📄 (পাঁচ) জুমু'আর দিন
আল্লাহ্ তা'আলা উম্মতে মুহাম্মাদীকে বহু বৈশিষ্ট্য দান করিয়াছেন যাহা অন্য কোন উম্মতকে দেন নাই। ইহার মধ্যে জুমু'আর দিনটি অন্যতম (খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩৫৩)। এই দিনটি দিনসমূহের সর্দার বা সায়্যিদুল আয়্যাম। সূর্য উদিত হয় এমন দিনসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম দিন হইল এই জুমু'আর দিন। এই দিনেই আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হয়। এই দিনেই তাঁহাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়। এই দিনেই তাঁহাকে জান্নাত হইতে বহিষ্কার করা হয়। আর এই জুমু'আর দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হইবে। এই দিনে এমন এক মুহূর্ত রহিয়াছে সেই মুহূর্তে দু'আ করিলে আল্লাহ্ তা'আলা তাহা কবুল করেন। এই দিনেই রহিয়াছে ঐ সালাতুল জুমু'আ যাহার জন্য দৌঁড়াইয়া যাওয়ার হুকুম করিয়াছেন আল্লাহ্ কুরআন মজীদে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলিয়াছেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَوةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا البَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ.
"হে মু'মিনগণ! জুমু'আর দিন যখন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয় তখন তোমরা আল্লাহ্র স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর; ইহাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি কর” (৬২ঃ ৯)।
এই মুবারক দিনটির ব্যাপারে পূর্ববর্তী উম্মতগণের মধ্যে মতভেদ ছিল। অবশেষে আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতকে এই দিনটির সন্ধান দেন এবং অন্যান্যদেরকে ইহা হইতে বেখবর রাখেন। এই দিনটি আমাদের জন্য সুনির্দিষ্ট। ইয়াহুদীদের জন্য শনিবার এবং খৃস্টানদের জন্য হইল রবিবার শ্রেষ্ঠ দিন। বহু হাদীছে এই সম্বন্ধে স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে। আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত: একদা তিনি রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে বলিতে শোনেন, আমরা (সৃষ্টির দিক হইতে) আখিরী উম্মত; তবে কিয়ামতের দিন (জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে) সকলের অগ্রগামী হইব। কেননা পূর্ববর্তী লোকদেরকে কিতাব দেওয়া হয় এবং এক মুবারক দিনে ইবাদত করা তাহাদের উপর ফরয করা হয়। কিন্তু তাহারা ইহাতে মতভেদ করে। অবশেষে আল্লাহ্ তা'আলা এই দিনটির ব্যাপারে আমাদেরকে সঠিক পথের সন্ধান দেন। এই ব্যাপারে সমস্ত উম্মত আমাদের অনুগামী। ইয়াহুদীরা পরের দিন তথা শনিবারকে এবং খৃস্টানরা ইহারও পরের দিন তথা রবিবারকে তা'যীমের দিন হিসাবে সাব্যস্ত করে (বুখাবী, ফাতহুল বারী, ২খ., পৃ. ৮৭৬; মুসলিম, নং ৮৫৫)।
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: সূর্য উদিত হয় এমন সব দিনের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম দিন হইল জুমুআর দিন। এই দিন আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হয়। এই দিনে তাঁহাকে জান্নাত হইতে বহিষ্কার করা হয়। এই দিনে তাঁহার তওবা কবুল করা হয়। এই দিনে তাঁহার ইনতিকাল হয়। আর এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হইবে। মানুষ এবং জিন ছাড়া সমস্ত জীব-জানোয়ারই এই জুমু'আর দিন ঊষালগ্ন হইতে সূর্যোদয় পর্যন্ত কিয়ামতের অপেক্ষা করে এবং আশংকা করে। জুমু'আর দিন এমন একটি মুহূর্ত আছে, যদি কোন বান্দা নামায পড়িয়া এই সময়টিতে দু'আ করে তবে আল্লাহ্ তা'আলা অবশ্যই তাহার দু'আ কবুল করেন। কা'ব (র) জিজ্ঞাসা করেন, এই দিনটি কি সারা বৎসরই পাওয়া যায়? রাবী আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, তাহার জবাবে আমি বলিলাম, বরং প্রতি জুমু'আয় পাওয়া যায়। তখন কা'ব (র) তাওরাত পড়িয়া করিয়া বলিলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) সত্যই বলিয়াছেন। আবু হুরায়রা (রা) বলেন, তাহার পর 'আবদুল্লাহ্ ইব্ন সালাম (রা)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হইলে আমি কা'ব-এর সাথে আমার বৈঠকের কথা বলিলাম। তিনি বলিলেন, তাহা কোন মুহূর্ত আমি জানি। একথা শুনিয়া আবূ হুরায়রা (রা) বলিলেন, তাহা হইলে আপনি আমাকে সেই মুহূর্তের কথা জানাইয়া দিন। আবদুল্লাহ্ ইব্ন সালাম (রা) বলিলেন, তাহা জুমুআর দিনের শেষ সময়। আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, আমি বলিলাম, তাহা জুমু'আর দিনের আখিরী সময় কেমন করিয়া হইবে? রাসূলুল্লাহ্ (স) তো বলিয়াছেন: যদি কোন মুসলিম বান্দা সালাতরত অবস্থায় সেই সময়টি পায়, অথচ এই সময়ে কেহ সালাত আদায় করে না। তাহা হইলে ইহা জুমুআর দিনের আখিরী সময়ে কেমন করিয়া হইবে? জবাবে আবদুল্লাহ্ ইব্ন সালাম (রা) বলিলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) কি বলেন নাই, যে ব্যক্তি সালাতের অপেক্ষায় থাকে, সেও সালাতের মধ্যে থাকে বলিয়া গণ্য হয়? আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, আমি বলিলাম, হাঁ। তিনি বলিলেন, ঐ সালাত বলিয়া ইহাকেই বুঝানো হইয়াছে (আবূ দাউদ, হাদীছ নং ১০৪৬; তিরমিযী, নং ৪৯১; ইমাম তিরমিযী (র) বলেন, হাদীছটি হাসান-সহীহ; নাসাঈ, ৩খ., পৃ. ১১৪-১১৫; মুওয়াত্তা মালিক, ১খ., পৃ. ১০৮-১১০; আলবানীর মতে হাদীছটি সহীহ্; আল-জামিউস সাগীর, নং ৩৩২৯)।
আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: একদা জিব্রাঈল (আ) আমার নিকট আসেন এবং তখন তাঁহার হাতে ছিল একটি সাদা আয়না, তাহাতে ছিল একটি কাল দাগ। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, হে জিব্রাঈল! ইহা কি? উত্তরে তিনি বলেন, ইহা হইল জুমুআর দিন। আপনার রব তাহা আপনার নিকট পেশ করিয়াছেন যাহাতে আপনি ও আপনার উম্মত এই দিনটিকে ঈদ হিসাবে উদযাপন করেন। এক্ষেত্রে আপনি থাকিবেন অগ্রগামী। ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের অবস্থান আপনার পরে। রাসূলুল্লাহ্ (স) ফেরেশতা জিব্রাঈল (আ)-কে জিজ্ঞাসা করেন: ইহাতে আমাদের জন্য কি রহিয়াছে? ফেরেস্তা বলেন, ইহাতে আপনাদের জন্য কল্যাণ রহিয়াছে। ইহাতে এমন একটি মুহূর্ত রহিয়াছে, যে ব্যক্তি ঐ মুহূর্তে তাহার রবের নিকট কল্যাণের জন্য দু'আ করিবে, যাহা তাহার ভাগ্যে রহিয়াছে, তবে অবশ্যই আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে তাহা দান করিবেন। আর যদি তাহা তাহার ভাগ্যে না থাকে তবে তাহা তাঁহার জন্য সঞ্চয় হিসাবে রাখিয়া দেওয়া থাকিবে। কেহ যদি এই মুহূর্তে কোন অকল্যাণ হইতে আল্লাহ্র নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে, যাহা তাহার জন্য অবধারিত, তবে আল্লাহ্ তা'আলা তাহাকে ইহার চেয়েও বড় অকল্যাণ হইতে আশ্রয় দান করিবেন। নবী কারীম (স) বলেন, আমি বলিলাম, ইহাতে এ কাল দাগটি কি? তিনি বলিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা জান্নাতের মধ্যে এমন একটি ময়দান বানাইবেন যাহা শুভ্র মিশক হইতেও অধিক সুঘ্রাণ বিচ্ছুরিত করিবে। জুমু'আর দিন আল্লাহ্ তা'আলা এই ময়দানে 'ইল্লিয়্যূন' হইতে অবতরণ করিয়া স্বীয় কুরসীতে সমাসীন থাকিবেন। এই কুরসীকে নূরের মিম্বরসমূহ পরিবেষ্টন করিয়া রাখিবে। তখন নবী-রাসূলগণ ঐ মিম্বরসমূহের উপর আসিয়া বসিবেন আর এই মিম্বরসমূহের চারি দিকে থাকিবে কতিপয় স্বর্ণের কুরসী। সেই কুরসীতে সিদ্দীক ও শহীদগণ উপবিষ্ট থাকিবেন। তাহার পর জান্নাতী লোকেরা আসিয়া এক একটি টিলার উপর উপবেশন করিবেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় তাজাল্লীতে উদ্ভাসিত হইবেন এবং সকলেই তাঁহার দীদার লাভে ধন্য হইবেন। এই অবস্থায় তিনি ঘোষণা করিবেন, আমি তোমাদের সাথে কৃত অঙ্গীকার বাস্তবে রূপায়িত করিয়াছি এবং তোমাদের প্রতি আমার দেওয়া নি'আমতকে পরিপূর্ণ করিয়াছি। ইহা আমার অনুগ্রহ প্রদর্শনের স্থান। সুতরাং তোমরা আমার নিকট দু'আ কর।
