📄 (এক) শ্রেষ্ঠতম উম্মত
আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতকে বহু শরাফত ও মর্যাদা দান করিয়াছেন, তাহাদের আলোচনাকে সমুন্নত করিয়াছেন এবং অন্যান্য উম্মতের তুলনায় তাহাদেরকে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী করিয়াছেন (আল-খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩৬১)। আর কুরআন মজীদে তিনি তাহাদেরকে শ্রেষ্ঠতম উম্মত বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। যেমন আল্লাহর বাণী : كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ. "তোমরাই শ্রেষ্ঠই উম্মত, তোমাদের আবির্ভাব হইয়াছে মানবজাতির জন্য। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎ কাজে নিষেধ কর এবং আল্লাহতে ঈমান আন" (৩: ১১০) বস্তুত রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উসীলাতেই এই উম্মত মর্যাদার উচ্চ শিখরে আরোহণ করিতে সক্ষম হইয়াছে। তিনি আল্লাহ্র সৃষ্টিকুলের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাবান ব্যক্তি এবং রাসূলগণের মধ্যে তিনি হইলেন সর্বাধিক সম্মানিত রাসূল। এক পরিপূর্ণ শারী'আতসহ আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে এই পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছেন। ইতোপূর্বে কোন নবী-রাসূলকে তাহা প্রদান করা হয় নাই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর তরীকায় অল্প আমলও অন্যের তরীকার অধিক আমল হইতে উত্তম। কুরআন-হাদীছ এবং সাহাবী ও তাবিঈনের বাণীতে অনুরূপ কথা বিবৃত হইয়াছে। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে: هُوَ اجْتَبْكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ "তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করিয়াছেন তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেন নাই" (২২: ৭৮)।
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيداً . "এইভাবে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী উম্মতরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি; যাহাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ এবং রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বারূপ হয়" (২: ১৪৩)।
বাহ্য ইব্ন হাকীম (রা) তাঁহার পিতা হইতে এবং তাঁহার পিতা তাঁহার দাদা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) মহান আল্লাহর বাণী : كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أَخْرِجَتْ لِلنَّاسِ “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত; মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের আবির্ভাব হইয়াছে" (৩: ১১০)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, “ তোমরা হইলে সত্তরমত উম্মত; তোমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত এবং আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদেরকে অন্য সকল উম্মতের উপর মর্যাদা দান করিয়াছেন" (তিরমিযী, হাদীছ নং ৩০০১; তাঁহার মতে হাদীছটি হাসান; মুসনাদে আহমাদ, ৫খ., পৃ. ৩; ইব্ন মাজা, নং ৪২৮৮; মুসতাদরাক হাকেম, ৪খ., পৃ. ৮৪; তাঁহার মতে ইহার সনদ সহীহ, তবে ইমাম বুখারী ও মুসলিম হাদীছটি বর্ণনা করেন নাই। আল্লামা যাহবীও অনুরূপ মত ব্যক্ত করিয়াছেন। হাফিয ইবন কাছীর বলেন, হাদীছটি প্রসিদ্ধ, তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ১খ., পৃ. ৩৯৯)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী কারীম (স) বলেন, আমাকে ছয়টি বিষয়ের দ্বারা অন্যান্যদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হইয়াছে, আমার পূর্ববর্তী কাহাকেও তাহা প্রদান করা হয় নাই। ইহার মধ্যে একটি হইল, আমার উম্মতকে শ্রেষ্ঠতম উম্মত বানানো হইয়াছে (হাফিয হায়ছামী, মুসনাদে বাযযার; ইমাম বাযযার-এর মতে হাদীছটির সূত্র খুবই মজবুত; মাজমাউয যাওয়াইদ, ৮খ., পৃ. ২৬৯; খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৩৩৬)।
'আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, আমাকে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দান করা হইয়াছে যাহা আমার পূর্ববর্তী কোন নবী-রাসূলকে দান করা হয় নাই। আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহা কি? তিনি বলিলেন: আমাকে রু'ব দ্বারা সাহায্য করা হইয়াছে; পৃথিবীর ধনভাণ্ডারের চাবি আমাকে দান করা হইয়াছে, আমাকে আহমাদ নামকরণ করা হইয়াছে, পৃথিবীকে আমার জন্য পবিত্রকারী বস্তু বানানো হইয়াছে এবং আমার উম্মতকে শ্রেষ্ঠতম উম্মত ঘোষণা করা হইয়াছে (মুসনাদে আহমাদ, ১খ., পৃ. ৯৮; হাফিয ইব্ন কাছীর বলেন, এই সনদে হাদীছটি বর্ণনা করার ক্ষেত্রে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল নিঃসঙ্গ। তাঁহার সূত্রটি হাসান। তাফসীরে ইবন্ন কাছীর, ১খ., পৃ. ৪০০; হাফিয ইব্ন হাজার বলেন, ইহার সনদ হাসান, ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ. ৫২২; অনুরূপভাবে- হাফিয হায়ছামী ইহাকে হাসান বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন; মাজমাউয যাওয়াইদ, ১খ., পৃ. ২৬১)।
আবু দারদা (রা) বলেন, আমি আবুল কাসিম (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি: আল্লাহ্ তা'আলা ঈসা (আ)-কে বলিলেন, হে ঈসা! আমি তোমার পর এক উম্মত সৃষ্টি করিব যাহাদের অবস্থা হইবে- যদি কোন পসন্দনীয় জিনিস তাহাদের হস্তগত হয়, তবে তাহারা আল্লাহর হাম্দ-শোকর করিবে। আর যদি তাহারা কোন অপসছন্দনীয় অবস্থার শিকার হয় তবে তাহারা ধৈর্য ধারণ করিবে। অথচ তাহাদের কোন হিল্ম (ধৈর্য) নাই এবং ইল্মও নাই। একথা শুনিয়া ঈসা (আ) বলেন, হে আমার রব! ইল্ম ও হিল্ল্ম ছাড়া কেমন করিয়া তাহারা এরূপ করিবে? আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, আমি আমার ইল্ল্ম ও হিল্ল্ম হইতে তাহাদেরকে দান করিব (মুসনাদে আহমাদ, ৬খ., পৃ. ৪৫০; হাফিয হায়ছামী বলেন, ইমাম আহমাদ, বাযযার ও ইমাম তাবারানী হাদীছটি মু'জামুল কাবীর ও মু'জামুল আওসাতে বর্ণনা করিয়াছেন। ইমাম আহমাদ কর্তৃক বর্ণিত সূত্রের রাবীগণ সকলেই সহীহ-এর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ। মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০খ., পৃ. ৬৭-৬৮; শু'আয়ব এবং আবদুল কাদির আরনাউত হাদীছের সূত্রটি হাসান বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন, যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৪৬)।
