিয়াছেন। আমি দু'আ করিয়াছিলাম যেন আমার উম্মতকে পানিতে ডুবাইয়া না মারা হয়। ইহাও তিনি মঞ্জুর করিয়াছেন। আমি দু'আ করিয়াছিলাম যেন তাহারা পরস্পর সংর্ঘষে লিপ্ত না হয়। ইহা তিনি প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন (মুসলিম, ফিতান, বাব ৫, হাদীছ নং ২৮৯০)।

আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাবির ইব্‌ন আতীক (রা) বলেন, একদা আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বনী মুআবিয়া এলাকায় আমাদের নিকট আসেন। ইহা আনসার সাহাবীদের একটি গ্রাম। তখন তিনি বলেন, তোমাদের এই মসজিদে রাসূলুল্লাহ্ (স) কোথায় নামায পড়িয়াছেন তাহা কি তোমরা জান? আমি বলিলাম, জানি। এই কথা বলিয়াই আমি কোণের দিকে তাঁহাকে ইশারা করিয়া দেখাইলাম। তিনি বলিলেন, এই মসজিদে রাসূলুল্লাহ (স) যে তিনটি দু'আ করিয়াছিলেন তাহা তোমরা জান কি? আমি বলিলাম, হাঁ, জানি। তিনি বলিলেন, তাহা আমাকে বলিয়া দাও। আমি বলিলাম, রাসূলুল্লাহ (স) দু'আ করেন যেন বহিরাগত কোন শত্রুকে মুসলমানদের উপর জয়ী না করা হয় এবং যেন তাহাদেরকে দুর্ভিক্ষের দ্বারা ধ্বংস না করা হয়। এ দুইটি দু'আ কবুল হইয়াছে। তিনি এই দু'আও করিয়াছিলেন যেন তাঁহার উম্মতেরা পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত না হয়, ইহা প্রত্যাখ্যাত হইয়াছে। ইবন উমার (রা) বলেন, হাঁ, তুমি সত্য বলিয়াছ। তিনি বলিলেন, এই কারণেই এই উম্মতের মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত সংর্ঘষ (বিবাদ ও অনৈক্য) চলিতে থাকিবে (মুওয়াত্তা লিল-মালিক, ১খ., পৃ. ২১৬; আবদুল কাদির আরনাউত বলেন, হাদীছের সনদ সহীহ, তা'লীক আলা জামিয়িল উসূল, ৯খ., পৃ. ১৯৯)।

আওফ ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতের উপর দুই তরবারিকে কখনও একত্র করিবেন না। একটি তাহাদের নিজেদের তরবারি। অপরটি শত্রুদের তরবারি (আবূ দাউদ, হাদীছ নং ৪৩০১; মুসনাদে আহমাদ, ৬খ., পৃ. ২৬; আলবানীর মতে হাদীছটি সহীহ, সহীহ আল-জামিউস সাগীর, হাদীছ ৫০৯৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (আট) এই উম্মত পথভ্রষ্টতার উপর একমত হইবে না এবং তাহাদের