তখন সকলেই তাঁহার নিকট তাঁহার সন্তুষ্টি লাভের দু'আ করিবে। তিনি বলিবেন, এই স্থানে আমি তোমাদের প্রতি আমার সন্তুষ্টি উন্মুক্ত করিয়া দিলাম। তাহার পর তিনি বলিবেন, তোমাদের জন্য আমার আরও অনুগ্রহ রহিয়াছে। তোমরা আমার নিকট চাও। সকলেই তাঁহার নিকট চাহিতে থাকিবে। এভাবে দু'আ করিতে করিতে সকলের চাওয়া-পাওয়াই পূর্ণ হইয়া যাহাবে। তখন তাহাদের জন্য আল্লাহ্র সত্তাকে উন্মুক্ত করিয়া দেওয়া হইবে। ফলে তাহারা অবলোকন করিবে এমন জিনিস যাহা চোখ কোন দিন দেখে নাই, কান কোন দিন শুনে নাই এবং মানুষের হৃদয় কোন দিন কল্পনাও করে নাই।
জুমুআর দিন সালাত হইতে প্রত্যাবর্তনকালে যেই পরিমাণ সময় ব্যয় হয় সেই পরিমাণ সময় ধরিয়া এই অবস্থা অব্যাহত থাকিবে। তাহার পর আল্লাহ্ তা'আলা পুনরায় স্বীয় কুরসীতে সমাসীন হইবেন। তাঁহার সাথে সাথে শহীদগণ এবং সিদ্দীকগণও নিজ নিজ কুরসীতে সমাসীন থাকিবেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয়, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন, তখন প্রত্যেকেই শুভ্র মোতি, লাল ইয়াকৃত কিংবা সবুজ যবরজদ পাথর দ্বারা নির্মিত নিজ নিজ কক্ষে ফিরিয়া আসিবেন। পাথরগুলিতে ফাটা, ভাংগা বা এই জাতীয় কোন খুঁত থাকিবে না। দরজাগুলি দূরে থাকিবে। ইহাতে নহর প্রবাহিত থাকিবে এবং প্রবাহিত নহরে বালতি থাকিবে। ইহাতে আরও থাকিবে রকমারি ফল-ফলাদি, স্ত্রী, খাদিম ইত্যাদি।
প্রকৃতপক্ষে মানুষ নিজেদের সম্মান ও আল্লাহ্র দীদারের পরিমাণ বৃদ্ধি করার জন্য জুমু'আর দিনের প্রতি যে পরিমাণ মুখাপেক্ষী, অন্য কিছুর প্রতি সেই পরিমাণ মুখাপেক্ষী থাকিবে না। তাই এই দিনকে 'বোনাস দিন' বলা যায় (হাফিয হায়ছামী বলেন, হাদীছটি ইমাম তাবারানী তৎপ্রণীত গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন। রাবীগণ সকলেই নির্ভরযোগ্য। আবূ ইয়ালাও ইহা বর্ণনা করিয়াছেন। তাঁহার রাবী সকলেই সহীহ-এর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ। মাজমাউয যাওয়াইদ, ২খ., পৃ. ১৬৪)।
📄 (ছয়) এই উম্মতের ভুল-ত্রুটি এবং পাপপ্রসূত কল্পনা ক্ষমাযোগ্য
আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতকে অসংখ্য ও অগণিত নি'য়ামত দান করিয়াছেন। ইহাতে রহিয়াছে আখিরী নবী মুহাম্মাদ (স)-এর প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শন। আল্লাহ্ প্রদত্ত নি'য়ামতসমূহের অন্যতম হইল, তিনি এই উম্মতের ভুল-ত্রুটি এবং মনের অবাস্তব জল্পনা-কল্পনা ইত্যাদি সব কিছু ক্ষমা করিবেন। মনের জল্পনা-কল্পনা যদি উচ্চারণ না করা হয় কিংবা তাহা বাস্তবে রূপায়িত না করা হয় তাহা হইলে এসব ক্ষমাযোগ্য। ইহা এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য। হাদীছে এই সম্বন্ধে স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মতের অহেতুক কল্পনা মাফ করিয়া দিয়াছেন যতক্ষণ না তাহারা তাহা উচ্চারণ করে কিংবা বাস্তবে রূপায়িত করে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৫৬০; মুসলিম নং ১২৭)।
للهِ مَا فِي السَّمواتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَإِنْ تُبْدُوا مَا فِي أَنْفُسِكُمْ أَوْ تُخْفُوهُ يُحَاسِبْكُمْ بِهِ اللَّهُ فَيَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَنْ يُشَاءُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.