وَلَمَّا سَكَتَ عَنْ مُوسَى الْغَضَبُ أَخَذَ الْأَلْوَاحَ وَفِي نُسْخَتِهَا هُدًى وَرَحْمَةً لِّلَّذِينَ هُمْ لِرَبِّهِمْ يَرْهَبُونَ. "মূসার ক্রোধ যখন প্রশমিত হইল তখন সে ফলকগুলি তুলিয়া নিল। যাহারা নিজেদের প্রতিপালককে ভয় করে তাহাদের জন্য উহাতে যাহা লেখা ছিল তাহাতে ছিল পথনির্দেশ ও রহমত" (৭: ১৫৪)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কাতাদা (র) বলেন, তখন মূসা (আ) বলেন, হে আমার রব! এই ফলকগুলিতে আমি এমন এক উম্মতের সন্ধান পাইয়াছি যাহাদেরকে শ্রেষ্ঠ উম্মত বলা হইয়াছে, যাহাদের আবির্ভাব হইবে মানুষের কল্যাণের জন্য। তাহারা লোকজনকে সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজে বাধা দিবে। হে আল্লাহ্! তাহাদেরকে আমার উম্মত বানাইয়া দিন। জবাবে মহান আল্লাহ্ বলেন, তাহারা আহমাদ (স)-এর উম্মত হইবে। তারপর মূসা (আ) বলেন, আমি ফলকগুলিতে এমন এক উম্মতের উল্লেখ পাইয়াছি যাহারা হইবে আখিরী উম্মত অর্থাৎ সৃষ্টির দিক হইতে আখিরী উম্মত হইবে, কিন্তু জান্নাতে যাইবে সর্বাগ্রে; তাহাদেরকে আমার উম্মত বানাইয়া দিন। জবাবে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, তাহারাও আহমাদ (স)-এর উম্মত হইবে। মূসা (আ) পুনরায় বলেন, হে আমার রব! আমি তাওরাতের ফলকগুলিতে এমন এক উম্মতের উল্লেখও পাইয়াছি যাহাদের বক্ষে তাহাদের ধর্মগ্রন্থ সংরক্ষিত থাকিবে এবং তাহা হইতে তাহারা পাঠ করিবে। অথচ তাহাদের পূর্ববর্তী উম্মতের অবস্থা এমন ছিল যে, তাহারা তাহাদের ধর্মগ্রন্থ দেখিয়া দেখিয়া পাঠ করিত। তারপর ঐ ধর্মগ্রন্থ তাহাদের হইতে উঠাইয়া নেওয়ার পর তাহারা আর তাহা হিফাযত করিয়া রাখিতে পারে নাই। পরবর্তী উম্মতকে আল্লাহ্ তা'আলা এমন স্মৃতিশক্তি দান করিবেন যাহা পূর্ববর্তী কোন উম্মতকে দেওয়া হয় নাই। হে আমার রব! তাহাদেরকে আমার উম্মত বানাইয়া দিন। এবারও আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, তাহারা হইবে আহমাদ নবীর উম্মত। মূসা (আ) আরও বলেন, হে আমার রব! ফলকসমূহে আমি এমন উম্মতেরও সন্ধান পাইয়াছি যাহাদের জন্য সাদাকা ভক্ষণ করাও জায়েয হইবে; অথচ পূর্ববর্তী উম্মতগণ সাদাকা করার পর তাহা কবূল হইলে আল্লাহ্ তা'আলা আকাশ হইতে আগুন নাযিল করিতেন এবং সেই আগুন তাহা গ্রাস করিত। আর সাদাকা গ্রহণযোগ্য না হইলে তাহা অমনি রাখিয়া দেওয়া হইত। অবশেষে জীব-জন্তু ও পাখি আসিয়া তাহা খাইয়া ফেলিত। কিন্তু পরবর্তী উম্মতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলা ভিন্ন ব্যবস্থা রাখিয়াছেন। তিনি ধনীদের হইতে গরীবদের জন্য সাদাকা গ্রহণ করেন। তখন মূসা (আ) বলেন, হে আমার রব! তাহাদেরকেও আমার উম্মত বানাইয়া দিন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, তাহারাও আহমাদ নবীর উম্মত হইবে। মূসা (আ) আবারও বলেন, হে আমার রব! আমি তাওরাতের ফলকগুলিতে এমন এক উম্মতের উল্লেখও পাইয়াছি যাহারা কোন নেক আমলের ইচ্ছা করিয়া তাহা বাস্তবে রূপায়িত না করিলেও তাহাদেরকে একটি ছওয়াব দান করা হইবে। আর যদি তাহারা তাহা বাস্তবে রূপায়িত করে তবে দশ হইতে সাত শত পর্যন্ত ছওয়াব তাহাদেরকে দেওয়া হইবে। সুতরাং হে আমার রব! তাহাদেরকে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত করিয়া দিন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, তাহারাও আহমাদ নবীর উম্মত হইবে। ইহার পর মূসা (আ) বলেন, হে আমার রব। আমি তাওরাতের ফলকগুলিতে এমন উম্মতেরও সন্ধান পাইয়াছি যাহাদের জন্য সুপারিশ করা হইবে এবং তাহাদের ব্যক্তিগত সুপারিশও গ্রহণযোগ্য হইবে। তাহাদেরকে আমার উম্মতের মধ্যে শামিল করিয়া দিন। জবাবে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, তাহারাও আহমাদ নবীর উম্মত হইবে। বর্ণনাকারী কাতাদা (র) বলেন, তখন আল্লাহ্ নবী মূসা (আ) ফলকগুলি ছুড়িয়া মারেন এবং বলেন, হে আল্লাহ্! তাহা হইলে আমাকেও আহমাদ (স)-এর উম্মত হিসাবে কবূল করিয়া নিন (তাফসীর ইন জারীর, ৯খ., পৃ. ৪৫; তাফসীর ইব্ন কাছীর, ২খ., ২৫৯)।
রবী' ইব্ন খাছ'আম (র) বলেন, ইসলাম ধর্মে মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মতেরা তুলনায় আর কাহারও দু'আই অধিক পরিমাণে আল্লাহ্র দরবারে গৃহীত হইবে না। এই কারণেই আল্লাহ্ তা'আলা বলিয়াছেন : كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ. "তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত; মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের আবির্ভাব হইয়াছে" (৩:১১০)।
📄 (দুই) গনীমতের মাল হালাল করা
আমাদের পূর্বে যেসব নবী-রাসূল গত হইয়াছেন, তাহাদের উম্মতের অবস্থা দুই ধরনের ছিল। (এক) কোন কোন নবীর উম্মতের উপর জিহাদ ফরয ছিল না এবং গনীমতের মাল হস্তগত হওয়ারও কোন ব্যবস্থা ছিল না। (দুই) কোন কোন উম্মতের উপর জিহাদ ফরয ছিল। তাহারা জিহাদ করিত এবং আল্লাহ্র দুশমন হইতে অর্থ-সম্পদ হস্তগত করিত। তবে এই মাল তাহারা নিজেরা ভোগ করিত না। সেই যুগের মানুষের জিহাদ কবূল হওয়ার নিদর্শন এই ছিল যে, মাল জমা করার পর আসমান হইতে আগুন আসিয়া তাহা ভস্মীভূত করিয়া দিত। আর কোন যুদ্ধ আল্লাহ্র দরবারে গ্রহণযোগ্য না হইলে আসমান হইতে আগুন নাযিল হইত না। যুদ্ধের পর গনীমতের মাল আত্মসাত করিলে সেই যুদ্ধ আল্লাহ্র দরবারে গৃহীত হইত না। এই নিয়ম দীর্ঘকাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। তারপর আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতের দুর্বলতা লক্ষ্য করিয়া তাহাদের জন্য গনীমতের মাল হালাল করিয়া দেন। এমনি করিয়া তিনি জিহাদ কবুল না করার লজ্জাজনক অবস্থা হইতেও এই উম্মতকে মুক্তিদান করেন। এই অসংখ্য ও অগণিত নিয়ামত দানের কারণে আল্লাহ্ জন্যই সকল প্রশংসা। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ لَوْلا كِتَبٌ مِّنَ اللهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ. فَكُلُوا مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلَلاً طيِّبًا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ. "আল্লাহ্র পূর্ব-বিধান না থাকিলে তোমরা যাহা গ্রহণ করিয়াছ তজ্জন্য তোমাদের উপর মহাশাস্তি আপতিত হইত। তোমরা যে গনীমত (যুদ্ধলব্ধ মাল) লাভ করিয়াছ তাহা হালাল ও উত্তম বলিয়া ভোগ-ব্যবহার কর এবং আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৮:৬৮-৬৯)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় জমহুর মুফাসসিরীনে কিরাম বলেন, لَوْلا كَتْبٌ مِّنَ الله سبق মর্ম হইল, উম্মুল কিতাব তথা লাওহে মাহফুযে এই বিধান যদি লিখিত না থাকিত যে, গনীমতের মাল এই উম্মতের জন্য হালাল (তাফসীরে ইবন জারীর তাবারী, ১০খ., পৃ. ৩২-৩৮; তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৩৯)। নিম্নোক্ত হাদীছ হইতেও উক্ত বৈশিষ্ট্যের বিষয়টি প্রতীয়মান হয়। জাবির (রা) হইতে বর্ণিত, নবী কারীম (স) বলেন: আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস দান করা হইয়াছে যাহা পূর্ববর্তী আর কাহাকেও দেওয়া হয় নাই। রু'ব দ্বারা আমাকে এক মাসের পথ পর্যন্ত সাহায্য করা হইয়াছে। আমার জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু বানানো হইয়াছে। সুতরাং আমার উম্মতের যাহার যেখানে নামাযের ওয়াক্ত হইবে সে যেন সেখানেই নামায আদায় করিয়া নেয়। আমার জন্য গনীমতের মাল হালাল করা হইয়াছে, কিন্তু আমার পূর্ববর্তী কাহারও জন্য তাহা হালাল ছিল না। আমাকে শাফা'আতে কুবরার অধিকার দেওয়া হইয়াছে। আমার পূর্ববর্তী নবীগণকে প্রেরণ করা হইত বিশেষ গোত্রের প্রতি; আর আমি প্রেরিত হইয়াছি সমস্ত সৃষ্টির প্রতি (বুখারী, ফাতহুল বারী, পৃ. ৩৩৫; মুসলিম, নং ৫১১)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, কোন একজন নবী জিহাদ করিয়াছিলেন। তিনি তাঁহার সম্প্রদায়কে বলেন, এমন কোন ব্যক্তি আমার অনুসরণ করিবে না যে কোন নারীকে বিবাহ করিয়াছে এবং তাহার সঙ্গে মিলিত হওয়ার ইচ্ছা রাখে, কিন্তু সে এখনও মিলিত হয় নাই। আর এমন ব্যক্তিও না, যে ঘর তৈরি করিয়াছে; কিন্তু উহার ছাদ তোলে নাই। এমন ব্যক্তিও না, যে গর্ভবতী ছাগল কিম্বা উষ্ট্রী কিনিয়াছে এবং সে উহার প্রসবের অপেক্ষা করিতেছে। তারপর তিনি জিহাদে গেলেন এবং একটি জনপদের নিকটবর্তী হইলেন। তখন আসরের নামাযের ওয়াক্ত হইয়াছে কিংবা সময়টি ছিল ইহার কাছাকাছি। এই অবস্থায় তিনি সূর্যকে বলেন, তুমিও আদিষ্ট এবং আমিও আদিষ্ট। ইয়া আল্লাহ্! সূর্যকে কিছুক্ষণের জন্য থামাইয়া দিন। তখন উহাকে থামাইয়া দেওয়া হয়। অবশেষে তিনি বিজয় অর্জন করেন এবং গনীমতের মাল একত্র করেন। তখন সেগুলি জ্বালাইয়া দিতে আগুন আসে, কিন্তু আগুন তাহা জ্বালায় নাই। ইহাতে সেই নবী বলেন, তোমাদের মধ্যে কেহ গনীমত আত্মসাৎ করিয়াছে। প্রত্যেক গোত্র হইতে একজন আমার কাছে বায়'আত গ্রহণ করুক। ইহাতে তাহারা সকলেই তাঁহার হাতে বায়'আত গ্রহণ করিল। কিন্তু একজনের হাত নবীর হাতের সঙ্গে আটকাইয়া গেল। তিনি বলেন, তোমাদের মধ্যেই আত্মসাৎকারী রহিয়াছে। সুতরাং তোমার গোত্রের লোকেরা আমার কাছে বায়'আত গ্রহণ করুক। তাহারা তাঁহার হাতে বায়'আত গ্রহণ করিল। তখন দুই বা তিন ব্যক্তির হাত নবীর হাতের সঙ্গে আটকাইয়া গেল। নবী বলেন, তোমাদের মধ্যেই আত্মসাৎকারী রহিয়াছে। তোমরাই গনীমতের মালে খিয়ানত করিয়াছ। অবশেষে তাহারা একটি গাভীর মস্তক সমতুল্য স্বর্ণ উপস্থিত করিল এবং তাহা গনীমতের মালের সঙ্গে রাখিয়া দিল। বস্তুত এসব মাল মাটির উপরিভাগেই রাখা হইয়াছিল। তারপর আগুন আসিয়া সব জ্বালাইয়া দিল। আমাদের পূর্ববর্তী লোকদের জন্য গনীমতের মাল হালাল ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আমাদের দুর্বলতা ও অক্ষমতা লক্ষ্য করিয়া আমাদের জন্য তাহা হালাল করিয়াছেন (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৬খ., নং ৩১২৪; মুসলিম, নং ১৭৪৭)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী কারীম (স) বলেন: তোমাদের পূর্ববর্তী কোন আদম সন্তানের জন্য গনীমতের মাল হালাল ছিল না। পূর্ববর্তী যমানায় নিয়ম ছিল, আসমান হইতে আগুন আসিয়া তাহা জ্বালাইয়া দিত। রাবী সুলায়মান আল-আ'মাশ বলেন, আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন গনীমতের মাল হালাল হওয়া তথা বণ্টন করার পূর্বে সাহাবীগণ তাহা গ্রহণ করিলে আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন: لَوْلَا كِتُبٌ مِّنَ اللَّهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيْمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ. "আল্লাহ্র পূর্ব-বিধান না থাকিলে তোমরা যাহা গ্রহণ করিয়াছ, ইহার জন্য তোমাদের উপর মহাশাস্তি আপতিত হইত" (৮ঃ ৬৮)।
📄 (তিন) পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রকারীরূপে গণ্য করা
আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতকে বহু বৈশিষ্ট্য দান করিয়াছেন। উহার একটি হইল, আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদের জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তুরূপে সাব্যস্ত করিয়াছেন। সুতরাং নামাযের ওয়াক্ত হওয়ার পর যদি পানি না পাওয়া যায় এবং মসজিদও না মিলে, তবে মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করিয়া মাটিতে দাঁড়াইয়া নামায আদায় করিবে। পক্ষান্তরে পূর্ববর্তী উম্মতের বিষয়টি ইহার ব্যতিক্রম ছিল। তাহাদের জন্য ইবাদতখানা ও গীর্জা ছাড়া অন্য কোথায়ও নামায আদায় করা জায়েয ছিল না।
হযরত জাবির (রা) হইতে বর্ণিত। নবী কারীম (স) বলেন, আমাকে এমন পাঁচটি বিষয় দান করা হইয়াছে যাহা আমার পূর্ববর্তী কাহাকেও দান করা হয় নাই। রু'ব (ব্যক্তিত্বের ভীতি) দ্বারা আমাকে এক মাসের পথ পর্যন্ত সাহায্য করা হইয়াছে। আমার জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু সাব্যস্ত করা হইয়াছে। সুতরাং আমার উম্মতের যাহার যেখানে নামাযের ওয়াক্ত হইবে, সে যেন সেখানে নামায আদায় করে। আমার জন্য গনীমতের মাল হালাল করা হইয়াছে, কিন্তু আমার পূর্ববর্তী উম্মতের জন্য তাহা হালাল ছিল না। আমাকে শাফা'আতে কুবরার অধিকার প্রদান করা হইয়াছে। আমার পূর্ববর্তী নবীগণ বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হইতেন আর আমি প্রেরিত হইয়াছি সমস্ত সৃষ্টির প্রতি (প্রাগুক্ত)।
'আবদুল্লাহ ইব্ন আম্র (রা) বলেন, তাবুক যুদ্ধের সময় রাত্রে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাজ্জুদের নামায আদায় করার জন্য দাঁড়াইলেন। নামাযশেষে তিনি বলিলেন, আজ রাত্রে আমাকে এমন পাঁচটি বিষয় দেওয়া হইয়াছে যাহা আমার পূর্বে আর কাহাকেও দেওয়া হয় নাই। আমর জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু বানানো হইয়াছে। সুতরাং যেখানেই নামাযের ওয়াক্ত হইবে, তায়াম্মুম করিয়া আমি নামায আদায় করিতে পারিব। পক্ষান্তরে আমার পূর্ববর্তী উম্মতগণ 'এইরূপ করাকে গুনাহের কাজ মনে করিত। তাই তাহারা উপাসনালয় ও গীর্জায় নামায আদায় করিত (প্রাগুক্ত)।
আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: আমাকে এমন কিছু বিষয় দেওয়া হইয়াছে যাহা কোন নবী-রাসূলকে দেওয়া হয় নাই। আমরা বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহা কী? তিনি বলিলেন: আমাকে রু'ب দ্বারা সাহায্য করা হইয়াছে, আমাকে পৃথিবীর তাবৎ ধনভাণ্ডারের চাবি প্রদান করা হইয়াছে, আমার নাম আহমাদ সাব্যস্ত করা হইয়াছে, আমার জন্য মাটিকে পবিত্রকারী বস্তু সাব্যস্ত করা হইয়াছে, আর আমার উম্মতকে শ্রেষ্ঠতম উম্মত বলিয়া গণ্য করা হইয়াছে।
📄 (চার) এই উম্মত গুরুভার হইতে মুক্ত
উম্মতে মুহাম্মাদীর উপর আল্লাহ্ তা'আলার বড়ই অনুগ্রহ যে, তিনি তাহাদের উপর হইতে এমন গুরুভার অপসৃত করিয়াছেন যাহা পূর্ববর্তী উম্মতের উপর ছিল। অন্যান্য উম্মতের উপর যাহা হারাম ছিল এই উম্মতের জন্য তাহা হালাল করা হইয়াছে। দীন ইসলামে আল্লাহ্ তা'আলা কোন কঠোর বিধান রাখেন নাই যাহা মানুষের জন্য অসাধ্য। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: هُوَ اجْتَبَكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ . "তিনিই তোমাদের মনোনীত করিয়াছেন। তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেন নাই" (২২ঃ ৭৮)।
مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُمْ مِّنْ حَرَجٍ وَلَكِنْ يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمْ. "আল্লাহ্ তোমাদের কষ্ট দিতে চাহেন না; তিনি তোমাদের পবিত্র করিতে চাহেন" (৫:৬)।
يُرِيدُ اللهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ. "আল্লাহ্ তোমাদের জন্য যাহা সহজ তাহা চাহেন এবং যাহা তোমাদের জন্য ক্লেশকর তাহা চাহেন না" (২: ১৮৫)।
বস্তুত ইসলামী শরী'আত যেমনিভাবে পরিপূর্ণ তেমনি তাহা সহজও বটে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: انی ارسلت بحنيفية سمحة. "আমি সহজ-সরল দীনে হানীফসহ প্রেরিত হইয়াছি" (মুসনাদে আহমাদ, ৬খ., পৃ. ১১৬-২৩৩; আলবানী বলেন, হাদীছের সূত্রটি বিশুদ্ধ, সিলসিলাতুল আহাদীছ আস-সাহীহা, নং ১৭৩৩)।
রাসূলুল্লাহ (স) মু'আয এবং আবূ মূসা (রা)-কে ইয়ামানে পাঠানোর প্রাক্কালে নসীহত করিয়া বলিয়াছিলেন : يسرا ولا تعسرا وبشرا ولا تنفرا. "তোমরা উভয়ে মানুষের সঙ্গে সহজ আচরণ করিবে, কঠোর আচরণ করিবে না এবং লোকজনকে সুসংবাদ শুনাইবে, কিন্তু এমন কথা বলিবে না যাহাতে ঘৃণা সৃষ্টি হয়” (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৬খ., নং ৩০৩৮; মুসলিম, নং ১৭৩৩)।
উপরিউক্ত হাদীছসমূহ হইতে এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য তথা তাহাদের উপর হইতে গুরুভার লাঘব করার এবং শৃংখলমুক্ত হওয়ার কথাই প্রতীয়মান হয়। হুযায়ফা (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের হইতে এমনভাবে অদৃশ্য হইয়া যান যে, আর বাহিরে আসিলেন না। আমরা মনে করিলাম, হয়ত তিনি আর বাহির হইবেন না। ইহার পর তিনি বাহির হইয়া আসিয়া এমনভাবে সিজদাবনত হইলেন যে, আমরা মনে করিলাম, হয়ত এই সিজদায়ই তাঁহার জান কবয হইয়া গিয়াছে। তাহার পর তিনি মাথা উত্তোলন করিয়া বলিলেন : আমার রব আমার নিকট আমার উম্মতের ব্যাপারে এই বলিয়া পরামর্শ চাহিয়াছেন যে, আমি তাহাদের সঙ্গে কি আচরণ করিব? আমি বলিলাম : হে আমার রব! তাহারা আপনার সৃষ্টি এবং আপনারই বান্দা। তারপর দ্বিতীয়বার পরামর্শ চাহিলে আমি প্রথমবারের মতই বলিলাম। তখন তিনি বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার উম্মতের ব্যাপারে আমি আপনাকে অপদস্ত করিব না। ইহার পর তিনি আমাকে সুসংবাদ দিলেন, প্রথমে আমার উম্মতের সত্তর হাজার লোক জান্নাতে প্রবেশ করিবে এবং প্রতি হাজারের সঙ্গে থাকিবে আরও সত্তর হাজার। তাহাদের কাহারও কোন হিসাব-নিকাশ হইবে না। অনন্তর আমার নিকট একজন ফেরেশতা পাঠানো হইল। ফেরেশতা বলিলেন, আপনি দু'আ করুন, কবুল করা হইবে, আপনি প্রার্থনা করুন, দেওয়া হইবে। তখন আমি প্রেরিত ফেরেশতাকে জিজ্ঞাসা করিলাম : আমি যাহা চাহিব তাহা কি আমার রব আমাকে দান করিবেন? তিনি বলিলেন, দান করার জন্যই তো আমাকে আপনার নিকট প্রেরণ করা হইয়াছে। তারপর তিনি বলেন : আমার রব আমাকে তাহা দান করিয়াছেন। ইহাতে আমার কোন গর্ব নাই। হাদীছে ইহাও উল্লেখ রহিয়াছে, আমার পূর্ববর্তী নবীগণের উপর যে কঠিন বিধান ছিল, আমাদের ধর্মাদর্শে কঠিন বিধান আল্লাহ্ তা'আলা রাখেন নাই; বরং তিনি অনেক কিছুই আমাদের জন্য হালাল করিয়া দিয়াছেন (মুসনাদে আহমাদ, ৫খ., পৃ. ৩৯৩; হাফিয হায়ছামী বলেন, হাদীছটি ইমাম আহমাদ (র) বর্ণনা করিয়াছেন। ইহার সনদ হাসান; মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০খ., পৃ. ৬৮, ৬৯)।
আবূ মূসা আশ'আরী (রা) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে ছিলাম। পথে তিনি পেশাব করিতে ইচ্ছা করিলেন এবং পার্শ্ববর্তী একটি দেয়ালের আড়ালে নরম মাটির সামনে গিয়া দাঁড়াইলেন। তারপর বলিলেন : বনী ইসরাঈলের অবস্থা এই ছিল যে, তাহাদের কাহারও শরীরে পেশাবের সময় ইহার ছিটা লাগিলে তাহা কাঁচি দিয়া কাটিয়া ফেলা হইত। কিন্তু তোমাদের জন্য এই বিধান নাই। তোমাদের কেহ পেশাব করিতে ইচ্ছা করিলে সে যেন নরম স্থানে গিয়া পেশাব করে (মুসনাদে আহমাদ, ৫খ., পৃ. ৪০২; হাকেম বলেন, হাদীছের সনদ সহীহ। ইমাম যাহাবী এই মত সমর্থন করিয়াছেন; ৩খ., পৃ. ৪৬৬)।
আনাস (রা) বলেন, ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের নিয়ম ছিল, তাহাদের কোন মহিলার হায়েয আরম্ভ হইলে তাহারা তাহার সঙ্গে একত্রে আহার করিত না এবং এক ঘরে বাস করিত না। এই ব্যাপারে সাহাবীগণ মহানবী (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলে আল্লাহ্ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন: وَيَسْتَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ. "লোকে আপনাকে রজঃস্রাব সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, তাহা অশুচি। সুতরাং তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রী-সংগ বর্জন করিবে” (২: ২২২)।