📄 (আট) এই উম্মত পথভ্রষ্টতার উপর একমত হইবে না এবং তাহাদের


আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতকে দুনিয়াতে বহু মর্যাদা দান করিয়াছেন। তন্মধ্যে একটি হইল, এই উম্মতের সকলকে একত্রে তিনি ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হওয়া হইতে হিফাযত করিবেন। ইহা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর খাতিরেই করা হইবে। আর এই উম্মতের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হইল, তাহাদের একটি দল সর্বদা, সর্বকালে ও সর্বযুগে সত্য ও হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকিবে এবং তাহারা বিজয়ী হিসাবে থাকিবে। যাহারা তাহাদের বিরোধিতা করিবে বা তাহাদেরকে অপদস্ত করার চেষ্টা করিবে, তাহারা তাহাদের কোন প্রকার ক্ষতি করিতে পারিবে না। কিয়ামত পর্যন্ত তাহারা তাহাদের অবস্থার উপর অটল থাকিবে।
শায়খ ইয্যুদ্দীন ইব্‌ন আবদুস সালাম বলেন, এই জাতীয় হাদীছ দ্বারা নবী কারীম (স)-এর বৈশিষ্ট্য বা তাঁহার উম্মতের পবিত্রতা প্রতীয়মান হয়। অর্থাৎ দীনের মৌলিক ও আনুষঙ্গিক কোন বিষয়েই এই উম্মত পথভ্রষ্টতায় একমত হইবে না।
কা'ব ইব্‌ন আলিম আশ'আরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: পথভ্রষ্টতার উপর একমত হওয়া হইতে আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতকে রক্ষা করিয়াছেন (কিতাবুস সুন্নাহ ইব্‌ন আবূ আসিম, পৃ. ৭৯)। আনাস (রা) হইতেও অনুরূপ বর্ণিত হইয়াছে। আলবানী হাদীছের দুইটি সূত্র উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছটি সামগ্রিকভাবে হাসান (সিলসিলাতুল আহাদীছ আস-সাহীহা, নং ১৩১১; সহীহ আল-জামিউস সাগীর, হাদীছ নং ১৭৮২)।
ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মত অথবা তিনি বলিয়াছেন, উম্মতে মুহাম্মাদীকে গোমরাহীর উপর একত্র করিবেন না। আল্লাহর সাহায্য জামাআতের সাথে। কেহ যদি মুসলিম জামাআত হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়, তবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায়ই সে জাহান্নামে প্রবেশ করিবে [তিরমিযী, হাদীছ নং ২১৬৭। ইমাম তিরমিযীর মতে হাদীছটি গরীব। আল-মাকাসিদুল হাসানা, আল্লামা সাখাবী, হাদীছটি সামগ্রিকভাবে মশহুর। ইহার বহু সনদ ও সমর্থন রহিয়াছে। ইহার কোন কোন সূত্র মারফু, পৃ. ৪৬০। সহীহ আল-জামিউস সাগীর গ্রন্থে আলবানী ইহাকে সহীহ বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন, নং ১৮৪৪। ইমাম তাবারীও হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। তাহার বর্ণিত হাদীছটি নিম্নরূপ:
عن ابن عمر لن تجتمع امتى على ضلالة فعليكم بالجماعة فان يد الله على الجماعة.
"ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেন, আমার উম্মত কখনও ভ্রষ্টতার উপর ঐক্যবদ্ধ হইবে না। অতএব তোমরা দলবদ্ধ থাকিবে। কেননা দলের উপরই রহিয়াছে আল্লাহর হাত"।
হাফিয হায়ছামী (র) তাবারানী হইতে হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। তবে তাবারানীর সূত্র দুইটি। ইহার একটির সমস্ত রাবীই নির্ভরযোগ্য এবং সকলেই সহীহ-এর শর্তে উত্তীর্ণ। অবশ্য মারযুক-এর বিষয়টি ইহার ব্যতিক্রম। তিনিও নির্ভরযোগ্য, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৫খ., পৃ. ২১৮]।
ছাওবান (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: আমার উম্মতের একদল লোক সব সময় হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকিবে। যাহারা তাহাদেরকে অপদস্ত করার চেষ্টা করিবে তাহারা তাহাদের কোন ক্ষতি করিতে পারিবে না। এইভাবে কিয়ামত আসিয়া যাইবে। কিন্তু তাহারা তাহাদের অবস্থার উপর সুদৃঢ় থাকিবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৬খ., নং ৩৬৪১; মুসলিম, হাদীছ নং ১৯২০)।
[ইমাম নববী বলেন, ইমাম বুখারীর মতে "আমার উম্মতের একদল লোক” বলিয়া উলামায়ে কিরামকে বুঝানো হইয়াছে। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, তাহারা যদি মুহাদ্দিছ না হন, তবে তাহারা কাহারা আমি জানি না। কাযী ইয়ায বলেন, ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল-এর মতে তাহারা হইলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-জামাআত এবং যাহারা তাহাদের আকীদা ও ফিক্সের অনুসারী। ইমাম নববী বলেন, তাহারা হইলেন মু'মিনদের বিভিন্ন জামাআত। তাহাদের মধ্যে রহিয়াছেন মুজাহিদ, ফকীহ, মুহাদ্দিছ, সূফী, মুবাল্লিগ ও দীনের অন্যান্য জামাআত। তাহাদের সকলের একই দলভুক্ত থাকা আবশ্যক নয়, বরং তাহারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন লোকও হইতে পারেন। শারহুন নাবাবী আলা সাহীহ মুসলিম, ১৩খ., পৃ. ৬৬-৬৭)।
আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাদের হৃদয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করার পর মুহাম্মাদ (স)-এর হৃদয়কে অন্যান্যদের তুলনায় সর্বোত্তম পাইলেন এবং তিনি তাঁহাকে নিজের জন্য নির্বাচিত করেন এবং তাঁহাকে রিসালাতের দায়িত্ব দিয়া রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেন। তিনি পুনরায় বান্দাদের হৃদয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া সাহাবায়ে কিরামের হৃদয়কে অন্যান্যদের তুলনায় সর্বোত্তম পাইলেন। তাই তিনি তাহাদেরকে নবী কারীম (স)-এর উযীর নির্বাচন করেন, যাহারা দীনের হেফাজতের জন্য লড়াই করেন। মুসলমানরা যে কাজকে উত্তম মনে কর তাহা আল্লাহ্ তা'আলার নিকটও উত্তম এবং যে কাজকে খারাপ মনে কর, তাহা আল্লাহ্ তা'আলার নিকটও খারাপ (মুসনাদে আহমদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৭৯)। হাফিয হায়ছামী বলেন, হাদীছটি ইমাম আহমাদ ও বাযযার বর্ণনা করিয়াছেন এবং ইমাম তাবারানীও তৎপ্রণীত কাবীর গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছের সূত্রে বর্ণিত সমস্ত রাবীই নির্ভরযোগ্য (মাজমাউয যাওয়াইদ, ১খ., পৃ. ১৭৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 একটি দল সর্বদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকিবে

📄 একটি দল সর্বদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকিবে


আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতকে দুনিয়াতে বহু মর্যাদা দান করিয়াছেন। তন্মধ্যে একটি হইল, এই উম্মতের সকলকে একত্রে তিনি ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হওয়া হইতে হিফাযত করিবেন। ইহা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর খাতিরেই করা হইবে। আর এই উম্মতের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হইল, তাহাদের একটি দল সর্বদা, সর্বকালে ও সর্বযুগে সত্য ও হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকিবে এবং তাহারা বিজয়ী হিসাবে থাকিবে। যাহারা তাহাদের বিরোধিতা করিবে বা তাহাদেরকে অপদস্ত করার চেষ্টা করিবে, তাহারা তাহাদের কোন প্রকার ক্ষতি করিতে পারিবে না। কিয়ামত পর্যন্ত তাহারা তাহাদের অবস্থার উপর অটল থাকিবে।

শায়খ ইয্যুদ্দীন ইব্‌ন আবদুস সালাম বলেন, এই জাতীয় হাদীছ দ্বারা নবী কারীম (স)-এর বৈশিষ্ট্য বা তাঁহার উম্মতের পবিত্রতা প্রতীয়মান হয়। অর্থাৎ দীনের মৌলিক ও আনুষঙ্গিক কোন বিষয়েই এই উম্মত পথভ্রষ্টতায় একমত হইবে না।

কা'ব ইব্‌ন আলিম আশ'আরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: পথভ্রষ্টতার উপর একমত হওয়া হইতে আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতকে রক্ষা করিয়াছেন (কিতাবুস সুন্নাহ ইব্‌ন আবূ আসিম, পৃ. ৭৯)। আনাস (রা) হইতেও অনুরূপ বর্ণিত হইয়াছে। আলবানী হাদীছের দুইটি সূত্র উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছটি সামগ্রিকভাবে হাসান (সিলসিলাতুল আহাদীছ আস-সাহীহা, নং ১৩১১; সহীহ আল-জামিউস সাগীর, হাদীছ নং ১৭৮২)।

ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মত অথবা তিনি বলিয়াছেন, উম্মতে মুহাম্মাদীকে গোমরাহীর উপর একত্র করিবেন না। আল্লাহর সাহায্য জামাআতের সাথে। কেহ যদি মুসলিম জামাআত হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়, তবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায়ই সে জাহান্নামে প্রবেশ করিবে [তিরমিযী, হাদীছ নং ২১৬৭। ইমাম তিরমিযীর মতে হাদীছটি গরীব। আল-মাকাসিদুল হাসানা, আল্লামা সাখাবী, হাদীছটি সামগ্রিকভাবে মশহুর। ইহার বহু সনদ ও সমর্থন রহিয়াছে। ইহার কোন কোন সূত্র মারফু, পৃ. ৪৬০। সহীহ আল-জামিউস সাগীর গ্রন্থে আলবানী ইহাকে সহীহ বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন, নং ১৮৪৪। ইমাম তাবারীও হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। তাহার বর্ণিত হাদীছটি নিম্নরূপ:
عن ابن عمر لن تجتمع امتى على ضلالة فعليكم بالجماعة فان يد الله على الجماعة.

"ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেন, আমার উম্মত কখনও ভ্রষ্টতার উপর ঐক্যবদ্ধ হইবে না। অতএব তোমরা দলবদ্ধ থাকিবে। কেননা দলের উপরই রহিয়াছে আল্লাহর হাত"।

হাফিয হায়ছামী (র) তাবারানী হইতে হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। তবে তাবারানীর সূত্র দুইটি। ইহার একটির সমস্ত রাবীই নির্ভরযোগ্য এবং সকলেই সহীহ-এর শর্তে উত্তীর্ণ। অবশ্য মারযুক-এর বিষয়টি ইহার ব্যতিক্রম। তিনিও নির্ভরযোগ্য, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৫খ., পৃ. ২১৮]।

ছাওবান (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: আমার উম্মতের একদল লোক সব সময় হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকিবে। যাহারা তাহাদেরকে অপদস্ত করার চেষ্টা করিবে তাহারা তাহাদের কোন ক্ষতি করিতে পারিবে না। এইভাবে কিয়ামত আসিয়া যাইবে। কিন্তু তাহারা তাহাদের অবস্থার উপর সুদৃঢ় থাকিবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৬খ., নং ৩৬৪১; মুসলিম, হাদীছ নং ১৯২০)।

[ইমাম নববী বলেন, ইমাম বুখারীর মতে "আমার উম্মতের একদল লোক” বলিয়া উলামায়ে কিরামকে বুঝানো হইয়াছে। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, তাহারা যদি মুহাদ্দিছ না হন, তবে তাহারা কাহারা আমি জানি না। কাযী ইয়ায বলেন, ইমাম আহমাদ ইব্‌ন হাম্বল-এর মতে তাহারা হইলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-জামাআত এবং যাহারা তাহাদের আকীদা ও ফিক্সের অনুসারী। ইমাম নববী বলেন, তাহারা হইলেন মু'মিনদের বিভিন্ন জামাআত। তাহাদের মধ্যে রহিয়াছেন মুজাহিদ, ফকীহ, মুহাদ্দিছ, সূফী, মুবাল্লিগ ও দীনের অন্যান্য জামাআত। তাহাদের সকলের একই দলভুক্ত থাকা আবশ্যক নয়, বরং তাহারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন লোকও হইতে পারেন। শারহুন নাবাবী আলা সাহীহ মুসলিম, ১৩খ., পৃ. ৬৬-৬৭)।

আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাদের হৃদয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করার পর মুহাম্মাদ (স)-এর হৃদয়কে অন্যান্যদের তুলনায় সর্বোত্তম পাইলেন এবং তিনি তাঁহাকে নিজের জন্য নির্বাচিত করেন এবং তাঁহাকে রিসালাতের দায়িত্ব দিয়া রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেন। তিনি পুনরায় বান্দাদের হৃদয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া সাহাবায়ে কিরামের হৃদয়কে অন্যান্যদের তুলনায় সর্বোত্তম পাইলেন। তাই তিনি তাহাদেরকে নবী কারীম (স)-এর উযীর নির্বাচন করেন, যাহারা দীনের হেফাজতের জন্য লড়াই করেন। মুসলমানরা যে কাজকে

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00