"আসমান ও যমীনে যাহা কিছু আছে সমস্ত আল্লাহ্রই। তোমাদের মনে যাহা আছে তাহা প্রকাশ কর অথবা গোপন রাখ, আল্লাহ্ উহার হিসাব তোমাদের নিকট হইতে গ্রহণ করিবেন। অতঃপর যাহাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করিবেন এবং যাহাকে খুশী শাস্তি দিবেন। আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান” (২: ২৮৪)।
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উপর উপরিউক্ত আয়াত নাযিল হইলে বিষয়টি সাহাবীগণের খুবই কঠোর মনে হয়। তাই সবাই রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সালাত, সিয়াম, জিহাদ, সাদাকা প্রভৃতি যে সমস্ত আমল আমাদের সামর্থ্যানুযায়ী ছিল, এই যাবত আমাদেরকে সেগুলি করার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। বর্তমানে আপনার উপর এই আয়াত নাযিল হইয়াছে। বিষয়টি তো আমাদের সমর্থ্যের বাহিরে। একথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, কিতাবী তথা ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের ন্যায় তোমরাও কি এমন কথা বলিবে, "শুনিলাম, কিন্তু মানিলাম না"? বরং তোমরা বল, শুনিলাম ও মানিলাম। হে আমাদের রব! আমরা তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি, আর তুমিই আমাদের শেষ প্রত্যাবর্তনস্থল। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর এই নির্দেশ শুনিয়া সাহাবায়ে কিরাম বলেন, আমরা শুনিয়াছি ও মানিয়াছি, হে আমাদের রব! আমরা তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি; তুমিই আমাদের শেষ প্রত্যাবর্তনস্থল। রাবী বলেন, সাহাবীদের সকলেই এই আয়াত পাঠ করেন এবং বিনয়াপ্লুত হইয়া মনে-প্রাণে তাহা গ্রহণ করেন। ইহার পর আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন:
اَمَنَ الرَّسُولُ بِمَا اُنْزِلَ اِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلُّ اَمَنَ بِاللَّهِ وَمَلْئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ اَحَدٍ مِّنْ رُّسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَاَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَاِلَيْكَ الْمَصِبْرُ.
"রাসূল, তাহার প্রতি তাহার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে যাহা নাযিল হইয়াছে তাহাতে ঈমান আনিয়াছে এবং মু'মিনগণও। তাহাদের সকলে আল্লাহ, তাঁহার ফেরেশতাগণে, তাঁহার কিতাবসমূহে এবং তাঁহার রাসূলগণে ঈমান আনয়ন করিয়াছে। তাহারা বলে, আমরা তাঁহার রাসূলগণের মধ্যে কোন তারতম্য করি না। তাহারা আরও বলে, আমরা শুনিয়াছি এবং পালন করিয়াছি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তোমার ক্ষমা চাই এবং প্রত্যাবর্তন তোমারই নিকট” (২: ২৮৫)।
যখন তাহারা সর্বোতভাবে আনুগত্য জ্ঞাপন করিলেন, তখন আল্লাহ্ তা'আলা উক্ত আয়াতের হুকুম রহিত করিয়া নাযিল করিলেন:
لا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَّسِينَا أَوْ أَخْطَانًا
"আল্লাহ্ কাহারও উপর এমন কোন কষ্টদায়ক দায়-দায়িত্ব অর্পণ করেন না যাহা তাঁহার সাধ্যাতীত। সে ভাল যাহা উপার্জন করিয়াছে তাহা তাহারই জন্য এবং মন্দ যাহা উপার্জন করিয়াছে তাহাও তাহারই। হে আমাদেব রব! যদি আমরা বিস্মৃত হই কিংবা ভুল করিয়া ফেলি, তবে তুমি আমাদেরকে পাকড়াও করিও না"। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, "হাঁ, মানিয়া নিলাম।" আরও নাযিল হয়:
رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا .
“হে আমাদের রব! আমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর যেমন গুরুদায়িত্ব অর্পণ করিয়াছিলেন, আমাদের উপর তেমন দায়িত্ব অর্পণ করিবেন না"। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, হাঁ, মানিয়া নিলাম। আরও নাযিল হয়:
রَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ.
"হে আমাদের রব! এমন ভার আমাদের উপর অর্পণ করিবেন না যাহা বহনের ক্ষমতা আমাদের নাই"। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, হাঁ, মানিলাম। আরও নাযিল হইয়াছে:
وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنْتَ مَوْلَانَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَفِرِينَ.
"আমাদের পাপ মোচন কর, আমাদেরকে ক্ষমা কর এবং আমাদের প্রতি রহম কর। তুমিই আমাদের অভিভাবক। সুতরাং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে জয়যুক্ত কর" (সূরা বাকারা, আয়াত নং ২৮৬)। এবারও রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, হাঁ, মানিয়া নিলাম (মুসলিম, হাদীছ নং ১১৫)।
আবূ যার গিফারী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মতের ভুল-ভ্রান্তি এবং জোরপূর্বক তাহাদের দ্বারা 'যাহা করানো হয়, এমন সব কাজ মাফ করিয়া দিয়াছেন। ইহাতে উম্মতে মুহাম্মাদীর মর্যাদা প্রতীয়মান হয় এবং ইহা এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য। এই উম্মতের কোন ব্যক্তি যদি ভুলে কোন অপরাধ করিয়া বসে তবে তাহা না করার মধ্যেই গণ্য থাকিবে। পূর্ববর্তী উম্মতের বিষয়টি ইহার ব্যতিক্রম ছিল (ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৫৬০; ইব্ন মাজা, হাদীছ নং ২০৫৩; মুসতাদরাক হাকেম, ২খ., পৃ. ১৯৮; তাঁহার মতে হাদীছটি বুখারী-মুসলিমের শর্তে উত্তীর্ণ। তবে তাঁহারা ইহা বর্ণনা করেন নাই। যাহাবীও অনুরূপ বলিয়াছেন; দারু কুতনী, পৃ. ৭৯৭; বায়হাকী, ৭খ., পৃ. ৩৫৬। আলবানীও হাদীছটিকে সহীহ বলিয়াছেন)।
ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) আল্লাহ্ তা'আলা হইতে এই কথা বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা সমুদয় সৎ ও অসৎ কর্মের হিসাব লিখেন। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) ইহাকে আরও বিস্তারিত করিয়া বলেন, যে ব্যক্তি নেক কাজের ইচ্ছা করিয়াছে অথচ তাহা সম্পাদন করে নাই, আল্লাহ্ তা'আলা ইহার বিনিময়ে তাহার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ছওয়াব লিখিয়া দেন। আর ইচ্ছার পর তাহা কাজে পরিণত করিলে আল্লাহ্ তা'আলা ইহার বিনিময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ছওয়াব লিখিয়া দেন। পক্ষান্তরে কেহ যদি কোন মন্দ কাজের ইচ্ছা করিয়া তাহা কাজে পরিণত না করে, তবে আল্লাহ্ তা'আলা ইহার বিনিময়ে তাহার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ছওয়াব লিখিয়া দেন। আর ইচ্ছার পর সম্পাদন করিলে তিনি একটি মাত্র গুনাহ লিখেন (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১খ., হাদীছ নং ৬৪৯১; মুসলিম, হাদীছ নং ১৩১)।
📄 (সাত) এই উম্মত সমূলে ধ্বংস হওয়া হইতে নিরাপদ