তারপর নবী কারীম (স) বলেন: এই অবস্থায় তোমরা তাহাদের সঙ্গে সহবাস ব্যতীত সব কিছু করিবে। সংবাদটি ইয়াহূদীদের নিকট পৌঁছলে তাহারা বলিল, এই লোকটি আমাদের সব কাজে কেবল বিরোধিতাই করিতেছে। তখন উসায়দ ইবন হুদায়র এবং আব্বাদ ইব্ন বিশ্র (রা) আসিয়া বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইয়াহুদীরা এই এই কথা বলিয়াছে। আমরা কি তাহাদের সঙ্গে সহবাস করিতে পারিব না? এই কথায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারা বিবর্ণ হইয়া যায়। আমরা মনে করিলাম, ইহাতে হয়ত তিনি ব্যথা পাইয়াছেন। অতঃপর তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবার হইতে বাহির হইয়া যান। তখন তাহাদের সামনে দিয়া কিছু দুধ রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দরবারে হাদিয়াস্বরূপ আসে। তিনি তাহাদেরকে ডাকিয়া পাঠান এবং সেই দুধ তাহাদেরকে পান করান। ইহাতে তাহারা বুঝিতে পারেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের কথায় কোন ব্যথা পান নাই (মুসলিম, নং ৩০২)।
'আইশা (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) খেলাধুলায় রত কতিপয় বালকের নিকট-দিয়া যাইতেছিলেন। তখন তিনি বলেনঃ হে বনী আরফিদা! তোমরা এগুলির অবলম্বন কর। ইহাতে ইয়াহুদী ও খৃস্টান সম্প্রদায়ের লোকেরা বুঝিতে পারিল যে, আমাদের ধর্মাদর্শে কিছুটা সুযোগ রহিয়াছে (মুসনাদে আহমাদ, ৬খ., পৃ. ১১৬-২৩৩)।
উক্ত হাদীছের মর্ম হইলঃ আমি সহজ-সরল দীনে হানীফসহ প্রেরিত হইয়াছি। আলবানী বলেন, হাদীছের সূত্রটি বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য; আবু উবায়দ (র) গারীবুল হাদীছ গ্রন্থেও উল্লেখ করিয়াছেন। হারিছ ইব্ন আবু উসামা তৎপ্রণীত মুসনাদেও তাহা বর্ণনা করিয়াছেন (পৃ. ২১-২; দায়লামী ২খ., পৃ. ১১০; হুমায়দী, পৃ. ২৫৯)। আলবানীর মতে হাদীছের সনদ সামগ্রিকভাবে সহীহ) ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। সিলসিলাতুল আহাদীছ আস-সাহীহা, নং ১৮২৯; সহীহুল জামিইস সাগীর, নং ৩২১৮)।
ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, বনী ইসরাঈলের শারী'আতে হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে কিসাস প্রথা চালু ছিল। কেহ কাহাকেও হত্যা করিলে তাহার বিনিময়ে হত্যকারীকে হত্যা করার বিধানকে কিসাস বলে। কিন্তু দিয়াত তাহাদের মধ্যে চালু ছিল না। হত্যার শাস্তি ক্ষমা করিয়া দেওয়ার বিনিময়ে গৃহীত ক্ষতিপূরণের অর্থকে দিয়াত বলে। অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতের জন্য এই আয়াত নাযিল করেন: كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنْثَى بِالْأُنْثَى فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَآدَاءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَانِ. "নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু তাহার ভাইয়ের পক্ষ হইতে কিছুটা ক্ষমা প্রদর্শন করা হইলে যথাযথ বিধির অনুসরণ করা ও সততার সঙ্গে তাহার দেয় আদায় করা বিধেয়" (২:১৭৮)।
আল-'আফও (العفو) অর্থ ইচ্ছাকৃত হত্যার বিনিময়ে দিয়াত গ্রহণ করিয়া কিসাস ক্ষমা করিয়া দেওয়া। তোমাদের উপর অবধারিতভাবে আরোপিত কিসাস-এর বিকল্প হিসাবে তোমাদের প্রতি দিয়াত ব্যবস্থা আল্লাহর পক্ষ হইতে বিশেষ অনুগ্রহ ও লঘু শাস্তির বিধান (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১২খ., নং ৬৮৮১; তাফসীরে ইবন জারীর তাবারী, ২খ., পৃ. ৬৫)।
এক দীর্ঘ হাদীছে মহান আল্লাহর বাণী وَفَتَنَّاكَ فَتُوْنًا "আমি তোমাকে বহু পরীক্ষা করিয়াছি” (২০:৪০)-এর ব্যাখ্যায় ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। মুসা (আ) বলেন, হে আমার রব! আমি আমার কওমের জন্য তওবার আবেদন করিয়াছি। আমি বলিয়াছি, আমার রহমত ও করুণার বিষয়টি আমি সাব্যস্ত করিয়াছি এমন সম্প্রদায়ের জন্য যাহারা আমার কওমের অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং আপনি আমাকে ঐ করুণা বর্ষিত ব্যক্তির উম্মতের অন্তর্ভুক্ত করুন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে বলেন, তাহাদের তওবা হইবে: তাহারা নিজের পিতা-পুত্র যাহাকেই সামনে পাইবে তাহাকেই তরবারি দ্বারা হত্যা করিবে, এই ব্যাপারে কোনরূপ পরওয়া করিবে না। অতঃপর যাহাদের পাপ মূসা ও হারুন (আ)-এর নিকট ছিল, আল্লাহ্ তা'আলা তাহা প্রকাশ করেন এবং তাহারা এই পাপের কথা স্বীকার করিয়া আল্লাহ্ তা'আলার নিকট তওবা করে এবং যেভাবে আদেশ করা হইয়াছে ঐভাবেই করে। ফলে আল্লাহ্ তা'আলা হত্যাকারী এবং নিহত সকলকেই মাফ করিয়া দেন। তারপর মূসা (আ) তাহাদেরকে নিয়া বায়তুল মুকাদ্দাসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন [হাফিয ইব্ন কাছীর হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। সুনানুল কুবরা, ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইব্ন জারীর ও ইন্ন হাতিম তৎপ্রণীত তাফসীর গ্রন্থদ্বয় (তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ৩খ., ১৬০-১৬১ দ্র.)]।
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, বনী ইসরাঈলের কোন ব্যক্তি গুনাহ করিলে তাহার এই গুনাহর কাফ্ফারা কি হইবে, তাহা সকালে তাহাদের ঘরের দরজায় লিখিয়া দেওয়া হইত। আর শরীরে কোন নাপাকী লাগিলে তাহা কাঁচি দিয়া কাটিয়া ফেলা হইত। এই কথা শুনিয়া জনৈক ব্যক্তি বলিল, আল্লাহ্ তা'আলা বনী ইসরাঈলের জন্য উত্তম বিধান দিয়াছেন। তখন আবদুল্লাহ (রা) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা বনী ইসরাঈলের জন্য যে বিধান দিয়াছেন তাহার তুলনায় তোমাদের প্রতি দেওয়া বিধান উত্তম। তিনি তোমাদের জন্য পানিকে পবিত্রকারী বস্তুরূপে সাব্যস্ত করিয়াছেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: وَالَّذِيْنَ اِذَا فَعَلُوْا فَاحِشَةً اَوْ ظَلَمُوْا اَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللهَ فَاسْتَغْفَرُوْا لِذُنُوْبِهِمْ "এবং যাহারা কোন অশ্লীল কার্য করিয়া ফেলিলে অথবা নিজেদের প্রতি যুলুম করিলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে" (৩ : ১৩৫)।
وَمَنْ يَّعْمَلْ سُوْءًا اَوْ يَظْلِمُ نَفْسَهٗ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللهَ يَجِدِ اللهَ غَفُوْرًا رَّحِيْمًا. "কেহ কোন মন্দ কার্য করিয়া অথবা নিজের প্রতি যুলুম করিয়া পরে আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলে আল্লাহকে সে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু পাইবে" (৪ : ১১০)।
কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবী আল-মালিকী (র) বলেন, আমাদের পূর্ববর্তী শরী'আতের রোযার বিধান ছিল এইরূপ: লোকেরা রোযা অবস্থায় পানাহার বর্জন করার সাথে সাথে কথাবার্তাও বর্জন করিত। ইহাতে তাহাদের ভীষণ কষ্ট হইত। পক্ষান্তরে আল্লাহ্ তা'আলা উম্মতে মুহাম্মাদীর উপর একান্ত দয়াপরবশ হইয়া রোযার সময় হইতে অর্ধেক সময় অর্থাৎ রাত্রকে রোযার হুকুম হইতে বাদ দেন এবং কথা বর্জন করার হুকুমটিও রহিত করেন [হাফিয ইব্ন কাছীর (র) আনাস (রা)-এর সূত্রে হযরত মারয়াম (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন যে, إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَنِ صَوْمًا অর্থ صُمْتًا )চুপ থাকা); ইব্ন আব্বাস (রা) ও দাহহাক (র)-ও অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। আনাস (রা) হইতেও অনুরূপ বর্ণিত রহিয়াছে। কাতাদা (র)-ও একথা বলিয়াছেন। পূর্ববর্তী শারী'আতে রোযা রাখার ক্ষেত্রে এরূপ বিধান ছিল যে, তাহাদের জন্য পানাহার ও কথা বলা হারাম। সুদ্দী, কাতাদা ও আবদুর রহমান ইব্ন যায়দ (র) অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন (তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ৩খ., পৃ. ১২৩; তাফসীরে তাবারী, ১৬খ., পৃ. ৫৬; তাফসীরে কুরতুবী, ১১খ., পৃ. ৯৮]।
(পাঁচ) জুমু'আর দিন আল্লাহ্ তা'আলা উম্মতে মুহাম্মাদীকে বহু বৈশিষ্ট্য দান করিয়াছেন যাহা অন্য কোন উম্মতকে দেন নাই। ইহার মধ্যে জুমু'আর দিনটি অন্যতম (খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩৫৩)। এই দিনটি দিনসমূহের সর্দার বা সায়্যিদুল আয়্যাম। সূর্য উদিত হয় এমন দিনসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম দিন হইল এই জুমু'আর দিন। এই দিনেই আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হয়। এই দিনেই তাঁহাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়। এই দিনেই তাঁহাকে জান্নাত হইতে বহিষ্কার করা হয়। আর এই জুমু'আর দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হইবে। এই দিনে এমন এক মুহূর্ত রহিয়াছে সেই মুহূর্তে দু'আ করিলে আল্লাহ্ তা'আলা তাহা কবুল করেন। এই দিনেই রহিয়াছে ঐ সালাতুল জুমু'আ যাহার জন্য দৌঁড়াইয়া যাওয়ার হুকুম করিয়াছেন আল্লাহ্ কুরআন মজীদে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলিয়াছেন: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَوةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا البَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ. "হে মু'মিনগণ! জুমু'আর দিন যখন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয় তখন তোমরা আল্লাহ্র স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর; ইহাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি কর” (৬২ঃ ৯)।
এই মুবারক দিনটির ব্যাপারে পূর্ববর্তী উম্মতগণের মধ্যে মতভেদ ছিল। অবশেষে আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতকে এই দিনটির সন্ধান দেন এবং অন্যান্যদেরকে ইহা হইতে বেখবর রাখেন। এই দিনটি আমাদের জন্য সুনির্দিষ্ট। ইয়াহুদীদের জন্য শনিবার এবং খৃস্টানদের জন্য হইল রবিবার শ্রেষ্ঠ দিন। বহু হাদীছে এই সম্বন্ধে স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে। আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত: একদা তিনি রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে বলিতে শোনেন, আমরা (সৃষ্টির দিক হইতে) আখিরী উম্মত; তবে কিয়ামতের দিন (জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে) সকলের অগ্রগামী হইব। কেননা পূর্ববর্তী লোকদেরকে কিতাব দেওয়া হয় এবং এক মুবারক দিনে ইবাদত করা তাহাদের উপর ফরয করা হয়। কিন্তু তাহারা ইহাতে মতভেদ করে। অবশেষে আল্লাহ্ তা'আলা এই দিনটির ব্যাপারে আমাদেরকে সঠিক পথের সন্ধান দেন। এই ব্যাপারে সমস্ত উম্মত আমাদের অনুগামী। ইয়াহুদীরা পরের দিন তথা শনিবারকে এবং খৃস্টানরা ইহারও পরের দিন তথা রবিবারকে তা'যীমের দিন হিসাবে সাব্যস্ত করে (বুখাবী, ফাতহুল বারী, ২খ., পৃ. ৮৭৬; মুসলিম, নং ৮৫৫)।
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: সূর্য উদিত হয় এমন সব দিনের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম দিন হইল জুমুআর দিন। এই দিন আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হয়। এই দিনে তাঁহাকে জান্নাত হইতে বহিষ্কার করা হয়। এই দিনে তাঁহার তওবা কবুল করা হয়। এই দিনে তাঁহার ইনতিকাল হয়। আর এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হইবে। মানুষ এবং জিন ছাড়া সমস্ত জীব-জানোয়ারই এই জুমু'আর দিন ঊষালগ্ন হইতে সূর্যোদয় পর্যন্ত কিয়ামতের অপেক্ষা করে এবং আশংকা করে। জুমু'আর দিন এমন একটি মুহূর্ত আছে, যদি কোন বান্দা নামায পড়িয়া এই সময়টিতে দু'আ করে তবে আল্লাহ্ তা'আলা অবশ্যই তাহার দু'আ কবুল করেন। কা'ব (র) জিজ্ঞাসা করেন, এই দিনটি কি সারা বৎসরই পাওয়া যায়? রাবী আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, তাহার জবাবে আমি বলিলাম, বরং প্রতি জুমু'আয় পাওয়া যায়। তখন কা'ব (র) তাওরাত পড়িয়া করিয়া বলিলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) সত্যই বলিয়াছেন। আবু হুরায়রা (রা) বলেন, তাহার পর 'আবদুল্লাহ্ ইব্ন সালাম (রা)-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হইলে আমি কা'ব-এর সাথে আমার বৈঠকের কথা বলিলাম। তিনি বলিলেন, তাহা কোন মুহূর্ত আমি জানি। একথা শুনিয়া আবূ হুরায়রা (রা) বলিলেন, তাহা হইলে আপনি আমাকে সেই মুহূর্তের কথা জানাইয়া দিন। আবদুল্লাহ্ ইব্ন সালাম (রা) বলিলেন, তাহা জুমুআর দিনের শেষ সময়। আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, আমি বলিলাম, তাহা জুমু'আর দিনের আখিরী সময় কেমন করিয়া হইবে? রাসূলুল্লাহ্ (স) তো বলিয়াছেন: যদি কোন মুসলিম বান্দা সালাতরত অবস্থায় সেই সময়টি পায়, অথচ এই সময়ে কেহ সালাত আদায় করে না। তাহা হইলে ইহা জুমুআর দিনের আখিরী সময়ে কেমন করিয়া হইবে? জবাবে আবদুল্লাহ্ ইব্ন সালাম (রা) বলিলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) কি বলেন নাই, যে ব্যক্তি সালাতের অপেক্ষায় থাকে, সেও সালাতের মধ্যে থাকে বলিয়া গণ্য হয়? আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, আমি বলিলাম, হাঁ। তিনি বলিলেন, ঐ সালাত বলিয়া ইহাকেই বুঝানো হইয়াছে (আবূ দাউদ, হাদীছ নং ১০৪৬; তিরমিযী, নং ৪৯১; ইমাম তিরমিযী (র) বলেন, হাদীছটি হাসান-সহীহ; নাসাঈ, ৩খ., পৃ. ১১৪-১১৫; মুওয়াত্তা মালিক, ১খ., পৃ. ১০৮-১১০; আলবানীর মতে হাদীছটি সহীহ্; আল-জামিউস সাগীর, নং ৩৩২৯)।
আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: একদা জিব্রাঈল (আ) আমার নিকট আসেন এবং তখন তাঁহার হাতে ছিল একটি সাদা আয়না, তাহাতে ছিল একটি কাল দাগ। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, হে জিব্রাঈল! ইহা কি? উত্তরে তিনি বলেন, ইহা হইল জুমুআর দিন। আপনার রব তাহা আপনার নিকট পেশ করিয়াছেন যাহাতে আপনি ও আপনার উম্মত এই দিনটিকে ঈদ হিসাবে উদযাপন করেন। এক্ষেত্রে আপনি থাকিবেন অগ্রগামী। ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের অবস্থান আপনার পরে। রাসূলুল্লাহ্ (স) ফেরেশতা জিব্রাঈল (আ)-কে জিজ্ঞাসা করেন: ইহাতে আমাদের জন্য কি রহিয়াছে? ফেরেস্তা বলেন, ইহাতে আপনাদের জন্য কল্যাণ রহিয়াছে। ইহাতে এমন একটি মুহূর্ত রহিয়াছে, যে ব্যক্তি ঐ মুহূর্তে তাহার রবের নিকট কল্যাণের জন্য দু'আ করিবে, যাহা তাহার ভাগ্যে রহিয়াছে, তবে অবশ্যই আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে তাহা দান করিবেন। আর যদি তাহা তাহার ভাগ্যে না থাকে তবে তাহা তাঁহার জন্য সঞ্চয় হিসাবে রাখিয়া দেওয়া থাকিবে। কেহ যদি এই মুহূর্তে কোন অকল্যাণ হইতে আল্লাহ্র নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে, যাহা তাহার জন্য অবধারিত, তবে আল্লাহ্ তা'আলা তাহাকে ইহার চেয়েও বড় অকল্যাণ হইতে আশ্রয় দান করিবেন। নবী কারীম (স) বলেন, আমি বলিলাম, ইহাতে এ কাল দাগটি কি? তিনি বলিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা জান্নাতের মধ্যে এমন একটি ময়দান বানাইবেন যাহা শুভ্র মিশক হইতেও অধিক সুঘ্রাণ বিচ্ছুরিত করিবে। জুমু'আর দিন আল্লাহ্ তা'আলা এই ময়দানে 'ইল্লিয়্যূন' হইতে অবতরণ করিয়া স্বীয় কুরসীতে সমাসীন থাকিবেন। এই কুরসীকে নূরের মিম্বরসমূহ পরিবেষ্টন করিয়া রাখিবে। তখন নবী-রাসূলগণ ঐ মিম্বরসমূহের উপর আসিয়া বসিবেন আর এই মিম্বরসমূহের চারি দিকে থাকিবে কতিপয় স্বর্ণের কুরসী। সেই কুরসীতে সিদ্দীক ও শহীদগণ উপবিষ্ট থাকিবেন। তাহার পর জান্নাতী লোকেরা আসিয়া এক একটি টিলার উপর উপবেশন করিবেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় তাজাল্লীতে উদ্ভাসিত হইবেন এবং সকলেই তাঁহার দীদার লাভে ধন্য হইবেন। এই অবস্থায় তিনি ঘোষণা করিবেন, আমি তোমাদের সাথে কৃত অঙ্গীকার বাস্তবে রূপায়িত করিয়াছি এবং তোমাদের প্রতি আমার দেওয়া নি'আমতকে পরিপূর্ণ করিয়াছি। ইহা আমার অনুগ্রহ প্রদর্শনের স্থান। সুতরাং তোমরা আমার নিকট দু'আ কর। তখন সকলেই তাঁহার নিকট তাঁহার সন্তুষ্টি লাভের দু'আ করিবে। তিনি বলিবেন, এই স্থানে আমি তোমাদের প্রতি আমার সন্তুষ্টি উন্মুক্ত করিয়া দিলাম। তাহার পর তিনি বলিবেন, তোমাদের জন্য আমার আরও অনুগ্রহ রহিয়াছে। তোমরা আমার নিকট চাও। সকলেই তাঁহার নিকট চাহিতে থাকিবে। এভাবে দু'আ করিতে করিতে সকলের চাওয়া-পাওয়াই পূর্ণ হইয়া যাহাবে। তখন তাহাদের জন্য আল্লাহ্র সত্তাকে উন্মুক্ত করিয়া দেওয়া হইবে। ফলে তাহারা অবলোকন করিবে এমন জিনিস যাহা চোখ কোন দিন দেখে নাই, কান কোন দিন শুনে নাই এবং মানুষের হৃদয় কোন দিন কল্পনাও করে নাই। জুমুআর দিন সালাত হইতে প্রত্যাবর্তনকালে যেই পরিমাণ সময় ব্যয় হয় সেই পরিমাণ সময় ধরিয়া এই অবস্থা অব্যাহত থাকিবে। তাহার পর আল্লাহ্ তা'আলা পুনরায় স্বীয় কুরসীতে সমাসীন হইবেন। তাঁহার সাথে সাথে শহীদগণ এবং সিদ্দীকগণও নিজ নিজ কুরসীতে সমাসীন থাকিবেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয়, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন, তখন প্রত্যেকেই শুভ্র মোতি, লাল ইয়াকৃত কিংবা সবুজ যবরজদ পাথর দ্বারা নির্মিত নিজ নিজ কক্ষে ফিরিয়া আসিবেন। পাথরগুলিতে ফাটা, ভাংগা বা এই জাতীয় কোন খুঁত থাকিবে না। দরজাগুলি দূরে থাকিবে। ইহাতে নহর প্রবাহিত থাকিবে এবং প্রবাহিত নহরে বালতি থাকিবে। ইহাতে আরও থাকিবে রকমারি ফল-ফলাদি, স্ত্রী, খাদিম ইত্যাদি। প্রকৃতপক্ষে মানুষ নিজেদের সম্মান ও আল্লাহ্র দীদারের পরিমাণ বৃদ্ধি করার জন্য জুমু'আর দিনের প্রতি যে পরিমাণ মুখাপেক্ষী, অন্য কিছুর প্রতি সেই পরিমাণ মুখাপেক্ষী থাকিবে না। তাই এই দিনকে 'বোনাস দিন' বলা যায় (হাফিয হায়ছামী বলেন, হাদীছটি ইমাম তাবারানী তৎপ্রণীত গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন। রাবীগণ সকলেই নির্ভরযোগ্য। আবূ ইয়ালাও ইহা বর্ণনা করিয়াছেন। তাঁহার রাবী সকলেই সহীহ-এর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ। মাজমাউয যাওয়াইদ, ২খ., পৃ. ১৬৪)।
(ছয়) এই উম্মতের ভুল-ত্রুটি এবং পাপপ্রসূত কল্পনা ক্ষমাযোগ্য আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতকে অসংখ্য ও অগণিত নি'য়ামত দান করিয়াছেন। ইহাতে রহিয়াছে আখিরী নবী মুহাম্মাদ (স)-এর প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শন। আল্লাহ্ প্রদত্ত নি'য়ামতসমূহের অন্যতম হইল, তিনি এই উম্মতের ভুল-ত্রুটি এবং মনের অবাস্তব জল্পনা-কল্পনা ইত্যাদি সব কিছু ক্ষমা করিবেন। মনের জল্পনা-কল্পনা যদি উচ্চারণ না করা হয় কিংবা তাহা বাস্তবে রূপায়িত না করা হয় তাহা হইলে এসব ক্ষমাযোগ্য। ইহা এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য। হাদীছে এই সম্বন্ধে স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে। আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মতের অহেতুক কল্পনা মাফ করিয়া দিয়াছেন যতক্ষণ না তাহারা তাহা উচ্চারণ করে কিংবা বাস্তবে রূপায়িত করে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৫৬০; মুসলিম নং ১২৭)।
للهِ مَا فِي السَّمواتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَإِنْ تُبْدُوا مَا فِي أَنْفُسِكُمْ أَوْ تُخْفُوهُ يُحَاسِبْكُمْ بِهِ اللَّهُ فَيَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَنْ يُشَاءُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ. "আসমান ও যমীনে যাহা কিছু আছে সমস্ত আল্লাহ্রই। তোমাদের মনে যাহা আছে তাহা প্রকাশ কর অথবা গোপন রাখ, আল্লাহ্ উহার হিসাব তোমাদের নিকট হইতে গ্রহণ করিবেন। অতঃপর যাহাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করিবেন এবং যাহাকে খুশী শাস্তি দিবেন। আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান” (২: ২৮৪)।