উম্মতে মুহাম্মাদী আল্লাহর হেফাজতাধীন ও অনুগ্রহপ্রাপ্ত উম্মত। এই উম্মতকে আল্লাহ্ তা'আলা সমস্ত অকল্যাণ হইতে হিফাযত করিয়া নিজ রহমতের মধ্যে আশ্রয় দিয়াছেন। সুতরাং তাহারা অনাহারে, দুর্ভিক্ষে এবং পানিতে ডুবিয়া সমূলে মারা যাইবে না। আর এমন শত্রুকেও তাহাদের উপর চাপাইয়া দেওয়া হইবে না যাহারা তাহাদেরকে সমূলে ধ্বংস করিয়া দিবে। সমস্ত পৃথিবীর মানুষ একত্র হইলেও তাহা সম্ভব হইবে না। ইহা এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য। অন্য কোন উম্মতের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য ছিল না। এই সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ্ (স) হইতে স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে। ছাওবান (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: আল্লাহ্ তা'আলা আমার জন্য পৃথিবীকে সংকুচিত করিয়া দিয়াছেন। ফলে আমি ইহার পূর্ব দিগন্ত হইতে পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত দেখিতে পাইয়াছি। আমার উম্মতের রাজত্ব এই পূর্ণ এলাকাব্যাপী বিস্তৃত হইবে। আমাকে লাল ও সাদা [লাল বলিয়া সোনা ও সাদা বলিয়া রূপার ভাণ্ডারকে বুঝানো হইয়াছে, আর এই দুই ভাণ্ডার হইল রোম ও পারস্যের ধনভাণ্ডার, ভিন্নমতে ইরাক ও সিরিয়ার ধনভাণ্ডার] দুইটি ধনভাণ্ডার প্রদান করা হইয়াছে।
আমি আমার রবের নিকট আমার উম্মতের ব্যাপারে প্রার্থনা করিয়াছিলাম যেন তাহাদেরকে ব্যাপক দুর্ভিক্ষের দ্বারা ধ্বংস না করা হয় এবং যেন তাহাদের উপর বহিরাগত এমন কোন শত্রুকে চাপাইয়া দেওয়া না হয় যাহারা তাহাদেরকে সমূলে ধ্বংস করিয়া দিবে। তখন আমার রব বলেন, হে মুহাম্মাদ! কোন বিষয়ে আমি সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর তাহা আর রদ হয় না। আমি আপনার উম্মতের ব্যাপারে আপনাকে এই প্রতিশ্রুতি দিতেছি যে, তাহাদেরকে আমি ব্যাপক দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে ধ্বংস করিব না এবং তাহাদের দুনিয়া হইতে খতম করিয়া দিবে এমন কোন বহিরাগত শত্রুকেও আমি তাহাদের উপর চাপাইয়া দিব না। তাহারা দুনিয়ার সমস্ত প্রান্ত হইতে একত্র হইয়াও মুসলমানদেরকে খতম করিতে পারিবে না। অবশ্য আপনার উদ্ধৃত পরস্পর পরস্পরকে হত্যা করিবে অথবা বন্দী করিবে (মুসলিম, হাদীছ নং ২৮৮৯)।
সা'দ (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ (স) আলিয়া (উচ্চভূমি) অঞ্চল হইতে আসিতেছিলেন। এই সময় তিনি বনূ মুআবিয়ার মসজিদের নিকট দিয়া অতিক্রমকালে তথায় প্রবেশ করিয়া দুই রাক'আত নামায আদায় করেন এবং আমরাও তাঁহার সাথে নামায আদায় করি। নামাযান্তে তিনি দীর্ঘক্ষণ দু'আ করেন। তাহার পর তিনি আমাদের দিকে ফিরিয়া বলেন আমি আমার রবের নিকট তিনটি বিষয়ে দু'আ করিয়াছিলাম। তিনি দুইটি কবুল করিয়াছেন, আর একটি প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। আমি আমার রবের নিকট দু'আ করিয়াছিলাম যেন তিনি আমার উম্মতকে দুর্ভিক্ষের দ্বারা ধ্বংস না করেন। ইহা তিনি মঞ্জুর করিয়াছেন। আমি দু'আ করিয়াছিলাম যেন আমার উম্মতকে পানিতে ডুবাইয়া না মারা হয়। ইহাও তিনি মঞ্জুর করিয়াছেন। আমি দু'আ করিয়াছিলাম যেন তাহারা পরস্পর সংর্ঘষে লিপ্ত না হয়। ইহা তিনি প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন (মুসলিম, ফিতান, বাব ৫, হাদীছ নং ২৮৯০)।
আবদুল্লাহ্ ইব্ন জাবির ইব্ন আতীক (রা) বলেন, একদা আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বনী মুআবিয়া এলাকায় আমাদের নিকট আসেন। ইহা আনসার সাহাবীদের একটি গ্রাম। তখন তিনি বলেন, তোমাদের এই মসজিদে রাসূলুল্লাহ্ (স) কোথায় নামায পড়িয়াছেন তাহা কি তোমরা জান? আমি বলিলাম, জানি। এই কথা বলিয়াই আমি কোণের দিকে তাঁহাকে ইশারা করিয়া দেখাইলাম। তিনি বলিলেন, এই মসজিদে রাসূলুল্লাহ (স) যে তিনটি দু'আ করিয়াছিলেন তাহা তোমরা জান কি? আমি বলিলাম, হাঁ, জানি। তিনি বলিলেন, তাহা আমাকে বলিয়া দাও। আমি বলিলাম, রাসূলুল্লাহ (স) দু'আ করেন যেন বহিরাগত কোন শত্রুকে মুসলমানদের উপর জয়ী না করা হয় এবং যেন তাহাদেরকে দুর্ভিক্ষের দ্বারা ধ্বংস না করা হয়। এ দুইটি দু'আ কবুল হইয়াছে। তিনি এই দু'আও করিয়াছিলেন যেন তাঁহার উম্মতেরা পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত না হয়, ইহা প্রত্যাখ্যাত হইয়াছে। ইবন উমার (রা) বলেন, হাঁ, তুমি সত্য বলিয়াছ। তিনি বলিলেন, এই কারণেই এই উম্মতের মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত সংর্ঘষ (বিবাদ ও অনৈক্য) চলিতে থাকিবে (মুওয়াত্তা লিল-মালিক, ১খ., পৃ. ২১৬; আবদুল কাদির আরনাউত বলেন, হাদীছের সনদ সহীহ, তা'লীক আলা জামিয়িল উসূল, ৯খ., পৃ. ১৯৯)।
আওফ ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতের উপর দুই তরবারিকে কখনও একত্র করিবেন না। একটি তাহাদের নিজেদের তরবারি। অপরটি শত্রুদের তরবারি (আবূ দাউদ, হাদীছ নং ৪৩০১; মুসনাদে আহমাদ, ৬খ., পৃ. ২৬; আলবানীর মতে হাদীছটি সহীহ, সহীহ আল-জামিউস সাগীর, হাদীছ ৫০৯৭)।
📄 (আট) এই উম্মত পথভ্রষ্টতার উপর একমত হইবে না এবং তাহাদের
আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতকে দুনিয়াতে বহু মর্যাদা দান করিয়াছেন। তন্মধ্যে একটি হইল, এই উম্মতের সকলকে একত্রে তিনি ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হওয়া হইতে হিফাযত করিবেন। ইহা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর খাতিরেই করা হইবে। আর এই উম্মতের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হইল, তাহাদের একটি দল সর্বদা, সর্বকালে ও সর্বযুগে সত্য ও হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকিবে এবং তাহারা বিজয়ী হিসাবে থাকিবে। যাহারা তাহাদের বিরোধিতা করিবে বা তাহাদেরকে অপদস্ত করার চেষ্টা করিবে, তাহারা তাহাদের কোন প্রকার ক্ষতি করিতে পারিবে না। কিয়ামত পর্যন্ত তাহারা তাহাদের অবস্থার উপর অটল থাকিবে।
শায়খ ইয্যুদ্দীন ইব্ন আবদুস সালাম বলেন, এই জাতীয় হাদীছ দ্বারা নবী কারীম (স)-এর বৈশিষ্ট্য বা তাঁহার উম্মতের পবিত্রতা প্রতীয়মান হয়। অর্থাৎ দীনের মৌলিক ও আনুষঙ্গিক কোন বিষয়েই এই উম্মত পথভ্রষ্টতায় একমত হইবে না।
কা'ব ইব্ন আলিম আশ'আরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: পথভ্রষ্টতার উপর একমত হওয়া হইতে আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতকে রক্ষা করিয়াছেন (কিতাবুস সুন্নাহ ইব্ন আবূ আসিম, পৃ. ৭৯)। আনাস (রা) হইতেও অনুরূপ বর্ণিত হইয়াছে। আলবানী হাদীছের দুইটি সূত্র উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছটি সামগ্রিকভাবে হাসান (সিলসিলাতুল আহাদীছ আস-সাহীহা, নং ১৩১১; সহীহ আল-জামিউস সাগীর, হাদীছ নং ১৭৮২)।
ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মত অথবা তিনি বলিয়াছেন, উম্মতে মুহাম্মাদীকে গোমরাহীর উপর একত্র করিবেন না। আল্লাহর সাহায্য জামাআতের সাথে। কেহ যদি মুসলিম জামাআত হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়, তবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায়ই সে জাহান্নামে প্রবেশ করিবে [তিরমিযী, হাদীছ নং ২১৬৭। ইমাম তিরমিযীর মতে হাদীছটি গরীব। আল-মাকাসিদুল হাসানা, আল্লামা সাখাবী, হাদীছটি সামগ্রিকভাবে মশহুর। ইহার বহু সনদ ও সমর্থন রহিয়াছে। ইহার কোন কোন সূত্র মারফু, পৃ. ৪৬০। সহীহ আল-জামিউস সাগীর গ্রন্থে আলবানী ইহাকে সহীহ বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন, নং ১৮৪৪। ইমাম তাবারীও হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। তাহার বর্ণিত হাদীছটি নিম্নরূপ:
عن ابن عمر لن تجتمع امتى على ضلالة فعليكم بالجماعة فان يد الله على الجماعة.
"ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেন, আমার উম্মত কখনও ভ্রষ্টতার উপর ঐক্যবদ্ধ হইবে না। অতএব তোমরা দলবদ্ধ থাকিবে। কেননা দলের উপরই রহিয়াছে আল্লাহর হাত"।
হাফিয হায়ছামী (র) তাবারানী হইতে হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। তবে তাবারানীর সূত্র দুইটি। ইহার একটির সমস্ত রাবীই নির্ভরযোগ্য এবং সকলেই সহীহ-এর শর্তে উত্তীর্ণ। অবশ্য মারযুক-এর বিষয়টি ইহার ব্যতিক্রম। তিনিও নির্ভরযোগ্য, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৫খ., পৃ. ২১৮]।
ছাওবান (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: আমার উম্মতের একদল লোক সব সময় হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকিবে। যাহারা তাহাদেরকে অপদস্ত করার চেষ্টা করিবে তাহারা তাহাদের কোন ক্ষতি করিতে পারিবে না। এইভাবে কিয়ামত আসিয়া যাইবে। কিন্তু তাহারা তাহাদের অবস্থার উপর সুদৃঢ় থাকিবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৬খ., নং ৩৬৪১; মুসলিম, হাদীছ নং ১৯২০)।
[ইমাম নববী বলেন, ইমাম বুখারীর মতে "আমার উম্মতের একদল লোক” বলিয়া উলামায়ে কিরামকে বুঝানো হইয়াছে। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, তাহারা যদি মুহাদ্দিছ না হন, তবে তাহারা কাহারা আমি জানি না। কাযী ইয়ায বলেন, ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল-এর মতে তাহারা হইলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-জামাআত এবং যাহারা তাহাদের আকীদা ও ফিক্সের অনুসারী। ইমাম নববী বলেন, তাহারা হইলেন মু'মিনদের বিভিন্ন জামাআত। তাহাদের মধ্যে রহিয়াছেন মুজাহিদ, ফকীহ, মুহাদ্দিছ, সূফী, মুবাল্লিগ ও দীনের অন্যান্য জামাআত। তাহাদের সকলের একই দলভুক্ত থাকা আবশ্যক নয়, বরং তাহারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন লোকও হইতে পারেন। শারহুন নাবাবী আলা সাহীহ মুসলিম, ১৩খ., পৃ. ৬৬-৬৭)।
আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাদের হৃদয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করার পর মুহাম্মাদ (স)-এর হৃদয়কে অন্যান্যদের তুলনায় সর্বোত্তম পাইলেন এবং তিনি তাঁহাকে নিজের জন্য নির্বাচিত করেন এবং তাঁহাকে রিসালাতের দায়িত্ব দিয়া রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেন। তিনি পুনরায় বান্দাদের হৃদয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া সাহাবায়ে কিরামের হৃদয়কে অন্যান্যদের তুলনায় সর্বোত্তম পাইলেন। তাই তিনি তাহাদেরকে নবী কারীম (স)-এর উযীর নির্বাচন করেন, যাহারা দীনের হেফাজতের জন্য লড়াই করেন। মুসলমানরা যে কাজকে উত্তম মনে কর তাহা আল্লাহ্ তা'আলার নিকটও উত্তম এবং যে কাজকে খারাপ মনে কর, তাহা আল্লাহ্ তা'আলার নিকটও খারাপ (মুসনাদে আহমদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৭৯)। হাফিয হায়ছামী বলেন, হাদীছটি ইমাম আহমাদ ও বাযযার বর্ণনা করিয়াছেন এবং ইমাম তাবারানীও তৎপ্রণীত কাবীর গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছের সূত্রে বর্ণিত সমস্ত রাবীই নির্ভরযোগ্য (মাজমাউয যাওয়াইদ, ১খ., পৃ. ১৭৮)।