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর উপরিউক্ত আয়াত নাযিল হইলে বিষয়টি সাহাবীগণের খুবই কঠোর মনে হয়। তাই সবাই রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সালাত, সিয়াম, জিহাদ, সাদাকা প্রভৃতি যে সমস্ত আমল আমাদের সামর্থ্যানুযায়ী ছিল, এই যাবত আমাদেরকে সেগুলি করার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। বর্তমানে আপনার উপর এই আয়াত নাযিল হইয়াছে। বিষয়টি তো আমাদের সমর্থ্যের বাহিরে। একথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, কিতাবী তথা ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের ন্যায় তোমরাও কি এমন কথা বলিবে, "শুনিলাম, কিন্তু মানিলাম না"? বরং তোমরা বল, শুনিলাম ও মানিলাম। হে আমাদের রব! আমরা তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি, আর তুমিই আমাদের শেষ প্রত্যাবর্তনস্থল। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর এই নির্দেশ শুনিয়া সাহাবায়ে কিরাম বলেন, আমরা শুনিয়াছি ও মানিয়াছি, হে আমাদের রব! আমরা তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি; তুমিই আমাদের শেষ প্রত্যাবর্তনস্থল। রাবী বলেন, সাহাবীদের সকলেই এই আয়াত পাঠ করেন এবং বিনয়াপ্লুত হইয়া মনে-প্রাণে তাহা গ্রহণ করেন। ইহার পর আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন: اَمَنَ الرَّسُولُ بِمَا اُنْزِلَ اِلَيْهِ مِنْ رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلُّ اَمَنَ بِاللَّهِ وَمَلْئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ اَحَدٍ مِّنْ رُّسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَاَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَاِلَيْكَ الْمَصِبْرُ. "রাসূল, তাহার প্রতি তাহার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে যাহা নাযিল হইয়াছে তাহাতে ঈমান আনিয়াছে এবং মু'মিনগণও। তাহাদের সকলে আল্লাহ, তাঁহার ফেরেশতাগণে, তাঁহার কিতাবসমূহে এবং তাঁহার রাসূলগণে ঈমান আনয়ন করিয়াছে। তাহারা বলে, আমরা তাঁহার রাসূলগণের মধ্যে কোন তারতম্য করি না। তাহারা আরও বলে, আমরা শুনিয়াছি এবং পালন করিয়াছি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তোমার ক্ষমা চাই এবং প্রত্যাবর্তন তোমারই নিকট” (২: ২৮৫)।
যখন তাহারা সর্বোতভাবে আনুগত্য জ্ঞাপন করিলেন, তখন আল্লাহ্ তা'আলা উক্ত আয়াতের হুকুম রহিত করিয়া নাযিল করিলেন: لا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَّسِينَا أَوْ أَخْطَانًا "আল্লাহ্ কাহারও উপর এমন কোন কষ্টদায়ক দায়-দায়িত্ব অর্পণ করেন না যাহা তাঁহার সাধ্যাতীত। সে ভাল যাহা উপার্জন করিয়াছে তাহা তাহারই জন্য এবং মন্দ যাহা উপার্জন করিয়াছে তাহাও তাহারই। হে আমাদেব রব! যদি আমরা বিস্মৃত হই কিংবা ভুল করিয়া ফেলি, তবে তুমি আমাদেরকে পাকড়াও করিও না"। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, "হাঁ, মানিয়া নিলাম।" আরও নাযিল হয়: رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا . "হে আমাদের রব! আমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর যেমন গুরুদায়িত্ব অর্পণ করিয়াছিলেন, আমাদের উপর তেমন দায়িত্ব অর্পণ করিবেন না"। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, হাঁ, মানিয়া নিলাম। আরও নাযিল হয়: رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ. "হে আমাদের রব! এমন ভার আমাদের উপর অর্পণ করিবেন না যাহা বহনের ক্ষমতা আমাদের নাই"। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, হাঁ, মানিলাম। আরও নাযিল হইয়াছে: وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنْتَ مَوْلَانَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَفِرِينَ. "আমাদের পাপ মোচন কর, আমাদেরকে ক্ষমা কর এবং আমাদের প্রতি রহম কর। তুমিই আমাদের অভিভাবক। সুতরাং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে জয়যুক্ত কর" (সূরা বাকারা, আয়াত নং ২৮৬)। এবারও রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, হাঁ, মানিয়া নিলাম (মুসলিম, হাদীছ নং ১১৫)।
আবূ যার গিফারী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মতের ভুল-ভ্রান্তি এবং জোরপূর্বক তাহাদের দ্বারা 'যাহা করানো হয়, এমন সব কাজ মাফ করিয়া দিয়াছেন। ইহাতে উম্মতে মুহাম্মাদীর মর্যাদা প্রতীয়মান হয় এবং ইহা এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য। এই উম্মতের কোন ব্যক্তি যদি ভুলে কোন অপরাধ করিয়া বসে তবে তাহা না করার মধ্যেই গণ্য থাকিবে। পূর্ববর্তী উম্মতের বিষয়টি ইহার ব্যতিক্রম ছিল (ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৫৬০; ইব্ন মাজা, হাদীছ নং ২০৫৩; মুসতাদরাক হাকেম, ২খ., পৃ. ১৯৮; তাঁহার মতে হাদীছটি বুখারী-মুসলিমের শর্তে উত্তীর্ণ। তবে তাঁহারা ইহা বর্ণনা করেন নাই। যাহাবীও অনুরূপ বলিয়াছেন; দারু কুতনী, পৃ. ৭৯৭; বায়হাকী, ৭খ., পৃ. ৩৫৬। আলবানীও হাদীছটিকে সহীহ বলিয়াছেন)।
ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহ্ তা'আলা হইতে এই কথা বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা সমুদয় সৎ ও অসৎ কর্মের হিসাব লিখেন। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) ইহাকে আরও বিস্তারিত করিয়া বলেন, যে ব্যক্তি নেক কাজের ইচ্ছা করিয়াছে অথচ তাহা সম্পাদন করে নাই, আল্লাহ্ তা'আলা ইহার বিনিময়ে তাহার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ছওয়াব লিখিয়া দেন। আর ইচ্ছার পর তাহা কাজে পরিণত করিলে আল্লাহ্ তা'আলা ইহার বিনিময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ছওয়াব লিখিয়া দেন। পক্ষান্তরে কেহ যদি কোন মন্দ কাজের ইচ্ছা করিয়া তাহা কাজে পরিণত না করে, তবে আল্লাহ্ তা'আলা ইহার বিনিময়ে তাহার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ছওয়াব লিখিয়া দেন। আর ইচ্ছার পর সম্পাদন করিলে তিনি একটি মাত্র গুনাহ লিখেন (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১খ., হাদীছ নং ৬৪৯১; মুসলিম, হাদীছ নং ১৩১)।